রাজনীতির অন্যতম অস্ত্র: দিশা দেখিয়েছিলেন রাবণ
শৌভিক রায়
বেশ কিছু বছর আগের কথা। বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির শিক্ষক-প্রতিনিধি নির্বাচন ঘিরে অদ্ভুত কাণ্ড দেখেছিলাম। হার নিশ্চিন্ত জেনে, বিরোধী পক্ষের দুই শিক্ষককে, অপহরণ করেছিল ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী। এসএসসি চালু হওয়ার আগে, চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসে, অপহৃত হওয়ার ঘটনা সাধারণ ব্যাপার ছিল। কিন্তু পরিচালন সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের `কিডন্যাপড` হতে হবে, সেটা ছিল অকল্পনীয়। `রাজনৈতিক অপহরণ` বিষয়টি যে কী মারাত্মক, সেদিনই বুঝেছিলাম। এটি এমনই একটি বিষয়, যা কাউকেই রেয়াত করে না। অতি সম্প্রতি, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর অপহরণ, সেরকমই একটি উদাহরণ।
মানব ইতিহাসে অপহরণ বা `কিডন্যাপিং` কিন্তু নতুন কোনও বিষয় নয়। `রামায়ণ`-এ সীতাকে অপহরণ করা হয়েছিল। সীতাকে অপহরণের পেছনে শুধুই শুর্পনখার অপমানের জবাব- এরকম ভাবনা ভুল। রামায়ণের আধুনিক পাঠ বলছে, এই অপহরণ আসলে আর্য সাম্রাজ্য প্রসারের বিরুদ্ধে, অনার্য শক্তির প্রতিবাদ। মহাভারতেও এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে এবং কিডন্যাপিংয়ের ব্যাপারে পিছিয়ে ছিলেন না পাণ্ডব বা কৌরব কোনও পক্ষই। অন্যদিকে, ইলিয়াডে দেখেছি, ট্রয়ের যুদ্ধ হয়েছিল শুধুমাত্র একটি কিডন্যাপকে কেন্দ্র করে। আর তাতে জড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন রাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে, মহাকাব্য একটি যুগের ইতিহাস তুলে ধরে। বলে তখনকার রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার কথা। তাই এটা নিশ্চিন্ত যে, এই অপহরণগুলির কোনওটিই রাজনীতির বাইরে ছিল না।
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার শুরুতে প্রাচীন রোমের প্রথম রাজা রম্যুলাস ও তাঁর সৈন্যবাহিনী সাবাইন মহিলাদের অপহরণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই নারীদের অন্তঃসত্ত্বা করে নিজের দলের লোক বাড়ানো। অর্থাৎ পুরোটাই রাজনৈতিক বিষয়। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫ সালে সিসিলিয়ান জলদস্যুরা অবশ্য পঁচিশ বছর বয়সী জুলিয়াস সিজারকে শুধুমাত্র টাকার জন্য অপহরণ করে বিপদে পড়েছিল। তৃতীয় ক্রুসেডের পর অস্ট্রিয়ার ডিউক কিডন্যাপ করেন রাজা প্রথম রিচার্ডকে। তাঁকে তুলে দেওয়া হয়েছিল রোমান সম্রাট ষষ্ঠ হেনরির হাতে। শুধুমাত্র বিপুল পরিমান টাকার বদলেই নয়, রাজা প্রথম রিচার্ড ছাড়া পান বেশ কিছু রাজনৈতিক শর্তে। মধ্যযুগেও বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে কিডন্যাপিং ছিল অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। আর এই বিষয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে কোনও বিভেদ ছিল না। এককথায়, `বলে` না পেরে, `ছলে` ও `কৌশলে` রাজনৈতিক সুবিধে আদায় করার অত্যন্ত প্রাচীন একটি পদ্ধতি হল অপহরণ। এর বিকল্প নেই। ফলে, সারা দুনিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, পররাষ্ট্র নীতির তোয়াক্কা না করে, অন্য রাষ্ট্রে ঢুকে রাষ্ট্রপতিকে কিডন্যাপ করে নিজের দেশে আনতে একবারও ভাবে না পৃথিবীর তথাকথিত এক নম্বর শক্তিশালী রাষ্ট্রটি।
আধুনিককালে, গ্লোবাল টেররিজম ডাটাবেসের হিসেবে অনুসারে, ১৯৭০ থেকে ২০১৮ অবধি, রাজনৈতিক কারণে, ১২ হাজার ১৩৮ টি কিডন্যাপিংয়ের ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে মোট ৯২ হাজার ৯৮২ জন অপহৃত হয়েছেন। লক্ষণীয় যে, অপহরণ শুধুমাত্র অপহৃতের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকেই নষ্ট করে না, তাঁর পরিবার ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে `ট্রমাটাইজড` করে। অপহরণের সঙ্গে মিশে থাকে হত্যা, ধর্ষণ, অত্যাচার কিংবা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার মতো বিষয়। অপহরণকারীদের দাবি যদি মেনে না নেওয়া নেয়, তবে তার ফল কী হতে পারে, সেটি সহজেই অনুমান করা যায়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, কাশ্মীরে বা ভারতের উত্তর-পূর্বের বেশ কিছু রাজ্যের কথা, যেখানে রাজনৈতিক সুবিধে লাভের জন্য জঙ্গীগোষ্ঠীগুলি একসময় রাজনৈতিক নেতা থেকে সাধারণ মানুষকেও কিডন্যাপ করত। জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট যেমন ১৯৮৯ সালে কিডন্যাপ করেছিল তদানীন্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দের মেয়ে রুবাইয়াকে। রাজনৈতিক ভাবে তারা সফল হয়েছিল। মুক্তি দিতে হয়েছিল ভারতের জেলে বন্দী পাঁচ উগ্রবাদীকে। আবার জামাতা ও আরও দু`জনের সঙ্গে, কন্নড় ছায়াছবির সুপারস্টার ডঃ রাজকুমার অপহৃত হয়েছিলেন। সৌজন্যে চন্দনদস্যূ বীরাপ্পন। দাবি ছিল `টাডা` আইনে যাদের ধরা হয়েছে তাদের মুক্তি, কর্নাটকে তামিল ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষার স্বীকৃতি ও তামিলনাড়ুকে কাবেরির জলের সমভাগ। এই কিডন্যাপের ফলে দুই রাজ্যের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। সুতরাং বলা যায়, রাজনৈতিক অপহরণের ফল সুদূরপ্রসারী। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরোর অপহরণও ঠিক সেরকমই একটি ঘটনা। এর ফলে, আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতি কোনদিকে বাঁক নেবে, দেখার বিষয় সেটিই।
যে রাজনৈতিক অপহরণগুলি দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাদের মধ্যে নাৎসি অফিসার অ্যাডলফ ইচম্যানের কিডন্যাপিং অন্যতম। ১৯৬০ সালে ইজরায়েলের গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ তাঁকে আর্জেন্টিনায় অপরহণ করে। যুদ্ধ অপরাধী ও মানবতার শত্রু হিসেবে বিচারের পর, ১৯৬২ সালে, ইজরায়েলের রমলা শহরে, তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। আবার, ১৯৩৬ সালে চিয়াং-কাই-শেক কিন্তু কিডন্যাপড হয়েছিলেন সম্পূর্ণ কারণে। জাপানের সঙ্গে লড়াই করবার জন্য তিনি যাতে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে হাত মেলান, সেটাই ছিল অপহরণকারী ঝ্যান খুয়েলিয়াঙ এবং ইয়াং হুচেনের উদ্দেশ্য। মজার কথা হল, এই দুজনই ছিলেন চিয়াং-কাই-শেকের নিজের দলের লোক ও তাঁর অধস্তন। দুই সপ্তাহ পরে তিনি অবশ্য মুক্তি পান এবং মৌখিকভাবে জাপানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়তে রাজি হন।
১৯৭৪ সালে সারা বিশ্বের সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়ে উঠেছিলেন আমেরিকার অভিনেত্রী প্যাটি হার্স্ট। ধনকুবের উইলিয়াম র্যান্ডলফ হার্স্টের কন্যাকে উগ্র বামপন্থী সিম্বিওনিজ লিবারেশন আর্মি অপহরণ করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর প্যাটি নিজেই অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যাংক ডাকাতি করেন। ধরা পড়বার পর অবশ্য তাঁকে `স্টকহোম সিনড্রোমে` আক্রান্ত বলে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু ইতালির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আলদো মোরো-কে শেষ পর্যন্ত হত্যা করেছিল `রেড ব্রিগেড`। ১৯৭৮ সালে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। তদানীন্তন ইতালি সরকার তাঁর মুক্তির ব্যাপারে কোনও সমঝোতায় আসতে চায়নি। রাজনৈতিক অপহরণের আর একটি চমকপ্রদ উদাহরণ হল, লেবানিজ প্রধানমন্ত্রী সাদ হাইরির অপহরণ। রিয়াধ পরিদর্শনের সময় তাঁকে অপহরণ করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তেহরানের আমেরিকান এমব্যাসির দখল নিয়ে চারশো চুয়াল্লিশ দিন ধরে বন্দি শাহ-কে প্রত্যর্পণের দাবিতে ৫২ জন কর্মীকে অপহরণ করে রাখা, সম্ভবত অন্যতম দীর্ঘ কিডন্যাপিংয়ের ঘটনা।
এরকম উদাহরণ প্রচুর। কী করে ভোলা যায় নাইজেরিয়ার কুখ্যাত বোকো হারেমের অপহরণের ঘটনাগুলি? কিংবা অপহরণের পর, অপহৃতের মাথা কেটে ফেলে দুনিয়াকে দেখানো অতি উগ্রবাদী আইসিস জঙ্গিদের? ল্যাটিন আমেরিকা, পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু রাষ্ট্রে গল্পটা আবার অন্য। এই সব দেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক নানা কারণে দ্বন্দ লেগেই আছে। ফলে অপহরণ সেখানে অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। কিন্তু সমস্যা হল, সেই অপহরণের লক্ষ্য থাকে শিশু-কিশোররা। অপহরণের পরে তাদেরকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করার ঘটনাও অজানা নয় কারও। এই সব অঞ্চলে ২০০৫ থেকে ২০২৩ অবধি অপহরণ ও অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা মোট ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার। বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও বেশি। কেননা বহু ঘটনা সামনেই আসেনি। একই কথা বলা যায় শ্রীলংকার এলটিটিই-দের প্রসঙ্গেও। একই উদ্দেশ্যে তারাও সাধারণ নাগরিকদের অপহরণ করত। রাজনৈতিক দরকষাকষির জন্য আরও বহুজনকেই কিন্যাপ করেছিল তারা।
একটা সময় কালো মানুষদের অপহরণ করে বিভিন্ন কাজে লাগানোর দোষে অভিযুক্ত বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রের অপহরণের তালিকায় আবু ওমর, আলভারেজ মাচেন থেকে শুরু করে সাদ্দাম হোসেন সহ অনেকেই আছেন। এই তালিকায় ওসামা বিন লাদেনকে হয়ত যোগ করা যাবে না, তাঁর ঘৃণ্য কাজের জন্য। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে সেই হত্যাকাণ্ডের তাৎপর্য নিঃসন্দেহে আলাদা ছিল। রাজনৈতিক অপহরণের কুটিল খেলায় পিছিয়ে নেই বিশ্বের অন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলিও।
আসলে `রাজনৈতিক অপহরণ` বিষয়টি শুধুমাত্র গল্প, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজের বিষয় নয়। বাস্তবের কিডন্যাপিং অনেক বেশি নাটকীয় ও নির্মম। স্বাভাবিকভাবেই এর পক্ষে ও বিপক্ষে জনমত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর কিডন্যাপ ঘিরেও সারা বিশ্ব স্পষ্ট দু`ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তাতে অবশ্য কিছুই যায় আসে না। বরং যতদিন রাজনীতি-পররাষ্ট্রনীতি থাকবে, রাজনৈতিক অপহরণ চলবেই। তার জন্য আমরা কী বললাম তার তোয়াক্কা করে কে!
(প্রকাশিত: রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ জানুয়ারি ১১, ২০২৬)
** ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ

No comments:
Post a Comment