অলৌকিক সেই দিনে মায়ের কাছে
শৌভিক রায়
অবশেষে..... ওই যে....
বড় তুড়িগ্রাম.....
বুকে চলকে উঠল রক্ত....
'কতদিন পর? কতদিন পর?'
জানতে চাইল হাওয়া।
যে পথ ঢুকে গেছে এঁকেবেঁকে, তারও জিজ্ঞাসা এক।
বুড়ো পাকুর গাছটা মাথা নুইয়ে সঙ্গ দিল ওদের।
কতদিন পর মা? কতদিন পর?
ভেসে এলো মায়ের গলা, 'ওদিকে যাস না, খেজুর কাঁটা ঢুকবে পায়ে....'
ফিরে তাকাই পেছনে।
মায়ের পাশে দুই কাকিমা। মেজো কাকিমার কোলে ঝিনি। পাশে আছে দাদা আর বাবা।
বাতাস জড়িয়ে ধরে সারা গা। শিউরে উঠি। কোথায় কে! বাবা আর নেই। নেই মা আর মেজো কাকিমাও।
দাদা, ঝিনি আর বড় কাকিমা কোথায় এখানে! ওরা যে যার বাড়িতে। নিজের মতো।
- ছবি তুলছেন কেন? রাস্তার কাজ হবে নাকি?
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে এক মানুষ।
- না। এমনিই তুলছি।
- কোথায় যাবেন বলুন তো?
- মায়ের কাছে।
- মায়ের কাছে? মানে...
- এই গ্রামে জন্মেছিলেন আমার মা। বাড়ি ছিল। নেই আর। বিক্রি হয়ে গেছে। তবু তো মামাবাড়ি! মায়ের বাড়ি। তাই বললাম, মায়ের কাছে....
- বলেন কী! কোন বাড়ি? কোথা থেকে এসেছেন?
- এসেছি কোচবিহার থেকে।
- আরিব্বাস! এত দূর! তা কোন বাড়ি? কোন বাড়ি?
- নাগ বাড়ি। দাদুর নাম ছিল মৃত্যুঞ্জয় নাগ। নিজের দাদাকে নিয়ে চলে যান কাটিহারে। স্কুলে পড়াতেন। ছোট নাগবাবু বলে চিনতেন সবাই ওঁকে। মায়ের জন্ম অবশ্য এখানেই। বাড়ি ছিল। হাতবদল হয়েছে বছর কয়েক আগে।
- নাগ....আছে তো নাগ পরিবার কয়েক ঘর।
- আমাদের আর কেউ নেই। বললাম যে। ছোট জন বাদে মামারাও নেই আর। মা নেই, ছোট মাসি নেই। মেজ মাসি আর ওই ছোট মামা। মামা অবশ্য আসতেন। একটা মন্দির করেছিলেন, শ্মশান তৈরি....
- আরেএএএ.....আপনি কাকার বড়দির ছেলে!! ওই দেখো দেখো .... ওহহহ....কী যে ভাল লাগছে....মামা বাড়ি। ঠিক। একদম। আপনার মামা বাড়ি। কত বড় ব্যাপার। কী দারুণ ব্যাপার। যান যান। উফফফ....দেখেছিস তোরা! নাগ কাকার ভাগ্নে রে। নাগ কাকার ভাগ্নে। মামাবাড়ি দেখতে এসেছে, মায়ের গ্রাম দেখতে এসেছে....
- আপনি চিনলেন?
- চিনব না? গ্রাম দেশ। সবাই সবাইকে চেনে। আর আপনার মামাবাড়ি তো.......আহা বড় আনন্দ পেলাম, বড় আনন্দ! আপনি এত দূর থেকে এসেছেন....যান দাদা যান। সব্বাই চেনে আপনাদের। শুধু গিয়ে বলবেন। এই বাদলদা, তুমি যাও সঙ্গে। আমাদের গ্রামের গো। গ্রামের নাতি। যাও যাও.....কী যে আনন্দ!
'আর তোমার আনন্দ?' আবার জানতে চাইল হাওয়া, মাটি আর পাকুড় গাছ।
উত্তর দেব কী! এগিয়ে গেছি ততক্ষণে অনেকটা পথ। ওই তো....ওই সেই বাঁক.... ওখানেই সাধনদা চটি খুঁজে দিয়েছিল। কাদা মাটির ভেতর থেকে। নিয়ে গিয়েছিল পাশের গ্রামে। কামধেনু দেখাতে। সেখানে দেখেছিলাম এক বৃদ্ধাকে। তিনি নাকি পূর্ণদাস বাউলের পিসি। সত্যি মিথ্যে জানিনি সেদিনও। আজও।
'এত মনে রেখেছ! এত কিছু? তুমি তো তখন বেশ ছোট। বোধহয় ক্লাস সেভেন। সিক্সও হতে পারে।' ঝাঁঝিয়ে উঠল হাওয়া।
'রেখেছি। মনে। এই মনে রাখাটা আমার কাল। বুঝলে হাওয়া? স্মৃতি খুব বাজে ব্যাপার। কষ্ট দেয় বড্ড।'
'ও কথা বলো না। যদি ভুলে যেতে, তবে কি আসতে এই পথে? মায়ের কাছে? এভাবে?'
উত্তর দিই না। মুখ ফিরিয়ে রাখি। জল আসে চোখে। দেখাতে চাই না কাউকে।
গাড়ি ঢুকে যায় গ্রামে.....
(ক্রমশ)
(** বড় তুড়িগ্রাম বীরভূম জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আমার মায়ের আদি বাড়ি। দাদু প্রয়াত মৃত্যুঞ্জয় নাগ নিজের বড় দাদার সঙ্গে ভাগ্য অন্বেষণে চলে গিয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তাঁদের বোনেরা। বছর পঁয়তাল্লিশ আগে একবার সেই গ্রামে যাওয়ার ও দেখবার সুযোগ হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মা টেনে নিয়ে গেলেন সেখানে আবার। এই লেখায় হয়ত আবেগ বেশি। কিন্তু বিন্দুমাত্র খাদ নেই তাতে। বড় অদ্ভুত এই অলৌকিক যাত্রা।
রামপুরহাট-সাঁইথিয়া পথে তারাপীঠের পর বীরচন্দ্রপুর। আর তার পরেই বড় তুড়িগ্রাম। রামপুরহাট থেকে অবশ্য আজকাল বাঁ হাতে তারাপীঠকে রেখে, মল্লারপুর হয়ে, রাস্তা সোজা চলে গেছে সাঁইথিয়া। তবে সাবেক রাস্তাটি আজও মোহময়, প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সাজানো। সামান্য সময় থাকলেও, সেদিন বড় তুড়িগ্রাম, আমাকে এবং আমাদেরকে যা দিয়েছে তা এক জীবনের সঞ্চয়। যদিও নিতান্ত ব্যক্তিগত এই কথন, তবু ভাগ করছি সবার সঙ্গে।)



No comments:
Post a Comment