।। পাঠ প্রতিক্রিয়া।।
রাজনগর কোচবিহার : অরবিন্দ ভট্টাচার্য
বিয়ন্ড হরাইজন পাবলিকেশন
বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্র পত্রিকা, গেজেট ইত্যাদি থেকে ইতিহাস আরোহন করা এক ব্যাপার, আর স্বচক্ষে দেখা সময়কে নিজের মতো লিপিবদ্ধ করা অন্যরকম একটি বিষয়।
প্রথমটি কিছুটা নীরস। সেটাই স্বাভাবিক। অতীতের ঘটনাপ্রবাহ, সাল তারিখ ইত্যাদি সবাইকে আকর্ষণ করে না। একঘেয়ে বিবরণ পাঠককূলকে খানিকটা দূরে রাখে। পান্ডিত্য ও গবেষণা এইরকম লেখার প্রধান স্তম্ভ। ফলে, ঐতিহাসিক তথ্য ও নিরীক্ষণের দিক থেকে গুরুত্ব আলাদা হলেও, রসসিক্ত হওয়ার সুযোগ তাতে কম।
কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম। সেখানে প্রাধান্য পায় ব্যক্তির নিজস্ব দেখা, অনুভব ও প্রকাশ। তাই যখন লেখক বলেন, `....পুজোটা আসত মলয় চন্দন সাবান, জবা কুসুম তেল, কিউটিকিরা পাউডার, আফগান স্নো, অগুরু সেন্টার ঘ্রাণ নিয়ে', তখনই একটা সময়ের ছবি গেঁথে যায় পাঠকের মনে। বিশেষ করে সেই পাঠকরা মুহূর্তেই স্পর্শ করতে পারেন ফেলে আসা কালখণ্ডকে। সেজন্যই দ্বিতীয় ধরণের লেখায় পাঠক একাত্মবোধ করেন। মিলিয়ে নিতে পারেন। লেখকের সঙ্গে মানসভ্রমণে নিজেও লেখক হয়ে ওঠেন।
বর্ষীয়ান সাংবাদিক অরবিন্দ ভট্টাচার্যের `রাজনগর কোচবিহার` বইটি পড়তে পড়তে বারবার এরকম মনে হয়েছে। লেখক বর্ণিত বেশ কিছু ঘটনা আমার জন্মের আগেও হলেও, তিনবিঘা আন্দোলন, ছিটমহল বিনিময়, কেপিপি থেকে গ্রেটার কোচবিহার গণআন্দোলন ইত্যাদি বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী থেকেছি আমরাও। ফলে সেই ইতিহাস বুঝতে বেগ পেতে হয়নি। অন্য যে বিষয়গুলি এসেছে, সেগুলিও অত্যন্ত সহজে উপলব্ধি করেছি লেখকের বলার গুণে। নিজেকে জাহির করার কোনও প্রয়াস তাঁর লেখার মধ্যে নেই, বরং যা দেখেছেন, জেনেছেন সবটাই নির্মোহ লেখনশৈলীতে বিবৃত করেছেন তিনি। নিশ্চিন্ত জানি, এই গ্রন্থটি একটি অন্যধরণের `ডকুমেন্টেশন` হয়ে রইল আগামীর জন্য।
দু`একটি উদাহরণ দিই। কোচবিহারে একসময়ে সংখ্যায় খুব কম হলেও যে ব্রাহ্মরা ছিলেন, সেটা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। অরবিন্দবাবু কিন্তু মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন কোচবিহারের সুনীতি একাডেমির দুরন্ত ছাত্রী আরতি ভৌমিকের কথা। এই আরতি ভৌমিক-ই পরবর্তীতে অঞ্জনা ভৌমিক নামে বাঙালি ছায়াছবির বিখ্যাত নায়িকা হয়েছিলেন। কাজ করেছিলেন উত্তাকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে। সঙ্গীতাচার্যঃ কোমল দাশগুপ্ত, গীতিকার শৈলেন রায়, লোকসঙ্গীত সংগ্রাহক সতীন্দ্র নাথ দে সরকার, চারণ কবি নিবারণ পন্ডিত, বিষহরা গায়ক রাজকুমার গিদাল, গবেষক হরিশচন্দ্র পাল, সাইটোল সম্রাজ্ঞী ফুলতি গিদালি প্রমুখ বিস্মৃতপ্রায় মানুষদের কথা রয়েছে গ্রন্থটিতে। তিনি বলেছেন কোচবিহারে নাট্যচর্চা, খেলাধুলা, সিনেমাহল, মিষ্টির দোকান ইত্যাদির ইতিহাসের কথা। লিখেছেন রাজনগরের লোকসঙ্গীতের ইতিকথা থেকে জাতিসত্বা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কথা। আর সবটাই বলেছেন নিজের মতো। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো-ই দেখেছেন। বদলাননি নিজস্ব ভাষ্য ও বিশ্বাস।
মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের প্রভাব যে লেখকের ওপর বিরাট সেটা বইটি পড়লেই বোঝা যায়। বারবার উল্লেখিত হয়েছেন মহারাজা। আবার উপেক্ষিত শিল্পী শিবশংকরকেও মনে করেছেন একইরকম আবেগ নিয়ে। একজন সংবেদনশীল লেখক ও মানুষের এমনটাই হওয়া উচিত। অরবিন্দবাবু আমাদের, অনুজদের, এই শিক্ষা দিলেন তাঁর গ্রন্থ দিয়ে।
একটি বিরাট সময়ের খণ্ড খণ্ড ইতিহাস, ঘটনা, কথোপকথন অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীলভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ায় বইটি পড়তে একটিবারের জন্যও একঘেয়ে লাগেনি। পাঠককে ধরে রাখার এই গুণ সব লেখকের থাকে না, বিশেষ করে তিনি যখন এমন একটি সময়ের কথা বলছেন যার সম্পর্কে অনেকেরই কিছুই জানা নেই। অস্বীকার করব না, অত্যন্ত সহজভাবে সময়ের সেই বাধা ডিঙোতে পেরেছেন লেখক। পৌঁছে গিয়েছেন লেখকের নিজস্ব `অ্যাটিক রুম`-এ।
দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে কত প্রসিদ্ধ মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন লেখক, তা বইটি পড়লেই বোঝা যায়। তাঁদের নাম উল্লেখ করছি না। পাঠকরা খুঁজে নেবেন এবং নিশ্চিন্ত জানি, অত্যন্ত বিস্মিত হবেন।
বিয়ন্ড হরাইজন পাবলিকেশনের এই বইটি বাঁধাই, কাগজ যথাযথ। অনিরুদ্ধ দেবের প্রচ্ছদটিও বইয়ের বিষয়ের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। মূল্য ৩০০ টাকা।
নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বইটি পড়লে পাঠক সমৃদ্ধ হবেন। আর গবেষকরাও ক্রমশ বদলে যাওয়া অন্য এক কোচবিহারকে চিনবেন।
(আলোচক: শৌভিক রায়)

No comments:
Post a Comment