শেষ অবধি নাকাল হয় সেই সাধারণ মানুষই
শৌভিক রায়
বেলা তিনটে। শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। প্রশাসনের নির্দেশে সেটি এখন বন্ধ। এক টোটোরিক্সা চালক প্রবল মিনতি করে চলেছেন। তাঁর রিক্সায় স্কুল ইউনিফর্মে জনা পাঁচেক শিশু। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্ট খিদে পেয়েছে। চালকের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও রাস্তা খুলল না।
আমি নিজে দাঁড়িয়ে রয়েছি সহধর্মিনীর জন্য। তিনি তিন কিমি দূর থেকে হেঁটে হেঁটে আসছেন। তাঁর হাঁটুর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিস্থাপন দরকার। বেশি হাঁটাচলা বারণ। প্রশাসনের তরফে মূল রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে, শহরের বিভিন্ন গলিপথ ধরে কোনও মতে এই অবধি আসতে পেরেছি। এখান থেকে অন্তত নিজের দ্বিচক্রযানে সহধর্মিণীকে বসিয়ে নিয়ে যেতে পারব। এইটুকু পৌঁছতে পাঁচ কিমির পথ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর বেশি আর এগোতে পারছি না। অসহায়ভাবে অপেক্ষা করে আছি। আমার মতো আরও প্রায় শ` তিনেক মানুষ আটকে আছেন। কারণ? রাজনৈতিক সভা করতে আসা কোনও এক নেতা এই পথ দিয়ে যাবেন। তাঁর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত। প্রায় সাত কিমি দূর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের চলার পথ। থেমে রয়েছে সব ধরণের পরিবহন। কোনও কোনও জায়গায় রাস্তার এপার থেকে ওপারে পর্যন্ত যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, এই না রঙ্গে ভরা বঙ্গ দেশ! অতীতে রাজধানী দিল্লিতেও `ভি ভি আই পি মুভমেন্ট` দেখেছি। বড়জোর দশ থেকে পনেরো মিনিট বন্ধ থাকে কোনও ব্যস্ত সড়ক। আর এখানে? সকাল থেকে রাস্তার দুই ধারে মোটা দড়ি ফেলে রাখা হয়। নেতা যদি বেলা দুটোয় আসেন, রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রায় ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে। নিজের কর্মক্ষেত্রে পৌঁছতে কী পরিমাণ সমস্যায় পড়তে হয়, সেটা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন। আর যাঁরা নিত্যযাত্রী, তাঁদের অবস্থা তো আরও করুণ। সেদিন বাসের সংখ্যা নগণ্যে নেমে আসে। প্রবল ভীড়ে ঠাসাঠাসি করে তাঁরা যান। বাড়ি থেকে বেরোতেও হয় অন্যদিনের তুলনায় অনেকটা আগে।
নির্বাচন এগিয়ে এলে এরকম ঘটনার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় পথ অবরোধ, পিকেটিং ইত্যাদি। আজকাল পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক হাঙ্গামা, মারপিট, খুন-জখম। আর এসবের সঙ্গে নেতাদের দ্রুত আগমন, পরিদর্শন, গরম ভাষণ, চরম উত্তেজনা। মজা হল, সাধারণ মানুষের জীবন সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া সেই একই প্রশাসন, নেতাদের আগমনে, এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে, সব কিছু অত্যন্ত সুচারুভাবে সেরে ফেলে। অথচ এই কাজটি যদি তারা আগে করত, তাহলে কোনও কিছুরই প্রয়োজন পড়ত না। দুর্ভাগ্য, সেটি কখনও হয় না। ফলে, আবার সেই চিত্রের পুনরাবৃত্তি। পথে আটকে থাকা। বাসে গাদাগাদি ভিড়। কর্মস্থলে পৌঁছতে রাজ্যের হ্যাপা। এটিই বোধহয় আমাদের একমাত্র নিয়তি।
তবে সব নেতার কপাল এক রকম নয়। অনেকের ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার `ন` পর্যন্ত থাকে না। ফলে সেই নেতার কনভয়ে লাঠি মারা থেকে শুরু করে ঢিল পাটকেল ছোঁড়া হয়, ভেঙে দেওয়া হয় গাড়ির কাঁচ। এসবের নেপথ্যে যে সব মাথা, তারা মেঘনাদের মতোই আক্ষরিক অর্থে অন্তরালে থাকে। এগিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষকে। কুকীর্তি করে তাঁরা অনেকে ধরাও পড়েন। প্রশাসনের হাত মাথায় থাকায়, ছাড়াও পেয়ে যান। উল্টোদিকে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর শুরু হয় বিক্ষোভ ও পথ আটকানোর সস্তা রাজনীতি। ভোগে কারা? স্কুল ফেরতা শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে হাসপাতালের পথে যাওয়া মুমূর্ষু রোগী।
পশ্চিমবঙ্গে পথ অবরোধের ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মৃতের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। রাজনৈতিক দলগুলির ভেবে দেখার সময় হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের ভালর জন্য কাজ করতে গিয়ে, তারা শেষ পর্যন্ত তাদের সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছেন না তো? এমনিতেই নেতাদের নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খাওয়া প্রশাসন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই সমস্যায় ফেলে। তার ওপর আপনারাও যদি পথ অবরোধ, পিকেটিং করে আরও অসুবিধে করেন, তাহলে আমরা, সাধারণ মানুষরা, যাব কোথায়?
সুশাসনের প্রথম শর্ত হল, নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও জীবনের নিরাপত্তা প্রদান। বলতে দ্বিধা নেই, সেই শর্ত অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ। `ভি আই পি মুভমেন্ট`-এর নামে যেভাবে সাধারণ মানুষদের নাকাল করা হয়, সেটি যেমন কাম্য নয়, তেমনি সাধারণ মানুষদের, একে অন্যের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে বিভাজনের কু-নীতিও চাই না কেউ। আমরা এমন কোনও `ওয়ার জোন`-এ বাস করি না যে, নিরাপত্তার এত বাড়াবাড়ি করতে হবে কিংবা বিরুদ্ধে স্বরকে স্তব্ধ করে দিতে হবে পরস্পরকে আক্রমণ করে।
(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব)

No comments:
Post a Comment