অলৌকিক সেই দিনে মায়ের কাছে
শৌভিক রায়
২
জয়বাংলার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। ঠাহর করতে পারছি না কোন দিকে সেই বাড়ি।
ছোট মামা বলে দিয়েছেন জয়বাংলার কথা। একাত্তর সালে জন্ম। নাম তাই জয়বাংলা। বড় তুড়িগ্রামে, মায়েদের পরিবারের কাছের মানুষ।
উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে দু`চারজন। বুঝতে পারছি। ভাবছেন, ভর দুপুরে এরা কারা! ভাবাটাই স্বাভাবিক।
- কে গো তোমরা? কনে থেকে এলে?
বলি। একই কথা।
- সে কি গা! তুমি লীলুদির ছেলে! বড় জনা?
উত্তর দিই। অবাক হই। মা তো গ্রাম ছেড়ে ছিলেন সেই কবে। শেষবার এসে ছিলেন বছর পঁয়তাল্লিশ আগে। উনি জানলেন কী ভাবে মা`কে!
- গেরাম দেশ। সবাই সবাইকে চিনি গা। তুমাদের ভিটে অবশ্যি নেই এক্ষণে। পাকা বাড়ি হইচে। তুমি দেখেছিলে সে বাড়ি? পুরোনো? এসেছিল কখনও?
হ্যাঁ। এসেছিলাম সেই বছর পঁয়তাল্লিশ আগে। মায়ের সঙ্গে।
এসেছি আবার আজ। মা-কে ছাড়া দাঁড়িয়ে আছি মায়ের গ্রামে।
হাজির হল জয়বাংলা। মুখে হাসি।
- দেরি করলেম। স্নানে গেছিলেম। চলুন চলুন।
- মামা বলেছেন আপনার কথা।
- কাকা আমাকেও ফোন করেছিল। সৌভাগ্য আমাদের। আপনারা এলেন...
- না, না ওরকম বলছেন কেন! সৌভাগ্য বরং আমাদের। আপনাকে পেলাম।
জয়বাংলা নিয়ে যায় নিজের বাড়ি। পেশায় কলমিস্ত্রি। বাড়িতে তার গৃহিণী। দুই ছেলের বিয়ে দিয়ে নাতি নাতনি নিয়ে ভরা সংসার। তারা অবশ্য নেই এখন।
গৃহিণী বুঝে পান না কোথায় বসাবেন।
- গরিবের বাড়ি। বসুন কোনও রকম।
- গরিবের বাড়ি? সেজন্য দালান কোঠা?
হেসে ফেলি।
- চা খান আগে।
- এই ভর দুপুরে চা খাব না আর।
- তাহলে একেবারে ভাত খাবেন। ব্যবস্থা অবশ্য কিছুই করিনি। রাতে কিন্তু থাকতে হবে।
- না রে ভাই, সম্ভব নয় সেটাও। যাব বোলপুর।
- সে বললে হয়! মামাবাড়ি এখন নেই তো, কী হয়েছে! আমরা তো আছি।
- ভিটেটা নিশ্চয়ই আছে?
- আছে। তবে এখন পাকা বাড়ি সেখানে। অন্যদের।
- সেটা জানি। সেটাই দেখব।
- সে তো অবশ্যই দেখাবো। কিন্তু আজ রাতে ছাড়ছি না.....
- এবার নয় ভাই।
- সবাই আমাকে বকবে। বলবে, গ্রামের নাতি এলো, আর থাকল না!
উত্তরে হাসি শুধু।
রীনা বলে,
- সেই ভিটে কোথায়?
- চলুন তবে, দেখিয়ে আনি।
উঠে পড়ি। পা মেলাই। জয়বাংলার সঙ্গে।
ধুলো মাখা পথ। হলুদ খড় শুকোতে দিয়েছে কেউ কেউ।
মাটির বাড়ি। দোচালা। চারচালা।
টলটলে পুকুর। হাঁসের দল। মস্ত বড় গাছ। মন্দির।
- এই মন্দির কাকার হাতে তৈরি।
জানতাম ছোট মামা মন্দির তৈরি করেছেন একটি। দাঁড়াই খানিকক্ষণ।
- কে গা বটে?
- কাকার ভাগ্নে।
- কোন কাকার কথা বলছ বটে?
- আরে নাগ কাকা রে। সেই যে মন্দির...
- বটে বটে! মামাবাড়ি দেখতে এসেছে! দেখাও দেখাও।
হাসি। এগিয়ে যাই।
পোস্ট অফিস। সাবেক দোকান। পুরোনো মন্দির। দুর্গা মণ্ডপ।
- এখানে আমার বরের মামাবাড়ি। দেখতে এসেছে।
রীনার গলা কানে আসে।
অলস রোদে রোয়াকে বসে বধূ।
- ও জয়বাংলা। কোন বাড়ির কথা বলছে?
- আরে নাগ বাড়ি গো, নাগ বাড়ি। সেই যে কাকা এলো, মন্দির, শ্মশান করল....
- বুইচি গো বুইচি। কুটুম তো। অ বৌমা, আমাদের বাড়ি এসো। আমরা ব্যানার্জি। ভাত খেয়ে যাও....
দুজনেই হাত জোড় করি। আবার কখনও।
জয়বাংলা এগিয়ে যায়। পেছনে আমরা। অবশেষে এক বাড়ির সামনে দাঁড়ায় সে।
- দেখুন, চিনতে পারেন কিনা!
হাওয়া ফিসফিস করে। মুখ টিপে হাসে। পথ তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। চোখের দিকে। বুড়ো পাকুড় গাছের চোখে জিজ্ঞাসা।
- চিনতে পারছ? চিনতে পারছ?
(ক্রমশ)
(বড় তুড়িগ্রাম বীরভূম জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আমার মায়ের আদি বাড়ি। দাদু প্রয়াত মৃত্যুঞ্জয় নাগ নিজের বড় দাদার সঙ্গে ভাগ্য অন্বেষণে চলে গিয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তাঁদের বোনেরা। বছর পঁয়তাল্লিশ আগে একবার সেই গ্রামে যাওয়ার ও দেখবার সুযোগ হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মা টেনে নিয়ে গেলেন সেখানে আবার। এই লেখায় হয়ত আবেগ বেশি। কিন্তু বিন্দুমাত্র খাদ নেই তাতে। বড় অদ্ভুত এই অলৌকিক যাত্রা। রামপুরহাট-সাঁইথিয়া পথে তারাপীঠের পর বীরচন্দ্রপুর। আর তার পরেই বড় তুড়িগ্রাম। রামপুরহাট থেকে অবশ্য আজকাল বাঁ হাতে তারাপীঠকে রেখে, মল্লারপুর হয়ে, রাস্তা সোজা চলে গেছে সাঁইথিয়া। তবে সাবেক রাস্তাটি আজও মোহময়, প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সাজানো। সামান্য সময় থাকলেও, সেদিন বড় তুড়িগ্রাম, আমাকে এবং আমাদেরকে যা দিয়েছে তা এক জীবনের সঞ্চয়। যদিও নিতান্ত ব্যক্তিগত এই কথন, তবু ভাগ করছি সবার সঙ্গে।)









No comments:
Post a Comment