অলৌকিক সেই দিনে মায়ের কাছে
শৌভিক রায়
৩
দাঁড়িয়ে থাকি। চুপ করে।
চোখের সামনে সেই জায়গা। এখানেই জন্মেছিলেন মা।
মাটির সেই দোতলা বাড়ি আর নেই। নেই মাটির প্রাচীর আর তার গায়ে লাগানো দরজাও।
তবু জায়গাটা সেই একই....
- কী বুঝছ এখন?
ফিসফিস করল হাওয়া।
প্রশ্ন পথ আর পাকুড় গাছেরও।
বুঝব আর কী! ধরে রেখেছি কোনও ভাবে। নিজেকে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন মহিলারা। পুরুষেরাও।
জয়বাংলা পরিচয় দেয় আমাদের।
মুহূর্তেই হইচই।
সাদরে ডেকে নেন সবাই ভেতরে।
পা ভারী হয়ে আসে। এগোই তবু পায়ে পায়েই।
অদূরে তালগাছ। বয়সে মায়ের বড়।
ওই তো বাড়ি। মাটির। দোতলা।
দাওয়াও বসে মায়ের পিসিমা। চালভাজার বাটি হাতে।
মাটির পুরু দেওয়াল। জানালার মোটা কার্নিশ।
পেছনের দেওয়ালে দরজা। পুকুরে যাওয়ার।
সাধনদা হাত ধরে আছে। পুকুরে নামছি আমি। দাদা বসে পারে।
বাড়ির সামনে শ্যাওলা পুকুর।
- এই বসতে দে রে.....বসতে দে..... দাদা বসো বসো..... তোমাদেরই তো বাড়ি....
হ্যাঁ। আমাদেরই বাড়ি। সব কিছুই আমাদের। শুধু হাত বদলে `তোর` আর `আমার`। বোকার মতো। `আমাদের` ভাবি না কেন কখনও!
- পুকুর তো নেই গা। বুজে গেছে। দেখবে?
ফুটিফাটা মাটি বলে, জল ছিল এখানে। অতল জল ছিল কোনও এক সময়।
জল শুকোয় না। বাষ্প হয় কেবল।
মায়ের মতোই। মা চলে যান না।
থেকে যান নানাভাবে।
মায়েরা যান না কখনও। জল যেমন জীবন, মা-ও তাই।
- কী গো, কষ্ট হচ্ছে?
উদগ্রীব শুনি হাওয়ার গলা। ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে থাকে পথ আর পাকুড় গাছ।
- না, ঠিক কষ্ট নয়। কেমন একটা ব্যাপার যেন....বলতে পারছি না, বোঝাতে পারছি না.....
- দাদা, খেয়ে যেতে হবে।
বলে ওঠে মল্লিক। ওরাই এখন মালিক। এই জমির। এই বাড়ির।
- হ্যাঁ হ্যাঁ।
সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে মহিলারা।
ওদের কলেজে পড়া ছেলে, স্কুলে পড়া মেয়ে আর অন্য কিশোর-কিশোরীরা ঘিরে ধরে।
- জয়বাংলাকে বলেছি যে। ওর বাড়িতে রান্না হচ্ছে। খেতের চাল, পুকুরের মাছ, জমির শাক।
- তা বলে এই দুপুরে না খেয়ে এভাবে কেউ যায়? আমরা কি মামাবাড়ির লোক নই?
- অবশ্যই তাই। তোমরা তো সবাইই তাই। কিন্তু বোঝো তো.....
- মানতে পারলাম না। কষ্ট পেলাম। ভিন জাত বলে খাবে না বোধহয়!
- ভিন জাত? সে আবার কী! না গো। সে সব নয়।
- তবে? গেরস্থের অকল্যাণ হবে যে।
- হবে না। তোমরা যা দিলে, এই গ্রাম যা দিল, সে তো এক জীবনের....
- তা বললে হয়?
- আসব তো আবার। সেবার না হয় মুরগি রেঁধো।
- কথা দিলে?
- দিলাম।
- বলে গেলেন কিন্তু.....
বলি। আমরা। সবাই।
তবু কথা রাখি না। জানি সেটাও।
ছবি তুলি। সবার সঙ্গে। জড়িয়ে ধরে সকলে। শুভেচ্ছা জানায়।
ভেসে যায় ধর্মের কচকচি। বেঁচে থাকে মানুষ শুধু। কে বলে কে কোন জাত। আমি জানি, আমিই জাত, আমিই বেজাত।
- দেখেছ ওই দেওয়াল?
বলে ওঠে হাওয়া।
- দেখোনি?
গলা মেলায় পথ আর পাকুড় গাছ।
দেখেছি আগেই। উত্তরে ভাঙা দেওয়াল। মাটির। বাড়ির শেষ চিহ্ন।
বুক টনটন করে। হাত রাখি দেওয়ালে।
মনে হয়, মায়ের মুখে হাত রেখেছি।
মা যেদিন চলে যান, মায়ের কপাল ছিল বরফ ঠান্ডা।
কিন্তু মায়ের ওম ছিল আমার বুকে।
আসলে মায়েরা কোথাও যান না। থেকে যান। জীবনভর।
দেওয়ালের গায়ে মায়ের গায়ের ওম।
মনে হচ্ছে, মা জড়িয়ে রেখেছেন আমাকে।
প্রণাম করি। আবার প্রণাম করি।
প্রণাম ছাড়া আর কী করতে পারি?
এই গ্রাম না থাকলে অস্তিত্ব কি থাকত আমার?
দেখতে পেতাম কি এই রূপ রস ঐশ্বর্য? শুনতে কি পেতাম পৃথিবীর গান?
বড় তুড়িগ্রাম আছে বলেই আমিও আবহমান। সেই কবে থেকে....
আর এখন?
প্রবাহিত ধারা আর জীবনের ধারাপাতে, এক্কা দোক্কা খেলতে খেলতে, দাঁড়িয়ে আছি নির্দিষ্ট সময়ের শেষ প্রান্তে.....
অনেক আগেই পায়ে মেখেছি গ্রামের ধুলো।
এবার ঠেকাই মাথায়।
পেছনে পড়ে থাকে বড় তুড়িগ্রাম।
রেখে আসি হাওয়া, পথ আর বুড়ো পাকুরকে।
আবার কখনও, কোনও এক দুপুরে, হয়ত উত্তরাধিকারের শর্ত নিয়ে, ফিরবে কেউ মায়ের কাছে, আমার মতোই......
(শেষ)
(বড় তুড়িগ্রাম বীরভূম জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আমার মায়ের আদি বাড়ি। দাদু প্রয়াত মৃত্যুঞ্জয় নাগ নিজের বড় দাদার সঙ্গে ভাগ্য অন্বেষণে চলে গিয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তাঁদের বোনেরা। বছর পঁয়তাল্লিশ আগে একবার সেই গ্রামে যাওয়ার ও দেখবার সুযোগ হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মা টেনে নিয়ে গেলেন সেখানে আবার। এই লেখায় হয়ত আবেগ বেশি। কিন্তু বিন্দুমাত্র খাদ নেই তাতে। বড় অদ্ভুত এই অলৌকিক যাত্রা। রামপুরহাট-সাঁইথিয়া পথে তারাপীঠের পর বীরচন্দ্রপুর। আর তার পরেই বড় তুড়িগ্রাম। রামপুরহাট থেকে অবশ্য আজকাল বাঁ হাতে তারাপীঠকে রেখে, মল্লারপুর হয়ে, রাস্তা সোজা চলে গেছে সাঁইথিয়া। তবে সাবেক রাস্তাটি আজও মোহময়, প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সাজানো। সামান্য সময় থাকলেও, সেদিন বড় তুড়িগ্রাম, আমাকে এবং আমাদেরকে যা দিয়েছে তা এক জীবনের সঞ্চয়। যদিও নিতান্ত ব্যক্তিগত এই কথন, তবু ভাগ করছি সবার সঙ্গে।)







No comments:
Post a Comment