Saturday, August 31, 2024


 

বনধের বিবর্তন চোখে পড়ার মতো 
শৌভিক রায় 

গুটি গুটি পায়ে স্কুলের গেটে পৌঁছে দেখতাম, আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ সেটি। খানিক আগে যে পথে এসেছি, সেটিও শুনশান একেবারেই। সাইকেল নিয়ে চা বাগান পৌঁছেও দেখা যেত, ফ্যাক্টরিতে মস্ত তালা। তোলা হচ্ছে না চা পাতাও। রেল স্টেশনেও থাকত না কোনও ব্যস্ততা। সব কিছুই ঢিলেঢালা। বনধ চলছে।

বুধবার বিজেপির ডাকা বারো ঘন্টার বাংলা বনধ দেখে এসব আবার মনে পড়ছে। শুধু আমার কেন, উত্তরবঙ্গে অনেকেরই এক স্মৃতি। 

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মোটামুটি ভাবে জেনে এসেছিলাম,  বনধ  এই রাজ্যের একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। প্রতি বছর একটি  বনধ  নির্দিষ্ট থাকত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কোনও না কোনও দাবি নিয়ে। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে বন্ধ ডাকা ছিল অতি সাধারণ ঘটনা। আর সেসব  বনধ  বেশি মোটামুটিভাবে সফল‌ও হতো। হবে না-ই বা কেন! ডেকেছে স্বয়ং সরকার পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দলটি। তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে বন্ধ ব্যর্থ করার বুকের পাটা কার আর ছিল! 

তবে বিরোধী পক্ষ ডাকলেও, অনেক সময় সর্বাত্মক বনধ  দেখা যেত সেই আমলে। সরকারের তরফ থেকে বনধ  রুখবার প্রয়াস থাকলেও, কোথাও বোধহয় চোরা সমর্থনও থাকত। ফলে সেগুলিও কম বেশি সফল হতো। এই রাজ্যে পালাবদলের আগে এত বনধ  আমাদের দেখতে হয়েছে যে, `বনধ` বন্ধ হবে ভাবিনি কখনও।`বনধ` শব্দটিই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণ মানুষের সবরকম অসুবিধে করা বনধ ব্যাপারটিকেই সুনজরে দেখত না আর কেউ। 

সুখের কথা, মিলিয়ে গেছে সেই সব দিন। এই শরতের হাওয়ার মতোই। বনধ শব্দটি আমাদের অভিধান থেকে ক্রমে বিলুপ্ত হতে চলেছে। বনধ  নিয়ে সেভাবে কারও মাথাব্যথা নেই। তাই বনধ ডাকলেও ছাত্রদের স্কুলে আসা, অফিস আদালতে হাজির থাকা এখন অতি সাধারণ ঘটনা। হতে পারে সেটি সরকারি নির্দেশিকার জন্য।  কিন্তু যার জন্যই হোক, অতি ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া `বনধ` নামের প্রতিবাদের হাতিয়ারটিকে ভোঁতা করে দেওয়া গেছে। 

ফলে এই সব দিনে এখন খোলা দোকানপাট , চলমান যানবাহন ইত্যাদি নজর এড়ায় না। এই উত্তরে গুটি কয়েক যে কয়টি শিল্প-কারখানা আছে সেগুলিও 'চলছে না চলবে না' স্লোগানে আন্দোলিত হয় না। বন্ধ মানেই গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দেওয়া একটি দিন নয় আর আজ। বরং বনধ যে আখেরে নিজেদেরই ক্ষতি, সেটি এখন বোঝে সকলেই। তাই বোধহয় এই প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই দেখেছি, বনধ উপেক্ষা করে বেশি মাত্রায় নিজের কাজটি করতে।  

পাশাপাশি বুধবারের বনধ ছিল একটু যেন আলাদা। এই বনধ সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনের অভিমুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেবে কিনা সেটি বিতর্কের বিষয়। কিন্তু দিন কুড়ি আগে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনা থেকে রেহাই নেই আমাদের কারও। মানসিকভাবে এই মুহূর্তে আমরা বিপর্যস্ত। অবিশ্বাসের চোরা স্রোত আমাদের সকলের মধ্যে। স্বস্তি পাচ্ছি না কেউই। বনধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করলেও, সব কিছু পেছনে ফেলে সকলেরই পাখির চোখ এখন একটিই- নির্যাতিতার সুবিচার ও দোষীর চরম শাস্তি।  

আসলে প্রবল পরাক্রমী রাষ্ট্রশক্তি যখন নিজে অন্যায় লুকোনোর চেষ্টা করে, তখনই সংঘাত সৃষ্টি হয়। জেগে ওঠে বিবেক। মানুষ চায় মুক্তি। আর সেই মুক্তির পথে বনধ একটি অস্ত্র মাত্র, একমাত্র লক্ষ্য নয়। 

(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)

* প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ ২৯/০৮/২০২৪


 

ও রাষ্ট্র, অনেক তো হল, এবার সত্যি কিছু করো 
শৌভিক রায় 

লাল পোশাক পরিহিত বৃদ্ধ মানুষটি জলকামানের তীব্রতা উপেক্ষা করেও জাতীয় পতাকা উঁচু করে ধরে আছেন। ইশারায় কিছু বলছেন। এই মুহূর্তে দৃশ্যটি ভাইরাল। আর তাতেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। 

একদল বলছেন, ছাত্রদের আন্দোলনে এই বয়স্ক মানুষটি কেন? আসলে ছাত্রদের পেছনে অন্য কেউ এই আন্দোলনে মদত যোগাচ্ছে। তাদের ধারণা একেবারে অমূলক নয়। কিছু তথ্য-প্রমাণ অবশ্যই বলছে যে, শুধু ছাত্ররা নয়। অনেকেই রয়েছেন। 

অন্য দলের মত হল, আন্দোলনটি ডেকেছে ছাত্ররা। তাতে তারা সর্বস্তরের মানুষকেই আহ্বান করেছেন। তাই যদি কেউ এসে থাকেন তবে মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। তাদের এই কথাকেও উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। ঠিকই তো, স্বাধীনতা দিবসের আগে মহিলাদের `রাত দখল`-এর ডাকে তো শুধু তারাই ছিলেন না। অনেকেই ছিলেন। 

আসলে যে কোনও আন্দোলনেই পক্ষ ও বিপক্ষ থাকে। তা না হলে আন্দোলন কীসের বা কেন? আর দুটো পক্ষ থাকলেই বিরুদ্ধ মত থাকবেই। তাই এই সব চাপানউতোর খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হল, এই উচ্চকিত কোলাহলের মধ্যে যে দাবিতে এই আন্দোলন, সেটি থেকে আমরা সবাই সরে আসছি না তো! কেননা যে নির্যাতিতার জন্য আজকের এই রোষ, তিনি কিন্তু এখনও বিচার পাননি। এই রাজ্যের প্রশাসন তাঁকে বিচার দিতে পারবে না বলে যাদের ডেকে আনা হয়েছে, তারাও কিন্তু এখনও উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি। বরং তদন্তের অভিমুখ কিছুটা যেন অন্যদিকে ঘুরে গেছে। আশা করি, এই প্রতিবেদন প্রকাশ হতে হতে তারা সঠিক তদন্তে দোষী বা দোষীদের ধরতে পারবেন। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে শুধু আমি নই, রাজ্যের সব সাধারণ মানুষই এটা আশা করছেন। 

এবার একটু গভীরে ভেবে দেখি। আর জি কর কাণ্ডে হঠাৎ এত সংখ্যক সাধারণ মানুষ এইরকম ক্ষেপে উঠলেন কেন? পুরোটাই রাজনীতি? আর কিচ্ছু না? সবই নিয়ন্ত্রিত? 

অস্বীকার করছি না যে, সমস্ত ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক রং লাগেনি। অবশ্যই লেগেছে। যত সময় এগিয়েছে কমবেশি সবাই নিজের ফায়দা তুলতে নেমেছে। কিন্তু সেটার পরেও কিছু ব্যাপারকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কেননা সেখানে জায়গা নিয়েছে প্রায় সকলের অন্তর্গত তাগিদ। সেখানে কোনও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। আর নেই বলেই এখনও পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন এই রাজ্যের প্রতিটি জনপদের পাড়া, হাউজিং, কলোনি থেকে শুরু করে সর্বত্রই বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। যারা এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে রাজনীতি দেখছেন, তারা নিজেরাও খুব ভাল জানেন কী হচ্ছে। কিন্তু জেনেও না জানার ভান করে পাল্টা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। কার বিরুদ্ধে? নিজেদেরই বিরুদ্ধে। সম্ভবত এরকম বিচ্ছিরি অবস্থায় তাদের আর কোনও দিন পড়তে হয়নি। কিন্তু রাজনীতি বড় বালাই। আর তার বাধ্যবাধকতা? আরো বেশি। 

আসলে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটবার পর থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড দেখে তাদেরকে আর কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। পদত্যাগের পর মুহূর্তেই আবার কাউকে অন্যত্র বহাল করার মতো স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘৃতাহুতির কাজ করেছে। নির্যাতিতার বাবা-মা`কে প্রথমে এক কথা বলে নিয়ে এসে অন্য কথা বলা, তাঁদের বসিয়ে রেখে নির্যাতিতার পার্থিব শরীরকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া থেকে প্রতিটি ঘটনার মধ্যে সাধারণ মানুষ যদি ষড়যন্ত্র বা কিছু লুকোনোর মতো ব্যাপার খুঁজে পায়, তাহলে তাদেরকে কি খুব দোষ দেওয়া চলে? উচ্চ আদালতে যেভাবে নিজেদের রক্ষা করতে, জনগণের করের টাকায়, যেভাবে উকিল নিয়োগ করা হয়েছে, সেটিও কি মেনে নেওয়া যায়? এই বিষয়টিকে `প্রেস্টিজ ফাইট` হিসেবে নেওয়াটা কি খুব জরুরি ছিল?

কল্যাণকারী রাষ্ট্রের (এই ক্ষেত্রে রাজ্য) কাছে এই ভূমিকা আশা করা যায় না। বেঁচে থাকার অধিকার যে রাষ্ট্রে থাকে না, সেই রাষ্ট্রকে সবাই পরিত্যাগ করে। আর বেঁচে থাকার শর্তগুলির মধ্যে শুধু প্রাণ রক্ষা বোঝায় না। বোঝায় জীবনের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সুস্থ ও ভালভাবে বাঁচাকেও। আর জি করে ঘটনায় এর সবটাই লঙ্ঘিত। প্রাণ গেছে একটি অতি সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা মেধাবী ছাত্রীর। তাঁকে খোয়াতে হয়েছে সম্ভ্রমটুকুও। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যে ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল, সেটি রাষ্ট্র নিতে পারেনি। এখনও অবধি পারছে না। আর তার ফল এই দমবন্ধ করা পরিবেশ। 

অবিলম্বে যদি অপরাধী(রা) ধরা না পড়ে, নির্যাতিতা যদি অতি দ্রুত ন্যায়-বিচার না পায়, তবে এই রোষ তুষের আগুনের মতোই ধিকি ধিকি জ্বলবে। অবশ্য এই দেশে বর্ণালী দত্ত বিচার পাননি, রিজওয়ানুর বিচার পাননি। জানি না আর জি করের নির্যাতিতা কী পাবেন, কতটা পাবেন। কিন্তু রাষ্ট্র ভুলে যাচ্ছে, তার এই অমানবিকতা শেষ পর্যন্ত কফিনে শেষ পেরেক ঠুঁকছে।  

(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা
সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব) 

Friday, August 23, 2024

 বেওয়ারিশ

শৌভিক রায়

মানুষ লাশ হলে ভারী হয়। কে না জানে! কিন্তু তাই ব`লে এতটা!
প্যাডেলে আরও একটু জোরে চাপ দেয় গনা। সময় মতো পৌঁছতে না পারলে নাহাবাবুর কথা শুনতে হবে।
অবশ্য লখনা যখন তাকে খবর দিয়েছিল তখনই বোধহয় লাশটার দিন কুড়ি হয়ে গেছে। লখনার সঙ্গে নাহাবাবুর কী চুক্তি, সেটা প্রাণের বন্ধু হয়েও লখনা কোনদিন খোলসা করেনি। তবে গনাকে খারাপ পয়সা দেয় না সে। গনা বোঝে যে, লখনা নাহাবাবুর কাছ থেকে বেশ ভাল টাকা পায়। না হলে শুধু বইবার জন্য তাকে এতগুলো টাকা দিত না। অবশ্য এই কাজে ঝুঁকি বিরাট। কখন কোথায় কে ধরে বসবে তার ঠিক নেই। গনা তাই সাবধানে দেখেবুঝে ভ্যান চালায়। লাশটা নাহাবাবুর ওখানে পৌঁছে দিলে তার কাজ শেষ।
আর একটা পরিচয় আর খানিক পরে মুছে যাবে পৃথিবী থেকে। কেউ জানবে না যে, মানুষটা কোথায় গেল। বাড়ির লোক প্রথমদিকে কয়েকদিন থানায় চক্কর কাটবে। তারপর হাল ছেড়ে দেবে একদিন! চারদিকে এত মানুষ...কে কার খবর রাখে! এই যে লাশটা সে টানছে, এও তো কারও প্রিয়জন! কোথা থেকে এসেছিল, কোথায় যাচ্ছিল কেউ জানে না। কীভাবেই বা মারা গেল সেটাও অজানা। মরে গিয়ে একদিন চলে এলো লাশকাটা ঘরে। তারপর নিয়মমাফিক ছবি-টবি তুলে রাখা, নামকেওয়াস্তে তদন্ত চলা....ব্যস ওটুকুই। খোঁজ-খবর আর কে করবে? লখনা মারফত বেওয়ারিশ লাশের খবর পৌঁছে যাবে নাহাবাবুর কাছে। কী দেওয়া-নেওয়া হবে কে জানে, একদিন মরা মানুষটা লাশকাটা ঘর থেকে বেরিয়ে রাতের অন্ধকারে উঠে পড়বে গনার ভ্যানে। পৌঁছে যাবে নাহাবাবুর খামারবাড়ি।
খামারবাড়ি! পিচ করে থুতু ফেলল গনা। ওটা আসলে লাশবাড়ি। ওখান থেকে লাশটা যে কোথায় যাবে আর কেউ জানবে না। লখনা কখনও বলে, নাহাবাবু লাশ চালান দেয় নানা জায়গায়, কখনও বলে অ্যাসিডে লাশ ডুবিয়ে চামড়া খসিয়ে কঙ্কাল বের ক'রে সাপ্লাই দেয়!
গনার অবশ্য সেসব জানবার কোনও আগ্রহ নেই। সে তার পয়সা পেলেই খুশি। লখনা তাকে এতটা পয়সা দেয় যে, সারা সপ্তাহ তার আর কিছু না করলেও চলে। তবে বেওয়ারিশ লাশ তো আর প্রতিদিন জোটে না! তাই অন্যসময় গনা তার ভ্যানে মাল টানে। যা পায় তাই টানে। তার কামাই মন্দ না। ধরে রাখতে পারলে ভাল পয়সা করতে পারত গনা। কিন্তু তার মুশকিলটা অন্য জায়গায়। চুল্লু না খেলেও তার চলবে, কিন্তু সপ্তাহে তিন-চারদিন পিঙ্কির শরীর না হলে তার চলে না। ঝোপ বুঝে পিঙ্কিও আজকাল রেট বাড়াচ্ছে। আসলে শালীর দেমাক বেড়েছে। লোকজন বেশি যাচ্ছে বোধহয় ওর কাছে! তবে মুখে বলবে অন্য কথা,
- দেখছ না কীরকম দাম বাড়ছে জিনিসপত্রের! পেট তো চালাতে হবে নাকি।
- তাই বলে আমার কাছেও বেশি নিবি? আমি না তোর প্রথম কাস্টমার।
- সেসব দিন কি আর আছে? আরে আমাদেরও সংসার পালতে হয়।
- তাই বলে এত!
- দিলে দাও বাপু, নইলে কাটো।
- এভাবে বলছিস?
- কেন? একটু বাড়াতে অসুবিধে কি? ভালই তো কামাচ্ছ।
- কে বলেছে তোকে?
- ওসব বোঝা যায়। তাছাড়া লখনাদাও বলছিল।
- লখনাও আসে নাকি তোর কাছে?
- লখনা, গনা, মদনা...সব আসে। শোনো, পয়সা বাড়ালে এসো। নইলে ফোটো। ধান্দার টাইম। ফালতু কথার টাইম নেই।
পিঙ্কির কথায় রাগতে গিয়েও রাগে না গনা। বরং মজাই পায়। সেদিনের পুচকে পিঙ্কি আজ এপাড়ার মক্ষীরানি। আর কয়েকদিন পর বোধহয় মাসি হয়ে মেয়ে খাটাবে।
বেশি পয়সার ধান্দায় আজকাল অজানা-অচেনা লোক দেখলেই গনা সুযোগ খোঁজে। নিকেশ ক'রে সোজা নাহাবাবুর লাশবাড়িতে পৌঁছতে পারলেই হল। মাঝে আর কোনও ঝামেলা নেই। সব পয়সা নিজের পকেটে। এরকম কামাইয়ের পয়সায় গনা চুল্লুর বদলে বিলাতি খায়। পিঙ্কিকে রাগানোর জন্য শ্রীদেবীর কাছে যাবে ভেবেও অবশ্য যেতে পারে না। পিঙ্কির একটা আলাদা ইয়ে আছে। কিন্তু বেওয়ারিশ লোক পাওয়াই মুশকিল। তাই কামাইটা অনিশ্চিত। মাঝে পরপর তিনটে পেয়েছিল। এখন আবার মন্দা যাচ্ছে।
লখনা বোধহয় তার এই ধান্দার কথা বুঝতে পেরেছিল। আসলে দোষ তার নিজের। নাহাবাবুর কাছে পয়সা পেয়েই দেদার ওড়াচ্ছিল সে। লখনা সেটাই ধরেছে,
- কি রে, এত পয়সা পেলি কোথায়?
- কোথায় এত পয়সা দেখছিস?
- নিজে বুঝছিস না?
- ধুস! ছিল আগের। আর কয়েকদিন ধরে বেশি বেশি মাল টানছি প্রেমেনদার গুদামের।
- তাই বলে এত বেশি?
- কিছু বখশিস দিয়েছে তো।
- অ...সেটা বল।
- ওসব বলার কি আছে আর। নে, মাল টান।
- বিলাতি?
- হ্যাঁ রে। বাচ্চু নামটা বলে দিয়েছে।
- বাচ্চু যখন বলেছে তখন ভাল হবেই। খোল বোতল।
বিলাতি দিয়ে লখনাকে তখনকার মতো ভুলিয়ে রাখলেও মনে মনে সাবধান হয়ে গেছিল গনা। যা করবার চুপচাপ তো বটেই, খুব সাবধানে করতে হবে। অবশ্য লখনা বেশি তড়পালে অন্য পথ নেবে সে। ফাঁকফোকর সেও কম জানে না এই লাইনে থেকে থেকে। দরকারে সোজা চলে যাবে পুলিশের কাছে। ওরা বুঝলেও ধরতে পারছে না। গনা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলে লখনাকে আর দেখতে হবে না! সে নিজেই তখন নাহাবাবুর এক নাম্বার লোক হয়ে উঠবে।
হঠাৎ গনার শস্তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা আজ চালু রাখতে বলেছিল লখনা। নাহাবাবু নাকি ফোন করে অন্য কোথাও লাশ নিয়ে যেতে বলতেও পারেন। অন্যদিন অবশ্য ফোন বন্ধ রাখাই নিয়ম।
পকেট থেকে ফোন বের করে কানে ধরল গনা। আরেব্বাস...পিঙ্কির গলা,
- তুমি কোথায়?
- কেন রে?
- এক্ষুনি কুঠির মাঠের দিকে আসতে পারবে?
- কুঠির মাঠ? কেন?
- এক কাস্টমার নিয়ে এসেছিল। ব্যাটা মাল টেনে বেহুঁশ। ফিরতে পারছি না একা একা। তোমার ভ্যানটা নিয়ে এস না। ভয় লাগছে।
- এখন ভ্যান নিয়ে? এত রাতে?
- আসবে না? অ...বুঝলাম। ঠিক আছে। এসো আমার কাছে এরপর। ঢ্যামনা একটা।
- আরে দাঁড়া দাঁড়া। ওরকম বলছিস কেন? যাচ্ছি রে যাচ্ছি।
ভ্যান ঘোরায় গনা। কুঠির মাঠের ওদিকটা একটু ফাঁকা আর জঙ্গল জঙ্গল। তবে ওখান দিয়ে গেলে শর্টকাট একটা রাস্তা আছে। সেখান দিয়ে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হল ভ্যানের লাশটা নিয়ে। পিঙ্কি এটা দেখলে ঝামেলা হয়ে যাবে। কুঠির মাঠের কাছে একটা ঝোপের আড়ালে ভ্যানটা রেখে হাঁটা দিল গনা। আবছা অন্ধকারে খানিকটা দূরে একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তড়বর করে এগোয় গনা। এখানে ফাঁকা জায়গায় কেউ নেই। সে আর পিঙ্কি শুধু। একবার পিঙ্কিকে পেলে দারুন হয়। নিশ্চয়ই পিঙ্কি না করবে না! ডাকবার সঙ্গে সঙ্গেই সে এসেছে পিঙ্কির কাছে,
- কি রে খুব ভয় পাচ্ছিলি নাকি পি...
আর বলবার সুযোগ পেল না গনা। মাথার পেছনে তীব্র যন্ত্রণায় মাটিতে পড়ে গেল গনা। পড়েই রইল।
ভারী পুরোন লাশটার পাশেই গনার টাটকা লাশটা উঠিয়ে ভ্যান টানতে লাগল লখনা। দুটো লাশের ডিমান্ড ছিল। আগেই বলে রেখেছিলেন নাহাবাবু। একটা স্টকে থাকলেও আর একটা জোগাড় হচ্ছিল না। তখনই নাহাবাবু বলেছিলেন,
- গনার খবর কী রে?
- ভালই আছে বাবু।
- ওর হাতে মাল নেই?
- ওর হাতে কিভাবে থাকবে? ও তো শুধু ভ্যান টানে।
- তাই নাকি? আর কিছু করে না?
- আর কি করবে!
- কোন একটা মেয়ের জন্য নাকি পাগল! ধেনো পাঁচু বলছিল।
- জানি না বাবু।
- বেওয়ারিশের বাচ্চা গনাটা মাঝে তিনটে লাশ সাপ্লাই দিয়েছে আমাকে। তুই তো জানিসই। বলে দেখ ওকে, যদি দিতে পারে।
নাহাবাবুর কথায় লখনার কান ঝাঁ ঝাঁ করছিল। গনার তলে তলে এই ব্যাপার তবে! শালা এভাবে বেইমানি করছে! পিঙ্কিকেও হাত করা শেষ! চশমখোরটা একবারও ভাবল না যে, পিঙ্কি লখনার। যে থালে খাচ্ছে সেটাতেই ফুটো করছে ব্যাটা। কেন মেয়েছেলের অভাব নাকি রে? তাও না হয় মেনে নেওয়া গেল যে, বাজারের মেয়েছেলে যেখানে পয়সা দেখবে সেখানেই যাবে, কিন্তু তাকে ডিঙিয়ে লাশ সাপ্লাই দেবে এভাবে! এটার ব্যবস্থা করতে হবে। ওই শালী পিঙ্কিকে দিয়েই এটাকে তুলতে হবে। এই লাইনে বিশ্বাসঘাতকের কোনো জায়গা নেই। লখনা সেদিনই ভেবে রেখেছিল কোন লাশ দুটো সাপ্লাই দেবে। একবার তার মনে এটাও এসেছিল যে, নাহাবাবু ঘুরিয়ে গনার লাশের কথাই বললেন যেন! আজ কাজ হয়েছে।
দুটো লাশ নিয়ে ভ্যান টানছে লখনা আধা অন্ধকারে। দুটোই বেওয়ারিশ। ভ্যান টানে আর চকচকে টাকার নোট দেখে।
টাকার স্বপ্নে বিভোর থাকে বলে খেয়ালও করে না কখন তার ভ্যানে নাহাবাবুর ডানহাত ধেনো পাঁচু চকচকে ধারালো ছুরিটা নিয়ে উঠে এসেছে আর পিঙ্কি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার সামনের বাঁকে, নাহাবাবুর পাশে...
(প্রকাশিত: উত্তরের সারাদিন/ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০)

Sunday, August 18, 2024


 

`তুমি তো নারীকে দখল করেছ। তুমি বুঝবা কী!`

কতবার শুনেছি? মনে নেই এখন। হাসি ছাড়া উত্তর দেওয়ারও ছিল না এই কথার। 
তবে সেই নারী অর্থাৎ রীনা ছাড়ত না বিলকুল। আর তাতেই উত্তর আসতো,
`দেখছ তো, বুড়ো বলে নারী আমাকে পাত্তা দেয় না! কী যে জাদু করছ! মিঞা বিবি দুটোই সমান।`

আমার/ আমাদের ভরসার জায়গাগুলো ক্রম-বিলীয়মান। 
আর সেই ক্রমেই যোগ হলেন আর একজন। 
দেবজ্যোতি রায়। বাবুদা। 

তাঁর সঙ্গে আমার মেলামেশা হয়ত সামান্যই। যদিও পরিচয় এক যুগেরও ওপর। 
ওই সামান্যই আমার কাছে অসামান্য হয়ে যেত যখন একসঙ্গে নানা চ্যানেলে বিভিন্ন `টক শো`করতাম, আড্ডা দিতাম দুপুর থেকে বিকেল। 
মোবাইল ফোনটা ছিল যন্ত্রণার। সেটার অপারেশন শিখতে কতবার `তুমি কোথায়? বাপির দোকানে আসো তো`। 
শেষটায় নতুন ফোন। আর এক যন্ত্রণা! সেটা আরও সফিস্টিকেটেড। 
`শালা তুমি কলকাতায় যায় আর নতুন নতুন ঘ্যামা জামা কেন! এর পরে আমাকেও এনে দেবে।` 
আনিনি। জানতাম আনলেও নেবেন না। ওই বলা অবধিই।
 
আমার প্রাক্তন এক ছাত্র অসুস্থ। 
সে লেখক। মাথাব্যথা বাবুদার। 
কানের কাছে সমানে ফিসফিস `কী করা যায় বলো তো? ওর তো তেমন পয়সাকড়ি নাই`।  
উদ্যোগী হয়ে দৌড়োদৌড়ি। কিছু সুরাহা হল। কয়েকজন শোনা মাত্রই বিদায় করল। তাতে কী! 
এই ` কী করার` লোকগুলোই ঝটপট তারা হয়ে যায়। আকাশ যে কেন এদের ঠিকানা হয় কে জানে!

`তুমি কোথার থেকে শুনলা?` 
 `শুভম জানিয়েছে তুমি নার্সিং হোমে লুকিয়ে আছো।` 
`শ্বাসকষ্টটা মারাত্মক।`
`শুয়ে থাকো। এখন আসি। পরে আসবো।`
ওঁর লেখা। আমার বলা।
জানতাম আর আসবো না। কেন আসবো? এটা কোনও কথা হল!
সন্ধ্যায় তাঁর নারীকে লিখে জানালেন, `ওপরের ডাক চলে এসেছে।` 
নারী অভিমানে আর দাঁড়ায়নি। 
আমাদের বড্ড বেশি অভিমান। 
তোমারও কি কম ছিল!



  
  
    

Saturday, August 17, 2024

 অন্তর্গত তাগিদ আর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ফারাকটা অনেক। কিন্তু সেটাকে গুলিয়ে ফেলার বদভ্যাস আমাদের প্রায় সকলের......

Friday, August 9, 2024

 একটি ছোট্ট স্মৃতি

  শৌভিক রায় 

সময়টা ১৯৮২ বা ১৯৮৩। দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তিনি, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, জিততে পারেননি।  

সেই সময় শাসক দলের একজন কর্মী হিসেবে, দলীয় কাজে, তিনি একবার ফালাকাটায় এলেন। এরকমই বর্ষাকাল তখন। আমাদের স্কুল কোয়ার্টার্সের সামনের মাঠে বৃষ্টির জল ছোটাছুটি করছে। ব্যাঙের ডাকে দিনের বেলাতেই রাতের হাতছানি।

হঠাৎ পুলিশের একটি গাড়ি এসে থামল কোয়ার্টার্সের সামনে। মাঝবয়সী মুখ চেনা মানুষটি নামলেন। সঙ্গে রণেনকাকু। পুলিশের পোশাকেও দুই একজন ছিলেন হয়ত। 

সেই মানুষটির ধুতি পাঞ্জাবি ভিজে নেতিয়ে গেছে। গায়ে রাখবার মতো অবস্থা নেই। তখন ফালাকাটায় যাঁরা ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন, তাঁদের মধ্যে একদম প্রথম সারিতে আমার বাবা। বোঝা গেল ওই মানুষটির ধুতি পাঞ্জাবি প্রয়োজন।

গতকাল থেকে চোখে ভাসছে শুধু আমাদের সেই কোয়ার্টার্সের বসবার ঘরে, লাল সোফায়, বাবার ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত চেনা মুখের মানুষটি বসে রয়েছেন। অবশ্যই বেশিক্ষণ নয়। খানিক পরেই চলে যাবেন। তাঁর নিজের ধুতি পাঞ্জাবি শুকিয়ে ছিল কিনা মনে নেই সেসব। তাঁকে সামনাসামনি আর কোনও দিন দেখিওনি।

রণেনকাকু অকালে চলে গেছেন। বহু আগে। বাবাও নেই বছর তিনেক হল। গতকাল উনিও চলে গেলেন। 

আসলে কিছু অনুপস্থিতির প্রাবল্য, উপস্থিতির চাইতে অনেক বেশি। যত দিন যাচ্ছে, জীবন সেটাই শেখাচ্ছে।



 


Friday, August 2, 2024

 ।। নিজের ভাবনায়।।

       শৌভিক রায় 

সবার পক্ষে সবকিছু জানা বা করা সম্ভব নয়। সেটাই স্বাভাবিক। জোর করে কিছু করতে যাওয়ার অর্থ লোক হাসানো। সুর নেই তবু গায়ক, নাচের একটা মুদ্রা না জেনেও নৃত্যশিল্পী, এটা ওটা লিখেই কবি! তালিকা লম্বা।

বড় বেশি সরলীকরণ। বড় বেশি প্রদর্শন....