ও রাষ্ট্র, অনেক তো হল, এবার সত্যি কিছু করো
শৌভিক রায়
লাল পোশাক পরিহিত বৃদ্ধ মানুষটি জলকামানের তীব্রতা উপেক্ষা করেও জাতীয় পতাকা উঁচু করে ধরে আছেন। ইশারায় কিছু বলছেন। এই মুহূর্তে দৃশ্যটি ভাইরাল। আর তাতেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
একদল বলছেন, ছাত্রদের আন্দোলনে এই বয়স্ক মানুষটি কেন? আসলে ছাত্রদের পেছনে অন্য কেউ এই আন্দোলনে মদত যোগাচ্ছে। তাদের ধারণা একেবারে অমূলক নয়। কিছু তথ্য-প্রমাণ অবশ্যই বলছে যে, শুধু ছাত্ররা নয়। অনেকেই রয়েছেন।
অন্য দলের মত হল, আন্দোলনটি ডেকেছে ছাত্ররা। তাতে তারা সর্বস্তরের মানুষকেই আহ্বান করেছেন। তাই যদি কেউ এসে থাকেন তবে মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। তাদের এই কথাকেও উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। ঠিকই তো, স্বাধীনতা দিবসের আগে মহিলাদের `রাত দখল`-এর ডাকে তো শুধু তারাই ছিলেন না। অনেকেই ছিলেন।
আসলে যে কোনও আন্দোলনেই পক্ষ ও বিপক্ষ থাকে। তা না হলে আন্দোলন কীসের বা কেন? আর দুটো পক্ষ থাকলেই বিরুদ্ধ মত থাকবেই। তাই এই সব চাপানউতোর খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হল, এই উচ্চকিত কোলাহলের মধ্যে যে দাবিতে এই আন্দোলন, সেটি থেকে আমরা সবাই সরে আসছি না তো! কেননা যে নির্যাতিতার জন্য আজকের এই রোষ, তিনি কিন্তু এখনও বিচার পাননি। এই রাজ্যের প্রশাসন তাঁকে বিচার দিতে পারবে না বলে যাদের ডেকে আনা হয়েছে, তারাও কিন্তু এখনও উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি। বরং তদন্তের অভিমুখ কিছুটা যেন অন্যদিকে ঘুরে গেছে। আশা করি, এই প্রতিবেদন প্রকাশ হতে হতে তারা সঠিক তদন্তে দোষী বা দোষীদের ধরতে পারবেন। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে শুধু আমি নই, রাজ্যের সব সাধারণ মানুষই এটা আশা করছেন।
এবার একটু গভীরে ভেবে দেখি। আর জি কর কাণ্ডে হঠাৎ এত সংখ্যক সাধারণ মানুষ এইরকম ক্ষেপে উঠলেন কেন? পুরোটাই রাজনীতি? আর কিচ্ছু না? সবই নিয়ন্ত্রিত?
অস্বীকার করছি না যে, সমস্ত ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক রং লাগেনি। অবশ্যই লেগেছে। যত সময় এগিয়েছে কমবেশি সবাই নিজের ফায়দা তুলতে নেমেছে। কিন্তু সেটার পরেও কিছু ব্যাপারকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কেননা সেখানে জায়গা নিয়েছে প্রায় সকলের অন্তর্গত তাগিদ। সেখানে কোনও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। আর নেই বলেই এখনও পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন এই রাজ্যের প্রতিটি জনপদের পাড়া, হাউজিং, কলোনি থেকে শুরু করে সর্বত্রই বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছে। যারা এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে রাজনীতি দেখছেন, তারা নিজেরাও খুব ভাল জানেন কী হচ্ছে। কিন্তু জেনেও না জানার ভান করে পাল্টা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। কার বিরুদ্ধে? নিজেদেরই বিরুদ্ধে। সম্ভবত এরকম বিচ্ছিরি অবস্থায় তাদের আর কোনও দিন পড়তে হয়নি। কিন্তু রাজনীতি বড় বালাই। আর তার বাধ্যবাধকতা? আরো বেশি।
আসলে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটবার পর থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড দেখে তাদেরকে আর কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। পদত্যাগের পর মুহূর্তেই আবার কাউকে অন্যত্র বহাল করার মতো স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘৃতাহুতির কাজ করেছে। নির্যাতিতার বাবা-মা`কে প্রথমে এক কথা বলে নিয়ে এসে অন্য কথা বলা, তাঁদের বসিয়ে রেখে নির্যাতিতার পার্থিব শরীরকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া থেকে প্রতিটি ঘটনার মধ্যে সাধারণ মানুষ যদি ষড়যন্ত্র বা কিছু লুকোনোর মতো ব্যাপার খুঁজে পায়, তাহলে তাদেরকে কি খুব দোষ দেওয়া চলে? উচ্চ আদালতে যেভাবে নিজেদের রক্ষা করতে, জনগণের করের টাকায়, যেভাবে উকিল নিয়োগ করা হয়েছে, সেটিও কি মেনে নেওয়া যায়? এই বিষয়টিকে `প্রেস্টিজ ফাইট` হিসেবে নেওয়াটা কি খুব জরুরি ছিল?
কল্যাণকারী রাষ্ট্রের (এই ক্ষেত্রে রাজ্য) কাছে এই ভূমিকা আশা করা যায় না। বেঁচে থাকার অধিকার যে রাষ্ট্রে থাকে না, সেই রাষ্ট্রকে সবাই পরিত্যাগ করে। আর বেঁচে থাকার শর্তগুলির মধ্যে শুধু প্রাণ রক্ষা বোঝায় না। বোঝায় জীবনের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সুস্থ ও ভালভাবে বাঁচাকেও। আর জি করে ঘটনায় এর সবটাই লঙ্ঘিত। প্রাণ গেছে একটি অতি সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা মেধাবী ছাত্রীর। তাঁকে খোয়াতে হয়েছে সম্ভ্রমটুকুও। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যে ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল, সেটি রাষ্ট্র নিতে পারেনি। এখনও অবধি পারছে না। আর তার ফল এই দমবন্ধ করা পরিবেশ।
অবিলম্বে যদি অপরাধী(রা) ধরা না পড়ে, নির্যাতিতা যদি অতি দ্রুত ন্যায়-বিচার না পায়, তবে এই রোষ তুষের আগুনের মতোই ধিকি ধিকি জ্বলবে। অবশ্য এই দেশে বর্ণালী দত্ত বিচার পাননি, রিজওয়ানুর বিচার পাননি। জানি না আর জি করের নির্যাতিতা কী পাবেন, কতটা পাবেন। কিন্তু রাষ্ট্র ভুলে যাচ্ছে, তার এই অমানবিকতা শেষ পর্যন্ত কফিনে শেষ পেরেক ঠুঁকছে।
(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা
সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব)

No comments:
Post a Comment