বেওয়ারিশ
শৌভিক রায়
মানুষ লাশ হলে ভারী হয়। কে না জানে! কিন্তু তাই ব`লে এতটা!
অবশ্য লখনা যখন তাকে খবর দিয়েছিল তখনই বোধহয় লাশটার দিন কুড়ি হয়ে গেছে। লখনার সঙ্গে নাহাবাবুর কী চুক্তি, সেটা প্রাণের বন্ধু হয়েও লখনা কোনদিন খোলসা করেনি। তবে গনাকে খারাপ পয়সা দেয় না সে। গনা বোঝে যে, লখনা নাহাবাবুর কাছ থেকে বেশ ভাল টাকা পায়। না হলে শুধু বইবার জন্য তাকে এতগুলো টাকা দিত না। অবশ্য এই কাজে ঝুঁকি বিরাট। কখন কোথায় কে ধরে বসবে তার ঠিক নেই। গনা তাই সাবধানে দেখেবুঝে ভ্যান চালায়। লাশটা নাহাবাবুর ওখানে পৌঁছে দিলে তার কাজ শেষ।
আর একটা পরিচয় আর খানিক পরে মুছে যাবে পৃথিবী থেকে। কেউ জানবে না যে, মানুষটা কোথায় গেল। বাড়ির লোক প্রথমদিকে কয়েকদিন থানায় চক্কর কাটবে। তারপর হাল ছেড়ে দেবে একদিন! চারদিকে এত মানুষ...কে কার খবর রাখে! এই যে লাশটা সে টানছে, এও তো কারও প্রিয়জন! কোথা থেকে এসেছিল, কোথায় যাচ্ছিল কেউ জানে না। কীভাবেই বা মারা গেল সেটাও অজানা। মরে গিয়ে একদিন চলে এলো লাশকাটা ঘরে। তারপর নিয়মমাফিক ছবি-টবি তুলে রাখা, নামকেওয়াস্তে তদন্ত চলা....ব্যস ওটুকুই। খোঁজ-খবর আর কে করবে? লখনা মারফত বেওয়ারিশ লাশের খবর পৌঁছে যাবে নাহাবাবুর কাছে। কী দেওয়া-নেওয়া হবে কে জানে, একদিন মরা মানুষটা লাশকাটা ঘর থেকে বেরিয়ে রাতের অন্ধকারে উঠে পড়বে গনার ভ্যানে। পৌঁছে যাবে নাহাবাবুর খামারবাড়ি।
খামারবাড়ি! পিচ করে থুতু ফেলল গনা। ওটা আসলে লাশবাড়ি। ওখান থেকে লাশটা যে কোথায় যাবে আর কেউ জানবে না। লখনা কখনও বলে, নাহাবাবু লাশ চালান দেয় নানা জায়গায়, কখনও বলে অ্যাসিডে লাশ ডুবিয়ে চামড়া খসিয়ে কঙ্কাল বের ক'রে সাপ্লাই দেয়!
গনার অবশ্য সেসব জানবার কোনও আগ্রহ নেই। সে তার পয়সা পেলেই খুশি। লখনা তাকে এতটা পয়সা দেয় যে, সারা সপ্তাহ তার আর কিছু না করলেও চলে। তবে বেওয়ারিশ লাশ তো আর প্রতিদিন জোটে না! তাই অন্যসময় গনা তার ভ্যানে মাল টানে। যা পায় তাই টানে। তার কামাই মন্দ না। ধরে রাখতে পারলে ভাল পয়সা করতে পারত গনা। কিন্তু তার মুশকিলটা অন্য জায়গায়। চুল্লু না খেলেও তার চলবে, কিন্তু সপ্তাহে তিন-চারদিন পিঙ্কির শরীর না হলে তার চলে না। ঝোপ বুঝে পিঙ্কিও আজকাল রেট বাড়াচ্ছে। আসলে শালীর দেমাক বেড়েছে। লোকজন বেশি যাচ্ছে বোধহয় ওর কাছে! তবে মুখে বলবে অন্য কথা,
- দেখছ না কীরকম দাম বাড়ছে জিনিসপত্রের! পেট তো চালাতে হবে নাকি।
- তাই বলে আমার কাছেও বেশি নিবি? আমি না তোর প্রথম কাস্টমার।
- সেসব দিন কি আর আছে? আরে আমাদেরও সংসার পালতে হয়।
- তাই বলে এত!
- দিলে দাও বাপু, নইলে কাটো।
- এভাবে বলছিস?
- কেন? একটু বাড়াতে অসুবিধে কি? ভালই তো কামাচ্ছ।
- কে বলেছে তোকে?
- ওসব বোঝা যায়। তাছাড়া লখনাদাও বলছিল।
- লখনাও আসে নাকি তোর কাছে?
- লখনা, গনা, মদনা...সব আসে। শোনো, পয়সা বাড়ালে এসো। নইলে ফোটো। ধান্দার টাইম। ফালতু কথার টাইম নেই।
পিঙ্কির কথায় রাগতে গিয়েও রাগে না গনা। বরং মজাই পায়। সেদিনের পুচকে পিঙ্কি আজ এপাড়ার মক্ষীরানি। আর কয়েকদিন পর বোধহয় মাসি হয়ে মেয়ে খাটাবে।
বেশি পয়সার ধান্দায় আজকাল অজানা-অচেনা লোক দেখলেই গনা সুযোগ খোঁজে। নিকেশ ক'রে সোজা নাহাবাবুর লাশবাড়িতে পৌঁছতে পারলেই হল। মাঝে আর কোনও ঝামেলা নেই। সব পয়সা নিজের পকেটে। এরকম কামাইয়ের পয়সায় গনা চুল্লুর বদলে বিলাতি খায়। পিঙ্কিকে রাগানোর জন্য শ্রীদেবীর কাছে যাবে ভেবেও অবশ্য যেতে পারে না। পিঙ্কির একটা আলাদা ইয়ে আছে। কিন্তু বেওয়ারিশ লোক পাওয়াই মুশকিল। তাই কামাইটা অনিশ্চিত। মাঝে পরপর তিনটে পেয়েছিল। এখন আবার মন্দা যাচ্ছে।
লখনা বোধহয় তার এই ধান্দার কথা বুঝতে পেরেছিল। আসলে দোষ তার নিজের। নাহাবাবুর কাছে পয়সা পেয়েই দেদার ওড়াচ্ছিল সে। লখনা সেটাই ধরেছে,
- কি রে, এত পয়সা পেলি কোথায়?
- কোথায় এত পয়সা দেখছিস?
- নিজে বুঝছিস না?
- ধুস! ছিল আগের। আর কয়েকদিন ধরে বেশি বেশি মাল টানছি প্রেমেনদার গুদামের।
- তাই বলে এত বেশি?
- কিছু বখশিস দিয়েছে তো।
- অ...সেটা বল।
- ওসব বলার কি আছে আর। নে, মাল টান।
- বিলাতি?
- হ্যাঁ রে। বাচ্চু নামটা বলে দিয়েছে।
- বাচ্চু যখন বলেছে তখন ভাল হবেই। খোল বোতল।
বিলাতি দিয়ে লখনাকে তখনকার মতো ভুলিয়ে রাখলেও মনে মনে সাবধান হয়ে গেছিল গনা। যা করবার চুপচাপ তো বটেই, খুব সাবধানে করতে হবে। অবশ্য লখনা বেশি তড়পালে অন্য পথ নেবে সে। ফাঁকফোকর সেও কম জানে না এই লাইনে থেকে থেকে। দরকারে সোজা চলে যাবে পুলিশের কাছে। ওরা বুঝলেও ধরতে পারছে না। গনা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলে লখনাকে আর দেখতে হবে না! সে নিজেই তখন নাহাবাবুর এক নাম্বার লোক হয়ে উঠবে।
হঠাৎ গনার শস্তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা আজ চালু রাখতে বলেছিল লখনা। নাহাবাবু নাকি ফোন করে অন্য কোথাও লাশ নিয়ে যেতে বলতেও পারেন। অন্যদিন অবশ্য ফোন বন্ধ রাখাই নিয়ম।
পকেট থেকে ফোন বের করে কানে ধরল গনা। আরেব্বাস...পিঙ্কির গলা,
- তুমি কোথায়?
- কেন রে?
- এক্ষুনি কুঠির মাঠের দিকে আসতে পারবে?
- কুঠির মাঠ? কেন?
- এক কাস্টমার নিয়ে এসেছিল। ব্যাটা মাল টেনে বেহুঁশ। ফিরতে পারছি না একা একা। তোমার ভ্যানটা নিয়ে এস না। ভয় লাগছে।
- এখন ভ্যান নিয়ে? এত রাতে?
- আসবে না? অ...বুঝলাম। ঠিক আছে। এসো আমার কাছে এরপর। ঢ্যামনা একটা।
- আরে দাঁড়া দাঁড়া। ওরকম বলছিস কেন? যাচ্ছি রে যাচ্ছি।
ভ্যান ঘোরায় গনা। কুঠির মাঠের ওদিকটা একটু ফাঁকা আর জঙ্গল জঙ্গল। তবে ওখান দিয়ে গেলে শর্টকাট একটা রাস্তা আছে। সেখান দিয়ে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হল ভ্যানের লাশটা নিয়ে। পিঙ্কি এটা দেখলে ঝামেলা হয়ে যাবে। কুঠির মাঠের কাছে একটা ঝোপের আড়ালে ভ্যানটা রেখে হাঁটা দিল গনা। আবছা অন্ধকারে খানিকটা দূরে একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তড়বর করে এগোয় গনা। এখানে ফাঁকা জায়গায় কেউ নেই। সে আর পিঙ্কি শুধু। একবার পিঙ্কিকে পেলে দারুন হয়। নিশ্চয়ই পিঙ্কি না করবে না! ডাকবার সঙ্গে সঙ্গেই সে এসেছে পিঙ্কির কাছে,
- কি রে খুব ভয় পাচ্ছিলি নাকি পি...
আর বলবার সুযোগ পেল না গনা। মাথার পেছনে তীব্র যন্ত্রণায় মাটিতে পড়ে গেল গনা। পড়েই রইল।
ভারী পুরোন লাশটার পাশেই গনার টাটকা লাশটা উঠিয়ে ভ্যান টানতে লাগল লখনা। দুটো লাশের ডিমান্ড ছিল। আগেই বলে রেখেছিলেন নাহাবাবু। একটা স্টকে থাকলেও আর একটা জোগাড় হচ্ছিল না। তখনই নাহাবাবু বলেছিলেন,
- গনার খবর কী রে?
- ভালই আছে বাবু।
- ওর হাতে মাল নেই?
- ওর হাতে কিভাবে থাকবে? ও তো শুধু ভ্যান টানে।
- তাই নাকি? আর কিছু করে না?
- আর কি করবে!
- কোন একটা মেয়ের জন্য নাকি পাগল! ধেনো পাঁচু বলছিল।
- জানি না বাবু।
- বেওয়ারিশের বাচ্চা গনাটা মাঝে তিনটে লাশ সাপ্লাই দিয়েছে আমাকে। তুই তো জানিসই। বলে দেখ ওকে, যদি দিতে পারে।
নাহাবাবুর কথায় লখনার কান ঝাঁ ঝাঁ করছিল। গনার তলে তলে এই ব্যাপার তবে! শালা এভাবে বেইমানি করছে! পিঙ্কিকেও হাত করা শেষ! চশমখোরটা একবারও ভাবল না যে, পিঙ্কি লখনার। যে থালে খাচ্ছে সেটাতেই ফুটো করছে ব্যাটা। কেন মেয়েছেলের অভাব নাকি রে? তাও না হয় মেনে নেওয়া গেল যে, বাজারের মেয়েছেলে যেখানে পয়সা দেখবে সেখানেই যাবে, কিন্তু তাকে ডিঙিয়ে লাশ সাপ্লাই দেবে এভাবে! এটার ব্যবস্থা করতে হবে। ওই শালী পিঙ্কিকে দিয়েই এটাকে তুলতে হবে। এই লাইনে বিশ্বাসঘাতকের কোনো জায়গা নেই। লখনা সেদিনই ভেবে রেখেছিল কোন লাশ দুটো সাপ্লাই দেবে। একবার তার মনে এটাও এসেছিল যে, নাহাবাবু ঘুরিয়ে গনার লাশের কথাই বললেন যেন! আজ কাজ হয়েছে।
দুটো লাশ নিয়ে ভ্যান টানছে লখনা আধা অন্ধকারে। দুটোই বেওয়ারিশ। ভ্যান টানে আর চকচকে টাকার নোট দেখে।
টাকার স্বপ্নে বিভোর থাকে বলে খেয়ালও করে না কখন তার ভ্যানে নাহাবাবুর ডানহাত ধেনো পাঁচু চকচকে ধারালো ছুরিটা নিয়ে উঠে এসেছে আর পিঙ্কি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার সামনের বাঁকে, নাহাবাবুর পাশে...
(প্রকাশিত: উত্তরের সারাদিন/ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০)
No comments:
Post a Comment