বনধের বিবর্তন চোখে পড়ার মতো
শৌভিক রায়
গুটি গুটি পায়ে স্কুলের গেটে পৌঁছে দেখতাম, আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ সেটি। খানিক আগে যে পথে এসেছি, সেটিও শুনশান একেবারেই। সাইকেল নিয়ে চা বাগান পৌঁছেও দেখা যেত, ফ্যাক্টরিতে মস্ত তালা। তোলা হচ্ছে না চা পাতাও। রেল স্টেশনেও থাকত না কোনও ব্যস্ততা। সব কিছুই ঢিলেঢালা। বনধ চলছে।
বুধবার বিজেপির ডাকা বারো ঘন্টার বাংলা বনধ দেখে এসব আবার মনে পড়ছে। শুধু আমার কেন, উত্তরবঙ্গে অনেকেরই এক স্মৃতি।
জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মোটামুটি ভাবে জেনে এসেছিলাম, বনধ এই রাজ্যের একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। প্রতি বছর একটি বনধ নির্দিষ্ট থাকত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কোনও না কোনও দাবি নিয়ে। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে বন্ধ ডাকা ছিল অতি সাধারণ ঘটনা। আর সেসব বনধ বেশি মোটামুটিভাবে সফলও হতো। হবে না-ই বা কেন! ডেকেছে স্বয়ং সরকার পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দলটি। তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে বন্ধ ব্যর্থ করার বুকের পাটা কার আর ছিল!
তবে বিরোধী পক্ষ ডাকলেও, অনেক সময় সর্বাত্মক বনধ দেখা যেত সেই আমলে। সরকারের তরফ থেকে বনধ রুখবার প্রয়াস থাকলেও, কোথাও বোধহয় চোরা সমর্থনও থাকত। ফলে সেগুলিও কম বেশি সফল হতো। এই রাজ্যে পালাবদলের আগে এত বনধ আমাদের দেখতে হয়েছে যে, `বনধ` বন্ধ হবে ভাবিনি কখনও।`বনধ` শব্দটিই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণ মানুষের সবরকম অসুবিধে করা বনধ ব্যাপারটিকেই সুনজরে দেখত না আর কেউ।
সুখের কথা, মিলিয়ে গেছে সেই সব দিন। এই শরতের হাওয়ার মতোই। বনধ শব্দটি আমাদের অভিধান থেকে ক্রমে বিলুপ্ত হতে চলেছে। বনধ নিয়ে সেভাবে কারও মাথাব্যথা নেই। তাই বনধ ডাকলেও ছাত্রদের স্কুলে আসা, অফিস আদালতে হাজির থাকা এখন অতি সাধারণ ঘটনা। হতে পারে সেটি সরকারি নির্দেশিকার জন্য। কিন্তু যার জন্যই হোক, অতি ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া `বনধ` নামের প্রতিবাদের হাতিয়ারটিকে ভোঁতা করে দেওয়া গেছে।
ফলে এই সব দিনে এখন খোলা দোকানপাট , চলমান যানবাহন ইত্যাদি নজর এড়ায় না। এই উত্তরে গুটি কয়েক যে কয়টি শিল্প-কারখানা আছে সেগুলিও 'চলছে না চলবে না' স্লোগানে আন্দোলিত হয় না। বন্ধ মানেই গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দেওয়া একটি দিন নয় আর আজ। বরং বনধ যে আখেরে নিজেদেরই ক্ষতি, সেটি এখন বোঝে সকলেই। তাই বোধহয় এই প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই দেখেছি, বনধ উপেক্ষা করে বেশি মাত্রায় নিজের কাজটি করতে।
পাশাপাশি বুধবারের বনধ ছিল একটু যেন আলাদা। এই বনধ সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনের অভিমুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেবে কিনা সেটি বিতর্কের বিষয়। কিন্তু দিন কুড়ি আগে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনা থেকে রেহাই নেই আমাদের কারও। মানসিকভাবে এই মুহূর্তে আমরা বিপর্যস্ত। অবিশ্বাসের চোরা স্রোত আমাদের সকলের মধ্যে। স্বস্তি পাচ্ছি না কেউই। বনধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করলেও, সব কিছু পেছনে ফেলে সকলেরই পাখির চোখ এখন একটিই- নির্যাতিতার সুবিচার ও দোষীর চরম শাস্তি।
আসলে প্রবল পরাক্রমী রাষ্ট্রশক্তি যখন নিজে অন্যায় লুকোনোর চেষ্টা করে, তখনই সংঘাত সৃষ্টি হয়। জেগে ওঠে বিবেক। মানুষ চায় মুক্তি। আর সেই মুক্তির পথে বনধ একটি অস্ত্র মাত্র, একমাত্র লক্ষ্য নয়।
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
* প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ ২৯/০৮/২০২৪

No comments:
Post a Comment