Tuesday, July 30, 2024

একটা সময় প্রায় প্রতিটি রেল স্টেশনে বড় বড় করে লেখা থাকত ভারতীয় রেলের লক্ষ্য হল- SAFETY, SECURITY, PUNCTUALITY

আজকাল সেভাবে নজরে পড়ে না লেখাটি। 
গত দু`মাসে পরপর ট্রেন দুর্ঘটনা আর মৃত্যু মিছিল বলে দেয়  SAFETY ও SECURITY বলে কিছুই নেই ট্রেন যাত্রীদের। 
আর PUNCTUALITY? বিশেষ কিছু না বলাই ভাল। 
নির্বিঘ্ন পরিষেবা দিতে রেল কর্তৃপক্ষ কেন বারবার হোঁচট খাচ্ছেন, সেটি বুঝতে বিশেষ পণ্ডিত হতে হয় না। 
মনে রাখা দরকার, মৃত ও আহত যাত্রীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ কখনই বিকল্প পদ্ধতি হতে পারে না। যার যায়, তার যায়। 
এই ভোগান্তি ও অসহনীয়তা কি থামবে না কখনই?
অনেক তো তাবিজ কবচ মাদুলি ইত্যাদি শুনি। সেসব কি শুধুই কথার কথা? আই ওয়াশ?  

Saturday, July 27, 2024

 । নিজের ভাবনায়  

      শৌভিক রায় 

নদীর সঙ্গে বিদ্যালয়ের মিল কোথায় জানেন তো? 

দুজনেই প্রবাহিত। নিজের মতো। 

সমস্যা হল আমরা নদীতে বাঁধ বেঁধেছি। তার স্বাভাবিক যাত্রাপথকে আটকে দিয়েছি। যত্ন নিইনি নদীর। ফল? সকলেই জানেন। 

বিদ্যালয়ের জীবনেও যত্নের অভাবে প্রকট হয় অজস্র অসঙ্গতি। 
তার ফল? ছাত্রদের নিজেদের মধ্যে এমন কলহ যা স্তম্ভিত করে।

কিন্তু যত্নটি নেবে কে? 

বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষক-শিক্ষিকারা। অন্যত্র কখনও পিতা-মাতা, অভিভাবক-অভিভাবিকা। 
এই অভিভাবক-অভিভাবকদের মধ্যে, একটা সময়, পাড়ার বা জনপদের অগ্রজরাও থাকতেন। 
আজকাল অবশ্য এতটা আশা করা বৃথা। 

বিগত দু`দিনে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রদের কলহের (পড়ুন অস্বস্তিকর হাতাহাতি ও মারামারি) যে ভিডিও দেখলাম, তাতে স্পষ্ট বুঝতে পারছি বিরাট খামতি রয়ে যাচ্ছে আমাদের বড়দের দিক থেকে। আমরা যত্ন নিতে পারিনি তাদের।  

ছাত্রদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি হয় না এমন নয়। 
এরকম ঘটনার সাক্ষী প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ই। 
কিন্তু সেটা শেষ কথা হতে পারে না। 
কেননা এই জাতীয় ঘটনা কখনও এমন আকার ধারণ করতে পারে, যা কল্পনাতীত। যে কোনও মুহূর্তে অনেক বড় বিপদও ঘটতে পারে। 

ভিডিওতে যত্নের অভাব স্পষ্ট। 
এই প্রসঙ্গে বলতে পারি, নিজের ঘরে বসে যত্নহীন ও নড়বড়ে হয়ে যাওয়া ভিত অনেক সময় বোঝা যায় না। 
সেটি বুঝতে একটু বাইরেও আসতে হয়।নিতে হয় সুপরামর্শ, সাহায্য।  
যারা বিদ্যালয়ের যত্নের দায়িত্বে আছেন তাদের অন্তত এটুকু বোঝা উচিত।  

ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের নিজস্ব সঙ্গীতে উল্লেখ করা হয়েছে `ফালাকাটা নামে নিভৃত এ গ্রামে মিলেছি আমরা ভাগ্যবন্ত...`

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি  `ভাগ্যবন্ত` তারাই যারা যত্ন নেয় ও যত্ন প্রদান করে। 

যত্নহীন বিদ্যালয় আর যত্নহীন নদী বেপরোয়া। গতি হারাতে সময় লাগে না কারোরই।  

Friday, July 12, 2024


 সিরিজ: মা 

শৌভিক রায় 


ট্রেনের চাকার শব্দ। ব্রিজের ওপর। বিকট। ঘুম জড়ানো চোখ। খুলতে আর চায় না। 


মা ধাক্কা দিতেন। 

- ওঠ ওঠ। 


উঠব কী! ঘুম যে আমার বড্ড। শুধু ঘুম?

সব কিছুই বড্ড। খিদে। খেলা। পড়াশোনা? না না। সেটি বাদ।


- ছেলের ঘুম দেখেছ? ওঠ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির তো। গঙ্গা পেরোচ্ছি। প্রণাম কর। 

কাকে প্রণাম করব মা?

- উফফ। মা কে। ওই দ্যাখ মন্দির। রামকৃষ্ণদেব পুজো করতেন এখানে। প্রণাম কর শিগগির।


বুঝে না বুঝে প্রণাম। আকাশের গায়ে আঁকা মন্দির। পাশে গঙ্গা। জল টলটল।


- কলকাতা চলে এলো প্রায়। এরপর বরানগর। দমদম। তারপরেই শেয়ালদা। ঘুমিও না আর।


বাবার গলা কানে আসত। 


ধোঁয়া ধোঁয়া চারদিক। উঁচু উঁচু বাড়ি। গা ঘেঁষাঘেষি সব। এঁকেবেঁকে ট্রেন ঢুকত শেয়ালদায়। 


প্রথম কবে গেছি দক্ষিণেশ্বর? মনে পড়ে না। আমাদের প্রথম কোনও কিছুই আসলে মনে থাকে না- হাঁটা, বলা, শেখা....। বোধহয় মায়ের জন্য‌। 


তার কাছেই তো সব শেখা। তার কাছেই তো থাকা। সারা জীবন ধরে। মায়ের কাছে আবার প্রথম বা শেষ কী! সবই চিরদিনের। 


তাই ওসব হিসেব বাদ। যতবার যাই মায়ের কাছেই ফিরি। কবে প্রথম গেছি, কতবার গেছি এসব ভেবে লাভ!


তবে একটা কথা। মা অন্য রূপেও আছেন কাছে। আর একটি জায়গায়। সেটা জানি। কিন্তু মা ডাকে না সেখানে।


গত সন্ধেয় সে ডাক এলো। কসবার আদ্যাশক্তি কালী মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি। মা চাইলেন আদ্যাপীঠে যাই। সকালে তাই আদ্যাপীঠে। তার আগে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে।  


শুধু মা কে ভালবাসি। মায়ের কাছে আসি। জগৎ জননী মা তো আমার। কতভাবেই না কাছে থাকেন।


মা ঈশ্বর হয়ে গেলে স্পর্শ করে জীবন। সেই স্পর্শে মায়ের স্নেহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। 


মায়ের কাছে এটাই তো পাওয়া....


ছবি: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও আদ্যাপীঠ

ছবি: শৌভিক রায় 


sauvikr.blogspot.com


Thursday, July 11, 2024

 

।। একটি স্বীকারোক্তি ।।
        শৌভিক রায় 

প্রিয় বন্ধুর সম্পাদিত পত্রিকার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে। ভ্রমণ পর্বে দুটি নাম। একটি আমার। অন্যটি অনুজ প্রিয় লেখকের। তাঁর নামটি আমার আগে। 

বন্ধু ফোন করল। অনুজ লেখকের নাম আগে থাকায় আমার কোনও আপত্তি আছে কিনা। প্রথমটায় বুঝিনি। হঠাৎ এই কথা কেন! বন্ধুই জানালো আপত্তি অনুজ লেখকের। তিনি বয়সে ছোট, লেখার জগতেও হয়ত পরে এসেছেন। তাঁর মতে, আমার নামটি আগে থাকা উচিত। 

একটা অদ্ভুত ভাল লাগায় মন ভরে গেল। আমি যে আমলের মানুষ, তখন অন্যায় করলে পাড়ার দাদাদের কান ধরবার অধিকার ছিল। শিক্ষকদের বকুনির ও শাসনের ক্ষেত্রটি শিক্ষার্থীর অভিভাবক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর মুদ্রিত অক্ষরে নিজের নাম দেখা ছিল পৃথিবীর অষ্টমার্য। 

একটি পত্রিকায় নিজের লেখা নির্বাচিত হয়েছে ও প্রকাশিত হচ্ছে- এটাই আমার কাছে অনেক। কে আগে কে পরে এসব কোনও দিন ভাবিইনি। বরং লেখা ছাপা হলে এখনও দুরুদুরু বুকে ভাবি, লেখাটা আদৌ ছাপার যোগ্য ছিল তো!

সম্পাদক বন্ধু ও অনুজ লেখকের কথা শুনে তাই সত্যিই অদ্ভুত ভাল লেগেছে। একটু মজাও পেয়েছি সহপাঠী সম্পাদক বন্ধুর কুণ্ঠিত গলা শুনে। যেন কোনও অপরাধ করে ফেলেছে। এরকম ছিল ওর গলা। পাগল ছেলে (নাকি লোক!)। অনুজ লেখককে আমার স্নেহাশিস ও শুভেচ্ছা। 

আসলে উদারতা একটা বোধ। আজকের 'আমিত্ব' ঘেরা এই ঘুণপোকা ধরা সময়ে সেটা বোঝার ক্ষমতা অধিকাংশের নেই। 'আমাকে নয় কেন, আমি নই কেন, আমি ছাড়া কেন' মার্কা জ্বরে যখন সবাই কমবেশি আক্রান্ত আমরা, তখন এই আপাত ছোট্ট অথচ প্রবল প্রসারী পাওনাগুলি নতুন করে ভাবতে শেখায়। উত্তরণ ঘটায় নিজের। জীবন থেকে এটাই তো অর্জন!



Tuesday, July 9, 2024



হাসনুহানার গন্ধ মাখা

শৌভিক রায়


ঘুম ভাঙত ট্রামের ঘণ্টায়। যদিও ট্রাম লাইন দূরে খানিকটা। কিন্তু শান্ত ভোরে সেই শব্দই অনেক। রাস্তার ওপারে চপের দোকানটার মাটির উনুনে এখন আর আগুন নেই। জ্বলবে দুপুর থেকে। ভিড় বাড়বে লোকের।




জনতা এক্সপ্রেসে বেশ দেরিতেই পৌঁছেছিলাম কাল। স্টিম ইঞ্জিন হুস হুস শব্দে যেন কয়লা ঢেলেছিল বাবার সাদা ধুতি পাঞ্জাবিতে। রাতে খোপ খোপ করা থালায় দুলতে দুলতে ভাত খেতে মজাই লেগেছিল বেশ। আর ঘুম? বাড়িতেও এত আরাম হয় না!
হাসনুহানার তীব্র গন্ধ ঢুকছে জানালা দিয়ে। ঘরটা দোতলায়। চারটে খাট। ফাঁকা ফাঁকা করে রাখা। আমরাও চারজন। দু'পাল্লার দরজা বন্ধ করে রাতে শুয়েছি। আমার আলাদা খাট। এই হোটেলেও। মজা লাগছিল। বাইরে গেলে দাদা বা মায়ের সঙ্গে বিছানা ভাগ করতে হয়। এবার আমি একা থাকছি। বাড়িতে যেমন। ঘরের সামনে ব্যালকনি।



রাতে ঘরে খাবার এনে দিয়েছিল। কাঁসার থালায় ভাত। সঙ্গে ঘি, পটল ভাজা, কুমড়ো ছেচকি আর কাতলা মাছের লাল রগরগে ঝোল। এই হোটেল শুধু থাকবার। তবে বললে হারানদা খাবার এনে দেয়। দশ বিশ পয়সা বখশিস পেলে লম্বা হাসে। কৃতজ্ঞতা ঝোলে মুখে। আগেও এসেছি বলে চেনে আমাদের সবাইকে।





হোটেল থেকে বেরিয়ে বা দিকে গেলে উত্তর-দক্ষিণের রাস্তাটা পূব-পশ্চিমের এই রাস্তাকে কেটেছে। ট্রাম পূব থেকে এসে দক্ষিণে বেঁকে যায়। যেখানে বেঁকে সেখানে ইন্ডিয়া হোটেল। বেশ বড়।
আর ডান দিকে গেলে সিটি কলেজের কমার্স বিভাগ। উল্টোদিকে পুকুর। পুকুরের পূব দিকে শরবতের বিখ্যাত সেই দোকানটা। পুঁটীরামের দোকান পেরিয়ে আরও একটু গেলেই কলেজ স্ট্রিট। ইউনিভার্সিটি। থৈ থৈ ছাত্র। বই। কত বই। আর ঢিল ছোঁড়া দূরে ডেটল ফিনাইলের গন্ধের মেডিক্যাল কলেজ।





..... আজও হাঁটি ওই রাস্তায়। বিকেলের রোদ মরে গিয়ে এল ই ডি কে জায়গা দেবে একটু পরেই। সেই হোটেল একই জায়গায় রয়েছে। সময়ের প্রলেপে একটু পুরোনো। এই যা। আগের মতো সংখ্যায় ট্রাম চলে না ঘন্টি বাজিয়ে। পুকুরটা ঢেকে গেছে স্টলের ভিড়ে। জনতা এক্সপ্রেস তো কবে থেকেই নেই। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে চলা সেই ইঞ্জিনগুলোও দেখি না কতদিন। হয়ত হাসনুহানাও গন্ধ ছড়ায় না আর। হারানদার মতো মিইয়ে গিয়েছে সেও।




তবু হাঁটি। হাঁটতে বড্ড ভাল লাগে যে।