Tuesday, July 9, 2024



হাসনুহানার গন্ধ মাখা

শৌভিক রায়


ঘুম ভাঙত ট্রামের ঘণ্টায়। যদিও ট্রাম লাইন দূরে খানিকটা। কিন্তু শান্ত ভোরে সেই শব্দই অনেক। রাস্তার ওপারে চপের দোকানটার মাটির উনুনে এখন আর আগুন নেই। জ্বলবে দুপুর থেকে। ভিড় বাড়বে লোকের।




জনতা এক্সপ্রেসে বেশ দেরিতেই পৌঁছেছিলাম কাল। স্টিম ইঞ্জিন হুস হুস শব্দে যেন কয়লা ঢেলেছিল বাবার সাদা ধুতি পাঞ্জাবিতে। রাতে খোপ খোপ করা থালায় দুলতে দুলতে ভাত খেতে মজাই লেগেছিল বেশ। আর ঘুম? বাড়িতেও এত আরাম হয় না!
হাসনুহানার তীব্র গন্ধ ঢুকছে জানালা দিয়ে। ঘরটা দোতলায়। চারটে খাট। ফাঁকা ফাঁকা করে রাখা। আমরাও চারজন। দু'পাল্লার দরজা বন্ধ করে রাতে শুয়েছি। আমার আলাদা খাট। এই হোটেলেও। মজা লাগছিল। বাইরে গেলে দাদা বা মায়ের সঙ্গে বিছানা ভাগ করতে হয়। এবার আমি একা থাকছি। বাড়িতে যেমন। ঘরের সামনে ব্যালকনি।



রাতে ঘরে খাবার এনে দিয়েছিল। কাঁসার থালায় ভাত। সঙ্গে ঘি, পটল ভাজা, কুমড়ো ছেচকি আর কাতলা মাছের লাল রগরগে ঝোল। এই হোটেল শুধু থাকবার। তবে বললে হারানদা খাবার এনে দেয়। দশ বিশ পয়সা বখশিস পেলে লম্বা হাসে। কৃতজ্ঞতা ঝোলে মুখে। আগেও এসেছি বলে চেনে আমাদের সবাইকে।





হোটেল থেকে বেরিয়ে বা দিকে গেলে উত্তর-দক্ষিণের রাস্তাটা পূব-পশ্চিমের এই রাস্তাকে কেটেছে। ট্রাম পূব থেকে এসে দক্ষিণে বেঁকে যায়। যেখানে বেঁকে সেখানে ইন্ডিয়া হোটেল। বেশ বড়।
আর ডান দিকে গেলে সিটি কলেজের কমার্স বিভাগ। উল্টোদিকে পুকুর। পুকুরের পূব দিকে শরবতের বিখ্যাত সেই দোকানটা। পুঁটীরামের দোকান পেরিয়ে আরও একটু গেলেই কলেজ স্ট্রিট। ইউনিভার্সিটি। থৈ থৈ ছাত্র। বই। কত বই। আর ঢিল ছোঁড়া দূরে ডেটল ফিনাইলের গন্ধের মেডিক্যাল কলেজ।





..... আজও হাঁটি ওই রাস্তায়। বিকেলের রোদ মরে গিয়ে এল ই ডি কে জায়গা দেবে একটু পরেই। সেই হোটেল একই জায়গায় রয়েছে। সময়ের প্রলেপে একটু পুরোনো। এই যা। আগের মতো সংখ্যায় ট্রাম চলে না ঘন্টি বাজিয়ে। পুকুরটা ঢেকে গেছে স্টলের ভিড়ে। জনতা এক্সপ্রেস তো কবে থেকেই নেই। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে চলা সেই ইঞ্জিনগুলোও দেখি না কতদিন। হয়ত হাসনুহানাও গন্ধ ছড়ায় না আর। হারানদার মতো মিইয়ে গিয়েছে সেও।




তবু হাঁটি। হাঁটতে বড্ড ভাল লাগে যে।



No comments: