Saturday, February 25, 2023




ছায়া ছায়া চারদিক। পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে শুধু আলো।

 
পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক চারদিকের নির্জনতাকে বাড়িয়ে দেয় যেন! 

হঠাৎ ডেকে ওঠে কোনও পাখি। শিলিগুড়ি জংশন স্টেশন থেকে রেলপথে মাত্র ১৭.৭ কিমি দূরের রংটং দার্জিলিং পথের প্রথম প্রেম সেই কোন ছোট্টটি থেকে! সুকনার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে এই ছোট্ট হ্যামলেট আজও আরণ্যক। 

রংটং.....লেপচা ভাষা থেকে সৃষ্টি। `রং` বা `রাং` মানে নদী আর `টান` বা `টং`  মানে নিম্ন। অর্থাৎ নিম্নগামী নদী। 

আজকাল হঠাৎ হঠাৎ দেখা-অদেখা, যাওয়া-না যাওয়া নানা জায়গা চোখে ভেসে ওঠে। 
রংটংকে অবশ্য ছুঁয়ে এলাম কিছুদিন আগেই।

নিচে নামা নদীর জায়গা....এরকমই থেকো আরও বহু বছর। 

Wednesday, February 22, 2023


 

Ash Wednesday: যা জেনেছি 

শৌভিক রায় 


Because I do not hope to turn again
Because I do not hope
Because I do not hope to turn
Desiring this man's gift and that man's scope
I no longer strive to strive towards such things
(Why should the agèd eagle stretch its wings?)
Why should I mourn
The vanished power of the usual reign?

বলছেন টি এস এলিয়ট তাঁর Ash Wednesday কবিতায়। জীবনের অর্থহীনতা, অন্তঃসারশুন্যতা আর অবক্ষয়িত মূল্যবোধ বোধহয় তাঁকে এই কথাগুলি বলতে বাধ্য করিয়েছিল। আর অদ্ভুতভাবে এখন থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর এক অন্য যাত্রা।  

আজ, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, সেই  Ash Wednesday....আজ থেকেই শুরু হচ্ছে  Lent 

Lent খ্রীষ্টানদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কথাটি এসেছে Anglo-Saxon শব্দ lencten থেকে। ইংরেজিতে একে lengthen বলা যায়। বসন্তের দীর্ঘ দিনের সমার্থক যেন এই lengthen শব্দটি। অবশ্য সব খ্রীষ্টানরা এই Lent রাখেন না। 

Lent আসলে চল্লিশ দিনের সেই দীর্ঘ সময় যখন জিশুর অনুগামীরা উপবাস রাখেন। এই উপবাস চলে Easter অবধি। দিনগুলি তাৎপর্যপূর্ণ কেননা বলা হয়, `The forty days represents the time Jesus spent in the wilderness, enduring the temptation of Satan and preparing to begin his ministry.`

পরমেশ্বরের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সময় হল Lent .... এই বিলোনো মানে আর কিছু নয়। দীন-দরিদ্রদের জন্য নিজের সাধ্যমতো কিছু করা। কেননা জিশু রয়েছেন তাদের মধ্যেই। মাদার টেরেসার কথায় `And that is why we believe what Jesus said: I was hungry- I was naked- I was homeless -I was unwanted, unloved, uncared for - and you did it to me.` 

Ash Wednesday-এর দিন চার্চ থেকে পুণ্যার্থীদের কপালে ছাই দিয়ে ক্রস এঁকে দেওয়া হয়। পাপ ও মৃত্যুকে বোঝায় সেই চিহ্ন। কোনও নির্দিষ্ট তারিখে নয়, দিনটি এক এক বছর এক এক দিনে পালিত হয়। Good Friday, Easter ইত্যাদির মতো শোকের ঘটনার শুরু যেন এই দিনটি। কিন্তু তাতেও রয়েছে আনন্দের সুর। আসলে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে ঐশ্বরিক আনন্দ আছে তার তুল্য কিছু আছে কি? 

এলিয়ট যেমন নিজের এক অন্য যাত্রা শুরু করেছিলেন, ঠিক তেমনি হয়ত Ash Wednesday থেকে কেউ কেউ আজও শুরু করেন অন্যভাবে বাঁচতে। আসলে এলিয়টের কথাতেই In my beginning is my end হলেও জীবন তো বৃত্তাকার। আর সেই বৃত্তাকার জীবন শূন্য থেকে শুরু হয়ে শূন্যে শেষ হলেও, মাঝে রয়ে যায় কত কী! যে বোঝে সে নিজস্ব আত্মিক যাত্রায় নিজেকে স্থাপন করে অন্য এক আলোর জগতে। আমার মতো যারা সেটা পারে না, তারা রয়ে যায় অন্ধকারেই....  

ছবি- ১৮৬৮ সালে নির্মিত কলকাতার সেন্ট জেমস চার্চ (জোড়া গির্জা)


 

Saturday, February 18, 2023

 


পাচার 

শৌভিক রায় 

সাধুকে দেখে আজও অনন্ত হাত জোড় করল। সাধু মহারাজ হাসলেন। সেই রহস্যময় হাসি। 

উনি কথা বলেন না। চুপ থাকেন। অথবা হাসেন। অনন্তর খুব একটা ইচ্ছে ছিল না সাধুকে এখানে থাকতে দিতে। কিন্তু কিছু করার নেই। তবু বেশ কিছুদিন নজর রেখেছিল সে। বলা যায় না কে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসে! তবে এখন আর সাধুকে সন্দেহ হয় না।  

যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি। নদী দেখা যায় না! এই দুপুর রোদে সেই বালিতে পা টেনে টেনে হেঁটে এসেছে অনন্ত। কষ্ট যা, তা এই শীতের শুরু থেকে! চলবে গ্রীষ্মের শেষ অবধি। তারপর বর্ষা এলে খানিকটা রেহাই। নদী থাকবে খুব কাছে। জলও থাকবে প্রচুর। যত জল তত সুবিধে। 

ঠিক কতদিন থেকে এই কাজ করছে অনন্ত? এখন আর মনে পড়ে না। আগে হিসেবে-টিসেব করত। যেদিন থেকে লাভলি চলে গেছে, সেদিন থেকে ওসব হিসেবে তার জীবন থেকে বাদ দিয়েছে সে। লাভলির কথা মনে পড়লেই শরীরে এখনও কেমন একটা হয়। অথচ লাভলি তাকে কোনোদিন শরীর ছুঁতে পর্যন্ত দেয়নি। 

বিয়েটা করেছিল বাড়ির চাপাচাপিতে। অনন্তর বাপের চিরদিনের ধারণা ছিল বাউন্ডুলে অনন্তকে বাঁধতে পারবে বৌ। তাই পাকাপোক্তভাবে নিজের কাজ অনন্তর হাতে তুলে দেওয়ার আগে তার বিয়েটা দেওয়া জরুরি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। 

তখনও বর্ডারে সেভাবে কাঁটাতার বসেনি। সানিয়াজানেও ভর্তি জল আর কালো কালো পাবদা মাছ। ওপার থেকে এপারে সহজেই আসা যায়। যাওয়া যায়ও অনায়াসে। কিন্তু সময় পাল্টাচ্ছিল দ্রুত। অনেকে সেটা বুঝলেও, অনন্তর বাপ তেমন গা করেনি। একইভাবে ব্যবসা চালাচ্ছিল। ফল যা হওয়ার তাই হল। একদিন বিএসএফ বাপকে তুলে নিয়ে গেল। সেই যে গেল আর তার হদিশ পাওয়া গেল না। থানা পুলিশ মামলা মোকদ্দমা সব শেষে অনন্ত একদিন দেখল তার বাপের নামের আগে `মৃত' বসে গেছে। আর এসব চক্করের ফাঁকে টুক করে লাভলিও কেটে পড়েছে বাড়ি ছেড়ে।  

বাপ নিখোঁজ। বৌ ভেগেছে। এই দুইয়ের ধাক্কায় অনন্তর টালমাটাল দশা হওয়ার কথা। 

কিন্তু সে হল না। লাভলি যে থাকবে না, সেটা অনন্ত বুঝেছিল। ফুলশয্যার রাতেই লাভলি স্পষ্ট জানিয়েছিল, তাকে ধরা-টরা যাবে না। রাগ হলেও, অনন্ত সামলে নিয়েছিল। বাউন্ডুলেপনা করে দুটো জিনিস সে খুব ভাল করে শিখেছিল। কাউকে কোনও বিষয়ে জোর ক`র না। তাতে লাভ হয় না। আর একটা ব্যাপার হল, কখনই নিজেকে দুঃখী ভেবো না। কেননা তোমার চাইতেও বহু সমস্যা নিয়ে লোকে বেঁচে আছে। তার তখন একটাই ভাবনা, যে ব্যবসার জন্য বাপের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, সেই ব্যবসাকে বাড়ানো। সবাই মানা করলেও, তার জেদ চেপে গিয়েছিল। 

সেটাই চলছে। তখন থেকে। প্রথমে যে ব্যবসা ছিল খুব সহজ, ধীরে ধীরে কঠিন হয়েছে তা। বর্ডারে কাঁটাতার বসেছে। বাতিস্তম্ভ বেড়েছে। কড়া হয়েছে নজরদারি।কিন্তু সে দমেনি। 

অনন্ত নদীকে ধরেছিল। মাটিকে ভাগ করা গেলেও, নদীকে তো আর টুকরো করা যায় না। তার কোনও দেশও নেই। ফলে কাঁটাতার নেই নদীর ওপর। ওপারে মাল পাঠাতে, নদীর চাইতে সহজ আর কিছু নেই। তার ওপর কিছু কিছু জায়গায় নদী আর জঙ্গল মিলে এমন অবস্থা যে, দিনের বেলাতেও সেখানে বিশেষ কেউ যায় না। মাঝেমাঝে নৌকো বা লঞ্চে নদীতে পাহারা চললেও,তার স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ নয়। এই অঞ্চলে নদী ব্যবহার করে মাল পাঠানো লোকের সংখ্যা কম। যারা রয়েছে তাদের মধ্যে এক নম্বর হল অনন্ত। তাই তার কদর বেশি।    

তার মাল বলতে মূলত কাঠ। ওপারে শাল, সেগুন, গামার, কাঁঠাল ইত্যাদি কাঠের কদর বেশি। আড়কাঠিদের সাহায্যে অর্ডার আর পেমেন্ট পেয়ে যায় সে। তারপরে বাকিটা হাতযশ আর ভাগ্য। সব্বাই জানে, আজ পর্যন্ত তার পাঠানো মাল ধরা পড়েনি। 

তবে অনন্তর সেই বাউন্ডুলে স্বভাব। কোনও একটা নির্দিষ্ট মাল পাঠানোয় দীর্ঘদিন লেগে থাকা তার পোষায় না। আজকাল তাই মাঝেমাঝে অন্য মাল পাঠাচ্ছে সে। এই মালের দাম সবচেয়ে বেশি। ঠিকঠাক পাঠাতে পারলে যে পয়সা পাওয়া যায়, তা কল্পনা করা যায় না। তবে ঝক্কি বেশি। আর সবসময় পাওয়া যায় না। সুবিধে একটাই। এই মালের ডিমান্ড দুপারেই। 

যেদিন এই মালের কথা অনন্ত প্রথম শুনেছিল, সেদিন খুব অবাক হয়েছিল। লাশ নিয়েও যে ব্যবসা হতে পারে, সে স্বপ্নেও ভাবেনি কোনোদিন। রহমান বুঝিয়েছিল তাকে। জিন্দা থাকতে যে মানুষের কদর নেই, মরার পর সে হয়ে যায় লোভনীয়। ঠিকঠাক সাপ্লাই দিতে পারলে পয়সা তো পয়সা, বাজারে সম্মানও মেলে। অবশ্য সেই বাজার বাবুদের বাজার নয়। সে বাজারের নাম আর চরিত্র আলাদা। এই সম্মানটাই হল আসল। পয়সা যাবে আসবে। ও নিয়ে ভাবনা নেই। আর এত পয়সা করবেটাই বা কী সে? সংসারে কেউ নেই। লাভলি থাকলেও একটা কথা ছিল। 

আহহ.....আবার লাভলি। অনন্ত একটু গরম খেল!

কাল রাতেই খবর এসেছে একটা মাল পাওয়া গেছে। কেসটা জটিল। এমনিতে এরকম ব্যাপারে থানা-পুলিশ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুই হয়নি। যে মরেছে, সে নাকি বাঁধা মেয়েমানুষ। তাছাড়া বর্ডারের কাছে প্রত্যন্ত বলে পুলিশ এমনিতেই দায়িত্ব নিতে চায় না, তার ওপর মাঝবয়েসী মেয়েমানুষ মরলে কার কী যায় আসে! মেয়েমানুষটা যার বাঁধা ছিল সেই লোকটা বডি পুড়িয়েই ফেলত। রহমান লোকটাকে টাকা দিয়ে রাজি করিয়েছে। এখন বডি নদীতে ফেলে ওপারে পাঠানো হলেই কেল্লা ফতে। শীতের শুকনো নদীতে কীভাবে মাল কোথায় ফেললে, সেটা ওপারে যাবে সে ব্যাপারে অনন্তর চাইতে ভাল কেউ জানে না। মাল যে পথে যাবে, সেই পথের নানা জায়গায় তার লোক আছে। তারা বস্তাটাকে চিনে নেবে। জলের তলায় আটকালে বা রক্ষীদের হাতে পড়লে, ঠিক ব্যবস্থা করে ফেলবে।  

কিন্তু কাঠ পাচার আর লাশ পাচার এক নয়। লাশকে টাটকা রাখতে একটা কেমিক্যাল, কাঠের গুঁড়ো আর বরফ ব্যবহার করে অনন্ত। বড় প্লাস্টিকের বস্তায় সব ঢুকিয়ে এমন করে বস্তার মুখ বন্ধ করা হয় যাতে জল ঢুকতে না পারে। সব শেষে নিজের বিশেষ পদ্ধতিতে জলে নেমে বস্তাকে ভারী করে মাল ছাড়ে অনন্ত। বস্তার মুখ বন্ধ অবধি অনন্তর সঙ্গে কখনও তার সাগরেদ বা রহমান থাকলেও, মাল জলে ফেলার সময় কাউকে রাখে না সে। নদীর কোথায় কীভাবে মাল ফেললে সেটা পৌঁছবে ওপারে, সেটা তার নিজস্ব বিদ্যা। বাপ খানিকটা শিখিয়েছিল। বাকিটা রপ্ত করেছে সে। 

ঘাটে পৌঁছে অনন্ত দেখল রহমান বস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজ রহমানের তাড়া আছে। মাল হ্যান্ডওভার দিয়েই তাই সে চলে গেল। সাগরেদও নেই। বন্ধুর বিয়ে খেতে গেছে। পুরো ব্যাপারটাই অনন্তকে একা একা করতে হবে। 

বস্তার মুখ খোলার আগে বিড়ি ধরালো অনন্ত। হঠাৎ করেই রোদ পড়ে গেছে। হাওয়া বাড়ছে। সব খুলে শুধু হাফ প্যান্টটা পরল অনন্ত। এখন বস্তা থেকে লাশ বের করে বাকিটুকু করলেই হয়ে গেল। তার আগে গায়ে তেল মাখা দরকার। জলে নামতে হবে। তেলের ওপর দিয়ে জল চলে যাবে। ঠাণ্ডা লাগবে কম। অবশ্য তার আগেই শরীর গরম হয়ে উঠবে। কেননা একা সব করতে গেলে পরিশ্রম যথেষ্ট হবে। তার ওপর লাশ একবার বস্তা থেকে বের করা। আবার ঢোকানো। বেঁচে থাকতে মানুষের যা ওজন, মরার পর সেটা অনেকটা বেড়ে যায়। এটা বোঝে অনন্ত। 

বিড়িটা ফেলে, বালির ভেতর থেকে বোতলটা বের করে এক চুমুক দিল। এখানে একটা বোতল থাকে সবসময়। সে ছাড়া কেউ জানে না। এসব কাজে একটু না খেলে কেমন যেন লাগে। জল ছাড়া সেই তরল গলা দিয়ে নামতেই শরীর গরম হয়ে উঠল।  

অনন্তর সব গরম অবশ্য কমে গেল মুহূর্তেই। হু হু করে ছুটে আসা হাওয়া তার শরীরের ভেতর পর্যন্ত নাড়িয়ে দিল বস্তার মুখ খুলতেই। বিদ্যুতের ছোবল খেলে যেভাবে মানুষ ছিটকে যায়, সেভাবে বালির ওপর ছিটকে পড়ল অনন্ত। কুঁকড়ে গেল তার শরীর। এক অদ্ভুত প্রলাপ উঠে এলো মুখ থেকে। উদ্গত কান্না কাঁপিয়ে দিচ্ছিল তাকে। কী করবে বুঝতে পারছিল না অনন্ত। সারা শরীর বরফের চাইতেও শীতল তখন! টালমাটাল অবস্থা তার। ভেতরে ভেতরে চলছে তুমুল ভাঙচুর। 

- যা করার তাড়াতাড়ি কর। যে চলে যায় সে আর ফেরে না। লাভলি চলে গেছে। ও এখন লাশ। যদি নিজেকে সামলাতে না পারিস, তবে বিপদে পড়বি। মন শক্ত কর। জানি লাভলিকে তুই কোনোদিন ভুলিসনি। কিন্তু বাস্তব মানতে হবে। 

সাধুবাবার কথা শুনে আবার চমকে ওঠে অনন্ত। গলাটা তার ভীষণ চেনা। গায়েব হয়ে যাওয়া বাপের কি?

লাভলির লাশ, এই শীতের হাওয়া, মদের ঘোর আর নদীর জলের হালকা শব্দে সে কিছুতেই মনে করতে পারে না গলাটা কার......      


       

     


    

     


Thursday, February 16, 2023




 

চেনা দার্জিলিং 

শৌভিক রায় 


দার্জিলিং শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অনবদ্য প্যানোরামা যেখানে পাহাড়, নদী, মানুষ সবকিছু এক হয়ে যায় নিমেষে। নস্টালজিয়া প্রিয় বাঙালির সারা জীবনের ডেস্টিনেশন দার্জিলিঙের প্রেমে মাতোয়ারা হননি এমন বাঙালি দেখা যায় না। পর্যটনের হাত ধরে দীর্ঘদিন থেকেই অবশ্য দার্জিলিং সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক পর্যটন কেন্দ্র। কদর কখনই কমেনি দার্জিলিঙের। তথ্য-সংস্কৃতির এই বিস্ফোরণের যুগে দার্জিলিঙের জন্য সেই ভালবাসা আরও বেড়েছে যেন! আর সেজন্যই প্রায় প্রতিদিন দলে দলে মানুষ ছুটে আসছেন শৈলশহরে।      

ইমন সিং খেমজঙের `Brief History of Kirat Period- Bijaypur` অনুসারে পশ্চিমে ত্রিশূলী থেকে পূর্বে তিস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত কিরাতভূমি `ওয়ালো কিরাত`, `মাঝ কিরাত` ও `পল্লো কিরাত` হিসেবে বিভক্ত ছিল। আর এই পল্লো কিরাতের অংশ ছিল দার্জিলিং। ব্রিটিশ অধিগ্রহনের আগে অবধি দার্জিলিং পাহাড় মূলত সিকিমের অংশ হিসেবে বিবেচিত হত। `সিকিম` শব্দের উৎপত্তি বলতে গিয়ে ডঃ কুমার প্রধান বলছেন, এই শব্দটি এসেছে লিম্বু শব্দ `সু-খিম` বা নতুন বাড়ি থেকে। দ্বিতীয় চোগিয়াল তেনজিং নামগিয়ালের তিনজন পত্নী ছিল। তাদের একজন ছিলেন তিব্বতি, আর একজন ভুটিয়া ও তৃতীয়জন ছিলেন অরুণ উপত্যকার লিম্বু সর্দার য়ং য়াং হাঙের কন্যা। লিম্বু রাজকন্যা তার সাত সহচরীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি আসেন। সেই সাত কন্যারও স্থানীয় কাজি ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বিবাহ হয়। এই লিম্বু নারীরা নতুন জায়গায় সুখে শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে। ফলে জায়গাটির নাম হয় সু-খিম বা নতুন বাড়ি। কালক্রমে সেই সু-খিম হয়ে ওঠে সিকিম। অবশ্য 'সংখিম' অথবা 'শিং-খিম` থেকেও সিকিম শব্দের উৎপত্তির কথা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। 'শিং-খিম` বলতে বাঁশের বাড়িকে বোঝানো হয়ে থাকে। সুতরাং সিকিম বলতে বাঁশের বাড়ি বোঝানো হয় বলে মনে করেন জে আর সুব্বা, প্রফেসর রিচার্ড স্প্রিগসের মতো গবেষকরা। আবার লেপচারা নিজেদের মাতৃভূমিকে বলে থাকেন `ময়েল লিয়াং`। এই শব্দটির অর্থে কে পি তামসাং জানাচ্ছেন, পৃথিবীর স্বর্গোদ্যান বা সাংগ্রিলা যেখানে পাওয়া যায় অনন্ত শুদ্ধতা। লুকিয়ে থাকা সেই স্বর্গোদ্যানই সিকিম। তিব্বতিরা সিকিমকে জানে `দেঙজং` নামে।           

প্রাচীন তথ্য অনুযায়ী, সিকিমের পেমিয়ংচি মঠের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৩ পর্যন্ত আজকের দার্জিলিঙের  অবজারভেটরি পাহাড়ের মাথায়  সমতল ভূমির ওপর একটি মঠ বা মনাস্ট্রি তৈরি করেন। নতুন এই মঠের নামকরণ করা হয়েছিল রিনজিং দোর্জি লেগডেন লা-এর নামে। ১৭৮৮ সালে দার্জিলিঙে আবির্ভাব ঘটে গোর্খাদের। দার্জিলিঙের দখল নিয়ে মনাস্ট্রি ধ্বংস করে নিজেদের জন্য সেনা ছাউনি তৈরি করে তারা। গোর্খা কমান্ডার জোহার সিং স্থানীয় লেপ্চা প্রধান  রূপ চিরিংকে দায়িত্ব দেন কর আদায়ের। মনাস্ট্রি আবার তৈরি করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বাংলা প্রদেশের ইংরেজ গর্ভণরের আদেশে সেই মনাস্ট্রি স্থানান্তর করা হয় লেবংয়ের পথে ভুটিয়া বস্তিতে। কিন্তু লেপচা, লিম্বু, গোর্খা প্রমুখদের মধ্যে ইংরেজরা এলো কীভাবে! এখানেও একটি গল্প আছে।

 ইতিহাস বলছে, ১৭৬৮ সালে পার্বত্যজাতী গোর্খাদের চমকপ্রদ অভ্যূত্থান হয়। প্রথমদিকে লুঠতরাজের নধ্যে তারা সীমাবদ্ধ থাকলেও, দুর্ধর্ষ এই জনজাতি ক্রমে পাঞ্জাব থেকে ভূটান পর্যন্ত হিমালয়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় রাজ্যবিস্তার করে ফেলে।  গোর্খাদের ক্রমান্বয়ে বৃটিশ ভারতে অনুপ্রবেশ ও আক্রমণে তিনগরেজরা তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠে। আর তার ফলে ১৮১৪ সালে বড়লাট হেস্টিংস যুতাদের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেন। টানা দু'বছর ধরে সংঘর্ষের পর সন্ধি হয় এবং গোর্খারা কুমায়ুন, গাড়োয়াল, নেপালের তরাই, সিকিম ছাড়তে বাধ্য হয়। আরও দু'বছর বাদে ১৮১৮তে সিকিম ও নেপাল সীমান্তে বিবাদ বাঁধলে ক্যাপ্টেন লয়েড আসেন বিবাদ মেটাতে।

বিবাদ মিটে অচিরে। কিন্তু ততদিনে এই অঞ্চলটিকে লয়েডের ভাল লেগে গেছে। এখানকার মনোরম আবহাওয়া শরীরের পক্ষে অনুকূল বলে তাঁর মাথায় স্বাস্থ্যনিবাস স্থাপনের চিন্তা আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সেই প্রস্তাব দিলে, কোম্পানি প্রয়োজনীয় অনুমতি চান সিকিমের রাজার কাছে। সিকিমের রাজা এরপর উপহার হিসেবে দার্জিলিং তুলে দেন ব্রিটিশদের হাতে। ১৮২৯ সালের একটি দলিল দেখছি যাতে সিকিমের রাজার মোহর সম্বলিত এই কথাগুলি আছে- 
The Governor-General having expressed for the possession of the hill of Darjeeling on account of its cool climate, for the purpose of enabling the servants of his Government suffering from sickness to avail themselves of its advangtages, I, the Sikkimputtee Rajah, out of friendship to the said Government- General, hereby present Darjeeling to the East India Company, that is all the land south of the great Rangeet River, east of Balasun, Rahail, and Little Rangit Rivers, and the west of Rungpee and Mahanuddy Rivers. 
১৮৩৫ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি দার্জিলিং  ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয় । ক্যাপ্টেন লয়েড ও ডক্টর চ্যাপমান দার্জিলিঙের অধিকার নেন। দার্জিলিংকে জুড়ে দেওয়া হয় বেঙ্গল প্রভিন্সের সঙ্গে। এর  চারবছর পর ডক্টর ক্যাম্পবেল সুপারিন্টেডেন্ড হয়ে দার্জিলিংয়ে  আসেন ও তাঁর বাইশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে শৈলশহর  সেজে ওঠে।

তিব্বতিরা এই স্থানটিকে দোর্জিলিং ( লিং মানে বসতি বা বাড়ি বা মঠ। দোর্জিলিং অর্থাৎ যেখানে দোর্জি বাস করেন) নামে ডাকত। মনে করা হয় যে, দার্জিলিং নামের উৎস সেটাই। আবার দোর্জি বলতে বজ্রবিদ্যুৎকেও বোঝায়। তাই বজ্রবিদ্যুতের স্থান বলেও দার্জিলিং কথাটি এসেছে বলে একটি ব্যাখ্যা আছে। কেননা অবজারভেটরি পাহাড় দার্জিলিঙের সবচেয়ে উঁচু স্থান বলে এটি বজ্র ও বিদ্যুতের নাগালের মধ্যে ছিল। দার্জিলিং নামকরণের তৃতীয় মতটি এসেছে লেপচাদের `রং` ভাষা থেকে। লেপচারা মনে করেন যে, কাঞ্চনজঙ্ঘার দক্ষিণের পাহাড়ি অঞ্চল 'দার জু লিয়াং` নামে পরিচিত। এর অর্থ হল সৌন্দর্যের দেবীর স্বর্গীয় আবাসস্থল। সম্ভবত  'দার জু লিয়াং` ধীরে ধীরে দার্জিলিং-এ পরিণত হয়েছে। আবার কিরাতদের 'দুয়া লিং' থেকে দার্জিলিং-এর সৃষ্টি তত্বটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৬৩ সালের মঠ প্রতিষ্ঠার আগেও দার্জিলিং যখন কিরাতভূমির তৎকালীন সাম্রাজ্য খাম্বুয়ানের অন্তর্ভুক্ত, তখন অবজারভেটরি পাহাড়ের নিচের গুহা কিরাত রাইদের পূজার জায়গা হিসেবে বিবেচিত হত। আজও কিন্তু এই গুহায় নানারকম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চলে। 

ইতিহাস বলছে যে, প্রাক ব্রিটিশ যুগে সামান্য মঠ বা মনাস্ট্রি স্থাপনের শুরু থেকে দার্জিলিঙে অবজারভেটরি হিলসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি এটাও অনস্বীকার্য যে, আজকের দার্জিলিঙ কিন্তু মোটামুটিভাবে ব্রিটিশদের সৃষ্টি। ১৮৩৫ সালে সিকিম থেকে দার্জিলিং বিচ্ছিন্ন হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে আসে। কোম্পানির নির্দেশে লয়েড এবং ডঃ চ্যাপম্যান ১৮৩৬ সালের নভেম্বর মাসে দার্জিলিঙে আসেন। ছয় মাস দার্জিলিঙে থেকে তাঁরা ১৮৩৭ সালে রিপোর্ট দেন এবং সেই রিপোর্টে দার্জিলিংকে স্যানিটোরিয়াম করবার প্রস্তাব দেওয়া হয়। লয়েডকে লেফটেন্যান্ট কর্ণেলের পদমর্যাদা দিয়ে দার্জিলিঙে স্যানিটোরিয়াম গড়ে তোলার জন্য নিযুক্ত করা হয়। ১৮৩৮ সালে লেফটেন্যান্ট জন গিলমোর একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব দিয়ে দার্জিলিং ও তৎ সংলগ্ন এলাকার রাস্তা নির্মাণের জন্য পাঠানো হয়।  কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর জায়গা নেন রবার্ট নেপিয়ার। অবজারভেটরি হিলের ওপর একটি মনাস্ট্রি আর মাত্র ২০টি বাড়ির সেদিনের দার্জিলিঙের মূল নকশা শুরু হয়েছিল ১৮৩৯ সালে। ১৮৪২ সালের মধ্যে শিলিগুড়ির সঙ্গে যুক্ত হয় দার্জিলিং।  শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। 

আজকের দার্জিলিঙে অবজারভেটরি হিল মানে মোটামুটিভাবে ম্যালকে বোঝায়। প্রাচীন মনাস্ট্রি আর মহাকাল মন্দির নিয়ে এই অঞ্চলটি আজও দার্জিলিঙের সেরা আকর্ষণ। এখানেই শান্ত নির্জন দাঁড়িয়ে রয়েছে সেন্ট আন্ড্রুজ চার্চ। ক্যাপ্টেন বিশপের তত্বাবধানে এই চার্চের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৮৪৩ সালের নভেম্বর মাসে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল ৩০ নভেম্বর দিনটিকে। কেননা এই তারিখটি সেন্ট আন্ড্রুজের দিন বলে পরিচিত। ১৮৪৪-এ চার্চে প্রার্থনা শুরু হলেও, ১৮৬৭ সালে বজ্র বিদ্যুতের তান্ডবে (ভিন্নমতে ভূমিকম্প) আগষ্টে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় চার্চটি। শুরু হয় পুনঃনির্মাণ এবং তা শেষ হয় ১৮৭৩-এ। ১৮৭৭ থেকে শুরু হয় নিয়মিত প্রার্থনা। সেই আমলে চার্চের নির্মাণের জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ৯০০০টাকা। নামেই প্রকাশ যে, এই চার্চের 'প্যাট্রন সেন্ট' হচ্ছেন সেন্ট পিটারের ভাই সেন্ট আন্ড্রুজ যিনি  জিশুকে প্রথম থেকে ঈশ্বরের দূত বলে মেনে নিয়েছিলেন। সারা বিশ্বে খ্রীষ্টানদের একটি বড় অংশ এই চার্চের ভক্ত। ব্রিটিশদের মধ্যেও, বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের মানুষদের মধ্যে, এই চার্চের প্রভাব রয়েছে। উল্লেখ্য যে, সেই আমলের দার্জিলিঙ পাহাড়ে চা-শিল্পের সম্ভাবনা আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পরিমানে স্কটিশ টি-প্ল্যান্টার্স এসেছিলেন। ছিলেন স্কটিশ সৈন্যরাও। তাই চার্চের প্রথম কংগ্রেগেশন (ধর্মীয় সমাবেশ) হয়েছিল সেদিনের সেই স্কটিশদের নিয়েই।  ভারতের অন্যতম প্রাচীন এই চার্চটি ব্রিটিশ গথিক শিল্পশৈলীতে নির্মিত। এই শিল্পশৈলীর জন্ম মধ্যযুগে। প্রাচীন রোমান স্থাপত্যেও এই শৈলী ব্যবহার করা হত। জিশুর জন্মের ১২ শতক আগে সৃষ্ট হওয়া এই শৈলীর পুনঃ ব্যবহার দেখা যায় রেনেসাঁর সময়। আজকের দার্জিলিং শহরের চরম হৈচৈয়ের মাঝে থেকেও চার্চের গাম্ভীর্য এবং শান্ত সমাহিত ভাব মুহূর্তেই প্রশান্তি নিয়ে আসে। অতীতে চার্চে কোনও ক্লক টাওয়ার ছিল না। ভক্তদের সূর্য-ঘড়ি দেখে প্রার্থনার জন্য আসতে হত।  তবে ১৮৮৩ সালে নির্মিত ক্লিক টাওয়ার থেকে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টাধ্বনি করা শুরু হয়। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয় যে, পাইন-বার্চ-দেওদার ঘেরা ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ সেদিনের শান্ত দার্জিলিঙে চার্চের গম্ভীর ঘন্টাধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে। সেই সময় অবশ্য আর নেই। চার্চে আজ ঘড়ি বসেছে। দার্জিলিঙের ইতিহাসে সেন্ট আন্ড্রুজ চার্চের বিশেষ স্মরণীয়। কেননা এই চার্চের সঙ্গে জড়িয়ে দার্জিলিঙের অন্যতম রূপকার লেফটেন্যান্ট লয়েডের নাম ব্রোঞ্জের ফলকে খোদাই করা রয়েছে এখানে। রয়েছে শার্লট কাউন্টেস ক্যানিংয়ের নামও। শার্লট ছিলেন তদানীন্তন গভর্নর ক্যানিংয়ের স্ত্রী। রানি ভিক্টোরিয়ার সহচরী বিদুষী শার্লট ছিলেন একজন শিল্পী। ১৮৬১ সালে তিনি দার্জিলিঙে আসেন। দার্জিলিঙের রূপে মুগ্ধ শার্লট বেশ কিছু ছবিও এঁকেছিলেন। ফিরতি পথে শিলিগুড়ি এলাকায় কিছুদিন থেকে আরও ছবি অনেকবার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত শার্লটকে কলকাতায় ফিরতে হয়। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মারা যান। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দার্জিলিঙের পুরোনো গোরস্থানটিও ছিল চার্চ সংলগ্ন। 

অন্যদিকে ম্যালের একদম গা লাগোয়া 'স্টেপ অ্যাসাইড' বাড়িটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। স্বরাজ পার্টি, জীবিকা ও সমাজসেবার অতিরিক্ত পরিশ্রম ও চাপে ১৯২৫ সালের শুরু থেকে দেশবন্ধুর শরীর খারাপ হতে থাকে। চিকিৎসকদের পরামর্শে ও পারিবারিক আলোচনায় ঠিক হয় যে, দার্জিলিঙ 'চেঞ্জ'-এ যাওয়ার জন্য উপুযুক্ত জায়গা। ইতিমধ্যে দেশবন্ধুর পারিবারিক বন্ধু এন এন সরকার দার্জিলিঙে চৌরাস্তা বা ম্যালের খুব কাছে মিঃ বার্নসের একটি বাড়ি কিনেছিলেন। বাড়িটির সামনে দিয়ে পাহাড়ের গা ঘেষে পাকদন্ডী রাস্তা নিচে নেমে গেছে। ফলে উল্টোদিকের পাহাড়-সহ  বিস্তীর্ণ এলাকার দৃশ্যও অত্যন্ত মনোরম। 'স্টেপ অ্যাসাইড' নামের এই বাড়িটি তৈরী হয়েছিল তার আগের শতকে। ১১ই মে, ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু স্ত্রী-কন্যা সহ কলকাতা থেকে দার্জিলিঙে রওনা দেন। এন এন সরকারের নির্দেশে দার্জিলিঙে তাঁর প্রতিনিধি অনুপলাল গোস্বামী দেশবন্ধুকে বাড়িটিতে নিয়ে আসেন এবং তাঁর দেখভাল ও সুশ্রষায় নিযুক্ত হন। 'স্টেপ অ্যাসাইড' নামের এই বাড়িটি কিন্তু ততদিনে সম্পূর্ণ অন্য একটি কারণে খানিকটা পরিচিতি লাভ করেছিল। ১৯০৯ সালের ৮ই মে এই বাড়িতে পূর্ববঙ্গের সর্ববৃহৎ জমিদারির ভাওয়ালের অধিপতি রমেন্দ্রনারায়ণ রায় দেহত্যাগ করেন। তাঁর শবদেহ দাহ করবার জন্য কাছের এক শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কোনো রহস্যময়ভাবে সেই দেহ নিখোঁজ হয়ে যায়। এই ঘটনার ১২ বছর পর অর্থাৎ ১৯২১ সাল নাগাদ ঢাকায় এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হয়। তিনি নিজেকে রমেন্দ্রনারায়ণ রায় বলে পরিচয় দেন। এরপর শুরু হয় আইনি লড়াই। ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এই মামলা ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা নামে খ্যাত যেখানে শেষ পর্যন্ত ১৯৩৭ সালে সন্ন্যাসীর জয় হয়। 'স্টেপ অ্যাসাইড'-এ যখন দেশবন্ধু আসেন তখন এই মামলা দানা বাঁধছে বলে এই বাড়িটির দিকে অনেকের নজর ছিল। দেশবন্ধুর আগমনে তা আরও গুরুত্ব পায়। ১৯২৫ সালে গান্ধীজি দেশবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে দার্জিলিঙে আসেন। এটিই গান্ধীজির একমাত্র দার্জিলিঙে সফর।শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং অবধি ৮০ কিমির পথে গান্ধীজি রিকশা ও গরুর গাড়ি ব্যবহার করলেও, অধিকাংশ সময় পায়ে হেঁটেই আসেন। দেশবন্ধু নিজে জানিয়েছেন যে, দার্জিলিং পাহাড়ের অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য পায়ে হেঁটে ছাড়া উপভোগ করা যাবে না বুঝে গান্ধীজি পায়ে হাঁটবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জুন মাসের ৪ তারিখ থেকে ৯ তারিখ অবধি  'স্টেপ অ্যাসাইড'-এ দেশবন্ধু ও গান্ধীজির একসঙ্গে থাকা ও আলোচনা নিশ্চয়ই ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই একই সময় অ্যানি বেসান্তও  দেশবন্ধুর কাছে আসেন। সেই সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টি 'কমলওয়েলথ অফ ইন্ডিয়া বিল` আনবার প্রচেষ্টা করছিল। সেই সংক্রান্ত আলোচনার জন্য অ্যানি বেসান্তের দার্জিলিঙে আগমন ও 'স্টেপ অ্যাসাইড'-এ পা রাখা প্রমান করে যে, এই বাড়িটি-সহ দার্জিলিং তখন স্বাধীনতা-সংগ্রামের অন্য ঠিকানা হয়ে উঠেছিল। দার্জিলিঙের আবহাওয়ায় দেশবন্ধু খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু গান্ধীজি ও অ্যানি বেসান্ত ফিরে যাওয়ার পরে পরেই, ১৪ই জুন, তিনি হঠাৎই  গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং  মাত্র দুদিন পর অর্থাৎ ১৬ই জুন বিকেল ৫টা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়। দেশব্যাপী প্রবল শোকের মধ্যে তাঁর মরদেহ কলকাতায় আনা হয়। দেশবন্ধুর গুণমুগ্ধ শোকার্ত গান্ধীজি কলকাতায় ছুটে আসেন ও তাঁর অন্তিম যাত্রার নেতৃত্ব দেন। সবমিলে 'স্টেপ অ্যাসাইড' ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর ১৯৫৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন রাজ্যপাল হরেন্দ্রকুমার মুখার্জির নেতৃত্বে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন মেমোরিয়াল সোসাইটি গঠিত হয়। দেশবন্ধুর স্মৃতিরক্ষা করা ছাড়াও এই সোসাইটি বিভিন্ন জনহিতকর কাজে নিযুক্ত হয়। ১৯৫৪ সালে এন এন সরকারের পুত্র আর এন সরকার দার্জিলিঙের  'স্টেপ অ্যাসাইড' বাড়িটি সোসাইটির হাতে তুলে দেন। এই বাড়ির দোতলার যে ঘরে দেশবন্ধু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সেই ঘরটি আজ মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে। দেশবন্ধুর ব্যবহৃত সামগ্রী সেখানে সযত্নে রক্ষিত। নিচতলায় দেশবন্ধুর নামাঙ্কিত মাতৃত্ব ও শিশু কল্যাণ ক্লিনিক স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সহযোগিতায় নিরলস কাজ করে চলেছে। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই ক্লিনিকটি বর্তমানে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের অন্যতম ভরসা।  অন্যদিকে দার্জিলিঙের এইচ ডি লামা রোডে ব্রিটিশদের পরিচালিত 'কার্লটন হোটেল'টি ১৯৫৮ সালে অধিগ্রহণ ক`রে একটি গ্রন্থাগার তৈরী করা হয়। ১৯৭৫ সালে গ্রন্থাগারটিকে 'দেশবন্ধু জেলা সরকারি গ্রন্থাগার'-এ রূপান্তরিত করা হয়। দেশবন্ধুর নামাঙ্কিত ৮১৬০ বর্গা ফুটের এই গ্রন্থাগারটি দার্জিলিঙের ইতিহাস, পর্যটন, হিমালয়, চা-শিল্প ইত্যাদি সংক্রান্ত বহু গ্রন্থে সমৃদ্ধ। একটি বিস্তীর্ন অঞ্চলে জ্ঞানের আলো প্রদানে হীরক জয়ন্তীতে পৌঁছে যাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের নামের জন্য দেশবন্ধুর নাম ব্যবহার করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা তিনি শুধু স্বাধীনতা-সংগ্রামী ও আইজীবি ছিলেন না, ছিলেন মানবদরদী এক কবিও। দার্জিনিঙের অকল্যান্ড রোডে ক্যাথলিন কট নামের বাড়িটি কিনতে চেয়েছিলেন দেশবন্ধু। ভেবেছিলেন দার্জিলিং তাঁর অন্য ঠিকানা হয়ে উঠবে। অকালপ্রয়াণ তাঁর সে আশা পূরণ না করলেও, 'স্টেপ অ্যাসাইড'-এ আজও তাঁর উপস্থিতি যেন ছড়িয়ে আছে। গান্ধীজি দেশবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন যে, তিনি সারাজীবন মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করেন নি, 'স্বরাজ' চাওয়া ছাড়া ইংরেজদের অন্য কোনোরকম ক্ষতির কথা স্বপ্নেও ভাবতেন না। তাঁর স্বপ্ন ও ধ্যানজ্ঞান ছিল দেশের সাধারণ মানুষ। তাঁর জন্ম-সার্ধশতবর্ষে  সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রকৃত দেশবন্ধুর মতো কাজ করে চলেছে তাঁর স্মৃতিধন্য 'স্টেপ অ্যাসাইড'। 

অবজারভেটরি হিলসের কাছেই থাকা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউ ১৯৫৪ সালের ৪ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। তেনজিং নোরগের  সাফল্যে উজ্জীবিত ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত নেহেরু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় দার্জিলিঙে এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের উদ্যোগ নেন। তেনজিংয়ের সাফল্যে এই দুই দিকপালের মনে হয়েছিল  যে, নবীন প্রজন্মের মধ্যে যদি এই সাফল্যকে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তবে আখেরে দেশেরই হিতসাধন হবে। সেই উদ্দেশ্যেই দার্জিলিঙের লেবং রোডের রায় ভিলায় প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। এখানে  উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই বাড়িটিতে সিস্টার নিবেদিতা কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে বার্চ হিলে, আজকের জায়গায়, প্রতিষ্ঠানকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়। বর্তমান দার্জিলিঙের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই প্রতিষ্ঠান থেকে ইতিমধ্যে বিদেশী-সহ ৫০,০০০ অভিযাত্রী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত স্বয়ং তেনজিং দায়িত্ব সামলেছিলেন। পরবর্তীতে বিখ্যাত পর্বতারোহী নওয়াং গোম্বু, দর্জি লাটু, নিমা তাশি প্রমুখেরা নানাভাবে প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেন। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক বিদ্যালয়, শেরপা প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ধরণের 'সুইস' শৈলীর বাড়ির পাশাপাশি রয়েছে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ প্রদর্শনশালা যেখানে তেনজিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন অভিযাত্রীদের ব্যবহার করা পর্বতারোহণের সামগ্রী রক্ষিত। এটি দেশের মধ্যে পর্বতারোহণ বিষয়ক সবচেয়ে প্রাচীন প্রদর্শনশালা।প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারটিও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। পর্বতারোহন তো বটেই, হিমালয়ের প্রকৃতি নিয়েও দুষ্প্রাপ্য বই নিঃসন্দেহে গ্রন্থাগারটির সম্পদ। প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাগৃহের নামকরণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ তথা ভারতীয় পর্বতারোহণের প্রবাদপুরুষ নরেন্দ্র ধর জালালের নামে। উচ্চতায় ৫০ ফিট ও দৈর্ঘ্যে ২০ ফিট দেওয়াল-সহ কাছের 'তেনজিং' ও 'গোম্বু রক'-এও চলে প্রশিক্ষণ। আটাশ দিনের প্রাথমিক কোর্সের সঙ্গে রয়েছে 'অ্যাডভান্স' কোর্স, 'রক ক্লাইম্বিং', 'ট্রেকিং' ও 'ওয়াটার স্পোর্টস'ও। এবাদেও দার্জিলিঙে নানা ধরণের সমাজসেবামূলক কাজে প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহন তাকে আলাদা  করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্লাইম্বিং ও মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনের নয়নের মণি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে দেরি হয় নি প্রতিষ্ঠানের। তাই পর্যটকের  সঙ্গে সঙ্গে অভিযাত্রী হতে ইচ্ছুক মানুষের ঢল নামে এখানে। 

বিশ্ববিখ্যাত এই প্রতিষ্ঠান লাগোয়া  হিমালয়ান জুলজিকাল পার্ক। অবশ্য এর পরিচিতি পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকাল পার্ক হিসেবে।  ১৯৫৮ সালের ১৪ই অগাস্ট এই পার্কের পথ চলা শুরু। কবি সরোজিনী নাইডুর কন্যা পদ্মজা নাইডুর নামে নামাঙ্কিত এই পার্ক উত্তরবঙ্গ তো বটেই, সারা ভারতের গর্ব।পদ্মজা নাইডু ছিলেন নিজাম-শাসিত হায়দ্রাবাদে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অন্যতম স্থপতি। স্বাধীনতার পর ১৯৫৬ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল নিযুক্ত হন। ভারতীয় রেড ক্রসের কাজও সামলেছিলেন তিনি। নেহেরু পরিবারের ঘনিষ্ঠ পদ্মজা নাইডুর রক্তে বাঙালি রক্ত প্রবাহিত ছিল মায়ের দিক থেকে। ভারতের নাইটিঙ্গেল বলে পরিচিত তাঁর মা সরোজিনী নাইডু আসলে বাঙালি ছিলেন। পদ্মজা নাইডু ১৯৭৫ সালে দেহত্যাগ করেন। তাই তাঁর নামে হিমালয়ান জুলজিকাল পার্কের  নামকরণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।  পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা বিভাগ ও ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও কারিগরি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ৭০০০ ফিট উচ্চতার এই পার্ক গড়ে উঠেছিল।  ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে পার্কটিকে পশ্চিমবঙ্গ সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন এক্টের আওতায় এনে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার যৌথভাবে এর ব্যয়ভারের দায়িত্ব নেয়। ১৯৯৩ সালে সোসাইটিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তরের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দিক থেকেও পরিবেশ ও বন মন্ত্রক দায়িত্ব তুলে নেয়। কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে চলা পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকাল পার্ক সমগ্র ভারতে অনন্য। এরকম পার্কের উদাহরণ সারা বিশ্বে অত্যন্ত কম। ইতিমধ্যে ৬৭.৫ একরের  পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকাল পার্ক ২০১৪ সালে সারা বিশ্বের ৩০০ চিড়িয়াখানার মধ্যে 'দ্য আর্থ হিরো' সম্মানে সম্মানিত হয়েছে। পার্কে ছড়িয়ে আছে দুই শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ। একশো বছরের পুরোনো ওক গাছ পার্কের গর্বের বিষয়। অর্কিড রয়েছে ৬০ প্রজাতির বেশি। তুষারচিতা, রেড পান্ডা বাদে হিমালয়ের কালো ভাল্লুক, ইয়াক, হিমালয়ান থর, চিতল হরিণ, তিব্বতী নেকড়ে , টাকিন, গড়াল, নীল গাই, শম্বর, কচ্ছপ ইত্যাদি প্রাণী ও পাহাড়ি ময়না, ম্যাকাও, প্যারাকিট ইত্যাদির মতো নানা প্রজাতির পাখি চিড়িয়াখানার আকর্ষণ। ইচ্ছে করলে  যে কেউ কোনো পশুর দেখভালের দায়িত্ব নেওয়া নিতে পারে। সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট ব্যয়ভার গ্রহণ করতে হয় শুধু। 

ম্যাল থেকে নেহেরু রোড ধরে নিচের দিকে খানিকটা নেমে দাস ষ্টুডিও পার হলেই বাতাসে ভেসে আসা মিষ্টি পাউরুটি, কেক, পাই আর কফির মিলিত গন্ধ আর বিভিন্ন গানের চেনা সুরে এক ধাক্কাতে পিছিয়ে পড়তে হয় অনেকটা। এই গন্ধে আর সুরে  ভেসে বেড়ায় বনেদিয়ানা, আভিজাত্য আর পুরোনো দার্জিলিঙ। গন্ধের উৎস খোঁজ করলে চোখে পড়বে বিখ্যাত গ্লেনারিজ। সারা বছর তো বটেই বিশেষ করে ডিসেম্বর শেষের দিকে যখন চারদিকে সান্তাক্লজের আহ্বান তখন গ্লেনারিজের টান অস্বীকার করে কে! ব্রিটিশ আমলের দার্জিলিঙ যেন থমকে আছে এখানে। সাবেকিয়ানার ছাপ পাওয়া যায়, আরও একটু এগিয়ে, ভুবনবিখ্যাত কেভেন্টার্সেও। শতবর্ষ-উত্তীর্ণ গ্লেনারিজ আর কেভেন্টার্স বাঙালির দার্জিলিং পর্বে এখনও অদ্বিতীয়। ইতিহাস বলছে সুইডেন থেকে আগত ড্যানিশ ডেয়ারি ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কেভেন্টার ১৯০৩ সালে আলিগড়ের ডেয়ারির দায়িত্ব নেন। এক বছরে মুনাফা যথেষ্ট ভাল হওয়াতে ১৯০৪ সালে সিমলা, কলকাতা ও দার্জিলিঙে কেভেন্টার্সের শাখা খোলা হয়। সফল উদ্যোগপতিকে এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। ১৯২৫ সালে কেভেন্টার্সকে লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করে ব্যবসা চলতে থাকে। চিজ, মিল্কশেক, মাখন ইত্যাদির জন্য কেভেন্টার্সের বিকল্প আর কেউ ছিল না সেদিন। এডওয়ার্ড কেভেন্টারের মৃত্যুর পর ১৯৪০ ভাইপো ওয়ার্নার কেভেন্টার হাল ধরেন ব্যবসার। কিন্তু ১৯৪৬ সালে তাঁরও  মৃত্যু হয়। এরপর মালিকানা বদলে যায়, কেভেন্টার্সের মালিক হন আর কে ডালমিয়া। কিন্তু সত্তরের দশকে এই সোনালী দিন ধূসর হয় যখন কেভেন্টার্সের দিল্লি প্লান্ট বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৫ থেকে ঘুরে দাঁড়াবার আপ্রাণ চেষ্টায় আজ কেভেন্টার্স আবার স্ব-মহিমায়। আজকের দার্জিলিং কেভেন্টার্সে ডেয়ারি জাত খাবারের পাশাপাশি স্যান্ডউইচ, বার্গার, কাটলেট ইত্যাদি সব পাওয়া যায়। ক্রিস্টমাসে থাকে স্পেশাল মেনু।  অন্যদিকে, দার্জিলিঙের অন্যতম পুরোনো কনফেকশনারি হিসেবে গ্লেনারিজের পরিচিত। স্বাধীনতার আগে গ্লেনারিজের মালিকানা ইতালিয়ান কনফেকশনার মিঃ ভাদোর হাতে ছিল।  তিনি জার্মান মিঃ পিলভা- কে ব্যবসার অংশীদার করলে 'ভাদো ও পিলভা' নামে পরিচিতি পায় গ্লেনারিজ।  কিন্তু পরবর্তীতে ব্যবসার সম্পূর্ণ মালিকানা চলে আসে মিঃ পিলভার হাতে এবং আগের নাম বদলে নাম হয় 'পিলভা`স'। পাউরুটি, চকোলেট, আইসক্রিম এবং মিষ্টির পাশাপাশি পিলভাতে নাচের অনুষ্ঠানও হত। পিলভাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর পিলভা ও দার্জিলিঙের আকর্ষণে সারা দেশ থেকে ব্রিটিশরা ভিড় জমাতেন। স্বাধীনতার সময় মিঃ পিলভা ভারত ছেড়ে চলে গেলে সাময়িক টালমাটাল অবস্থার পর অগাস্টিন টার্সিয়াস এডওয়ার্ড পিলভার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। নাম পাল্টায় দোকানের। যে বিল্ডিঙে পিলভা`স  অবস্থিত ছিল  সেই বিল্ডিঙের নাম অনুসারেই দোকানের নাম হয় গ্লেনারিজ। চকোলেট এক্লেয়ার্স, লেমন টার্ট, চকোলেট রোলস, জ্যাম ডাউনাটস, বেকড চিজ ম্যাকারনি ইত্যাদি-সহ ক্রিস্টমাসের বিশেষ বিশেষ খাবার তৈরিতে পারদর্শী গ্লেনারিজ আজ দার্জিলিঙের অন্যতম মুখ। কেভেন্টার্স বা গ্লেনারি দু`জায়গাতেই লেগে রয়েছে সাবেকিয়ানার স্বাদ। কাঠের সিঁড়ি, প্রাচীন আসবাব, আলো-ছায়া পরিবেশ সব মিলে সময় থমকে রয়েছে। কেভেন্টার্সের খোলা ছাত থেকে সোজা তাকালে ক্লক-টাওয়ার আর জলাপাহাড়ের দিকে চলে যাওয়া রাস্তা। গ্লেনারিজের  বিরাট বিরাট জানালা দিয়ে দার্জিলিঙের প্যানোরামা আজও মন ছোঁওয়া।

অনেকেরই অজানা, ১৯৫৯ সালের এপ্রিলে দলাই লামার তিব্বত ত্যাগ করেন। তারপরেই এই দেশে তিব্বতি শরণার্থীদের ঢল নেমেছিল। তেজপুরের নিকটবর্তী অরুণাচল প্রদেশের মিসামারি ও পশ্চিমবঙ্গের বক্সাদুয়ারে তাদের থাকবার জন্য শিবির করা হলেও ক্রমশ চাপ বাড়ছিল। তিব্বতি উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৯০০০ পৌঁছলে তাদের বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত করে উত্তর ভারতের জম্মু কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন জায়গার পাশাপাশি সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পঙ ও দার্জিলিং ইত্যাদি জায়গায় পাঠানো হয়। ইতিমধ্যেই ভারতের দুর্দান্ত গরমে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।অন্যদিকে কম (২০০) উচ্চতায় থাকবার জন্য নানা উপসর্গও দেখা দিচ্ছিল তাদের মধ্যে। তাই শরণার্থী তিব্বতিদের ভারতের নানা প্রান্তে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তে সমর্থন ছিল প্রতিটি রাজনৈতিক দলের। দার্জিলিঙের ক্ষেত্রে সেন্টার গড়ে তুলবার জন্য লেবঙের পশ্চিমে থাকা 'হার্মিটেজ' এলাকার ৩.৪৪ একর জমি লিজ নেওয়া হয়েছিল সেন্ট জোসেফ কলেজের কাছ থেকে। এই জায়গাটি মূল শহর থেকে খানিকটা দূরে হলেও যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধে নেই। তাছাড়াও এই অঞ্চলে ত্রয়োদশ দলাই লামা  ১৯১০ থেকে ১৯১২ সাল অবধি ছিলেন। তাই 'হিল সাইড' নামেও পরিচিত এই অঞ্চলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো দ্বিধা ছিল না। ১৯৫৯ সালের ২রা অক্টোবর এই সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে এখানে ছিলেন দু`জন পুরুষ ও দু`জন মহিলা। ক্রমে বেড়েছে (৩০০) তাদের সংখ্যা। বর্তমানে এই সংখ্যা ৭০০ ছুঁই ছুঁই। আজকের টিবেটান রিফুজি সেলফ হেল্প সেন্টার দেখলে বোঝা যায় না যে, শুরুর দিনগুলি কি কষ্টকর ছিল। নিজের দেশ, পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তারা বাধ্য হয়েছিলেন এমন এক দেশে আশ্রয় নিতে যে দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য, আবহাওয়া ভিন্ন। তাছাড়া কে না জানে যে, শরণার্থী জীবনে পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকবার তীব্র যন্ত্রনা বুকে পুষে নিয়ে চলতে হয় প্রতিটি মূহুর্তে। খানিকটা হলেও তা অপমানের জীবন যেন! এই জায়গা থেকে যে সংগ্রাম সেদিন শুরু হয়েছিল আজ তা পল্লবিত নানা আকারে। এই সেন্টারে তৈরী জিনিস আজ পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে পর্যন্ত। কারো ওপর নির্ভরশীল নন সেন্টারের বাসিন্দারা। ধর্মশালার অর্থনৈতিক সাহায্যও তাদের দরকার হয় না। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা তিব্বতি শরণার্থীদের ক্যাম্পের সঙ্গে এখানেই পার্থক্য দার্জিলিঙের টিবেটান রিফুজি সেলফ হেল্প সেন্টারের।

দার্জিলিং নিয়ে বলা যায় আরও অনেককিছু। বর্ধমান মহারাজের বাড়ি, লালকুঠি, জলাপাহাড়, পোস্ট-অফিস, ক্যাপিটাল থিয়েটার ইত্যাদি সবই সাবেক দার্জিলিঙের ঐতিহ্য ধরে রয়েছে। জাপানিজ পিস প্যাগোডা, বাতাসিয়া লুপ আর টয় ট্রেনে বাদেও দার্জিলিং ভাবা যায় না। আজকের পর্যটকদের মুখে যতই লামাহাটা, লেপ্চা জগৎ, রক গার্ডেন বা তিনচুলের কথা শোনা যাক না কেন ঘুম মনাস্ট্রি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্টরি মিউজিয়ামের সেই আভিজাত্য পাওয়া যাবে না। লিটিল ম্যাগের বাধ্যবাধকতার কথা মনে রেখে বিস্তৃত বর্ণনা দিচ্ছি না সেসবের। কিন্তু একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি, দার্জিলিংকে জানতে ও বুঝতে হলে আর দার্জিলিঙেয়ের আসল `ফ্লেভার` পেতে হলে জানতে হবে অতীতকে। অবশ্য যে কোনও জনপদের ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা সত্যি। আসলে ইতিহাসকে আশ্রয় করেই একটি জনপদ বড় হয়ে ওঠে। সেই ইতিহাস ধরে রাখাই আমাদের, বর্তমান প্রজন্মের, কাজ। ধারাবাহিকতার এই পরম্পরা না থাকলে, অচিরেই শেষ হয়ে যাবে সভ্যতা।

(প্রকাশিত: অপরাজিতা অর্পণ/ সম্পাদক: কুণাল নন্দী, মেখলিগঞ্জ)

Saturday, February 11, 2023

 একশো পার করেও তরুণ সে

(তরুণ নিকেতন: একটি পাইস হোটেল)

শৌভিক রায় 


খাদক বলতে যা বোঝায় সেটা নই কোনও দিনই। বরং মায়ের 'খেতে চায় না' অভিযোগটি এখন শুনি অন্যের কাছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এই সব ধ্রুপদী হোটেলগুলিতে ঢুকবার সুযোগ ছেড়ে দেব।


বলছি মহানগরের পাইস হোটেলের কথা। এদের পথ চলা কিছুটা আগে শুরু হলেও, সম্ভবত গত শতকের তিরিশের দশক থেকে তাদের নামের আগে 'পাইস' শব্দটি সেঁটে গিয়েছিল। পাইস কথাটি এসেছে পয়সা থেকে। 'পয়সা' শব্দটি আসলে সব আমলেই কম রোজগারকে বোঝায়। তাই কম রোজগেরেদের জন্য হোটেল অর্থাৎ পাইস হোটেল।


অনেকে অবশ্য বলেন রাইস থেকে পাইস এসেছে। কেননা এই হোটেলগুলি মূলত ছিল ভাত খাওয়ার। মহানগরে কেরানির কাজ করতে আসা বাবু সম্প্রদায় থেকে শুরু করে ছাত্রদল, শ্রমিক মজদুর ও অতি সাধারণ মানুষদের আশ্রয় ছিল এই হোটেলগুলি। চাটাই বিছিয়ে বসা আর কলাপাতায় খাওয়া মোটামুটি এই ছিল বৈশিষ্ট্য। কোনও মেনু চার্ট থাকবে না, রান্না হবে একেবারে ঘরোয়া আর প্রতিটি পদের জন্য গুণতে হবে আলাদা পয়সা। হ্যাঁ, কলাপাতা ও জলের জন্য মাটির ভাঁড়ের পয়সাও দিতে হবে! অতীতে মহানগরের বুকে, পূর্ব বঙ্গের রকমারি রান্নায় সিদ্ধহস্ত পাইস হোটেলের রমরমা ছিল রীতিমত ঈর্ষণীয়। দীর্ঘদিন তারা কলকাতার বুকে রাজত্ব করেছে। কিন্তু কালের নিয়মে আজ আর তাদের সেভাবে দেখা মেলে না। 


গত সপ্তাহে এরকমই এক বিখ্যাত পাইস হোটেলে ঢুকবার সুযোগ হল। ১৯১৫ সালে কুমিল্লার (অধুনা বাংলাদেশ) শ্রী তরুণ দেব 'তরুণ নিকেতন' নামে এই হোটেলটি খুলেছিলেন দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারীতে। আজ ১০০ বছর পার করেও সমান তালে চলছে সেটি। মালিকানায় রয়েছেন তৃতীয় প্রজন্ম। এর আগে কলেজ স্ট্রিট লাগোয়া ভবানী দত্ত লেনের 'স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল'-এ খাওয়ায় অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেটিও কম পুরোনো নয়। তবে সম্ভবত এই মুহূর্তে কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো পাইস হোটেল হল তরুণ নিকেতন।


একজনের খাওয়ার মতো ছোট পাথর বসানো টেবিল ও চেয়ার। জোড়া লাগালে তিনজন মোটামুটিভাবে চলে যায়। বসতেই পাতা চলে এলো। হোটেল কর্মী এসে হরেক কিসিমের পদের নাম আওড়াতে শুরু করল। দু' তিনবার শুনে মোটামুটি একটা মেনু বলা গেল। আমার চোখ তখন অবশ্য দেওয়ালে আটকানো বিভিন্ন খবরের কাগজের কাটিংয়ে। পরিবেশটাই এমন আসলে, মুহূর্তে চোখে ভেসে উঠল পুরোনো কলকাতা....


তারপর? আর কী! ঘরোয়া সুস্বাদু রান্নায় নিজেদের অর্ডার করা খাবারে মন দেওয়া। তরুণ নিকেতনের নিজস্বতা তাদের মাছের রকমারি পদ। মাংসের আইটেমেও পিছিয়ে নেই তারা। থোর চিংড়ি খেয়ে আমার অবশ্য শ্রীরামপুরের 'ভেতো'র কচুপাতা-নারকেলের মালাইকারির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।


আসলে খাবার যা-ই হোক, শতাব্দী প্রাচীন একটি হোটেলে খানিকক্ষণ থাকাটাই একটা অন্য ব্যাপার! শপিং মলের ফুড কোর্ট আর ক্যাফের বাড়বাড়ন্তেও যে পাইস হোটেলগুলি এখনও টিকে রয়েছে, তাদের ব্যাপারটাই তো আলাদা। 'তরুণ নিকেতন' এভাবেই আরও কয়েক শতাব্দী পার করে তরুণ থাক!














Wednesday, February 8, 2023

।।একটু অন্য কলকাতা।।
        শৌভিক রায়

"SILENT TEARS OF NOBLE HEARTS ARE SAYING.
I TO THEM WAS DEAR
PITYING HANDS OF FAIR YOUNG GIRLS ARE LAYING
GARLANDS ON MY BIER.
MANY A TOKEN, WHERE MY DUST REPOSES 
MARKS THE LOVED ONE'S TOMBS.
BLUE FORGET-ME-NOT, AND PALE MILD ROSES, 
CLUSTERING ROUND IT BLOOM."

না। আমার লেখা নয়। সাত জন্ম তপস্যা করেও এরকম লিখতে পারব না! 

শুধু এরকম নয়। আছে আরও বহু অসামান্য সৃজন। সবই মন খারাপ করা। বেদনার। সেগুলি পড়লে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। খুব খুব তুচ্ছ মনে হয় নিজেকে। 

এই লেখা যেখানে, তার একটু দূরেই জ্বলজ্বল করছে সেই বিখ্যাত কথাগুলি "দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে তবে তিষ্ঠ ক্ষণকাল..."। কাছেই রয়েছেন দীন দুঃখীদের আর এক ত্রাতা।

পার্ক স্ট্রিট বা ভবানীপুরের  মতো মল্লিকবাজারের সমাধিক্ষেত্রটিও বড় প্রিয় আমার। সেদিন পৌঁছে গেছিলাম ঋতভাষকে নিয়ে। 

ওপরের কবিতাটি বেথুন সাহেবের। তাঁর সমাধির ওপর উৎকীর্ণ। এখানেই শুয়ে রয়েছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও দীনবন্ধু আন্দ্রুজ। আছেন আরও কত জন! 

প্রাচীন কবরখানা আসলে ইতিহাসের অন্যতম আকর। কত কিছু থাকে সেখানে। 

একটু খোঁজ, একটু সময় আর মৃত্যুকে একটু শ্রদ্ধা......