পাচার
শৌভিক রায়
সাধুকে দেখে আজও অনন্ত হাত জোড় করল। সাধু মহারাজ হাসলেন। সেই রহস্যময় হাসি।
উনি কথা বলেন না। চুপ থাকেন। অথবা হাসেন। অনন্তর খুব একটা ইচ্ছে ছিল না সাধুকে এখানে থাকতে দিতে। কিন্তু কিছু করার নেই। তবু বেশ কিছুদিন নজর রেখেছিল সে। বলা যায় না কে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসে! তবে এখন আর সাধুকে সন্দেহ হয় না।
যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি। নদী দেখা যায় না! এই দুপুর রোদে সেই বালিতে পা টেনে টেনে হেঁটে এসেছে অনন্ত। কষ্ট যা, তা এই শীতের শুরু থেকে! চলবে গ্রীষ্মের শেষ অবধি। তারপর বর্ষা এলে খানিকটা রেহাই। নদী থাকবে খুব কাছে। জলও থাকবে প্রচুর। যত জল তত সুবিধে।
ঠিক কতদিন থেকে এই কাজ করছে অনন্ত? এখন আর মনে পড়ে না। আগে হিসেবে-টিসেব করত। যেদিন থেকে লাভলি চলে গেছে, সেদিন থেকে ওসব হিসেবে তার জীবন থেকে বাদ দিয়েছে সে। লাভলির কথা মনে পড়লেই শরীরে এখনও কেমন একটা হয়। অথচ লাভলি তাকে কোনোদিন শরীর ছুঁতে পর্যন্ত দেয়নি।
বিয়েটা করেছিল বাড়ির চাপাচাপিতে। অনন্তর বাপের চিরদিনের ধারণা ছিল বাউন্ডুলে অনন্তকে বাঁধতে পারবে বৌ। তাই পাকাপোক্তভাবে নিজের কাজ অনন্তর হাতে তুলে দেওয়ার আগে তার বিয়েটা দেওয়া জরুরি। যেমন ভাবা তেমন কাজ।
তখনও বর্ডারে সেভাবে কাঁটাতার বসেনি। সানিয়াজানেও ভর্তি জল আর কালো কালো পাবদা মাছ। ওপার থেকে এপারে সহজেই আসা যায়। যাওয়া যায়ও অনায়াসে। কিন্তু সময় পাল্টাচ্ছিল দ্রুত। অনেকে সেটা বুঝলেও, অনন্তর বাপ তেমন গা করেনি। একইভাবে ব্যবসা চালাচ্ছিল। ফল যা হওয়ার তাই হল। একদিন বিএসএফ বাপকে তুলে নিয়ে গেল। সেই যে গেল আর তার হদিশ পাওয়া গেল না। থানা পুলিশ মামলা মোকদ্দমা সব শেষে অনন্ত একদিন দেখল তার বাপের নামের আগে `মৃত' বসে গেছে। আর এসব চক্করের ফাঁকে টুক করে লাভলিও কেটে পড়েছে বাড়ি ছেড়ে।
বাপ নিখোঁজ। বৌ ভেগেছে। এই দুইয়ের ধাক্কায় অনন্তর টালমাটাল দশা হওয়ার কথা।
কিন্তু সে হল না। লাভলি যে থাকবে না, সেটা অনন্ত বুঝেছিল। ফুলশয্যার রাতেই লাভলি স্পষ্ট জানিয়েছিল, তাকে ধরা-টরা যাবে না। রাগ হলেও, অনন্ত সামলে নিয়েছিল। বাউন্ডুলেপনা করে দুটো জিনিস সে খুব ভাল করে শিখেছিল। কাউকে কোনও বিষয়ে জোর ক`র না। তাতে লাভ হয় না। আর একটা ব্যাপার হল, কখনই নিজেকে দুঃখী ভেবো না। কেননা তোমার চাইতেও বহু সমস্যা নিয়ে লোকে বেঁচে আছে। তার তখন একটাই ভাবনা, যে ব্যবসার জন্য বাপের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, সেই ব্যবসাকে বাড়ানো। সবাই মানা করলেও, তার জেদ চেপে গিয়েছিল।
সেটাই চলছে। তখন থেকে। প্রথমে যে ব্যবসা ছিল খুব সহজ, ধীরে ধীরে কঠিন হয়েছে তা। বর্ডারে কাঁটাতার বসেছে। বাতিস্তম্ভ বেড়েছে। কড়া হয়েছে নজরদারি।কিন্তু সে দমেনি।
অনন্ত নদীকে ধরেছিল। মাটিকে ভাগ করা গেলেও, নদীকে তো আর টুকরো করা যায় না। তার কোনও দেশও নেই। ফলে কাঁটাতার নেই নদীর ওপর। ওপারে মাল পাঠাতে, নদীর চাইতে সহজ আর কিছু নেই। তার ওপর কিছু কিছু জায়গায় নদী আর জঙ্গল মিলে এমন অবস্থা যে, দিনের বেলাতেও সেখানে বিশেষ কেউ যায় না। মাঝেমাঝে নৌকো বা লঞ্চে নদীতে পাহারা চললেও,তার স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ নয়। এই অঞ্চলে নদী ব্যবহার করে মাল পাঠানো লোকের সংখ্যা কম। যারা রয়েছে তাদের মধ্যে এক নম্বর হল অনন্ত। তাই তার কদর বেশি।
তার মাল বলতে মূলত কাঠ। ওপারে শাল, সেগুন, গামার, কাঁঠাল ইত্যাদি কাঠের কদর বেশি। আড়কাঠিদের সাহায্যে অর্ডার আর পেমেন্ট পেয়ে যায় সে। তারপরে বাকিটা হাতযশ আর ভাগ্য। সব্বাই জানে, আজ পর্যন্ত তার পাঠানো মাল ধরা পড়েনি।
তবে অনন্তর সেই বাউন্ডুলে স্বভাব। কোনও একটা নির্দিষ্ট মাল পাঠানোয় দীর্ঘদিন লেগে থাকা তার পোষায় না। আজকাল তাই মাঝেমাঝে অন্য মাল পাঠাচ্ছে সে। এই মালের দাম সবচেয়ে বেশি। ঠিকঠাক পাঠাতে পারলে যে পয়সা পাওয়া যায়, তা কল্পনা করা যায় না। তবে ঝক্কি বেশি। আর সবসময় পাওয়া যায় না। সুবিধে একটাই। এই মালের ডিমান্ড দুপারেই।
যেদিন এই মালের কথা অনন্ত প্রথম শুনেছিল, সেদিন খুব অবাক হয়েছিল। লাশ নিয়েও যে ব্যবসা হতে পারে, সে স্বপ্নেও ভাবেনি কোনোদিন। রহমান বুঝিয়েছিল তাকে। জিন্দা থাকতে যে মানুষের কদর নেই, মরার পর সে হয়ে যায় লোভনীয়। ঠিকঠাক সাপ্লাই দিতে পারলে পয়সা তো পয়সা, বাজারে সম্মানও মেলে। অবশ্য সেই বাজার বাবুদের বাজার নয়। সে বাজারের নাম আর চরিত্র আলাদা। এই সম্মানটাই হল আসল। পয়সা যাবে আসবে। ও নিয়ে ভাবনা নেই। আর এত পয়সা করবেটাই বা কী সে? সংসারে কেউ নেই। লাভলি থাকলেও একটা কথা ছিল।
আহহ.....আবার লাভলি। অনন্ত একটু গরম খেল!
কাল রাতেই খবর এসেছে একটা মাল পাওয়া গেছে। কেসটা জটিল। এমনিতে এরকম ব্যাপারে থানা-পুলিশ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুই হয়নি। যে মরেছে, সে নাকি বাঁধা মেয়েমানুষ। তাছাড়া বর্ডারের কাছে প্রত্যন্ত বলে পুলিশ এমনিতেই দায়িত্ব নিতে চায় না, তার ওপর মাঝবয়েসী মেয়েমানুষ মরলে কার কী যায় আসে! মেয়েমানুষটা যার বাঁধা ছিল সেই লোকটা বডি পুড়িয়েই ফেলত। রহমান লোকটাকে টাকা দিয়ে রাজি করিয়েছে। এখন বডি নদীতে ফেলে ওপারে পাঠানো হলেই কেল্লা ফতে। শীতের শুকনো নদীতে কীভাবে মাল কোথায় ফেললে, সেটা ওপারে যাবে সে ব্যাপারে অনন্তর চাইতে ভাল কেউ জানে না। মাল যে পথে যাবে, সেই পথের নানা জায়গায় তার লোক আছে। তারা বস্তাটাকে চিনে নেবে। জলের তলায় আটকালে বা রক্ষীদের হাতে পড়লে, ঠিক ব্যবস্থা করে ফেলবে।
কিন্তু কাঠ পাচার আর লাশ পাচার এক নয়। লাশকে টাটকা রাখতে একটা কেমিক্যাল, কাঠের গুঁড়ো আর বরফ ব্যবহার করে অনন্ত। বড় প্লাস্টিকের বস্তায় সব ঢুকিয়ে এমন করে বস্তার মুখ বন্ধ করা হয় যাতে জল ঢুকতে না পারে। সব শেষে নিজের বিশেষ পদ্ধতিতে জলে নেমে বস্তাকে ভারী করে মাল ছাড়ে অনন্ত। বস্তার মুখ বন্ধ অবধি অনন্তর সঙ্গে কখনও তার সাগরেদ বা রহমান থাকলেও, মাল জলে ফেলার সময় কাউকে রাখে না সে। নদীর কোথায় কীভাবে মাল ফেললে সেটা পৌঁছবে ওপারে, সেটা তার নিজস্ব বিদ্যা। বাপ খানিকটা শিখিয়েছিল। বাকিটা রপ্ত করেছে সে।
ঘাটে পৌঁছে অনন্ত দেখল রহমান বস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজ রহমানের তাড়া আছে। মাল হ্যান্ডওভার দিয়েই তাই সে চলে গেল। সাগরেদও নেই। বন্ধুর বিয়ে খেতে গেছে। পুরো ব্যাপারটাই অনন্তকে একা একা করতে হবে।
বস্তার মুখ খোলার আগে বিড়ি ধরালো অনন্ত। হঠাৎ করেই রোদ পড়ে গেছে। হাওয়া বাড়ছে। সব খুলে শুধু হাফ প্যান্টটা পরল অনন্ত। এখন বস্তা থেকে লাশ বের করে বাকিটুকু করলেই হয়ে গেল। তার আগে গায়ে তেল মাখা দরকার। জলে নামতে হবে। তেলের ওপর দিয়ে জল চলে যাবে। ঠাণ্ডা লাগবে কম। অবশ্য তার আগেই শরীর গরম হয়ে উঠবে। কেননা একা সব করতে গেলে পরিশ্রম যথেষ্ট হবে। তার ওপর লাশ একবার বস্তা থেকে বের করা। আবার ঢোকানো। বেঁচে থাকতে মানুষের যা ওজন, মরার পর সেটা অনেকটা বেড়ে যায়। এটা বোঝে অনন্ত।
বিড়িটা ফেলে, বালির ভেতর থেকে বোতলটা বের করে এক চুমুক দিল। এখানে একটা বোতল থাকে সবসময়। সে ছাড়া কেউ জানে না। এসব কাজে একটু না খেলে কেমন যেন লাগে। জল ছাড়া সেই তরল গলা দিয়ে নামতেই শরীর গরম হয়ে উঠল।
অনন্তর সব গরম অবশ্য কমে গেল মুহূর্তেই। হু হু করে ছুটে আসা হাওয়া তার শরীরের ভেতর পর্যন্ত নাড়িয়ে দিল বস্তার মুখ খুলতেই। বিদ্যুতের ছোবল খেলে যেভাবে মানুষ ছিটকে যায়, সেভাবে বালির ওপর ছিটকে পড়ল অনন্ত। কুঁকড়ে গেল তার শরীর। এক অদ্ভুত প্রলাপ উঠে এলো মুখ থেকে। উদ্গত কান্না কাঁপিয়ে দিচ্ছিল তাকে। কী করবে বুঝতে পারছিল না অনন্ত। সারা শরীর বরফের চাইতেও শীতল তখন! টালমাটাল অবস্থা তার। ভেতরে ভেতরে চলছে তুমুল ভাঙচুর।
- যা করার তাড়াতাড়ি কর। যে চলে যায় সে আর ফেরে না। লাভলি চলে গেছে। ও এখন লাশ। যদি নিজেকে সামলাতে না পারিস, তবে বিপদে পড়বি। মন শক্ত কর। জানি লাভলিকে তুই কোনোদিন ভুলিসনি। কিন্তু বাস্তব মানতে হবে।
সাধুবাবার কথা শুনে আবার চমকে ওঠে অনন্ত। গলাটা তার ভীষণ চেনা। গায়েব হয়ে যাওয়া বাপের কি?
লাভলির লাশ, এই শীতের হাওয়া, মদের ঘোর আর নদীর জলের হালকা শব্দে সে কিছুতেই মনে করতে পারে না গলাটা কার......

No comments:
Post a Comment