একশো পার করেও তরুণ সে
(তরুণ নিকেতন: একটি পাইস হোটেল)
শৌভিক রায়
খাদক বলতে যা বোঝায় সেটা নই কোনও দিনই। বরং মায়ের 'খেতে চায় না' অভিযোগটি এখন শুনি অন্যের কাছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এই সব ধ্রুপদী হোটেলগুলিতে ঢুকবার সুযোগ ছেড়ে দেব।
বলছি মহানগরের পাইস হোটেলের কথা। এদের পথ চলা কিছুটা আগে শুরু হলেও, সম্ভবত গত শতকের তিরিশের দশক থেকে তাদের নামের আগে 'পাইস' শব্দটি সেঁটে গিয়েছিল। পাইস কথাটি এসেছে পয়সা থেকে। 'পয়সা' শব্দটি আসলে সব আমলেই কম রোজগারকে বোঝায়। তাই কম রোজগেরেদের জন্য হোটেল অর্থাৎ পাইস হোটেল।
অনেকে অবশ্য বলেন রাইস থেকে পাইস এসেছে। কেননা এই হোটেলগুলি মূলত ছিল ভাত খাওয়ার। মহানগরে কেরানির কাজ করতে আসা বাবু সম্প্রদায় থেকে শুরু করে ছাত্রদল, শ্রমিক মজদুর ও অতি সাধারণ মানুষদের আশ্রয় ছিল এই হোটেলগুলি। চাটাই বিছিয়ে বসা আর কলাপাতায় খাওয়া মোটামুটি এই ছিল বৈশিষ্ট্য। কোনও মেনু চার্ট থাকবে না, রান্না হবে একেবারে ঘরোয়া আর প্রতিটি পদের জন্য গুণতে হবে আলাদা পয়সা। হ্যাঁ, কলাপাতা ও জলের জন্য মাটির ভাঁড়ের পয়সাও দিতে হবে! অতীতে মহানগরের বুকে, পূর্ব বঙ্গের রকমারি রান্নায় সিদ্ধহস্ত পাইস হোটেলের রমরমা ছিল রীতিমত ঈর্ষণীয়। দীর্ঘদিন তারা কলকাতার বুকে রাজত্ব করেছে। কিন্তু কালের নিয়মে আজ আর তাদের সেভাবে দেখা মেলে না।
গত সপ্তাহে এরকমই এক বিখ্যাত পাইস হোটেলে ঢুকবার সুযোগ হল। ১৯১৫ সালে কুমিল্লার (অধুনা বাংলাদেশ) শ্রী তরুণ দেব 'তরুণ নিকেতন' নামে এই হোটেলটি খুলেছিলেন দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারীতে। আজ ১০০ বছর পার করেও সমান তালে চলছে সেটি। মালিকানায় রয়েছেন তৃতীয় প্রজন্ম। এর আগে কলেজ স্ট্রিট লাগোয়া ভবানী দত্ত লেনের 'স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল'-এ খাওয়ায় অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেটিও কম পুরোনো নয়। তবে সম্ভবত এই মুহূর্তে কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো পাইস হোটেল হল তরুণ নিকেতন।
একজনের খাওয়ার মতো ছোট পাথর বসানো টেবিল ও চেয়ার। জোড়া লাগালে তিনজন মোটামুটিভাবে চলে যায়। বসতেই পাতা চলে এলো। হোটেল কর্মী এসে হরেক কিসিমের পদের নাম আওড়াতে শুরু করল। দু' তিনবার শুনে মোটামুটি একটা মেনু বলা গেল। আমার চোখ তখন অবশ্য দেওয়ালে আটকানো বিভিন্ন খবরের কাগজের কাটিংয়ে। পরিবেশটাই এমন আসলে, মুহূর্তে চোখে ভেসে উঠল পুরোনো কলকাতা....
তারপর? আর কী! ঘরোয়া সুস্বাদু রান্নায় নিজেদের অর্ডার করা খাবারে মন দেওয়া। তরুণ নিকেতনের নিজস্বতা তাদের মাছের রকমারি পদ। মাংসের আইটেমেও পিছিয়ে নেই তারা। থোর চিংড়ি খেয়ে আমার অবশ্য শ্রীরামপুরের 'ভেতো'র কচুপাতা-নারকেলের মালাইকারির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।
আসলে খাবার যা-ই হোক, শতাব্দী প্রাচীন একটি হোটেলে খানিকক্ষণ থাকাটাই একটা অন্য ব্যাপার! শপিং মলের ফুড কোর্ট আর ক্যাফের বাড়বাড়ন্তেও যে পাইস হোটেলগুলি এখনও টিকে রয়েছে, তাদের ব্যাপারটাই তো আলাদা। 'তরুণ নিকেতন' এভাবেই আরও কয়েক শতাব্দী পার করে তরুণ থাক!







No comments:
Post a Comment