Sunday, January 29, 2023


 

আজকের (২৯ জানুয়ারি, ২০২৩) উত্তরবঙ্গ সংবাদের রংদার রোববারের ট্রাভেল ব্লগে প্রকাশিত একটি লেখা। সঙ্গে কিছু ছবি মানস অভয়ারণ্য ভ্রমণের। ছবিগুলি আমার নিজের ও পুত্র ঋতভাষের তোলা।    

মনের মাঝে মানস থাকে 
শৌভিক রায় 

এভাবে যে ময়ূরেরা দল বেঁধে সর্ষে ক্ষেতে ঘুরে বেড়াতে পারে, তা কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ ফুলের মাঝে তাই নীল ময়ূরদের দেখে থমকে দাঁড়াই। আমার বাঁ দিকে মানস টাইগার রিজার্ভের গভীর জঙ্গল। বৈদ্যুতিক তার দেওয়া আছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর কোন তার কবে পাখিদের আটকাতে পেরেছে! অরণ্য থেকে তারা উড়ে আসছে ঝাঁক বেঁধে। কেউ কাঁটাওয়ালা কুল গাছে বসে দিব্যি কুল খাচ্ছে, কেউ আবার আপন মনেই এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। 


খানিক আগে বেঁকি নদীতে সূর্যাস্ত দেখেছি। এখন চলে এসেছি একদম উল্টোদিকে। অরণ্য এখানে আদিম। তবে ডানদিকে সভ্যতার ছোঁওয়া ওই সর্ষে ক্ষেত।  শীত সন্ধে ঝপ করে নেমে এলো।  ভাবলাম, খানিকটা পথ হেঁটে যাই। হল না। অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন অরণ্যপ্রহরীরা। খুব বিনীতভাবে বললেন, কোনওভাবেই যেন হেঁটে না বেড়াই। অরণ্যের নিয়ম না মানলে বিপদে পড়তে হবে। তাই ফিরতি পথ ধরলাম। আসবার সময় দেখেছি বন দপ্তরের তিন কুনকি হাতি জঙ্গলের ভেতর মহানন্দে গাছপালা খাচ্ছিল। বোধহয় নৈশ আহার। ফেরার পথেও ডালপালা ভাঙার আওয়াজে বুঝলাম ওদের এখনও খাওয়া শেষ হয়নি। 

রাতে থাকছি নেচার ক্যাম্পে। আগুনে শরীর সেঁকতে সেঁকতে স্থানীয় প্রবীণ গুণমণি ফুকন জানালেন, তাদের বিশ্বাস সর্প দেবী মনসার কাছে থেকে প্রবাহিত হয়েছে মানাহ নামের নদী। দীর্ঘ পথ সে বয়ে এসেছে তিব্বত ও  ভুটান হয়ে। এই এলাকায় একটি গুহায় একসময় মনসা দেবীর পুজোও করা হত। সেই থেকেই এই বনাঞ্চল মানস নামে পরিচিত। তবে অনেকে বলেন, নদীটি  হিমালয়ের মানস হ্রদ থেকে ব্রহ্মপুত্রের মতোই প্রবাহিত হয়েছে। যোগীঘোপায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মেশা পর্যন্ত ভারতের ওপর দিয়ে ১০৪ কিমি পরিক্রমা সেরেছে সে। সঙ্গে ভারত ও ভুটানকে আলাদা করেছে। তবে ভারতে ঢুকে বেঁকি ও হাকোয়া নামে দুভাগে ভাগ হয়েছে সে। নীল জলের নদীটি তার আশেপাশে ঘন অরণ্য আর মাথায় পাহাড় নিয়ে এত সুন্দরী যে বলে বোঝানো যায় না!  


বেশ ভোরে গাইড উমেশ দাসের সঙ্গে জিপ সাফারিতে বেরিয়ে পড়া গেল। শীতের কুয়াশা মাখা অরণ্য। তার সৌন্দর্য না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না। খানিকটা যেতে একেবারে হাতের নাগালে বুনো মোষ দেখে চমৎকৃত হলাম। কী রাজসিক চেহারা! ঘোর লেগে গেল! খানিক বাদেই দেখি পথ আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইসনের দল। সংখ্যায় বহু। পিছিয়ে এলো জিপ। বাইসনকে সমীহ করতেই হয়। রাস্তা পরিষ্কার হলে আবার এগোনো। জঙ্গল বেশ গভীর। ঝুঁকে থাকা গাছের ডালপালা মাথা স্পর্শ করছে। শাল, শিরিষ, শিমুল, গামার, খয়ের, অর্জুন, বহেরা, সিদা, কাঞ্চন ইত্যাদি গাছ দেখা যাচ্ছে চারদিকে। মাঝে মাঝেই চলে আসছে ময়ূরের দল। কেউ আবার একা  বসে রয়েছে ডালে। হঠাৎ চোখে পড়ল একজোড়া গণ্ডার। আমাদের একদম পাশে। এত মগ্ন যে, ফিরেও তাকালো না। মন খুশি হয়ে উঠল। ইউনেস্কোর  ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় থাকা বিশ্বের অন্যতম সুন্দর মানসে এসে গণ্ডার না দেখতে পেলে মন খারাপ হত বৈকি!

পরপর বার্কিং ডিয়ার আর  শম্বর হরিণ পাওয়া গেল। দুজনেই ব্যস্ত। তবে শম্বরটি ছবি তোলার জন্য বেশ পোজ দিল। খানিকটা এগিয়ে গাইড গাড়ি থামিয়ে দেখালেন জায়ান্ট স্কুইরেল। মাথার ওপর গাছের ডালে দিব্যি বসে রয়েছে। এর মধ্যেই ড্রাইভার আবিষ্কার করলেন বালির ওপর বাঘের পায়ের ছাপ। একদম টাটকা। খানিকক্ষণ দমবন্ধ করা বৃথা অপেক্ষা করা হল। গাড়ি থেকে নামা বারণ। চারপাশে তন্নতন্ন করে দেখেও কিছুই পাওয়া গেল না। তবে সঙ্গিনীকে নিয়ে উড়ে এলো একটি স্কারলেট মিনিভেট। তার ছবি তোলা হলেও, সঙ্গিনী ক্যামেরায় ধরা দিল না। নিরাশ করল না ক্রেস্টেড হকটিও। গাছের উঁচু ডালে বসে ধ্যানমগ্ন সে। কিন্তু  দেখা পেলাম না মানসের বিখ্যাত পিগমি হগের। এমনিতে অবশ্য এখানে রয়েছে ৫৫ ধরণের স্তন্যপায়ী প্রাণী ও  ৪৫০ প্রজাতির পাখি সহ ৫০ ধরণের সরীসৃপ।  কিছু কিছু বিলুপ্তপ্রায়। সাফারির শেষে জঙ্গলের গভীরে মানস নদীর ধারে দেখা গেল একঝাঁক হর্নবিল। পাশে রয়েছে বেশ কিছু পরিযায়ীও। 

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টার বেশি থাকা যায় না জঙ্গলে। আগে সারাদিন সাফারি করা যেত। আপাতত সেটা বন্ধ। তাই উপায় নেই। ফিরতে হল। পেছনে পড়ে রইল সবুজ বনানী আর প্রাণীরা। অবাধে বিচরণ করুক তারা। তাদের জগতে বেশিক্ষণ থাকা মানে তাদের বিরক্ত করা। তার চেয়ে এই ভাল। যা দেখলাম, যেটুকু দেখলাম মানস অভয়ারণ্যে এসে, সেটি কম কীসে! ফিরে চলি তাই আরণ্যক স্মৃতি নিয়ে। 




















 

Wednesday, January 25, 2023




শুধুই পুজো? নাকি অন্য স্বাধীনতা?  
বিষয়: মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজো
শৌভিক রায় 

একটি সরস্বতী পুজো আর তাকে ঘিরে একটি মিশনারি বিদ্যালয়ের টালমাটাল ভবিষ্যত...
এরকম উদাহরণ কি রয়েছে? 
রয়েছে।  কোচবিহার জেলার যে বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজো অত্যন্ত নাম করা, সেই মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় সম্ভবত শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দুর্ভাগ্য, অনেকেই জানেন না সে ইতিহাস।

মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় অতীতে সুইডিশ মিশন নামে পরিচিত ছিল। কেননা তখন সুইডিশ মিশনারিরা এই বিদ্যালয়ের পরিচালনা করতেন। ১৯২৪ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি উত্তাল দুই বছর কাটিয়েছিল ১৯৪৭-৪৮ সালে। দেশভাগের জন্য শহর কোচবিহারে শরণার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাদের স্থান হয়েছিল বিদ্যালয়ের আটচালা ঘরে। সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ের কাজ চলছিল সকালবেলায় প্রতিবেশী জেঙ্কিন্স স্কুলে। বিদ্যালয়ের দুই ছাত্র ইয়াকুব ও ইয়াসিনের নেতৃত্বে পাকিস্তানের স্বপক্ষে শহরে মিছিলও পরিক্রমা করেছিল। সব মিলে সুইডিশ মিশনারিদের পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না। তাঁরা শর্তসাপেক্ষে কোচবিহার স্টেস্টের কাছে বিদ্যালয়টি হস্তান্তর করতে চাইলেন। সুইডেনের হোম-বোর্ডও বিদ্যালয়ের অনুদান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল।  বিদ্যালয়ের সর্বেসর্বা A. W. BRANDT চিঠি দিয়ে জানালেও স্টেট দায়িত্ব নিতে রাজি হল না।  

এই টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৮ সালের ১৯ শে জানুয়ারি ছাত্ররা বিদ্যালয়ের ভেতর সরস্বতী পুজো করবার আবেদন জানালেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সতীশচন্দ্র ভৌমিক আবেদন পত্র পাঠালেন  A. W. BRANDT-এর কাছে। অবধারিতভাবে আপত্তি এলো তাঁদের দিক থেকে। কিন্তু তখন ছাত্ররা খেপে উঠেছে। প্রাক্তন ছাত্র ও প্রখ্যাত কবি প্রয়াত সনৎ চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, 'স্কুলে শতকরা আশি ছেলেই হিন্দু, তারা দাবী তুলেছে সরস্বতী পুজো করবে। সঙ্গে মুসলমান ছেলেরাও আছে। অন্যদিকে সুইডিশ মিশনের কর্মকর্তারা পুজো করতে দেবেন না। ছাত্র বিক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলো।  শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিলেন। এত সব কাণ্ডের সময় আমি বাগানে আছি। যেদিন বাগান থেকে হোস্টেলে এলাম, সেদিন স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমি হতবাক। সারা স্কুলের মাঠে কাগজের টুকরো। একটা কাগজের টুকরো তুলে দেখি আমাদের পাঠ্য বাইবেল ছেঁড়া হয়েছে। খুব খারাপ লাগল।` এরকম অবস্থায় A. W. BRANDT ও মিশন প্রতিনিধি JOHN A ROY-এর  আপত্তি লিপিবদ্ধ করেও পরিচালন সমিতি পুজো করবার অনুমতি দিল।  

কিন্তু মিশনারিরা এই ব্যাপারটি যে ভালভাবে নেন নি তার প্রমান পাওয়া গেল  ২১ জানুয়ারি। পদত্যাগপত্র গেল পরিচালন সমিতির কাছে। কিন্তু সেটি গৃহীত না হওয়ায় আবার মার্চের ২ তারিখ আবার পদত্যাগপত্র পাঠানো হল। এবার তা গৃহীত হল। সুইডিশ মিশনারিদের সঙ্গে এতদিনের সম্পর্কের ইতি ঘটল এখানেই। 

১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ নতুন কমিটি গঠিত হল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল। কিন্তু তখনও বিদ্যালয়ের নাম পাল্টায় নি। নাম পরিবর্তনের জন্য পরিচালন সমিতি মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের দ্বারস্থ হলেন। অবশেষে ১৯৪৯ সালের ১৯ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া গেল। 

মহারাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ১লা মে ১৯৪৯ পরিচলন সমিতি সিদ্ধান্ত নিল- 'Resolved that the Committee of Management of the school express their most heartful thanks and their deep sense of gratitude to H.H. Maharaja Bhup Bahadur for the favour of H.H's graciously granting the prayer of the Committee to associate the name of the great and illustrious Ruler of the State His Highness Late Maharaja Sir Nripendra Narayan Bhup Bahadur of revered memory.` এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৬০০ টাকার মিষ্টি বরাদ্দ হয়েছিল ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ১৯৫০ সালের ৬ জানুইয়ারি 'মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়'  নাম অনুমোদন করে পাঠালেন।

আজও বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজোকে ঘিরে ছাত্র শিক্ষক সকলের মধ্যে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা কাজ করে, তা বোধহয় সেই অতীত পরম্পরা। সংবাদপত্রের পাতায় বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজোর খবর স্থান পাক কিংবা না পাক, এই বিদ্যালয়ের পুজো কোচবিহারের অন্যতম সেরা পুজো সেটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।


ছবি- ২০১৭ সালের প্রতিমা 

(এই লেখার কিছু অংশ বকলম পত্রিকায় প্রকাশিত নিজের লেখা একটি প্রবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে)       

Monday, January 16, 2023




গিদ্দা পাহাড়ের একটি বাড়ি ও কিছু কথা 

শৌভিক রায় 

The happiest day in my life will be when I shall become independent and a still happier one when I shall go to Darjeeling

বলা হয়, স্বয়ং নেতাজি এরকম কথা বলেছিলেন। সত্য মিথ্যে জানি না। তবে তিনি এই কথা বলেছিলেন ভাবতে অবশ্যই ভাল লাগে। 

আসলে দার্জিলিং পাহাড়ের হাতছানি তো সহজে এড়ানো যায় না। বাঙালির আইকন নেতাজির পরিবারও পারেননি। আস্ত একটা বাড়ি কিনে ফেলেছিলেন কার্সিয়াংয়ের গিদ্দা পাহাড়ে। সেই বাড়ি এখন নেতাজি ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ। সুদৃশ্য এই বাড়িটিতে রয়েছে নেতাজি মিউজিয়াম এবং সেন্টার ফর দা স্টাডিজ অফ হিমালয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস সোসাইটি এন্ড কালচার।

১৯২২ সালে Rowley Lascelles Ward-এর থেকে এই বাড়িটি কিনেছিলেন নেতাজি সুভাষের দাদা শরৎচন্দ্র বোস। ১৯২৫-এ এই বাড়িতে পা রেখেছিলেন দেশপ্রিয় চিত্তরঞ্জন দাস ও তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী। শোনা যায়, নিশিযাপনও করেন তাঁরা। 

শরৎচন্দ্র বোস নিজে এই বাড়িতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ অবধি গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৩৬ সালে নেতাজিকেও এই বাড়িতে সাত মাস গৃহবন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়। কিন্তু বিশ্বস্ত সহচর কালু সিং লেপচার মাধ্যমে নেতাজি কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণ রচনা করা ছাড়াও, এই বাড়ি থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে স্বাধীনতা ও ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে নেতাজির পত্রালাপ চলত। 

স্বাধীনতার পর ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ অবধি এই বাড়িতে বসু পরিবারের যাতায়াত ছিল। কিছু চিঠি, নেতাজির ইউনিফর্ম, অতীত আসবাবপত্র এখন দ্রষ্টব্য এখানে। শরৎচন্দ্র বোসের নিজের হাতে লাগানো ক্যামেলিয়া গাছটি অতীতের স্পর্শ নিয়ে আজও ফুল দিয়ে চলেছে। 

এই বাড়িতে কালু লেপচার মেয়ে মতি মায়া লেপচা ২০১৬ অবধি মালির কাজ করতেন। সিঙ্গাপুরের Stonebench-এর গবেষক জাবির রহমান বলছেন, নেতাজি ও এমিলি শেঙ্কেলের মেয়ে বলে পরিচিত অনিতা বসু পাফের এক সন্তানের নামও মায়া। হতে পারে বিষয়টি একেবারেই কাকতালীয় অথবা কালু লেপচার পরিবারকে স্মরণে রাখা।   

গত ১২ জানুয়ারি, ২০২৩, বাঙালির আর এক মহান নায়ক বিবেকানন্দের জন্মদিনে, কার্সিয়াংয়ে নেতাজির সেই বাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা ছবি-সহ লেখা থাকে নিজের মতো করে...... 

(ছবি- লেখক) 












Wednesday, January 4, 2023


 

ঐতিহ্যমণ্ডিত জেনকিন্স স্কুলের শিক্ষক বিরামকক্ষে, বিশেষ প্রয়োজনে, আজ অনেকটা সময় কাটালাম। আজও সেই অনুভূতি যা লিখেছিলাম এই বিদ্যালয়ের সার্ধ শতবর্ষের স্যুভেনিরে ২০১১ সালে। আজকের তোলা একটি ছবি ও এক দশক আগের সেই লেখাটি রেখে দিই এখানে আর নিজের ব্লগে।  


জেনকিন্স স্কুল -অন্য চোখে 

শৌভিক রায় 


চন্দন দিঘির ওপার থেকে তখন লাল বিল্ডিংটা দেখা যেত। ছন্নছাড়া দু'চারটে দোকান থাকলেও দিঘিটা পরিপূর্ণ ঢেকে যায়নি। শিশু চোখে অগাধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করবার ছিল না। কিন্তু অবচেতনে ওই বিল্ডিংটার প্রতি যে টান তৈরি হয়েছিল তখন থেকে, সে বুঝি আর যাবার নয়। এই মাঝবয়সেও!


কোচবিহার জেলার লোক হ'লেও আমি শহর কোচবিহারের লোক নই সে অর্থে। বড় হয়ে উঠেছি প্রতিবেশী জেলার ছোট্ট শহরে। কিন্তু চাকরিসূত্রে বাবা-মা এমন দু'জায়গায় থাকতেন যে, যাতায়াত করতে হলে শহরটাকে ছুঁতেই হয়। শিলতোর্ষায় তখন ব্রিজ তৈরি হয়নি। মিনিবাস স্ট্যান্ড বা স্টেডিয়াম না থাকায় রাজবাড়ি তখন আরও বিস্তৃত আর এ. বি. এন শীল কলেজ হোস্টেলের সামনের নতুন বাস স্ট্যান্ড ডবল ডেকার, ট্রেইলার বাসের দখলে। হাসপাতাল আর কলেজ হোস্টেলের মাঝে কাকচক্ষু টলটলে জলের সেই অসামান্য দিঘি, আর তারই একদিকে ঐ লাল বিল্ডিং। ছোট বিল্ডিংটার ফাঁক দিয়ে দেখা যেত রাজকীয় আরও একটা বিল্ডিং। কী তার রূপ আর সজ্জা! আর একটা রাজবাড়ি নাকি? 


জেনেছিলাম বহু পরে। সাধ জেগেছিল মনে ঐ বিল্ডিংগুলোতে নিজেকে ভাগীদার করবার। বিধি বাম। ছেলে ছোট এইটুকু, থাকতে পারবে নাকি অচেনা অজানা রাজনগরে? তাছাড়া তখন ডুয়ার্সের চাাগানে, কুলি বস্তির মাদলে, টুংটাং শব্দে বয়ে চলা ঝর্ণা নদীতে এমনই মেতে আছি যে লাল বিল্ডিং আর হাতছানি দেয় না। তখনও কি বুঝেছি ছাই ওটা যে প্রোণিত হয়ে আছে অবচেতনে!


তা মাধ্যমিকের পর দিব্যি সুযোগ ছিল ভাগীদার হবার। দু'একজন প্রতিবেশী জেলার ছোট সেই শহরটা থেকে চলেও এল। পরীক্ষার ইঁদুর দৌড়ে তাদের থেকে খানিকটা এগিয়ে থেকেও পড়ে রইলাম সেই শহরেই। অগ্যতা বোধ হয় এ জীবনে আর লাল বিল্ডিংটার ভাল মন্দের, সুখ- দুঃখের সঙ্গী হতে পারলাম না। সেই রাগেই কলেজ জীবনে স্কুলের সামনের ঐ রাস্তাটাই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল! না, কলেজ জীবনও রাজনগরের কৃপা পায় নি। ফলে, এ শহরটাতেই আর নয় এমন ধনুক ভাঙা পণ করতে বিন্দুমাত্র দেরী হয় নি। কিন্তু প্রতিজ্ঞাটাও তো মানুষ করে ভাঙার জন্যই!


তারপর এক ঝোড়ো হাওয়া- কফিহাউসের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে তুফানি আলোচনা- আগুন খেকো ভাষণ- যুক্তি তক্কো আর গল্পো-বেকারত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি যাবতীয় কর্তব্য সেরে অবশেষে... 


আর কি আশ্চর্য! যে পথ মাড়াইনি একবুক যন্ত্রণা নিয়ে এতদিন, লাল বিল্ডিংয়ের দিকে নিজের সৃষ্ট অভিমানে ভালভাবে তাকাইনি পর্যন্ত, তাকেই অতিক্রম করে নিজের কর্মস্থল? যন্ত্রণা তো কমলই না, উপরন্ত দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে, রুটি রুজির তাগিদে প্রতিজ্ঞাটাকে ভাঙতে হ'ল। 


তখনও বুঝিনি এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে কোন্ অধরাকে পেতে চলেছি। আসলে লাল বিল্ডিং আমায় আপন করতে শুরু করল এবার। প্রতিবেশী বিদ্যালয়ে কর্মের সূত্র ধরে আমার এতদিনের মোহ, আমার ভালো লাগা, আমার যন্ত্রণা, আমার অভিমান ঐ শতাব্দী প্রাচীন নাল বিল্ডিং এবার আমার হাত ধরল। দুই বিদ্যালয়ের পারস্পরিক আদান প্রদানে, ক্রিকেট-ফুটবলের প্রীতিম্যাচে কখনই আর আমি এই লাল বিল্ডিংয়ের কেউ নই- মনে হয় নি। ছাত্র সমস্যায়, কর্মশালায়, নানাবিধ আলোচনায় লাল বিল্ডিং এতদিনে যেন আমার হল। নীরেনদার সস্নেহ বকুনিতে, গোপেশবাবুর তার্কিক আলোচনায়, সুকুমারদার গম্ভীর অথচ আর্দ্র আহ্বানে ভেসে গেলাম এবার। উপরি পাওনার মতো আড্ডা, রামবাবুর সৌহার্দ্য, অমিতাভ-জয়ন্ত- দিলীপ- মানবেন্দ্র - ইন্দ্রজিৎ-তপনদার ভালবাসা। কে বলেছে লাল বিল্ডিং আপন করেনি আমায়? আর ছাত্ররা? প্রাক্তন ও বর্তমানেরা? তারা? তারাও তো স্যার ডাকে। প্রতিবেশী বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলে তো দূরে সরিয়ে রাখেনি তারা। সাক্ষাতে, ফেসবুকে বা অর্কুটে তারাও তো ভীষণ আপন। এই বিল্ডিং-ই তো শেখরদার মতো প্রবুদ্ধকে বন্ধু করেছে, আবার অঙ্গীকারের মতো ছোট্টকেও বন্ধু করেছে। যে যন্ত্রণা তাই নিত্য ছটফটানি আনতো মনে তা আজ প্রশমিত। যন্ত্রণার বদলে সুখের তিরতিরে বহতা নদী। এ বড়ই আনন্দ। 


সার্ধশতবর্ষের এই মহতি কাণ্ডকারখানায় হয়তো বড্ড অকিঞ্চিৎকর এই আত্মকখন। এ একান্ত ব্যক্তিগত আলোচারিতা। কিন্তু কী করব? গবেষকের চোখে, ঐতিহাসিকের চোখে দেখিনি তো কোনও দিন এই লাল বিল্ডিংটাকে। এ ছিল এক শিশুর ভাল লাগা। হয়তো প্রথম ভালবাসাও! আর যথারীতি প্রথম সেই ভাললাগা,ভালবাসা, মুগ্ধতা পূর্ণতা পায় নি। 


ভুল বললাম। পূর্ণতা পেয়েছে। পূর্ণতার ভাণ্ডার কানায় কানায় ভরে গেছে। আমি জেনকিন্স স্কুলের অংশীদার হতে পারিনি ছাত্রাবস্থায়। স্বপ্নের অঞ্জন নিয়ে যে শিশু, যে কিশোর ঐ লাল বিল্ডিংয়ে ভীরু পা রাখতে চাইত, তারই উত্তারাধিকার আজ সেই শিশুর, সেই কিশোরের রূপ নিয়ে, তার ভীরু পা রাখে। যে শৈশবকে পিছনে ফেলে এসেছি (আদৌ কি তা যায়?) সেই শৈশবই আজ আর এক শিশু হয়ে পূর্ণ করে আমার মাধুকরীর সেই পাত্র! 


জীবন সত্যিই সুন্দর।


(লেখক বর্তমান বর্তমান ছাত্রের অভিভাবক)


প্রকাশিত: সার্ধ শতবর্ষ স্মরণী জেনকিন্স স্কুল, ২০১১

Monday, January 2, 2023


 

।। নিজের ভাবনায়।।

      শৌভিক রায় 


মৃত্যুরও রকমফের থাকে। 

কারও মৃত্যুতে শোক বেশি, কারও মৃত্যুতে কম।


মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি নিজেকে, একান্ত আপনজন ছাড়া অন্য কারও মৃত্যু কি আমাদের তেমন স্পর্শ করে? বোধহয় করে। বোধহয় করে না। ঠিক বুঝি না আজও। 


ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর আমার পরিচিত অনেককে কাঁদতে দেখেছিলাম। অথচ তারা কেউ কোনোদিন তাঁকে চাক্ষুষ দেখেননি! এরকম আরও বহু নাম বলা যায় যাঁদের মৃত্যুতে আমরা কেঁদেছি অথবা তীব্র মন খারাপ করে বসে থেকেছি। জল স্পর্শ পর্যন্ত করিনি।


আবার দীর্ঘদিন সহকর্মী হয়েও কেউ কেউ আমাদের স্পর্শ করতে পারে না! তার মৃত্যু খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে যায়! তার স্মরণে সামান্য সময় নীরব থাকার চাইতেও বড় হয়ে ওঠে নানা অর্থহীন কাজ! 


ভাবি, যে মানুষটা তার জীবনের অনেকটা সময় কর্মক্ষেত্রকে দিল, তার কি এটুকুও পাওনা থাকতে পারে না? একটা দিন কি তার কথা বলতে পারে না সহকর্মীরা? ভাবতে পারে না তার কথা? মৃত্যুর পর অন্তত একটা দিন কি তাকে ঘিরে আবর্তিত হতে পারে না?


একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু তো কমতে কমতে এমনিতেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। গতানুগতিকতার চাপে মানুষটিকে পুরোপুরি ভুলে যেতে সময় লাগবে না জানি সবাই! কিন্তু তার আগে একটি দিন, একটু সময় তার কি প্রাপ্য নয়! 


চলে গেলে তাই দিন চাই না আর। চাই না  অপমানে বিদ্ধ হোক শায়িত দেহ। 


এটুকু চাওয়া যেতেই পারে। এটুকু অহঙ্কার থাকতেই পারে.....


শিল্পী - রাকেশ পাল

(এই শিল্পকর্মটি গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের ১৫৮ তম বার্ষিক প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছিল)