আজকের (২৯ জানুয়ারি, ২০২৩) উত্তরবঙ্গ সংবাদের রংদার রোববারের ট্রাভেল ব্লগে প্রকাশিত একটি লেখা। সঙ্গে কিছু ছবি মানস অভয়ারণ্য ভ্রমণের। ছবিগুলি আমার নিজের ও পুত্র ঋতভাষের তোলা।
মনের মাঝে মানস থাকে
শৌভিক রায়
এভাবে যে ময়ূরেরা দল বেঁধে সর্ষে ক্ষেতে ঘুরে বেড়াতে পারে, তা কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ ফুলের মাঝে তাই নীল ময়ূরদের দেখে থমকে দাঁড়াই। আমার বাঁ দিকে মানস টাইগার রিজার্ভের গভীর জঙ্গল। বৈদ্যুতিক তার দেওয়া আছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর কোন তার কবে পাখিদের আটকাতে পেরেছে! অরণ্য থেকে তারা উড়ে আসছে ঝাঁক বেঁধে। কেউ কাঁটাওয়ালা কুল গাছে বসে দিব্যি কুল খাচ্ছে, কেউ আবার আপন মনেই এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
খানিক আগে বেঁকি নদীতে সূর্যাস্ত দেখেছি। এখন চলে এসেছি একদম উল্টোদিকে। অরণ্য এখানে আদিম। তবে ডানদিকে সভ্যতার ছোঁওয়া ওই সর্ষে ক্ষেত। শীত সন্ধে ঝপ করে নেমে এলো। ভাবলাম, খানিকটা পথ হেঁটে যাই। হল না। অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন অরণ্যপ্রহরীরা। খুব বিনীতভাবে বললেন, কোনওভাবেই যেন হেঁটে না বেড়াই। অরণ্যের নিয়ম না মানলে বিপদে পড়তে হবে। তাই ফিরতি পথ ধরলাম। আসবার সময় দেখেছি বন দপ্তরের তিন কুনকি হাতি জঙ্গলের ভেতর মহানন্দে গাছপালা খাচ্ছিল। বোধহয় নৈশ আহার। ফেরার পথেও ডালপালা ভাঙার আওয়াজে বুঝলাম ওদের এখনও খাওয়া শেষ হয়নি।
রাতে থাকছি নেচার ক্যাম্পে। আগুনে শরীর সেঁকতে সেঁকতে স্থানীয় প্রবীণ গুণমণি ফুকন জানালেন, তাদের বিশ্বাস সর্প দেবী মনসার কাছে থেকে প্রবাহিত হয়েছে মানাহ নামের নদী। দীর্ঘ পথ সে বয়ে এসেছে তিব্বত ও ভুটান হয়ে। এই এলাকায় একটি গুহায় একসময় মনসা দেবীর পুজোও করা হত। সেই থেকেই এই বনাঞ্চল মানস নামে পরিচিত। তবে অনেকে বলেন, নদীটি হিমালয়ের মানস হ্রদ থেকে ব্রহ্মপুত্রের মতোই প্রবাহিত হয়েছে। যোগীঘোপায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মেশা পর্যন্ত ভারতের ওপর দিয়ে ১০৪ কিমি পরিক্রমা সেরেছে সে। সঙ্গে ভারত ও ভুটানকে আলাদা করেছে। তবে ভারতে ঢুকে বেঁকি ও হাকোয়া নামে দুভাগে ভাগ হয়েছে সে। নীল জলের নদীটি তার আশেপাশে ঘন অরণ্য আর মাথায় পাহাড় নিয়ে এত সুন্দরী যে বলে বোঝানো যায় না!
বেশ ভোরে গাইড উমেশ দাসের সঙ্গে জিপ সাফারিতে বেরিয়ে পড়া গেল। শীতের কুয়াশা মাখা অরণ্য। তার সৌন্দর্য না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না। খানিকটা যেতে একেবারে হাতের নাগালে বুনো মোষ দেখে চমৎকৃত হলাম। কী রাজসিক চেহারা! ঘোর লেগে গেল! খানিক বাদেই দেখি পথ আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইসনের দল। সংখ্যায় বহু। পিছিয়ে এলো জিপ। বাইসনকে সমীহ করতেই হয়। রাস্তা পরিষ্কার হলে আবার এগোনো। জঙ্গল বেশ গভীর। ঝুঁকে থাকা গাছের ডালপালা মাথা স্পর্শ করছে। শাল, শিরিষ, শিমুল, গামার, খয়ের, অর্জুন, বহেরা, সিদা, কাঞ্চন ইত্যাদি গাছ দেখা যাচ্ছে চারদিকে। মাঝে মাঝেই চলে আসছে ময়ূরের দল। কেউ আবার একা বসে রয়েছে ডালে। হঠাৎ চোখে পড়ল একজোড়া গণ্ডার। আমাদের একদম পাশে। এত মগ্ন যে, ফিরেও তাকালো না। মন খুশি হয়ে উঠল। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় থাকা বিশ্বের অন্যতম সুন্দর মানসে এসে গণ্ডার না দেখতে পেলে মন খারাপ হত বৈকি!
পরপর বার্কিং ডিয়ার আর শম্বর হরিণ পাওয়া গেল। দুজনেই ব্যস্ত। তবে শম্বরটি ছবি তোলার জন্য বেশ পোজ দিল। খানিকটা এগিয়ে গাইড গাড়ি থামিয়ে দেখালেন জায়ান্ট স্কুইরেল। মাথার ওপর গাছের ডালে দিব্যি বসে রয়েছে। এর মধ্যেই ড্রাইভার আবিষ্কার করলেন বালির ওপর বাঘের পায়ের ছাপ। একদম টাটকা। খানিকক্ষণ দমবন্ধ করা বৃথা অপেক্ষা করা হল। গাড়ি থেকে নামা বারণ। চারপাশে তন্নতন্ন করে দেখেও কিছুই পাওয়া গেল না। তবে সঙ্গিনীকে নিয়ে উড়ে এলো একটি স্কারলেট মিনিভেট। তার ছবি তোলা হলেও, সঙ্গিনী ক্যামেরায় ধরা দিল না। নিরাশ করল না ক্রেস্টেড হকটিও। গাছের উঁচু ডালে বসে ধ্যানমগ্ন সে। কিন্তু দেখা পেলাম না মানসের বিখ্যাত পিগমি হগের। এমনিতে অবশ্য এখানে রয়েছে ৫৫ ধরণের স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৪৫০ প্রজাতির পাখি সহ ৫০ ধরণের সরীসৃপ। কিছু কিছু বিলুপ্তপ্রায়। সাফারির শেষে জঙ্গলের গভীরে মানস নদীর ধারে দেখা গেল একঝাঁক হর্নবিল। পাশে রয়েছে বেশ কিছু পরিযায়ীও।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টার বেশি থাকা যায় না জঙ্গলে। আগে সারাদিন সাফারি করা যেত। আপাতত সেটা বন্ধ। তাই উপায় নেই। ফিরতে হল। পেছনে পড়ে রইল সবুজ বনানী আর প্রাণীরা। অবাধে বিচরণ করুক তারা। তাদের জগতে বেশিক্ষণ থাকা মানে তাদের বিরক্ত করা। তার চেয়ে এই ভাল। যা দেখলাম, যেটুকু দেখলাম মানস অভয়ারণ্যে এসে, সেটি কম কীসে! ফিরে চলি তাই আরণ্যক স্মৃতি নিয়ে।





No comments:
Post a Comment