ঐতিহ্যমণ্ডিত জেনকিন্স স্কুলের শিক্ষক বিরামকক্ষে, বিশেষ প্রয়োজনে, আজ অনেকটা সময় কাটালাম। আজও সেই অনুভূতি যা লিখেছিলাম এই বিদ্যালয়ের সার্ধ শতবর্ষের স্যুভেনিরে ২০১১ সালে। আজকের তোলা একটি ছবি ও এক দশক আগের সেই লেখাটি রেখে দিই এখানে আর নিজের ব্লগে।
জেনকিন্স স্কুল -অন্য চোখে
শৌভিক রায়
চন্দন দিঘির ওপার থেকে তখন লাল বিল্ডিংটা দেখা যেত। ছন্নছাড়া দু'চারটে দোকান থাকলেও দিঘিটা পরিপূর্ণ ঢেকে যায়নি। শিশু চোখে অগাধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করবার ছিল না। কিন্তু অবচেতনে ওই বিল্ডিংটার প্রতি যে টান তৈরি হয়েছিল তখন থেকে, সে বুঝি আর যাবার নয়। এই মাঝবয়সেও!
কোচবিহার জেলার লোক হ'লেও আমি শহর কোচবিহারের লোক নই সে অর্থে। বড় হয়ে উঠেছি প্রতিবেশী জেলার ছোট্ট শহরে। কিন্তু চাকরিসূত্রে বাবা-মা এমন দু'জায়গায় থাকতেন যে, যাতায়াত করতে হলে শহরটাকে ছুঁতেই হয়। শিলতোর্ষায় তখন ব্রিজ তৈরি হয়নি। মিনিবাস স্ট্যান্ড বা স্টেডিয়াম না থাকায় রাজবাড়ি তখন আরও বিস্তৃত আর এ. বি. এন শীল কলেজ হোস্টেলের সামনের নতুন বাস স্ট্যান্ড ডবল ডেকার, ট্রেইলার বাসের দখলে। হাসপাতাল আর কলেজ হোস্টেলের মাঝে কাকচক্ষু টলটলে জলের সেই অসামান্য দিঘি, আর তারই একদিকে ঐ লাল বিল্ডিং। ছোট বিল্ডিংটার ফাঁক দিয়ে দেখা যেত রাজকীয় আরও একটা বিল্ডিং। কী তার রূপ আর সজ্জা! আর একটা রাজবাড়ি নাকি?
জেনেছিলাম বহু পরে। সাধ জেগেছিল মনে ঐ বিল্ডিংগুলোতে নিজেকে ভাগীদার করবার। বিধি বাম। ছেলে ছোট এইটুকু, থাকতে পারবে নাকি অচেনা অজানা রাজনগরে? তাছাড়া তখন ডুয়ার্সের চাাগানে, কুলি বস্তির মাদলে, টুংটাং শব্দে বয়ে চলা ঝর্ণা নদীতে এমনই মেতে আছি যে লাল বিল্ডিং আর হাতছানি দেয় না। তখনও কি বুঝেছি ছাই ওটা যে প্রোণিত হয়ে আছে অবচেতনে!
তা মাধ্যমিকের পর দিব্যি সুযোগ ছিল ভাগীদার হবার। দু'একজন প্রতিবেশী জেলার ছোট সেই শহরটা থেকে চলেও এল। পরীক্ষার ইঁদুর দৌড়ে তাদের থেকে খানিকটা এগিয়ে থেকেও পড়ে রইলাম সেই শহরেই। অগ্যতা বোধ হয় এ জীবনে আর লাল বিল্ডিংটার ভাল মন্দের, সুখ- দুঃখের সঙ্গী হতে পারলাম না। সেই রাগেই কলেজ জীবনে স্কুলের সামনের ঐ রাস্তাটাই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল! না, কলেজ জীবনও রাজনগরের কৃপা পায় নি। ফলে, এ শহরটাতেই আর নয় এমন ধনুক ভাঙা পণ করতে বিন্দুমাত্র দেরী হয় নি। কিন্তু প্রতিজ্ঞাটাও তো মানুষ করে ভাঙার জন্যই!
তারপর এক ঝোড়ো হাওয়া- কফিহাউসের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে তুফানি আলোচনা- আগুন খেকো ভাষণ- যুক্তি তক্কো আর গল্পো-বেকারত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি যাবতীয় কর্তব্য সেরে অবশেষে...
আর কি আশ্চর্য! যে পথ মাড়াইনি একবুক যন্ত্রণা নিয়ে এতদিন, লাল বিল্ডিংয়ের দিকে নিজের সৃষ্ট অভিমানে ভালভাবে তাকাইনি পর্যন্ত, তাকেই অতিক্রম করে নিজের কর্মস্থল? যন্ত্রণা তো কমলই না, উপরন্ত দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে, রুটি রুজির তাগিদে প্রতিজ্ঞাটাকে ভাঙতে হ'ল।
তখনও বুঝিনি এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে কোন্ অধরাকে পেতে চলেছি। আসলে লাল বিল্ডিং আমায় আপন করতে শুরু করল এবার। প্রতিবেশী বিদ্যালয়ে কর্মের সূত্র ধরে আমার এতদিনের মোহ, আমার ভালো লাগা, আমার যন্ত্রণা, আমার অভিমান ঐ শতাব্দী প্রাচীন নাল বিল্ডিং এবার আমার হাত ধরল। দুই বিদ্যালয়ের পারস্পরিক আদান প্রদানে, ক্রিকেট-ফুটবলের প্রীতিম্যাচে কখনই আর আমি এই লাল বিল্ডিংয়ের কেউ নই- মনে হয় নি। ছাত্র সমস্যায়, কর্মশালায়, নানাবিধ আলোচনায় লাল বিল্ডিং এতদিনে যেন আমার হল। নীরেনদার সস্নেহ বকুনিতে, গোপেশবাবুর তার্কিক আলোচনায়, সুকুমারদার গম্ভীর অথচ আর্দ্র আহ্বানে ভেসে গেলাম এবার। উপরি পাওনার মতো আড্ডা, রামবাবুর সৌহার্দ্য, অমিতাভ-জয়ন্ত- দিলীপ- মানবেন্দ্র - ইন্দ্রজিৎ-তপনদার ভালবাসা। কে বলেছে লাল বিল্ডিং আপন করেনি আমায়? আর ছাত্ররা? প্রাক্তন ও বর্তমানেরা? তারা? তারাও তো স্যার ডাকে। প্রতিবেশী বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলে তো দূরে সরিয়ে রাখেনি তারা। সাক্ষাতে, ফেসবুকে বা অর্কুটে তারাও তো ভীষণ আপন। এই বিল্ডিং-ই তো শেখরদার মতো প্রবুদ্ধকে বন্ধু করেছে, আবার অঙ্গীকারের মতো ছোট্টকেও বন্ধু করেছে। যে যন্ত্রণা তাই নিত্য ছটফটানি আনতো মনে তা আজ প্রশমিত। যন্ত্রণার বদলে সুখের তিরতিরে বহতা নদী। এ বড়ই আনন্দ।
সার্ধশতবর্ষের এই মহতি কাণ্ডকারখানায় হয়তো বড্ড অকিঞ্চিৎকর এই আত্মকখন। এ একান্ত ব্যক্তিগত আলোচারিতা। কিন্তু কী করব? গবেষকের চোখে, ঐতিহাসিকের চোখে দেখিনি তো কোনও দিন এই লাল বিল্ডিংটাকে। এ ছিল এক শিশুর ভাল লাগা। হয়তো প্রথম ভালবাসাও! আর যথারীতি প্রথম সেই ভাললাগা,ভালবাসা, মুগ্ধতা পূর্ণতা পায় নি।
ভুল বললাম। পূর্ণতা পেয়েছে। পূর্ণতার ভাণ্ডার কানায় কানায় ভরে গেছে। আমি জেনকিন্স স্কুলের অংশীদার হতে পারিনি ছাত্রাবস্থায়। স্বপ্নের অঞ্জন নিয়ে যে শিশু, যে কিশোর ঐ লাল বিল্ডিংয়ে ভীরু পা রাখতে চাইত, তারই উত্তারাধিকার আজ সেই শিশুর, সেই কিশোরের রূপ নিয়ে, তার ভীরু পা রাখে। যে শৈশবকে পিছনে ফেলে এসেছি (আদৌ কি তা যায়?) সেই শৈশবই আজ আর এক শিশু হয়ে পূর্ণ করে আমার মাধুকরীর সেই পাত্র!
জীবন সত্যিই সুন্দর।
(লেখক বর্তমান বর্তমান ছাত্রের অভিভাবক)
প্রকাশিত: সার্ধ শতবর্ষ স্মরণী জেনকিন্স স্কুল, ২০১১

No comments:
Post a Comment