শুধুই পুজো? নাকি অন্য স্বাধীনতা?
বিষয়: মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজো
শৌভিক রায়
একটি সরস্বতী পুজো আর তাকে ঘিরে একটি মিশনারি বিদ্যালয়ের টালমাটাল ভবিষ্যত...
এরকম উদাহরণ কি রয়েছে?
রয়েছে। কোচবিহার জেলার যে বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজো অত্যন্ত নাম করা, সেই মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় সম্ভবত শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দুর্ভাগ্য, অনেকেই জানেন না সে ইতিহাস।
মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় অতীতে সুইডিশ মিশন নামে পরিচিত ছিল। কেননা তখন সুইডিশ মিশনারিরা এই বিদ্যালয়ের পরিচালনা করতেন। ১৯২৪ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি উত্তাল দুই বছর কাটিয়েছিল ১৯৪৭-৪৮ সালে। দেশভাগের জন্য শহর কোচবিহারে শরণার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাদের স্থান হয়েছিল বিদ্যালয়ের আটচালা ঘরে। সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ের কাজ চলছিল সকালবেলায় প্রতিবেশী জেঙ্কিন্স স্কুলে। বিদ্যালয়ের দুই ছাত্র ইয়াকুব ও ইয়াসিনের নেতৃত্বে পাকিস্তানের স্বপক্ষে শহরে মিছিলও পরিক্রমা করেছিল। সব মিলে সুইডিশ মিশনারিদের পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না। তাঁরা শর্তসাপেক্ষে কোচবিহার স্টেস্টের কাছে বিদ্যালয়টি হস্তান্তর করতে চাইলেন। সুইডেনের হোম-বোর্ডও বিদ্যালয়ের অনুদান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল। বিদ্যালয়ের সর্বেসর্বা A. W. BRANDT চিঠি দিয়ে জানালেও স্টেট দায়িত্ব নিতে রাজি হল না।
এই টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৮ সালের ১৯ শে জানুয়ারি ছাত্ররা বিদ্যালয়ের ভেতর সরস্বতী পুজো করবার আবেদন জানালেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সতীশচন্দ্র ভৌমিক আবেদন পত্র পাঠালেন A. W. BRANDT-এর কাছে। অবধারিতভাবে আপত্তি এলো তাঁদের দিক থেকে। কিন্তু তখন ছাত্ররা খেপে উঠেছে। প্রাক্তন ছাত্র ও প্রখ্যাত কবি প্রয়াত সনৎ চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, 'স্কুলে শতকরা আশি ছেলেই হিন্দু, তারা দাবী তুলেছে সরস্বতী পুজো করবে। সঙ্গে মুসলমান ছেলেরাও আছে। অন্যদিকে সুইডিশ মিশনের কর্মকর্তারা পুজো করতে দেবেন না। ছাত্র বিক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলো। শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিলেন। এত সব কাণ্ডের সময় আমি বাগানে আছি। যেদিন বাগান থেকে হোস্টেলে এলাম, সেদিন স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমি হতবাক। সারা স্কুলের মাঠে কাগজের টুকরো। একটা কাগজের টুকরো তুলে দেখি আমাদের পাঠ্য বাইবেল ছেঁড়া হয়েছে। খুব খারাপ লাগল।` এরকম অবস্থায় A. W. BRANDT ও মিশন প্রতিনিধি JOHN A ROY-এর আপত্তি লিপিবদ্ধ করেও পরিচালন সমিতি পুজো করবার অনুমতি দিল।
কিন্তু মিশনারিরা এই ব্যাপারটি যে ভালভাবে নেন নি তার প্রমান পাওয়া গেল ২১ জানুয়ারি। পদত্যাগপত্র গেল পরিচালন সমিতির কাছে। কিন্তু সেটি গৃহীত না হওয়ায় আবার মার্চের ২ তারিখ আবার পদত্যাগপত্র পাঠানো হল। এবার তা গৃহীত হল। সুইডিশ মিশনারিদের সঙ্গে এতদিনের সম্পর্কের ইতি ঘটল এখানেই।
১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ নতুন কমিটি গঠিত হল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল। কিন্তু তখনও বিদ্যালয়ের নাম পাল্টায় নি। নাম পরিবর্তনের জন্য পরিচালন সমিতি মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের দ্বারস্থ হলেন। অবশেষে ১৯৪৯ সালের ১৯ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া গেল।
মহারাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ১লা মে ১৯৪৯ পরিচলন সমিতি সিদ্ধান্ত নিল- 'Resolved that the Committee of Management of the school express their most heartful thanks and their deep sense of gratitude to H.H. Maharaja Bhup Bahadur for the favour of H.H's graciously granting the prayer of the Committee to associate the name of the great and illustrious Ruler of the State His Highness Late Maharaja Sir Nripendra Narayan Bhup Bahadur of revered memory.` এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৬০০ টাকার মিষ্টি বরাদ্দ হয়েছিল ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ১৯৫০ সালের ৬ জানুইয়ারি 'মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়' নাম অনুমোদন করে পাঠালেন।
আজও বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজোকে ঘিরে ছাত্র শিক্ষক সকলের মধ্যে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা কাজ করে, তা বোধহয় সেই অতীত পরম্পরা। সংবাদপত্রের পাতায় বিদ্যালয়ের সরস্বতী পুজোর খবর স্থান পাক কিংবা না পাক, এই বিদ্যালয়ের পুজো কোচবিহারের অন্যতম সেরা পুজো সেটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।
ছবি- ২০১৭ সালের প্রতিমা
(এই লেখার কিছু অংশ বকলম পত্রিকায় প্রকাশিত নিজের লেখা একটি প্রবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে)

No comments:
Post a Comment