২৬/১১
শৌভিক রায়
কালাশনিকভ এখনও বহাল
ছিন্নভিন্ন শরীরও চারদিকে
বছর ঘুরেও শেষ হয় না
পরিক্রমা
এক হয়ে যায় দেশ সব পৃথিবীর
তবু স্বপ্ন দেখি লেননের মতো
পেরিয়ে যাই রাষ্ট্রের গণ্ডি
একটি গোলাপের জন্যে....
নামে কী এসে যায়!
শৌভিক রায়
- শি হ্যাজ বিন সাফারিং ফ্রম সিভিয়ার হেডএক সিনস...
এভাবেই শুরু করেছিল বাবুদা।
ঘটনাটা ভেলোরের সি এম সি হসপিটালে। মেডিসিনের এক নম্বর ইউনিটের বয়স্কা লেডি-ডক্টরের পাশে বৌদি বসা। উল্টোদিকে আমি আর বাবুদা।
বৌদির সমস্যা এটুকু বলতেই, ডক্টর বাবুদাকে থামিয়ে দিলেন,
- হু ইজ দ্যা পেশেন্ট?
- শি।
- দেন লেট হার স্পিক...আপ বোলিয়ে...
- বাট ডক্টর শি কান্ট স্পিক ইন ইংলিশ ওর হিন্দি।
- কোই বাত নেহি। আপকা যো ল্যাঙ্গুয়েজ আতা হ্যায় উসমে বলিয়ে। মেরা কোই প্রবলেম হোনে সে, আপ কা হাজব্যান্ড মুঝে হেল্প করেঙ্গে।
বাবুদা আর আমি চুপ। বাবুদার মুখ দেখে বুঝলাম, পুরো হতাশ।
বাংলা ছাড়া বৌদি অন্য কোনও ভাষায় তেমন সড়গড় নয়। বাংলায় বললে কি ডক্টর কিছু বুঝবেন! ওঁর নাম আর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে উনি তামিল। কিন্তু কিছু করার নেই। ডক্টর বৌদিকে বলতে বলেছেন। অগত্যা বাবুদা চুপ।
এবার বৌদি শুরু করল,
- আমার অনেকদিন থেকে মাথায় একটা ব্যথা হয়। এত অসহ্য সে ব্যথা কী আর বলব। দপদপ করতে থাকে একদম। মাইগ্রেনের ব্যথা ভেবে কত ওষুধ খেলাম, কিন্তু কিছুতেই কমে না...
- আপনের বেথাটা ডাইন দিক থিকে বাম দিকে যায়, নাকি বাম দিক থেকে ডাইন দিকে আসে?
হঠাৎ ডক্টরের এই প্রশ্নে চমকে উঠলাম সব্বাই। উনি তো রীতিমতো বাংলা বলছেন! কী কাণ্ড। বাবুদা হতভম্ব। বৌদিকে দেখে মনে হচ্ছে হাতে চাঁদ পেয়েছে। ডক্টর নিজে মিটিমিটি হাসছেন। আর আমি রগড় দেখছি।
আসলে নামে আর চেহারায় বোধহয় সত্যিই কিছু আসে যায় না।
নিজের গিন্নির অপারেশনের জন্য এস আর ব্যানার্জি জেসুদাসনকে আমরা বেছেছিলাম। সিএমসি সার্জারি ৩ ইউনিটের হেড। ব্যানার্জি দেখে ওঁকে বাঙালি ভাবলে ভুল করা হবে। আদতে উনি কেরালিয়ান। ব্যানার্জি ওঁর টাইটেল নয়। মূল নাম।
ছোটোখাটো চেহারার মানুষটি সেই সময়ে অত্যন্ত বিখ্যাত। খুব প্রয়োজন ছাড়া নিজে কাঁচি ছুরি ধরেন না। ওঁর তত্বাবধানে এমএস-রা সব অপারেশন করেন। উনি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। করুণানিধি, জয়ললিতা গোত্রীয় মানুষেরা নাকি সব ওঁর রুগী।
অপারেশনের পর ডিসচার্জের সময় উনি গিন্নির জন্য ওষুধ দিলেন। যাদের ভেলোর সিএমসির অভিজ্ঞতা আছে, তারা বুঝবেন হাসপাতাল ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনা কতটা সময় সাপেক্ষ। তার ওপর সেটা যদি মেন ফার্মেসি হয়। মোটামুটি মিনিট পঁয়তাল্লিশ লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা ক'রে আরও আধাঘন্টা পরে সেই ওষুধ পেলাম। না জানি কী ওষুধ ভেবে প্যাকেট খুলে দেখি ক্যালপলের পাতা। সত্যি বলছি, মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল ওষুধ দেখে। ওয়ার্ডে আসতেই নার্সের মধুর কণ্ঠ কানে এলো,
- দাওয়াই লায়া?
কোনোমতে মাথা নাড়লাম।
- ডক্টর জেসুদাসন বোলা আগর জরুরত হোনে সে দাওয়াই লেনা হ্যায়, নেহি তো মত লেনা।
পিত্তি জ্বলে গেল শুনে। জেসুদাসনের ইয়ে, ঘন্টার মাথা একজন...এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ক্যালপল!! ইল্লি আর কি!
একা একই বকবক করছিলাম।
যাহোক পাঁচদিন পর চেক আপ হল। মুখ গম্ভীর করে জেসুদাসন দেখলেন। গিন্নি প্রশ্ন করল,
- স্যার, ফিরে কব আনা?
- কিস লিয়ে?
- কোই চেক আপ বগেড়া?
- কুছ নেহি।
- কেয়া খানা মানা হ্যায়?
- দারু ছোড়কে সব খাও!
এসবের জন্যই বলছিলাম নামে কী এসে যায়? প্রয়াত কবি ও লেখক তারাপদ রায়ের একটি লেখায় পড়েছিলাম চ্যাটার্জি, ব্যানার্জি, বোস, ঠাকুর ইত্যাদি নানা বাঙালি-পদবী দক্ষিণ ভারতের মানুষেরা মূল নাম হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। তাই নাম শুনে তাদের বাঙালি ভাবা যেমন ভুল হবে, তেমনি অন্য প্রদেশের মানুষ বাংলা জানেন না ভাবাটাও ঠিক নয়।
নতুন রাজ্যপাল আসছেন জেনে এই কথাগুলি মনে হল। তাঁর নামে নিভু নিভু বাংলা জ্বলজ্বল করছে। উচ্চ পদস্থ মানুষটি লেখকও বটে। অবশ্য আমাদের এখানে একই অঙ্গে বেস্ট সেলার লেখক, কবি, গায়ক, উকিল, ব্যবসায়ী, ভাষাবিদ, শিল্পী মানুষ কম নেই! ভয়টা তাই বেশি আর কি!
নামে যদি এবার কিছু এসে যায়, তবেই চিত্তির আর কি!!
(বোকামির এককাল)
বোকা
শৌভিক রায়
- স্যার...বর্ষবরণ আজ মার খেয়েছে।
- মার খেয়েছে? বর্ষবরণ? সে কি রে.... কী রে বর্ষবরণ? কী ব্যাপার।
- না স্যার, মার খাইনি। ওটা আদর। থাপ্পড় না...
- ছ্যা ছ্যা....তুই থাপ্পড় খেলি!
- ওহ...তুমি না স্যার কিচ্ছু বোঝো না...ওটা থাপ্পড় না। আদর।
- আচ্ছা বেশ। তা সেটা করল কে?
- প্রবীরবাবু।
- কেন করলেন প্রবীরবাবু?
- ওই যে তখন....
- কখন?
- আহ...শোনো না!
- সরি সরি...বল...কখন...
- টিফিনের সময়। তখন তো একদম রক্তারক্তি খুনোখুনি ব্যাপার!
- বলিস কী! রক্তারক্তি? খুনোখুনি?? কোথায়? কিচ্ছু তো নেই কোথাও রক্তটক্ত!
- আহহা...ওটা তো কথার কথা! ঘটনাটাকে ইমপরট্যান্স দেওয়ার জন্য!
- ওহহ....সরি রে। বুঝিনি।
- তুমি বুঝবে কীভাবে? এমনিতেই বুদ্ধি কম তোমার।
- ঠিক ঠিক। খুব কম। তারপর কী হল?
- তারপর তো গেলাম তোমাদের কাছে। তোমরা তখন চা খাচ্ছ। প্রবীরবাবু ফাঁকা ছিলেন। উনি বললেন।
- কী বললেন?
- আমার জামায় এত নোংরা কেন? মাটির দাগ কীভাবে লাগল?
- তাই তো, কীভাবে লাগল?
- ওই যে হট্টগোল। মাঠে দৌড়াদৌড়ি!
- দৌড়লে শার্ট নোংরা হয়?
- বললাম না খুনোখুনি রক্তারক্তি কাণ্ড!
- ওওওও....আচ্ছা। তা কে কাকে খুন করল?
- অস্মিত আমাকে। আর তাতেই দাগ লাগল।
- তারপর?
- প্রবীর স্যার বললেন, এরকম নোংরা করলে জামা কাচতে মায়ের কষ্ট হবে।
- হুমম...ঠিক। কষ্ট হবে।
- আমি স্যারকে বললাম, আর করব না। কিন্তু মনে মনে বললাম, মায়ের ঘণ্টা কষ্ট হবে। আমাদের ওয়াশিং মেশিন আছে! মা কাচবে কেন!
- এটা বললি?
- আহহা... এটা তো মনে মনে বললাম!!
- মুখে কী বললি?
- বললাম, মায়ের কষ্ট হবে না। নিজের জামা নিজে কাচব!
- এটা বললি???
- এটা শুনেই তো স্যার আমাকে গালে আদর করলেন। এই বোকাগুলো ওটাকে থাপ্পড় ভেবেছে! তোমার ছাত্র তো। তোমার মতোই বোকা সব!!!!
পঞ্চম শ্রেণির বর্ষবরণ এইজন্যই খুব প্রিয় আমার।
( বোকামির এককাল )
মেমেন্টো
শৌভিক রায়
স্মরণে ব্রজগোপাল ঘোষ, আমার চলমান ডুয়ার্স