Saturday, November 26, 2022

২৬/১১

শৌভিক রায় 


কালাশনিকভ এখনও বহাল

ছিন্নভিন্ন শরীরও চারদিকে


বছর ঘুরেও শেষ হয় না 

পরিক্রমা


এক হয়ে যায় দেশ সব পৃথিবীর


তবু স্বপ্ন দেখি লেননের মতো

পেরিয়ে যাই রাষ্ট্রের গণ্ডি

একটি গোলাপের জন্যে....

Friday, November 18, 2022

নামে কী এসে যায়!

শৌভিক রায় 


- শি হ্যাজ বিন সাফারিং ফ্রম সিভিয়ার হেড‌এক সিনস... 

এভাবেই শুরু করেছিল বাবুদা। 

ঘটনাটা ভেলোরের সি এম সি হসপিটালে। মেডিসিনের এক নম্বর ইউনিটের বয়স্কা লেডি-ডক্টরের পাশে বৌদি বসা। উল্টোদিকে আমি আর বাবুদা। 

বৌদির সমস্যা এটুকু বলতেই, ডক্টর বাবুদাকে থামিয়ে দিলেন, 

- হু ইজ দ্যা পেশেন্ট?

- শি। 

- দেন লেট হার স্পিক...আপ বোলিয়ে... 

- বাট ডক্টর শি কান্ট স্পিক ইন ইংলিশ ওর হিন্দি। 

- কোই বাত নেহি। আপকা যো ল্যাঙ্গুয়েজ আতা হ্যায় উসমে বলিয়ে। মেরা কোই প্রবলেম হোনে সে, আপ কা হাজব্যান্ড মুঝে হেল্প করেঙ্গে।


বাবুদা আর আমি চুপ। বাবুদার মুখ দেখে বুঝলাম, পুরো হতাশ। 


বাংলা ছাড়া বৌদি অন্য কোনও ভাষায় তেমন সড়গড় নয়। বাংলায় বললে কি ডক্টর কিছু বুঝবেন! ওঁর নাম আর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে উনি তামিল। কিন্তু কিছু করার নেই। ডক্টর বৌদিকে বলতে বলেছেন। অগত্যা বাবুদা চুপ।

 

এবার বৌদি শুরু করল,

- আমার অনেকদিন থেকে মাথায় একটা ব্যথা হয়। এত অসহ্য সে ব্যথা কী আর বলব। দপদপ করতে থাকে একদম। মাইগ্রেনের ব্যথা ভেবে কত ওষুধ খেলাম, কিন্তু কিছুতেই কমে না...

- আপনের বেথাটা ডাইন দিক থিকে বাম দিকে যায়, নাকি বাম দিক থেকে ডাইন দিকে আসে?


হঠাৎ ডক্টরের এই প্রশ্নে চমকে উঠলাম সব্বাই। উনি তো রীতিমতো বাংলা বলছেন! কী কাণ্ড। বাবুদা হতভম্ব। বৌদিকে দেখে মনে হচ্ছে হাতে চাঁদ পেয়েছে। ডক্টর নিজে মিটিমিটি হাসছেন। আর আমি রগড় দেখছি। 


আসলে নামে আর চেহারায় বোধহয় সত্যিই কিছু আসে যায় না। 


নিজের গিন্নির অপারেশনের জন্য এস আর ব্যানার্জি জেসুদাসনকে আমরা বেছেছিলাম। সিএমসি সার্জারি ৩ ইউনিটের হেড। ব্যানার্জি দেখে ওঁকে বাঙালি ভাবলে ভুল করা হবে। আদতে উনি কেরালিয়ান। ব্যানার্জি ওঁর টাইটেল নয়। মূল নাম। 


ছোটোখাটো চেহারার মানুষটি সেই সময়ে অত্যন্ত বিখ্যাত। খুব প্রয়োজন ছাড়া নিজে কাঁচি ছুরি ধরেন না। ওঁর তত্বাবধানে এমএস-রা সব অপারেশন করেন। উনি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। করুণানিধি, জয়ললিতা গোত্রীয় মানুষেরা নাকি সব ওঁর রুগী। 


অপারেশনের পর ডিসচার্জের সময় উনি গিন্নির জন্য ওষুধ দিলেন। যাদের ভেলোর সিএমসির অভিজ্ঞতা আছে, তারা বুঝবেন হাসপাতাল ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনা কতটা সময় সাপেক্ষ। তার ওপর সেটা যদি মেন ফার্মেসি হয়। মোটামুটি মিনিট পঁয়তাল্লিশ লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা ক'রে আরও আধাঘন্টা পরে সেই ওষুধ পেলাম। না জানি কী ওষুধ ভেবে প্যাকেট খুলে দেখি ক্যালপলের পাতা। সত্যি বলছি, মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল ওষুধ দেখে। ওয়ার্ডে আসতেই নার্সের মধুর কণ্ঠ কানে এলো,

- দাওয়াই লায়া?

কোনোমতে মাথা নাড়লাম। 

- ডক্টর জেসুদাসন বোলা আগর জরুরত হোনে সে দাওয়াই লেনা হ্যায়, নেহি তো মত লেনা। 

পিত্তি জ্বলে গেল শুনে। জেসুদাসনের ইয়ে, ঘন্টার মাথা একজন...এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ক্যালপল!! ইল্লি আর কি! 

একা একই বকবক করছিলাম। 


যাহোক পাঁচদিন পর চেক আপ হল। মুখ গম্ভীর করে জেসুদাসন দেখলেন। গিন্নি প্রশ্ন করল,

- স্যার, ফিরে কব আনা?

- কিস লিয়ে? 

- কোই চেক আপ বগেড়া?

- কুছ নেহি।

- কেয়া খানা মানা হ্যায়?

- দারু ছোড়কে সব খাও!      


এসবের জন্যই বলছিলাম নামে কী এসে যায়? প্রয়াত কবি ও লেখক তারাপদ রায়ের একটি লেখায় পড়েছিলাম চ্যাটার্জি, ব্যানার্জি, বোস, ঠাকুর ইত্যাদি নানা বাঙালি-পদবী দক্ষিণ ভারতের মানুষেরা মূল নাম হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। তাই নাম শুনে তাদের বাঙালি ভাবা যেমন ভুল হবে, তেমনি অন্য প্রদেশের মানুষ বাংলা জানেন না ভাবাটাও ঠিক নয়। 


নতুন রাজ্যপাল আসছেন জেনে এই কথাগুলি মনে হল। তাঁর নামে নিভু নিভু বাংলা জ্বলজ্বল করছে। উচ্চ পদস্থ মানুষটি লেখকও‌ বটে। অবশ্য আমাদের এখানে একই অঙ্গে বেস্ট সেলার লেখক, কবি, গায়ক, উকিল, ব্যবসায়ী, ভাষাবিদ, শিল্পী মানুষ কম নেই! ভয়টা তাই বেশি আর কি! 


নামে যদি এবার কিছু এসে যায়, তবেই চিত্তির আর কি!!


(বোকামির এককাল)

Thursday, November 10, 2022

 বোকা

শৌভিক রায় 


- স্যার...বর্ষবরণ আজ মার খেয়েছে।

- মার খেয়েছে? বর্ষবরণ? সে কি রে.... কী রে বর্ষবরণ? কী ব্যাপার।

- না স্যার, মার খাইনি। ওটা আদর। থাপ্পড় না...

- ছ্যা ছ্যা....তুই থাপ্পড় খেলি!

- ওহ...তুমি না স্যার কিচ্ছু বোঝো না...ওটা থাপ্পড় না। আদর।

- আচ্ছা বেশ। তা সেটা করল কে?

- প্রবীরবাবু।

- কেন করলেন প্রবীরবাবু?

- ওই যে তখন....

- কখন?

- আহ...শোনো না! 

- সরি সরি...বল...কখন...

- টিফিনের সময়। তখন তো একদম রক্তারক্তি খুনোখুনি ব্যাপার!

- বলিস কী! রক্তারক্তি? খুনোখুনি?? কোথায়? কিচ্ছু তো নেই কোথাও রক্তটক্ত!

- আহহা...ওটা তো কথার কথা! ঘটনাটাকে ইমপরট্যান্স দেওয়ার জন্য!

- ওহহ....সরি রে। বুঝিনি।

- তুমি বুঝবে কীভাবে? এমনিতেই বুদ্ধি কম তোমার।

- ঠিক ঠিক। খুব কম। তারপর কী হল?

- তারপর তো গেলাম তোমাদের কাছে। তোমরা তখন চা খাচ্ছ। প্রবীরবাবু ফাঁকা ছিলেন। উনি বললেন।

- কী বললেন?

- আমার জামায় এত নোংরা কেন? মাটির দাগ কীভাবে লাগল?

- তাই তো, কীভাবে লাগল?

- ওই যে হট্টগোল। মাঠে দৌড়াদৌড়ি! 

- দৌড়লে শার্ট নোংরা হয়?

- বললাম না খুনোখুনি রক্তারক্তি কাণ্ড!

- ওওওও....আচ্ছা। তা কে কাকে খুন করল?

- অস্মিত আমাকে। আর তাতেই দাগ লাগল।

- তারপর?

- প্রবীর স্যার বললেন, এরকম নোংরা করলে জামা কাচতে মায়ের কষ্ট হবে।

- হুমম...ঠিক। কষ্ট হবে।

- আমি স্যারকে বললাম, আর করব না। কিন্তু মনে মনে বললাম, মায়ের ঘণ্টা কষ্ট হবে। আমাদের ওয়াশিং মেশিন আছে! মা কাচবে কেন!

- এটা বললি?

- আহহা... এটা তো মনে মনে বললাম!!

- মুখে কী বললি?

- বললাম, মায়ের কষ্ট হবে না। নিজের জামা নিজে কাচব! 

- এটা বললি???

- এটা শুনেই তো স্যার আমাকে গালে আদর করলেন। এই বোকাগুলো ওটাকে থাপ্পড় ভেবেছে! তোমার ছাত্র তো। তোমার মতোই বোকা সব!!!!


পঞ্চম শ্রেণির বর্ষবরণ এইজন্যই খুব প্রিয় আমার।


( বোকামির এককাল )

 

Tuesday, November 8, 2022

 মেমেন্টো

শৌভিক রায় 


লোকটা যেন হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো! টানা টানা চোখ। মাথায় পাগড়ি। গোঁফ দাড়ি ভর্তি মুখ। বেশ লম্বা। সুগঠিত চেহারা। মলিন বেশ। খুব নম্র গলায় গুরু নানক আর স্বর্ণ মন্দিরের ছবি সমৃদ্ধ একটি মেমেন্টো নিতে অনুরোধ করলেন।

কোনও সর্দারজিকে এভাবে জিনিস ফিরি করতে দেখিনি। আমাদের ফালাকাটায় যে পাঞ্জাবি পরিবারগুলির ছেলে মেয়েরা আমাদের সঙ্গে বড় হয়েছে, তাদের ছিল গাড়ির ব্যবসা। যথেষ্ট ধনবান ছিল তারা। ভোগাল, কাউর পদবীর সেই মানুষগুলির সঙ্গে খুব হৃদ্যতা ছিল আমাদের। ডুয়ার্সের বিভিন্ন জনপদে, বীরপাড়ায় বা বিন্নাগুড়ি অথবা মালবাজারে, তখন বেশ ভারি সংখ্যায় দেখা যেত তাদের।

১৯৮৪ সালের পর দৃশ্যপট বদলে গেল। এখন আর পাঞ্জাবিদের সেভাবে চোখে পড়ে না। 
কিন্তু সবাই কি তারা বিত্তশালী ছিল? না। কলকাতার পথে বহু পাঞ্জাবি ট্যাক্সিচালক দেখেছি একসময়। দিল্লির কনট প্লেসে অটোচালক পাঞ্জাবিও নেহাত কম নয়। কিন্তু এই লোকটির মতো মায়াময় চেহারার এরকম ফিরিওয়ালা সর্দার এই প্রথম দেখছি!

খানিকটা মনস্তাত্বিক ব্যাপারও ছিল অবাক হওয়ার। কিছুক্ষণ আগেই স্বর্ণমন্দিরে ঢুকবার সময় আমাদের ধুলা ধূসরিত থ্যাতথেরে জুতো জমা নিচ্ছিলেন যে সুবেশ সর্দারজিরা, তাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছিল রইস আদমি সব। মার্সিডিজ বেঞ্জ থেকে নেমে লঙ্গরখানায় কর সেবার জন্যও ঢুকতে দেখলাম বেশ কয়েকজনকে। তাদের তুলনায় এই মানুষটি এত বেশি মলিন যে, বিশ্বাস হচ্ছিল না অমৃতসরের মতো জায়গায় এরকম মানুষও থাকতে পারে!

যাহোক, কিনলাম দুটি মেমেন্টো। হয়ত একটু বেশিই পড়ল। তবু নিলাম। যদি মানুষটির খানিক ব্যবসা হয় আমাকে দিয়ে ক্ষতি কি! এই দীর্ঘ ট্যুরে কতই তো খরচ করছি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে। টাকাটা হাতে নিয়ে খানিকটা আশীর্বাদের ভঙ্গীতে কিছু একটা বলে, চকচকে চোখে, খানিকটা ভাঙাচোরা দীর্ঘ চেহারা নিয়ে মানুষটি চলে গেলেন।

পরদিন সকালে, দুপুরে, বিকেলে, রাতে তন্নতন্ন করে খুঁজেও মানুষটির আর দেখা পেলাম না। ইচ্ছে ছিল ওর কাছ থেকেই কয়েকটি মেমেন্টো কিনে নিয়ে যাব প্রিয়জনদের দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোথায় যে হারিয়ে গেল লোকটা! অনেককে জিজ্ঞাসা করলাম। চেহারার বর্ণনা দিলাম। কিন্তু কেউই কোনও কিছু বলতে পারল না।

.... প্রতি বছর গুরু নানকের জন্মদিনে সেই চেহারাটা চোখে ভাসে। লম্বা সুগঠিত শরীর। টানা টানা চোখ। মায়াময় একটা মুখ। স্বর্ণ মন্দিরের ঝলমলে আলো গাছের ওপর পড়ে যে গাঢ় ছায়া ফেলেছে, সেখান দিয়ে চলে যাচ্ছেন মানুষটি.....কতদিন হল? বছর বারো তো বটেই। উনি কি আছেন আজও? থাকলেও কেমন আছেন? কোথায় আছেন? 

পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় চারদিক ভেসে গেলে, কোচবিহারে রাসযাত্রা শুরু হলে, তিনি কি আজও ফিরি করে বেড়ান সেই মেমেন্টো!!  

Tuesday, November 1, 2022


 


শিরোনাম 
শৌভিক রায় 

এই জন্যই আজ সকালে খবরের কাগজ দেখতে চায়নি সুব্রত!

কাল একবার ভেবেছিল পেপারওয়ালাকে ফোন করে আজ দিতে না করবে। কিন্তু একদিনের জন্য না করতেও কেমন যেন লাগে। হয়ত লোকটা ভাববে সে রামকিপটে... একদিন বন্ধ করে চারটে টাকা বাঁচাতে চাইছে!

অগত্যা আর কী করা। জেনেবুঝেই পেপার হাতে নেওয়া। আর তারপর থেকে মেজাজ বিগড়ে যাওয়া। 

মুশকিল হল তার মন আর মুখ আলাদা নয়। সদ্য পরিচিতরাও তার মুখ দেখে মনের কথা বুঝে যায়। তাই সেকেন্ড রাউন্ড চা দিতে এসে  বাবলির প্রশ্ন,
- কী ব্যাপার? ওভাবে বসে আছো কেন?
- কেন কীভাবে বসব তাহলে?
- কিছু তো একটা হয়েছে। কিন্তু কী!
- কী আবার হবে? কিছুই হয়নি। 
- কিছু যখন হয়নি, তাহলে ওরকম ভেবলে থেকো না। 
- যাবে তুমি!! যাবে?
- আমি তো যাবই। আমার কি আর তোমার সঙ্গে বসে থাকলে চলবে? 
- তো যাও না! যত্তসব। 

কথা আর না বাড়িয়ে বাবলি চলে গেল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিতেই আবার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল সুব্রতর। চিনি দিয়ে শেষ করেছে একেবারে! বোঝেও না যে সুগার লেভেল বেড়ে আছে। না, এখনও ওষুধ শুরু হয়নি ঠিকই, কিন্তু হতে কতক্ষণ! সাত পুরুষের কারোর সুগার না থেকেও, যদি তার সুগার লেভেল বাড়তে পারে, তবে ওষুধও শুরু হতে পারে। ডাক্তারবাবু অবশ্য ওষুধ দিতে রাজি নন। হাঁটাচলা আর ব্যায়ামের ওপর জোর দিয়েছেন। আর বারবার বলেছেন টেনশন না করতে।
কিন্তু সেটা আর হচ্ছে কোথায়! এক একটা দিন যাচ্ছে আর তার টেনশন বাড়ছে। আজ তো আরও হবে। খুব স্বাভাবিক। সেই কবে থেকেই তো ওই দিনটাতে তার মারাত্মক টেনশন হয়। আর আজ পেপার দেখে মেজাজ একেবারেই বিগড়ে আছে!

অন্যদিন এই সময় খানিকক্ষণ টিভি দেখে সে। মোটামুটি সব আপডেট নিয়ে অফিস পৌঁছায়। কিন্তু আজ আর টিভি খুলবে না। সে জানে, গতকালের রেশ এখনও চলছে। তাছাড়া এই সকালে এমন কিছু নতুন ঘটেনি যে, খবর তৈরি হবে। সে নিশ্চিন্ত এই ব্যাপারে। তার চাইতে টেনশন কমানো ভাল। একটু ট্রেড মিল করে নিলেও হয়। গতকাল থেকে জমে থাকা টেনশনটা যদি কাটে তবে! এই টেনশনটা তার হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এখন অবশ্য টেনশনের চাইতে হতাশা বেশি হয়। আর তার থেকে কেমন একটা শূন্যতা বোধ! 

খুব বেশি কিছু চেয়েছিল কি সে? নাহ! জাস্ট একটা শিরোনাম। প্রাইম নিউজে আসবে। পরের দিন কাগজে বেরোবে। এটুকুই। তাও ব্যাপারটা একবার মাত্র। এমন নয় যে, সে প্রতি বছর চাইছে। সেটা চাইবার কোনও প্রশ্নই আসছে না। কিন্তু মানুষের আশা আর পূরণ হয় ক`জনের! তারও হয়নি। হয়নি বলে টেনশন শুরু হয়েছে সেটাও নয়। হবে হবে করেই টেনশন শুরু। তারপর আশাভঙ্গ। আর এখন তো শুধুই শূন্যতা। কিন্তু সুগারের জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। তাই ট্রেড মিল এসেছে বাড়িতে। ওষুধ না শুরু করলেও রীতিমতো বাঁধা জীবন কাটাতে হচ্ছে তাকে।

শিরোনামের ইচ্ছেটা শুরু হয়েছিল অর্ককে স্কুলে ভর্তি করা থেকে। একেবারেই সুপ্ত ছিল সে ইচ্ছে। কিন্তু প্রতি বছর মাত্র দুটো দিনের জন্য তার ইচ্ছেটা ক্রমে বাড়তে লাগল। বাড়তে বাড়তে শেষদিকে সেটা এমন হল যে সুব্রত রীতিমতো স্বপ্ন দেখত.... হাসি হাসি মুখে সে আর বাবলি অর্কের দুইদিকে, অর্কের মুখ খোলা, সে সাদা রসগোল্লা তুলে দিচ্ছে অর্কের মুখে.... খবরের শিরোনামে এই ছবি। তারপর বিস্তারিত খবর। মাধ্যমিক পরীক্ষায় অর্ক রাজ্যে প্রথম দশজনের একজন হয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় বা তৃতীয় নয়, একটা হলেই হল! দশজনের একজন। তাহলেই শিরোনামটা হয়ে যেত! গর্বিত মুখে সে সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ দিত। অবশ্য বাবার কথা ওরা কম শোনে। ছাত্রের সাফল্যই বড় করে দেখায়। সেটা হলেও তো অসুবিধে ছিল না। অর্কের পরিচয় তো তার পরিচয়েই। পাড়ায়, অফিসে, শহরে তাকে দেখিয়ে সবাই ফিসফিস করত 'উনি সুব্রতবাবু, ওঁর ছেলেই এবার আমাদের শহর থেকে মাধ্যমিকে মেরিট লিস্টে এসেছে... আরে দেখলে না সেদিন নিউজ চ্যানেলের  শিরোনামে!`

সুব্রতর স্বপ্নটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেলো মাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন। মেরিট লিস্টে অর্কের জায়গা হল না কয়েকটা নাম্বারের জন্য। আগের তিন চারদিন থেকে রকেটের গতিতে যে ইচ্ছেটা ওপরে উঠছিল সেটা আচমকা মাটিতে আছড়ে পড়ল। সকাল থেকে টিভির পর্দায় চোখ রেখেছিল সুব্রত সেদিন। একে একে সব নাম ঘোষণা হয়ে গেল। সাংবাদিকরা বুম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল এর বাড়ি তার বাড়ি। চারদিকে হৈচৈ। এর ইন্টারভিউ, তার সাক্ষাৎকার। জেলাওয়ারি রেজাল্ট বিশ্লেষণ। গতবারের তুলনায় এবারের পাশের হার। মেয়েদের এগিয়ে আসা ইত্যাদি সব ভ্যানিশ হয়ে গেল সুব্রতর খোলা চোখ থেকে। তার ছেলে অর্ক যে যথেষ্ট ভাল মার্কস পেয়ে পাস করেছে, সেটা একেবারেই ভুলে গেল সে। তার চোখে শুধু শিরোনাম আর শিরোনাম। আর সেই শিরোনামে অর্কের জায়গা হল না। লোকেরা দেখতে পেলো না সে আর বাবলি অর্ককে রসগোল্লা খাওয়াচ্ছে!

ক্রমে শিরোনাম পাল্টে গেল। কিন্তু সুব্রতর মাথায় সেদিনের শিরোনাম গেঁথে রইল। 

ওই শিরোনামই সুব্রতর সুগারের ব্যারামের সূত্রপাত। অবশ্য সেদিনের পর বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেলেও তার সুগার ওই একই জায়গায়। ফলে আজ অবধি ওষুধ খেতে হয়নি। হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, খাবার কন্ট্রোল করা ইত্যাদি করেই চলে যাচ্ছে। অর্ক এখন আমেরিকায়। রিসার্চের কাজে। ওর উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্টের দিনও অনেকটা এভাবেই টিভির সামনে বসেছিল সুব্রত। সেদিন অবশ্য অনেকটা হালকা ছিল সে। তবু মনের কোনও এক গভীর কোনায় ইচ্ছেটা জেগে ছিল। এবারও সুব্রত আশা করেছিল অর্ক আসছে শিরোনামে। কিন্তু না। সেবারও অর্ক আসেনি। আবার খুব যে খারাপ করেছে সেটাও না। আর পাঁচ ছয়টা নাম্বার পেলেই হয়ে যেত। কিন্তু বিধি বাম। টিভি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অর্ককে রসগোল্লা খাওয়ানোর ছবিটা আর শিরোনামে এলো না কোনোদিনই!

এরপর জয়েন্ট দিয়ে আই আই টি হয়ে অর্ক আমেরিকায় চলে গেল ঠিকই, কিন্তু তাতে কী! এরকম কতজনই তো যাচ্ছে। আজ থেকে বছর তিরিশ চল্লিশ আগে হলেও এই যাওয়াটা নিয়ে শিরোনাম হতে পারত। কিন্তু আজকাল এসব জলভাত। খুঁজলে দেখা যাবে, প্রায় প্রতি বাড়ি থেকেই কেউ না কেউ আমেরিকা বা অন্য কোনও দেশে আছে! তাই আজও অর্কের শিরোনামে না আসাটা সুব্রত ভুলতে পারেনি। ভুলতে পারেনি এই শিরোনাম তাকে সুগার দিয়ে গেছে!

গতকাল ছিল সেই দিন। গতকাল এই বছরের মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। প্রতিদিনের মতো অফিস যাওয়ার আগে টিভি খুলে বসেছিল সুব্রত। পর্ষদ সভাপতি তখন মেরিট লিস্ট ঘোষণা করছেন। দেখা মাত্রই টিভি অফ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। এবার সারাদিন ধরে চলবে এই একই কথা। তালিকার প্রথম দিকে থাকা ছাত্র ছাত্রীর ইন্টারভিউ। কে কতক্ষণ পড়েছে, কার কজন গৃহশিক্ষক ছিল, কে কবিতা লেখে আর কে গান গায় ! সঙ্গে থাকবে বাবা-মায়ের হাসি হাসি মুখে ছেলে বা মেয়েকে রসগোল্লা খাওয়ানো। শিরোনামে বারবার দেখা যাবে এই ছবি। এভাবেই চলবে রাত অবধি। নিউজ চ্যানেলগুলোকেও দোষ দেওয়া যায় না। প্রতিযোগিতার এই ইঁদুর দৌড়ে একগাদা চ্যানেল। ঘন্টায় ঘন্টায় এত খবর তারা পাবেই বা কোথায়! তাই রেজাল্টের পোস্ট-মর্টেম না করে থামে না তারা। গতকাল সারাদিন তাই টিভি খোলেনি আর সুব্রত। আজ সকালে অভ্যাস মতো পেপার হাতে নিয়েই মেজাজ তেতো হয়ে গিয়েছিল তাই। বাবলির মিষ্টি চায়েও সেটা ঠিক হওয়ার চান্স দেখা যাচ্ছে না আর। 

- কী গো। টিভি খুললে না আজ?

বাবলির কথায় চমকে উঠল সুব্রত। 

- না মানে...খুলিনি আজ। তোমার কিছু আনতে-টানতে হবে নাকি? অফিসের একটু দেরি আছে এখনও। যদি কিছু লাগে তো বলো। এনে দিচ্ছি।
- বাব্বা! আজ সূর্য কোনদিকে উঠল। সকালে কিছু আনতে বললে তো চেঁচামেচি শুরু করো। আজ নিজে থেকে বলছি দেখি!
- এতে কী আছে। আজ সময় আছে। তাই বললাম। 
- না গো। কিছু আনার নেই আজ। রান্নাও শেষ। সুমিও সব কাজ করে চলে গেল। আজ আমিও ফ্রি হয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি।
- ভালোই তো। 
- হ্যাঁ। দাঁড়াও। টিভিটা খুলি। আমার তো সকালে দেখাই হয় না খবর টবর। আজ চান্স পেলাম। 
- হুমমম....বুঝেছি। দেখো তুমি। আমি স্নানে গেলাম। 
- এই না বললে অফিসের দেরি আছে। আবার এখনই স্নানে যাচ্ছ। বুঝিনা বাপু তোমার ব্যাপার-স্যাপার। ঠিক আছে। যাও। 

বাথরুমে ঢুকে দরজাটা লাগাতে না লাগাতেই বাবলির চিৎকারে দৌঁড়ে এলো সুব্রত,
- কী হয়েছে? এভাবে চিৎকার করছি কেন?
- দে...দেখো তো খবরটা। শিরোনামে কী যেন বলছে!
- কী বলছে? 
- তু...তুমি দেখো। আমেরিকা...
- আমেরিকা?
- হ্যাঁ 
- আমেরিকা কী?? আর কোথায় আমেরিকা? খেলার কথা বলছে তো। 
-  তুমি দেখো। 

শিরোনাম শেষ হয়ে গেল। বিজ্ঞাপন বিরতির পর এবার শুরু বিস্তারিত খবর। সুবেশী তরুণী দুঃখ  দুঃখ মুখ করে বলছে আমেরিকার এক নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অজ্ঞাত বন্দুকবাজের গুলিতে ভারতীয় গবেষক সহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে। 

সেই প্রতিষ্ঠানের নামটাও বলল সংবাদ পাঠিকা।কিন্তু বাবলির কান্নার মধ্যে ঠিক মতো শুনতে পেলো না সুব্রত।       


           


        





স্মরণে ব্রজগোপাল ঘোষ, আমার চলমান ডুয়ার্স 

শৌভিক রায়  


তাঁর শেষ ফোন এসেছিল পয়লা সেপ্টেম্বর। ঠিক দু`মাস আগে। উত্তরবঙ্গ সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায়  সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারকে নিয়ে  প্রকাশিত আমার একটি লেখার পরিপ্রেক্ষেতে তাঁর সেই ফোন। এতদিন পর সেই ফোনে তিনি আমাকে 'তুমি' সম্বোধন করলেন। 

আজ পয়লা নভেম্বরের এই অভিশপ্ত দিনে মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস জীবনের শেষ ফোনে তিনি আমার ইচ্ছেটা পূর্ণ করেছিলেন! তা না হলে খেদ রয়ে যেত আজীবন।

তিনি। তিনি ব্রজগোপাল ঘোষ। নামের আগে আর `শ্রী' বসাতে পারছি না। আজকের তারিখটাকে অভিশপ্ত বলছি তার কারণ হল ব্রজগোপালবাবু আর আমাদের মধ্যে নেই। আজ দুপুরে তিনি চলে গেছেন। ঠিক দুই বছর আগে আজকের এই দিনে হারিয়েছিলাম লক্ষ্মী নন্দী আর রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। আজ সারাদিন যখন মন বিক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে লক্ষ্মীদি আর রঞ্জনদার জন্য, তখনই এই সংবাদ। এরপরেও যদি পয়লা নভেম্বরকে অভিশপ্ত না বলি তবে কোন দিনকে বলব!!

তাঁকে আমার চলমান ডুয়ার্স মনে হত। পূর্বের সংকোশ নদী থেকে পশ্চিমের তিস্তা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগের ইতিহাস আর ভূগোল ছিল তাঁর নখদর্পনে। ডুয়ার্সের এনসাইক্লোপিডিয়া। আর চা-বাগানের? সে তো বলা বাহুল্য! আমার বিরাট সৌভাগ্য এই মানুষটির একটি লেখা 'মুজনাই'তে প্রকাশ করতে পেরেছি। সম্পাদক হিসেবে এটি আমার অন্যতম সেরা অনুভূতি। কী জানতেন না উনি ডুয়ার্স নিয়ে! ওঁর সংস্পর্শই একটা পাওনা। সৌভাগ্য আমার সেটা পেয়েছি। অবশ্য এর জন্য ঋণী থাকব শ্রী সুদীপ মজুমদারের কাছে। 

ব্যক্তি জীবনে কী অসম্ভব কষ্ট পেয়েছেন মানুষটি! তিন সন্তানের মৃত্যু দেখেছেন। শেষ সময়ে চোখ কাজ করছিল না। প্রখ্যাত ডার্মাটোলজিস্ট ডঃ কৌশিক লাহিড়ীর মা শ্রীমতি সুছন্দা লাহিড়ী বর্ধমান থেকে ফোনে নানা বই পড়ে শোনাতেন। শ্রীমতি লাহিড়ী তাসাটি চা বাগানে বড় হয়েছেন। সেখানে তাঁর প্রতিবেশী ও শিক্ষক  ছিলেন ব্রজবাবু। 

গত বছর, কোচবিহার বইমেলার আগে, একবার ফোন করলেন। জানালেন প্রখ্যাত লেখক সুকান্ত নাহার `চা ডুবুরি' বইটি প্রকাশিত হচ্ছে। যদি আমি বইটি কিনে একবার পড়ি। খুব কুন্ঠিত স্বরে এটাও বললেন, 'পাগল সুকান্ত' তাঁকে এই বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র করেছেন। আমি আগেই জানতাম এই বইটির কথা। ধারাবাহিকভাবে পড়ছিলাম সুকান্তবাবুর লেখা। কিন্তু ব্রজবাবুর আনন্দটা অনুভব করতে পারছিলাম। `সব জানি' বলে সেই আনন্দকে নষ্ট করতে চাইনি সেদিন। `চা ডুবুরি` নিয়ে আমার নিজের কিছু কথা লিখেছিলাম। সেই লেখা পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক অর্ণব সেনের মাধ্যমে পৌঁছেছিল বর্ধমানে শ্রীমতি লাহিড়ীর কাছে। তিনি পড়ে শুনিয়েছিলেন ব্রজবাবুকে। শিশুর মতো আনন্দে আবার ফোন আমাকে। সেদিন বলা তাঁর কথাগুলি মনে পড়তেই চোখ ভিজে আসছে আজ। 

ফালাকাটা শৌলমারির সাধুর কথা, চা বাগানের পুজোর কথা, ডুয়ার্সের বাঘের গল্প, রেল লাইন পাতবার কথা, চা বাগানের বদলে যাওয়ার খন্ডচিত্র ....কী না শুনেছি তাঁর কাছে! অধিকাংশটাই ফোনে, কখনও সাক্ষাতে। অত্যন্ত ভদ্র, মৃদুভাষী এবং সর্বোপরি আপাদমস্তক একজন ভালমানুষকে হারিয়ে শূন্যতা গ্রাস করছে তাই।

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। জানি। কিন্তু কিছু মৃত্যু বড্ড নাড়া দিয়ে যায়। অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষটি হয়ত কাল গুনছিলেন, হয়ত তাঁর নিজেরই বেঁচে থাকবার আর ইচ্ছে ছিল না। এসব কিছু জেনে ও মেনেও নিজেকে শান্ত করতে পারছি না। একটা অধ্যায় শেষ হলে তার রেশ তো থেকে যায় আজীবন। যেমন জলের দাগ লাগলে মোছা যায় না তা!

ভাল থাকুন স্যার। আমৃত্যু রইবে আপনার ঋণ। যা দিয়ে গেলেন তার মূল্যায়ণ হয় না। হিমালয়ের কি কখনও পরিমাপ করা যায়?

ডুয়ার্স হিমালয়....বিদায়....

( ছবিটি তুলেছিলাম তাঁর গয়েরকাটা চা বাগান কোয়ার্টারে বছর তিনি আগে)