Tuesday, November 1, 2022





স্মরণে ব্রজগোপাল ঘোষ, আমার চলমান ডুয়ার্স 

শৌভিক রায়  


তাঁর শেষ ফোন এসেছিল পয়লা সেপ্টেম্বর। ঠিক দু`মাস আগে। উত্তরবঙ্গ সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায়  সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারকে নিয়ে  প্রকাশিত আমার একটি লেখার পরিপ্রেক্ষেতে তাঁর সেই ফোন। এতদিন পর সেই ফোনে তিনি আমাকে 'তুমি' সম্বোধন করলেন। 

আজ পয়লা নভেম্বরের এই অভিশপ্ত দিনে মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস জীবনের শেষ ফোনে তিনি আমার ইচ্ছেটা পূর্ণ করেছিলেন! তা না হলে খেদ রয়ে যেত আজীবন।

তিনি। তিনি ব্রজগোপাল ঘোষ। নামের আগে আর `শ্রী' বসাতে পারছি না। আজকের তারিখটাকে অভিশপ্ত বলছি তার কারণ হল ব্রজগোপালবাবু আর আমাদের মধ্যে নেই। আজ দুপুরে তিনি চলে গেছেন। ঠিক দুই বছর আগে আজকের এই দিনে হারিয়েছিলাম লক্ষ্মী নন্দী আর রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। আজ সারাদিন যখন মন বিক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে লক্ষ্মীদি আর রঞ্জনদার জন্য, তখনই এই সংবাদ। এরপরেও যদি পয়লা নভেম্বরকে অভিশপ্ত না বলি তবে কোন দিনকে বলব!!

তাঁকে আমার চলমান ডুয়ার্স মনে হত। পূর্বের সংকোশ নদী থেকে পশ্চিমের তিস্তা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগের ইতিহাস আর ভূগোল ছিল তাঁর নখদর্পনে। ডুয়ার্সের এনসাইক্লোপিডিয়া। আর চা-বাগানের? সে তো বলা বাহুল্য! আমার বিরাট সৌভাগ্য এই মানুষটির একটি লেখা 'মুজনাই'তে প্রকাশ করতে পেরেছি। সম্পাদক হিসেবে এটি আমার অন্যতম সেরা অনুভূতি। কী জানতেন না উনি ডুয়ার্স নিয়ে! ওঁর সংস্পর্শই একটা পাওনা। সৌভাগ্য আমার সেটা পেয়েছি। অবশ্য এর জন্য ঋণী থাকব শ্রী সুদীপ মজুমদারের কাছে। 

ব্যক্তি জীবনে কী অসম্ভব কষ্ট পেয়েছেন মানুষটি! তিন সন্তানের মৃত্যু দেখেছেন। শেষ সময়ে চোখ কাজ করছিল না। প্রখ্যাত ডার্মাটোলজিস্ট ডঃ কৌশিক লাহিড়ীর মা শ্রীমতি সুছন্দা লাহিড়ী বর্ধমান থেকে ফোনে নানা বই পড়ে শোনাতেন। শ্রীমতি লাহিড়ী তাসাটি চা বাগানে বড় হয়েছেন। সেখানে তাঁর প্রতিবেশী ও শিক্ষক  ছিলেন ব্রজবাবু। 

গত বছর, কোচবিহার বইমেলার আগে, একবার ফোন করলেন। জানালেন প্রখ্যাত লেখক সুকান্ত নাহার `চা ডুবুরি' বইটি প্রকাশিত হচ্ছে। যদি আমি বইটি কিনে একবার পড়ি। খুব কুন্ঠিত স্বরে এটাও বললেন, 'পাগল সুকান্ত' তাঁকে এই বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র করেছেন। আমি আগেই জানতাম এই বইটির কথা। ধারাবাহিকভাবে পড়ছিলাম সুকান্তবাবুর লেখা। কিন্তু ব্রজবাবুর আনন্দটা অনুভব করতে পারছিলাম। `সব জানি' বলে সেই আনন্দকে নষ্ট করতে চাইনি সেদিন। `চা ডুবুরি` নিয়ে আমার নিজের কিছু কথা লিখেছিলাম। সেই লেখা পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক অর্ণব সেনের মাধ্যমে পৌঁছেছিল বর্ধমানে শ্রীমতি লাহিড়ীর কাছে। তিনি পড়ে শুনিয়েছিলেন ব্রজবাবুকে। শিশুর মতো আনন্দে আবার ফোন আমাকে। সেদিন বলা তাঁর কথাগুলি মনে পড়তেই চোখ ভিজে আসছে আজ। 

ফালাকাটা শৌলমারির সাধুর কথা, চা বাগানের পুজোর কথা, ডুয়ার্সের বাঘের গল্প, রেল লাইন পাতবার কথা, চা বাগানের বদলে যাওয়ার খন্ডচিত্র ....কী না শুনেছি তাঁর কাছে! অধিকাংশটাই ফোনে, কখনও সাক্ষাতে। অত্যন্ত ভদ্র, মৃদুভাষী এবং সর্বোপরি আপাদমস্তক একজন ভালমানুষকে হারিয়ে শূন্যতা গ্রাস করছে তাই।

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। জানি। কিন্তু কিছু মৃত্যু বড্ড নাড়া দিয়ে যায়। অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষটি হয়ত কাল গুনছিলেন, হয়ত তাঁর নিজেরই বেঁচে থাকবার আর ইচ্ছে ছিল না। এসব কিছু জেনে ও মেনেও নিজেকে শান্ত করতে পারছি না। একটা অধ্যায় শেষ হলে তার রেশ তো থেকে যায় আজীবন। যেমন জলের দাগ লাগলে মোছা যায় না তা!

ভাল থাকুন স্যার। আমৃত্যু রইবে আপনার ঋণ। যা দিয়ে গেলেন তার মূল্যায়ণ হয় না। হিমালয়ের কি কখনও পরিমাপ করা যায়?

ডুয়ার্স হিমালয়....বিদায়....

( ছবিটি তুলেছিলাম তাঁর গয়েরকাটা চা বাগান কোয়ার্টারে বছর তিনি আগে) 


          
 

No comments: