Tuesday, November 8, 2022

 মেমেন্টো

শৌভিক রায় 


লোকটা যেন হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো! টানা টানা চোখ। মাথায় পাগড়ি। গোঁফ দাড়ি ভর্তি মুখ। বেশ লম্বা। সুগঠিত চেহারা। মলিন বেশ। খুব নম্র গলায় গুরু নানক আর স্বর্ণ মন্দিরের ছবি সমৃদ্ধ একটি মেমেন্টো নিতে অনুরোধ করলেন।

কোনও সর্দারজিকে এভাবে জিনিস ফিরি করতে দেখিনি। আমাদের ফালাকাটায় যে পাঞ্জাবি পরিবারগুলির ছেলে মেয়েরা আমাদের সঙ্গে বড় হয়েছে, তাদের ছিল গাড়ির ব্যবসা। যথেষ্ট ধনবান ছিল তারা। ভোগাল, কাউর পদবীর সেই মানুষগুলির সঙ্গে খুব হৃদ্যতা ছিল আমাদের। ডুয়ার্সের বিভিন্ন জনপদে, বীরপাড়ায় বা বিন্নাগুড়ি অথবা মালবাজারে, তখন বেশ ভারি সংখ্যায় দেখা যেত তাদের।

১৯৮৪ সালের পর দৃশ্যপট বদলে গেল। এখন আর পাঞ্জাবিদের সেভাবে চোখে পড়ে না। 
কিন্তু সবাই কি তারা বিত্তশালী ছিল? না। কলকাতার পথে বহু পাঞ্জাবি ট্যাক্সিচালক দেখেছি একসময়। দিল্লির কনট প্লেসে অটোচালক পাঞ্জাবিও নেহাত কম নয়। কিন্তু এই লোকটির মতো মায়াময় চেহারার এরকম ফিরিওয়ালা সর্দার এই প্রথম দেখছি!

খানিকটা মনস্তাত্বিক ব্যাপারও ছিল অবাক হওয়ার। কিছুক্ষণ আগেই স্বর্ণমন্দিরে ঢুকবার সময় আমাদের ধুলা ধূসরিত থ্যাতথেরে জুতো জমা নিচ্ছিলেন যে সুবেশ সর্দারজিরা, তাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছিল রইস আদমি সব। মার্সিডিজ বেঞ্জ থেকে নেমে লঙ্গরখানায় কর সেবার জন্যও ঢুকতে দেখলাম বেশ কয়েকজনকে। তাদের তুলনায় এই মানুষটি এত বেশি মলিন যে, বিশ্বাস হচ্ছিল না অমৃতসরের মতো জায়গায় এরকম মানুষও থাকতে পারে!

যাহোক, কিনলাম দুটি মেমেন্টো। হয়ত একটু বেশিই পড়ল। তবু নিলাম। যদি মানুষটির খানিক ব্যবসা হয় আমাকে দিয়ে ক্ষতি কি! এই দীর্ঘ ট্যুরে কতই তো খরচ করছি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে। টাকাটা হাতে নিয়ে খানিকটা আশীর্বাদের ভঙ্গীতে কিছু একটা বলে, চকচকে চোখে, খানিকটা ভাঙাচোরা দীর্ঘ চেহারা নিয়ে মানুষটি চলে গেলেন।

পরদিন সকালে, দুপুরে, বিকেলে, রাতে তন্নতন্ন করে খুঁজেও মানুষটির আর দেখা পেলাম না। ইচ্ছে ছিল ওর কাছ থেকেই কয়েকটি মেমেন্টো কিনে নিয়ে যাব প্রিয়জনদের দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোথায় যে হারিয়ে গেল লোকটা! অনেককে জিজ্ঞাসা করলাম। চেহারার বর্ণনা দিলাম। কিন্তু কেউই কোনও কিছু বলতে পারল না।

.... প্রতি বছর গুরু নানকের জন্মদিনে সেই চেহারাটা চোখে ভাসে। লম্বা সুগঠিত শরীর। টানা টানা চোখ। মায়াময় একটা মুখ। স্বর্ণ মন্দিরের ঝলমলে আলো গাছের ওপর পড়ে যে গাঢ় ছায়া ফেলেছে, সেখান দিয়ে চলে যাচ্ছেন মানুষটি.....কতদিন হল? বছর বারো তো বটেই। উনি কি আছেন আজও? থাকলেও কেমন আছেন? কোথায় আছেন? 

পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় চারদিক ভেসে গেলে, কোচবিহারে রাসযাত্রা শুরু হলে, তিনি কি আজও ফিরি করে বেড়ান সেই মেমেন্টো!!  

No comments: