Tuesday, November 1, 2022


 


শিরোনাম 
শৌভিক রায় 

এই জন্যই আজ সকালে খবরের কাগজ দেখতে চায়নি সুব্রত!

কাল একবার ভেবেছিল পেপারওয়ালাকে ফোন করে আজ দিতে না করবে। কিন্তু একদিনের জন্য না করতেও কেমন যেন লাগে। হয়ত লোকটা ভাববে সে রামকিপটে... একদিন বন্ধ করে চারটে টাকা বাঁচাতে চাইছে!

অগত্যা আর কী করা। জেনেবুঝেই পেপার হাতে নেওয়া। আর তারপর থেকে মেজাজ বিগড়ে যাওয়া। 

মুশকিল হল তার মন আর মুখ আলাদা নয়। সদ্য পরিচিতরাও তার মুখ দেখে মনের কথা বুঝে যায়। তাই সেকেন্ড রাউন্ড চা দিতে এসে  বাবলির প্রশ্ন,
- কী ব্যাপার? ওভাবে বসে আছো কেন?
- কেন কীভাবে বসব তাহলে?
- কিছু তো একটা হয়েছে। কিন্তু কী!
- কী আবার হবে? কিছুই হয়নি। 
- কিছু যখন হয়নি, তাহলে ওরকম ভেবলে থেকো না। 
- যাবে তুমি!! যাবে?
- আমি তো যাবই। আমার কি আর তোমার সঙ্গে বসে থাকলে চলবে? 
- তো যাও না! যত্তসব। 

কথা আর না বাড়িয়ে বাবলি চলে গেল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিতেই আবার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল সুব্রতর। চিনি দিয়ে শেষ করেছে একেবারে! বোঝেও না যে সুগার লেভেল বেড়ে আছে। না, এখনও ওষুধ শুরু হয়নি ঠিকই, কিন্তু হতে কতক্ষণ! সাত পুরুষের কারোর সুগার না থেকেও, যদি তার সুগার লেভেল বাড়তে পারে, তবে ওষুধও শুরু হতে পারে। ডাক্তারবাবু অবশ্য ওষুধ দিতে রাজি নন। হাঁটাচলা আর ব্যায়ামের ওপর জোর দিয়েছেন। আর বারবার বলেছেন টেনশন না করতে।
কিন্তু সেটা আর হচ্ছে কোথায়! এক একটা দিন যাচ্ছে আর তার টেনশন বাড়ছে। আজ তো আরও হবে। খুব স্বাভাবিক। সেই কবে থেকেই তো ওই দিনটাতে তার মারাত্মক টেনশন হয়। আর আজ পেপার দেখে মেজাজ একেবারেই বিগড়ে আছে!

অন্যদিন এই সময় খানিকক্ষণ টিভি দেখে সে। মোটামুটি সব আপডেট নিয়ে অফিস পৌঁছায়। কিন্তু আজ আর টিভি খুলবে না। সে জানে, গতকালের রেশ এখনও চলছে। তাছাড়া এই সকালে এমন কিছু নতুন ঘটেনি যে, খবর তৈরি হবে। সে নিশ্চিন্ত এই ব্যাপারে। তার চাইতে টেনশন কমানো ভাল। একটু ট্রেড মিল করে নিলেও হয়। গতকাল থেকে জমে থাকা টেনশনটা যদি কাটে তবে! এই টেনশনটা তার হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এখন অবশ্য টেনশনের চাইতে হতাশা বেশি হয়। আর তার থেকে কেমন একটা শূন্যতা বোধ! 

খুব বেশি কিছু চেয়েছিল কি সে? নাহ! জাস্ট একটা শিরোনাম। প্রাইম নিউজে আসবে। পরের দিন কাগজে বেরোবে। এটুকুই। তাও ব্যাপারটা একবার মাত্র। এমন নয় যে, সে প্রতি বছর চাইছে। সেটা চাইবার কোনও প্রশ্নই আসছে না। কিন্তু মানুষের আশা আর পূরণ হয় ক`জনের! তারও হয়নি। হয়নি বলে টেনশন শুরু হয়েছে সেটাও নয়। হবে হবে করেই টেনশন শুরু। তারপর আশাভঙ্গ। আর এখন তো শুধুই শূন্যতা। কিন্তু সুগারের জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। তাই ট্রেড মিল এসেছে বাড়িতে। ওষুধ না শুরু করলেও রীতিমতো বাঁধা জীবন কাটাতে হচ্ছে তাকে।

শিরোনামের ইচ্ছেটা শুরু হয়েছিল অর্ককে স্কুলে ভর্তি করা থেকে। একেবারেই সুপ্ত ছিল সে ইচ্ছে। কিন্তু প্রতি বছর মাত্র দুটো দিনের জন্য তার ইচ্ছেটা ক্রমে বাড়তে লাগল। বাড়তে বাড়তে শেষদিকে সেটা এমন হল যে সুব্রত রীতিমতো স্বপ্ন দেখত.... হাসি হাসি মুখে সে আর বাবলি অর্কের দুইদিকে, অর্কের মুখ খোলা, সে সাদা রসগোল্লা তুলে দিচ্ছে অর্কের মুখে.... খবরের শিরোনামে এই ছবি। তারপর বিস্তারিত খবর। মাধ্যমিক পরীক্ষায় অর্ক রাজ্যে প্রথম দশজনের একজন হয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় বা তৃতীয় নয়, একটা হলেই হল! দশজনের একজন। তাহলেই শিরোনামটা হয়ে যেত! গর্বিত মুখে সে সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ দিত। অবশ্য বাবার কথা ওরা কম শোনে। ছাত্রের সাফল্যই বড় করে দেখায়। সেটা হলেও তো অসুবিধে ছিল না। অর্কের পরিচয় তো তার পরিচয়েই। পাড়ায়, অফিসে, শহরে তাকে দেখিয়ে সবাই ফিসফিস করত 'উনি সুব্রতবাবু, ওঁর ছেলেই এবার আমাদের শহর থেকে মাধ্যমিকে মেরিট লিস্টে এসেছে... আরে দেখলে না সেদিন নিউজ চ্যানেলের  শিরোনামে!`

সুব্রতর স্বপ্নটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেলো মাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন। মেরিট লিস্টে অর্কের জায়গা হল না কয়েকটা নাম্বারের জন্য। আগের তিন চারদিন থেকে রকেটের গতিতে যে ইচ্ছেটা ওপরে উঠছিল সেটা আচমকা মাটিতে আছড়ে পড়ল। সকাল থেকে টিভির পর্দায় চোখ রেখেছিল সুব্রত সেদিন। একে একে সব নাম ঘোষণা হয়ে গেল। সাংবাদিকরা বুম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল এর বাড়ি তার বাড়ি। চারদিকে হৈচৈ। এর ইন্টারভিউ, তার সাক্ষাৎকার। জেলাওয়ারি রেজাল্ট বিশ্লেষণ। গতবারের তুলনায় এবারের পাশের হার। মেয়েদের এগিয়ে আসা ইত্যাদি সব ভ্যানিশ হয়ে গেল সুব্রতর খোলা চোখ থেকে। তার ছেলে অর্ক যে যথেষ্ট ভাল মার্কস পেয়ে পাস করেছে, সেটা একেবারেই ভুলে গেল সে। তার চোখে শুধু শিরোনাম আর শিরোনাম। আর সেই শিরোনামে অর্কের জায়গা হল না। লোকেরা দেখতে পেলো না সে আর বাবলি অর্ককে রসগোল্লা খাওয়াচ্ছে!

ক্রমে শিরোনাম পাল্টে গেল। কিন্তু সুব্রতর মাথায় সেদিনের শিরোনাম গেঁথে রইল। 

ওই শিরোনামই সুব্রতর সুগারের ব্যারামের সূত্রপাত। অবশ্য সেদিনের পর বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেলেও তার সুগার ওই একই জায়গায়। ফলে আজ অবধি ওষুধ খেতে হয়নি। হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, খাবার কন্ট্রোল করা ইত্যাদি করেই চলে যাচ্ছে। অর্ক এখন আমেরিকায়। রিসার্চের কাজে। ওর উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্টের দিনও অনেকটা এভাবেই টিভির সামনে বসেছিল সুব্রত। সেদিন অবশ্য অনেকটা হালকা ছিল সে। তবু মনের কোনও এক গভীর কোনায় ইচ্ছেটা জেগে ছিল। এবারও সুব্রত আশা করেছিল অর্ক আসছে শিরোনামে। কিন্তু না। সেবারও অর্ক আসেনি। আবার খুব যে খারাপ করেছে সেটাও না। আর পাঁচ ছয়টা নাম্বার পেলেই হয়ে যেত। কিন্তু বিধি বাম। টিভি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অর্ককে রসগোল্লা খাওয়ানোর ছবিটা আর শিরোনামে এলো না কোনোদিনই!

এরপর জয়েন্ট দিয়ে আই আই টি হয়ে অর্ক আমেরিকায় চলে গেল ঠিকই, কিন্তু তাতে কী! এরকম কতজনই তো যাচ্ছে। আজ থেকে বছর তিরিশ চল্লিশ আগে হলেও এই যাওয়াটা নিয়ে শিরোনাম হতে পারত। কিন্তু আজকাল এসব জলভাত। খুঁজলে দেখা যাবে, প্রায় প্রতি বাড়ি থেকেই কেউ না কেউ আমেরিকা বা অন্য কোনও দেশে আছে! তাই আজও অর্কের শিরোনামে না আসাটা সুব্রত ভুলতে পারেনি। ভুলতে পারেনি এই শিরোনাম তাকে সুগার দিয়ে গেছে!

গতকাল ছিল সেই দিন। গতকাল এই বছরের মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। প্রতিদিনের মতো অফিস যাওয়ার আগে টিভি খুলে বসেছিল সুব্রত। পর্ষদ সভাপতি তখন মেরিট লিস্ট ঘোষণা করছেন। দেখা মাত্রই টিভি অফ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। এবার সারাদিন ধরে চলবে এই একই কথা। তালিকার প্রথম দিকে থাকা ছাত্র ছাত্রীর ইন্টারভিউ। কে কতক্ষণ পড়েছে, কার কজন গৃহশিক্ষক ছিল, কে কবিতা লেখে আর কে গান গায় ! সঙ্গে থাকবে বাবা-মায়ের হাসি হাসি মুখে ছেলে বা মেয়েকে রসগোল্লা খাওয়ানো। শিরোনামে বারবার দেখা যাবে এই ছবি। এভাবেই চলবে রাত অবধি। নিউজ চ্যানেলগুলোকেও দোষ দেওয়া যায় না। প্রতিযোগিতার এই ইঁদুর দৌড়ে একগাদা চ্যানেল। ঘন্টায় ঘন্টায় এত খবর তারা পাবেই বা কোথায়! তাই রেজাল্টের পোস্ট-মর্টেম না করে থামে না তারা। গতকাল সারাদিন তাই টিভি খোলেনি আর সুব্রত। আজ সকালে অভ্যাস মতো পেপার হাতে নিয়েই মেজাজ তেতো হয়ে গিয়েছিল তাই। বাবলির মিষ্টি চায়েও সেটা ঠিক হওয়ার চান্স দেখা যাচ্ছে না আর। 

- কী গো। টিভি খুললে না আজ?

বাবলির কথায় চমকে উঠল সুব্রত। 

- না মানে...খুলিনি আজ। তোমার কিছু আনতে-টানতে হবে নাকি? অফিসের একটু দেরি আছে এখনও। যদি কিছু লাগে তো বলো। এনে দিচ্ছি।
- বাব্বা! আজ সূর্য কোনদিকে উঠল। সকালে কিছু আনতে বললে তো চেঁচামেচি শুরু করো। আজ নিজে থেকে বলছি দেখি!
- এতে কী আছে। আজ সময় আছে। তাই বললাম। 
- না গো। কিছু আনার নেই আজ। রান্নাও শেষ। সুমিও সব কাজ করে চলে গেল। আজ আমিও ফ্রি হয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি।
- ভালোই তো। 
- হ্যাঁ। দাঁড়াও। টিভিটা খুলি। আমার তো সকালে দেখাই হয় না খবর টবর। আজ চান্স পেলাম। 
- হুমমম....বুঝেছি। দেখো তুমি। আমি স্নানে গেলাম। 
- এই না বললে অফিসের দেরি আছে। আবার এখনই স্নানে যাচ্ছ। বুঝিনা বাপু তোমার ব্যাপার-স্যাপার। ঠিক আছে। যাও। 

বাথরুমে ঢুকে দরজাটা লাগাতে না লাগাতেই বাবলির চিৎকারে দৌঁড়ে এলো সুব্রত,
- কী হয়েছে? এভাবে চিৎকার করছি কেন?
- দে...দেখো তো খবরটা। শিরোনামে কী যেন বলছে!
- কী বলছে? 
- তু...তুমি দেখো। আমেরিকা...
- আমেরিকা?
- হ্যাঁ 
- আমেরিকা কী?? আর কোথায় আমেরিকা? খেলার কথা বলছে তো। 
-  তুমি দেখো। 

শিরোনাম শেষ হয়ে গেল। বিজ্ঞাপন বিরতির পর এবার শুরু বিস্তারিত খবর। সুবেশী তরুণী দুঃখ  দুঃখ মুখ করে বলছে আমেরিকার এক নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অজ্ঞাত বন্দুকবাজের গুলিতে ভারতীয় গবেষক সহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে। 

সেই প্রতিষ্ঠানের নামটাও বলল সংবাদ পাঠিকা।কিন্তু বাবলির কান্নার মধ্যে ঠিক মতো শুনতে পেলো না সুব্রত।       


           


        

No comments: