Friday, October 28, 2022
Wednesday, October 26, 2022
শৌভিক রায়
যে গ্রামের নাম টিরনা, সে সুন্দর হবেই। চেরাপুঞ্জির বাজার থেকে একুশ কিমির যাত্রায় ভাবছিলাম সেটাই। ভাবনাটা মিলে গেল। ছবির মতো এরকম সুন্দর জনপদ দেখিনি আগে।
এখান থেকেই গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নামতে হবে ৩৫০০ সিঁড়ি। পথে পড়বে দু-দু'টো ঝুলন্ত ফুটব্রিজ আর তার নীচে ভীমবেগে বয়ে চলা পাহাড়ী নদী! যাচ্ছি লিভিঙ রুটব্রিজ দেখতে। নির্দিষ্ট করে বললে ডাবল ডেকার লিভিঙ রুটব্রিজ দেখতে। এটা দেখতেই আসা চেরাপুঞ্জিতে।
মেঘালয়ের এই অংশে অত্যাধিক বৃষ্টিপাতের ও ট্রপিক্যাল ফরেস্টের জন্য প্রকৃতি দুর্গম। খাসি প্রজাতির লোকেরা তাই অভিনব পদ্ধতিতে ব্রিজ বানিয়ে থাকেন। বয়স্ক রাবার গাছের শেকড়গুলিকে তারা এমনভাবে লালন করেন যে, সেগুলি ব্রিজের আকার নেয়। নদীর ওপরে যেখানে চলাচল অসম্ভব, সেখানে এই রুটব্রিজই ভরসা। প্রায় বছর পনের লাগে একটি রুটব্রিজ তৈরী করতে। কেননা শেকড়কে হতে হয় ততটাই শক্ত যাতে সে মানুষের ওজন নিতে পারে। একবার তৈরী হলে রুটব্রিজ টিকে যেতে পারে পাঁচশো বছর।
টিরনা থেকে ৩৫০০ সিঁড়ি ভেঙে উমশিয়াং যাবার কারন এই রুটব্রিজ।এই ব্রিজটি ডাবলডেকার, অর্থাৎ দু'টো তল এর। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি জানাচ্ছে, পৃথিবীতে এরকম ব্রিজ এই একটিই। আরও কান্ড হ'ল, ব্রিজ নির্মিত নয়, গড়ে উঠেছে নিজেই!
ট্রেক আগেও করেছি। সিঁড়িও ভেঙেছি পালিতানা, পক্ষীতীর্থম বা শ্রাবণবেলগোলায়। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা আলাদা। এই সিঁড়িগুলো অনেকটা বেশী খাড়াই। চাপাও। তাই পায়ের ওপর চাপ পড়ছে তুলনায় বেশী। নজর রাখতে হচ্ছে তীক্ষ্ণ, যাতে পা ঠিক জায়গায় পড়ে। কোথাও কোথাও টানা আটশো সিঁড়ি নেমে গেছে। চারদিকে পাহাড় আর গভীর জঙ্গল। কোনও কোনও জায়গায় অরণ্য এত দুর্ভেদ্য, আলোও ঢোকে না ঠিকঠাক। রাস্তা জনশূন্য।
একবার থামতে হ'ল। রাস্তা নেই। সামনে পাহাড়ী নদী। ঝুলছে ফুটব্রিজ। তাতে খানিক এগোতেই শুরু হ'ল দুলুনি। নীচে বিরাট বিরাট পাথর আর তার ফাঁকফোকড় দিয়ে বইছে প্রবল বেগে নদী। দাঁতে দাঁত চেপে পৌঁছে গেলাম ওপারে। আবার শুরু ওঠা। খানিকটা এগোতেই আবার একটি ব্রিজ। এটি অনেকটা লম্বা। তবে ভয় কেটে গেছে। সামান্য যেতেই দেখা হয়ে গেল একটি রুটব্রিজ সঙ্গে। বসে পড়ি আনন্দে। পুত্র তাগাদা দেয়। থামা চলবে না। এখনও গন্তব্য আসে নি। তাই এগিয়ে যাই। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে আর বোধহয় পারবো না। তবু এক অদম্য জেদ নিয়ে চলতে থাকি।
অবশেষে চোখের সামনে ডাবল ডেকার লিভিং রুটব্রিজ। বিশ্বাসই করতে পারছি না। একটি গাছ থেকে শেকড় বেরিয়ে দু'টো ব্রিজ হয়ে ওপরে নীচে দাঁড়িয়ে আছে ! বেশ লম্বা। নীচে বইছে নদী। শোনা যাচ্ছে পাথরের বুকে আছড়ে পড়া জলের শব্দ। ঝুলছে সরু সরু ঝুরি। নদীতে সামান্য দূরে দু'একজন কাপড় ধুচ্ছে। বড় বড় পাথরের অনেকগুলিতেই শ্যাওলা জমে পেছল পেছল ভাব। নদীর স্বচ্ছ জলে মাছের দল। চোখের সামনে বিশ্বের একবোদ্বিতীয়ম ডাবল ডেকার রুটব্রিজ। নিমেষেই মিলিয়ে যায় সব ক্লান্তি। প্রণাম করি সেই বৃক্ষকে। তার সহনশীলতা মুহূর্তেই পড়িয়ে দেয় জীবনের পাঠ।
ফিরতি পথে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা কেবল। বুকে হাঁপ ধরে ভীষণ। থেমে থেমে চলি। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে। প্রতি মুহূর্তেই মনে হয় আর বোধহয় পারবো না। কিন্তু যে সহনশীলতার শিক্ষা মাত্র নিয়ে এলাম বৃক্ষের থেকে, উজ্জীবিত করে সে-ই। এগোই। থামি। আবার এগোই। আমাকে পেরিয়ে যান স্থানীয় এক বৃদ্ধ ও এক প্রৌঢ়া। মৃদু হাসেন। প্রৌঢ়া বলেন, "ওয়াক স্লোলি।" হাসি। সত্যিই বলেছেন। ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে এক সময় শেষ হয় সিঁড়ি। উঠে আসি টিরনা গ্রামে। কোমরে, পায়ে তখন অসম্ভব ব্যথা শুরু হয়েছে। দরদর করে ঘামছি। বুকে চাপ চাপ ব্যথা। গাইড টাকা নেয়। হ্যান্ডসেক করে। বলে, "কাম এগেন।" মাথা নেড়ে বলি, "ইয়েস আই মাস্ট।"
( প্রকাশিত: http://www.khonjporibar.com )
Tuesday, October 25, 2022
Friday, October 21, 2022
।। নিজের ভাবনায়।।
শৌভিক রায়
অগ্রজ শ্রদ্ধেয় প্রিয় শিক্ষক বলেছিলেন, কয়লা খেয়েছ, আংরা তো বেরোবেই!
সেদিন কথাটি বাড়াবাড়ি মনে হলেও আজ বুঝি আঙরার বাড়বাড়ন্ত।
সর্বব্যাপী এই আংরাই এখন আমাদের ভবিতব্য। কেননা আবার আমরা কয়লা খাবো। না জেনে নয়, জেনে ও বুঝেই গ্রহণ করব সেটা। ফল? আবার আংরা সৃষ্টি হবে। আবার ডুববে বহুজন। পিঠ ঠেকবে দেওয়ালে। প্রতিবাদে সক্রিয় হলে নির্লজ্জ কিছু দলদাসকে নামানো হবে অন্ধকারে!
তারপর রাতি পোহাইলে কিছু পাখি রব করিবে। উহারা সেইটিই করিয়া থাকে। উদ্বেগের কিছু নাই তাহাতে। কেননা কাননে কুসুমকলি দেখিলেই উহারা থামিয়াও যাইবে, কয়লা ভক্ষণেও উদ্যোগী হইবে.....
Tuesday, October 18, 2022
ডুয়ার্সের পথে পথে এই পুজোতে
শৌভিক রায়
Sunday, October 16, 2022
একটি পুরষ্কার ও কিছু না বলা কথা
শৌভিক রায়
সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা ভীষণ মনে পড়ছে! সেই ছোট্ট ছেলেটা যে দিনহাটা গার্লস স্কুলের লোহার গেটটা ঝাঁকিয়ে চলেছে আর চিৎকার করে বলছে গেটটা খুলে দিতে।
আজ রেজাল্টের দিন। তার নিজেরও রেজাল্ট বেরিয়েছে। গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সে দৌড়ে চলে এসেছে মায়ের কাছে। কিন্তু মায়ের স্কুলের গেট বন্ধ। গেটের বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি। সেই ছোট্ট ছেলের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যাচ্ছে তীব্র কোলাহলে। কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না যে, কী করবে! তার মতো ছোট্ট ছেলের কাছে এই দিনহাটা শহর এক বিরাট জায়গা। বাবা থাকেন ভিন শহরে। বাড়িতে অন্যান্যরা থাকলেও, মা ও মায়ের সহকর্মীদের ঘিরেই তার জগৎ। অন্য দিন সে সোজা ঢুকে পড়ে স্কুলের ভেতর। কিন্তু আজ কিছুতেই গেট খুলছে না। দিশেহারা সে। কী করবে, কোথায় যাবে কিছুতেই বুঝতে পারছে না! তার তখন কান্নার উপক্রম। এর মধ্যেই কেউ একজন বলে উঠল, 'এই ছেলেটা বোধহয় ফেল করেছে। কীরকম কান্না কান্না মুখ!` নিজের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া ছেলেটির সে কথার উত্তর দেওয়ার স্পৃহাও আর নেই। সে একান্ত চাইছে মায়ের স্কুলে ঢুকতে, মাকে জানাতে তার রেজাল্ট। কিন্তু কোথায় গার্লস স্কুলের শিক্ষাকর্মী রামেশ্বরদা বা রতনদা কিংবা লাবণ্যমাসি। কে খুলে দেবে গেট!!
হঠাৎ ছেলেটির পিঠে কেউ হাত রাখল। মুখ ঘুরিয়ে ছেলেটি দেখল তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে প্রিয় রাজাদা। অন্যদিন অনেকসময় সে আর রাজাদা একসঙ্গে মায়ের স্কুলে আসে। আজ রাজাদা পরে এসেছে। রাজাদাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। প্রাণ ফিরে পেল। রাজাদা ততক্ষনে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। রাজাদার ছোট্ট হাত দুটো হয়ে উঠেছে আশ্রয়ের হাত! তিরতির করে কাঁপতে থাকা ছোট্ট ছেলেটি ধীরে ধীরে শান্ত হয় এরপর....
পরের ঘটনা সহজবোধ্য। স্কুলের গেট খুলেছিল। সে এবং রাজাদা স্কুলে ঢুকেছিল। তাদের রেজাল্ট দেখে মায়েরা আনন্দ পেয়েছিলেন। ঝর্ণামাসি, প্রতিমামাসি, সন্ধ্যামাসি বা মানি, গৌরীপিসি, ইলামসি, জয়তীপিসি আর অতি অবশ্যই বেলামসি তাদের আদর করেছিলেন। বেলামসি তো চুলের বেণী ঝুলিয়ে দিয়ে ছেলেটিকে বলেছিলেন অন্যান্য দিনের মতো চুল ধরে ঝুলতে। রাশভারী সন্ধ্যামাসি গাল টিপে দিয়েছিলেন। প্রধানশিক্ষিকা মুকুলমাসি আর একটা পান মুখে দিয়ে আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। ঝর্ণামাসি বলেছিলেন, তাদের বাড়িতে গেলে ঘুঘনি করে খাওয়াবেন। খানিক আগের সেই বিচলিত অবস্থা থেকে উদ্ধার পেয়ে ছেলে তখন নিশ্চিন্ত। ইতিমধ্যে চলে এসেছে রিঙ্কু, রূপা, বাবুদা, ইমন, তানিয়া। জমে উঠেছে তাদের খেলা।
সেদিনের সেই ছেলেটি আজকের আমি। সেদিনের সেই সাহচর্যের হাত পিঠে রাখা রাজাদা আসলে অনির্বাণ নাগ। ঝর্ণামাসি হলেন রাজাদার মা। বাকি যে নামগুলি বললাম তাঁরা ছিলেন দিনহাটা গার্লস স্কুলের দিদিমনি। চুল খুলে দিতেন যিনি তিনি জননেতা কমল গুহর স্ত্রী প্রয়াত বেলা গুহ, যাঁর বড় মেয়ে ইন্দ্রানীদি আজও আমার খোঁজ নেন। মানি বা সন্ধ্যা সাহা সহ বাকি দিদিমণিদেরও চেনেন কম বেশি সবাই।
আসলে দিনহাটা মানে আমার কাছে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। প্রাইমারি স্কুল ওখানে শুরু করলেও ক্লাস থ্রি-তে উঠে আমি চলে গিয়েছিলাম ফালাকাটায় বাবার কাছে। বাবা নিজের কর্মজীবনের শুরুতে ছিলেন দিনহাটা হাই স্কুলে। কিন্তু আমার জন্মের আগে ফালাকাটায় চলে যান হেডমাস্টার হয়ে। সেই অর্থে আমার খুব ছোটবেলা ছিল বাবাকে ছাড়া। আবার ফালাকাটায় চলে গেলে মা ছাড়াই থাকতে হয়েছে অনেকগুলি বছর। পরে অবশ্য মা-ও ফালাকাটায় চলে যান। কিন্তু মূল বাড়ি এবং কলেজ জীবন দিনহাটায় হওয়ার সুবাদে এখানকার রাস্তাঘাট, মানুষজন সবই আমার একান্ত আপন। তাই আজও মহামায়া পাট হয়ে হাটখোলার দিকে গেলেই তেল-ডাল-চাল-নুন-তামাক সব মিলেমিশে থাকা সেই অদ্ভুত গন্ধ যেমন পাই, তেমনি থানার পুকুরের বিরাট বট গাছটার ফাঁকে দিয়ে ছোটবেলার আশ্বিন রাতের নীল আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখি। কোনও এক মহালয়ার সকালে মা সন্তোষী বাসটির ধাক্কায় নিহত হরতোষ চক্রবর্তী যেমন আজও স্বপ্নে আসেন, তেমনি মনের চোখে দেখি আমাদের বাড়ির সামনের মসজিদের পাশে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা কাবুলিওয়ালা মির্জা খান সাইকেলে চাপিয়ে আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ছোট মেয়ে দেখলেই বলছেন, 'শুববু...এই লেড়কি কো বিয়া করবে?' দিনহাটা মানে আজও নবপল্লব পত্রিকার ক্ষুদে সম্পাদক পাজামা পাঞ্জাবি পরা অমিত কুমার দে-এর সঙ্গে কোচবিহার থেকে মিনিবাসে দিনহাটায় ফেরা আর তোর্সা ব্রিজে আটকে থাকা। দিনহাটা মানে এখনও রিকশা চেপে সেই কত্ত দূরের ঝর্ণা মাসির বাড়িতে সঞ্জয়, রাজাদা আর রিংকুর সঙ্গে খেলতে যাওয়া!
বদলে যাওয়া দিনহাটায় এখনও যেন খুঁজে পাই নিজের অস্তিত্ব, কেননা আজও কোনও শহর আমাকে নিজের মনে করেনি। দিনহাটা ভেবেছে আমি ফালাকাটার, ফালাকাটা ভেবেছে আমি দিনহাটার, আর কোচবিহার ভেবেছে বাইরে থেকে আসা কেউ একজন! অস্তিত্বের দোলাচলে এখনও যখন ভুগি, কখনও ছুটে যাই দিনহাটায় কখনও বা মূজনাই তীরের ফালাকাটায়। বেঁচে যায় আমার অহং, আমার নিজস্বতা।
গত বছর এক শরৎ সন্ধ্যায় দিনহাটায় এমন একজন মানুষের নামে সম্মাননা পেলাম, যাঁকে প্রথম জীবনে মেসো বলে ডেকে এসেছি আর পরবর্তীতে দিনহাটা কলেজে পড়বার সুবাদে 'স্যার'। অন্য একটি অদ্ভুত সমাপতনও আছে। যাঁর নামে এই সম্মান প্রদত্ত হল সেই তিনি, শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হিতেন নাগ, ছিলেন সেই স্কুলের ছাত্র, যে স্কুলে আমি আজ কর্মরত।
তাঁর সম্পর্কে নতুন করে আর কী বলার আছে! দিনহাটার মতো প্রান্তিক শহরে বসে তিনি যে কাজ করে গেছেন তাঁর মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ করবে। এমন একজন মানুষের নামে প্রদত্ত স্মৃতি সম্মাননা আমার মতো একজন অকিঞ্চিৎকর মানুষকে প্রদানের মাধ্যমে বকলম তাদের মহত্ব প্রকাশ করলেও, সম্মাননার সঠিক বিচার করলেন কিনা সে বিষয়ে আমি নিজে অন্তত সন্দিহান। তাই নিজের কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করছি দ্ব্যর্থভাবে। নিজের সামান্য লেখালিখিতে কোনোদিনই ভাবিনি যে, কোনও সম্মাননার যোগ্য আমি! আনন্দ হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু, অস্বীকার করব না, ভয়ও একটু ছিল। কেননা সম্মাননার মর্যাদা রাখার গুরু দায়িত্ব কিন্তু মাথায় চাপিয়ে দিলেন বকলম। তার ওপর এই সম্মাননা দিলেন এমন এক পরিবার ও সাহিত্য গোষ্ঠী, যাঁদের যাপনে অধ্যাপক হিতেন নাগ সবসময় উপস্থিত। পাশাপশি আমার বা আমাদের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের যে হৃদ্যতা তা কেবল অনুভূত ও অনুমেয়। তাই এই সম্মাননা গ্রহণ আমার দিনগুলিকে নিঃসন্দেহে কঠিন করেছে, বলা বাহুল্য সেটা।
ওই বিশেষ দিনে বারবার মনে পড়ছিল নিজের বাবা- মায়ের কথা। ওঁরা থাকলে সবচেয়ে খুশি হতেন। দুর্ভাগ্য মাত্র এগারো মাসের ব্যবধানে দুজনকেই হারিয়েছি কিছুদিন আগে। আজ আমি যেভাবে যেটুকু সবই তো তাঁদের জন্য। আর এই দিনহাটা শহরে আজও মায়ের কত ছাত্রী রয়েছেন! রয়েছেন বাবার ছাত্ররাও। মনে পড়েছে আমার শ্বশুর মশাই দেওয়ানহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহ-প্রধান শিক্ষক প্রয়াত বলিপ্রসাদ সাহাকে। ভীষণ উৎসাহিত করতেন তিনি। আমার সেজকাকু নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত মদন রায়ও আজ বড্ড খুশি হতেন। তবে সব আক্ষেপ নিমেষে মুছে দিলেন, শ্রীমতী ঝর্ণা নাগ। তাঁর প্রবল বাৎসল্য যে আজও কতটা টনিকের কাজ করে সেটা নিয়ে গবেষণা করা যেতেই পারে।
সবসময় মনে করি যে, সাফল্য শুধু পাহাড়ের চূড়োয় ওঠা নয়, চূড়ো থেকে সাবধানে নেমে আসাকেও বোঝায়। ম্যালোরি তাই এভারেস্ট জয় করেও বিজয়ী হন না। তিনি আরোহন করেছিলেন, অবরোহন করতে পারেন নি। একই ভাবে সম্মাননা পেলেই হয় না, তার মর্যাদা রাখতে হয়। আর এই সম্মাননা তো এমন একজন মানুষের নামে যিনি আমার কাছে প্রকৃত শিক্ষক, দার্শনিক ও পথ প্রদর্শক। প্রার্থনা তাই, এই উত্তরণ শেষে অবরোহন যেন মসৃণ হয়। রাখতে পারি যথাযোগ্য মর্যাদা!
(প্রকাশিত: বকলম, সঞ্জয় নাগ)
Thursday, October 13, 2022
লোকটা
দুর্গা পুজো
শৌভিক রায়
"নবপত্রিকা বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ। নবপত্রিকা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নটি গাছের পাতা। তবে বাস্তবে নবপত্রিকা নটি পাতা নয়, নটি উদ্ভিদ। এগুলি হল - কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান। একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ একত্র করে একজোড়া বেল-সহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার প্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পুজো করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম কলাবউ।
Tuesday, October 11, 2022
নীলা আশমা শো গয়া...
শৌভিক রায়
তাঁকে দেখামাত্রই শিড়দাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেত।
আজকাল তো মনে হয় বৃদ্ধকালও এতো সুন্দর হতে পারে!
মানুষটি যখন কেবিসি করতে এলেন তখন লেখিকা শোভা দে বলেছিলেন ব্যাপারটা যেন স্যার লরেন্স অলিভিয়ের ফিল্ম শো-এর ইন্টারভ্যালে বাদাম বেচছেন!
স্বাভাবিক এই ভাবনাটা। কেননা একেই তিনি টিভির পর্দায় তায় আবার গেম শো'র অ্যাঙ্কর!
রোলস রয়েস কি আর তৃতীয় বিশ্বের ভাঙাচোরা খানাখন্দে ভরা রাস্তায় চলতে পারে নাকি?
কিন্তু তিনি তো তিনিই! হিসেব উল্টোতে আগাগোড়াই শাহেনশা!
ভাগ্যিস এসেছিলেন। তাই তো ওই ব্যারিটোন গলা, ওই গভীর চোখ, ঠিকরে পড়া ব্যক্তিত্ব চোখের সামনে মাঝেমাঝে আজকাল। (নিজের নজর না লেগে যায়!)
ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী না হয়েও এই ভদ্রলোকের কাছে কেন যেন হেরে বসে আছি। পুজো করতে ইচ্ছে করে বড্ড।
এরকম ছেলেমানুষি পোস্ট করতে অভ্যস্ত নই আমি। কিন্তু এঁর মহিমা, অবশ্যই আমার ওপর, এতোটাই যে বারবার ছেলেমানুষ হয়ে যাই। গন্ডগোল বেঁধে যায় সব আর শিরদাঁড়ায় সেই ঠান্ডা স্রোতটা বয়ে যায়!
ভদ্রলোকের আজ জন্মদিন। কোচবিহার-মুম্বাই দূরত্বটা বিরাট। এই পোস্টটি দেখবার কোনো সুযোগ ভদ্রলোকের নেই। উনি দেখুন সে আর্জিও আমার নেই। কিন্তু আর্তি আছে। আর্তি এটাই যে উনি ঠিকঠাক থাকুন। এতোটাই ঠিকঠাক থাকুন যে আমি যেন বারবার ছেলেমানুষ হয়ে যেতে পারি!
সবশেষে স্মৃতিতে সেই দিন আবার।
কলেজ ফেরতা জিনস-পাঞ্জাবির কানে রাস্তার ধারের দোকান থেকে টেপডেকে ভেসে আসছে 'নীলা আশমা শো গয়া...' সেই কলেজ ফেরতা মুহূর্তে ফ্রিজ শট। সব্বাই চলে গেল। একা কলেজ ফেরতা দাঁড়িয়েই রইল!
সবশেষে তিনি এলেন। হাত ধরলেন।
ধরেই রইলেন।
নীল আকাশ আজও শুয়ে বুকের মাঝে।
আকাশেই তো তাঁরা থাকেন।
আকাশেই তো তারা থাকে।
(পুরোনো লেখা। আবার পোস্ট করলাম। তাঁর জন্মদিন আজ.....)














