Friday, October 28, 2022

রাত পার হয়ে
শৌভিক রায়

মুখ আর মুখোশের দূরত্ব 
বুঝতে না বুঝতে,
কখন যেন রাত পার হয়ে 
নতুন আলো,
খেলা করে খোলা চোখে

লিখে যায় বালক
যোদ্ধা পিতার কথা
নিজস্ব অক্ষরে…

(প্রকাশিত: Web ডুয়ার্স
  সম্পাদক: অনিমেষ)

https://webdooarss.blogspot.com/2022/10/blog-post.html?m=1


Wednesday, October 26, 2022






সেই বৃক্ষের কাছে 

শৌভিক রায় 


যে গ্রামের নাম টিরনা, সে সুন্দর হবেই। চেরাপুঞ্জির বাজার থেকে একুশ কিমির যাত্রায় ভাবছিলাম সেটাই। ভাবনাটা মিলে গেল। ছবির মতো এরকম সুন্দর জনপদ দেখিনি আগে।

 

            এখান থেকেই গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নামতে হবে ৩৫০০ সিঁড়ি। পথে পড়বে দু-দু'টো ঝুলন্ত ফুটব্রিজ আর তার নীচে ভীমবেগে বয়ে চলা পাহাড়ী নদী! যাচ্ছি লিভিঙ রুটব্রিজ দেখতে। নির্দিষ্ট করে বললে ডাবল ডেকার লিভিঙ রুটব্রিজ দেখতে। এটা দেখতেই আসা চেরাপুঞ্জিতে। 


মেঘালয়ের এই অংশে অত্যাধিক বৃষ্টিপাতের ও ট্রপিক্যাল ফরেস্টের জন্য প্রকৃতি দুর্গম। খাসি প্রজাতির লোকেরা তাই অভিনব পদ্ধতিতে ব্রিজ বানিয়ে থাকেন। বয়স্ক রাবার গাছের শেকড়গুলিকে তারা এমনভাবে লালন করেন যে, সেগুলি ব্রিজের আকার নেয়। নদীর ওপরে যেখানে চলাচল অসম্ভব, সেখানে এই রুটব্রিজই ভরসা। প্রায় বছর পনের লাগে একটি রুটব্রিজ তৈরী করতে। কেননা শেকড়কে হতে হয় ততটাই শক্ত যাতে সে মানুষের ওজন নিতে পারে। একবার তৈরী হলে রুটব্রিজ টিকে যেতে পারে পাঁচশো বছর। 



টিরনা থেকে ৩৫০০ সিঁড়ি ভেঙে উমশিয়াং যাবার কারন এই রুটব্রিজ।এই ব্রিজটি ডাবলডেকার, অর্থাৎ দু'টো তল এর। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি জানাচ্ছে, পৃথিবীতে এরকম ব্রিজ এই একটিই। আরও কান্ড হ'ল, ব্রিজ নির্মিত নয়, গড়ে উঠেছে নিজেই!



 ট্রেক আগেও করেছি। সিঁড়িও ভেঙেছি পালিতানা, পক্ষীতীর্থম বা শ্রাবণবেলগোলায়। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা আলাদা। এই সিঁড়িগুলো অনেকটা বেশী খাড়াই। চাপাও। তাই পায়ের ওপর চাপ পড়ছে তুলনায় বেশী। নজর রাখতে হচ্ছে তীক্ষ্ণ, যাতে পা ঠিক জায়গায় পড়ে। কোথাও কোথাও টানা আটশো সিঁড়ি নেমে গেছে। চারদিকে পাহাড় আর গভীর জঙ্গল। কোনও কোনও জায়গায় অরণ্য এত দুর্ভেদ্য, আলোও ঢোকে না ঠিকঠাক। রাস্তা জনশূন্য। 



একবার থামতে হ'ল। রাস্তা নেই। সামনে পাহাড়ী নদী। ঝুলছে ফুটব্রিজ। তাতে খানিক এগোতেই শুরু হ'ল দুলুনি। নীচে বিরাট বিরাট পাথর আর তার ফাঁকফোকড় দিয়ে বইছে প্রবল বেগে নদী। দাঁতে দাঁত চেপে পৌঁছে গেলাম ওপারে। আবার শুরু ওঠা। খানিকটা এগোতেই আবার একটি ব্রিজ। এটি অনেকটা লম্বা। তবে ভয় কেটে গেছে। সামান্য যেতেই দেখা হয়ে গেল একটি রুটব্রিজ সঙ্গে। বসে পড়ি আনন্দে। পুত্র তাগাদা দেয়। থামা চলবে না। এখনও গন্তব্য আসে নি। তাই এগিয়ে যাই। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে আর বোধহয় পারবো না। তবু এক অদম্য জেদ নিয়ে চলতে থাকি। 


         অবশেষে চোখের সামনে ডাবল ডেকার লিভিং রুটব্রিজ। বিশ্বাসই করতে পারছি না। একটি গাছ থেকে শেকড় বেরিয়ে দু'টো ব্রিজ হয়ে ওপরে নীচে দাঁড়িয়ে আছে ! বেশ লম্বা। নীচে বইছে নদী। শোনা যাচ্ছে পাথরের বুকে আছড়ে পড়া জলের শব্দ। ঝুলছে সরু সরু ঝুরি। নদীতে সামান্য দূরে দু'একজন কাপড় ধুচ্ছে। বড় বড় পাথরের অনেকগুলিতেই শ্যাওলা জমে পেছল পেছল ভাব। নদীর স্বচ্ছ জলে মাছের দল। চোখের সামনে বিশ্বের একবোদ্বিতীয়ম ডাবল ডেকার রুটব্রিজ। নিমেষেই মিলিয়ে যায় সব ক্লান্তি। প্রণাম করি সেই বৃক্ষকে। তার সহনশীলতা মুহূর্তেই পড়িয়ে দেয় জীবনের পাঠ।  



ফিরতি পথে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা কেবল। বুকে হাঁপ ধরে ভীষণ। থেমে থেমে চলি। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে। প্রতি মুহূর্তেই মনে হয় আর বোধহয় পারবো না। কিন্তু যে সহনশীলতার শিক্ষা মাত্র নিয়ে এলাম বৃক্ষের থেকে, উজ্জীবিত করে সে-ই। এগোই। থামি। আবার এগোই। আমাকে পেরিয়ে যান স্থানীয় এক বৃদ্ধ ও এক প্রৌঢ়া। মৃদু হাসেন। প্রৌঢ়া বলেন, "ওয়াক স্লোলি।" হাসি। সত্যিই বলেছেন। ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে এক সময় শেষ হয় সিঁড়ি। উঠে আসি টিরনা গ্রামে। কোমরে, পায়ে তখন অসম্ভব ব্যথা শুরু হয়েছে। দরদর করে ঘামছি। বুকে চাপ চাপ ব্যথা। গাইড টাকা নেয়। হ্যান্ডসেক করে। বলে, "কাম এগেন।" মাথা নেড়ে বলি, "ইয়েস আই মাস্ট।"  

( প্রকাশিত: http://www.khonjporibar.com )

                         

Tuesday, October 25, 2022






স্মৃতির পুজো 
শৌভিক রায় 

দীর্ঘদিন থেকেই ফালাকাটার দশমী প্রসিদ্ধ হলেও, দুর্গাপূজায় কিন্তু কোনোদিন আজকের মতো এতো জাঁকজমক দেখিনি। বরং কালীপূজার জমকালো ভাব ছিল বেশি।

আমাদের ছোটবেলায়, গত শতকের আশির দশকে, দুর্গা পুজোয় ভিড় জমত ভুতনিরঘাট এস এস বি ক্যাম্প আর দুই চা বাগানে। সুভাষপল্লী, মশলাপট্টি বা দেশবন্ধু পাড়ায় পুজো হলেও সেরকম বিরাট কিছু ব্যাপার হত না। মুক্তিপাড়ায় লোকে প্রতিমা দর্শনে গেলেও কলেজ পাড়ার পুজো তখন ছিল একেবারেই ছোট। তুলনায় স্টেশনের পুজো বরং ভাল ছিল। মোট কথা, ফালাকাটার পুজোতে তখন গ্রামীণ ভাবটাই বেশি ছিল। 

নব্বইয়ের দশকেও কিন্তু পুজো বলতে মোটামুটি এরকমই বোঝাত। কিন্তু তাতে আক্ষেপ ছিল না কারও। তখন ফালাকাটা আয়তনেও খুব ছোট্ট। মোটামুটি সবাই সবাইকে চিনত, জানত। পুজোর কয়েকদিন সবাই মিলে মণ্ডপে বসে আড্ডা, খাওয়া, সন্ধ্যায় দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদি ছিল মুখ্য। একটা সন্ধ্যা বরাদ্দ থাকত পরিবারের জন্য। 

তবে ফালাকাটার দশমী ছিল বরাবর আলাদা। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন দিতে আসত ফালাকাটার আশেপাশের বহু পুজো কমিটি। একটা সময় নাকি বীরপাড়াকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন চা বাগান, মাদারিহাট, শালকুমার, রামাঠেঙা, পারডুবি, শালবাড়ি ইত্যাদি অঞ্চল থেকেও প্রতিমা ফালাকাটায় আনা হত। কেন ফালাকাটায় তারা আসতেন, সে সম্পর্কে আজ আর প্রামাণ্য কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি যে, প্রাচীন জনপদ ফালাকাটা আসলে সেই সময় সব দিক থেকেই ছিল সমৃদ্ধ। ডুয়ার্সের অন্য শহরগুলি যেমন বীরপাড়া, গয়েরকাটা, মাদারিহাট, হাসিমারা, কালচিনি, এমনকি মালবাজার পর্যন্ত চা বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। চা বাগান ও চা বাগান কেন্দ্রিক জনপদগুলিতে ছিল মিশ্র সংস্কৃতি। তুলনায় ফালাকাটা অনেক পুরোনো। এখানে বাঙালি জোতদার ও জমিদারদের প্রাধান্য ছিল বেশি। তারও আগে ফালাকাটার ইতিহাসে পাওয়া যায় রংপুরের জমিদার শ্যামল বর্মন ও তাঁর বীরাঙ্গনা স্ত্রী ফুলটুসির কথা। ইংরেজরাও ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা তৈরি করে ফালাকাটাকে মহকুমার মর্যাদা দিয়েছিল। এখানে এসেছিল বাঙালি বাবু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। সাপটানার পূর্বে সেই বাবুরা নিজেদের পাড়া তৈরি করে নাম দিয়েছিলেন বাবুপাড়া। অর্থাৎ সব কিছু মিলে ফালাকাটা ছিল বাঙালিদের পক্ষে আদর্শ জায়গা। তাই চা বাগানের ইংরেজ মালিক ও ম্যানেজার, জনজাতি শ্রমিক, চিনা কাঠমিস্ত্রি, পাঞ্জাবি দফাদারের সঙ্গে বাঙালি কেরানিরা মায়ের বিসর্জনকে মেনে নিতে পারেননি। আর তার ফলেই, সেই সময় এত নানা জায়গা থেকে সকলের আগমন হত ফালাকাটায়, দশমীর ওই দিনটায়। 

পরবর্তীতে দশমীর সেই রমরমা কালের নিয়মেই কমতে শুরু করেছিল। প্রতিমা নিয়ে আসবার খরচ, নিজেদের স্বাভিমান ইত্যাদির জন্যই নব্বইয়ের দশক থেকে দশমীর ঘাটে বাইরে থেকে প্রতিমা আসা বন্ধ হচ্ছিল। মুজনাইয়ের গতিপথ পরিবর্তনও ছিল অন্যতম কারণ। আজ ফালাকাটার দশমীর সঙ্গে বিভিন্ন জায়গার দশমীর চরিত্রগত খুব বেশি কিছু পার্থক্য নেই। তবে ঐতিহ্যের ব্যাপারটি সবসময় আলাদা। সেদিক থেকে ফালাকাটা বহু যোজন এগিয়ে।  

দশমী বাদে সেই আমলের ফালাকাটার দুর্গা পুজো নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। বরং কালীপুজোর ব্যাপারটি ছিল আলাদা। সেই সময় আলিপুদুয়ার বা ধূপগুড়ির কালীপুজো খুব নাম করা হলেও, ফালাকাটা পিছিয়ে ছিল না। বিশেষ করে সুভাষপল্লী আর তরুণদলের মধ্যে কালীপুজো রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। মশলাপট্টির সেই বিরাট কালীর কথা অবশ্য আলাদা। সেই প্রতিমার ঐতিহ্য আর সাবেকিয়ানা ছিল অন্য ঘরানার। প্রাচীন পুজো হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। প্রাচীনত্বের দিক থেকে অবশ্য উন্মাদ সংঘের পুজোর কথাও  বলতে হয়। পরবর্তীতে হাটখোলা ব্যবসায়ী সমিতিও দারুন পুজো করতেন। কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা বাগান আর মুক্তিপাড়ার কালীপুজো ছিল নাম করা। দুই এস এস বি ক্যাম্পেই আমরা ভিড় জমাতাম ভাল প্রসাদের লোভে। ধূপগুড়ি মোড়ে ভেনাস ক্লাবের পুজোও সেই সময় থেকেই অন্যরকম হচ্ছিল। বাবুপাড়া, গোপনগর, সুভাষ কলোনি, দেশবন্ধু পাড়া ইত্যাদিতেও বেশ কিছু পুজো ভাল লাগত। মাঝে কিছুদিন ত্রিধারা নামে একটি সংস্থা বেশ কয়েক বছর খুব ভাল পুজো উপহার দিয়েছিল। ১৯৮২ সালে ত্রিধারা পুজো করেছিল ফালাকাটা হাই স্কুল কোয়ার্টারের সামনের মাঠে। তখন কমিউনিটি হলের জায়গায় ফাঁকা মাঠ। ফালাকাটা হাই স্কুলের কিছু ঘর ছিল সেই মাঠের দক্ষিণ দিকে। ফালাকাটা কলেজের ক্লাস তখন সেই ঘরগুলিতে হত। ১৯৮২ সালে ত্রিধারার পুজোতেই আমার দাদা কৌশিক রায় আর আর এক দাদা অভ্রজ্যোতি গুহর সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করেছিল সাহিত্য পত্রিকা `মুজনাই`। সুভাষপল্লীতে সুমতি মায়ের কালীপুজোও কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে হওয়া পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম।

কালীপূজোকে ঘিরে ফালাকাটার তখনকার উন্মাদনা ছিল চোখে পড়বার মতো। তবে ফালাকাটার সেরা পুজো ছিল অবশ্যই জংলা কালীবাড়ির। নাম থেকেই বোঝা যায়, একসময় এই মন্দিরটি জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত ছিল। জনশ্রুতি, এই মন্দিরে দেবীর পুজো সেরে ডাকাতরা জলপথে ডাকাতি করতে যেত। মুজনাই তখন এই মন্দিরের পাশ দিয়েই প্রবাহিত। মুজনাই দিয়ে জলঢাকায় পৌঁছে উত্তরে দক্ষিণে বহুদিকেই যাওয়া যেত। কিন্তু সে বহু পুরোনো কথা। আমাদের ছোটবেলায় জংলা কালীবাড়ি যেতে হলে পুরোনো চৌপথী থেকে হাটের দিকে এগিয়ে ডান হাতের পরিচিত রাস্তা ধরতে হত।  আর একটি রাস্তা ছিল সুভাষ গার্লস হাই স্কুলের সামনে দিয়ে। কিন্তু সে পথে এলে সাপটানা পায়ে হেঁটে পার হতে হত, কেননা কোনও ব্রিজ ছিল না। নদী পার করবার জন্য অনেকটা নিচে নামতে হত। ভীষণ উঁচু ছিল নদীর তীর। কালীপুজোর অমাবস্যার রাতে অন্ধকার ওই জায়গা দিয়ে জংলা কালীবাড়ি যাওয়ার সাহস অনেকেরই ছিল না। দিনের বেলাতেই গা ছমছম করত, রাতে তো কথাই নেই।

একটা সময় খুব সাধারণ পুজো ছিল উদয়ন সংঘের। অত্যন্ত স্বাভাবিক সেটা। কিন্তু আশির দশকের শেষ থেকেই তারা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে, ফালাকাটার কালীপূজোতে থিমের ভাবনা কিন্তু উদয়ন সংঘের হাত ধরেই। শুধুমাত্র রুচি আর শৈল্পিক ভাবনায় অসামান্য পুজো করে নজির সৃষ্টি করেছিল তারা। সাপটানার তীরে পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা নিচুতে নেমে উদয়ন সংঘের মাঠ তাদের পুজোকে অন্য মাত্রা দিত। আজ সেই উদয়ন সংঘের পুজো পঞ্চাশ বছরে পা দিচ্ছে ভাবতেই অবাক লাগে। এতগুলি বছর যে কথা দিয়ে কেটে গেল, কে জানে!

বহুদিন ফালাকাটার পুজো সেভাবে দেখি না। পুজো নিয়ে সেভাবে কিছু লিখতেও ইচ্ছে করে না আর। কিন্তু উদয়ন সংঘের কথা শুনে লিখতে বাধ্য হলাম কিছুটা দায় থেকেই। করোনা মহামারির ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে আমার বাবা ও মা`কে নিয়ে উদয়ন সংঘের পুজো দেখতে এসেছিলাম। মা বাবা দুজনকে নিয়ে সেটাই আমার শেষ কালীপুজো দেখা। মা চলে গেলেন ২০২০ তে আর বাবা মায়ের চলে যাওয়ার এগারো মাসের মাথায় ২০২১ সালে। মনে আছে আমাদের গাড়ি উদয়ন সংঘের কাছে পৌঁছলে, বাবা ও মা`কে হাত ধরে নামিয়ে ছিলেন কর্মকর্তারা। তাঁরাই বাবা-মা`কে প্রতিমা দর্শন করান। আমি শুধু সঙ্গী ছিলাম।

বাবার সঙ্গে উদয়ন সংঘের বোধহয় বিশেষ সম্পর্ক ছিল সবসময়ই। আগে না বুঝলেও আজ বুঝি কেন বাবা উদয়ন সংঘের ব্যাপারে চিরদিন অন্যরকম ছিলেন! ১৯৬৭ সালে বাবা যখন ফালাকাটা হাই স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে আসেন, তখন বাবার বাসস্থান ছিল শ্রদ্ধেয় মানিক বোসের বাড়ির দুই একটি বাড়ির পরেই। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন স্কুল কোয়ার্টার ও কলেজ পাড়ায় নিজের বাড়িতে থাকলেও, ওই পাড়ার প্রতি বাবার টান কোনোদিন কমেনি। যতবার ফালাকাটার কালীপুজো দেখেছি বাবা মায়ের সঙ্গে, বাবার লিস্টে উদয়ন সংঘ জ্বলজ্বল করত। 

উদয়ন সংঘের সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাবার কথা খুব মনে পড়বে। মনে পড়বে মায়ের কথাও। আসলে মায়ের পুজোয় মা`কে যদি মনে না পড়ে, তবে কি পুজোর মাহাত্ম্য থাকে! আর কে না জানে মা এলে, বাবাও থাকেন মায়ের পাশে। নিশ্চুপে, নির্বাক উপস্থিতিতে। 
     

Friday, October 21, 2022

 


।। নিজের ভাবনায়।।

      শৌভিক রায়


অগ্রজ শ্রদ্ধেয় প্রিয় শিক্ষক বলেছিলেন, কয়লা খেয়েছ, আংরা তো বেরোবেই!


সেদিন কথাটি বাড়াবাড়ি মনে হলেও আজ বুঝি আঙরার বাড়বাড়ন্ত। 


সর্বব্যাপী এই আংরাই এখন আমাদের ভবিতব্য। কেননা আবার আমরা কয়লা খাবো। না জেনে নয়, জেনে ও বুঝেই গ্রহণ করব সেটা। ফল? আবার আংরা সৃষ্টি হবে। আবার ডুববে বহুজন। পিঠ ঠেকবে দেওয়ালে। প্রতিবাদে সক্রিয় হলে নির্লজ্জ কিছু দলদাসকে নামানো হবে অন্ধকারে! 


তারপর রাতি পোহাইলে কিছু পাখি রব করিবে। উহারা সেইটিই করিয়া থাকে। উদ্বেগের কিছু নাই তাহাতে। কেননা কাননে কুসুমকলি দেখিলেই উহারা থামিয়াও যাইবে, কয়লা ভক্ষণেও উদ্যোগী হইবে.....

Tuesday, October 18, 2022

ডুয়ার্সের পথে পথে এই পুজোতে

শৌভিক রায়

শরতের প্রকৃতিতে বোধহয় এমন কোনও অনুঘটক আছে যে আপামর বাঙালিকে এই সময় বারমুখী করে তোলে। বিষয়টি ভাববার। ভারতবর্ষে এত সংখ্যক মানুষ থাকতে, বাঙালিরা কেন এই সময় বাক্স-প্যাঁটরা বেঁধে এদিক-সেদিক দৌড়ে পালায়, তার কারণ ঠিক জানা নেই কারও। কিন্তু বাঙালিরা যায়। এমনিতেও সম্বৎসর তারা ঘুরে বেড়ায়। অন্য সময় কখনও সখনও যদিও বা তাদের আটকে রাখা যায়, শরতের এই সময়, দুর্গাপুজোর পর, বাঙালিদের আটকাবে এরকম সাধ্যি বোধহয় কারও নেই। ফলে, দেশের সর্বত্র তো বটেই, এই সময় তাদের বিদেশেও দেখা যায়। কিন্তু এই নানা জায়গা দেখতে গিয়ে, আমরা অনেক সময় `ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া` স্থানগুলিকে ভুলে যাই। অথচ এই সব জায়গার টানে বাংলার বাইরের বহু জায়গা থেকে মানুষ আসছেন প্রতিনিয়ত!
তাই এবারে আমাদের ডেস্টিনেশন হতে পারে একটু আলাদা....নিজের রাজ্যের বেশ কিছু জায়গাকে দেখা আর চিনে নেওয়া সেই সব জায়গায় লুকিয়ে থাকা নানানা ঐশ্বর্যকে। বাঙালির চিরকালীন `দীপুদা` (দীঘা-পুরি-দার্জিলিং) বাদে এবারের ডেস্টিনেশন তাই `থোরা হটকে`। এই জায়গাগুলির অনেকগুলিই আজকাল অবশ্য নেট-দুনিয়ার দৌলতে অনেকেরই জানা, তবু যেন একবার মনে করিয়ে দেওয়া!
নিউল্যান্ড-সংকোশ-কালিখোলা- শুরু করলাম আলিপুদুয়ার জেলার কুমারগ্রাম ব্লকের এই তিনটে জায়গা নিয়ে। নিউল্যান্ড মূলত চা-বাগান হলেও, বক্সা ফরেস্ট লাগোয়া বনবস্তিটি আজও যেন ভার্জিন স্পট। হাতের কাছে বক্সার ঘন জঙ্গল আর সন্ধ্যা হলেই নির্জন নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়া বস্তিতে বসে মনে হতেই পারে সভ্যতা থেকে যেন অনেক দূরে চলে এসেছি। রায়ডাকের বয়ে চলার শব্দও কানে আসতে পারে কখনও। চা-বাগানের পুরোনো বাংলোটি শতাব্দী প্রাচীন। অন্যদিকে সংকোশ চা-বাগানটি দেখলে টি-এস্টেট সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করা যায়। পাশেই বইছে বাংলা-অসম সীমান্ত নির্ধারণকারী নদী স্বর্ণ কোশ বা সংকোশ। আর কালিখোলার অপার সৌন্দর্যে পাগল হয় না কে! এস এস বি ক্যাম্পের চেক পোস্টে নিজের পরিচয় ঠিকঠাক লিখিয়ে চলে যাওয়া যেতে পারে ভুটানের সীমানায়। ফুন্টশেলিং দেখতে দেখতে অভ্যস্ত চোখ দেখে নিতে পারে ভুটানের স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোট্ট গ্রাম। এখন থেকেও সংকোশের সৌন্দর্য অনবদ্য। বাড়তি পাওনা ভুটানের আতিথ্য।
শামুকতলা-মহাকালগুড়ি-চিপড়া-তুরতুরি-হাতিপোতা-ফাঁসখাওয়া-ভুটানঘাট - ঠিক থাকবার মতো না হলেও, একদিনের আউটিংয়ে দেখা যেতেই পারে মহাকালগুড়ি নামের পরিচ্ছন্ন গ্রামটি। জনজাতি অধ্যুষিত এই গ্রামের বাড়িঘর, চার্চ, স্কুল সবকিছুই প্রাচীন। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বের চিপড়া অরণ্য বক্সার অন্তর্ভুক্ত হলেও নিজের মতো আলাদা। এখানকার ওয়াচ টাওয়ার থেকে বিস্তৃত দর্শন মেলে অরণ্যভূমির। জলাশয়ে রয়েছে পরিযায়ী পাখিদের দল। শামুকতলা থেকে আর একদিকে রয়েছে তুরতুরি, হাতিপোতা আর ফাঁসখাওয়া। বক্সা জঙ্গলের খুব কাছেই থাকা এই জায়গাগুলির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জয়ন্তী চা বাগান, তুরতুরি চা বাগান ইত্যাদির সবুজ পরিবেশ তাদের যেন আরও আকর্ষণীয় করেছে। আর ভুটানঘাটের পিপিংখোলা না দেখলে বোঝা যাবে না এখানে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে!
বারবিশা শিলবাংলো-শিকিয়াঝোরা- নির্জনে ঘোলানি নদীর ধারে সময় কাটাবার শ্রেষ্ঠ জায়গা শিলবাংলো। রাত্রিবাস নিয়ে আসে অন্য মাদকতা। কপাল ভাল থাকলে দেখা যেতে পারে বনচরদেরও। আর উত্তরবঙ্গের মিনি সুন্দরবন শিকিয়াঝোরা তো এখন অত্যন্ত পরিচিত জায়গা। নৌকায় চেপে ঝোরা দিয়ে ঢুকে পড়া যায় গভীর অরণ্যে। বিভিন্ন ধরণের গাছের পাশাপাশি দেখা পাওয়া যেতে পারে বন্য পশুদের। তবে নৌকো চালকদের গল্পে কান দিয়ে নিজের মতো দেখে নেওয়াই ভাল সবটা।
চিলাপাতা নলরাজার গড়-মেন্দাবাড়ি-কোদালবস্তি- অরণ্যের ভেতর দিয়ে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘতম পথ দেখা যায় চিলাপাতায়। কিংবদন্তি অনুসারে নল-দময়ন্তীর কথা জড়িয়ে থাকলেও, ঐতিহাসিকরা মনে করেন বানিয়া নদীর তীরে গুপ্ত যুগে নল রাজার গড় তৈরি হয়। আপাতভাবে হয়তো কিছুই নেই। তবে এখানে কল্পনার চোখ ভেবে নিতে পারে অনেককিছু। মেন্দাবাড়ি গভীর জঙ্গলে থাকা ক্যাম্প। পাশের ঝোরাতে সন্ধ্যা থেকেই দেখা মেলে নানা প্রাণীর। দিনেও কমতি নেই তাদের। জঙ্গল পার করে কোদালবস্তি নির্জনে জঙ্গলের ধারে সময় কাটাবার আদর্শ জায়গা। অবশ্য সম্পূর্ণ চিলাপাতাকে ঘিরেই আজকাল প্রচুর থাকবার ব্যবস্থা রয়েছে। মনের মানুষ বা পোরো বস্তি অঞ্চলেও কোদালবস্তির মতো অসংখ্য হোম স্টে বা টুরিস্ট লজ।
রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তী-বক্সা ফোর্ট-লেপচাখা- নতুন করে এদের সম্পর্কে বলবার প্রয়োজন নেই। খুব কম মানুষকেই পাওয়া যাবে যারা এখনও এই জায়গাগুলি যাননি। তবে রাজাভাতখাওয়ার মিউজিয়াম না দেখলে মিস করা হবে অনেককিছু। জয়ন্তী বহু বর্ণনায় বিবৃত। মহাকাল মন্দির, পুখুরি ইত্যাদিও দেখা উচিত জয়ন্তী দর্শনে। রহস্যময় বক্সা ফোর্ট আর তার ওপরে লেপচাখা অবধি হেঁটে ওঠা এনে দিতে পারে অন্য স্বাদ। অবলীলায় কেটে যাবে কয়েকটা দিন।
কালচিনি-রায়মাটাং-সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা বাগান-ছিপছিপি- কালচিনি হল সেন্ট্রাল ডুয়ার্সের অলিখিত রাজধানী। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে এই একের পর এক চা বাগান তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলে। আর সেই চা বাগানগুলির মধ্যমণি ছিল কালচিনি। ইউরোপিয়ান টি প্লান্টার্স থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানুষের এখানে আগমন হয় সেই সময়। সেই সময়ের বেশ কিছু নিদর্শন এখনও রয়েছে এখানে। কাছের হ্যামিল্টনগঞ্জ জায়গাটির নামকরণ হয়েছে রেলের ইঞ্জিনিয়ার হ্যামিল্টন সাহেবের নামে। হাসিমারা, রাজাভাতখাওয়া ইত্যাদিও কালচিনির খুব কাছে। আজকের কালচিনিতে কাজিমান গোলের সংগ্রহশালা অবশ্য দ্রষ্টব্য। তামাং সম্প্রদায়ের এই মানুষটি চা শ্রমিক হলেও ছিলেন স্বভাব কবি। বাকপা নৃত্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন তিনি আর একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন একটি সংগ্রহশালা। কালচিনির কাছে রায়মাটাং শান্ত নির্জনে কাটানোর আদর্শ জায়গা। নদী পেরিয়ে ওপারে গিয়ে যে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায় তা অতুলনীয়। সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা বাগান এই অঞ্চলের অন্যতম সেরা সুন্দর চা বাগান। বাগান পার করে ছিপছিপি পৌঁছলে মনে হয় স্বর্গের কাছাকাছি যেন চলে এসেছি!
পাশাখা-ফুন্টশেলিং- পাশাখায় আপাতভাবে সেভাবে দেখবার কিছু নেই। তবে ভুটানের অন্যতম শিল্পকেন্দ্রা দেখে নেওয়া যেতেই পারে। ফুন্টশেলিং সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সকলেই জানি। জয়গাঁ সীমান্ত পার করে ফুন্টশেলিং পৌঁছলে ভুটানের শহর সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা হয়। গুম্ফা, ক্রোকোডাইল পার্ক, তাসি মার্কেট ইত্যাদি ফুন্টশিলিংয়ের অন্যতম আকর্ষণ। ২৩ সেপ্টেম্বর ভুটান গেট খুলবার পর নতুন কিছু নিয়ম চালু করা হয়েছে। ফুন্টশিলিংয়ে ঢুকবার জন্য ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট জাতীয় পরিচয়পত্র আবশ্যিক। এপারে জয়গাঁতে তোর্ষা নদীর শোভা দেখাও অন্য অভিজ্ঞতা। তোর্ষা চা বাগানের কাছে আজকাল নতুন কিছু স্পট হয়েছে নিজের মতো সময় কাটাবার।
জলদাপাড়া-দক্ষিণ খয়েরবাড়ি-কুঞ্জনগর-টোটোপাড়া-মুজনাই- বিশ্ব বিখ্যাত জলদাপাড়া অভয়ারণ্যকে ঘিরে শালকুমার, মাদারিহাট ইত্যাদিতে থাকবার প্রচুর ব্যবস্থা রয়েছে। জলদাপাড়ার ভেতরে হলং টুরিস্ট লজ বা বাইরে সরকারি আবাসনে থাকতে গেলে অবশ্য আগে থেকে বন দপ্তরের মাধ্যমে বুকিং করতে হয়। কুঞ্জনগর, দক্ষিণ খয়েরবাড়ি ইত্যাদিও জলদাপাড়ার অংশ। এসব জায়গায় ইকো পার্ক ও রেসকিউ সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। শালকুমারে শিসামারা নদীর ধরে বসে জলদাপাড়ার রহস্যময় সৌন্দর্য উপভোগ করা আলাদা অভিজ্ঞতা। মাদারিহাট থেকে খুব কাছের টোটোপাড়া পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠী টোটোদের বাসস্থান। পাহাড়ি ঢালে এই গ্রামের সৌন্দর্য অসামান্য। মুজনাই উত্তরের অন্যতম রহস্যময় নদী। মাদারিহাট থেকে টোটোপাড়া যাওয়ার পথে বা হাতে বাঙাবাড়ি ডিভিশনে দেখে নেওয়া যায় এই নদীর সারা বছরের জলের উৎস তিনটি প্রস্রবণ ও টিলার ওপর অবস্থিত সুন্দর শিবমন্দিরটি।
লঙ্কাপাড়া-মাকড়াপাড়া-বান্দাপানি- টোটোপাড়ার খুব কাছে, পাহাড়ের অন্য ঢালে, রূপসী লঙ্কাপাড়া। তবে বীরপাড়া হয়ে যাওয়া ভাল। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্যের এই ছোট্ট জনপদ ডুয়ার্সের অন্যতম গর্ব। কাছের মাকড়াপাড়া কালীমন্দিরের জন্য বিখ্যাত হলেও, ভুটান সীমান্তের গুমটু ভুটানে সিমেন্ট তৈরির কারখানা দেখা যায়। পাহাড়ের ওপর রয়েছে ছোট্ট সুন্দর একটি গুম্ফাও। মাকড়াপাড়া থেকে যাওয়া যায় বান্দাপানি চা বাগানে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে পুরোনো চা গাছটিকে দেখতে। এটির বয়স একশোর ওপর।
গয়েরকাটা-খুট্টিমারি-নাথুয়া- গয়েরকাটার মধুবনী পার্ক এই অঞ্চলের সেরা আকর্ষণ। তাছাড়াও রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন রিডিং লাইব্রেরি। খুট্টিমারি অরণ্যটির সেভাবে প্রচার না থাকলেও, কোনও অংশে এটি বিখ্যাত নামি অরণ্যগুলির চাইতে কম নয়। খুট্টিমারি পেরিয়ে নাথুয়ায় দেখা মেলে জলঢাকা ও ডায়ানা নদীর সঙ্গম।
চামুর্চি-লাল ঝামেলা বস্তি- জয়গাঁ-ফুন্টশিলিংয়ের মতো ভুটানে ঢুকবার আর একটি দ্বার হল চামুর্চি। অত্যন্ত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের এই জনপদ পার হয়ে ওপারে সামচিতে চলে যাওয়া যায়। দেখা যায় ভুটানের ছোট্ট পরিচ্ছন্ন গ্রাম। চামুর্চি থেকে চা-বাগানের ভেতর দিয়ে দেবপাড়ার কাছে হাই রোডে উঠে ডায়ানা নদী পার করে ডানহাতে ধরণীপুর চা বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া যায় লাল ঝামেলা বস্তিতে। এখানকার সৌন্দর্য আর ডায়ানার জলের আওয়াজে পাথরের মতো শক্ত মনও গলে যেতে বাধ্য!
লাটাগুড়ি-মূর্তি-চাপড়ামারি- ডুয়ার্সের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। নতুন কিছু বলবার নেই। বহু বর্ণনায় আর ভ্রমণে দিনদিন যেন নষ্ট হতে বসেছে এই বিখ্যাত অরণ্য দুটির অপার রহস্যময়তা। মূর্তি বলে পরিচিত জায়গাটিতেও বড্ড ভিড় বিরক্ত করে তোলে। তবে থাকা ও খাওয়ার অভাব নেই। প্রচুর টুরিস্ট লজ লাটাগুড়িকে ঘিরে।
ঝালং-দলগাওঁ-জলঢাকা-প্যারেন-তোদে-বিন্দু- অসামান্য সব জনপদ। এইসব জায়গায় যারা থাকেন, তাদেরকে দেখে ঈর্ষা হয়। জলঢাকার অসামান্য সৌন্দর্য আর তাকে বিভিন্নভাবে দেখা এবং সঙ্গে পাহাড়ের রূপ নিজের হাতের মুঠিতে বন্দি করার এরকম সুযোগ কম হয়। ঝালং আর দলগাওঁ ভিউ পয়েন্ট ঠিক সেই সুযোগটাই করে দেয়। তোদে অনেকটা ওপরে। ভার্জিন স্পট এখনও। কপাল ভাল থাকলে এখন থেকে নাথুলা পাহাড়ের দৃশ্যও দেখা যায়। প্যারেন যেন এক অসামান্য ভ্যালি। একবার পৌঁছলে ফিরতে মন চায় না। বিন্দুতে জলঢাকাকে বেঁধে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলছে। উত্তরবঙ্গের তো বটেই, ভারতের অন্যতম প্রাচীন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে দেখা প্রত্যেকেরই উচিত।
কুমাই-রকি আইল্যান্ড-সুনটালিখোলা-সামসিং-মেটেলি-চালসা - সর্বত্রই প্রকৃতি উদার হস্ত। কুমাই যেন উত্তরের লেক ডিস্ট্রিক্ট। অসামান্য এর শোভা। পিছিয়ে নেই রকি আইল্যান্ড ও সুনটালিখোলা। অন্যদিকে সামসিং-মেটেলি আর চালসার আবেদনও মোহময়ী। সর্বত্রই থাকবার ব্যবস্থা আছে।
মালবাজার-গরুবাথান-অহেলা-ডালিমকোট-শাখাম-সৌরেনি- ডুয়ার্সের অন্যতম প্রাচীন ফোর্ট ডালিমকোট দেখার আনন্দ যেমন, তেমনি অভিজ্ঞতাও অনন্য। মালবাজারকে ঘিরে চলে যাওয়া যায় এখানে। গরুবাথান কালিম্পঙ পাহাড়ের শুরুতেই ছোট্ট জনপদ। নিজের মতো অনন্য। অহেলা ভিউ পয়েন্ট থেকে যে দৃশ্য দেখা যায়, তার তুলনা সে নিজেই। তবে হাতিদের আঁতুরঘর শাখামের নির্জনতা আর নিঃসঙ্গতার বিকল্প সারা ডুয়ার্সে আর দ্বিতীয়টি নেই। শাখাম থেকে যাওয়া যায় সৌরেনি গ্রামে। রয়েছে জলপ্রপাত। উড়ে আসে পরিযায়ীরা।
লাভা-লোলেগাঁও-কোলেখাম-ছাঙ্গে-ন্যাওড়া ভ্যালি- লাভা লোলেগাঁও সম্পর্কে সকলেই অবহিত। পর্যটক ভিড়ে আগের সেই ভাল লাগা অনেকটাই উধাও। তুলনায় কোলেখাম-ছাঙ্গে খানিকটা হালকা এখনও। ছাঙ্গের জলপ্রপাত দেখতে অবশ্য ভিড় বাড়ছে আজকাল। ন্যাওড়া ভ্যালির মধ্যে অবস্থিত এই সব কয়টি জায়গাই অত্যন্ত উপভোগ্য।
গজলডোবা- ডুয়ার্সের প্রথম চা বাগান এখানেই তৈরি হয়। অবশ্য সেই চা বাগান আজ আর নেই। তবে তিস্তায় বাঁধ দিয়ে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে অনিন্দ্যসুন্দর টুরিস্ট স্পট। পাশের বিরাট জলাশয় আর অদূরের বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গল মিলে অসামান্য হল গজলডোবা। বোটিং, মাছ ধরা আর তিস্তা ও জলাশয়ে ভেসে বেড়ানো পর্যায়িদের দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যায়, বোঝাই যায় না!
মোটামুটি মূল জায়গাগুলিকে ধরে একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলাম এই লেখায়। আজকাল নিত্যনতুন বহু জায়গায় হোম সাথে বা রিসোর্ট করে প্রচার চালানো হচ্ছে। আসলে উত্তরের প্রায় সব জায়গাই অত্যন্ত সুন্দর। তাই যে কোনও জায়গায় থাকা যায় স্বচ্ছন্দে। রানিছেঁড়া, লিস রিভার, বেদগুড়ির মতো চা বাগানগুলি যেমন অসাধারণ, তেমনি পাপরখেতি, লুকসান, বানারহাট ইত্যাদি জায়গাগুলিও কম সুন্দর নয়। সাধ্য থাকলে তাই উচিত ডুয়ার্সের পথে পথে নিজের মতো বেরিয়ে পড়া। আর হ্যাঁ, ডুয়ার্স মানে কিন্তু তিস্তার পূর্ব তীর থেকে সংকোশের পশ্চিম তীর অবধি অঞ্চল। দার্জিলিং জেলা ডুয়ার্সের মধ্যে নয়।


https://www.kathalahori.com/2022/09/blog-post_5.html?fbclid=IwAR1ijo-R98MeCr4inFoBYauvvUiIWDlCjikqvHADVOWqU6m_LQGwySdVQYo

Sunday, October 16, 2022


 

একটি পুরষ্কার ও কিছু না বলা কথা

শৌভিক রায় 


সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা ভীষণ মনে পড়ছে! সেই ছোট্ট ছেলেটা যে দিনহাটা গার্লস স্কুলের লোহার গেটটা ঝাঁকিয়ে চলেছে আর চিৎকার করে বলছে গেটটা খুলে দিতে। 


আজ রেজাল্টের দিন। তার নিজেরও রেজাল্ট বেরিয়েছে। গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সে দৌড়ে চলে এসেছে মায়ের কাছে। কিন্তু মায়ের স্কুলের গেট বন্ধ। গেটের বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি। সেই ছোট্ট ছেলের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যাচ্ছে তীব্র কোলাহলে। কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না যে, কী করবে! তার মতো ছোট্ট ছেলের কাছে এই দিনহাটা শহর এক বিরাট জায়গা। বাবা থাকেন ভিন শহরে। বাড়িতে অন্যান্যরা থাকলেও, মা ও মায়ের সহকর্মীদের ঘিরেই তার জগৎ। অন্য দিন সে সোজা ঢুকে পড়ে স্কুলের ভেতর। কিন্তু আজ কিছুতেই গেট খুলছে না। দিশেহারা সে। কী করবে, কোথায় যাবে কিছুতেই বুঝতে পারছে না! তার তখন কান্নার উপক্রম। এর মধ্যেই কেউ একজন বলে উঠল, 'এই ছেলেটা বোধহয় ফেল করেছে। কীরকম কান্না কান্না মুখ!` নিজের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া ছেলেটির সে কথার উত্তর দেওয়ার স্পৃহাও আর নেই। সে একান্ত চাইছে মায়ের স্কুলে ঢুকতে, মাকে জানাতে তার রেজাল্ট। কিন্তু কোথায় গার্লস স্কুলের শিক্ষাকর্মী রামেশ্বরদা বা রতনদা কিংবা লাবণ্যমাসি। কে খুলে দেবে গেট!! 


হঠাৎ ছেলেটির পিঠে কেউ হাত রাখল। মুখ ঘুরিয়ে ছেলেটি দেখল তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে প্রিয় রাজাদা। অন্যদিন অনেকসময় সে আর রাজাদা একসঙ্গে মায়ের স্কুলে আসে। আজ রাজাদা পরে এসেছে। রাজাদাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। প্রাণ ফিরে পেল। রাজাদা ততক্ষনে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। রাজাদার ছোট্ট হাত দুটো হয়ে উঠেছে আশ্রয়ের হাত! তিরতির করে কাঁপতে থাকা ছোট্ট ছেলেটি ধীরে ধীরে শান্ত হয় এরপর....


পরের ঘটনা সহজবোধ্য। স্কুলের গেট খুলেছিল। সে এবং রাজাদা স্কুলে ঢুকেছিল। তাদের রেজাল্ট দেখে মায়েরা আনন্দ পেয়েছিলেন। ঝর্ণামাসি, প্রতিমামাসি, সন্ধ্যামাসি বা মানি, গৌরীপিসি, ইলামসি, জয়তীপিসি আর অতি অবশ্যই বেলামসি তাদের আদর করেছিলেন। বেলামসি তো চুলের বেণী ঝুলিয়ে দিয়ে ছেলেটিকে বলেছিলেন অন্যান্য দিনের মতো চুল ধরে ঝুলতে। রাশভারী সন্ধ্যামাসি গাল টিপে দিয়েছিলেন। প্রধানশিক্ষিকা মুকুলমাসি আর একটা পান মুখে দিয়ে আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। ঝর্ণামাসি বলেছিলেন, তাদের বাড়িতে গেলে ঘুঘনি করে খাওয়াবেন। খানিক আগের সেই বিচলিত অবস্থা থেকে উদ্ধার পেয়ে ছেলে তখন নিশ্চিন্ত। ইতিমধ্যে চলে এসেছে রিঙ্কু, রূপা, বাবুদা, ইমন, তানিয়া। জমে উঠেছে তাদের খেলা। 


সেদিনের সেই ছেলেটি আজকের আমি। সেদিনের সেই সাহচর্যের হাত পিঠে রাখা রাজাদা আসলে অনির্বাণ নাগ। ঝর্ণামাসি হলেন রাজাদার মা। বাকি যে নামগুলি বললাম তাঁরা ছিলেন দিনহাটা গার্লস স্কুলের দিদিমনি। চুল খুলে দিতেন যিনি তিনি জননেতা কমল গুহর স্ত্রী প্রয়াত বেলা গুহ, যাঁর বড় মেয়ে ইন্দ্রানীদি আজও আমার খোঁজ নেন। মানি বা সন্ধ্যা সাহা সহ বাকি দিদিমণিদের‌ও চেনেন কম বেশি সবাই।


আসলে দিনহাটা মানে আমার কাছে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। প্রাইমারি স্কুল ওখানে শুরু করলেও ক্লাস থ্রি-তে উঠে আমি চলে গিয়েছিলাম ফালাকাটায় বাবার কাছে। বাবা নিজের কর্মজীবনের শুরুতে ছিলেন দিনহাটা হাই স্কুলে। কিন্তু আমার জন্মের আগে ফালাকাটায় চলে যান হেডমাস্টার হয়ে। সেই অর্থে আমার খুব ছোটবেলা ছিল বাবাকে ছাড়া। আবার ফালাকাটায় চলে গেলে মা ছাড়াই থাকতে হয়েছে অনেকগুলি বছর। পরে অবশ্য মা-ও ফালাকাটায় চলে যান। কিন্তু মূল বাড়ি এবং কলেজ জীবন দিনহাটায় হওয়ার সুবাদে এখানকার রাস্তাঘাট, মানুষজন সবই আমার একান্ত আপন। তাই আজও মহামায়া পাট হয়ে হাটখোলার দিকে গেলেই তেল-ডাল-চাল-নুন-তামাক সব মিলেমিশে থাকা সেই অদ্ভুত গন্ধ যেমন পাই, তেমনি থানার পুকুরের বিরাট বট গাছটার ফাঁকে দিয়ে ছোটবেলার আশ্বিন রাতের নীল আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখি। কোনও এক মহালয়ার সকালে মা সন্তোষী বাসটির ধাক্কায় নিহত হরতোষ চক্রবর্তী যেমন আজও স্বপ্নে আসেন, তেমনি মনের চোখে দেখি আমাদের বাড়ির সামনের মসজিদের পাশে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা কাবুলিওয়ালা মির্জা খান সাইকেলে চাপিয়ে আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ছোট মেয়ে দেখলেই বলছেন, 'শুববু...এই লেড়কি কো বিয়া করবে?' দিনহাটা মানে আজও নবপল্লব পত্রিকার ক্ষুদে সম্পাদক পাজামা পাঞ্জাবি পরা অমিত কুমার দে-এর সঙ্গে কোচবিহার থেকে মিনিবাসে দিনহাটায় ফেরা আর তোর্সা ব্রিজে আটকে থাকা। দিনহাটা মানে এখনও রিকশা চেপে সেই কত্ত দূরের ঝর্ণা মাসির বাড়িতে সঞ্জয়, রাজাদা আর রিংকুর সঙ্গে খেলতে যাওয়া!


বদলে যাওয়া দিনহাটায় এখনও যেন খুঁজে পাই নিজের অস্তিত্ব, কেননা আজও কোনও শহর আমাকে নিজের মনে করেনি। দিনহাটা ভেবেছে আমি ফালাকাটার, ফালাকাটা ভেবেছে আমি দিনহাটার, আর কোচবিহার ভেবেছে বাইরে থেকে আসা কেউ একজন! অস্তিত্বের দোলাচলে এখনও যখন ভুগি, কখনও ছুটে যাই দিনহাটায় কখনও বা মূজনাই তীরের ফালাকাটায়। বেঁচে যায় আমার অহং, আমার নিজস্বতা। 


গত বছর এক শরৎ সন্ধ্যায় দিনহাটায় এমন একজন মানুষের নামে সম্মাননা পেলাম, যাঁকে প্রথম জীবনে মেসো বলে ডেকে এসেছি আর পরবর্তীতে দিনহাটা কলেজে পড়বার সুবাদে 'স্যার'। অন্য একটি অদ্ভুত সমাপতনও আছে। যাঁর নামে এই সম্মান প্রদত্ত হল সেই তিনি, শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হিতেন নাগ, ছিলেন সেই স্কুলের ছাত্র, যে স্কুলে আমি আজ কর্মরত। 


তাঁর সম্পর্কে নতুন করে আর কী বলার আছে! দিনহাটার মতো প্রান্তিক শহরে বসে তিনি যে কাজ করে গেছেন তাঁর মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ করবে। এমন একজন মানুষের নামে প্রদত্ত স্মৃতি সম্মাননা আমার মতো একজন অকিঞ্চিৎকর মানুষকে প্রদানের মাধ্যমে বকলম তাদের মহত্ব প্রকাশ করলেও, সম্মাননার সঠিক বিচার করলেন কিনা সে বিষয়ে আমি নিজে অন্তত সন্দিহান। তাই নিজের কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করছি দ্ব্যর্থভাবে। নিজের সামান্য লেখালিখিতে কোনোদিনই ভাবিনি যে, কোনও সম্মাননার যোগ্য আমি! আনন্দ হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু, অস্বীকার করব না, ভয়ও একটু ছিল। কেননা সম্মাননার মর্যাদা রাখার গুরু দায়িত্ব কিন্তু মাথায় চাপিয়ে দিলেন বকলম। তার ওপর এই সম্মাননা দিলেন এমন এক পরিবার ও সাহিত্য গোষ্ঠী, যাঁদের যাপনে অধ্যাপক হিতেন নাগ সবসময় উপস্থিত। পাশাপশি আমার বা আমাদের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের যে হৃদ্যতা তা কেবল অনুভূত ও অনুমেয়। তাই এই সম্মাননা গ্রহণ আমার দিনগুলিকে নিঃসন্দেহে কঠিন করেছে, বলা বাহুল্য সেটা।


 

ওই বিশেষ দিনে বারবার মনে পড়ছিল নিজের বাবা- মায়ের কথা। ওঁরা থাকলে সবচেয়ে খুশি হতেন। দুর্ভাগ্য মাত্র এগারো মাসের ব্যবধানে দুজনকেই হারিয়েছি কিছুদিন আগে। আজ আমি যেভাবে যেটুকু সবই তো তাঁদের জন্য। আর এই দিনহাটা শহরে আজও মায়ের কত ছাত্রী রয়েছেন! রয়েছেন বাবার ছাত্ররাও। মনে পড়েছে আমার শ্বশুর মশাই দেওয়ানহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহ-প্রধান শিক্ষক প্রয়াত বলিপ্রসাদ সাহাকে। ভীষণ উৎসাহিত করতেন তিনি। আমার সেজকাকু নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত মদন রায়ও আজ বড্ড খুশি হতেন। তবে সব আক্ষেপ নিমেষে মুছে দিলেন, শ্রীমতী ঝর্ণা নাগ। তাঁর প্রবল বাৎসল্য যে আজও কতটা টনিকের কাজ করে সেটা নিয়ে গবেষণা করা যেতেই পারে। 


সবসময় মনে করি যে, সাফল্য শুধু পাহাড়ের চূড়োয় ওঠা নয়, চূড়ো থেকে সাবধানে নেমে আসাকেও বোঝায়। ম্যালোরি তাই এভারেস্ট জয় করেও বিজয়ী হন না। তিনি আরোহন করেছিলেন, অবরোহন করতে পারেন নি। একই ভাবে সম্মাননা পেলেই হয় না, তার মর্যাদা রাখতে হয়। আর এই সম্মাননা তো এমন একজন মানুষের নামে যিনি আমার কাছে প্রকৃত শিক্ষক, দার্শনিক ও পথ প্রদর্শক। প্রার্থনা তাই, এই উত্তরণ শেষে অবরোহন যেন মসৃণ হয়। রাখতে পারি যথাযোগ্য মর্যাদা!

(প্রকাশিত: বকলম, সঞ্জয় নাগ)


Thursday, October 13, 2022

 



লোকটা 

শৌভিক রায়


                 লোকটা সারাদিন পাথর ভাঙে...
শুধু বুবাই নয়, অনেকেই খেয়াল করেছে এটা। বাড়ির ছাদ ঢালাই বা পিলার উঠবে এরকম তো নয়। এমনও নয় যে, বাড়ির সামনে রাস্তা তৈরি হবে আর সেই রাস্তা তৈরির জন্য লোকটা স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে!
বুবাইয়ের কেমন ভয় ভয় লাগে। সেই চেনা লোকটা এরকম করছে কেন! বাড়ির পিছনটায় যেখানে একফালি বাগানের মতো, সেখানেই সারাদিন পাথর ভেঙে চলেছে লোকটা। চওড়া রোদ, দুরন্ত বৃষ্টি, দারুণ ঠান্ডা, ভয়ংকর গরম... কিছুই লোকটাকে আটকাতে পারছে না!
বুবাইয়ের আরও ভয় হচ্ছে। লোকটা আজকাল তেমন কথাও বলে না। কেউ কিছু বললে চুপচাপ শোনে। চোখ দেখে অবশ্য মনে হয় না কিছু শুনছে। এমনই শূন্য দৃষ্টি লোকটার। শুধু যখন কারও কথায় পাথর শব্দটা আসে, তখনই লোকটার চোখ চকচক করে ওঠে। বুবাই লক্ষ্য
করেছে এটা।
কিরকম অদ্ভুত না! সারাটা দিন চুপচাপ, কারও সঙ্গে কথা নেই, কারও কথা মন দিয়ে শোনা নেই, কেবল পাথর আর পাথর। লোকটা কি পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি? নাঃ, দাদাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে এর একটা হেস্তনেস্ত এবার করতেই হবে। সেরকম হলে ডাক্তার দেখাতে হবে। পরশু দিলীপ যা বলে গেছে এরপর আর দেরি করা ঠিক হবে না।
দিন কয়েক আগে, লোকটাকে বাইরে যেতে দেখে বুবাই একটু নিশ্চিন্ত হয়েছিল। যাক একটু ঘুরেটুরে বেড়াক। মনটা বদলাবে। কিন্তু দিলীপ জানিয়ে গেছে লোকটা নাকি বাবুপাড়ার রাস্তায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। ঠিক কোথায় দাঁড়িয়েছিল জানতে চাওয়ায় দিলীপ যে জায়গাটার কথা বলল সেটার আশঙ্কাই করছিল বুবাই। বাবুপাড়ার ওই রাস্তাটার ধারে দীর্ঘদিন ধরেই একটা বড় পাথর রয়েছে। বুবাই শুধু নয়, এই শহরের সব লোকই জানে। দিলীপের কাছে আর কিছু জানতে চায়নি বুবাই। কে যেন বুবাইয়ের মুখটাকে আটকে ধরেছিল। কিন্তু মনটাকে কে আর বাঁধবে! মনের চোখে বুবাই দেখতে পাচ্ছিল লোকটা একদৃষ্টে ওই পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার দু'চোখ চকচক করছে। নেহাত লোকজন আছে বলে পাথরটাকে তুলে বাড়িতে আনতে পারছে না!
দাদভাই এসেছিল। লোকটার সঙ্গে কথা বলেছে অনেকক্ষণ। অবশ্য বুবাইয়ের ধারনা দাদাভাই-ই একতরফা কথা বলেছে। লোকটা আদৌ কিছু বলেনি। বরং তাদের কথাবার্তার শেষে দাদাভাইয়ের কথায় বুবাইয়ের রাগই হল একটু। কোথায় লোকটাকে একটু কড়কে দেবে তা না, উল্টে লোকটাকে আরও বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছে!
পরে অবশ্য আলাদা করে বুবাইকে ডেকে দাদাভাই বলেছে,
— দ্যাখ, লোকটার কাজটাজ নেই। সকালে উঠে তোর দোকানের সামনে ঝাঁট দেয়। কিন্তু তারপর আর কী করবে? তুই তো ওকে দোকানে
ঢুকতে দিস না। ওই রকম বুড়োমার্কা চেহারা দেখে নাকি তোর দোকানে কাস্টমার আসবে না। অবশ্য এমনিতেও বিশেষ লাভ নেই। প্রেসক্রিপশান দেখেও কিছু বুঝবে না। কোন্ ওষুধ কোথায় রাখা আছে তাও জানে না।
একটু দম নিয়ে দাদাভাই আরও যোগ করল,
- আর একটা কথা, বাজার করে কাকিমা। রাঁধে তোর বৌ। বাসন মাজে ঠিকে ঝি। তো লোকটা কী করবে? যা করছে করুক, কাউকে তো ডিস্টার্ব করছে না। আর বলছে এতে ওর শরীর ভালো থাকে। দ্যাখ, বই পড়ার নেশা নেই, এই শহর ছেড়ে আর নিজের দোকান ছেড়ে বাইরে কোথাও দু'রাতও কাটায়নি লোকটা। কী করবে বেচারা, বল তো তুই নিজেই!
এটা একটা কথা হল? কাজ নেই বলে পাথর ভাঙবে? কাজ তো সারাজীবন বহু করেছে লোকটা। এ তল্লাটের সেরা মণিহারি দোকান এই লোকটারই ছিল। সেই সময়ে লোকটার ঠাটবাট ছিল চোখে পড়ার মতো। গা থেকে কিউটিকোরা পাউডারের গন্ধ ভুরভুর করে বেরোত। বুবাইয়ের মা'কে নিয়ে শনিবার রাতে বাড়ির কাছের সিনেমা হলে নাইট শো বাঁধা ছিল।
পুজোর সময় তো নাওয়া খাওয়ার সময় থাকত না। ভীষণ ভীড় লেগে থাকত দোকানে। তারপর কবে যে হঠাৎ কী হল! চারদিকে আলো ঝলমলে শপিং মল, আলাদা আলাদা আরও ঝাঁ চকচকে নানা দোকান, স্মার্ট সেলস গার্ল... সব কিছুর থাবায় লোকটার দোকানটা হারাতে হারাতে একদিন সত্যিই হারিয়ে গেল। কিন্তু লোকটা হারাতে চায়নি দোকানটা। খুব ঝামেলা করেছিল কয়েকদিন। না খেয়ে পর্যন্ত প্রতিবাদ করেছিল বুবাইয়ের মা, বুবাইয়ের বৌ আর বুবাইয়ের নিজের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা লোকটার কোন কথা শোনেনি।
লোকটার মণিহারি দোকান বন্ধ করে পার্টনারশিপে এই ওষুধের দোকানটা করে ফেলেছিল বুবাই। কিছুতেই কিছু হবে না বুঝতে পেরে লোকটা পরের দিকে আর কোন কথাই বলেনি। বুবাইও সেভাবে আর কিছু খেয়াল করেনি। ওষুধের দোকান সাজানো, পার্টনারশিপের কাগজপত্র তৈরি করা, ডাক্তার বসানো, রিক্সাওয়ালা ফিট করা এসব করতে করতে লোকটার কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। সেদিন যখন লোকটাকে ভালোভাবে দেখল, তখনই ভাবনাটা মাথায় এসেছিল। লোকটা পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো? নাঃ, দাদাভাইকে দিয়ে কোন কাজ হল না।
বুবাইয়ের ওষুধের দোকানটা চলছে না। আরও কিছু নতুন ওষুধের দোকান হয়েছে। নামী ডাক্তারদের ভীড় সেখানে। বুবাই স্পষ্ট বুঝতে পারছে তাদের আর কিছু করার নেই। কেউ কেউ বুদ্ধি দিচ্ছে ফাস্ট ফুডের দোকান খুলতে। কোন এক বিদেশি কোম্পানি ফ্রানচায়েসি খুঁজছে। তাদের কেউ কেউ বুবাইদের দোকান দেখেও গেছে। হতাশ বুবাই টের পাচ্ছে দোকানটাকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না সে। কিন্তু তবুও হাল ছাড়ছে না। দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছে।
সেদিন এক কোম্পানি এলো কীসব ব্যবসার কথা নিয়ে। বুবাইয়ের হঠাৎ মাথা গরম হয়ে গেল। কী পেয়েছে কী সবাই মিলে! তার দোকান। তিল তিল করে দোকানটাকে সে সাজিয়েছে। কথায় কথায় তর্ক বেঁধে যেতেই বুবাই পাথর তুলে...ভোরের স্বপ্নটা এখানেই ভেঙে গেল।
দরদর করে ঘামতে ঘামতে বিছানায় উঠে বসল সে। জানালা দিয়ে হালকা ভিজে হওয়া আসছে। বউ অকাতরে ঘুমোচ্ছে। বুবাই ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
একটা ঠকঠক আওয়াজ দূর থেকে কানে আসায়, বুবাই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল আওয়াজটাকে লক্ষ্য করে। বুঝতে পারছে সে কিসের আওয়াজ। হ্যাঁ ঠিকই। এই সকালেও লোকটা পাথর ভাঙছে। বুবাই চুপচাপ দাঁড়াল লোকটার পাশে।
বিভোর হয়ে লোকটা পাথর ভেঙেই চলেছে। বুবাই খেয়াল করে লোকটার স্বপ্নালু চোখে খেলা করছে এক অনির্বচনীয় আনন্দ... যেন লোকটা কেবল পাথর ভাঙছে না! ভাঙছে সব বাধা — পরাজয়ের, গ্লানির, ক্লেদের, অপ- মানের, ব্যর্থতার, সংসারের, জীবনের...... হয়তো বা মৃত্যুরও।
বুবাই লোকটার পাশে চুপচাপ বসে। এগিয়ে দেয় একটা বড় পাথর। তারপর একটা একটা করে আরও পাথর। অস্ফুটে বলে, 'ভাঙো বাবা...আরও ভাঙো!'
লোকটা চমকে তাকায় বুবাইয়ের দিকে।
হঠাৎই বুবাইয়ের চোখে নামে জলের ধারা।
আচমকা বৃষ্টি অবশ্য মুছে দেয় সেই জল....           

 

দুর্গা পুজো

শৌভিক রায়

"নবপত্রিকা বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ। নবপত্রিকা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নটি গাছের পাতা। তবে বাস্তবে নবপত্রিকা নটি পাতা নয়, নটি উদ্ভিদ। এগুলি হল - কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান। একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ একত্র করে একজোড়া বেল-সহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার প্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পুজো করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম কলাবউ।

নবপত্রিকার ৯টি উদ্ভিদ আসলে দুর্গার ৯টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত হয়। এই ৯ দেবী হলেন রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুণ্ডা ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী। এই নয় দেবী একত্রে "নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা" নামে নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ মন্ত্রে পূজিতা হন।
মহাসপ্তমীর দিন সকালে কাছের কোনও নদী বা কোনও জলাশয়ে (নদী বা জলাশয় না থাকলে কোনও মন্দিরে) নিয়ে যাওয়া হয়। পুরোহিত নিজেই কাঁধে করে নবপত্রিকা নিয়ে যান। তাঁর পিছন পিছন ঢাকীরা ঢাক বাজাতে বাজাতে এবং মহিলারা শঙ্খ ও উলুধ্বনি করতে করতে যান। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী স্নান করানোর পর নবপত্রিকাকে নতুন শাড়ি পরানো হয়। তারপর পূজামণ্ডপে নিয়ে এসে নবপত্রিকাকে দেবীর ডান দিকে একটি কাষ্ঠসিংহাসনে স্থাপন করা হয়। পুজোমণ্ডপে নবপত্রিকা প্রবেশের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর মূল অনুষ্ঠানটির প্রথাগত সূচনা হয়।
নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। এরপর বাকি দিনগুলিতে নবপত্রিকা প্রতিমাস্থ দেবদেবীদের সঙ্গেই পূজিত হতে থাকে। বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় হল, নবপত্রিকা প্রবেশের পূর্বে পত্রিকার সম্মুখে দেবী চামুণ্ডার আবাহন ও পুজো করা হয়। পত্রিকাস্থ অপর কোনও দেবীকে পৃথক ভাবে পুজো করা হয় না।
গবেষকদের মতে, নবপত্রিকার পুজো প্রকৃতপক্ষে শস্যদেবীর পুজো। ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন, 'এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক রূপে গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজার মূলে বোধহয় এই শস্য-দেবীরই পূজা।' পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপুজোর বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আসলে এই সবই হল পৌরাণিক দুর্গার সঙ্গে এই শস্যদেবীকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্য-মাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপুজোর ভিতরে এখনও সেই আদিমাতা পৃথিবীর পুজো অনেকখানি মিশে রয়েছে।"
( এই অংশটুকু 'এই সময়' পত্রিকা থেকে নেওয়া হয়েছে। )
(ছবি- কলকাতার গড়ফা-হালতুর মাঝের মূল রাস্তায় তোলা)






দুর্গা পুজোর অষ্টমী মানেই বিশেষ দিন। সকাল থেকে শুদ্ধ দেহে, শুদ্ধ চিত্তে দেবীর আরাধনার দিন। গতদিন নবপত্রিকা স্থাপনের মধ্যে দিয়ে যে আবাহন শুরু হয়েছিল, আজ তা শুদ্ধ সত্তা লাভ করে।
পুরাণ অনুযায়ী, মহাষ্টমীতেই দেবী দুর্গাকে নানা ধরনের অস্ত্র, পদ্মের মালা, রত্নহার দিয়ে সাজিয়ে তুলেছিলেন দেবতারা। কারণ, পুরাণের মতে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণানবমী তিথিতে দেবতাদের তেজ পুঞ্জীভূত হতে শুরু করে। আর, সেই পুঞ্জীভূত তেজ আশ্বিনের সপ্তমী তিথিতে বিশেষ রূপ ধারণ করে। সেই তেজের সাহায্যেই অষ্টমী তিথিতে দেবী মহিষাসুরমর্দিনীকে সাজিয়ে তুলেছিলেন দেবতারা।
দেবী আজ আবির্ভূতা হন মহালক্ষ্মীরূপা বৈষ্ণবী শক্তি হিসেবে। আজ তাঁর রাজরাজেশ্বরী মূর্তি। তিনি আজ উদারহস্ত। শ্রেষ্ঠ উপাচার নিবেদিত হয় আজ। পদ্ম, জবা, অপরাজিতা, বেলপাতা— কত রকমের ফুলমালায় দেবীকে সাজানো হয়।
অষ্টমীপুজো হল দুর্গোৎসবের পাঁচটি দিনের মধ্যমণি। এই একটি দিনেই সংহত হয়ে রয়েছে পাঁচদিনের পুজোর নির্যাস। অষ্টমীতে পুজোর বাহুল্য তাই বেশি। এদিন ৬৪ যোগিনী, কোটি যোগিনী, নবদুর্গা প্রমুখের আরাধনা হয়ে থাকে। এদিন ভক্তেরা দেবীকে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন— "নমস্যামি জগদ্ধাত্রি ত্বামহং বিশ্বভাবিনি"।
আবার দুর্গা পূজার অষ্টম দিনে মাতা মহাগৌরীর উপাসনার বিধান আছে। মায়ের শক্তি অমোঘ ও অনন্ত। মায়ের স্মরণ, মনন, চিন্তন, পূজন, ধ্যান, আরাধনায়, ভক্তের সমস্ত পাপ ও ক্লেশ বিনষ্ট হয় ও সিদ্ধিলাভ হয়। তাই নবরাত্রির অষ্টম দিনে মাতা মহাগৌরী পূজিতা হন। মায়ের বর্ণ হল গৌর। এই গৌরবর্ণ বা শুভ্রতার উপমা শঙ্খ, চন্দ্র, কুন্দ ফুলের সঙ্গে করা হয়েছে। মায়ের বস্ত্র ও আভূষণ শ্বেতবর্ণ। দেবী সরস্বতীর মতো মাতা মহাগৌরীও সম্পূর্ণ শুভ্রবর্ণা।
অষ্টম দূর্গা মহাগৌরীর রূপ অত্যন্ত শান্ত ও শান্তি প্রদায়ক। তিনি নিত্যশুদ্ধা, নির্মলা এবং পতিব্রতার অখন্ড উদাহরণ। তিনি ত্রিনয়নী, বৃষভবাহিনী ও চতুর্ভুজা। তাঁর দক্ষিণ দিকের দুটি হস্তে অভয় মুদ্রা ও ত্রিশূল এবং বাম দিকের দুই হস্তে আছে বরমুদ্রা ও ডুমরু। শিব পুরাণ অনুযায়ী শিবকে পতি রূপে লাভ করার জন্য দেবী পার্বতী কঠিন তপস্যা করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র আট বৎসর--"অষ্টবর্ষা ভবেদ্ গৌরী"। প্রখর তাপের প্রভাবে দেবীর সুকোমল শরীর শরীর ক্ষীণ ও কালো হয়ে যায়। ভগবান শিব প্রসন্ন ও সন্তুষ্ট হয়ে দেবীকে দেখা দেন এবং পবিত্র গঙ্গাজল দেবীর উপর বর্ষণ করেন। দেবী হয়ে উঠলেন অদ্বিতীয়া গৌরবর্ণা। বিদ্যুৎকান্তিসম বর্ণ ধারণ করে দেবীর নাম হল মহাগৌরী।
ধর্মীয় এইসব ব্যাখ্যার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, অষ্টমীর এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশেরও বিভিন্ন অনুষঙ্গ। এমনিতেই প্রকৃতি মানে নারী। নারী শক্তির পুজো মানে কিন্তু আসলে প্রকৃতিরই পুজো... সেই প্রকৃতি যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের সবকিছু। পাশাপাশি শরৎ বা হেমন্ত হল মধ্যবর্তী সেই সময় যখন গ্রীষ্ম বিদায় নিচ্ছে, শীত আসছে। এই পরিবর্তনের কাল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, বীজ বপন করা হয়েছে কিছুদিন আগে। শস্য উঠতে চলেছে আর কিছুদিন পর। মধ্যবর্তী সময় সেদিক থেকেও। আবার যদি দেখি, শুভ অশুভের দ্বন্দ্ব, তাহলেও পাচ্ছি, এই বিশেষ দিনে অশুভের বিরুদ্ধে শুভর সংগ্রাম শুরু! আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই দ্বন্দ্বই তো চলছে শ্রেয় আর প্রেয় হিসেবেই। আর কে না জানে, দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত যে নির্যাস নিয়ে আসে সেটাই সুন্দর, সেটাই সত্যি, সেটাই শ্বাশত।
ব্যাখ্যা অনেক তাই। বাকি সবটাই বিশ্বাস আর ভাবনা। পুজো ভাল কাটুক সকলের। অষ্টমীর অঞ্জলি শুধু উচ্চারণে নয়, মননে থাকুক আমাদের।
ঋণ স্বীকার- অরিন্দম চক্রবর্তী, এই সময়, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
(প্রথম ছবি- রাজডাঙা নবউদয় সংঘ, কসবা, কলকাতা
দ্বিতীয় ছবি- হিন্দুস্থান ক্লাব, গড়িয়াহাট, কলকাতা)






প্রখ্যাত কবি টি এস এলিয়ট তাঁর একটি কবিতায় বলেছিলেন 'In my beginning is my end'। বড় সত্যি কথা! শুরুর মধ্যে থাকে শেষের সংকেত। পিতৃপক্ষ অবসানে সূচনা হয়েছিল যে মহোৎসবের, আজ তারই শেষ দিন। আজ প্রকৃত অর্থে অশুভর বিনাশ। কেননা নবমীর এই দিনটিতেই দেবী দুর্গা অসুরকে বধ করেছিলেন। শ্রী রামচন্দ্র দুর্গার শক্তি আর আশীর্বাদ নিয়ে এই দিনে অশুভ রাবণকে বিনাশ করেছিলেন। তাঁর এই পুজোর জন্যই, শাস্ত্র মতে, একে অকাল বোধন বলা হয়।
গতদিন হয়ে গেছে সন্ধিপূজা। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিট এই পূজা হয়ে থাকে। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট নিয়ে মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু অষ্টমী ও নবমী তিথির সংযোগ স্থলে এই পূজা হয়, তাই এই পূজার নাম সন্ধিপূজা। এই সন্ধি বলতে কিন্তু সন্ধ্যা নয়। বরং সন্ধি-কালীন পূজা।
দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অঙ্গ হল সন্ধিপুজো। এইসময় দেবী দুর্গাকে চামুন্ডা রূপে পুজো করা হয়ে থাকে। সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। এই পূজা সম্পন্ন হয় তান্ত্রিক মতে। এই পূজায় দেবীকে ষোলটি উপাচার নিবেদন করা হয়। এই সময় বলিকৃত পশুর স্মাংস-রুধি (মাংস ও রক্ত) এবং কারণ (মদ) দেবীর উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়।
মহানবমী পুজোর তাৎপর্য সম্পর্কে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। তবে হিন্দু পুরাণ মতে মা দুর্গা মহিষাসুরকে দশমীতে বধ করছিলেন, তাই সেই দিক থেকে দেখতে গেলে যুদ্ধের শেষ দিন নবমী। শাস্ত্র মতে, এই দিন দেবীর পূর্ণাঙ্গ পুজো করা হয়।
নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলে সম্পদলাভ হয়। শাপলা-শালুক ও বলিদান সঙ্গে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নবমী পূজা পালিত হয়। শাস্ত্রমতে, নবমীতেই দেবী বন্দনার সমাপ্তি। তাই ভক্তরা প্রার্থনা করতে থাকেন দেবীর উদ্দেশ্যে। যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে আহুতি দেওয়া হয়। ১০৮টি বেল পাতা, আম কাঠ, ঘি দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়।
ধর্মীয় ব্যাখ্যা থাকুক তার জায়গায়। শাস্ত্র ঘাটলে হয়ত পাওয়া যাবে আরও অনেককিছুই। কিন্তু নবমী মানে আপামর বাঙালির কাছে বুক টনটন করবার দিন। পুজো শেষ হয়ে গেল! আগামীকাল উমা চলে যাবেন কৈলাশে। কে আর চায় নিজের মেয়েকে বিদায় জানাতে! 'দিতে নাহি চায়' ভেবেও এই যে যেতে দেওয়া, এর কষ্ট বোঝে মেয়ের বাবার বাড়ির মানুষেরাই। আমাদের অবস্থাও তাই আজ ঠিক ওরকমই যেন। তাই আষ্টেপৃষ্ঠে ধরা আজ তাঁকে। যতটা সম্ভব থাকা তাঁর সঙ্গে! থাকা শুভর সঙ্গে, অশুভের বিরুদ্ধে।
কিন্তু সত্যিই কি শুভ ভাবনায় উদ্বেলিত আমরা? প্রশ্ন জাগে। যে মহা মিলনের বার্তা নিয়ে দুর্গাপুজো আমাদের প্রতি বছর কিছু শিখিয়ে যায়, তার থেকে আদৌ কি শিক্ষা নিই কিছু আমরা? অসম্প্রীতি, অশিক্ষা আর কুসংস্কারের অশুভ শক্তি থেকে মুক্তি মিলছে কোথায়? কোথায় জেগে উঠছে চেতনা আমাদের? কোথায় আমরা আপন করছি একে অন্যকে!!
নবমী দিনে প্রার্থনা তাই এটুকুই। নবমী রাতি অবসান হ'য় না, অবসান ক'র আমার মন ও শরীরের কলুষকে.....
তথ্য: সংগৃহীত
(প্রথম ছবি: শক্তি সংঘ, পূর্বাচল, হালতু
দ্বিতীয় ছবি: নন্দী বাগান, হালতু)





ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরূৎ, ব্যোম.... পৃথিবী জল আগুন বায়ু ও আকাশ। পঞ্চভূত। পঞ্চতত্ত্ব।
হিন্দু ধর্ম অনুসারে যে কোনও মহাজাগতিক সৃষ্টির মূল হল এই পঞ্চভূত বা পঞ্চতত্ত্ব। এই পাঁচ উপাদানই প্রাণ প্রতিষ্ঠার পেছনে। তাই মৃত্যুর পর আমরা মিশে যায় সেই পঞ্চভূতেই।
একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় হিন্দু ধর্মের একটি বিশেষত্ব হল, কমবেশি সব অনুষ্ঠানেই প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় পালন করা। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি থাকলেও, হিন্দু ধর্ম ছাড়িয়ে গেছে সবাইকে। আর এই প্রত্যেকটি ব্যাপারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, যা আমাদের মোটা চোখে ধরা পড়ে না। উল্টে সেই সব বিষয়ের ওপর অযথা দেবত্ব আরোপ করে তাকে আমরা স্থূল করে তুলেছি। আর তার ফল? আস্ফালন! ভক্তির নামে ভন্ডামি!
দশমীতে কেন প্রতিমাকে বিসর্জন দেওয়া হয়? কারণ কী? তাৎপর্য লুকিয়ে এই দর্শনেই। যে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল গঙ্গা তীরের মৃত্তিকা দিয়ে, যে প্রতিমাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল... তাকে সেই গঙ্গাতেই বিসর্জন দেওয়া হল! মিলছে কি অন্তর্নিহিত তাৎপর্যটি? শুধু এখানেই থেমে থাকছে না দর্শনটি। আরও একটু আছে। বিসর্জন শব্দটির অর্থ কী? বিশেষ রূপে সৃজন। কিন্তু গঙ্গায় প্রতিমা ভাসিয়ে দিয়ে সেই সৃজন পূর্ণ হল কীভাবে? হ'ল, অবশ্যই হ'ল। অন্তরের মধ্যে যে আদির সূচনা হ'ল, সেটাই তো প্রকৃত সৃজন, বিশেষ রূপে সৃজন। বিজয়া দশমীর বিসর্জনে লুকিয়ে তাই বড্ড দামী কথা!
এমনিতে 'দশমী' ব্যাপারটি কমবেশি সকলেই জানেন। এই দিন অর্থাৎ আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে বাপের বাড়ি ছেড়ে উমা কৈলাসে চলে যান। তাঁর স্বামীর কাছে। তাই এই তিথি হল 'বিজয়া দশমী'।
আবার প্রশ্ন জাগছে। দশমী তো বুঝলাম। কিন্তু 'বিজয়া' কেন? আশ্রয় নিতে হচ্ছে পুরাণের।মহিষাসুর বধ কাহিনীতে বলা হয়েছে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পর দশম দিনে তাঁর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন মা দুর্গা। তাই তাকে 'বিজয়া' বলা হয়। আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী কাহিনী অনুসারে, দেবীর আবির্ভাব হয় আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে। পরে শুক্লা দশমীতে মহিষাসুর বধ করেছিলেন তিনি।আজকের এই দিন অর্থাৎ দশমীর দিনটি সেই বিজয়াকেই বোঝায়।
ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিজয়া দশমী বলতে 'দশেরা'কে বোঝায়। 'দশেরা' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'দশহর' থেকে। যার অর্থ দশানন রাবণের মৃত্যু। বাল্মীকি রামায়নে বলা হয়েছে, আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতেই লঙ্কেশ্বর রাবণকে বধ করেছিলেন রাম। কথিত আছে, রাবণ বধের পরে আশ্বিন মাসের ৩০ তম দিনে অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেন রাম, সীতা, ও লক্ষণ। রাবণ বধ ও রামচন্দ্রের এই প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যেই যথাক্রমে দশেরা ও দীপাবলি পালন করা হয়ে থাকে।
এই দিনটিতে বাঙালি সমাজে সিঁদুর খেলা কবে কীভাবে এল তার কোনও প্রামাণ্য ইতিহাস নেই। একটি তথ্য বলছে, জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজায় ২০০ বছর আগে এই সিঁদুর খেলার উৎসব শুরু হয়েছিল। কিন্তু জোর দিয়ে সেটা বলা যায় না। আবার অনেকের মতে, সিঁদুর খেলার এই ঐতিহ্য দুর্গাপূজার মতই পুরানো। সেই হিসেবে এই রীতি প্রায় ৪০০ বছর পুরানো। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে। তবে এটি একটি লৌকিক আচার এবং মনে করা হয়, সঠিক রীতি মেনে সিন্দুর খেলা হলে, নারী বিধবা হন না।
সবশেষে বিজয়া দশমীর আর একটি প্রথার কথা বলব। মনে পড়ে সেই কথাগুলি? 'যাও উড়ে নীলকণ্ঠ পাখি, যাও সেই কৈলাসে,/ দাও গো সংবাদ তুমি, উমা বুঝি ওই আসে।' আজকের দিনে বিভিন্ন নিয়মে সেই মাতামাতি না থাকলেও, ভুললে চলবে না নীলকন্ঠ পাখির কথা। বলা হয়, দশমীর দিনে উমার কৈলাসে গমনের বার্তা নীলকণ্ঠ পাখিই মহাদেবকে দিয়ে থাকে। তাই, দশমীর দিন দুটি নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হয়। প্রথমটি মণ্ডপ থেকে দেবী দুর্গার যাত্রা শুরু হওয়ার সময় ও অপরটি দেবী দুর্গার নিরঞ্জনের পর।
আর একটি ধারণা হল, নীলকণ্ঠ পাখির দর্শনের পর রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেন রামচন্দ্র। লঙ্কাজয়ের পর রামের ওপর ব্রহ্মহত্যার পাপ লাগে। এরপর লক্ষ্মণের সঙ্গে মিলে রাম শিবের আরাধনা করেন ও ব্রাহ্মণ হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হন। সে সময় শিব নীলকণ্ঠ পাখির রূপ ধারণ করে মর্ত্যে এসেছিলেন। নীলকণ্ঠকে পৃথিবীতে শিবের প্রতিনিধি ও স্বরূপ, দুই-ই মনে করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, নীলকণ্ঠ রূপ ধারণ করেই শিব মর্ত্যে বিচরণ করেন।
এই দিনে দেখতে পাচ্ছি তাই, লাল সিঁদুরে ভ'রে যাওয়া মণ্ডপ থেকে উড়ে যাচ্ছে নীলকন্ঠ। গোধূলির আলোতে লাল হয়ে যাওয়া গঙ্গার জল থেকেও উড়ে যাচ্ছে নীলকন্ঠ। উড়ে যাচ্ছে সে হিমালয়ে। বার্তা নিয়ে। মর্ত্য থেকে ফিরছেন মা। ফিরছেন কোথায়? প্রবল পরাক্রমশালী হিমালয়ের কোলে পুরুষ শক্তির কাছে। পুরুষ আর প্রকৃতি মিলে যাচ্ছে আবার। সাক্ষী থাকছে পরিবেশের নানাবিধ উপাদান.... গঙ্গার জল, নীলকন্ঠ পাখি, শরতের উদার আকাশ, সাদা কাশফুল! আর যাদের ছাড়া এই সভ্যতা অচল, অবশ্যই সেই মানবকূল‌ও দেখছে এই মহামিলন। আভাস কি পাওয়া যাচ্ছে না হিন্দু ধর্মের প্রকৃতি সমন্বয়?
পুজো মানে মিলন। মহামিলন। পুজো মানে পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি ঋণ স্বীকার। পুজো মানে শুভ অশুভের দ্বন্দ্বে শুভর জয়।
সেই জয়ে সব পাপ স্খলন করে এগিয়ে চলা অমৃতের পথে। প্রতি বছর। প্রতি বার....
শুভ বিজয়া।
সকলের মঙ্গল হোক।
তথ্য: সংগৃহীত
(ছবি: হুগলি জেলার জনাই-এর গাঙ্গুলি বাড়ির প্রতিমা)


ছবি- লেখক

Tuesday, October 11, 2022

 নীলা আশমা শো গয়া...

শৌভিক রায়


তাঁকে দেখামাত্রই শিড়দাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেত। 


আজকাল তো মনে হয় বৃদ্ধকালও এতো সুন্দর হতে পারে!


মানুষটি যখন কেবিসি করতে এলেন তখন লেখিকা শোভা দে বলেছিলেন ব্যাপারটা যেন স্যার লরেন্স অলিভিয়ের ফিল্ম শো-এর ইন্টারভ্যালে বাদাম বেচছেন! 


স্বাভাবিক এই ভাবনাটা। কেননা একেই তিনি টিভির পর্দায় তায় আবার গেম শো'র অ্যাঙ্কর! 


রোলস রয়েস কি আর তৃতীয় বিশ্বের ভাঙাচোরা খানাখন্দে ভরা রাস্তায় চলতে পারে নাকি? 


কিন্তু তিনি তো তিনিই! হিসেব উল্টোতে আগাগোড়াই শাহেনশা!


 ভাগ্যিস এসেছিলেন। তাই তো ওই ব্যারিটোন গলা, ওই গভীর চোখ, ঠিকরে পড়া ব্যক্তিত্ব চোখের সামনে মাঝেমাঝে আজকাল। (নিজের নজর না লেগে যায়!)


ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী না হয়েও এই ভদ্রলোকের কাছে কেন যেন হেরে বসে আছি। পুজো করতে ইচ্ছে করে বড্ড। 


এরকম ছেলেমানুষি পোস্ট করতে অভ্যস্ত নই আমি। কিন্তু এঁর মহিমা, অবশ্যই আমার ওপর, এতোটাই যে বারবার ছেলেমানুষ হয়ে যাই। গন্ডগোল বেঁধে যায় সব আর শিরদাঁড়ায় সেই ঠান্ডা স্রোতটা বয়ে যায়! 


ভদ্রলোকের আজ জন্মদিন। কোচবিহার-মুম্বাই দূরত্বটা বিরাট। এই পোস্টটি দেখবার কোনো সুযোগ ভদ্রলোকের নেই। উনি দেখুন সে আর্জিও আমার নেই। কিন্তু আর্তি আছে। আর্তি এটাই যে উনি ঠিকঠাক থাকুন। এতোটাই ঠিকঠাক থাকুন যে আমি যেন বারবার ছেলেমানুষ হয়ে যেতে পারি! 


সবশেষে স্মৃতিতে সেই দিন আবার। 

কলেজ ফেরতা জিনস-পাঞ্জাবির কানে রাস্তার ধারের দোকান থেকে টেপডেকে ভেসে আসছে 'নীলা আশমা শো গয়া...' সেই কলেজ ফেরতা মুহূর্তে ফ্রিজ শট। সব্বাই চলে গেল। একা কলেজ ফেরতা দাঁড়িয়েই রইল!


সবশেষে তিনি এলেন। হাত ধরলেন। 

ধরেই রইলেন। 


নীল আকাশ আজও শুয়ে বুকের মাঝে। 


আকাশেই তো তাঁরা থাকেন। 

আকাশেই তো তারা থাকে।


(পুরোনো লেখা। আবার পোস্ট করলাম। তাঁর জন্মদিন আজ.....)