দুর্গা পুজো
শৌভিক রায়
"নবপত্রিকা বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ। নবপত্রিকা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নটি গাছের পাতা। তবে বাস্তবে নবপত্রিকা নটি পাতা নয়, নটি উদ্ভিদ। এগুলি হল - কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান। একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ একত্র করে একজোড়া বেল-সহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার প্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পুজো করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম কলাবউ।
নবপত্রিকার ৯টি উদ্ভিদ আসলে দুর্গার ৯টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত হয়। এই ৯ দেবী হলেন রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুণ্ডা ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী। এই নয় দেবী একত্রে "নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা" নামে নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ মন্ত্রে পূজিতা হন।
মহাসপ্তমীর দিন সকালে কাছের কোনও নদী বা কোনও জলাশয়ে (নদী বা জলাশয় না থাকলে কোনও মন্দিরে) নিয়ে যাওয়া হয়। পুরোহিত নিজেই কাঁধে করে নবপত্রিকা নিয়ে যান। তাঁর পিছন পিছন ঢাকীরা ঢাক বাজাতে বাজাতে এবং মহিলারা শঙ্খ ও উলুধ্বনি করতে করতে যান। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী স্নান করানোর পর নবপত্রিকাকে নতুন শাড়ি পরানো হয়। তারপর পূজামণ্ডপে নিয়ে এসে নবপত্রিকাকে দেবীর ডান দিকে একটি কাষ্ঠসিংহাসনে স্থাপন করা হয়। পুজোমণ্ডপে নবপত্রিকা প্রবেশের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর মূল অনুষ্ঠানটির প্রথাগত সূচনা হয়।
নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। এরপর বাকি দিনগুলিতে নবপত্রিকা প্রতিমাস্থ দেবদেবীদের সঙ্গেই পূজিত হতে থাকে। বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় হল, নবপত্রিকা প্রবেশের পূর্বে পত্রিকার সম্মুখে দেবী চামুণ্ডার আবাহন ও পুজো করা হয়। পত্রিকাস্থ অপর কোনও দেবীকে পৃথক ভাবে পুজো করা হয় না।
গবেষকদের মতে, নবপত্রিকার পুজো প্রকৃতপক্ষে শস্যদেবীর পুজো। ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন, 'এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক রূপে গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজার মূলে বোধহয় এই শস্য-দেবীরই পূজা।' পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপুজোর বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আসলে এই সবই হল পৌরাণিক দুর্গার সঙ্গে এই শস্যদেবীকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্য-মাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপুজোর ভিতরে এখনও সেই আদিমাতা পৃথিবীর পুজো অনেকখানি মিশে রয়েছে।"
( এই অংশটুকু 'এই সময়' পত্রিকা থেকে নেওয়া হয়েছে। )
(ছবি- কলকাতার গড়ফা-হালতুর মাঝের মূল রাস্তায় তোলা)
দুর্গা পুজোর অষ্টমী মানেই বিশেষ দিন। সকাল থেকে শুদ্ধ দেহে, শুদ্ধ চিত্তে দেবীর আরাধনার দিন। গতদিন নবপত্রিকা স্থাপনের মধ্যে দিয়ে যে আবাহন শুরু হয়েছিল, আজ তা শুদ্ধ সত্তা লাভ করে।
পুরাণ অনুযায়ী, মহাষ্টমীতেই দেবী দুর্গাকে নানা ধরনের অস্ত্র, পদ্মের মালা, রত্নহার দিয়ে সাজিয়ে তুলেছিলেন দেবতারা। কারণ, পুরাণের মতে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণানবমী তিথিতে দেবতাদের তেজ পুঞ্জীভূত হতে শুরু করে। আর, সেই পুঞ্জীভূত তেজ আশ্বিনের সপ্তমী তিথিতে বিশেষ রূপ ধারণ করে। সেই তেজের সাহায্যেই অষ্টমী তিথিতে দেবী মহিষাসুরমর্দিনীকে সাজিয়ে তুলেছিলেন দেবতারা।
দেবী আজ আবির্ভূতা হন মহালক্ষ্মীরূপা বৈষ্ণবী শক্তি হিসেবে। আজ তাঁর রাজরাজেশ্বরী মূর্তি। তিনি আজ উদারহস্ত। শ্রেষ্ঠ উপাচার নিবেদিত হয় আজ। পদ্ম, জবা, অপরাজিতা, বেলপাতা— কত রকমের ফুলমালায় দেবীকে সাজানো হয়।
অষ্টমীপুজো হল দুর্গোৎসবের পাঁচটি দিনের মধ্যমণি। এই একটি দিনেই সংহত হয়ে রয়েছে পাঁচদিনের পুজোর নির্যাস। অষ্টমীতে পুজোর বাহুল্য তাই বেশি। এদিন ৬৪ যোগিনী, কোটি যোগিনী, নবদুর্গা প্রমুখের আরাধনা হয়ে থাকে। এদিন ভক্তেরা দেবীকে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন— "নমস্যামি জগদ্ধাত্রি ত্বামহং বিশ্বভাবিনি"।
আবার দুর্গা পূজার অষ্টম দিনে মাতা মহাগৌরীর উপাসনার বিধান আছে। মায়ের শক্তি অমোঘ ও অনন্ত। মায়ের স্মরণ, মনন, চিন্তন, পূজন, ধ্যান, আরাধনায়, ভক্তের সমস্ত পাপ ও ক্লেশ বিনষ্ট হয় ও সিদ্ধিলাভ হয়। তাই নবরাত্রির অষ্টম দিনে মাতা মহাগৌরী পূজিতা হন। মায়ের বর্ণ হল গৌর। এই গৌরবর্ণ বা শুভ্রতার উপমা শঙ্খ, চন্দ্র, কুন্দ ফুলের সঙ্গে করা হয়েছে। মায়ের বস্ত্র ও আভূষণ শ্বেতবর্ণ। দেবী সরস্বতীর মতো মাতা মহাগৌরীও সম্পূর্ণ শুভ্রবর্ণা।
অষ্টম দূর্গা মহাগৌরীর রূপ অত্যন্ত শান্ত ও শান্তি প্রদায়ক। তিনি নিত্যশুদ্ধা, নির্মলা এবং পতিব্রতার অখন্ড উদাহরণ। তিনি ত্রিনয়নী, বৃষভবাহিনী ও চতুর্ভুজা। তাঁর দক্ষিণ দিকের দুটি হস্তে অভয় মুদ্রা ও ত্রিশূল এবং বাম দিকের দুই হস্তে আছে বরমুদ্রা ও ডুমরু। শিব পুরাণ অনুযায়ী শিবকে পতি রূপে লাভ করার জন্য দেবী পার্বতী কঠিন তপস্যা করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র আট বৎসর--"অষ্টবর্ষা ভবেদ্ গৌরী"। প্রখর তাপের প্রভাবে দেবীর সুকোমল শরীর শরীর ক্ষীণ ও কালো হয়ে যায়। ভগবান শিব প্রসন্ন ও সন্তুষ্ট হয়ে দেবীকে দেখা দেন এবং পবিত্র গঙ্গাজল দেবীর উপর বর্ষণ করেন। দেবী হয়ে উঠলেন অদ্বিতীয়া গৌরবর্ণা। বিদ্যুৎকান্তিসম বর্ণ ধারণ করে দেবীর নাম হল মহাগৌরী।
ধর্মীয় এইসব ব্যাখ্যার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, অষ্টমীর এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশেরও বিভিন্ন অনুষঙ্গ। এমনিতেই প্রকৃতি মানে নারী। নারী শক্তির পুজো মানে কিন্তু আসলে প্রকৃতিরই পুজো... সেই প্রকৃতি যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের সবকিছু। পাশাপাশি শরৎ বা হেমন্ত হল মধ্যবর্তী সেই সময় যখন গ্রীষ্ম বিদায় নিচ্ছে, শীত আসছে। এই পরিবর্তনের কাল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, বীজ বপন করা হয়েছে কিছুদিন আগে। শস্য উঠতে চলেছে আর কিছুদিন পর। মধ্যবর্তী সময় সেদিক থেকেও। আবার যদি দেখি, শুভ অশুভের দ্বন্দ্ব, তাহলেও পাচ্ছি, এই বিশেষ দিনে অশুভের বিরুদ্ধে শুভর সংগ্রাম শুরু! আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই দ্বন্দ্বই তো চলছে শ্রেয় আর প্রেয় হিসেবেই। আর কে না জানে, দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত যে নির্যাস নিয়ে আসে সেটাই সুন্দর, সেটাই সত্যি, সেটাই শ্বাশত।
ব্যাখ্যা অনেক তাই। বাকি সবটাই বিশ্বাস আর ভাবনা। পুজো ভাল কাটুক সকলের। অষ্টমীর অঞ্জলি শুধু উচ্চারণে নয়, মননে থাকুক আমাদের।
ঋণ স্বীকার- অরিন্দম চক্রবর্তী, এই সময়, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
(প্রথম ছবি- রাজডাঙা নবউদয় সংঘ, কসবা, কলকাতা
দ্বিতীয় ছবি- হিন্দুস্থান ক্লাব, গড়িয়াহাট, কলকাতা)
প্রখ্যাত কবি টি এস এলিয়ট তাঁর একটি কবিতায় বলেছিলেন 'In my beginning is my end'। বড় সত্যি কথা! শুরুর মধ্যে থাকে শেষের সংকেত। পিতৃপক্ষ অবসানে সূচনা হয়েছিল যে মহোৎসবের, আজ তারই শেষ দিন। আজ প্রকৃত অর্থে অশুভর বিনাশ। কেননা নবমীর এই দিনটিতেই দেবী দুর্গা অসুরকে বধ করেছিলেন। শ্রী রামচন্দ্র দুর্গার শক্তি আর আশীর্বাদ নিয়ে এই দিনে অশুভ রাবণকে বিনাশ করেছিলেন। তাঁর এই পুজোর জন্যই, শাস্ত্র মতে, একে অকাল বোধন বলা হয়।
গতদিন হয়ে গেছে সন্ধিপূজা। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিট এই পূজা হয়ে থাকে। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট নিয়ে মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু অষ্টমী ও নবমী তিথির সংযোগ স্থলে এই পূজা হয়, তাই এই পূজার নাম সন্ধিপূজা। এই সন্ধি বলতে কিন্তু সন্ধ্যা নয়। বরং সন্ধি-কালীন পূজা।
দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অঙ্গ হল সন্ধিপুজো। এইসময় দেবী দুর্গাকে চামুন্ডা রূপে পুজো করা হয়ে থাকে। সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। এই পূজা সম্পন্ন হয় তান্ত্রিক মতে। এই পূজায় দেবীকে ষোলটি উপাচার নিবেদন করা হয়। এই সময় বলিকৃত পশুর স্মাংস-রুধি (মাংস ও রক্ত) এবং কারণ (মদ) দেবীর উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়।
মহানবমী পুজোর তাৎপর্য সম্পর্কে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। তবে হিন্দু পুরাণ মতে মা দুর্গা মহিষাসুরকে দশমীতে বধ করছিলেন, তাই সেই দিক থেকে দেখতে গেলে যুদ্ধের শেষ দিন নবমী। শাস্ত্র মতে, এই দিন দেবীর পূর্ণাঙ্গ পুজো করা হয়।
নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলে সম্পদলাভ হয়। শাপলা-শালুক ও বলিদান সঙ্গে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নবমী পূজা পালিত হয়। শাস্ত্রমতে, নবমীতেই দেবী বন্দনার সমাপ্তি। তাই ভক্তরা প্রার্থনা করতে থাকেন দেবীর উদ্দেশ্যে। যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে আহুতি দেওয়া হয়। ১০৮টি বেল পাতা, আম কাঠ, ঘি দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়।
ধর্মীয় ব্যাখ্যা থাকুক তার জায়গায়। শাস্ত্র ঘাটলে হয়ত পাওয়া যাবে আরও অনেককিছুই। কিন্তু নবমী মানে আপামর বাঙালির কাছে বুক টনটন করবার দিন। পুজো শেষ হয়ে গেল! আগামীকাল উমা চলে যাবেন কৈলাশে। কে আর চায় নিজের মেয়েকে বিদায় জানাতে! 'দিতে নাহি চায়' ভেবেও এই যে যেতে দেওয়া, এর কষ্ট বোঝে মেয়ের বাবার বাড়ির মানুষেরাই। আমাদের অবস্থাও তাই আজ ঠিক ওরকমই যেন। তাই আষ্টেপৃষ্ঠে ধরা আজ তাঁকে। যতটা সম্ভব থাকা তাঁর সঙ্গে! থাকা শুভর সঙ্গে, অশুভের বিরুদ্ধে।
কিন্তু সত্যিই কি শুভ ভাবনায় উদ্বেলিত আমরা? প্রশ্ন জাগে। যে মহা মিলনের বার্তা নিয়ে দুর্গাপুজো আমাদের প্রতি বছর কিছু শিখিয়ে যায়, তার থেকে আদৌ কি শিক্ষা নিই কিছু আমরা? অসম্প্রীতি, অশিক্ষা আর কুসংস্কারের অশুভ শক্তি থেকে মুক্তি মিলছে কোথায়? কোথায় জেগে উঠছে চেতনা আমাদের? কোথায় আমরা আপন করছি একে অন্যকে!!
নবমী দিনে প্রার্থনা তাই এটুকুই। নবমী রাতি অবসান হ'য় না, অবসান ক'র আমার মন ও শরীরের কলুষকে.....
তথ্য: সংগৃহীত
(প্রথম ছবি: শক্তি সংঘ, পূর্বাচল, হালতু
দ্বিতীয় ছবি: নন্দী বাগান, হালতু)
ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরূৎ, ব্যোম.... পৃথিবী জল আগুন বায়ু ও আকাশ। পঞ্চভূত। পঞ্চতত্ত্ব।
একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় হিন্দু ধর্মের একটি বিশেষত্ব হল, কমবেশি সব অনুষ্ঠানেই প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় পালন করা। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি থাকলেও, হিন্দু ধর্ম ছাড়িয়ে গেছে সবাইকে। আর এই প্রত্যেকটি ব্যাপারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, যা আমাদের মোটা চোখে ধরা পড়ে না। উল্টে সেই সব বিষয়ের ওপর অযথা দেবত্ব আরোপ করে তাকে আমরা স্থূল করে তুলেছি। আর তার ফল? আস্ফালন! ভক্তির নামে ভন্ডামি!
দশমীতে কেন প্রতিমাকে বিসর্জন দেওয়া হয়? কারণ কী? তাৎপর্য লুকিয়ে এই দর্শনেই। যে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল গঙ্গা তীরের মৃত্তিকা দিয়ে, যে প্রতিমাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল... তাকে সেই গঙ্গাতেই বিসর্জন দেওয়া হল! মিলছে কি অন্তর্নিহিত তাৎপর্যটি? শুধু এখানেই থেমে থাকছে না দর্শনটি। আরও একটু আছে। বিসর্জন শব্দটির অর্থ কী? বিশেষ রূপে সৃজন। কিন্তু গঙ্গায় প্রতিমা ভাসিয়ে দিয়ে সেই সৃজন পূর্ণ হল কীভাবে? হ'ল, অবশ্যই হ'ল। অন্তরের মধ্যে যে আদির সূচনা হ'ল, সেটাই তো প্রকৃত সৃজন, বিশেষ রূপে সৃজন। বিজয়া দশমীর বিসর্জনে লুকিয়ে তাই বড্ড দামী কথা!
এমনিতে 'দশমী' ব্যাপারটি কমবেশি সকলেই জানেন। এই দিন অর্থাৎ আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে বাপের বাড়ি ছেড়ে উমা কৈলাসে চলে যান। তাঁর স্বামীর কাছে। তাই এই তিথি হল 'বিজয়া দশমী'।
আবার প্রশ্ন জাগছে। দশমী তো বুঝলাম। কিন্তু 'বিজয়া' কেন? আশ্রয় নিতে হচ্ছে পুরাণের।মহিষাসুর বধ কাহিনীতে বলা হয়েছে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পর দশম দিনে তাঁর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন মা দুর্গা। তাই তাকে 'বিজয়া' বলা হয়। আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী কাহিনী অনুসারে, দেবীর আবির্ভাব হয় আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে। পরে শুক্লা দশমীতে মহিষাসুর বধ করেছিলেন তিনি।আজকের এই দিন অর্থাৎ দশমীর দিনটি সেই বিজয়াকেই বোঝায়।
ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিজয়া দশমী বলতে 'দশেরা'কে বোঝায়। 'দশেরা' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'দশহর' থেকে। যার অর্থ দশানন রাবণের মৃত্যু। বাল্মীকি রামায়নে বলা হয়েছে, আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতেই লঙ্কেশ্বর রাবণকে বধ করেছিলেন রাম। কথিত আছে, রাবণ বধের পরে আশ্বিন মাসের ৩০ তম দিনে অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেন রাম, সীতা, ও লক্ষণ। রাবণ বধ ও রামচন্দ্রের এই প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যেই যথাক্রমে দশেরা ও দীপাবলি পালন করা হয়ে থাকে।
এই দিনটিতে বাঙালি সমাজে সিঁদুর খেলা কবে কীভাবে এল তার কোনও প্রামাণ্য ইতিহাস নেই। একটি তথ্য বলছে, জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজায় ২০০ বছর আগে এই সিঁদুর খেলার উৎসব শুরু হয়েছিল। কিন্তু জোর দিয়ে সেটা বলা যায় না। আবার অনেকের মতে, সিঁদুর খেলার এই ঐতিহ্য দুর্গাপূজার মতই পুরানো। সেই হিসেবে এই রীতি প্রায় ৪০০ বছর পুরানো। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে। তবে এটি একটি লৌকিক আচার এবং মনে করা হয়, সঠিক রীতি মেনে সিন্দুর খেলা হলে, নারী বিধবা হন না।
সবশেষে বিজয়া দশমীর আর একটি প্রথার কথা বলব। মনে পড়ে সেই কথাগুলি? 'যাও উড়ে নীলকণ্ঠ পাখি, যাও সেই কৈলাসে,/ দাও গো সংবাদ তুমি, উমা বুঝি ওই আসে।' আজকের দিনে বিভিন্ন নিয়মে সেই মাতামাতি না থাকলেও, ভুললে চলবে না নীলকন্ঠ পাখির কথা। বলা হয়, দশমীর দিনে উমার কৈলাসে গমনের বার্তা নীলকণ্ঠ পাখিই মহাদেবকে দিয়ে থাকে। তাই, দশমীর দিন দুটি নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হয়। প্রথমটি মণ্ডপ থেকে দেবী দুর্গার যাত্রা শুরু হওয়ার সময় ও অপরটি দেবী দুর্গার নিরঞ্জনের পর।
আর একটি ধারণা হল, নীলকণ্ঠ পাখির দর্শনের পর রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেন রামচন্দ্র। লঙ্কাজয়ের পর রামের ওপর ব্রহ্মহত্যার পাপ লাগে। এরপর লক্ষ্মণের সঙ্গে মিলে রাম শিবের আরাধনা করেন ও ব্রাহ্মণ হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হন। সে সময় শিব নীলকণ্ঠ পাখির রূপ ধারণ করে মর্ত্যে এসেছিলেন। নীলকণ্ঠকে পৃথিবীতে শিবের প্রতিনিধি ও স্বরূপ, দুই-ই মনে করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, নীলকণ্ঠ রূপ ধারণ করেই শিব মর্ত্যে বিচরণ করেন।
এই দিনে দেখতে পাচ্ছি তাই, লাল সিঁদুরে ভ'রে যাওয়া মণ্ডপ থেকে উড়ে যাচ্ছে নীলকন্ঠ। গোধূলির আলোতে লাল হয়ে যাওয়া গঙ্গার জল থেকেও উড়ে যাচ্ছে নীলকন্ঠ। উড়ে যাচ্ছে সে হিমালয়ে। বার্তা নিয়ে। মর্ত্য থেকে ফিরছেন মা। ফিরছেন কোথায়? প্রবল পরাক্রমশালী হিমালয়ের কোলে পুরুষ শক্তির কাছে। পুরুষ আর প্রকৃতি মিলে যাচ্ছে আবার। সাক্ষী থাকছে পরিবেশের নানাবিধ উপাদান.... গঙ্গার জল, নীলকন্ঠ পাখি, শরতের উদার আকাশ, সাদা কাশফুল! আর যাদের ছাড়া এই সভ্যতা অচল, অবশ্যই সেই মানবকূলও দেখছে এই মহামিলন। আভাস কি পাওয়া যাচ্ছে না হিন্দু ধর্মের প্রকৃতি সমন্বয়?
পুজো মানে মিলন। মহামিলন। পুজো মানে পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি ঋণ স্বীকার। পুজো মানে শুভ অশুভের দ্বন্দ্বে শুভর জয়।
সেই জয়ে সব পাপ স্খলন করে এগিয়ে চলা অমৃতের পথে। প্রতি বছর। প্রতি বার....
শুভ বিজয়া।
সকলের মঙ্গল হোক।







No comments:
Post a Comment