স্মৃতির পুজো
শৌভিক রায়
দীর্ঘদিন থেকেই ফালাকাটার দশমী প্রসিদ্ধ হলেও, দুর্গাপূজায় কিন্তু কোনোদিন আজকের মতো এতো জাঁকজমক দেখিনি। বরং কালীপূজার জমকালো ভাব ছিল বেশি।
আমাদের ছোটবেলায়, গত শতকের আশির দশকে, দুর্গা পুজোয় ভিড় জমত ভুতনিরঘাট এস এস বি ক্যাম্প আর দুই চা বাগানে। সুভাষপল্লী, মশলাপট্টি বা দেশবন্ধু পাড়ায় পুজো হলেও সেরকম বিরাট কিছু ব্যাপার হত না। মুক্তিপাড়ায় লোকে প্রতিমা দর্শনে গেলেও কলেজ পাড়ার পুজো তখন ছিল একেবারেই ছোট। তুলনায় স্টেশনের পুজো বরং ভাল ছিল। মোট কথা, ফালাকাটার পুজোতে তখন গ্রামীণ ভাবটাই বেশি ছিল।
নব্বইয়ের দশকেও কিন্তু পুজো বলতে মোটামুটি এরকমই বোঝাত। কিন্তু তাতে আক্ষেপ ছিল না কারও। তখন ফালাকাটা আয়তনেও খুব ছোট্ট। মোটামুটি সবাই সবাইকে চিনত, জানত। পুজোর কয়েকদিন সবাই মিলে মণ্ডপে বসে আড্ডা, খাওয়া, সন্ধ্যায় দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদি ছিল মুখ্য। একটা সন্ধ্যা বরাদ্দ থাকত পরিবারের জন্য।
তবে ফালাকাটার দশমী ছিল বরাবর আলাদা। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন দিতে আসত ফালাকাটার আশেপাশের বহু পুজো কমিটি। একটা সময় নাকি বীরপাড়াকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন চা বাগান, মাদারিহাট, শালকুমার, রামাঠেঙা, পারডুবি, শালবাড়ি ইত্যাদি অঞ্চল থেকেও প্রতিমা ফালাকাটায় আনা হত। কেন ফালাকাটায় তারা আসতেন, সে সম্পর্কে আজ আর প্রামাণ্য কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি যে, প্রাচীন জনপদ ফালাকাটা আসলে সেই সময় সব দিক থেকেই ছিল সমৃদ্ধ। ডুয়ার্সের অন্য শহরগুলি যেমন বীরপাড়া, গয়েরকাটা, মাদারিহাট, হাসিমারা, কালচিনি, এমনকি মালবাজার পর্যন্ত চা বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। চা বাগান ও চা বাগান কেন্দ্রিক জনপদগুলিতে ছিল মিশ্র সংস্কৃতি। তুলনায় ফালাকাটা অনেক পুরোনো। এখানে বাঙালি জোতদার ও জমিদারদের প্রাধান্য ছিল বেশি। তারও আগে ফালাকাটার ইতিহাসে পাওয়া যায় রংপুরের জমিদার শ্যামল বর্মন ও তাঁর বীরাঙ্গনা স্ত্রী ফুলটুসির কথা। ইংরেজরাও ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা তৈরি করে ফালাকাটাকে মহকুমার মর্যাদা দিয়েছিল। এখানে এসেছিল বাঙালি বাবু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। সাপটানার পূর্বে সেই বাবুরা নিজেদের পাড়া তৈরি করে নাম দিয়েছিলেন বাবুপাড়া। অর্থাৎ সব কিছু মিলে ফালাকাটা ছিল বাঙালিদের পক্ষে আদর্শ জায়গা। তাই চা বাগানের ইংরেজ মালিক ও ম্যানেজার, জনজাতি শ্রমিক, চিনা কাঠমিস্ত্রি, পাঞ্জাবি দফাদারের সঙ্গে বাঙালি কেরানিরা মায়ের বিসর্জনকে মেনে নিতে পারেননি। আর তার ফলেই, সেই সময় এত নানা জায়গা থেকে সকলের আগমন হত ফালাকাটায়, দশমীর ওই দিনটায়।
পরবর্তীতে দশমীর সেই রমরমা কালের নিয়মেই কমতে শুরু করেছিল। প্রতিমা নিয়ে আসবার খরচ, নিজেদের স্বাভিমান ইত্যাদির জন্যই নব্বইয়ের দশক থেকে দশমীর ঘাটে বাইরে থেকে প্রতিমা আসা বন্ধ হচ্ছিল। মুজনাইয়ের গতিপথ পরিবর্তনও ছিল অন্যতম কারণ। আজ ফালাকাটার দশমীর সঙ্গে বিভিন্ন জায়গার দশমীর চরিত্রগত খুব বেশি কিছু পার্থক্য নেই। তবে ঐতিহ্যের ব্যাপারটি সবসময় আলাদা। সেদিক থেকে ফালাকাটা বহু যোজন এগিয়ে।
দশমী বাদে সেই আমলের ফালাকাটার দুর্গা পুজো নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। বরং কালীপুজোর ব্যাপারটি ছিল আলাদা। সেই সময় আলিপুদুয়ার বা ধূপগুড়ির কালীপুজো খুব নাম করা হলেও, ফালাকাটা পিছিয়ে ছিল না। বিশেষ করে সুভাষপল্লী আর তরুণদলের মধ্যে কালীপুজো রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। মশলাপট্টির সেই বিরাট কালীর কথা অবশ্য আলাদা। সেই প্রতিমার ঐতিহ্য আর সাবেকিয়ানা ছিল অন্য ঘরানার। প্রাচীন পুজো হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। প্রাচীনত্বের দিক থেকে অবশ্য উন্মাদ সংঘের পুজোর কথাও বলতে হয়। পরবর্তীতে হাটখোলা ব্যবসায়ী সমিতিও দারুন পুজো করতেন। কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা বাগান আর মুক্তিপাড়ার কালীপুজো ছিল নাম করা। দুই এস এস বি ক্যাম্পেই আমরা ভিড় জমাতাম ভাল প্রসাদের লোভে। ধূপগুড়ি মোড়ে ভেনাস ক্লাবের পুজোও সেই সময় থেকেই অন্যরকম হচ্ছিল। বাবুপাড়া, গোপনগর, সুভাষ কলোনি, দেশবন্ধু পাড়া ইত্যাদিতেও বেশ কিছু পুজো ভাল লাগত। মাঝে কিছুদিন ত্রিধারা নামে একটি সংস্থা বেশ কয়েক বছর খুব ভাল পুজো উপহার দিয়েছিল। ১৯৮২ সালে ত্রিধারা পুজো করেছিল ফালাকাটা হাই স্কুল কোয়ার্টারের সামনের মাঠে। তখন কমিউনিটি হলের জায়গায় ফাঁকা মাঠ। ফালাকাটা হাই স্কুলের কিছু ঘর ছিল সেই মাঠের দক্ষিণ দিকে। ফালাকাটা কলেজের ক্লাস তখন সেই ঘরগুলিতে হত। ১৯৮২ সালে ত্রিধারার পুজোতেই আমার দাদা কৌশিক রায় আর আর এক দাদা অভ্রজ্যোতি গুহর সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করেছিল সাহিত্য পত্রিকা `মুজনাই`। সুভাষপল্লীতে সুমতি মায়ের কালীপুজোও কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে হওয়া পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম।
কালীপূজোকে ঘিরে ফালাকাটার তখনকার উন্মাদনা ছিল চোখে পড়বার মতো। তবে ফালাকাটার সেরা পুজো ছিল অবশ্যই জংলা কালীবাড়ির। নাম থেকেই বোঝা যায়, একসময় এই মন্দিরটি জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত ছিল। জনশ্রুতি, এই মন্দিরে দেবীর পুজো সেরে ডাকাতরা জলপথে ডাকাতি করতে যেত। মুজনাই তখন এই মন্দিরের পাশ দিয়েই প্রবাহিত। মুজনাই দিয়ে জলঢাকায় পৌঁছে উত্তরে দক্ষিণে বহুদিকেই যাওয়া যেত। কিন্তু সে বহু পুরোনো কথা। আমাদের ছোটবেলায় জংলা কালীবাড়ি যেতে হলে পুরোনো চৌপথী থেকে হাটের দিকে এগিয়ে ডান হাতের পরিচিত রাস্তা ধরতে হত। আর একটি রাস্তা ছিল সুভাষ গার্লস হাই স্কুলের সামনে দিয়ে। কিন্তু সে পথে এলে সাপটানা পায়ে হেঁটে পার হতে হত, কেননা কোনও ব্রিজ ছিল না। নদী পার করবার জন্য অনেকটা নিচে নামতে হত। ভীষণ উঁচু ছিল নদীর তীর। কালীপুজোর অমাবস্যার রাতে অন্ধকার ওই জায়গা দিয়ে জংলা কালীবাড়ি যাওয়ার সাহস অনেকেরই ছিল না। দিনের বেলাতেই গা ছমছম করত, রাতে তো কথাই নেই।
একটা সময় খুব সাধারণ পুজো ছিল উদয়ন সংঘের। অত্যন্ত স্বাভাবিক সেটা। কিন্তু আশির দশকের শেষ থেকেই তারা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে, ফালাকাটার কালীপূজোতে থিমের ভাবনা কিন্তু উদয়ন সংঘের হাত ধরেই। শুধুমাত্র রুচি আর শৈল্পিক ভাবনায় অসামান্য পুজো করে নজির সৃষ্টি করেছিল তারা। সাপটানার তীরে পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা নিচুতে নেমে উদয়ন সংঘের মাঠ তাদের পুজোকে অন্য মাত্রা দিত। আজ সেই উদয়ন সংঘের পুজো পঞ্চাশ বছরে পা দিচ্ছে ভাবতেই অবাক লাগে। এতগুলি বছর যে কথা দিয়ে কেটে গেল, কে জানে!
বহুদিন ফালাকাটার পুজো সেভাবে দেখি না। পুজো নিয়ে সেভাবে কিছু লিখতেও ইচ্ছে করে না আর। কিন্তু উদয়ন সংঘের কথা শুনে লিখতে বাধ্য হলাম কিছুটা দায় থেকেই। করোনা মহামারির ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে আমার বাবা ও মা`কে নিয়ে উদয়ন সংঘের পুজো দেখতে এসেছিলাম। মা বাবা দুজনকে নিয়ে সেটাই আমার শেষ কালীপুজো দেখা। মা চলে গেলেন ২০২০ তে আর বাবা মায়ের চলে যাওয়ার এগারো মাসের মাথায় ২০২১ সালে। মনে আছে আমাদের গাড়ি উদয়ন সংঘের কাছে পৌঁছলে, বাবা ও মা`কে হাত ধরে নামিয়ে ছিলেন কর্মকর্তারা। তাঁরাই বাবা-মা`কে প্রতিমা দর্শন করান। আমি শুধু সঙ্গী ছিলাম।
বাবার সঙ্গে উদয়ন সংঘের বোধহয় বিশেষ সম্পর্ক ছিল সবসময়ই। আগে না বুঝলেও আজ বুঝি কেন বাবা উদয়ন সংঘের ব্যাপারে চিরদিন অন্যরকম ছিলেন! ১৯৬৭ সালে বাবা যখন ফালাকাটা হাই স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে আসেন, তখন বাবার বাসস্থান ছিল শ্রদ্ধেয় মানিক বোসের বাড়ির দুই একটি বাড়ির পরেই। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন স্কুল কোয়ার্টার ও কলেজ পাড়ায় নিজের বাড়িতে থাকলেও, ওই পাড়ার প্রতি বাবার টান কোনোদিন কমেনি। যতবার ফালাকাটার কালীপুজো দেখেছি বাবা মায়ের সঙ্গে, বাবার লিস্টে উদয়ন সংঘ জ্বলজ্বল করত।
উদয়ন সংঘের সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাবার কথা খুব মনে পড়বে। মনে পড়বে মায়ের কথাও। আসলে মায়ের পুজোয় মা`কে যদি মনে না পড়ে, তবে কি পুজোর মাহাত্ম্য থাকে! আর কে না জানে মা এলে, বাবাও থাকেন মায়ের পাশে। নিশ্চুপে, নির্বাক উপস্থিতিতে।

No comments:
Post a Comment