Thursday, October 13, 2022

 



লোকটা 

শৌভিক রায়


                 লোকটা সারাদিন পাথর ভাঙে...
শুধু বুবাই নয়, অনেকেই খেয়াল করেছে এটা। বাড়ির ছাদ ঢালাই বা পিলার উঠবে এরকম তো নয়। এমনও নয় যে, বাড়ির সামনে রাস্তা তৈরি হবে আর সেই রাস্তা তৈরির জন্য লোকটা স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে!
বুবাইয়ের কেমন ভয় ভয় লাগে। সেই চেনা লোকটা এরকম করছে কেন! বাড়ির পিছনটায় যেখানে একফালি বাগানের মতো, সেখানেই সারাদিন পাথর ভেঙে চলেছে লোকটা। চওড়া রোদ, দুরন্ত বৃষ্টি, দারুণ ঠান্ডা, ভয়ংকর গরম... কিছুই লোকটাকে আটকাতে পারছে না!
বুবাইয়ের আরও ভয় হচ্ছে। লোকটা আজকাল তেমন কথাও বলে না। কেউ কিছু বললে চুপচাপ শোনে। চোখ দেখে অবশ্য মনে হয় না কিছু শুনছে। এমনই শূন্য দৃষ্টি লোকটার। শুধু যখন কারও কথায় পাথর শব্দটা আসে, তখনই লোকটার চোখ চকচক করে ওঠে। বুবাই লক্ষ্য
করেছে এটা।
কিরকম অদ্ভুত না! সারাটা দিন চুপচাপ, কারও সঙ্গে কথা নেই, কারও কথা মন দিয়ে শোনা নেই, কেবল পাথর আর পাথর। লোকটা কি পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি? নাঃ, দাদাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে এর একটা হেস্তনেস্ত এবার করতেই হবে। সেরকম হলে ডাক্তার দেখাতে হবে। পরশু দিলীপ যা বলে গেছে এরপর আর দেরি করা ঠিক হবে না।
দিন কয়েক আগে, লোকটাকে বাইরে যেতে দেখে বুবাই একটু নিশ্চিন্ত হয়েছিল। যাক একটু ঘুরেটুরে বেড়াক। মনটা বদলাবে। কিন্তু দিলীপ জানিয়ে গেছে লোকটা নাকি বাবুপাড়ার রাস্তায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। ঠিক কোথায় দাঁড়িয়েছিল জানতে চাওয়ায় দিলীপ যে জায়গাটার কথা বলল সেটার আশঙ্কাই করছিল বুবাই। বাবুপাড়ার ওই রাস্তাটার ধারে দীর্ঘদিন ধরেই একটা বড় পাথর রয়েছে। বুবাই শুধু নয়, এই শহরের সব লোকই জানে। দিলীপের কাছে আর কিছু জানতে চায়নি বুবাই। কে যেন বুবাইয়ের মুখটাকে আটকে ধরেছিল। কিন্তু মনটাকে কে আর বাঁধবে! মনের চোখে বুবাই দেখতে পাচ্ছিল লোকটা একদৃষ্টে ওই পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার দু'চোখ চকচক করছে। নেহাত লোকজন আছে বলে পাথরটাকে তুলে বাড়িতে আনতে পারছে না!
দাদভাই এসেছিল। লোকটার সঙ্গে কথা বলেছে অনেকক্ষণ। অবশ্য বুবাইয়ের ধারনা দাদাভাই-ই একতরফা কথা বলেছে। লোকটা আদৌ কিছু বলেনি। বরং তাদের কথাবার্তার শেষে দাদাভাইয়ের কথায় বুবাইয়ের রাগই হল একটু। কোথায় লোকটাকে একটু কড়কে দেবে তা না, উল্টে লোকটাকে আরও বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছে!
পরে অবশ্য আলাদা করে বুবাইকে ডেকে দাদাভাই বলেছে,
— দ্যাখ, লোকটার কাজটাজ নেই। সকালে উঠে তোর দোকানের সামনে ঝাঁট দেয়। কিন্তু তারপর আর কী করবে? তুই তো ওকে দোকানে
ঢুকতে দিস না। ওই রকম বুড়োমার্কা চেহারা দেখে নাকি তোর দোকানে কাস্টমার আসবে না। অবশ্য এমনিতেও বিশেষ লাভ নেই। প্রেসক্রিপশান দেখেও কিছু বুঝবে না। কোন্ ওষুধ কোথায় রাখা আছে তাও জানে না।
একটু দম নিয়ে দাদাভাই আরও যোগ করল,
- আর একটা কথা, বাজার করে কাকিমা। রাঁধে তোর বৌ। বাসন মাজে ঠিকে ঝি। তো লোকটা কী করবে? যা করছে করুক, কাউকে তো ডিস্টার্ব করছে না। আর বলছে এতে ওর শরীর ভালো থাকে। দ্যাখ, বই পড়ার নেশা নেই, এই শহর ছেড়ে আর নিজের দোকান ছেড়ে বাইরে কোথাও দু'রাতও কাটায়নি লোকটা। কী করবে বেচারা, বল তো তুই নিজেই!
এটা একটা কথা হল? কাজ নেই বলে পাথর ভাঙবে? কাজ তো সারাজীবন বহু করেছে লোকটা। এ তল্লাটের সেরা মণিহারি দোকান এই লোকটারই ছিল। সেই সময়ে লোকটার ঠাটবাট ছিল চোখে পড়ার মতো। গা থেকে কিউটিকোরা পাউডারের গন্ধ ভুরভুর করে বেরোত। বুবাইয়ের মা'কে নিয়ে শনিবার রাতে বাড়ির কাছের সিনেমা হলে নাইট শো বাঁধা ছিল।
পুজোর সময় তো নাওয়া খাওয়ার সময় থাকত না। ভীষণ ভীড় লেগে থাকত দোকানে। তারপর কবে যে হঠাৎ কী হল! চারদিকে আলো ঝলমলে শপিং মল, আলাদা আলাদা আরও ঝাঁ চকচকে নানা দোকান, স্মার্ট সেলস গার্ল... সব কিছুর থাবায় লোকটার দোকানটা হারাতে হারাতে একদিন সত্যিই হারিয়ে গেল। কিন্তু লোকটা হারাতে চায়নি দোকানটা। খুব ঝামেলা করেছিল কয়েকদিন। না খেয়ে পর্যন্ত প্রতিবাদ করেছিল বুবাইয়ের মা, বুবাইয়ের বৌ আর বুবাইয়ের নিজের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা লোকটার কোন কথা শোনেনি।
লোকটার মণিহারি দোকান বন্ধ করে পার্টনারশিপে এই ওষুধের দোকানটা করে ফেলেছিল বুবাই। কিছুতেই কিছু হবে না বুঝতে পেরে লোকটা পরের দিকে আর কোন কথাই বলেনি। বুবাইও সেভাবে আর কিছু খেয়াল করেনি। ওষুধের দোকান সাজানো, পার্টনারশিপের কাগজপত্র তৈরি করা, ডাক্তার বসানো, রিক্সাওয়ালা ফিট করা এসব করতে করতে লোকটার কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। সেদিন যখন লোকটাকে ভালোভাবে দেখল, তখনই ভাবনাটা মাথায় এসেছিল। লোকটা পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো? নাঃ, দাদাভাইকে দিয়ে কোন কাজ হল না।
বুবাইয়ের ওষুধের দোকানটা চলছে না। আরও কিছু নতুন ওষুধের দোকান হয়েছে। নামী ডাক্তারদের ভীড় সেখানে। বুবাই স্পষ্ট বুঝতে পারছে তাদের আর কিছু করার নেই। কেউ কেউ বুদ্ধি দিচ্ছে ফাস্ট ফুডের দোকান খুলতে। কোন এক বিদেশি কোম্পানি ফ্রানচায়েসি খুঁজছে। তাদের কেউ কেউ বুবাইদের দোকান দেখেও গেছে। হতাশ বুবাই টের পাচ্ছে দোকানটাকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না সে। কিন্তু তবুও হাল ছাড়ছে না। দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছে।
সেদিন এক কোম্পানি এলো কীসব ব্যবসার কথা নিয়ে। বুবাইয়ের হঠাৎ মাথা গরম হয়ে গেল। কী পেয়েছে কী সবাই মিলে! তার দোকান। তিল তিল করে দোকানটাকে সে সাজিয়েছে। কথায় কথায় তর্ক বেঁধে যেতেই বুবাই পাথর তুলে...ভোরের স্বপ্নটা এখানেই ভেঙে গেল।
দরদর করে ঘামতে ঘামতে বিছানায় উঠে বসল সে। জানালা দিয়ে হালকা ভিজে হওয়া আসছে। বউ অকাতরে ঘুমোচ্ছে। বুবাই ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
একটা ঠকঠক আওয়াজ দূর থেকে কানে আসায়, বুবাই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল আওয়াজটাকে লক্ষ্য করে। বুঝতে পারছে সে কিসের আওয়াজ। হ্যাঁ ঠিকই। এই সকালেও লোকটা পাথর ভাঙছে। বুবাই চুপচাপ দাঁড়াল লোকটার পাশে।
বিভোর হয়ে লোকটা পাথর ভেঙেই চলেছে। বুবাই খেয়াল করে লোকটার স্বপ্নালু চোখে খেলা করছে এক অনির্বচনীয় আনন্দ... যেন লোকটা কেবল পাথর ভাঙছে না! ভাঙছে সব বাধা — পরাজয়ের, গ্লানির, ক্লেদের, অপ- মানের, ব্যর্থতার, সংসারের, জীবনের...... হয়তো বা মৃত্যুরও।
বুবাই লোকটার পাশে চুপচাপ বসে। এগিয়ে দেয় একটা বড় পাথর। তারপর একটা একটা করে আরও পাথর। অস্ফুটে বলে, 'ভাঙো বাবা...আরও ভাঙো!'
লোকটা চমকে তাকায় বুবাইয়ের দিকে।
হঠাৎই বুবাইয়ের চোখে নামে জলের ধারা।
আচমকা বৃষ্টি অবশ্য মুছে দেয় সেই জল....           

No comments: