Monday, September 26, 2022

    গল্প নয়

শৌভিক রায় 


পুষ্প স্তবক এগিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু তার মাথা ঘুরে রইল ডান দিকে। মুখে মৃদু হাসি। 


একগাল কৃতার্থ হেসে হাত বাড়িয়ে সেই পুষ্প স্তবক নিলাম আমি। অথচ আমার মাথা ঘোরানো থাকল বা দিকে। 


উনি দিলেন। আমি নিলাম। 

উনি কৃতজ্ঞ করলেন। আমি কৃতজ্ঞ হলাম। 


কিন্তু যিনি দিলেন তিনি আমার দিকে একবারও তাকালেন না। আমিও নিলাম ঠিকই। কিন্তু তার দিকে তাকালাম না। 


দর্শকাসনের সকলে তাকে দেখলেন। আমাকেও দেখলেন। লাইভ টেলিকাস্টে, ধারা বিবরণীতেও আরও বেশ কিছু মানুষ দেখলেন আমাদের।


কিন্তু, তিনি আমাকে দেখলেন না। আমিও তাকে দেখলাম না। 


আমরা শুধু ক্যামেরা দেখলাম। 

হরেক কিসিমের ক্যামেরা....

Sunday, September 25, 2022

 অন্য মহালয়া 

শৌভিক রায় 


বুড়ির পাট থেকে ফিরতি পথ ধরতেই দুদ্দাড় ছুটে বেরিয়ে গেল মা সন্তোষী নামের বাসটি। ভাগ্যিস লাফিয়ে রাস্তার ধারে চলে গিয়েছিলাম! না হলে বোধহয় বিপদ একটা হতই।


উঠেছি সেই ভোরবেলায়। উঠোনে থাকা শিউলি গাছের তলা তখন সাদা ফুলে ঢাকা। ঝেঁপে ফুল এসেছে এবার। শিউলির মো মো গন্ধে আর ভোরের হালকা ঠান্ডায় কেমন একটা নেশা লাগছিল। হাতে তখনও গত রাতের মাংসের সুবাস। বৈষ্ণব বাড়ি বলে মাংস রান্নার ব্যাপার কম আমাদের। যেদিন হত সেদিন বেশ সাজো সাজো রব পড়ে যেত। রান্নাঘর থেকে অনেকটা দূরে, আমাদের শোওয়ার ঘরের বারান্দায়, মা আর বড় কাকিমা মাংস রাঁধতেন। আর আমরা ছোটরা ঘরে বসে প্রেসার কুকারের সিটি গুণতাম। একসঙ্গে সবাই খেতে বসা হত। প্রিয়তম ছিল ঝোলের আলু। কী স্বাদ! কী স্বাদ! বছরে আর কোনও দিন হোক না হোক, মহালয়ার রাতে মাংস হতই। ঠাকুমা আর বাবার বিধবা পিসিমা শুধু নাকে আঁচল চাপা দিয়ে সেই দূরে বসে থাকতেন!


গতকাল মহালয়ার রাতেও মাংস রান্না হয়েছে। জিভে লেগে থাকা তার সেই স্বাদ আর শিউলির গন্ধে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র উদাত্ত পাঠ করে চলেছেন। গাইছেন দ্বিজেন, হেমন্ত, শ্যামল, সন্ধ্যা, আরতি...। বড়কাকার ঘরের ফিলিপস ট্রানজিস্টর থেকে সেই পাঠ আর গানে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি কৈলাশ থেকে উমা নেমে আসছেন মহাদেবের কাছে বিদায় নিয়ে। তাঁকে এগিয়ে দিচ্ছেন নন্দী আর ভৃঙ্গি। মায়ের আঁচল ধরে আছেন লাজুক সরস্বতী। লক্ষ্মী আর গণেশ আগে আগে। লক্ষ্মী চপলা। গণেশ বলশালী। তীর ধনুক নিয়ে কার্তিক চারদিকে নজর রাখতে রাখতে চলেছেন। দেব সেনাপতি তিনি, তাঁর কেতাই আলাদা। মা আসছেন আবাহনে, আগমনী গানে...আসছেন মর্ত্যে, নিজের বাড়িতে! 


পিসতুতো ভাই ডেকে বলল, 'চল...এবার বেরিয়ে আসি, রোদ উঠে যাবে এরপর।' গত পরশু ওরা অসম থেকে এসেছে। পিসি আর তিন ভাই। আমরাও এসেছি ফালাকাটা থেকে। দিনহাটার বাড়ি ভর্তি লোক। বছরে এই একবার সবাই এক হই। আমাদের সারাদিন খেলা। হৈ চৈ। শেষ মুহূর্তে প্রতিমা তৈরি দেখতে ছোটা। দৌড়ে যাওয়া থানা পাড়া, গোধূলি বাজার, ডাকবাংলো পাড়ার প্যান্ডেল দেখতে এবেলা ওবেলা। দুপুরে বড়রা বিশ্রাম নিলে, নজরের চোখ একটু ঢিলে হলে, দে দৌড় দে দৌড় মহামায়া পাট বা কলেজ পাড়ায় । শহীদ কর্ণারের কাছের মাইকের দোকানে অমিতাভ বচ্চন তখন গেয়ে ওঠেন, 'মেরে অঙ্গন মে তুমাহারা কেয়া কাম হ্যায়?' আর টিটবিট দোকানের প্রতিবিম্ব খেলা করে ফুলদিঘির জলে!


ভাই, আমি, মধু, ভজন হেঁটে হেঁটে চলে এসেছি বুড়ির পাট অবধি। আমাদের ছোট ছোট পায়ে বুড়ির পাট মানে ভেটাগুড়ি প্রায়। কলেজ হল্টের রেললাইনের পাশ থেকে জোগাড় করেছি কাশ ফুল। নীল আকাশে সূর্য তখন উঠি উঠি। আমাদের মতো আরও কত মানুষ দলে দলে রাস্তায় তখন। মহালয়ার সকাল মানেই দিনহাটায় এক অদ্ভুত আনন্দ। তখনও রেডিও থেকে ভেসে আসছে মহালয়ার পাঠ আর গান। আমরা ধরেছি ফিরতি পথ। ঠিক তখনই দুদ্দাড় মা সন্তোষী বাস!! আমাদের প্রায় পিষেই দিয়েছিল। মুহূর্তে আমরা এদিক ওদিক লাফিয়ে ছত্রভঙ্গ। ধাতস্থ হতে না হতেই বাস মিলিয়ে গেল দূরে কোথাও।  


এক্সচেঞ্জ মোড়ের কাছে আসতেই দেখি হাসপাতালের সামনে ভিড়। দলে দলে মানুষ। বিষন্ন চেহারা। কেউ কেউ কাঁদছেন। খানিক আগে এক খুনি বাস পিষে ফেলেছে শিক্ষক হরতোষ চক্রবর্তীকে। দিনহাটা হাই স্কুলের এই শিক্ষককে চেনেন না এমন বোধহয় কেউ ছিলেন না সেসময়। তরুণ সুদর্শন জনপ্রিয় মানুষটিকে ভালবাসতেন সব্বাই। আমিও চিনতাম অন্য স্কুল বা অন্য জায়গার বাসিন্দা হয়েও।  ধাক্কা সামলে, সম্বিৎ ফিরলে বুঝলাম, কেন ছিল মা সন্তোষী নামের সেই বাসটির ওত তাড়া !


বোধনের আলো নিভে গেল মুহূর্তে। সারা শহর স্তব্ধ। প্রাথমিক উত্তেজনায় খানিকটা বিশৃঙ্খলা হলেও, শোক গ্রাস করেছিল কমবেশি সবাইকে। ক্রমশ বিমর্ষ হল দিনহাটা, যেন কাঁদতে লাগল শহর....


পরদিন সকালে শিউলি ঝরে পড়ল আবার। অঞ্জলি দিলাম সে ফুলে আমাকে না চেনা সেই স্যারকে।


মহালয়া এলে আজও প্রণতি দিই। 

হরতোষ স্যারের সঙ্গে আরও কিছু নাম যোগ হয়েছে কেবল! বাকি সব একই আছে....


(প্রকাশিত: শারদীয় 'চলো কিছু লিখি'/ সম্পাদক: অমিত রায়/ দিনহাটা)

Thursday, September 22, 2022


পুজোর সিনেমা হল

শৌভিক রায় 


আমাদের ছেলেবেলায় পুজোর অনুষঙ্গে সিনেমা হলের বেশ একটা যোগাযোগ ছিল। পুজোতে কোন হলে কী ছবি আসছে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম আমরা। ফালাকাটায় অবশ্য একটাই সিনেমা হল ছিল। গৌরী টকিজ। কিন্তু পুজোর সময় আমরা দিনহাটার বাড়িতে চলে আসতাম বলে একটা চয়েসের ব্যাপার থেকে যেত। কেননা দিনহাটায় তখন দুটো সিনেমা হল। মহামায়া আর ভবানী। যারা আমাদের চাইতেও এক কাঠি সরেস ছিল, তারা চলে যেত কোচবিহারে। কমলা, ভবানী, নিউ আর সম্ভবত কোঅপারেটিভ। সুতরাং চুজিংয়ের একটা ব্যাপার থাকতই! 


সিনেমা দেখবার ব্যাপারে আমার বাবা ছিলেন ভয়ঙ্কর পিউরিটান। ফালাকাটায় মা থাকতেন না। ফলে তাঁর ব্যাপারটা বুঝতাম না। কিন্তু মা ফালাকাটায় আসবার পর বুঝলাম, মা এই ব্যাপারেও আর সব কিছুর মতোই বাবার যোগ্য পার্টনার। সিনেমা? কী ছবি? অমিতাভ বচ্চন? ওই লম্বা ঢ্যাঙা লোকটা যে শুধু মারপিট করে? ধর্মেন্দ্র? কুকুর তুলে গালিগালাজ দেয়? নো। নেভার। হবে না। 


মোটামুটি ক্লাস এইট অবধি আমার ছবি দেখার দৌড় ছিল 'বিদ্যাসাগর' (একটা খাতা দিয়েছিল টিকিট কাটার সময়। বিদ্যাসাগরের মুখ ছিল নীল কাভারে), 'হীরে মানিক' (হাপুস নয়নে কেঁদেছিলাম ছবিটা দেখতে দেখতে), 'বাবা তারকনাথ' (বিশ্বজিৎ আর সন্ধ্যা রায়ের সেই কী ইয়ে!) এইসব আর কি! বড়দের ছবি বলতে ঠাকুমার দৌলতে একবার দেখেছিলাম 'সুনয়নী' (শকুন্তলা বড়ুয়া অন্ধ হয়ে যান এরকম কিছু একটা ছিল)।  


ফলে যা হওয়ার তাই হল! ক্লাস নাইনে 'দুটি পাতা' দেখে নায়িকা মিতা দেবরায়ের প্রেমে পড়ে গেলাম! সে কী অবস্থা!! একটু পর পর মিতা দেবরায় চোখের সামনে চলে আসছেন। কানে গান ভেসে আসছে 'ঝর ঝর ঝরে ঝিলমিল ঝর্ণা' বা 'মনটা যদি না থাকত আমার কিছুই মনে পড়ত না'! উফফ কী মারাত্মক দশা। ফালাকাটা হাট থেকে 'দুটি পাতা' ফিল্মের গানের বই কিনে আনলাম। তাতে আবার মিতা দেবরায়ের ছবি। তোষকের তলায় লুকিয়ে রাখা সেই বই খুলে সুযোগ পেলেই ছবি দেখি আর গান গাই। গানের বিষয়ে আমি চিরদিনই অসুর আর বেতাল রাগে দীক্ষিত। কিন্তু কিছু করার নেই। তখন মিতা দেবরায় আমার শয়নে স্বপনে নিদ্রা জাগরণে। ওদিকে আমার বন্ধু প্রণবের সঙ্গে 'নদীয়া কে পার'-এর নায়িকা সাধনা সিংয়ের প্রবল প্রেম চলছে। চিরকালের সুরেলা প্রণব গোপনগরের লালপুলে গিয়ে 'গুঞ্জা রে', সাঁচি কহে তোরে' গাইতে গাইতে প্রায় কেঁদে ফেলছে! পুটন আর বাপির কেস শুধু বোঝা যাচ্ছে না! তবে পুটনের আঙুল চোষা বেড়ে গেছে আর বাপির ফাজলামি!


এই সাইড এফেক্ট কেটে গেল অন্য ঘটনায়। আর সেটা হল দিনহাটায়। আসলে, দিনহাটার কেসটা একটু অন্য ছিল। বাড়ির কাছেই মহামায়া সিনেমা হল। কাজ ছিল হলে কত লোক হয়েছে দেখতে যাওয়া। আর সিনেমার পোস্টার দেখা। কোনও কোনও দিন চলে যাওয়া হত ভবানী সিনেমার পোস্টার দেখতে। আর এভাবেই হাতে খড়ি হয়ে গেল লুকিয়ে ছবি দেখার। কাউকে না জানিয়ে, বাড়িতে লুকিয়ে প্রথম ছবি দেখলাম 'হিম্মতওয়ালা'। পঁচাত্তর পয়সার ইন্টারে বসে জিতেন্দ্র আর শ্রীদেবীকে একটু মোটা লাগলেও, নায়িকার গ্ল্যামারে সব উবে গেল! তবে শ্রীদেবীর প্রেমে পড়িনি। 


সেই সমসাময়িক আমলে পুজোর সিনেমা হল মানেই সেই আমলের হিট ছবি সব। বেশিটাই হিন্দি। তবে বাংলাও পিছিয়ে নেই। ইলেভেন থেকে লায়েক হয়ে গিয়েছিলাম বলে সিনেমা হলে ঢোকার ব্যাপারে আর ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছিল না। তবে তখনও ফালাকাটায় থাকতাম। তাই খানিকটা রেস্ট্রিকশন ছিল। ঝামেলা শেষ হয়ে গেল কলেজে উঠে। দিনহাটায় কলেজে পড়তে এসে একদম মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে গেলাম। ফলে ম্যাটিনি, ইভনিং, নাইট শো কোনোটাই বাদ ছিল না। কাকিমায়েরা ভাত ঢেকে রাখতেন। নাইট শো থেকে ফিরে গামলায় রাখা সেই ভাতের স্বাদ অমৃত মনে হত। ছবি দেখার ব্যাপারে কোনও বাছবিচার ছিল না। যা পেতাম তাইই দেখতাম। পুজোর সময় তো কথাই নেই! এই ব্যাপারে আমাদের জীবনদার থিয়োরি সিম্পল ছিল। 

- ছবিটা কেমন জীবনদা?

- আছেএএএ....

ভাল লাগলে এসে চেপে ধরতাম। 

- ছবিটা তো ভালই গো!

- ক্যান, তোরে কইলাম না আছে!!

খারাপ লাগলেও চেপে ধরতাম।

- কী ফালতু একটা ছবি!

- ক্যান তোরে কইছিলাম না আছেএএএএএএ...


সেই জীবনদা আছে। আমি আছি। পুজো আছে। কিছু কিছু সিনেমা হলও আছে! শুধু নেই পুজোর সময়ের সেই সিনেমা হল ঘিরে উন্মাদনা! গত বছরের মতো এবারও পুজোর ছবি বলতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এটা সেটা....


পুনশ্চ: মহামায়া সিনেমা হলের লোক দেখতে গিয়ে অষ্টমীর দিন রীনাকে দেখেছিলাম। সিনেমা দেখতে এসেছে। দেওয়ানহাট থেকে। মাঝেমাঝে মনে হয়, এখনও কি কোনও কলেজ পড়ুয়া মেয়ে সিনেমা হলে আসে? কোনও কলেজ পড়ুয়া ছেলের সঙ্গে তার কি হঠাৎ দেখা হয়? আর দেখা হওয়া মাত্র পুজোটা কেমন প্রেম প্রেম হয়ে যায়! দারুণ ভাল লাগে আবার বুকটা একটু টনটনও করে!

Friday, September 16, 2022

 



পাহাড় আর বাবা
শৌভিক রায়

আমার একটা পাহাড় আছে, 
যাকে ডিঙোনো যায় না কিছুতেই
 
চড়াই উৎরাই ভেঙে সেই পাহাড়ের কাছে
পৌঁছে দেখি বিকেলবেলায় 
সে আরও উঁচু, অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে!

পাহাড়টার নাম রেখেছি- বাবা

এখন আর তাকে ডিঙোবার চেষ্টা করি না।

বাবাকে ডিঙোনো যায় না
বাবা পাহাড়কে এক জন্মে ডিঙোনো যায় না....



Tuesday, September 13, 2022

 আজকাল

শৌভিক রায়


ভেতরে ভেতরে 

কত কী যে হয়ে যায় আজকাল,

বুঝতেও পারিনা!

 

এসব কি বুদ্ধির দোষ 

নাকি বোধের,

অথবা হতে পারে 

বয়স গেড়েছে থাবা

বোঝা না-বোঝার সূক্ষ সীমান্তে!


কত কী হয়ে যাচ্ছে তাই,

কত কী!!

এত যে

দেখেও দেখছি না কিছুই......

Monday, September 12, 2022

 ওড়া 

শৌভিক রায় 


হাওয়ায় ওড়া যে এত কঠিন 
জানা ছিল না এতদিন 

অথচ কত সহজেই না উড়তাম সবাই!

দেওয়া-নেওয়া শেষ হলে দেখি হঠাৎ 
রাজপথে আফগানি লাশ, 
টুপটাপ খসে পড়ে হাওয়া থেকে...

(প্রকাশিত: ফুলেশ্বরী নন্দিনী)

Thursday, September 8, 2022


 


পুজোর আনন্দেও শঙ্কার মেঘ

শৌভিক রায়

(লেখক) 


ডুয়ার্সের আকাশে এখন বর্ষা শেষের বৃষ্টি। কখনও মেঘ কেটে গেলে, উত্তর আকাশে ঝকঝকে অনিন্দ্য নীল পাহাড় আর পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। চারদিকের সবুজে ইতিউতি মাথা তুলতে শুরু করেছে সাদা কাশফুলেরা। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে অনাগত ধ্বনি। মা আসছেন!


মা প্রতিবারই আসেন। তাঁর আশায় কেটে যায় সারা বছর। তিনি আসা মানেই অপূর্ব এক আনন্দযজ্ঞ। আর তাতে উদ্বেলিত হয় না, এমন কাউকে পাওয়া ভার। কেননা তিনি স্বয়ং আনন্দমূর্তি, দুষ্টের সংহারক এবং মঙ্গলদাত্রী। 

কিন্তু জীবন বড় কঠিন। আর সেই কাঠিন্য আরও বেড়ে গেছে করোনা মহামারীর পর। আমূল বদলে গেছে সবকিছু। সেই পরিবর্তন স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে চামূর্চি আর জয়গাঁয়। উত্তরবঙ্গ থেকে ভুটানে প্রবেশের এই দুই পথ এখন বন্ধ। আগামী ২৩শে সেপ্টেম্বর ভুটান গেট খুললেও কী হবে বোঝা যাচ্ছে না।   


চামূর্চির বহু দোকানপাট দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ। বহু ব্যবসায়ী চলে গেছেন অন্যত্র। যারা আছেন তারা বুঝে উঠতে পারছেন না কী করবেন। এখানকার অবস্থা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। অথচ করোনা ও লকডাউনের আগে চামূর্চি ছিল এই অঞ্চলের ব্যস্ততম একটি জায়গা। বড় বড় ট্রাক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের পণ্যবাহী গাড়ির ভিড়ে এগোনই যেত না। রাস্তার দুই ধারের রকমারি দোকানগুলি ক্রেতার ভিড়ে গমগম করত। গেটের ওপারে, ভুটান থেকে মানুষেরা এসে কিনে নিয়ে যেতেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ভারত থেকেও বহু মানুষ যেতেন ওদিকে। আর এখন? সব বন্ধ! বিউটি পার্লারের মালিক রোশনি থাপা বলছেন, 'এরকম হবে কে জানত! অভ্যাস মতো প্রতিদিন পার্লার খুলি। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।' একই অবস্থা প্রায় প্রতিটি ব্যবসায়ীর। ইতিমধ্যে অনেকে আশেপাশের চা বাগানে কাজ নিয়েছেন। অনেকে আবার চলে গেছে ভিন রাজ্যে। তারা বুঝেছেন চামূর্চি গেটের ওপর ভরসা করে পেট চালাবার দিন শেষ! 


চামূর্চির মতো দৈন্য দশা না হলেও, অবস্থা ভাল নয় আর এক দুয়ার জয়গাঁরও। কর্মব্যস্ত সেই অতীত জয়গাঁকে আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না! এখানকার গেট সামান্য খোলা ঠিকই। কিন্তু এখনও প্রবেশের অনুমতি নেই। গেট বন্ধ হওয়ার পর থেকে আজ অবধি জয়গাঁ ছেড়েছেন বহু মানুষ। অন্য জায়গায় ভাগ্য অন্বেষণে পাড়ি দিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ, এই এলাকায় বেড়ে গেছে চুরি ডাকাতির সংখ্যাও। 


তেইশে সেপ্টেম্বর গেট খুলবার আশ্বাসেও স্বস্তি পাচ্ছেন না জয়গাঁ বা চামূর্চির মানুষেরা। অনেকেই মনে করছেন সাধারণ মানুষের কোনও লাভ হবে না। শ্রমিক বা পণ্য বহনের কাজে যারা থাকবেন, তারা হয়ত ঢুকতে পারবেন। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন যে পয়সা পর্যটককে গুণতে হবে, তাতে কজন আর বেড়াতে আসবেন? ভুটান থেকে এদিকে আসবার ব্যাপারটিও পরিষ্কার নয়। ভুটানিরা আগের মতো স্বচ্ছন্দে আসতে পারবেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। চামূর্চির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। ফলে আতঙ্কিত হয়ে রয়েছেন কমবেশি সকলেই। পঞ্চাশ বছরের ওপর ব্যবসা সামলানো জয়গাঁর প্রবীণ সুরেন্দ্র গুপ্ত অকপট বললেন, `কে আর জানত এমন দিনও দেখতে হবে। জানিনা কী হবে এরপর!`


দোলাচলের এই আবহে শরতের উদার আকাশ আর পুজো পুজো গন্ধ নিয়ে আলাদা উৎসাহ নেই জয়গাঁ ও চামূর্চির সাধারণ মানুষের। অথচ কয়েক বছর আগেও, জয়গাঁ ও সংলগ্ন ফুন্টসেলিং অথবা চামূর্চির গা ঘেঁষা সামচিতে এই সময় ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকত। মাঝের দুটি বছর বদলে দিয়েছে সব। তবু, আর কয়েকদিন পর ভুটান গেট খুলবার ঘোষণা সামান্য হলেও আশার আলো নিয়ে এসেছে। চরম হতাশার মধ্যেও প্রত্যেকেই অপেক্ষা করে আছেন সেই দিনটির। প্রার্থনা করছেন, আবার ফিরে আসুক অতীতের সেই স্বর্ণালী সময়। প্রার্থনা করছি আমরাও। স্বাভাবিক হয়ে উঠুক সব। চামূর্চি আর জয়গাঁকে এভাবে দেখতে অভ্যস্ত নই আমরা। ছন্দে ফিরুক তারা। 



Tuesday, September 6, 2022


 স্বপ্ন, স্বপ্নপূরণ ও স্বপ্নভঙ্গ প্রসঙ্গ

 উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় 

শৌভিক রায় 


খুব ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যেদিন এই অনিন্দ্যসুন্দর ক্যাম্পাসে প্রথম পা রেখেছিলাম, সেদিন  বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যেভাবে ধারণা ছিল না। সুস্পষ্ট ধারণা যখন গড়ে উঠল, তখন থেকেই একটা গোপন ইচ্ছে পোষা ছিল। এই ক্যাম্পাসের বাসিন্দা হতে হবে! কলেজ জীবন শেষ করে সেই আশা পূরণ হয়েছিল। ততদিনে অবশ্য এই ক্যাম্পাসের না হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে গেছি। রেজিস্ট্রেশন, এডমিট কার্ড এবং মার্কশিটে বসে গেছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। আমাদের সময়ে তো এভাবে প্রায় প্রতি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তাই পরীক্ষার আগে ভয় ছিল ক্যাম্পাসে যাওয়ার সুযোগ পাব কিনা। ফলপ্রকাশের পর অবশ্য সেই ভয় চলে গিয়ে শুরু হয়েছিল অপেক্ষা।


১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল দার্জিলিং থেকে মালদহ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ বিরাট ভূখণ্ডের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। এই অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা নিতে ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্নপুরণের সেরা ঠিকানা। উত্তরের তো বটেই, রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময় উপাচার্য ছিলেন ড.অম্লান দত্ত, ডঃ প্রসাদ ঘোষ  ড.দীপ্তিভূষণ দত্ত, ড.কৃষ্ণনাথ চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা। শ্রদ্ধেয় অশ্রুকুমার শিকদার, ভবতোষ দত্ত, মানস দাশগুপ্ত, আশুতোষ ব্যানার্জি সহ কত না প্রথিতযশা অধ্যাপকেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে গর্বিত করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত ছয়টি জেলার নানা কলেজেও ছিলেন বহু বিখ্যাত অধ্যাপকেরা। প্রাক্তনীরা ছড়িয়ে রয়েছেন সারা পৃথিবীতে। তাঁদের প্রত্যেকেই আজও গর্ব বোধ করেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে।


কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই গর্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ কালো দাগ লেগে গেল। সৌজন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোনও না কোনোভাবে জড়িত কেউই বোধহয় স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবেননি যে, এরকম একটি দিনও দেখতে হবে। বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি উঠেছে সেগুলো প্রমাণসাপেক্ষ হলেও, অভিযোগের গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর জেল যাত্রার ফলে অভিযোগগুলিকে চক্রান্তের তত্বেও ফেলা যাচ্ছে না। বরং এমন কিছু ঘটনা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে যেগুলো দেখে সন্দেহ আরও দানা বাঁধছে। যেভাবে অযোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা টাকার বিনিময়ে এসএসসি-তে শিক্ষকতার চাকরি বাগিয়েছে, তাতে উপাচার্যের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা তিনি নিজে দীর্ঘদিন এসএসসি-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। ইতিমধ্যে কলকাতায় তাঁর একটি ফ্ল্যাট সিল করে দেওয়া হয়েছে। কিছু নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করাও হয়েছে। কথা উঠেছে নব্বই দশকের শেষদিকে  ত্রিপুরা থেকে এই রাজ্যে এসে হাউয়ের মতো তাঁর উত্থানে। অনেকেরই সন্দেহ, এর পেছনে রয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন এক হোমরাচোমরা মন্ত্রীর পিএইচডি পাওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেওয়ার কুনাট্য সহ তাঁর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত। খারাপ লাগে ভেবে, পিএইচডি করতে যেখানে বেশ কয়েক বছর প্রয়োজন, সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসাকে যদি একজন উপাচার্য এভাবে মান্যতা দিচ্ছেন। তাই উপাচার্যের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। মনে রাখতে হবে, তিনি আবার উপাচার্য সমিতির সভাপতিও বটে! এই আচরণ কখনই কাম্য নয়। কেননা উপাচার্যদের চিরকালই অন্য চোখে দেখা হয়। মনে করা হয়, তাঁরা সুশীল সমাজের মানুষ। অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে সদা জাগ্রত বিবেক। সাধারণ মানুষদের প্রণম্য। সমাজকে পথ দেখবেন তাঁরা। দুর্ভাগ্য উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের। অবশ্য এটাও ঠিক, দীর্ঘদিন থেকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে উপাচার্যদের সেই মর্যাদায় যথেষ্ট টান ধরেছে। তাঁরা নিজেরাও অনেকেই দলদাসে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার প্রবেশ ও উপাচার্যের অফিসে এবং বাড়িতে ঢুকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ সহ ঘটনাসমূহ সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। আর এর পরিণাম হতে চলেছে সুদূরপ্রসারী।


তাই `এহ বাহ্য` বলে কোনোভাবেই পাশ কাটানো যাচ্ছে না। আজ উপাচার্যের জন্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আগমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে যে দাগটি লাগল, তার দায় কে নেবে? উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শুনে আগামীদিনে চাকরিপ্রার্থীকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে না, এই গ্যারান্টি কে দেবে? তাঁর ছাত্রছাত্রীদের তাঁর জন্য কটূক্তি শুনতে হবে না, সেই নিশ্চয়তাও আছে কি? তাঁর উপাচার্য থাকাকালীন সময়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও দুর্নীতি হয়নি, সেই ব্যাপারেও জোর দিয়ে বলা যাবে কি কিছু? সর্বোপরি, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোনও না কোনোভাবে জড়িত একজন ব্যক্তির ভাবাবেগে যে আঘাত লাগল, তার নিরাময় হবে কীভাবে? উত্তর বোধহয় কারোরই জানা নেই। ভাবতে অবাক লাগে, বর্তমান উপাচার্য শুধু উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়েরই নন, তিনি দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটিরও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত। ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। সদ্য শুরু হওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্যের নামে যদি এভাবে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে যায়, তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চলার শুরুতেই ধাক্কা লাগে। এটা কখনই কাম্য নয়। 


আসলে সব প্রতিষ্ঠানেই স্বপ্নমায়া লেগে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে যোগ হয় আবেগ। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সেই আবেগের অন্য একটি নাম। কেউই ভুলতে পারেন না এই ক্যাম্পাসের সন্ধ্যাবেলার উত্তর আকাশে কার্শিয়াং পাহাড়ের আলোর মেলা কিংবা সুবলদার ক্যান্টিনের খাওয়া। দল বেঁধে শিবমন্দির যাওয়া কিংবা শালবাগানের সৌন্দর্যে পথ হারানো বোধহয় সবার মনে সদা জাগ্রত। মাগুরমারির ব্রিজ আর তার পরের সিপিএম মোড় (কেমিস্ট্রি ফিজিক্স ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের দিকে যাওয়ার তে মাথা) রয়ে গেছে প্রত্যেকের স্মৃতিতে। ভূমিলক্ষীর সবুজে হারিয়ে যেতে যেতে এখানেই গড়ে ওঠে আগামীর সুখী সংসার। কনভোকেশন হল, রিসার্চ স্কলারদের হোস্টেল, পদ্মজা পার্ক ইত্যাদি থেকে যায় মনের গভীরে। শিক্ষকদের সঙ্গে মেলামেশায়, প্রয়োজনে তাঁদের কোয়ার্টারে সাহায্য নিতে যাওয়ায়, ক্লাসের ফাঁকে ডিপার্টমেন্টে ক্লাসে হয়ে যাওয়া পড়া বুঝে নেওয়ায় কিংবা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নানা ধরণের ছাত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় যে আনন্দ, সুখ আর অভিজ্ঞতা, সেটা কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পাওয়া। বৃহত্তর জীবনের প্রথম পদক্ষেপ আর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সমার্থক। সে তার ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে ধরে যেন শিখিয়ে দেয় শ্রেয়টিকে। বুঝিয়ে দেয় ভবিষ্যতে কীভাবে হতে হবে সুনাগরিক। নিতে হবে দেশ ও দশের দায়িত্ব। ছিনিয়ে দেয় দেশ ও দ্বেষের ফারাক। তাই সেই স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় যখন কোনও একজন ব্যক্তির জন্য কালিমালিপ্ত হয়, তখন সেটা মেনে নেওয়া যতটা না বিড়ম্বনার, তার চাইতে অনেক বেশি বেদনার। নিশ্চিত জানি, এই কষ্ট অনুভব করছেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলেই, সে তিনি বর্তমান বা প্রাক্তন ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী যা-ই হন না কেন। অনাগত ভবিষ্যৎ কী নিয়ে আসবে জানা নেই। আকাঙ্খার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সব কালিমা মুছে জ্বলজ্বল করুক আবার সেই কার্শিয়াং পাহাড়ের আলোর নেকলেসের মতো সেটাই একান্ত চাওয়া এই মুহূর্তের।

Sunday, September 4, 2022

নিজের ভাবনায়

শৌভিক রায় 



শিক্ষক দিবস এলে খুব বেশি মনে পড়ে বাবা-মায়ের কথা। তাঁরা শিক্ষক ছিলেন। আদতে বীরভূমের মেয়ে, আমার মা, দাদুর কর্মসূত্রে বড় হয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা অনার্স পাস করা সেই মা`কে বিয়ের কয়েকদিন পর দিনহাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে যোগ দিতে হয়েছিল। সৌজন্যে সেই সময়ের পরিচালন সমিতির সদস্যরা। তাঁরা এসে ঠাকুরদাকে ধরেছিলেন মা`কে যাতে চাকরি করতে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সব ফেলে আসা ও  এই দেশে উদ্বাস্তু বনে যাওয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আমার সেই ঠাকুরদা রাজি হয়েছিলেন। 

১৯৫৮ সালে মায়ের চাকরিতে যোগদান। মাইনে ৩৫ টাকা। বাবা তখনও ছাত্র। যে মানুষটিকে বহু মানুষ ব্যঙ্গ করে থাকেন অকারণে, যাঁকে গালিগালাজ না করলে অনেকের নিজেকে `বোদ্ধা` প্রমাণ করতে অসুবিধে হয়, নোবেলজয়ী সেই অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তখন বাবাকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়াচ্ছেন। এম এ পাস করে ১৯৬০/৬১ সালে বাবারও শিক্ষকতার কাজে যোগদান। দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে। কিছুদিন পরে, ১৯৬৭ সালে, বাবা ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক হয়ে চলে যান। মা দিনহাটা ছাড়লেন ১৯৮১তে। মা-ও যোগ দিলেন ফালাকাটায় ওই একই স্কুলে। কলকাতা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও জায়গায় থিতু হতে পারতেন এই দম্পতি। হননি। 

বাবার একটাই স্বপ্ন ছিল, ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়। মাধ্যমিকের সেন্টার, উচ্চ মাধ্যমিক কোর্স, সায়েন্স, আর্টস, কমার্স তিনটে বিভাগ থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের মূল দালানবাড়ি ইত্যাদি সবটাই বাবার আমলে। এর সঙ্গে ফালাকাটার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে জড়িয়ে থাকা। মা ছিলেন বাবার সঙ্গে থাকা নীরব কর্মী। মা না থাকলে বাবার পক্ষে এত কিছু করা সম্ভব ছিল না কোনোদিনই!

এই বিশেষ দিন এলে মনে পড়ে আমার শ্বশুরমশাইকেও। পঞ্চাশের দশকের কলকাতার সিটি কলেজের ছাত্র মানুষটির পূর্বপুরুষেরা বিহার থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন ব্যবসার জন্য। বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ী পরিবারে পড়াশোনার তেমন চল না থাকলেও, মায়ের প্রেরণায় (সত্যিকরেই প্রেরণা। তেলবাজির নয়) তাঁর পড়াশোনা। আমার বাবার মতোই দেশভাগের শিকার হয়েছিলেন শ্বশুরমশাইও। ফল, দেশত্যাগ। চলে যেতে পারতেন বিহারে তাঁর আসল বাড়িতে, যেখানে বাকি সবাই চলে গেল! কিন্তু রয়ে গেলেন এই বঙ্গে। দেওয়ানহাটের মতো ছোট্ট জায়গায়। শিক্ষকতা করে কাটালেন দেওয়ানহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহপ্রধান শিক্ষক প্রয়াত বলিপ্রসাদ সাহা নামের মানুষটি। তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের বিত্ত দেখে চোখ কপালে উঠলেও, তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল নিতান্তই অতি সাধারণ। অথচ তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিয়ে হয়ে যেতে পারতেন অনেককিছুই। হননি।   

মনে পড়ে রামভোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহপ্রধান শিক্ষক প্রয়াত রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। কম্যুইনিজমে দীক্ষা নিয়ে পৈতে ফেলে দিয়েছিলেন। প্রকৃত কম্যুইনিস্টের মতো কোনোদিন শিক্ষক বা ছাত্রদের বিভেদ করেননি। তাঁর কাছে সকলের পরিচয় আগে মানুষ, বাকি তারপর। রাজনৈতিক মতাদর্শে একদম তাঁর বিপরীতে থাকা সর্বজন শ্রদ্ধেয় বাণীকান্ত ভট্টাচার্যও কি এই একই মন্ত্রে দীক্ষিত নন! হা হা হেসে সবাইকে অক্লেশে বুকে জড়িয়ে ধরার ক্ষমতা রাখেন এই মানুষটি। এঁদের দুজনের জীবনযাত্রাও এত সহজ সরল যে কল্পনা করা যায় না। অথচ দুজনেরই ক্ষমতা ছিল ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার। ভুলি কীভাবে ফালাকাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের একদা প্রধানশিক্ষিকা শ্রীমতী মায়া বোসকে? আমার বাবার মতোই তিনিও তিরিশ বছরের বেশি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন। তাঁর সময়ের সেই স্কুলকে ভুলতে পারে কি কেউ! কলকাতার পাটুলিতে, নির্দিষ্ট করে বলতে হয় পঞ্চাশায়রে, ছোটখাটো একটি বাড়ি করে রয়েছেন তিনি।  

এই নামগুলি কেবল সামান্য কিছু  উদাহরণ মাত্র। এই বিশেষ দিন এলেই মনে পড়ে, সেই সব অগুন্তি শিক্ষকদের যাঁরা শহরের প্রচারের আলো থেকে বহু দূরে গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন স্কুলে রয়েছেন। তাঁদের নাম জানা তো দূরে, চিনিও না আমরা তাঁদের। 

অথচ আজ রমরমা কাদের? অনৈতিকভাবে পয়সা দিয়ে ও প্রভাবশালীদের তৈলমর্দন করে বদলি নেওয়া, ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক কেষ্টবিষ্টুদের খুশি রাখার প্রচেষ্টায় নিমগ্ন, নিজের কাজ ঠিকঠাক না করা কিছু মানুষের। আরও বেশি খারাপ লাগে যখন দেখি, এরাই পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে সর্বত্র শিক্ষকতা নিয়ে বড় বড় কথা বলে। শিক্ষা তো পণ্য বহুদিন আগেই হয়েছে। আর এরা সেই পণ্যকে নিয়ে এমন ব্যবসা করেছে যে, পণ্যটি পুঁতিগন্ধময় আবর্জনায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। একদা কোনও একটি নামের সঙ্গে `আয়ন` জুড়ে যে শব্দবন্ধ তৈরি হয়েছিল, আজ সেই `আয়ন`কে যে কতগুলো নামের সঙ্গে জুড়তে হবে ভাবতে অবাক লাগে! এরাই এখন নানা পুরস্কারপ্রাপক। মেলায়-খেলায় এদেরই রাজত্ব। 

কষ্ট হয় অন্যদের জন্য। কোনও স্বীকৃতি নেই তাঁদের। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নিরলস কাজ করে, নিয়মিত পাঠদান করেও তাঁরা ব্রাত্য। তাঁদের কথা কেউ শোনেও না, বলেও না। এঁদের দেখে এক এক সময় লুই ফিশারের গান্ধির কথা মনে পড়ে যায়। ফিশার বলেছিলেন, গান্ধি ব্যর্থ হবেন। হয়েছেন। ফিশারের কথা ফলে গেছে। অবশ্য ফিশার আর একটি কথা বলেছিলেন। গান্ধির নিজের জীবনই একটি শিক্ষা। এই কিছু না পাওয়া শিক্ষকদের দেখে সে কথাই মনে হয়। তাঁদের জীবন সত্যিই একটি শিক্ষা। আপোষ না করার, মেরুদণ্ড সোজা রাখার, অনৈতিক কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত না হওয়ার, মূল্যবোধ নষ্ট না হতে দেওয়ার  শিক্ষা তাঁরা জীবন দিয়েই শিখিয়ে যাচ্ছেন ক্রমাগত। তাঁদের জন্যই শিক্ষক দিবসকে মহান বলতে দ্বিধা হয়না। শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম তাঁদের।  আর সর্বক্ষেত্রে তাঁবেদারী করে নিজের কাজ স্বার্থ সিদ্ধি করা সেইসব মানুষদের জন্য করুণা....        

 

              
    

Friday, September 2, 2022

তোমার অসীমে...

শৌভিক রায় 

ঠিক কবে থেকে জানতাম ওকে? উত্তর হয় না এই প্রশ্নের! 

আসলে কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না। হবে কীভাবে? সেই সময় ফালাকাটা তো নিজের হাতের তালুর মতোই ছোট। কমবেশি সবাই সবাইকে চিনি বা জানি। এর মাঝেই কোনও কোনও পরিবারের মধ্যে সখ্যতা বেশি হয়ে যায়। আমাদেরও ছিল। ফালাকাটা হাই স্কুলের মাস্টারমশাই-দিদিমণিরা তখন সত্যিই একটা পরিবারের মতো ছিলেন। আর তাঁদের ছেলে-মেয়েরা প্রত্যেকেই যেন ভাই বোন। আমার দাদা কৌশিক, রুমাদি, অলকদাদা, রুবিদি, টিঙ্কুদা, বাবুদা, বাসবদা, টুটু, টিটো, ফুলটুসি, রত্নাদি, রথীন, মিতুন, বুবুন-তুতুন, টুপ্পা, লালুদা, ভুলুদা, মঞ্জু, সাথী, অপু, বাবু, অনু, অনুর ভাই, সৈকত, অর্ণব, মুক্তি, বীরেন স্যারের মেয়েরা, নারায়ণদা, বিমলদা, পূর্ণ....অজস্র নাম।  এই বিরাট পরিবারের ছেলে-মেয়েরা সবাই নিজেদের ভাইবোনের মতোই বড় হয়েছি। পুজোয় দেওয়া-থোওয়া হত পরিবারগুলির অনেকের মধ্যে। ভাইফোঁটায় মেয়েরা আমাদের ছেলেদের ফোঁটা দিত। সবাই যেত সবার বাড়িতে। 

তাই আলাদা করে তাকে কবে থেকে চিনি সেটা বলতে পারব না। শুধু এটুকু মনে আছে আমাদের এই ছেলেমেয়েদের বর্ধিত পরিবারের সবচেয়ে বড় দুই দাদার একজন ছিল অসীমদা। অসীম সরকার। আজকের ফালাকাটায় তার পরিচয় ফালাকাটা হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক হলেও, অসীমদা আদতে ছিল আমাদের বড় ভাই। আজ তার অকালে চলে যাওয়ায় খবর পেয়ে সারাদিন ধরেই মনে হচ্ছে, এই মিলনমেলা এবার ভাঙা শুরু হল! আগে চলে গেছেন আমাদের বাবা-মায়েরা। এবার টান ধরল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমাদের বর্ধিত সেই পরিবারেও।

অসীমদার শুধু গ্রন্থাগারিক হলেই চলত। চোখের পুরু চশমাটা গ্রন্থাগারিক হওয়ার জন্য একদম ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু অসীমদা ওখানেই থিম থাকেনি কোনোদিন। নাটক নিয়ে ভেবেছে, নাটক মঞ্চস্থ করিয়েছে আমাদের দিয়ে, গল্প-উপন্যাস লিখেছে, বই প্রকাশ করেছে আর সর্বোপরি নতুন সৃষ্টির নেশায় সবসময় পুড়েছে। প্রকৃত একজন শিল্পী যেভাবে পোড়ে, ঠিক সেভাবেই পূত অসীমদা। ওর লেখা বা অন্যান্য সৃজন কতটা কালোত্তীর্ণ হয়েছে, সেটা বিচার করবে সময়। কিন্তু এটা জোর গলায় বলতে পারি, নিজের প্যাশনটা কোনোদিন নষ্ট হতে দেয়নি অসীমদা। যখনই দেখা হয়েছে তা সে বিয়ের মতো আনন্দ অনুষ্ঠান হোক, বা পারলৌকিক ক্রিয়ার মতো শোকের আবহ হোক, অসীমদা তার নিজের সৃজনের কথা বলে গেছে। কখনও কখনও আমার ওকে অবসেসড মনে হত। হয়ত বিরক্তি আসত। কিন্তু মানুষটি ছিল খাঁটি। ঘোরপ্যাঁচ সেভাবে জানত না বলেই মনে হয়েছে বরাবর।  আমাদের আর পাঁচজনের মতো নিজেকে লুকিয়েও রাখতে পারত না!

অসীমদার বাবা অনিলকাকু (ফালাকাটায় তাঁর পরিচয় ছিল কেরানি স্যার নাম) ছিলেন এক ব্যতিক্রমী মানুষ। সেই সময় অনেক তাবড় হেডমাস্টার আমার বাবাকে রীতিমতো ঈর্ষা করতেন। সেটা শুধুমাত্র অনিলকাকুর জন্য। বিভিন্ন কাজে অনিলকাকুর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। ভীষণ কর্মঠ ছিলেন। সেই আমলে সকালবেলায় জলপাইগুড়ি গিয়ে সারাদিন কাজ করে ফালাকাটায় ফিরে আবার বিকেলের দিকে আলিপুদুয়ার যাওয়ার শারীরিক ক্ষমতা একমাত্র তিনিই রাখতেন। সঙ্গে ছিল প্রবল স্মৃতিশক্তি। ১৯৮৫ সালে আলিপুরদুয়ারের এক পোস্ট অফিসে অনিলকাকুর সঙ্গে গিয়েছিলাম এন এস সি জাতীয় কোনও পলিসি ভাঙাতে (সেই সময় ফালাকাটা পোস্ট অফিসে ভাঙানো যেত না) অনিলকাকু পোস্টমাস্টারকে চিনে ফেললেন! ১৯৬৮ সালে ভদ্রলোক নাকি জলপাইগুড়ি পান্ডাপাড়া পোস্ট অফিসে ছিলেন। আমি যত না অবাক তার চাইতে পোস্টমাস্টার সাহেব বেশি অবাক এত বছর পরেও অনিলকাকুর তাঁকে চিনে ফেলায়। অনিলকাকুর আর একটা অভ্যেস ছিল। কাকিমাকে বলতেন `সাধু`। আর অসীমদা ছিল তাঁর `পাগলা`। বহুদিন শুনেছি চাপা স্বরে অনিলকাকু আমাকে বলছেন, `দেখসো...সাধুর কাছে পাগলা কেমন চুপ থাকে! আমার লগে চ্যাল্লায়!` পুরোটাই মজা করে বলা। মিটিমিটি হাসতে হাসতে। আসলে মানুষটি আমাকে বড্ড স্নেহ করতেন। ইনিই সেই মানুষ, যিনি আমার স্কুলে চাকরির আপ্যয়েন্টমেন্ট লেটার দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন, `শুভু বড় হয়া গ্যালো! আমাগো শুভু বড় হয়া গ্যালো!` 

স্বভাবে অনিলকাকুর একদম বিপরীতে ছিল অসীমদা। অন্তত আমার সেরকমই মনে হয়েছে সবসময়। প্রখর বাস্তববাদী অনিলকাকুর জ্যেষ্ঠ সন্তানটি যে জগতে বিচরণ করত, তা যেন অনেকটাই ইউটোপিয়ান। খানিকটা ছন্নছাড়া, ভুলোমনা, অন্যমনস্ক অসীমদাকেই দেখে এসেছি বরাবর। আর ওই প্যাশন। তার জন্য কত জায়গায় যে দৌড়ে বেরিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আমার সঙ্গে ২০২১-এ  শেষ দেখায় চেয়েছিল ওর একটা বই যেন ভাল প্রকাশনী থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। বোঝাতে পারিনি, যে প্রকাশনীগুলি থেকে আমার বই প্রকাশিত হয়েছে, তারা অন্য প্রকাশনীর বই পুনর্মুদ্রণ করবেন না। বুঝতে চায়নি। শিশুর মতো এই অবুঝপনা ছিল ওর চিরসঙ্গী। ছিল অভিমানও । সবটাই শেষ হয়ে গেল। 

বাবা হিসেবে সফল অসীমদা। ছেলেকে ডাক্তারি পড়াতে চেয়েছিল। ওর ছেলে বাবার ইচ্ছে পূরণ করেছে। ডাক্তার হিসেবে ছেলেকে দেখতে না পেলেও, ছেলে ডাক্তারি পড়ছে এই শান্তিটা নিয়ে যেতে পারল! ছিল কল্যাণীতে। ওখানেই বাড়ি ভাড়া করে থাকত ছেলের জন্য।

অসীমদাকে নিয়ে আসা হচ্ছে ফালাকাটায়। মুজনাইয়ের তীরে ওর নশ্বর শরীর মিলিয়ে যাবে আর কয়েক ঘন্টা পরে। 

ফালাকাটা ক্রমশ ধূসর হয়ে যাচ্ছে। 
সময় তার হাত রাখছে নিজের মতো। 
বুঝিয়ে দিচ্ছে অনুচ্চারিত এক অমোঘ সত্যকে....

অসীমদা...তোমার নির্দেশিত সেই নাটক `টেনিদা এন্ড কোং'-এ আমাকে টেনিদার ভূমিকায় নামিয়েছিলে। সেদিনের শেখানো সেই কলার তুলে দর্শকদের অভিবাদন...আজ সেই অভিবাদন তোমায়...কলার তুলে...ভাল থেকো। শো মাস্ট গো অন। শো চলবে। ভেবো না!!!

(স্মরণে: অসীম সরকার)