Tuesday, September 6, 2022


 স্বপ্ন, স্বপ্নপূরণ ও স্বপ্নভঙ্গ প্রসঙ্গ

 উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় 

শৌভিক রায় 


খুব ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যেদিন এই অনিন্দ্যসুন্দর ক্যাম্পাসে প্রথম পা রেখেছিলাম, সেদিন  বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যেভাবে ধারণা ছিল না। সুস্পষ্ট ধারণা যখন গড়ে উঠল, তখন থেকেই একটা গোপন ইচ্ছে পোষা ছিল। এই ক্যাম্পাসের বাসিন্দা হতে হবে! কলেজ জীবন শেষ করে সেই আশা পূরণ হয়েছিল। ততদিনে অবশ্য এই ক্যাম্পাসের না হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে গেছি। রেজিস্ট্রেশন, এডমিট কার্ড এবং মার্কশিটে বসে গেছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। আমাদের সময়ে তো এভাবে প্রায় প্রতি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তাই পরীক্ষার আগে ভয় ছিল ক্যাম্পাসে যাওয়ার সুযোগ পাব কিনা। ফলপ্রকাশের পর অবশ্য সেই ভয় চলে গিয়ে শুরু হয়েছিল অপেক্ষা।


১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল দার্জিলিং থেকে মালদহ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ বিরাট ভূখণ্ডের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। এই অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা নিতে ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্নপুরণের সেরা ঠিকানা। উত্তরের তো বটেই, রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময় উপাচার্য ছিলেন ড.অম্লান দত্ত, ডঃ প্রসাদ ঘোষ  ড.দীপ্তিভূষণ দত্ত, ড.কৃষ্ণনাথ চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা। শ্রদ্ধেয় অশ্রুকুমার শিকদার, ভবতোষ দত্ত, মানস দাশগুপ্ত, আশুতোষ ব্যানার্জি সহ কত না প্রথিতযশা অধ্যাপকেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে গর্বিত করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত ছয়টি জেলার নানা কলেজেও ছিলেন বহু বিখ্যাত অধ্যাপকেরা। প্রাক্তনীরা ছড়িয়ে রয়েছেন সারা পৃথিবীতে। তাঁদের প্রত্যেকেই আজও গর্ব বোধ করেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে।


কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই গর্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ কালো দাগ লেগে গেল। সৌজন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোনও না কোনোভাবে জড়িত কেউই বোধহয় স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবেননি যে, এরকম একটি দিনও দেখতে হবে। বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি উঠেছে সেগুলো প্রমাণসাপেক্ষ হলেও, অভিযোগের গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর জেল যাত্রার ফলে অভিযোগগুলিকে চক্রান্তের তত্বেও ফেলা যাচ্ছে না। বরং এমন কিছু ঘটনা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে যেগুলো দেখে সন্দেহ আরও দানা বাঁধছে। যেভাবে অযোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা টাকার বিনিময়ে এসএসসি-তে শিক্ষকতার চাকরি বাগিয়েছে, তাতে উপাচার্যের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা তিনি নিজে দীর্ঘদিন এসএসসি-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। ইতিমধ্যে কলকাতায় তাঁর একটি ফ্ল্যাট সিল করে দেওয়া হয়েছে। কিছু নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করাও হয়েছে। কথা উঠেছে নব্বই দশকের শেষদিকে  ত্রিপুরা থেকে এই রাজ্যে এসে হাউয়ের মতো তাঁর উত্থানে। অনেকেরই সন্দেহ, এর পেছনে রয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন এক হোমরাচোমরা মন্ত্রীর পিএইচডি পাওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেওয়ার কুনাট্য সহ তাঁর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত। খারাপ লাগে ভেবে, পিএইচডি করতে যেখানে বেশ কয়েক বছর প্রয়োজন, সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসাকে যদি একজন উপাচার্য এভাবে মান্যতা দিচ্ছেন। তাই উপাচার্যের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। মনে রাখতে হবে, তিনি আবার উপাচার্য সমিতির সভাপতিও বটে! এই আচরণ কখনই কাম্য নয়। কেননা উপাচার্যদের চিরকালই অন্য চোখে দেখা হয়। মনে করা হয়, তাঁরা সুশীল সমাজের মানুষ। অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে সদা জাগ্রত বিবেক। সাধারণ মানুষদের প্রণম্য। সমাজকে পথ দেখবেন তাঁরা। দুর্ভাগ্য উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের। অবশ্য এটাও ঠিক, দীর্ঘদিন থেকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে উপাচার্যদের সেই মর্যাদায় যথেষ্ট টান ধরেছে। তাঁরা নিজেরাও অনেকেই দলদাসে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার প্রবেশ ও উপাচার্যের অফিসে এবং বাড়িতে ঢুকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ সহ ঘটনাসমূহ সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। আর এর পরিণাম হতে চলেছে সুদূরপ্রসারী।


তাই `এহ বাহ্য` বলে কোনোভাবেই পাশ কাটানো যাচ্ছে না। আজ উপাচার্যের জন্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আগমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে যে দাগটি লাগল, তার দায় কে নেবে? উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শুনে আগামীদিনে চাকরিপ্রার্থীকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে না, এই গ্যারান্টি কে দেবে? তাঁর ছাত্রছাত্রীদের তাঁর জন্য কটূক্তি শুনতে হবে না, সেই নিশ্চয়তাও আছে কি? তাঁর উপাচার্য থাকাকালীন সময়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও দুর্নীতি হয়নি, সেই ব্যাপারেও জোর দিয়ে বলা যাবে কি কিছু? সর্বোপরি, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোনও না কোনোভাবে জড়িত একজন ব্যক্তির ভাবাবেগে যে আঘাত লাগল, তার নিরাময় হবে কীভাবে? উত্তর বোধহয় কারোরই জানা নেই। ভাবতে অবাক লাগে, বর্তমান উপাচার্য শুধু উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়েরই নন, তিনি দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটিরও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত। ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। সদ্য শুরু হওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্যের নামে যদি এভাবে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে যায়, তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চলার শুরুতেই ধাক্কা লাগে। এটা কখনই কাম্য নয়। 


আসলে সব প্রতিষ্ঠানেই স্বপ্নমায়া লেগে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে যোগ হয় আবেগ। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সেই আবেগের অন্য একটি নাম। কেউই ভুলতে পারেন না এই ক্যাম্পাসের সন্ধ্যাবেলার উত্তর আকাশে কার্শিয়াং পাহাড়ের আলোর মেলা কিংবা সুবলদার ক্যান্টিনের খাওয়া। দল বেঁধে শিবমন্দির যাওয়া কিংবা শালবাগানের সৌন্দর্যে পথ হারানো বোধহয় সবার মনে সদা জাগ্রত। মাগুরমারির ব্রিজ আর তার পরের সিপিএম মোড় (কেমিস্ট্রি ফিজিক্স ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের দিকে যাওয়ার তে মাথা) রয়ে গেছে প্রত্যেকের স্মৃতিতে। ভূমিলক্ষীর সবুজে হারিয়ে যেতে যেতে এখানেই গড়ে ওঠে আগামীর সুখী সংসার। কনভোকেশন হল, রিসার্চ স্কলারদের হোস্টেল, পদ্মজা পার্ক ইত্যাদি থেকে যায় মনের গভীরে। শিক্ষকদের সঙ্গে মেলামেশায়, প্রয়োজনে তাঁদের কোয়ার্টারে সাহায্য নিতে যাওয়ায়, ক্লাসের ফাঁকে ডিপার্টমেন্টে ক্লাসে হয়ে যাওয়া পড়া বুঝে নেওয়ায় কিংবা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নানা ধরণের ছাত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় যে আনন্দ, সুখ আর অভিজ্ঞতা, সেটা কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পাওয়া। বৃহত্তর জীবনের প্রথম পদক্ষেপ আর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সমার্থক। সে তার ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে ধরে যেন শিখিয়ে দেয় শ্রেয়টিকে। বুঝিয়ে দেয় ভবিষ্যতে কীভাবে হতে হবে সুনাগরিক। নিতে হবে দেশ ও দশের দায়িত্ব। ছিনিয়ে দেয় দেশ ও দ্বেষের ফারাক। তাই সেই স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় যখন কোনও একজন ব্যক্তির জন্য কালিমালিপ্ত হয়, তখন সেটা মেনে নেওয়া যতটা না বিড়ম্বনার, তার চাইতে অনেক বেশি বেদনার। নিশ্চিত জানি, এই কষ্ট অনুভব করছেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলেই, সে তিনি বর্তমান বা প্রাক্তন ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী যা-ই হন না কেন। অনাগত ভবিষ্যৎ কী নিয়ে আসবে জানা নেই। আকাঙ্খার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সব কালিমা মুছে জ্বলজ্বল করুক আবার সেই কার্শিয়াং পাহাড়ের আলোর নেকলেসের মতো সেটাই একান্ত চাওয়া এই মুহূর্তের।

No comments: