Friday, September 2, 2022

তোমার অসীমে...

শৌভিক রায় 

ঠিক কবে থেকে জানতাম ওকে? উত্তর হয় না এই প্রশ্নের! 

আসলে কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না। হবে কীভাবে? সেই সময় ফালাকাটা তো নিজের হাতের তালুর মতোই ছোট। কমবেশি সবাই সবাইকে চিনি বা জানি। এর মাঝেই কোনও কোনও পরিবারের মধ্যে সখ্যতা বেশি হয়ে যায়। আমাদেরও ছিল। ফালাকাটা হাই স্কুলের মাস্টারমশাই-দিদিমণিরা তখন সত্যিই একটা পরিবারের মতো ছিলেন। আর তাঁদের ছেলে-মেয়েরা প্রত্যেকেই যেন ভাই বোন। আমার দাদা কৌশিক, রুমাদি, অলকদাদা, রুবিদি, টিঙ্কুদা, বাবুদা, বাসবদা, টুটু, টিটো, ফুলটুসি, রত্নাদি, রথীন, মিতুন, বুবুন-তুতুন, টুপ্পা, লালুদা, ভুলুদা, মঞ্জু, সাথী, অপু, বাবু, অনু, অনুর ভাই, সৈকত, অর্ণব, মুক্তি, বীরেন স্যারের মেয়েরা, নারায়ণদা, বিমলদা, পূর্ণ....অজস্র নাম।  এই বিরাট পরিবারের ছেলে-মেয়েরা সবাই নিজেদের ভাইবোনের মতোই বড় হয়েছি। পুজোয় দেওয়া-থোওয়া হত পরিবারগুলির অনেকের মধ্যে। ভাইফোঁটায় মেয়েরা আমাদের ছেলেদের ফোঁটা দিত। সবাই যেত সবার বাড়িতে। 

তাই আলাদা করে তাকে কবে থেকে চিনি সেটা বলতে পারব না। শুধু এটুকু মনে আছে আমাদের এই ছেলেমেয়েদের বর্ধিত পরিবারের সবচেয়ে বড় দুই দাদার একজন ছিল অসীমদা। অসীম সরকার। আজকের ফালাকাটায় তার পরিচয় ফালাকাটা হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক হলেও, অসীমদা আদতে ছিল আমাদের বড় ভাই। আজ তার অকালে চলে যাওয়ায় খবর পেয়ে সারাদিন ধরেই মনে হচ্ছে, এই মিলনমেলা এবার ভাঙা শুরু হল! আগে চলে গেছেন আমাদের বাবা-মায়েরা। এবার টান ধরল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমাদের বর্ধিত সেই পরিবারেও।

অসীমদার শুধু গ্রন্থাগারিক হলেই চলত। চোখের পুরু চশমাটা গ্রন্থাগারিক হওয়ার জন্য একদম ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু অসীমদা ওখানেই থিম থাকেনি কোনোদিন। নাটক নিয়ে ভেবেছে, নাটক মঞ্চস্থ করিয়েছে আমাদের দিয়ে, গল্প-উপন্যাস লিখেছে, বই প্রকাশ করেছে আর সর্বোপরি নতুন সৃষ্টির নেশায় সবসময় পুড়েছে। প্রকৃত একজন শিল্পী যেভাবে পোড়ে, ঠিক সেভাবেই পূত অসীমদা। ওর লেখা বা অন্যান্য সৃজন কতটা কালোত্তীর্ণ হয়েছে, সেটা বিচার করবে সময়। কিন্তু এটা জোর গলায় বলতে পারি, নিজের প্যাশনটা কোনোদিন নষ্ট হতে দেয়নি অসীমদা। যখনই দেখা হয়েছে তা সে বিয়ের মতো আনন্দ অনুষ্ঠান হোক, বা পারলৌকিক ক্রিয়ার মতো শোকের আবহ হোক, অসীমদা তার নিজের সৃজনের কথা বলে গেছে। কখনও কখনও আমার ওকে অবসেসড মনে হত। হয়ত বিরক্তি আসত। কিন্তু মানুষটি ছিল খাঁটি। ঘোরপ্যাঁচ সেভাবে জানত না বলেই মনে হয়েছে বরাবর।  আমাদের আর পাঁচজনের মতো নিজেকে লুকিয়েও রাখতে পারত না!

অসীমদার বাবা অনিলকাকু (ফালাকাটায় তাঁর পরিচয় ছিল কেরানি স্যার নাম) ছিলেন এক ব্যতিক্রমী মানুষ। সেই সময় অনেক তাবড় হেডমাস্টার আমার বাবাকে রীতিমতো ঈর্ষা করতেন। সেটা শুধুমাত্র অনিলকাকুর জন্য। বিভিন্ন কাজে অনিলকাকুর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। ভীষণ কর্মঠ ছিলেন। সেই আমলে সকালবেলায় জলপাইগুড়ি গিয়ে সারাদিন কাজ করে ফালাকাটায় ফিরে আবার বিকেলের দিকে আলিপুদুয়ার যাওয়ার শারীরিক ক্ষমতা একমাত্র তিনিই রাখতেন। সঙ্গে ছিল প্রবল স্মৃতিশক্তি। ১৯৮৫ সালে আলিপুরদুয়ারের এক পোস্ট অফিসে অনিলকাকুর সঙ্গে গিয়েছিলাম এন এস সি জাতীয় কোনও পলিসি ভাঙাতে (সেই সময় ফালাকাটা পোস্ট অফিসে ভাঙানো যেত না) অনিলকাকু পোস্টমাস্টারকে চিনে ফেললেন! ১৯৬৮ সালে ভদ্রলোক নাকি জলপাইগুড়ি পান্ডাপাড়া পোস্ট অফিসে ছিলেন। আমি যত না অবাক তার চাইতে পোস্টমাস্টার সাহেব বেশি অবাক এত বছর পরেও অনিলকাকুর তাঁকে চিনে ফেলায়। অনিলকাকুর আর একটা অভ্যেস ছিল। কাকিমাকে বলতেন `সাধু`। আর অসীমদা ছিল তাঁর `পাগলা`। বহুদিন শুনেছি চাপা স্বরে অনিলকাকু আমাকে বলছেন, `দেখসো...সাধুর কাছে পাগলা কেমন চুপ থাকে! আমার লগে চ্যাল্লায়!` পুরোটাই মজা করে বলা। মিটিমিটি হাসতে হাসতে। আসলে মানুষটি আমাকে বড্ড স্নেহ করতেন। ইনিই সেই মানুষ, যিনি আমার স্কুলে চাকরির আপ্যয়েন্টমেন্ট লেটার দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন, `শুভু বড় হয়া গ্যালো! আমাগো শুভু বড় হয়া গ্যালো!` 

স্বভাবে অনিলকাকুর একদম বিপরীতে ছিল অসীমদা। অন্তত আমার সেরকমই মনে হয়েছে সবসময়। প্রখর বাস্তববাদী অনিলকাকুর জ্যেষ্ঠ সন্তানটি যে জগতে বিচরণ করত, তা যেন অনেকটাই ইউটোপিয়ান। খানিকটা ছন্নছাড়া, ভুলোমনা, অন্যমনস্ক অসীমদাকেই দেখে এসেছি বরাবর। আর ওই প্যাশন। তার জন্য কত জায়গায় যে দৌড়ে বেরিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আমার সঙ্গে ২০২১-এ  শেষ দেখায় চেয়েছিল ওর একটা বই যেন ভাল প্রকাশনী থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। বোঝাতে পারিনি, যে প্রকাশনীগুলি থেকে আমার বই প্রকাশিত হয়েছে, তারা অন্য প্রকাশনীর বই পুনর্মুদ্রণ করবেন না। বুঝতে চায়নি। শিশুর মতো এই অবুঝপনা ছিল ওর চিরসঙ্গী। ছিল অভিমানও । সবটাই শেষ হয়ে গেল। 

বাবা হিসেবে সফল অসীমদা। ছেলেকে ডাক্তারি পড়াতে চেয়েছিল। ওর ছেলে বাবার ইচ্ছে পূরণ করেছে। ডাক্তার হিসেবে ছেলেকে দেখতে না পেলেও, ছেলে ডাক্তারি পড়ছে এই শান্তিটা নিয়ে যেতে পারল! ছিল কল্যাণীতে। ওখানেই বাড়ি ভাড়া করে থাকত ছেলের জন্য।

অসীমদাকে নিয়ে আসা হচ্ছে ফালাকাটায়। মুজনাইয়ের তীরে ওর নশ্বর শরীর মিলিয়ে যাবে আর কয়েক ঘন্টা পরে। 

ফালাকাটা ক্রমশ ধূসর হয়ে যাচ্ছে। 
সময় তার হাত রাখছে নিজের মতো। 
বুঝিয়ে দিচ্ছে অনুচ্চারিত এক অমোঘ সত্যকে....

অসীমদা...তোমার নির্দেশিত সেই নাটক `টেনিদা এন্ড কোং'-এ আমাকে টেনিদার ভূমিকায় নামিয়েছিলে। সেদিনের শেখানো সেই কলার তুলে দর্শকদের অভিবাদন...আজ সেই অভিবাদন তোমায়...কলার তুলে...ভাল থেকো। শো মাস্ট গো অন। শো চলবে। ভেবো না!!!

(স্মরণে: অসীম সরকার) 

No comments: