Thursday, September 22, 2022


পুজোর সিনেমা হল

শৌভিক রায় 


আমাদের ছেলেবেলায় পুজোর অনুষঙ্গে সিনেমা হলের বেশ একটা যোগাযোগ ছিল। পুজোতে কোন হলে কী ছবি আসছে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম আমরা। ফালাকাটায় অবশ্য একটাই সিনেমা হল ছিল। গৌরী টকিজ। কিন্তু পুজোর সময় আমরা দিনহাটার বাড়িতে চলে আসতাম বলে একটা চয়েসের ব্যাপার থেকে যেত। কেননা দিনহাটায় তখন দুটো সিনেমা হল। মহামায়া আর ভবানী। যারা আমাদের চাইতেও এক কাঠি সরেস ছিল, তারা চলে যেত কোচবিহারে। কমলা, ভবানী, নিউ আর সম্ভবত কোঅপারেটিভ। সুতরাং চুজিংয়ের একটা ব্যাপার থাকতই! 


সিনেমা দেখবার ব্যাপারে আমার বাবা ছিলেন ভয়ঙ্কর পিউরিটান। ফালাকাটায় মা থাকতেন না। ফলে তাঁর ব্যাপারটা বুঝতাম না। কিন্তু মা ফালাকাটায় আসবার পর বুঝলাম, মা এই ব্যাপারেও আর সব কিছুর মতোই বাবার যোগ্য পার্টনার। সিনেমা? কী ছবি? অমিতাভ বচ্চন? ওই লম্বা ঢ্যাঙা লোকটা যে শুধু মারপিট করে? ধর্মেন্দ্র? কুকুর তুলে গালিগালাজ দেয়? নো। নেভার। হবে না। 


মোটামুটি ক্লাস এইট অবধি আমার ছবি দেখার দৌড় ছিল 'বিদ্যাসাগর' (একটা খাতা দিয়েছিল টিকিট কাটার সময়। বিদ্যাসাগরের মুখ ছিল নীল কাভারে), 'হীরে মানিক' (হাপুস নয়নে কেঁদেছিলাম ছবিটা দেখতে দেখতে), 'বাবা তারকনাথ' (বিশ্বজিৎ আর সন্ধ্যা রায়ের সেই কী ইয়ে!) এইসব আর কি! বড়দের ছবি বলতে ঠাকুমার দৌলতে একবার দেখেছিলাম 'সুনয়নী' (শকুন্তলা বড়ুয়া অন্ধ হয়ে যান এরকম কিছু একটা ছিল)।  


ফলে যা হওয়ার তাই হল! ক্লাস নাইনে 'দুটি পাতা' দেখে নায়িকা মিতা দেবরায়ের প্রেমে পড়ে গেলাম! সে কী অবস্থা!! একটু পর পর মিতা দেবরায় চোখের সামনে চলে আসছেন। কানে গান ভেসে আসছে 'ঝর ঝর ঝরে ঝিলমিল ঝর্ণা' বা 'মনটা যদি না থাকত আমার কিছুই মনে পড়ত না'! উফফ কী মারাত্মক দশা। ফালাকাটা হাট থেকে 'দুটি পাতা' ফিল্মের গানের বই কিনে আনলাম। তাতে আবার মিতা দেবরায়ের ছবি। তোষকের তলায় লুকিয়ে রাখা সেই বই খুলে সুযোগ পেলেই ছবি দেখি আর গান গাই। গানের বিষয়ে আমি চিরদিনই অসুর আর বেতাল রাগে দীক্ষিত। কিন্তু কিছু করার নেই। তখন মিতা দেবরায় আমার শয়নে স্বপনে নিদ্রা জাগরণে। ওদিকে আমার বন্ধু প্রণবের সঙ্গে 'নদীয়া কে পার'-এর নায়িকা সাধনা সিংয়ের প্রবল প্রেম চলছে। চিরকালের সুরেলা প্রণব গোপনগরের লালপুলে গিয়ে 'গুঞ্জা রে', সাঁচি কহে তোরে' গাইতে গাইতে প্রায় কেঁদে ফেলছে! পুটন আর বাপির কেস শুধু বোঝা যাচ্ছে না! তবে পুটনের আঙুল চোষা বেড়ে গেছে আর বাপির ফাজলামি!


এই সাইড এফেক্ট কেটে গেল অন্য ঘটনায়। আর সেটা হল দিনহাটায়। আসলে, দিনহাটার কেসটা একটু অন্য ছিল। বাড়ির কাছেই মহামায়া সিনেমা হল। কাজ ছিল হলে কত লোক হয়েছে দেখতে যাওয়া। আর সিনেমার পোস্টার দেখা। কোনও কোনও দিন চলে যাওয়া হত ভবানী সিনেমার পোস্টার দেখতে। আর এভাবেই হাতে খড়ি হয়ে গেল লুকিয়ে ছবি দেখার। কাউকে না জানিয়ে, বাড়িতে লুকিয়ে প্রথম ছবি দেখলাম 'হিম্মতওয়ালা'। পঁচাত্তর পয়সার ইন্টারে বসে জিতেন্দ্র আর শ্রীদেবীকে একটু মোটা লাগলেও, নায়িকার গ্ল্যামারে সব উবে গেল! তবে শ্রীদেবীর প্রেমে পড়িনি। 


সেই সমসাময়িক আমলে পুজোর সিনেমা হল মানেই সেই আমলের হিট ছবি সব। বেশিটাই হিন্দি। তবে বাংলাও পিছিয়ে নেই। ইলেভেন থেকে লায়েক হয়ে গিয়েছিলাম বলে সিনেমা হলে ঢোকার ব্যাপারে আর ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছিল না। তবে তখনও ফালাকাটায় থাকতাম। তাই খানিকটা রেস্ট্রিকশন ছিল। ঝামেলা শেষ হয়ে গেল কলেজে উঠে। দিনহাটায় কলেজে পড়তে এসে একদম মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে গেলাম। ফলে ম্যাটিনি, ইভনিং, নাইট শো কোনোটাই বাদ ছিল না। কাকিমায়েরা ভাত ঢেকে রাখতেন। নাইট শো থেকে ফিরে গামলায় রাখা সেই ভাতের স্বাদ অমৃত মনে হত। ছবি দেখার ব্যাপারে কোনও বাছবিচার ছিল না। যা পেতাম তাইই দেখতাম। পুজোর সময় তো কথাই নেই! এই ব্যাপারে আমাদের জীবনদার থিয়োরি সিম্পল ছিল। 

- ছবিটা কেমন জীবনদা?

- আছেএএএ....

ভাল লাগলে এসে চেপে ধরতাম। 

- ছবিটা তো ভালই গো!

- ক্যান, তোরে কইলাম না আছে!!

খারাপ লাগলেও চেপে ধরতাম।

- কী ফালতু একটা ছবি!

- ক্যান তোরে কইছিলাম না আছেএএএএএএ...


সেই জীবনদা আছে। আমি আছি। পুজো আছে। কিছু কিছু সিনেমা হলও আছে! শুধু নেই পুজোর সময়ের সেই সিনেমা হল ঘিরে উন্মাদনা! গত বছরের মতো এবারও পুজোর ছবি বলতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এটা সেটা....


পুনশ্চ: মহামায়া সিনেমা হলের লোক দেখতে গিয়ে অষ্টমীর দিন রীনাকে দেখেছিলাম। সিনেমা দেখতে এসেছে। দেওয়ানহাট থেকে। মাঝেমাঝে মনে হয়, এখনও কি কোনও কলেজ পড়ুয়া মেয়ে সিনেমা হলে আসে? কোনও কলেজ পড়ুয়া ছেলের সঙ্গে তার কি হঠাৎ দেখা হয়? আর দেখা হওয়া মাত্র পুজোটা কেমন প্রেম প্রেম হয়ে যায়! দারুণ ভাল লাগে আবার বুকটা একটু টনটনও করে!

No comments: