Sunday, September 4, 2022

নিজের ভাবনায়

শৌভিক রায় 



শিক্ষক দিবস এলে খুব বেশি মনে পড়ে বাবা-মায়ের কথা। তাঁরা শিক্ষক ছিলেন। আদতে বীরভূমের মেয়ে, আমার মা, দাদুর কর্মসূত্রে বড় হয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা অনার্স পাস করা সেই মা`কে বিয়ের কয়েকদিন পর দিনহাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে যোগ দিতে হয়েছিল। সৌজন্যে সেই সময়ের পরিচালন সমিতির সদস্যরা। তাঁরা এসে ঠাকুরদাকে ধরেছিলেন মা`কে যাতে চাকরি করতে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সব ফেলে আসা ও  এই দেশে উদ্বাস্তু বনে যাওয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আমার সেই ঠাকুরদা রাজি হয়েছিলেন। 

১৯৫৮ সালে মায়ের চাকরিতে যোগদান। মাইনে ৩৫ টাকা। বাবা তখনও ছাত্র। যে মানুষটিকে বহু মানুষ ব্যঙ্গ করে থাকেন অকারণে, যাঁকে গালিগালাজ না করলে অনেকের নিজেকে `বোদ্ধা` প্রমাণ করতে অসুবিধে হয়, নোবেলজয়ী সেই অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তখন বাবাকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়াচ্ছেন। এম এ পাস করে ১৯৬০/৬১ সালে বাবারও শিক্ষকতার কাজে যোগদান। দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে। কিছুদিন পরে, ১৯৬৭ সালে, বাবা ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক হয়ে চলে যান। মা দিনহাটা ছাড়লেন ১৯৮১তে। মা-ও যোগ দিলেন ফালাকাটায় ওই একই স্কুলে। কলকাতা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও জায়গায় থিতু হতে পারতেন এই দম্পতি। হননি। 

বাবার একটাই স্বপ্ন ছিল, ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়। মাধ্যমিকের সেন্টার, উচ্চ মাধ্যমিক কোর্স, সায়েন্স, আর্টস, কমার্স তিনটে বিভাগ থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের মূল দালানবাড়ি ইত্যাদি সবটাই বাবার আমলে। এর সঙ্গে ফালাকাটার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে জড়িয়ে থাকা। মা ছিলেন বাবার সঙ্গে থাকা নীরব কর্মী। মা না থাকলে বাবার পক্ষে এত কিছু করা সম্ভব ছিল না কোনোদিনই!

এই বিশেষ দিন এলে মনে পড়ে আমার শ্বশুরমশাইকেও। পঞ্চাশের দশকের কলকাতার সিটি কলেজের ছাত্র মানুষটির পূর্বপুরুষেরা বিহার থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন ব্যবসার জন্য। বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ী পরিবারে পড়াশোনার তেমন চল না থাকলেও, মায়ের প্রেরণায় (সত্যিকরেই প্রেরণা। তেলবাজির নয়) তাঁর পড়াশোনা। আমার বাবার মতোই দেশভাগের শিকার হয়েছিলেন শ্বশুরমশাইও। ফল, দেশত্যাগ। চলে যেতে পারতেন বিহারে তাঁর আসল বাড়িতে, যেখানে বাকি সবাই চলে গেল! কিন্তু রয়ে গেলেন এই বঙ্গে। দেওয়ানহাটের মতো ছোট্ট জায়গায়। শিক্ষকতা করে কাটালেন দেওয়ানহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহপ্রধান শিক্ষক প্রয়াত বলিপ্রসাদ সাহা নামের মানুষটি। তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের বিত্ত দেখে চোখ কপালে উঠলেও, তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল নিতান্তই অতি সাধারণ। অথচ তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিয়ে হয়ে যেতে পারতেন অনেককিছুই। হননি।   

মনে পড়ে রামভোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহপ্রধান শিক্ষক প্রয়াত রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। কম্যুইনিজমে দীক্ষা নিয়ে পৈতে ফেলে দিয়েছিলেন। প্রকৃত কম্যুইনিস্টের মতো কোনোদিন শিক্ষক বা ছাত্রদের বিভেদ করেননি। তাঁর কাছে সকলের পরিচয় আগে মানুষ, বাকি তারপর। রাজনৈতিক মতাদর্শে একদম তাঁর বিপরীতে থাকা সর্বজন শ্রদ্ধেয় বাণীকান্ত ভট্টাচার্যও কি এই একই মন্ত্রে দীক্ষিত নন! হা হা হেসে সবাইকে অক্লেশে বুকে জড়িয়ে ধরার ক্ষমতা রাখেন এই মানুষটি। এঁদের দুজনের জীবনযাত্রাও এত সহজ সরল যে কল্পনা করা যায় না। অথচ দুজনেরই ক্ষমতা ছিল ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার। ভুলি কীভাবে ফালাকাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের একদা প্রধানশিক্ষিকা শ্রীমতী মায়া বোসকে? আমার বাবার মতোই তিনিও তিরিশ বছরের বেশি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন। তাঁর সময়ের সেই স্কুলকে ভুলতে পারে কি কেউ! কলকাতার পাটুলিতে, নির্দিষ্ট করে বলতে হয় পঞ্চাশায়রে, ছোটখাটো একটি বাড়ি করে রয়েছেন তিনি।  

এই নামগুলি কেবল সামান্য কিছু  উদাহরণ মাত্র। এই বিশেষ দিন এলেই মনে পড়ে, সেই সব অগুন্তি শিক্ষকদের যাঁরা শহরের প্রচারের আলো থেকে বহু দূরে গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন স্কুলে রয়েছেন। তাঁদের নাম জানা তো দূরে, চিনিও না আমরা তাঁদের। 

অথচ আজ রমরমা কাদের? অনৈতিকভাবে পয়সা দিয়ে ও প্রভাবশালীদের তৈলমর্দন করে বদলি নেওয়া, ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক কেষ্টবিষ্টুদের খুশি রাখার প্রচেষ্টায় নিমগ্ন, নিজের কাজ ঠিকঠাক না করা কিছু মানুষের। আরও বেশি খারাপ লাগে যখন দেখি, এরাই পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে সর্বত্র শিক্ষকতা নিয়ে বড় বড় কথা বলে। শিক্ষা তো পণ্য বহুদিন আগেই হয়েছে। আর এরা সেই পণ্যকে নিয়ে এমন ব্যবসা করেছে যে, পণ্যটি পুঁতিগন্ধময় আবর্জনায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। একদা কোনও একটি নামের সঙ্গে `আয়ন` জুড়ে যে শব্দবন্ধ তৈরি হয়েছিল, আজ সেই `আয়ন`কে যে কতগুলো নামের সঙ্গে জুড়তে হবে ভাবতে অবাক লাগে! এরাই এখন নানা পুরস্কারপ্রাপক। মেলায়-খেলায় এদেরই রাজত্ব। 

কষ্ট হয় অন্যদের জন্য। কোনও স্বীকৃতি নেই তাঁদের। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নিরলস কাজ করে, নিয়মিত পাঠদান করেও তাঁরা ব্রাত্য। তাঁদের কথা কেউ শোনেও না, বলেও না। এঁদের দেখে এক এক সময় লুই ফিশারের গান্ধির কথা মনে পড়ে যায়। ফিশার বলেছিলেন, গান্ধি ব্যর্থ হবেন। হয়েছেন। ফিশারের কথা ফলে গেছে। অবশ্য ফিশার আর একটি কথা বলেছিলেন। গান্ধির নিজের জীবনই একটি শিক্ষা। এই কিছু না পাওয়া শিক্ষকদের দেখে সে কথাই মনে হয়। তাঁদের জীবন সত্যিই একটি শিক্ষা। আপোষ না করার, মেরুদণ্ড সোজা রাখার, অনৈতিক কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত না হওয়ার, মূল্যবোধ নষ্ট না হতে দেওয়ার  শিক্ষা তাঁরা জীবন দিয়েই শিখিয়ে যাচ্ছেন ক্রমাগত। তাঁদের জন্যই শিক্ষক দিবসকে মহান বলতে দ্বিধা হয়না। শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম তাঁদের।  আর সর্বক্ষেত্রে তাঁবেদারী করে নিজের কাজ স্বার্থ সিদ্ধি করা সেইসব মানুষদের জন্য করুণা....        

 

              
    

No comments: