পুজোর আনন্দেও শঙ্কার মেঘ
শৌভিক রায়
(লেখক)
ডুয়ার্সের আকাশে এখন বর্ষা শেষের বৃষ্টি। কখনও মেঘ কেটে গেলে, উত্তর আকাশে ঝকঝকে অনিন্দ্য নীল পাহাড় আর পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। চারদিকের সবুজে ইতিউতি মাথা তুলতে শুরু করেছে সাদা কাশফুলেরা। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে অনাগত ধ্বনি। মা আসছেন!
মা প্রতিবারই আসেন। তাঁর আশায় কেটে যায় সারা বছর। তিনি আসা মানেই অপূর্ব এক আনন্দযজ্ঞ। আর তাতে উদ্বেলিত হয় না, এমন কাউকে পাওয়া ভার। কেননা তিনি স্বয়ং আনন্দমূর্তি, দুষ্টের সংহারক এবং মঙ্গলদাত্রী।
কিন্তু জীবন বড় কঠিন। আর সেই কাঠিন্য আরও বেড়ে গেছে করোনা মহামারীর পর। আমূল বদলে গেছে সবকিছু। সেই পরিবর্তন স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে চামূর্চি আর জয়গাঁয়। উত্তরবঙ্গ থেকে ভুটানে প্রবেশের এই দুই পথ এখন বন্ধ। আগামী ২৩শে সেপ্টেম্বর ভুটান গেট খুললেও কী হবে বোঝা যাচ্ছে না।
চামূর্চির বহু দোকানপাট দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ। বহু ব্যবসায়ী চলে গেছেন অন্যত্র। যারা আছেন তারা বুঝে উঠতে পারছেন না কী করবেন। এখানকার অবস্থা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। অথচ করোনা ও লকডাউনের আগে চামূর্চি ছিল এই অঞ্চলের ব্যস্ততম একটি জায়গা। বড় বড় ট্রাক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের পণ্যবাহী গাড়ির ভিড়ে এগোনই যেত না। রাস্তার দুই ধারের রকমারি দোকানগুলি ক্রেতার ভিড়ে গমগম করত। গেটের ওপারে, ভুটান থেকে মানুষেরা এসে কিনে নিয়ে যেতেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ভারত থেকেও বহু মানুষ যেতেন ওদিকে। আর এখন? সব বন্ধ! বিউটি পার্লারের মালিক রোশনি থাপা বলছেন, 'এরকম হবে কে জানত! অভ্যাস মতো প্রতিদিন পার্লার খুলি। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।' একই অবস্থা প্রায় প্রতিটি ব্যবসায়ীর। ইতিমধ্যে অনেকে আশেপাশের চা বাগানে কাজ নিয়েছেন। অনেকে আবার চলে গেছে ভিন রাজ্যে। তারা বুঝেছেন চামূর্চি গেটের ওপর ভরসা করে পেট চালাবার দিন শেষ!
চামূর্চির মতো দৈন্য দশা না হলেও, অবস্থা ভাল নয় আর এক দুয়ার জয়গাঁরও। কর্মব্যস্ত সেই অতীত জয়গাঁকে আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না! এখানকার গেট সামান্য খোলা ঠিকই। কিন্তু এখনও প্রবেশের অনুমতি নেই। গেট বন্ধ হওয়ার পর থেকে আজ অবধি জয়গাঁ ছেড়েছেন বহু মানুষ। অন্য জায়গায় ভাগ্য অন্বেষণে পাড়ি দিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ, এই এলাকায় বেড়ে গেছে চুরি ডাকাতির সংখ্যাও।
তেইশে সেপ্টেম্বর গেট খুলবার আশ্বাসেও স্বস্তি পাচ্ছেন না জয়গাঁ বা চামূর্চির মানুষেরা। অনেকেই মনে করছেন সাধারণ মানুষের কোনও লাভ হবে না। শ্রমিক বা পণ্য বহনের কাজে যারা থাকবেন, তারা হয়ত ঢুকতে পারবেন। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন যে পয়সা পর্যটককে গুণতে হবে, তাতে কজন আর বেড়াতে আসবেন? ভুটান থেকে এদিকে আসবার ব্যাপারটিও পরিষ্কার নয়। ভুটানিরা আগের মতো স্বচ্ছন্দে আসতে পারবেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। চামূর্চির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। ফলে আতঙ্কিত হয়ে রয়েছেন কমবেশি সকলেই। পঞ্চাশ বছরের ওপর ব্যবসা সামলানো জয়গাঁর প্রবীণ সুরেন্দ্র গুপ্ত অকপট বললেন, `কে আর জানত এমন দিনও দেখতে হবে। জানিনা কী হবে এরপর!`
দোলাচলের এই আবহে শরতের উদার আকাশ আর পুজো পুজো গন্ধ নিয়ে আলাদা উৎসাহ নেই জয়গাঁ ও চামূর্চির সাধারণ মানুষের। অথচ কয়েক বছর আগেও, জয়গাঁ ও সংলগ্ন ফুন্টসেলিং অথবা চামূর্চির গা ঘেঁষা সামচিতে এই সময় ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকত। মাঝের দুটি বছর বদলে দিয়েছে সব। তবু, আর কয়েকদিন পর ভুটান গেট খুলবার ঘোষণা সামান্য হলেও আশার আলো নিয়ে এসেছে। চরম হতাশার মধ্যেও প্রত্যেকেই অপেক্ষা করে আছেন সেই দিনটির। প্রার্থনা করছেন, আবার ফিরে আসুক অতীতের সেই স্বর্ণালী সময়। প্রার্থনা করছি আমরাও। স্বাভাবিক হয়ে উঠুক সব। চামূর্চি আর জয়গাঁকে এভাবে দেখতে অভ্যস্ত নই আমরা। ছন্দে ফিরুক তারা।

No comments:
Post a Comment