Monday, April 25, 2022

 প্রণাম

শৌভিক রায়


এবার সত্যিই বিরক্ত লাগছে! একগাদা প্রণাম করতে হবে এখন....কী মুশকিল! 


কয়েকদিন থেকেই অত্যাচার চলছে সমানে। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দই খাওয়াচ্ছে, ভোরবেলায় ধাক্কা দিয়ে তুলে দিচ্ছে, হলুদ এনে গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছে, দুম করে জল ঢেলে দিচ্ছে... মানে সব মিলে ঝামেলার একশেষ। এত হ্যাপা জানলে ঘণ্টা বিয়ে করতাম! 


বিয়ের দিন তো আরও ক্যাচাল। বলে যে, উপোস থাকতে হবে। ইল্লি আর কী! শুরু করলাম ঝামেলা। কিন্তু হাজার চেঁচামেচি, হুলুস্থূলতেও চিড়ে ভিজল না। এমনকি আমার এতদিনের সব দুষ্কর্মের সঙ্গী ছোট বোনটাও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেল। শেষটায় কমল লুকিয়ে খাবার দিয়ে গেল। তাতে কিছুটা খিদে মিটলেও, ওই ড্রেস পরা ব্যান্ড পার্টির 'তুঝে দেখা তো ইয়ে জানা সনম' আর 'চিরদিনই তুমি যে আমার' অসহ্য লাগছিল। মনে হচ্ছিল সব কটাকে ধরে দিই কয়েক ঘা। নিকুচি করেছে তোর সনমের!


আর এখন সেই মুহূর্ত। খুউব বিরক্তির একটা সময়। চারদিকে দেখতে পাচ্ছি গোটা পাড়া ভেঙে পড়েছে। সব্বাই নাকি আশীর্বাদ করবে। তারপর রওনা। বসিয়েও দিয়েছে বাসরে। প্রণাম করতে হবে নাকি এই গুষ্ঠির লোকদের। কী যন্ত্রণা! পাশে বসে আকুল কেঁদে চলেছে কয়েক ঘণ্টার পুরোনো বউ। কান্না দেখে নিজেকেই শালা অপরাধী মনে হচ্ছে। কেন করলাম বিয়ে! গতকাল থেকেই খুচ খুচ কাঁদছিল। ওদিকে পাড়াতুতো শালীদের ইয়ার্কির চোটে থাকা যাচ্ছিল না, আর এদিকে এর কান্না। মাঝে আমার স্যান্ডুইচ দশা। বয়স্করা কেউ কেউ তো এসে বাবাজি, বাবাজীবন বলে এমন ভাব করছিল যেন কতদিনের শ্বশুর সব! উফফ। রাগে গা রি রি করলেও সুবোধ জামাইয়ের মতো হে হে করা ছাড়া কোনও উপায়ও ছিল না! 


যাহোক, কী আর করা। বাঁধা পড়ে গেছি। দাদাকে দেখি দূরে দূরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইশারায় সামনে আসতে বললাম। কানে কানে বলে গেল, 'কান্না দেখলে আমারও কান্না পায় রে। দূরেই থাকি।' বদমাশ বোনটা দেখি ফিক ফিক করে হাসছে। ভাবখানা এই, 'বোঝ এবার!' সর্বময়ী কর্ত্রী সেজ কাকিমা মুখে পান দিয়ে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যাতে কোনও ঝামেলা না পাকাই। কী আর করি। এটাই শেষ পর্ব ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।


প্রথমেই পিসে শ্বশুর ও শাশুড়ি। অতি সজ্জন মানুষ দুজনেই। অর্থবান। প্রণাম করলাম। একটা সোনার আংটি পরিয়ে দিলেন অনামিকায়। পকেট থেকে টাকা বের করে দিলেন। বউকেও আংটি আর টাকা দিলেন। তো তিনি এমনই কান্নায় ব্যস্ত যে, আংটি পরলেও টাকা নিতে পারলেন না। আমিই নিলাম। 


এলেন কাকি শাশুড়ি। একই কেস। টাকা ও আংটি। আমার টাকা ও আংটি যথাস্থানে, তার টাকা আমার পকেটে। পরের জন এক সম্বন্ধী। এবারেও পুনরাবৃত্তি। কেমন একটু গোলমেলে লাগল। হচ্ছেটা কী? টাকা আর আংটি দিচ্ছে কেন রে বাবা! 


এর পর আরও দুই তিনজন এলেন। আংটি জুটল না ঠিকই, কিন্তু টাকা পাওয়া গেল। তার টাকা আমি দায়িত্ব নিয়ে রাখছি নিজের কাছে। মোটামুটি ছয় সাতজনের পরে ব্যপারটা বুঝলাম। এরা আশীর্বাদের সঙ্গে টাকাও দিচ্ছেন। যারা পারছেন তারা আংটি বা অন্য কিছুও সঙ্গে দিচ্ছেন। 


মুহূর্তে দিল খুশ। সব বিরক্তি কেটে গেল। মনে হল আবার উপোস করি। ব্যান্ড পার্টিকে বলি ঝম্পর ঝম্পর আরও বাজাক। ভীষণভাবে চাইলাম, শুধু এই পাড়া কেন....সারা শহর আসুক। প্রণাম করবই। কাউকে বাদ দেব না।


 উফফ, পাঁচ মিনিটে কালেকশন সাড়ে তিন হাজার টাকা। আমার মায়না তখন ৩২০০ টাকা (১৯৯৬ সাল)। আহা কী আনন্দ। এই জন্যই এভাবে বিয়ে করতে হয়। ইসস...আয় আয়, লগন বয়ে যায়, বুক গুড় গুড় করে নোটের তাড়নায়...


শেষমেষ কত পেলাম সেটা বলব না। পর্ব শেষ হলে, মেজকাকুকে বাসরটা নাড়িয়ে দিতে বলা হল। তিনি সেটা করা মাত্রই তাঁর হাতেও টাকা গুঁজে দেওয়া হল। কাকুর মুখে সেকি প্রসন্নতা! আহা। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি, দাদা কান্নাটান্না ভুলে কাছাকাছি পায়চারি করছে। বুঝলাম খুব আশা করছে বেচারা যদি কিছু কাজ পায়!!


( বি দ্রঃ: তিনি কয়েকদিন পরে তার ভাগের টাকাগুলো চেয়েছিলেন। দিই নি। কেন দেব? কে ওত কাঁদতে বলেছিল? পনেরো কিমি আসতে না আসতেই তো বোনের সঙ্গে হ্যা হ্যা হি হি শুরু হয়ে গেছিল আর প্ল্যান চলছিল কীভাবে সারা জীবন প্যাঁচ মারা যায়!)


(বোকামির এককাল)

Thursday, April 21, 2022



স্বপ্ন পূরণ 
শৌভিক রায় 

স্বপনের সঙ্গে দেখা হওয়া ইস্তক পূর্ণর মেজাজটা বিগড়ে আছে! প্রথমটায় খুব ভাল লাগছিল। সেই কতদিন পর দেখা! ইউনিভার্সিটি ছেড়েছে বছর তিরিশ হল। দুজনেরই বিয়ের পর  একবার দেখা হয়েছিল ঠিকই, তবে সেও কম দিন হল না! 

বহুদিন পর দেখা হলে যা হয়। প্রথমটায় হৈ হৈ, কে কতটা বুড়ো হল, কার বুকে স্টেন বসল, কে কোথায় বাড়ি করল ইত্যাদি পর্ব শেষ করে মাঝবয়সের নিয়ম অনুসারে কার ছেলেমেয়ে কয়টি ও কে কী করছে ইত্যাদিতে এসে পূর্ণর তাল কাটল। স্বপন বলে কী! মাসে পঁয়তাল্লিশ লাখ! তাকে ঝেড়েঝুড়ে সাগর দিঘির ঠান্ডা জলে ফেলে দিলেও মেরেকেটে পনের থেকে কুড়ি লাখ পাওয়া যেতে পারে। তার নিজের আর বৌয়ের প্রফিডেন্ট ফান্ড মিলিয়ে আরও বড়জোর লাখ পনের। অর্থাৎ সব মিলে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ। এর বেশি কিছুতেই নয়! আর স্বপন বলছে পঁয়তাল্লিশ লাখ। তাও আবার একমাসে। পঁচিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করে সে এখনও এক লাখে পৌঁছতে পারে নি।  বৌয়ের  মায়না ধরেও লাখ দেড়েক এখনও বহুদূর। আর এ একেবারে পঁয়তাল্লিশ লাখ! এক মাসে! কত বছরের চাকরিতে? চার মাসের। যে পাচ্ছে এই বিপুল অঙ্কটা তার বয়স মেরেকেটে তেইশ! পূর্ণর অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা একেবারে।

স্বপনের ছেলে পড়াশোনায় ভাল সেটা সে আগেই শুনেছিল আর এক বন্ধুর মুখে। কিন্তু তাই বলে ইঞ্জিনিয়ারিং করে এত লক্ষ টাকার চাকরি পেয়ে যাবে সেটা কোনোদিনই ভাবে নি। বিদেশী কোম্পানি নাকি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে যে দুজন বি. টেক-এর ছাত্রকে  এই বিরাট অঙ্কে, স্বপনের ভাষায় 'তুলে নিয়েছে', তার মধ্যে ওর ছেলে একজন। এরপরেও স্বপন বলছে যে, ওরা নাকি খুশি নয়। ওরা চেয়েছিল ছেলে আরও লেখাপড়া করুক, এম এস করে আসুক জি আর ই দিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্বপন আর আগের জায়গায় নেইও এখন। ওখানকার ফ্ল্যাট বিক্রি করে কলকাতার নিউটাউনে চলে গেছে। পোস্টিং নিয়েছে ওখানেই। এখানে এসেছে প্রায় দুই বছর বাদে মা কে দেখতে! 

সব জেনে পূর্ণর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল! স্বপনেরও ছেলে আর তারও ছেলে। একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। শুধু বিষয়টা আলাদা। কিন্তু ওদেরও ক্যাম্পাসিং হয়। আর এখানেই এক পালা গান। তার ছেলে কিছুতেই ক্যাম্পাসিংয়ে বসবে না। ধনুক ভাঙা পণ করে আছে যে, কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি করবে না! কেন রে বাপু? কর্পোরেটরা এখন দুনিয়া চালায়। তুই কে কোথাকার যে তাদের চাকরি করবি না? বুঝিয়ে, রাগ করে, কথা না বলে, এমন কি মরে যাওয়ার ভয় দেখিয়েও ছেলেকে বাগে আনতে পারে নি পূর্ণ। চোখের সামনে সে দেখতে পাচ্ছে ছেলের সহপাঠীরা একে একে ক্যাম্পাসিং থেকে চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তার ছেলে কেবল গিটার নিয়ে টুংটুং করছে। চেতনার গান গাইছে! যেন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবার ঠিকে নিয়ে রেখেছে! যত্তসব। 

বাড়ি ফিরে পূর্ণর সব রাগ পড়ল বৌয়ের ওপর। মায়ের জন্যই ছেলের এই অবস্থা। কিছুই বলে না ছেলেকে। যা করছে করুক আর কি! এভাবে চলে নাকি। তার বুকনিতে বৌ আজ চুপ করে থাকল। পাল্টা কিছু বলল না।  জবাব না পেয়ে একসময় থেমে গেল পূর্ণ। অন্যদিনের চাইতে খানিকটা আগেই রাতের খাবার  খেয়ে শুয়েও পড়ল। বৌ দেখল সবটাই। কিন্তু কিছু বলল না।  

আচমকা ফোনে ঘুম ভেঙে গেল পূর্ণর। অচেনা নম্বর। ফোন তুলতেই মহিলা কণ্ঠ,
- দাদা আমি স্বপনের বৌ বলছি। ও বলল আজই আপনার নম্বর নিয়েছে। দাদা বিপদে পড়েছি। ওর হঠাৎ বুক ব্যথা। বুঝতে পারছি না কী করব! 

ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল পূর্ণর। কী বলবে, না বলবে বুঝতে না বুঝতেই ছেলে এঘরে হাজির। এত রাতে ফোন শুনে অন্য ঘর থেকে ছুটে এসেছে। পুজোর বন্ধে এসেছে। ফেরার সময় হয়ে এলো। বাবার কাছে সব শুনে দৌড়ল সে। দুই একজন বন্ধুও জুটিয়ে নিল।

তারপর যা হয়। নার্সিং হোম, আই সি ইউ। কয়েকদিন যমে মানুষে টানাটানি। তাদের ছোট শহরে যতটা সম্ভব চিকিৎসা করে স্বপন শেষটায় উড়ে গেল ব্যাঙ্গালোর। যাওয়ার আগে পূর্ণর হাত ধরে কী কান্না আর কী কান্না। ওর বৌ তার ছেলের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে আদর। চোখ ছলছল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বারবার। কলকাতায় বেড়াতে যাওয়ার আবেদন। স্বপনের ছেলেও ফোনে দুবেলা নানা কথা। ও বেচারা আসতে পারেনি। নতুন চাকরি। অফিস ছাড়ে নি। তার ওপর ওসলো কি আর এখানে!

ছুটি শেষে ছেলেও ফিরে গেল। পূর্ণ এবারও বোঝালো, রাগ করল, রীতিমত হুমকি দিল। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল যে, এবারে তার বোঝানোতে‌ সেই আগের জোর ভ্যানিশ। ছেলের চোখে চোখ রাখলেই মনে হচ্ছিল ছেলে যেন  হাসছে।

সপ্তাহ খানেক পর ছেলের ফোন এল। পি এইচ ডি-তে নিজের ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ান একটা কোম্পানিতে মাসে ছাব্বিশ লাখে চাকরি পেয়েছে। দুই তিন বছর পরেই সে টাকা বহু বেড়ে যাবে। তবে থাকতে হবে মেলবোর্নে। 

ছেলে বাবার ওপর ছাড়ল সব। বাবা যা বলবে সে সেটাই করবে।

এরপর থেকে পূর্ণ ভেবে চলছে। মুশকিল হচ্ছে একটাই। ভাবতে গেলেই স্বপন আর ওর বৌয়ের মুখটা বারবার ভেসে উঠছে। নিজের বৌয়ের দিকে তাকালো সে। বৌয়ের মুখে হাসি ঠিকই। তবে চোখে জলও যেন দেখল পূর্ণ !

(প্রকাশিত: মানসাই/ সারস্বত উৎসব ২০২২)




 

মডেল নং- 125/LXXI
শৌভিক রায়
তিনটে বাজবার ঠিক তিন মিনিট আগে দাড়িওয়ালা লোকটি বেরিয়ে এলো। তিনটে বাজতেই গঙে তিনটে আঘাত। বোঝা গেল তিনটে বেজে গেছে। আর অপেক্ষা নয়। সময় ঘোষণা করেই আবার সে চলে গেল ভেতরে। কামারের মতো চেহারার আর একজন লোক না থেমে সেকেন্ডের কাঁটা বাজিয়ে চলছিল অনবরত।
ব্যাপারটা আদতে এমন কিছু নয়। কিন্তু যদি দাড়িওয়ালা লোকটি এবং তার সঙ্গী হয় খেলনা পুতুল তবে তো একটু থমকাতেই হয়!
থমকে ছিলাম। থমকে থেমে বসে পড়েছিলাম সামনে রাখা চেয়ারে। আর তারপরেই সেই দৃশ্য। আসলে দাড়িওয়ালা লোকটি ও তার সঙ্গীর আবির্ভাব হয় একটি ঘড়ির ভেতর থেকে প্রতি ঘন্টায়। সময় ঘোষণা করে তারা অদৃশ্য হয়ে যায় পরের ঘন্টায় আসবে বলে। অদ্ভুত এই ঘড়িটি রাখা আছে হায়দ্রাবাদের সালার জং মিউজিয়ামে।




ঊনবিংশ শতকে নির্মিত ইংল্যান্ডের কুক এন্ড কেলভি কোম্পানির এই ঘড়িটি বিংশ শতকের প্রথম দিকে তৃতীয় সালার জং নবাব মীর ইউসুফ আলী খান নিজের মিউজিয়ামের জন্য সংগ্রহ করেছিলেন। ঘড়িটির ৩৫০-এর অধিক যন্ত্রাংশ বিলেতে তৈরি হলেও সেগুলি কিন্তু জোড়া লেগেছিল কলকাতা শহরে। ইংলিশ ব্র্যাকেট ক্লক নামে পরিচিত এই মিউজিক্যাল ঘড়িটি সালার জং মিউজিয়ামের তো বটেই, ভারতের অন্যতম গর্ব। পনের মিনিট পর পর সময় জানানোর পাশাপাশি ঘড়িটিতে দিন, তারিখ ও মাস প্রদর্শনের তিনটি ডায়াল রয়েছে।


 

মিস্ত্রির জোগানদার থেকে মা
শৌভিক রায়
রাজমিস্ত্রির সঙ্গে জোগানদারের কাজ করতে আসা অল্পবয়স্ক ছেলেটির হাবভাব দেখে সন্দেহ হচ্ছিল। চেপে ধরতেই সত্যটা বেরিয়ে এলো। বছর চোদ্দ-পনেরোর ছেলেটি আসলে আমারই প্রাক্তন ছাত্র!
দুর্ভাগ্য, যে বয়সে ওর নবম বা দশম শ্রেণিতে থাকবার কথা, সে সময়ে ওকে `প্রাক্তন' বলতে যত খারাপই লাগুক না কেন, বাস্তব এটাই। প্রান্তিক পরিবারের এই ছাত্রটির পড়াশোনার ক্ষেত্রে এমনিতেই বহু সমস্যা ছিল। আর সেই সমস্যার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে গেছে করোনা অতিমারি। ফলে 'লেখাপড়া' নামের বিলাসিতায় গা না ভাসিয়ে ছেলেটি নিজে ও তার পরিবার জোগানদারের এই কাজটিকেই শ্রেয় মনে করেছে।
আমাদের স্কুলের এই ছাত্রটিই শুধু নয়, কোচবিহার সহ উত্তরবঙ্গের প্রত্যেকটি জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে একটু উঁকি দিলে এই ছবিই ধরা পড়বে। মনে পড়ছে দিনহাটা আদাবাড়িঘাটের কাছের এক বিদ্যালয়ের ছাত্রের কথা। লকডাউনের আগে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া সেই ছাত্রটিকে আর বিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে না। এমনিতেই ছাত্রটি ইঁটভাটায় কাজ করে বলে একটা আভাস আগে থেকেই ছিল। এখন তার বিদ্যালয়ে না আসা সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণিত করেছে।
এই ছাত্রটিকে মনে রাখবার বিশেষ কারণ ছিল তার আঁকা ও লেখার হাত। ছোট ছোট ছড়া আর তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আঁকা ছবি তাক লাগিয়ে দিত শিক্ষক-ছাত্র সবাইকেই। সেই ছোট্ট ছাত্রটির হাত এখন ইঁটের বোঝা বইছে! আরও দুর্ভাগ্য, তাকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনবার বিভিন্ন প্রচেষ্টা শেষ অবধি সফল হয়নি।
একই অবস্থা তুফানগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। দিন-দিন বেড়ে চলেছে বিদ্যালয় ছুটের সংখ্যা। এরকমই এক প্রাক্তন ছাত্র, বর্তমানে কেরালে কাজ করা শ্রমিকের। বলছিল, 'লকডাউনের আগে থেকে সংসারে টানাটানি ছিল। সেটা অনেক অংশেই বেড়ে যায় সেই সময়। স্কুল থেকে মিড-ডে মিলের সরঞ্জাম পেলেও সেটা যথেষ্ট ছিল না।' অগত্যা পড়াশোনায় ইতি টেনে করোনা নিয়মবিধি সামান্য শিথিল হতেই সে পাড়ি দিয়েছে ভিন রাজ্যে।
এই কয়েকটা ঘটনাকে ব্যতিক্রম মনে করা হলে ভুল করা হবে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যালয়-ছুটের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এই মুহূর্তে রীতিমতো উদ্বেগজনক। অতিমারির আগে কোচবিহার জেলার বিদ্যালয় ছুটের হার ছিল ০.১৩, জলপাইগুড়ির ক্ষেত্রে তা ছিল ০.১১। দার্জিলিং সেদিক থেকে কিছুটা ভাল জায়গায় থাকলেও (০.০৯), দিনাজপুর ও মালদায় সেই হার ছিল যথাক্রমে ০.১৫ ও ০.১৭। সেই সময়ে রাজ্যের গড় হারের ছিল ০.১৫। আর এই মুহূর্তে রাজ্য গড় বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উত্তরের জেলাগুলির বিদ্যালয় ছুটের হার।
ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ বেসিক এন্ড অ্যাডভান্স রিসার্চ'-এর একটি সমীক্ষা বলছে, শহরের হিসেবে রাজ্যে বিদ্যালয় ছুটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে শিলিগুড়ি। পিছিয়ে নেই উত্তরের অন্যান্য শহরগুলিও। সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া মাধ্যমিক পরীক্ষায় অনেক বিদ্যালয়ে `টোটাল এনরোলমেন্ট`-এর তুলনায় যেমন কম সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফর্ম ফিল আপ করেছে, তেমনি ফর্ম ফিল আপের পর পরীক্ষায় না বসা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও কম নয়। চলতে থাকা উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা এতটাই যে, খবরের কাগজের শিরোনাম হয়েছে সেটি। এই ক্ষেত্রে উত্তরের সব জেলার অবস্থা কমবেশি এক।
বিদ্যালয় ছুটের এই চিত্রে মেয়েদের অবস্থাটি অতিমারির আগে তুলনায় খানিকটা ভাল ছিল। সেই সময়ে বিদ্যালয় ছুট মেয়েদের হার ছেলেদের তুলনায় কম বা সমান সমান ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের দশা সত্যি করুণ। সমীক্ষা বলছে, উত্তরের চা-বলয়ে মেয়েদের বিদ্যালয় ছুটের পরিমাণ ৬৭ শতাংশ। বিদ্যালয় থেকে প্রত্যেক মাসে প্রদত্ত মিড ডে মিল, কন্যাশ্রী সহ অন্যান্য বিভিন্ন সুযোগসুবিধাও আটকাতে পারে নি এই ভয়াবহ অবস্থাকে। সম্প্রতি চা-বাগানের অভিভাবকদের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
স্কুলে না আসা প্রথম স্থানাধিকারিনী ছাত্রীটির খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেছি, তার বিয়ে হয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার অতি অল্প বয়সে মায়ের দায়িত্ব পালন করছে। আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এরকম ছাত্রীর সংখ্যা কম নয়। ক্রান্তি অঞ্চলের এক ছাত্রীর পড়বার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয় নি বাড়ির চাপে। তার অভিভাবকের আয় এতটা কমে গিয়েছে যে, সে শেষ পর্যন্ত বিয়ে আর লেখাপড়ার মধ্যে প্রথমটিকে বেছে নেয়। একই অবস্থা মেখলিগঞ্জের তিনবিঘার এক ছাত্রীর। তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জানা গেল, সে ইতিমধ্যে মা হয়ে বাচ্চা সামলাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও চাকরির অনিশ্চয়তা বিদ্যালয় ছুটের মূল কারণ হলেও, আরও কিছু কারণ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। যেমন ধরা যাক 'ডিজিটাল ডিভাইড`-এর বিষয়টি। আধুনিক কারিগরি বিদ্যা ব্যবহারের পার্থক্যকে `ডিজিটাল ডিভাইড` হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অতীতে 'ডিজিটাল ডিভাইড' বলতে বোঝাত টেলিফোন ব্যবহারকারী এবং টেলিফোন ব্যবহার না করা মানুষজনের পার্থক্যকে। বর্তমানে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে ব্রডব্যান্ড, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সঙ্গে, সেসব যারা ব্যবহার করে না বা করবার অবস্থায় নেই তাদের।
করোনার সময় অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়ায় ইতি টানা ফালাকাটা ব্লকের এক বাদামবিক্রেতা কিশোর স্পষ্ট জানালো, 'অনলাইনে ক্লাস চলছিল। কিন্তু একটা ক্লাস হলেই সেদিনের মতো ডাটা শেষ হয়ে যায়। অন্য ক্লাস করব কীভাবে? এমনিতেই বাবার কাজ ছিল না সেসময়। মা বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজ করছিল। তাতে কি আর সংসার চলে?` এখন সেই অবস্থা নেই, কিন্তু তবু কেন বিদ্যালয়ে না যাওয়ার কারণ হিসেবে সে জানালো, 'লেখাপড়ার মধ্যে না থাকায় ইতিমধ্যে সে এতটা পিছিয়ে গেছে যে, তার পক্ষে আর অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়।'
আলিপুরদুয়ার জেলার বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) আহসানুল করিমের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলছিলাম। তিনি বলছিলেন, ' শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের বিরাট ফারাকের ফলে শিক্ষার সমবন্টন অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বহু শিক্ষার্থী অচিরেই লেখাপড়ায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। নাম লেখাচ্ছে বিদ্যালয় ছুটের দলে।'
উত্তরের বহু বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা একটি সাধারণ ঘটনা। উৎসশ্রীতে বদলি হওয়ার আগে থেকেই সরকারি বা সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ে বহু শিক্ষকের পদ ফাঁকা ছিল। ছিল না বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক। ফলে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়তে না পেরে উৎসাহ হারিয়েছে বহু শিক্ষার্থী। পারিবারিক অনটনে তারা অন্যত্র ভর্তিও হতে পারে নি। ফল, বিদ্যালয় ত্যাগ। সম্প্রতি উৎসশ্রীতে বহু সংখ্যক শিক্ষক গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে বদলি নিয়ে চলে আসায়, বহু বিদ্যালয়ে প্রায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বহু বিষয়ের শিক্ষক যেমন নেই, তেমনি পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে সপ্তম বা অষ্টম পিরিয়ড অবধি বিদ্যালয় চালানোই সমস্যা হয়ে পড়ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। তারা বিদ্যালয় ছাড়ছে।
অতি সম্প্রতি দিনহাটা মহকুমার এরকমই এক বিদ্যালয় ছুট ছাত্রী বলল, 'কীভাবে কী করব? আমাদের স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা বদলি নিয়ে চলে গেলেন। আমার প্রিয় বিষয় পড়ানোর মতো কেউ আর নেই। আশেপাশেও এমন কেউ নেই, যার কাছে বিষয়টি বুঝব। এদিকে দিনহাটায় কলেজ মাত্র একটিই। খুব ভাল রেজাল্ট করতে না পারলে সেখানে ভর্তিই হতে পারব না। এর চাইতে মায়ের সঙ্গে বিড়ি বাঁধাইয়ের কাজে নেমেছি। সংসারের খরচে অন্তত কিছু সাহায্য করতে পারছি। এটা ঠিক, বাড়ির কেউ চায় নি পড়া ছেড়ে দিই। কিন্তু যদি নিজের পছন্দের বিষয় পড়তেই না পারি তবে শুধু শুধু স্কুলে গিয়ে করবটা কী?`
বিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকায় বরাবর দেখেছি পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ছাত্রের সংখ্যা অষ্টম শ্রেণিতে কমে যায়। মাধ্যমিকের পর সেই সংখ্যা আরও কমে। তবে যেভাবে দিন দিন বিদ্যালয় ছুটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। আর এর চাইতেও মারাত্মক হল, এই বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনও তথ্য কারও কাছে নেই। বিদ্যালয়ের নিজের বা কোনও কোনও শিক্ষকের একক উদ্যোগে কিছু শিক্ষার্থীকে আবারও বিদ্যালয়মুখী করা গেলেও, সেটি খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতোই নগণ্য। খুব দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে সেদিন আর দূরে নেই যেদিন পরিকাঠামো থাকবে, কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করবার মতো পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী থাকবে না।
(লেখক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)

১৭ এপ্রিল, ২০২২, উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এর উত্তর সম্পাদকীয়






নেই রাজ্যের বাসিন্দা হওয়ার ভয় জয়ন্তীজুড়ে
শৌভিক রায়
এখানে নদীর তীরে দাঁড়ালে ওপারের সবুজ পাহাড়ে মন হারিয়ে যায়। কখনও দূর থেকে ভেসে আসে ময়ূরের ডাক। সবাইকে চমকে দিয়ে পরিবার সমেত গজরাজ রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে চলে যায়। এখানকার শান্ত নির্জন পরিবেশ একান্ত বেরসিক মানুষকেও কাব্যিক করে তুলতে পারে। মনে হয় এখানেই থেকে যাই সারাটা জীবন। কিন্তু, পর্যটন মানচিত্রে উত্তরের রানি বলে পরিচিত জয়ন্তীর বাসিন্দাদের সেই সৌভাগ্য হচ্ছে না। কেননা রেভিনিউ ভিলেজের মর্যাদা হারিয়ে প্রতি মুহূর্তে তারা নিজ বাসভূমে পরবাসী হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন। ওখানে ঘুরে এসে এমনই আক্ষেপ শোনা যায় বারবার।
বাদশা আকবরের আমলে মন্ত্রী রাজা টোডরমল সৃষ্ট রেভিনিউ ভিলেজের ধারণাটিকে মারাঠারা একটি স্পষ্ট রূপ দিয়েছিল। পরবর্তীতে সূচারুভাবে সেটিকে প্রয়োগ করে ব্রিটিশরা। ১৮৬৫ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের পর ১৮৮৮ সালে এডওয়ার্ড ডালটনের সুপারিশে তদানীন্তন ভারত সরকারের বিদেশ দপ্তর ভুটানের কাছে থেকে ১০০০০ টাকার বিনিময়ে ২১.৪৩ বর্গমাইলের জয়ন্তী ল্যান্ডস বা জৈনতি কিনে নিয়েছিল। সময়ের হাত ধরে হাতি কেনাবেচার কেন্দ্র থেকে জয়ন্তী ক্রমশ হয়ে উঠেছিল উত্তরের অন্যতম ব্যস্ত জনপদ। এখানকার খনিজ আর বনজ সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে সঙ্গে সারা ভারতের মানুষ বসতি স্থাপন করেছিলেন। চালু হয়েছিল রেলপথ। নদীর ওপর তৈরি হওয়া ব্রিজের সাহায্যে অসমের সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। ঘন হয়েছিল মনুষ্যবসতি।
অবস্থা পাল্টে যেতে লাগল ১৯৮৩ সালের পর থেকে। বক্সার অরণ্য ন্যাশনাল টাইগার রিজার্ভ ঘোষিত হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেল রেলপথ সহ ডলোমাইট কারখানা। নদীবক্ষ থেকে পাথর তোলাও নিষিদ্ধ হল কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে। ফাঁকা হতে লাগল জয়ন্তী। অবশ্য এত কিছুর পরেও জয়ন্তী রেভিনিউ ভিলেজের মর্যাদা হারায় নি অন্তত ২০১৪ সাল অবধি। তখনও পর্যন্ত জুডিশিয়াল লিস্টে গ্রামের নাম্বার ছিল ৪৫। কিন্তু ২০১৫ থেকে জয়ন্তী নামের পরিবর্তে বক্সা ফরেস্ট পানবাড়ি খন্ড হওয়ায় এখানকার বাসিন্দারা আজ জমির পাট্টা এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত। ভোটার বা আধার কার্ডেও `জয়ন্তী' উল্লেখ করা যাচ্ছে না বলে, গ্রামটির অস্তিত্বই বিপন্ন। অথচ রেভিনিউ ভিলেজে পরিণত হতে হলে যে শর্তগুলি দরকার তার সবকিছুই রয়েছে এখানে। বারোশোর ওপর বাসিন্দা, বিদ্যালয়, পাকা সড়ক, সরকারি দপ্তর ইত্যাদির পাশাপাশি জয়ন্তীতে রয়েছে পি ডব্লু ডি, পি এইচ ই, সি ই এস ই, পর্যটন বিভাগ ও বনবিভাগের বাংলো, কমবেশি ৩৬টি হোম স্টে। অন্যদিকে, জাতীয় উদ্যান ঘোষণা হওয়ার সময়েও সরকারি নির্দেশে জয়ন্তীকে ৩৭ একর কোর এরিয়ার বাইরে রাখবার কথা বলা হয়েছিল। আবার অতি সম্প্রতি বনবিভাগ গ্রীন ট্রাইবুনালে হলফনামা পেশ করেও একই কথা বলেছে। এমনকি ২০১৫ সালে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী তদানীন্তন ডি এম এলিজ ভ্যাজকে জমির পাট্টা দিতে বলে গেছেন। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এখানকার বাসিন্দারা একই তিমিরে রয়ে গেছেন।
তাই সকল জয়ন্তীবাসীই তাই আজ ভীত। প্রবল জলকষ্টের সঙ্গে সঙ্গে অচিরেই উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছেন তারা। কেউই নিশ্চিন্ত করে বলতে পারছেন না, নেই রাজ্যের বাসিন্দা হবেন না তারা!
(লেখক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)

২২ মার্চ, ২০২২, উত্তরবঙ্গ সংবাদ






উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও উত্তরবঙ্গে 'ব্রেন ড্রেন` অব্যাহত
শৌভিক রায়


উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্বেও উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশের এই রাজ্য বা দেশের অন্যত্র যাওয়ার প্রবণতা কিছুতেই কমছে না। এক দশক আগেও উত্তরবঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। বর্তমানে মালদা থেকে শুরু করে কোচবিহার পর্যন্ত শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ইত্যাদি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। রয়েছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বেড়েছে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ল কলেজ, বি এড কলেজ ইত্যাদির সংখ্যাও। কিন্তু আটকানো যাচ্ছে না শিক্ষার্থীদের বাইরে পড়তে যাওয়ার প্রবণতাকে!

এর প্রধান কারণ হিসেবে কর্মসংস্থানের অভাবকেই দায়ি করা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য অংশের চাইতে উত্তরবঙ্গ অনেকটা পিছিয়ে। সরকারি-বেসরকারি কিছু অফিস আদালত থাকলেও, কর্মসংস্থানের ব্যাপারে উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক চিত্রটি নিতান্তই হতাশার। আজকের দিনে কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষে `ক্যাম্পাসিং`অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তরের দুই-চারটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদে আর কোথাও এই ব্যাপারটি দেখা যায় না। ফলে, এখানকার মেধাবী শিক্ষার্থীরা অন্যত্র পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে।

উত্তরের পড়ুয়াদের বাইরে চলে যাওয়ার আর একটি কারণ হল, শিক্ষক- শিক্ষার্থী অনুপাতের বিরাট পার্থক্য। সেটি এতটাই যে, শিক্ষার সমবন্টন আদৌ সম্ভব নয়। প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এই চিত্রটি সর্বত্র এক। ফলে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকরা কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে বাইরে পড়তে যাওয়াই ভাল মনে করছেন।

শিক্ষা পরিকাঠামোর হাল বাংলার এই অংশে কেমন? এককথায় অত্যন্ত শোচনীয়। উত্তরের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নির্ভর করছে গুটিকয়েক কর্মীর ওপর। বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় প্রতি জেলাতেই প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষা পরিকাঠামো ধুঁকছে। যারা শিক্ষার হালহকিকত সম্পর্কে সামান্য ওয়াকিবহাল, তারা এখানকার উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কেননা তারা জানেন যে, অপ্রতুল শিক্ষক, অবৈজ্ঞানিক শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, অনুপযুক্ত শিক্ষা পরিকাঠামোর ফলে তাদের লক্ষ্য সফল হবে না। তার চাইতে, একটু কষ্ট হলেও বাইরে চলে যাওয়া ভাল।

এমনিতে সাবেকি ঘরানার পড়াশোনার সেই চিত্রটিও আজ আর নেই। এখন দর্শন নিয়ে পড়বার পর রিপ্রোডাকটিভ হেলথ বা মিডিয়া সায়েন্স নিয়েও রিসার্চ করা যায়। `ওপেনিং' বলতে যা বোঝায় তা অনেকটা পরিব্যাপ্ত। কিন্তু উত্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি এই ব্যাপারেও অনেকটা পিছিয়ে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিলেবাসে কিছু পরিবর্তন এলেও, তা যৎসামান্য। তাই একটু অন্যরকম পড়াশোনার কথা যারা ভাবছে, তাদের পছন্দের তালিকায় উত্তরবঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির নাম দেখা যাচ্ছে না।

আর একটা দিক।জোগানের তুলনায় চাহিদা কম হওয়ায় কারিগরি শিক্ষাও কাজে আসছে না। আগে আলাদা আলাদা পেশায়, আলাদা আলাদা মানুষ দেখা যেত। কারিগরি বিষয়ে এখন একই মানুষকে আলাদা আলাদা পেশায় দেখা যাচ্ছে। ফলে, উত্তরের ছোট আয়তনের জেলাগুলিতে কাজের সুযোগ সেভাবে তৈরী হচ্ছে না। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কারিগরি প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা যুগোপযোগী পড়াশোনার জন্য চলে যাচ্ছে অন্যত্র।

উপযুক্ত পরিকাঠামো-সহ এই সমস্যাগুলির দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান না হলে উত্তরের 'ব্রেন ড্রেন' অদূর ভবিষ্যতে কমবার কোনও উপায় নেই। ফলে, পিছিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গ রয়ে যাবে সেই একই তিমিরে।

(লেখক কোচবিহার নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)

২৯ জানুয়ারি, ২০২২, উত্তরবঙ্গ সংবাদ

 


রঙালি বিহু ও কুশান নৃত্যগীত
শৌভিক রায়
কেউ কেউ মনে করেন, কুশান নৃত্যগীত রামায়ণের লব কুশের থেকে সৃষ্টি। কেননা তাঁরা দুজনই প্রথম `বাল্মীকি রামায়ণ` প্রচার করেছিলেন বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে। 'কুশ' থেকে তাই কুশান কথাটি এসেছে। আজকের কুশান গানেও `রামায়ণ` বর্ণিত হয় এবং আরও কিছু মত রয়েছে এই গানের উদ্ভব নিয়ে। অনেকে বলেন, ১৫ শতকে কোচ রাজারা যখন অসম ও বাংলায় রাজত্ব করছেন, তখন এই গানের সৃষ্টি। তাঁদের বিশ্বাস কোচ থেকে `কুশান` শব্দটি এসেছে।





গানের উৎপত্তি নিয়ে যে মতই থাকুক না কেন, পশ্চিম অসমের গোয়ালপাড়া জেলার অত্যন্ত প্রিয় লোকনৃত্য হিসেবে এই গান ও নাচের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। তবে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, বিহারের পূর্ণিয়া, মেঘালয়ের পশ্চিমে, নেপালের ঝাপা, ভুটানের টুচি ও বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলাতেও এই নৃত্যগীত যথেষ্ট পরিচিত। রামায়ণের ওপর ভিত্তি করে অধ্যাত্মিক লোকনৃত্যগীত একে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। রঙালি বিহুতে এই গান দর্শক শ্রোতার মনোরঞ্জনের জন্য নাচের সঙ্গে গাওয়া হয়ে থাকে। কোনও মঞ্চ ছাড়াই, বৃত্তাকারে, কোনও খোলা জায়গায়, মূল বা গীদাল বা কুশানী, পালি বা পাইল, দোহারী, বায়ন বা বাইন ও পুরুষ বা মহিলার ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হয় এই নৃত্যগীত।




সম্প্রতি গোয়ালপাড়ার কাছে রঙালি বিহুর উৎসবে, আড়ম্বরহীন এক ক্ষুদ্র আয়োজনে, একেবারে প্রান্তিক মানুষদের কুষাণ গানের আয়োজন দেখে ভীষণ ভাল লেগেছে। কিছু ছবি ও নৃত্যগীতের ভিডিও রাখলাম নিজের টাইমলাইনে।
কুশান নৃত্যগীত নিয়ে প্রাজ্ঞ বন্ধুরা বিস্তারিত তথ্য জানালে কৃতজ্ঞ ও সমৃদ্ধ হব।
* তথ্য: কুশান গান: নটরাজ/ আমাৰ ঐতিহ্য/ অসমীয়া -ই আলোচনী, উইকিপিডিয়া


 

রঙালি বিহুর দিনে
শৌভিক রায়
১লা বৈশাখের অসম। বেশ কয়েকদিনের বৃষ্টির পর ঝকঝকে রোদ। কালো পিচের টানা রাস্তায় দ্রুত চলতে চলতে, চাপরের বহলপুরে, অভিনব দৃশ্যটি দেখে থেমে যেতে বাধ্য হলাম। ছোট্ট ক্লাব প্রাঙ্গণে, কালী মন্দিরের সামনে, আয়োজনটি ছোট্ট, কিন্তু ভাবনায় অনেক বড়। `জ্যেষ্ঠ-কণিষ্ঠৰ মহামিলন পর্ব` অনুষ্ঠানে এলাকার সব ধর্মের, সব বর্ণের প্রবীণদের একত্রিত করে বসানো হয়েছে। হাজির আশেপাশের কমবেশি অধিকাংশ মানুষ। চাপর থানার অফিসার-ইন-চার্জ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করবার পরে, বড়দের বসানো হল। গামছা পরিয়ে, পান-সুপুরি দিয়ে বরণের পর তাঁদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম সারলেন এলাকার সব ছোটরা। জ্যেষ্ঠদের মুখে তখন পরিতৃপ্তির হাসি, আর কনিষ্ঠেরা শ্রদ্ধাবনত। উপস্থিত অসম সাহিত্য একাডেমির সদস্য সহ কয়েকজনের হাতে তাঁরা তুলে দিলেন সম্মাননা। ছিল রঙালি বিহুর আয়োজন।








গামছা পরিয়ে আর দই-চিড়ে-গুড় খাইয়ে উদ্যোক্তারা আমাকে আর রীনাকে বিদায় দিয়েছিলেন। হতে পারি কোচবিহার থেকে গেছি, হতে পারি অচেনা অজানা একে অন্যের। কিন্তু তাতে কী? রঙালি বিহু সবাইকে আপন করে নেয় যে! মুছে দেয় কাল্পনিক সীমানা।