প্রণাম
শৌভিক রায়
এবার সত্যিই বিরক্ত লাগছে! একগাদা প্রণাম করতে হবে এখন....কী মুশকিল!
কয়েকদিন থেকেই অত্যাচার চলছে সমানে। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দই খাওয়াচ্ছে, ভোরবেলায় ধাক্কা দিয়ে তুলে দিচ্ছে, হলুদ এনে গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছে, দুম করে জল ঢেলে দিচ্ছে... মানে সব মিলে ঝামেলার একশেষ। এত হ্যাপা জানলে ঘণ্টা বিয়ে করতাম!
বিয়ের দিন তো আরও ক্যাচাল। বলে যে, উপোস থাকতে হবে। ইল্লি আর কী! শুরু করলাম ঝামেলা। কিন্তু হাজার চেঁচামেচি, হুলুস্থূলতেও চিড়ে ভিজল না। এমনকি আমার এতদিনের সব দুষ্কর্মের সঙ্গী ছোট বোনটাও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেল। শেষটায় কমল লুকিয়ে খাবার দিয়ে গেল। তাতে কিছুটা খিদে মিটলেও, ওই ড্রেস পরা ব্যান্ড পার্টির 'তুঝে দেখা তো ইয়ে জানা সনম' আর 'চিরদিনই তুমি যে আমার' অসহ্য লাগছিল। মনে হচ্ছিল সব কটাকে ধরে দিই কয়েক ঘা। নিকুচি করেছে তোর সনমের!
আর এখন সেই মুহূর্ত। খুউব বিরক্তির একটা সময়। চারদিকে দেখতে পাচ্ছি গোটা পাড়া ভেঙে পড়েছে। সব্বাই নাকি আশীর্বাদ করবে। তারপর রওনা। বসিয়েও দিয়েছে বাসরে। প্রণাম করতে হবে নাকি এই গুষ্ঠির লোকদের। কী যন্ত্রণা! পাশে বসে আকুল কেঁদে চলেছে কয়েক ঘণ্টার পুরোনো বউ। কান্না দেখে নিজেকেই শালা অপরাধী মনে হচ্ছে। কেন করলাম বিয়ে! গতকাল থেকেই খুচ খুচ কাঁদছিল। ওদিকে পাড়াতুতো শালীদের ইয়ার্কির চোটে থাকা যাচ্ছিল না, আর এদিকে এর কান্না। মাঝে আমার স্যান্ডুইচ দশা। বয়স্করা কেউ কেউ তো এসে বাবাজি, বাবাজীবন বলে এমন ভাব করছিল যেন কতদিনের শ্বশুর সব! উফফ। রাগে গা রি রি করলেও সুবোধ জামাইয়ের মতো হে হে করা ছাড়া কোনও উপায়ও ছিল না!
যাহোক, কী আর করা। বাঁধা পড়ে গেছি। দাদাকে দেখি দূরে দূরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইশারায় সামনে আসতে বললাম। কানে কানে বলে গেল, 'কান্না দেখলে আমারও কান্না পায় রে। দূরেই থাকি।' বদমাশ বোনটা দেখি ফিক ফিক করে হাসছে। ভাবখানা এই, 'বোঝ এবার!' সর্বময়ী কর্ত্রী সেজ কাকিমা মুখে পান দিয়ে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যাতে কোনও ঝামেলা না পাকাই। কী আর করি। এটাই শেষ পর্ব ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।
প্রথমেই পিসে শ্বশুর ও শাশুড়ি। অতি সজ্জন মানুষ দুজনেই। অর্থবান। প্রণাম করলাম। একটা সোনার আংটি পরিয়ে দিলেন অনামিকায়। পকেট থেকে টাকা বের করে দিলেন। বউকেও আংটি আর টাকা দিলেন। তো তিনি এমনই কান্নায় ব্যস্ত যে, আংটি পরলেও টাকা নিতে পারলেন না। আমিই নিলাম।
এলেন কাকি শাশুড়ি। একই কেস। টাকা ও আংটি। আমার টাকা ও আংটি যথাস্থানে, তার টাকা আমার পকেটে। পরের জন এক সম্বন্ধী। এবারেও পুনরাবৃত্তি। কেমন একটু গোলমেলে লাগল। হচ্ছেটা কী? টাকা আর আংটি দিচ্ছে কেন রে বাবা!
এর পর আরও দুই তিনজন এলেন। আংটি জুটল না ঠিকই, কিন্তু টাকা পাওয়া গেল। তার টাকা আমি দায়িত্ব নিয়ে রাখছি নিজের কাছে। মোটামুটি ছয় সাতজনের পরে ব্যপারটা বুঝলাম। এরা আশীর্বাদের সঙ্গে টাকাও দিচ্ছেন। যারা পারছেন তারা আংটি বা অন্য কিছুও সঙ্গে দিচ্ছেন।
মুহূর্তে দিল খুশ। সব বিরক্তি কেটে গেল। মনে হল আবার উপোস করি। ব্যান্ড পার্টিকে বলি ঝম্পর ঝম্পর আরও বাজাক। ভীষণভাবে চাইলাম, শুধু এই পাড়া কেন....সারা শহর আসুক। প্রণাম করবই। কাউকে বাদ দেব না।
উফফ, পাঁচ মিনিটে কালেকশন সাড়ে তিন হাজার টাকা। আমার মায়না তখন ৩২০০ টাকা (১৯৯৬ সাল)। আহা কী আনন্দ। এই জন্যই এভাবে বিয়ে করতে হয়। ইসস...আয় আয়, লগন বয়ে যায়, বুক গুড় গুড় করে নোটের তাড়নায়...
শেষমেষ কত পেলাম সেটা বলব না। পর্ব শেষ হলে, মেজকাকুকে বাসরটা নাড়িয়ে দিতে বলা হল। তিনি সেটা করা মাত্রই তাঁর হাতেও টাকা গুঁজে দেওয়া হল। কাকুর মুখে সেকি প্রসন্নতা! আহা। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি, দাদা কান্নাটান্না ভুলে কাছাকাছি পায়চারি করছে। বুঝলাম খুব আশা করছে বেচারা যদি কিছু কাজ পায়!!
( বি দ্রঃ: তিনি কয়েকদিন পরে তার ভাগের টাকাগুলো চেয়েছিলেন। দিই নি। কেন দেব? কে ওত কাঁদতে বলেছিল? পনেরো কিমি আসতে না আসতেই তো বোনের সঙ্গে হ্যা হ্যা হি হি শুরু হয়ে গেছিল আর প্ল্যান চলছিল কীভাবে সারা জীবন প্যাঁচ মারা যায়!)
(বোকামির এককাল)















