স্বপ্ন পূরণ
শৌভিক রায়
স্বপনের সঙ্গে দেখা হওয়া ইস্তক পূর্ণর মেজাজটা বিগড়ে আছে! প্রথমটায় খুব ভাল লাগছিল। সেই কতদিন পর দেখা! ইউনিভার্সিটি ছেড়েছে বছর তিরিশ হল। দুজনেরই বিয়ের পর একবার দেখা হয়েছিল ঠিকই, তবে সেও কম দিন হল না!
বহুদিন পর দেখা হলে যা হয়। প্রথমটায় হৈ হৈ, কে কতটা বুড়ো হল, কার বুকে স্টেন বসল, কে কোথায় বাড়ি করল ইত্যাদি পর্ব শেষ করে মাঝবয়সের নিয়ম অনুসারে কার ছেলেমেয়ে কয়টি ও কে কী করছে ইত্যাদিতে এসে পূর্ণর তাল কাটল। স্বপন বলে কী! মাসে পঁয়তাল্লিশ লাখ! তাকে ঝেড়েঝুড়ে সাগর দিঘির ঠান্ডা জলে ফেলে দিলেও মেরেকেটে পনের থেকে কুড়ি লাখ পাওয়া যেতে পারে। তার নিজের আর বৌয়ের প্রফিডেন্ট ফান্ড মিলিয়ে আরও বড়জোর লাখ পনের। অর্থাৎ সব মিলে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ। এর বেশি কিছুতেই নয়! আর স্বপন বলছে পঁয়তাল্লিশ লাখ। তাও আবার একমাসে। পঁচিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করে সে এখনও এক লাখে পৌঁছতে পারে নি। বৌয়ের মায়না ধরেও লাখ দেড়েক এখনও বহুদূর। আর এ একেবারে পঁয়তাল্লিশ লাখ! এক মাসে! কত বছরের চাকরিতে? চার মাসের। যে পাচ্ছে এই বিপুল অঙ্কটা তার বয়স মেরেকেটে তেইশ! পূর্ণর অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা একেবারে।
স্বপনের ছেলে পড়াশোনায় ভাল সেটা সে আগেই শুনেছিল আর এক বন্ধুর মুখে। কিন্তু তাই বলে ইঞ্জিনিয়ারিং করে এত লক্ষ টাকার চাকরি পেয়ে যাবে সেটা কোনোদিনই ভাবে নি। বিদেশী কোম্পানি নাকি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে যে দুজন বি. টেক-এর ছাত্রকে এই বিরাট অঙ্কে, স্বপনের ভাষায় 'তুলে নিয়েছে', তার মধ্যে ওর ছেলে একজন। এরপরেও স্বপন বলছে যে, ওরা নাকি খুশি নয়। ওরা চেয়েছিল ছেলে আরও লেখাপড়া করুক, এম এস করে আসুক জি আর ই দিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্বপন আর আগের জায়গায় নেইও এখন। ওখানকার ফ্ল্যাট বিক্রি করে কলকাতার নিউটাউনে চলে গেছে। পোস্টিং নিয়েছে ওখানেই। এখানে এসেছে প্রায় দুই বছর বাদে মা কে দেখতে!
সব জেনে পূর্ণর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল! স্বপনেরও ছেলে আর তারও ছেলে। একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। শুধু বিষয়টা আলাদা। কিন্তু ওদেরও ক্যাম্পাসিং হয়। আর এখানেই এক পালা গান। তার ছেলে কিছুতেই ক্যাম্পাসিংয়ে বসবে না। ধনুক ভাঙা পণ করে আছে যে, কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি করবে না! কেন রে বাপু? কর্পোরেটরা এখন দুনিয়া চালায়। তুই কে কোথাকার যে তাদের চাকরি করবি না? বুঝিয়ে, রাগ করে, কথা না বলে, এমন কি মরে যাওয়ার ভয় দেখিয়েও ছেলেকে বাগে আনতে পারে নি পূর্ণ। চোখের সামনে সে দেখতে পাচ্ছে ছেলের সহপাঠীরা একে একে ক্যাম্পাসিং থেকে চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তার ছেলে কেবল গিটার নিয়ে টুংটুং করছে। চেতনার গান গাইছে! যেন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবার ঠিকে নিয়ে রেখেছে! যত্তসব।
বাড়ি ফিরে পূর্ণর সব রাগ পড়ল বৌয়ের ওপর। মায়ের জন্যই ছেলের এই অবস্থা। কিছুই বলে না ছেলেকে। যা করছে করুক আর কি! এভাবে চলে নাকি। তার বুকনিতে বৌ আজ চুপ করে থাকল। পাল্টা কিছু বলল না। জবাব না পেয়ে একসময় থেমে গেল পূর্ণ। অন্যদিনের চাইতে খানিকটা আগেই রাতের খাবার খেয়ে শুয়েও পড়ল। বৌ দেখল সবটাই। কিন্তু কিছু বলল না।
আচমকা ফোনে ঘুম ভেঙে গেল পূর্ণর। অচেনা নম্বর। ফোন তুলতেই মহিলা কণ্ঠ,
- দাদা আমি স্বপনের বৌ বলছি। ও বলল আজই আপনার নম্বর নিয়েছে। দাদা বিপদে পড়েছি। ওর হঠাৎ বুক ব্যথা। বুঝতে পারছি না কী করব!
ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল পূর্ণর। কী বলবে, না বলবে বুঝতে না বুঝতেই ছেলে এঘরে হাজির। এত রাতে ফোন শুনে অন্য ঘর থেকে ছুটে এসেছে। পুজোর বন্ধে এসেছে। ফেরার সময় হয়ে এলো। বাবার কাছে সব শুনে দৌড়ল সে। দুই একজন বন্ধুও জুটিয়ে নিল।
তারপর যা হয়। নার্সিং হোম, আই সি ইউ। কয়েকদিন যমে মানুষে টানাটানি। তাদের ছোট শহরে যতটা সম্ভব চিকিৎসা করে স্বপন শেষটায় উড়ে গেল ব্যাঙ্গালোর। যাওয়ার আগে পূর্ণর হাত ধরে কী কান্না আর কী কান্না। ওর বৌ তার ছেলের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে আদর। চোখ ছলছল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বারবার। কলকাতায় বেড়াতে যাওয়ার আবেদন। স্বপনের ছেলেও ফোনে দুবেলা নানা কথা। ও বেচারা আসতে পারেনি। নতুন চাকরি। অফিস ছাড়ে নি। তার ওপর ওসলো কি আর এখানে!
ছুটি শেষে ছেলেও ফিরে গেল। পূর্ণ এবারও বোঝালো, রাগ করল, রীতিমত হুমকি দিল। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল যে, এবারে তার বোঝানোতে সেই আগের জোর ভ্যানিশ। ছেলের চোখে চোখ রাখলেই মনে হচ্ছিল ছেলে যেন হাসছে।
সপ্তাহ খানেক পর ছেলের ফোন এল। পি এইচ ডি-তে নিজের ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ান একটা কোম্পানিতে মাসে ছাব্বিশ লাখে চাকরি পেয়েছে। দুই তিন বছর পরেই সে টাকা বহু বেড়ে যাবে। তবে থাকতে হবে মেলবোর্নে।
ছেলে বাবার ওপর ছাড়ল সব। বাবা যা বলবে সে সেটাই করবে।
এরপর থেকে পূর্ণ ভেবে চলছে। মুশকিল হচ্ছে একটাই। ভাবতে গেলেই স্বপন আর ওর বৌয়ের মুখটা বারবার ভেসে উঠছে। নিজের বৌয়ের দিকে তাকালো সে। বৌয়ের মুখে হাসি ঠিকই। তবে চোখে জলও যেন দেখল পূর্ণ !
(প্রকাশিত: মানসাই/ সারস্বত উৎসব ২০২২)
No comments:
Post a Comment