মিস্ত্রির জোগানদার থেকে মা
শৌভিক রায়
রাজমিস্ত্রির সঙ্গে জোগানদারের কাজ করতে আসা অল্পবয়স্ক ছেলেটির হাবভাব দেখে সন্দেহ হচ্ছিল। চেপে ধরতেই সত্যটা বেরিয়ে এলো। বছর চোদ্দ-পনেরোর ছেলেটি আসলে আমারই প্রাক্তন ছাত্র!
দুর্ভাগ্য, যে বয়সে ওর নবম বা দশম শ্রেণিতে থাকবার কথা, সে সময়ে ওকে `প্রাক্তন' বলতে যত খারাপই লাগুক না কেন, বাস্তব এটাই। প্রান্তিক পরিবারের এই ছাত্রটির পড়াশোনার ক্ষেত্রে এমনিতেই বহু সমস্যা ছিল। আর সেই সমস্যার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে গেছে করোনা অতিমারি। ফলে 'লেখাপড়া' নামের বিলাসিতায় গা না ভাসিয়ে ছেলেটি নিজে ও তার পরিবার জোগানদারের এই কাজটিকেই শ্রেয় মনে করেছে।
আমাদের স্কুলের এই ছাত্রটিই শুধু নয়, কোচবিহার সহ উত্তরবঙ্গের প্রত্যেকটি জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে একটু উঁকি দিলে এই ছবিই ধরা পড়বে। মনে পড়ছে দিনহাটা আদাবাড়িঘাটের কাছের এক বিদ্যালয়ের ছাত্রের কথা। লকডাউনের আগে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া সেই ছাত্রটিকে আর বিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে না। এমনিতেই ছাত্রটি ইঁটভাটায় কাজ করে বলে একটা আভাস আগে থেকেই ছিল। এখন তার বিদ্যালয়ে না আসা সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণিত করেছে।
এই ছাত্রটিকে মনে রাখবার বিশেষ কারণ ছিল তার আঁকা ও লেখার হাত। ছোট ছোট ছড়া আর তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আঁকা ছবি তাক লাগিয়ে দিত শিক্ষক-ছাত্র সবাইকেই। সেই ছোট্ট ছাত্রটির হাত এখন ইঁটের বোঝা বইছে! আরও দুর্ভাগ্য, তাকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনবার বিভিন্ন প্রচেষ্টা শেষ অবধি সফল হয়নি।
একই অবস্থা তুফানগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। দিন-দিন বেড়ে চলেছে বিদ্যালয় ছুটের সংখ্যা। এরকমই এক প্রাক্তন ছাত্র, বর্তমানে কেরালে কাজ করা শ্রমিকের। বলছিল, 'লকডাউনের আগে থেকে সংসারে টানাটানি ছিল। সেটা অনেক অংশেই বেড়ে যায় সেই সময়। স্কুল থেকে মিড-ডে মিলের সরঞ্জাম পেলেও সেটা যথেষ্ট ছিল না।' অগত্যা পড়াশোনায় ইতি টেনে করোনা নিয়মবিধি সামান্য শিথিল হতেই সে পাড়ি দিয়েছে ভিন রাজ্যে।
এই কয়েকটা ঘটনাকে ব্যতিক্রম মনে করা হলে ভুল করা হবে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যালয়-ছুটের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এই মুহূর্তে রীতিমতো উদ্বেগজনক। অতিমারির আগে কোচবিহার জেলার বিদ্যালয় ছুটের হার ছিল ০.১৩, জলপাইগুড়ির ক্ষেত্রে তা ছিল ০.১১। দার্জিলিং সেদিক থেকে কিছুটা ভাল জায়গায় থাকলেও (০.০৯), দিনাজপুর ও মালদায় সেই হার ছিল যথাক্রমে ০.১৫ ও ০.১৭। সেই সময়ে রাজ্যের গড় হারের ছিল ০.১৫। আর এই মুহূর্তে রাজ্য গড় বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উত্তরের জেলাগুলির বিদ্যালয় ছুটের হার।
ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ বেসিক এন্ড অ্যাডভান্স রিসার্চ'-এর একটি সমীক্ষা বলছে, শহরের হিসেবে রাজ্যে বিদ্যালয় ছুটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে শিলিগুড়ি। পিছিয়ে নেই উত্তরের অন্যান্য শহরগুলিও। সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া মাধ্যমিক পরীক্ষায় অনেক বিদ্যালয়ে `টোটাল এনরোলমেন্ট`-এর তুলনায় যেমন কম সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফর্ম ফিল আপ করেছে, তেমনি ফর্ম ফিল আপের পর পরীক্ষায় না বসা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও কম নয়। চলতে থাকা উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা এতটাই যে, খবরের কাগজের শিরোনাম হয়েছে সেটি। এই ক্ষেত্রে উত্তরের সব জেলার অবস্থা কমবেশি এক।
বিদ্যালয় ছুটের এই চিত্রে মেয়েদের অবস্থাটি অতিমারির আগে তুলনায় খানিকটা ভাল ছিল। সেই সময়ে বিদ্যালয় ছুট মেয়েদের হার ছেলেদের তুলনায় কম বা সমান সমান ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের দশা সত্যি করুণ। সমীক্ষা বলছে, উত্তরের চা-বলয়ে মেয়েদের বিদ্যালয় ছুটের পরিমাণ ৬৭ শতাংশ। বিদ্যালয় থেকে প্রত্যেক মাসে প্রদত্ত মিড ডে মিল, কন্যাশ্রী সহ অন্যান্য বিভিন্ন সুযোগসুবিধাও আটকাতে পারে নি এই ভয়াবহ অবস্থাকে। সম্প্রতি চা-বাগানের অভিভাবকদের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
স্কুলে না আসা প্রথম স্থানাধিকারিনী ছাত্রীটির খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেছি, তার বিয়ে হয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার অতি অল্প বয়সে মায়ের দায়িত্ব পালন করছে। আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এরকম ছাত্রীর সংখ্যা কম নয়। ক্রান্তি অঞ্চলের এক ছাত্রীর পড়বার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয় নি বাড়ির চাপে। তার অভিভাবকের আয় এতটা কমে গিয়েছে যে, সে শেষ পর্যন্ত বিয়ে আর লেখাপড়ার মধ্যে প্রথমটিকে বেছে নেয়। একই অবস্থা মেখলিগঞ্জের তিনবিঘার এক ছাত্রীর। তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জানা গেল, সে ইতিমধ্যে মা হয়ে বাচ্চা সামলাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও চাকরির অনিশ্চয়তা বিদ্যালয় ছুটের মূল কারণ হলেও, আরও কিছু কারণ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। যেমন ধরা যাক 'ডিজিটাল ডিভাইড`-এর বিষয়টি। আধুনিক কারিগরি বিদ্যা ব্যবহারের পার্থক্যকে `ডিজিটাল ডিভাইড` হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অতীতে 'ডিজিটাল ডিভাইড' বলতে বোঝাত টেলিফোন ব্যবহারকারী এবং টেলিফোন ব্যবহার না করা মানুষজনের পার্থক্যকে। বর্তমানে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে ব্রডব্যান্ড, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সঙ্গে, সেসব যারা ব্যবহার করে না বা করবার অবস্থায় নেই তাদের।
করোনার সময় অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়ায় ইতি টানা ফালাকাটা ব্লকের এক বাদামবিক্রেতা কিশোর স্পষ্ট জানালো, 'অনলাইনে ক্লাস চলছিল। কিন্তু একটা ক্লাস হলেই সেদিনের মতো ডাটা শেষ হয়ে যায়। অন্য ক্লাস করব কীভাবে? এমনিতেই বাবার কাজ ছিল না সেসময়। মা বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজ করছিল। তাতে কি আর সংসার চলে?` এখন সেই অবস্থা নেই, কিন্তু তবু কেন বিদ্যালয়ে না যাওয়ার কারণ হিসেবে সে জানালো, 'লেখাপড়ার মধ্যে না থাকায় ইতিমধ্যে সে এতটা পিছিয়ে গেছে যে, তার পক্ষে আর অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়।'
আলিপুরদুয়ার জেলার বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) আহসানুল করিমের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলছিলাম। তিনি বলছিলেন, ' শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতের বিরাট ফারাকের ফলে শিক্ষার সমবন্টন অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বহু শিক্ষার্থী অচিরেই লেখাপড়ায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। নাম লেখাচ্ছে বিদ্যালয় ছুটের দলে।'
উত্তরের বহু বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা একটি সাধারণ ঘটনা। উৎসশ্রীতে বদলি হওয়ার আগে থেকেই সরকারি বা সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ে বহু শিক্ষকের পদ ফাঁকা ছিল। ছিল না বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক। ফলে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়তে না পেরে উৎসাহ হারিয়েছে বহু শিক্ষার্থী। পারিবারিক অনটনে তারা অন্যত্র ভর্তিও হতে পারে নি। ফল, বিদ্যালয় ত্যাগ। সম্প্রতি উৎসশ্রীতে বহু সংখ্যক শিক্ষক গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে বদলি নিয়ে চলে আসায়, বহু বিদ্যালয়ে প্রায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বহু বিষয়ের শিক্ষক যেমন নেই, তেমনি পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে সপ্তম বা অষ্টম পিরিয়ড অবধি বিদ্যালয় চালানোই সমস্যা হয়ে পড়ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। তারা বিদ্যালয় ছাড়ছে।
অতি সম্প্রতি দিনহাটা মহকুমার এরকমই এক বিদ্যালয় ছুট ছাত্রী বলল, 'কীভাবে কী করব? আমাদের স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা বদলি নিয়ে চলে গেলেন। আমার প্রিয় বিষয় পড়ানোর মতো কেউ আর নেই। আশেপাশেও এমন কেউ নেই, যার কাছে বিষয়টি বুঝব। এদিকে দিনহাটায় কলেজ মাত্র একটিই। খুব ভাল রেজাল্ট করতে না পারলে সেখানে ভর্তিই হতে পারব না। এর চাইতে মায়ের সঙ্গে বিড়ি বাঁধাইয়ের কাজে নেমেছি। সংসারের খরচে অন্তত কিছু সাহায্য করতে পারছি। এটা ঠিক, বাড়ির কেউ চায় নি পড়া ছেড়ে দিই। কিন্তু যদি নিজের পছন্দের বিষয় পড়তেই না পারি তবে শুধু শুধু স্কুলে গিয়ে করবটা কী?`
বিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকায় বরাবর দেখেছি পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ছাত্রের সংখ্যা অষ্টম শ্রেণিতে কমে যায়। মাধ্যমিকের পর সেই সংখ্যা আরও কমে। তবে যেভাবে দিন দিন বিদ্যালয় ছুটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। আর এর চাইতেও মারাত্মক হল, এই বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনও তথ্য কারও কাছে নেই। বিদ্যালয়ের নিজের বা কোনও কোনও শিক্ষকের একক উদ্যোগে কিছু শিক্ষার্থীকে আবারও বিদ্যালয়মুখী করা গেলেও, সেটি খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতোই নগণ্য। খুব দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে সেদিন আর দূরে নেই যেদিন পরিকাঠামো থাকবে, কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করবার মতো পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী থাকবে না।
(লেখক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)
১৭ এপ্রিল, ২০২২, উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এর উত্তর সম্পাদকীয়
নেই রাজ্যের বাসিন্দা হওয়ার ভয় জয়ন্তীজুড়ে
শৌভিক রায়
এখানে নদীর তীরে দাঁড়ালে ওপারের সবুজ পাহাড়ে মন হারিয়ে যায়। কখনও দূর থেকে ভেসে আসে ময়ূরের ডাক। সবাইকে চমকে দিয়ে পরিবার সমেত গজরাজ রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে চলে যায়। এখানকার শান্ত নির্জন পরিবেশ একান্ত বেরসিক মানুষকেও কাব্যিক করে তুলতে পারে। মনে হয় এখানেই থেকে যাই সারাটা জীবন। কিন্তু, পর্যটন মানচিত্রে উত্তরের রানি বলে পরিচিত জয়ন্তীর বাসিন্দাদের সেই সৌভাগ্য হচ্ছে না। কেননা রেভিনিউ ভিলেজের মর্যাদা হারিয়ে প্রতি মুহূর্তে তারা নিজ বাসভূমে পরবাসী হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন। ওখানে ঘুরে এসে এমনই আক্ষেপ শোনা যায় বারবার।
বাদশা আকবরের আমলে মন্ত্রী রাজা টোডরমল সৃষ্ট রেভিনিউ ভিলেজের ধারণাটিকে মারাঠারা একটি স্পষ্ট রূপ দিয়েছিল। পরবর্তীতে সূচারুভাবে সেটিকে প্রয়োগ করে ব্রিটিশরা। ১৮৬৫ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের পর ১৮৮৮ সালে এডওয়ার্ড ডালটনের সুপারিশে তদানীন্তন ভারত সরকারের বিদেশ দপ্তর ভুটানের কাছে থেকে ১০০০০ টাকার বিনিময়ে ২১.৪৩ বর্গমাইলের জয়ন্তী ল্যান্ডস বা জৈনতি কিনে নিয়েছিল। সময়ের হাত ধরে হাতি কেনাবেচার কেন্দ্র থেকে জয়ন্তী ক্রমশ হয়ে উঠেছিল উত্তরের অন্যতম ব্যস্ত জনপদ। এখানকার খনিজ আর বনজ সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে সঙ্গে সারা ভারতের মানুষ বসতি স্থাপন করেছিলেন। চালু হয়েছিল রেলপথ। নদীর ওপর তৈরি হওয়া ব্রিজের সাহায্যে অসমের সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। ঘন হয়েছিল মনুষ্যবসতি।
অবস্থা পাল্টে যেতে লাগল ১৯৮৩ সালের পর থেকে। বক্সার অরণ্য ন্যাশনাল টাইগার রিজার্ভ ঘোষিত হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেল রেলপথ সহ ডলোমাইট কারখানা। নদীবক্ষ থেকে পাথর তোলাও নিষিদ্ধ হল কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে। ফাঁকা হতে লাগল জয়ন্তী। অবশ্য এত কিছুর পরেও জয়ন্তী রেভিনিউ ভিলেজের মর্যাদা হারায় নি অন্তত ২০১৪ সাল অবধি। তখনও পর্যন্ত জুডিশিয়াল লিস্টে গ্রামের নাম্বার ছিল ৪৫। কিন্তু ২০১৫ থেকে জয়ন্তী নামের পরিবর্তে বক্সা ফরেস্ট পানবাড়ি খন্ড হওয়ায় এখানকার বাসিন্দারা আজ জমির পাট্টা এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত। ভোটার বা আধার কার্ডেও `জয়ন্তী' উল্লেখ করা যাচ্ছে না বলে, গ্রামটির অস্তিত্বই বিপন্ন। অথচ রেভিনিউ ভিলেজে পরিণত হতে হলে যে শর্তগুলি দরকার তার সবকিছুই রয়েছে এখানে। বারোশোর ওপর বাসিন্দা, বিদ্যালয়, পাকা সড়ক, সরকারি দপ্তর ইত্যাদির পাশাপাশি জয়ন্তীতে রয়েছে পি ডব্লু ডি, পি এইচ ই, সি ই এস ই, পর্যটন বিভাগ ও বনবিভাগের বাংলো, কমবেশি ৩৬টি হোম স্টে। অন্যদিকে, জাতীয় উদ্যান ঘোষণা হওয়ার সময়েও সরকারি নির্দেশে জয়ন্তীকে ৩৭ একর কোর এরিয়ার বাইরে রাখবার কথা বলা হয়েছিল। আবার অতি সম্প্রতি বনবিভাগ গ্রীন ট্রাইবুনালে হলফনামা পেশ করেও একই কথা বলেছে। এমনকি ২০১৫ সালে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী তদানীন্তন ডি এম এলিজ ভ্যাজকে জমির পাট্টা দিতে বলে গেছেন। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এখানকার বাসিন্দারা একই তিমিরে রয়ে গেছেন।
তাই সকল জয়ন্তীবাসীই তাই আজ ভীত। প্রবল জলকষ্টের সঙ্গে সঙ্গে অচিরেই উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছেন তারা। কেউই নিশ্চিন্ত করে বলতে পারছেন না, নেই রাজ্যের বাসিন্দা হবেন না তারা!
(লেখক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)
২২ মার্চ, ২০২২, উত্তরবঙ্গ সংবাদ
উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও উত্তরবঙ্গে 'ব্রেন ড্রেন` অব্যাহত
শৌভিক রায়
উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্বেও উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশের এই রাজ্য বা দেশের অন্যত্র যাওয়ার প্রবণতা কিছুতেই কমছে না। এক দশক আগেও উত্তরবঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। বর্তমানে মালদা থেকে শুরু করে কোচবিহার পর্যন্ত শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ইত্যাদি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। রয়েছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বেড়েছে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ল কলেজ, বি এড কলেজ ইত্যাদির সংখ্যাও। কিন্তু আটকানো যাচ্ছে না শিক্ষার্থীদের বাইরে পড়তে যাওয়ার প্রবণতাকে!
এর প্রধান কারণ হিসেবে কর্মসংস্থানের অভাবকেই দায়ি করা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য অংশের চাইতে উত্তরবঙ্গ অনেকটা পিছিয়ে। সরকারি-বেসরকারি কিছু অফিস আদালত থাকলেও, কর্মসংস্থানের ব্যাপারে উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক চিত্রটি নিতান্তই হতাশার। আজকের দিনে কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষে `ক্যাম্পাসিং`অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তরের দুই-চারটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদে আর কোথাও এই ব্যাপারটি দেখা যায় না। ফলে, এখানকার মেধাবী শিক্ষার্থীরা অন্যত্র পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে।
উত্তরের পড়ুয়াদের বাইরে চলে যাওয়ার আর একটি কারণ হল, শিক্ষক- শিক্ষার্থী অনুপাতের বিরাট পার্থক্য। সেটি এতটাই যে, শিক্ষার সমবন্টন আদৌ সম্ভব নয়। প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এই চিত্রটি সর্বত্র এক। ফলে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকরা কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে বাইরে পড়তে যাওয়াই ভাল মনে করছেন।
শিক্ষা পরিকাঠামোর হাল বাংলার এই অংশে কেমন? এককথায় অত্যন্ত শোচনীয়। উত্তরের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নির্ভর করছে গুটিকয়েক কর্মীর ওপর। বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় প্রতি জেলাতেই প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষা পরিকাঠামো ধুঁকছে। যারা শিক্ষার হালহকিকত সম্পর্কে সামান্য ওয়াকিবহাল, তারা এখানকার উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কেননা তারা জানেন যে, অপ্রতুল শিক্ষক, অবৈজ্ঞানিক শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, অনুপযুক্ত শিক্ষা পরিকাঠামোর ফলে তাদের লক্ষ্য সফল হবে না। তার চাইতে, একটু কষ্ট হলেও বাইরে চলে যাওয়া ভাল।
এমনিতে সাবেকি ঘরানার পড়াশোনার সেই চিত্রটিও আজ আর নেই। এখন দর্শন নিয়ে পড়বার পর রিপ্রোডাকটিভ হেলথ বা মিডিয়া সায়েন্স নিয়েও রিসার্চ করা যায়। `ওপেনিং' বলতে যা বোঝায় তা অনেকটা পরিব্যাপ্ত। কিন্তু উত্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি এই ব্যাপারেও অনেকটা পিছিয়ে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিলেবাসে কিছু পরিবর্তন এলেও, তা যৎসামান্য। তাই একটু অন্যরকম পড়াশোনার কথা যারা ভাবছে, তাদের পছন্দের তালিকায় উত্তরবঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির নাম দেখা যাচ্ছে না।
আর একটা দিক।জোগানের তুলনায় চাহিদা কম হওয়ায় কারিগরি শিক্ষাও কাজে আসছে না। আগে আলাদা আলাদা পেশায়, আলাদা আলাদা মানুষ দেখা যেত। কারিগরি বিষয়ে এখন একই মানুষকে আলাদা আলাদা পেশায় দেখা যাচ্ছে। ফলে, উত্তরের ছোট আয়তনের জেলাগুলিতে কাজের সুযোগ সেভাবে তৈরী হচ্ছে না। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কারিগরি প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা যুগোপযোগী পড়াশোনার জন্য চলে যাচ্ছে অন্যত্র।
উপযুক্ত পরিকাঠামো-সহ এই সমস্যাগুলির দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান না হলে উত্তরের 'ব্রেন ড্রেন' অদূর ভবিষ্যতে কমবার কোনও উপায় নেই। ফলে, পিছিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গ রয়ে যাবে সেই একই তিমিরে।
(লেখক কোচবিহার নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)
২৯ জানুয়ারি, ২০২২, উত্তরবঙ্গ সংবাদ



No comments:
Post a Comment