Monday, March 30, 2026


 

এই মানুষটিই বাধ্য করেছিলেন লেখা পাঠাতে। 

লেখাটি প্রকাশিতও হয়েছিল বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকায়। 

সে খবর দেওয়ার আগেই, অভিনন্দন জানিয়ে  তাঁর ফোন এসেছিল। 

সেটাই শেষ নয় অবশ্য। লেখা নিয়ে কাটাছেঁড়া করেছেন বহুবার। 

সত্যি বলতে, ওঁর জন্যই আবার লেখালিখি শুরু করেছিলাম। সে ঋণ ভুলি কীভাবে!
 
নিজের বাবা চলে যাওয়ার পর, হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম অভিভাবক। জানতেন সে কথাও।


মহীরুহ চলে গেলে, তার স্নিগ্ধ ছায়াও চলে যায়। 
ছায়াহীন হলাম আবারও। 

।। পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবক অধ্যাপক অর্ণব সেন।। 
                    প্রয়াণ: মার্চ ৩০, ২০২৬
  
  

Thursday, March 26, 2026


 

আদর্শহীন দলবদলুরা গণতন্ত্রে বড় বিপদ
শৌভিক রায়

১৯৬২ সালে ডেমোক্র্যাট দল ছেড়ে রিপাবলিকান দলে যোগ দেওয়ার সময় আমেরিকার চল্লিশতম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের উক্তি ছিল, 'আমি দল ছাড়িনি, দল আমাকে ত্যাগ করেছে।' এই কথাটি রাজনীতিতে দলবদলের এক চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে। দলবদল কোনো এক দেশের একচেটিয়া বিষয় নয়, পৃথিবীর বহু দেশেই এই প্রবণতা কমবেশি দেখা যায়। রাজনীতিতে এমন ঘটনা বারবার ঘটে আসছে, যা ক্ষমতার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দলবদলের উদাহরণ অজস্র। ১৯৬৪ সালে হিলারি ক্লিনটনকে আরিজোনা রিপাবলিকানদের হয়ে প্রচার করতে দেখা গেলেও, পরবর্তীতে তিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট পদের জন্য রিপাবলিকান পার্টির টিকিট না পেয়ে, ১৯১২ সালে রুজভেল্ট প্রোগ্রেসিভ পার্টি (বুল মুজ পার্টি নামেও পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যদিও পরে তিনি পুরোনো দলেই ফিরে আসেন। মার্কিন সিনেটেও দলবদলের ঘটনা বিরল নয়। ১৯৯৪ সালে পাঁচজন হাউস ডেমোক্র্যাট ও দুজন সিনেট ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন। ২০০১ সালে জিম জেফর্ডস রিপাবলিকানদের সঙ্গ ত্যাগ করে 'স্বাধীন' হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করলেও, তার রাজনৈতিক রাশ ছিল ডেমোক্র্যাটদের হাতে। ২০০৯ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, যা প্রমাণ করে যে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রায়শই দলের প্রতি আনুগত্যের ঊর্ধ্বে স্থান পায়।

তুরস্কের কিউবিলে উগানের সাতবার নিজের দল থেকে ইস্তফা দেওয়া এবং চারটি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া এক কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়। অস্ট্রেলিয়ায় এক দল থেকে অন্য দলে যাওয়ার রেওয়াজ কম হলেও, নিজের দল ছেড়ে স্বাধীনভাবে থাকা বা নতুন দল প্রতিষ্ঠা করা সাধারণ ঘটনা। ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে ইতালিতে দলবদলের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ইতালির 'চেম্বার অফ ডেপুটিজ'-এর ২৫ শতাংশ সদস্য কোনো না কোনো সময় দলবদল করেছেন। ফিলিপাইনে দলবদল একটি 'নীতি' হিসেবেই বিবেচিত হয়। মালয়েশিয়ার মতো রাষ্ট্র দলবদলের ধাক্কায় বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত আইন করে এটিকে বন্ধ করেছে। আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়, বরং সেখানেও ক্ষমতার পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য দলবদল একটি সাধারণ কৌশল।

ভারতে দলবদলের প্রবণতা কমাতে ১৯৮৫ সালে সংবিধানের ৫২তম সংশোধনের মাধ্যমে দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন পাস করা হয়। কিন্তু এই আইন 'আয়ারাম গয়ারাম'দের আটকাতে পারেনি। 'আয়ারাম গয়ারাম' শব্দবন্ধটি মজার ছলে তৈরি হলেও, এর বাস্তব ভিত্তি হরিয়ানার বিধায়ক গয়ালালকে ঘিরে। ১৯৬৭ সালে তিনি হাসানপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেন এবং একই দিনে কয়েকবার কংগ্রেস ও ইউনাইটেড ফ্রন্টে যোগ দিয়ে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড তৈরি করেন। তখন প্রায়শই প্রশ্ন করা হতো, 'গয়ারাম আজ কোন দলে?' শেষ পর্যন্ত পনেরো দিন পর হরিয়ানার কংগ্রেস নেতা রাও বীরেন্দ্র সিং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা করেন, 'গয়া রাম এখন আয়া রাম', অর্থাৎ তিনি আবার কংগ্রেসে ফিরে এসেছেন। এই ঘটনা ভারতীয় রাজনীতির একটি প্রতীকী চিত্র হয়ে আজও বিদ্যমান।

আমাদের রাজ্যেও এই 'আয়ারাম গয়ারাম' সংস্কৃতি সমানভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে এই দৃশ্য কমবেশি প্রতিবারই দেখা যায়। দলবদলকারীরা যদিও দেশের প্রতি তাদের গভীর চিন্তার যুক্তি দেন, আসল কারণটি বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। সম্প্রতি, একটি জেলা শহরে শাসক দল ছেড়ে শতাব্দীপ্রাচীন এক দলে যোগ দিয়ে একজন পরিচিত নেতা কেঁদে ফেলেন। দীর্ঘদিন ধরে শাসক দলে কোণঠাসা হয়ে থাকলেও, 'বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার' আশায় তিনি চুপ করে ছিলেন। কিন্তু যখন প্রার্থী তালিকায় তার স্থান হলো না, তখনই তিনি দল ছাড়লেন। শোনা যাচ্ছে, নতুন দল তাকে প্রার্থী করতে পারে। এই ধরনের ঘটনাগুলি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার লোভের স্পষ্ট প্রতিফলন।

আজকের রাজনীতি 'করে খাওয়ার' এক জায়গায় পরিণত হয়েছে। অপমানের শিকার হয়েও অনেকে চুপ থাকাকে শ্রেয় মনে করেন। মুখ তখনই খোলেন, যখন দেখেন তারা আর প্রার্থী তালিকায় নেই। কেউ কেউ 'সম্মানের সঙ্গে' রাজনৈতিক জীবন শেষ করতে পারলেন না বলে আক্ষেপ করেন, আবার কেউ কেউ অভিমানে রাজনৈতিক সন্ন্যাস ঘোষণা করেন। এই প্রবীণ নেতাদের অনেকেই হয়তো দলবদল করেননি বা করবেন না, কিন্তু তাদের শারীরিক ভাষা বুঝিয়ে দেয়, তারা আদৌ খুশি নন এবং সুযোগ পেলে অন্য কিছু ভাববেন না, এমনটিও নয়। যেমন, উত্তরবঙ্গের এক বড় শহরে কানাঘুষো শোনা যায় যে, কোনো বয়স্ক নেতার জন্য একজন তরুণ দল ছেড়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শের দক্ষিণপন্থী দলে যোগ দিয়েছিলেন, কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে ওই বয়স্ক মানুষটির জন্য তিনি কখনোই বিধায়ক হতে পারবেন না। এটি এক দুঃখজনক বাস্তবতা, যেখানে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভই মুখ্য হয়ে ওঠে।

একসময় বামপন্থীদের আদর্শ ও নীতি নিয়ে চলার কারণে তাদের দলবদল থেকে মুক্ত মনে করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নতুন শাসক দলে ভিড় জমিয়েছিলেন একদা বামপন্থীরা। তাদের অনেকেই আজ ক্ষমতার কেন্দ্রে। কেউ কেউ নির্লজ্জ দুর্নীতিতে জড়িয়েও প্রার্থী তালিকায় স্বমহিমায় রয়ে গেছেন। বর্তমান শাসক দলেও অনেক জায়গায় অন্য দল থেকে আসা এই নেতারাই ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। যারা দলের সঙ্গে প্রথম থেকে ছিলেন, তারা আজ ব্যাকফুটে। কেউ দল ছেড়েছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক হতাশা ঢাকতে কিছু হবে না জেনেও এমন সব দলে ভিড়ছেন, যারা এ বঙ্গে একেবারেই অপরিচিত। সামাজিক কোনো আন্দোলনের ফায়দা তুলে, রাজনৈতিক দলের তুল্যমূল্য বিচার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ধান্দাতেও কেউ কেউ লেগে আছেন; এঁরাও দলবদলু। এই প্রবণতাগুলি রাজনৈতিক আদর্শের অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।

গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায়, এবার জার্সি বদলে অন্য দলের হয়ে নেমে পড়ার সংখ্যাটা কিছুটা কম। তবে নিজের দলের কর্মী খুনে অভিযুক্ত দলবদলুর নির্বাচনে টিকিট পাওয়াটা বেশ অভিনব। অবশ্য যে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা নিজেই দলবদলকারী, সেই রাজ্যে হয়তো এটাই স্বাভাবিক। মনে রাখা প্রয়োজন, রাজ্যের বর্তমান প্রধানও একসময় দলবদল করেছিলেন; পার্থক্য এই যে, তিনি নতুন কোনো দলে যাননি, বরং নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া, কমবেশি প্রায় সকলেই দলবদলের রোগে আক্রান্ত। কেউ অন্য দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ আবার পিংপং বলের মতো এদিক-ওদিক করেছেন। এই বিষয়ে প্রবীণ-নবীন কেউই আর কলঙ্কমুক্ত নন। রাজনীতিতে নীতি-আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার প্রলোভন যে প্রবল, তা এই ঘটনাগুলি স্পষ্ট করে তোলে।

একটা সময় পুরোনো দল ছেড়ে অন্য দল প্রতিষ্ঠা করা বা নতুন দলে যোগ দেওয়ার পেছনে হয়তো কিছুটা আদর্শ কাজ করত। কিন্তু আজ সেই দিন নেই। আদর্শহীনতা এখন রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যে কোনোভাবে ক্ষমতায় থাকাই আজকাল রাজনীতির একমাত্র উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য দলবদল যেন অতি সাধারণ এক বিষয়। কিন্তু এই দলবদলকারীরা বুঝতে পারছেন না যে, এর ফলে সামগ্রিকভাবে তারা ভারতীয় গণতন্ত্রের বিপদ ডেকে আনছেন। তাদের জন্যই মেধাবী ও মননশীল মানুষরা ক্রমশ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। প্রাজ্ঞ, বুদ্ধিমান, সুবক্তা এবং আদর্শকে বুকে নিয়ে চলা সত্যিকারের নেতারা হারিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রের পক্ষে এটা কখনোই ভালো হতে পারে না। রাজনীতি যদি সমাজ সচেতন সুনাগরিক তৈরি করতে না পারে, তবে রাষ্ট্রের অগ্রগতি আর হবে কীভাবে? এ প্রশ্ন আজ জাতীয় রাজনৈতিক পরিসরে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা।)


* প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, মার্চ ২৬, ২০২৬ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ

Wednesday, March 25, 2026

।।নিজের ভাবনায়।।

     শৌভিক রায়

দাড়ি কামিয়ে দেওয়া, রুটি বেলে দেওয়া, ঘুটে দিতে সাহায্য করা, কোলে তুলে নিয়ে নাচা, ক্রিকেট খেলা, মাঠে নেমে আলু তোলা.... ধন্য তুমি ও তোমরা...

আমার ও আমাদের হাতে ধরা থাক পেনসিল। দিনগত পাপক্ষয় শেষে টিক চিহ্ন দিয়ে রাখি আর একটা দিন এগোলো বলে....



Monday, March 23, 2026


 

গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসবে থাক সৌহার্দ্য, উদারতা 
শৌভিক রায়  

আরও একবার গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব আসন্ন। আগামী বেশ কিছুদিন আমরা, বঙ্গভূমের মানুষরা, মেতে থাকব সেই উৎসবে। 

তিন দশক আগে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর পরই, ভোটকর্মী হিসেবে গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। সেই হিসেবে বিগত তিরিশ বছরে লোকসভা, বিধানসভা আর পঞ্চায়েত ধরে অনেকগুলি নির্বাচন সামলেছি। আর সেটা করতে গিয়েই বুঝতে পারছি, এই রাজ্যে সব কিছুর মতোই বদলে গিয়েছে সেই উৎসব। আজকাল আর কেউই বোধহয় সেই উৎসব উপভোগ করতে চান না। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন মানেই রক্তক্ষয়। তা সে নির্বাচনের আগেই হোক বা পরে। 

অথচ কয়েক বছর আগেও, ভোটকর্মী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছিল এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। গ্রামে বা শহরে ভোট করাতে গিয়ে এই বঙ্গের প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে যেতাম সকলেই। কখনও নিরাপত্তা বাহিনীতে থাকা বিভিন্ন প্রদেশের জওয়ানদের সঙ্গে সখ্য হয়ে যেত অনায়াসে। অন্য দিকে, বিরুদ্ধ মতাবলম্বী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও, মনের অমিল ছিল না। বরং তাঁরা সচেষ্ট থাকতেন নিজেদের এলাকার সুনাম বজায় রাখতে। ফলে বাইরে থেকে আসা ভোটকর্মী, নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন `অতিথি দেব ভব`। প্রত্যেকেই চেষ্টা করতেন নির্বাচনকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করবার। কারণ, দায় সবার। গণতন্ত্র মানে তো নিজেদেরই নির্বাচিত সরকার। ফলে, সেখানে কোনও খাদ ছিল না। ছিল না ধর্ম, সম্প্রদায়, বর্ণ, ভাষা, মতের মল্লযুদ্ধ। বরং সব কিছু মিলেমিশে এই বহুত্ববাদের দেশে বেজে উঠত `বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান`-এর সুর।

অবস্থা যেন বদলে গেল কবে। আজকাল নির্বাচন মানেই উত্তেজনা, মারামারি, হানাহানি। কখনও আবার নিদারুণ প্রহসন ছাড়া কিছুই না। উদাহরণ হিসেবে গত দু`টি পঞ্চায়েত নির্বাচনের কথা বলা যেতে পারে। তুলনায় অনেক বেশি নিরাপত্তা টাকার পরেও লোকসভা ও বিধানসভা ভোটেও যে সব  শতকরা একশো ভাগ সঠিক হয়েছে, সে দাবিও কেউই করবেন না। গণতন্ত্রকে পথে নামানোর চোরাগোপ্তা আক্রমণ চলেছে তখনও। সব কিছু দেখেশুনে মনে হয়েছে, এই জন্য কি দেশ স্বাধীন হয়েছিল? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

আসলে, গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হল সামগ্রিক শিক্ষা। মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষা কিন্তু শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়। প্রকৃত অর্থে একজন মানুষের আত্মিক উন্নয়ন, চিন্তাশক্তির বিকাশ এবং সামগ্রিকতার উত্তরণ হল শিক্ষার মূল কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আজও আমরা তা  অর্জন করতে পারিনি। বরং এক অদ্ভুত অবক্ষয় গ্রাস করেছে করেছে আমাদের। ফলে গণতান্ত্রিক উদারতা নয়, নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু হাসিল করার একমাত্র উপায়। যতক্ষণ না আমাদের নিজেদের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততক্ষণ এই অবস্থা বদলাবে না। এটা বলাই যায়। 

তবু নির্বাচন আসবে, যাবে। কিন্তু তার জন্য পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনষ্ট হোক, সেটা আমরা কেউই চাই না। সুষ্ঠ, সুস্থ, সুন্দর, শান্তির পরিবেশে নির্বাচন হোক, এটাই কাম্য। তার জন্য শুধুমাত্র কঠোর নিয়মবিধি শেষ কথা হতে পারে না, বরং অনেক বেশি প্রয়োজন, নিজেদের সঠিক থাকা। তা হলেই, গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব, উৎসব-ই থাকবে, শোকগাথায় পরিণত হবে না। 

* শিক্ষক, কোচবিহার

(প্রকাশিত: আপনার অভিমত, আনন্দবাজার পত্রিকা উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, মার্চ ২৩, ২০২৬)


     





Sunday, March 22, 2026


 

মোড়ল, মাতব্বরদের দিন গিয়েছে

শৌভিক রায়

পুরানো দিনের মোড়ল নেই, কিন্তু ভোটারের মন কি আজও পরাধীন?

'শুধু অভিযোগ আর অনুযোগ! তোমার কি মন নেই, ভোটার?' জানতে ভীষণ ইচ্ছে করে, এইরকম প্রশ্ন কি করে থাকেন রাজনৈতিক দলের ভোটপ্রার্থী নেতা-কর্মীরা? নাকি তাঁরাও মনে করেন, মানুষের মন বোঝা বড্ড কঠিন। আর সেটা যদি ভোটারের হয়, তবে তা কঠিনতর। একটা সময় কিন্তু রঙ্গভরা এই বঙ্গে ভোটারের মন বোঝা খুব কিছু কঠিন ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে খুব সহজেই তাদের মন বোঝা গিয়েছিল বলেই, সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙালির মসনদ সামলেছিল কার্যত একটি দল। তারপর বদলে গেল অনেক কিছুই। নকশাল আন্দোলন ও পরবর্তীতে জরুরি অবস্থা ভোটারের মন দিল বদলে। হু হু করে পাল্টে গেল সব। এমন সে পরিবর্তন, যা হয়ে উঠল রীতিমতো গবেষণা ও চর্চার বিষয়। কিন্তু ওই অবধিই। এরপর আর ভোটারের মন বুঝতে ভুল করেননি রাজনীতির সেদিনের ধুরন্ধররা। তাই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত থেকেছে এই রাজ্যের রাজনীতির পটচিত্র। আসলে আমরা বাঙালিরা খুব বেশি নাড়াচাড়া বা পরীক্ষা ভালোবাসি না। বরং অনেক বেশি পছন্দ করি স্থিতাবস্থা। তাই ভারতের অন্যান্য নানা রাজ্যে পাঁচ বা দশ বছর অন্তর ভোটারের মন বদলে গেলেও বাংলায় সে দৃশ্য দেখা যায় না। এখানে অনায়াসে ঘটে যায় বিজন সেতু, বানতলা, সিঙ্গুর, সাইবাড়ি, নন্দীগ্রামের মতো নারকীয় ঘটনা। আবার রাজ্যের মন্ত্রীদের জেলযাত্রা, কয়লা-বালি-গরু মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যও 'এহ বাহ্য' হয়ে যায় অনায়াসে। অভয়া কাণ্ডের মতো নারকীয় ঘটনাও তাঁদের মনে শেষ অবধি রেখাপাত করে না। যোগ্য শিক্ষকদের পথে বসে থাকাও ভোটারের মনে বদল আনে না। স্থিতাবস্থা বজায় রাখায় বাংলার ভোটারের মন যেন তুরীয় অবস্থায় থাকে সবসময়। জগদ্দল পাথর হয়ে স্থিতাবস্থায় চলে যাওয়া প্রশাসন আর স্থিতধী বাঙালি ভোটারের মনকে আলাদা করা যায় না কোনও ভাবেই। বহু বছর পরে পরে তার হঠাৎ কখনও মনে হয়, 'অনেক হয়েছে, এবার পাথরটাকে সরানো উচিত।' অতীতে বহু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে দেখতাম, বাড়ির কর্তা কিংবা সম্ভ্রমের মানুষটি পরিবারের অন্য ভোটারদের মন বুঝে নিজের মতো তাঁদের পরিচালনা করতেন। বাড়ির পরিচারকসহ কর্মচারী শ্রেণির মানুষজনও তাঁর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতেন। কেউ বেসুরো গাইলে সেই সদস্য বা কর্মচারীর মন বুঝে নিতেন কর্তা ব্যক্তিটি। ছোট ছোট গ্রামগুলিতেও মোটামুটি একই ছবি ছিল। বিশেষ করে সেই সব গ্রামে যদি একই সম্প্রদায়ের মানুষ থাকতেন, তবে তো কথাই নেই। গ্রামকর্তা বা মোড়লের কথাই ছিল সব ভোটারের মনের কথা। ফলে একবার সেই কর্তার মনের কথা পড়ে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে। জন্মাবধি চা বাগান এলাকায় বড় হয়েছি বলে বোধহয় এই ব্যাপারটা ভালো বুঝেছি। দেখেছি কীভাবে নির্বাচনের দু-তিন দিন আগে, রাতের বেলায় পানভোজন করিয়ে শ্রমিক ভোটারের মন বুঝে নিত রাজনৈতিক দলগুলি। সঙ্গে থাকতেন শ্রমিকদের নেতা বা মাতব্বরজাতীয় কেউ। কোনও কোনও সময় একটি ছাতা বা যৎসামান্য পোশাক দিয়েও ভোটারের মন দখল করে নিত তারা। আর তার ছবি ধরা পড়ত ব্যালট বক্সে। অনায়াসে জিতে যেত উপঢৌকন দেওয়া সেই দল বা তাদের সমর্থিত প্রার্থী। চা বাগানের সরল সহজ গরিব ভোটারদের মন এভাবেই বহুবার প্রলুব্ধ হতো। না বুঝে তাঁরা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন। ভারতের অন্য রাজ্যগুলিতে ভোটারের মন বোঝা এত সহজ নয়। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। তামিলনাড়ুতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ সাল অবধি মোট কুড়ি বছর টানা রাজত্ব করেছিল কংগ্রেস। ১৯৬৭-তে আন্নাদুরাইয়ের ডিএমকে ক্ষমতায় এসে কাটিয়েছিল পরবর্তী দশ বছর। ১৯৭৭ সালে এমজি রামচন্দ্রন এআইএডিএমকে প্রতিষ্ঠা করবার পর মোটামুটিভাবে পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে তাদের ও ডিএমকে-র মধ্যে। বহুবার বহু চেষ্টা করেও সেখানকার ভোটারের মন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন পোড়খাওয়া রাজনৈতিক নেতা বা বিশ্লেষক। স্বাধীনতার পর থেকে কেরালায় ভোটারের মন এখনও পর্যন্ত বাইশ বার ক্ষমতার অদলবদল ঘটিয়েছে। তুলনায় কর্ণাটকের ভোটার খানিকটা স্থিতাবস্থা পছন্দ করলেও সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর বদল হয়েছে প্রায় তেইশ বার। অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ভোটারের মনের এই পরিবর্তন সাতবার, গুজরাটে আটবার। তুলনামূলকভাবে দেশের পূর্বদিকের রাজ্যগুলির মধ্যে অসমের ভোটারের মন পশ্চিমবঙ্গের মতোই পাঁচবার বুঝতে পেরেছে রাজনৈতিক দলগুলি। তুলনায় অনেক এগিয়ে ওড়িশা, মণিপুর, নাগাল্যান্ডের মতো রাজ্যগুলি। এই সব রাজ্যেই ভোটারের মন দশবারের বেশি বদল এনেছে। বহুত্ববাদের এই দেশে যেখানে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের ভাষা, বর্ণ, খাদ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার, ব্যবহার ইত্যাদি সবই আলাদা, সেখানে ভোটারের মন আলাদা হবে—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে ভোটারের মনের যে একটা যোগ রয়েছে, সেটা স্পষ্ট। কেরালায় স্বাক্ষরতার হার ৯৬.২ শতাংশ। তামিলনাড়ু ও পন্ডিচেরিতে ৮৫.৫ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমেও ৮০ শতাংশের ওপর। কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ বা অসমে ভোটারের মনের গতিপ্রকৃতি আঁচ করা অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় অনেকটা সহজ। আসলে স্বাক্ষরতা আর শিক্ষা এক নয়। আর রাজনৈতিক শিক্ষা ও জ্ঞান তো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। বলতে দ্বিধা নেই, এই বিষয়ে আমাদের রাজ্যের ভোটারের মন অনেকটা পিছিয়ে। আবার সর্বভারতীয় স্তরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে রাজ্যের অধোগতিও প্রমাণ করে আমাদের রাজনৈতিক দৈন্য। এরকম বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের ব্যাপক খামতি রয়ে গেছে। ফলে ভোটারের মন বোধহয় সেভাবে পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি আজও। এর সঙ্গে দিন দিন বেড়ে চলেছে ড্রপ আউট, ছদ্ম ও সাময়িক বেকারত্ব এবং পরিযায়ীর সংখ্যা। আর তাতেই সামান্য চাকরি বা ভাতাকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরছে এক বিপন্ন বিরাট প্রজন্ম, যারা আজ ও আগামীর ভোটার। এদের মন বোঝা খুব কিছু কঠিন নয়। যেন-তেন-প্রকারেণ উপার্জন ও জীবনধারণ তাদের একমাত্র পাখির চোখ। আজ যে রাজনৈতিক দল ভোটারের মনের শুধু এইটুকু বুঝতে পারবে, অ্যাডভান্টেজ তাদের। তার প্রমাণও যে আমরা পাচ্ছি না, তেমন নয়। অতীতেও ভোটারের মনের এই নির্লিপ্ততা 'প্রমোদ জ্যোতি মাতব্বর, আপেল পেঁয়াজ এক দর' হওয়ার পরেও বদলায়নি। কিন্তু সেটা বুঝতে পারেননি সেদিনের বিরোধী পক্ষ। উল্টে বিরোধিতা করতে গিয়ে ক্রমে সাইনবোর্ডে পরিণত হয়েছেন। একইভাবে বর্তমানের 'জিতলে গণতন্ত্র, হারলে ষড়যন্ত্র' সময়েও ভোটারের মন একইরকমভাবে নির্মোহ। হয়তো কখনও বিবেকের অত্যাধিক তাড়নায় সে পালাবদলের ডাক দেয়, কিন্তু পরক্ষণেই আবার আপোসের রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। ফলে সেদিনের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক আজ বিরোধী দল হয়ে ক্রমে শূন্যে মিলিয়ে যায়। বঙ্গের ভোটারের মন এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত নির্মম বলা যেতেই পারে। কেননা মাত্র এক দশকে সে নিজের একসময়ের পথপ্রদর্শককে ব্রাত্য করেছে। তাঁদের অবস্থা আজ এমনই যে, দূরবীন দিয়ে দেখলেও খুঁজে পাওয়া যায় না। সমাজমাধ্যমে তাঁদের দাপুটে উপস্থিতি কিংবা জনসভায় ভিড় থাকা সত্ত্বেও ক্ষয় অব্যাহত। সেজন্যই বলছি, ভোটারের মন বোঝা সবসময় সহজ হয় না। তবে ভারতীয় গণতন্ত্রে শেষ কথা হলো সংখ্যার প্রাধান্য। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত সমীকরণ। গণতন্ত্রের পক্ষে সেটি কতটা স্বাস্থ্যকর কে জানে। কিন্তু বোধহয় সেটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ৬৫.৭৯ শতাংশ ভোটার নিজেদের মনের কথা বলেছিলেন ভোটিং মেশিনে। অর্থাৎ মনের কথা না জানানোর দলে ছিলেন ৩৪.২১ শতাংশ। বিজয়ী দলের ভোটের শতাংশ ছিল ৩৬.৫৬। এখানেই ভাবনা আসে যে, মনের কথা না বলা ভোটাররা যদি তাঁদের ভোট বিরোধীদের দিতেন, তবে নির্বাচনের ফল পুরোটাই বদলে যেত। সেই অর্থে দেখতে গেলে গণতন্ত্রের এই প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ সময় সংখ্যালঘু ভোটারের মন জয় করে পরবর্তী পাঁচ বছরে তখতে মৌরসীপাট্টা গেড়ে বসে কোনও রাজনৈতিক দল। সংখ্যাতত্ত্বের এ এক অদ্ভুত খেলা। আর একটা ব্যাপার হলো, ভারতীয় গণতন্ত্রে এখনও ব্যক্তিপুজো করেই চলেছে মানুষ। দলবদলু বহু নেতার বারংবার জয় সে কথাই প্রমাণ করে। ভোটারের মন এক্ষেত্রে বুঝতে অসুবিধে হয় না। সে মন চলে নেতার সঙ্গে সঙ্গে। কখনোই স্বাবলম্বী হয় না সে। নিজের মনের ওপরেই থাকে না তাঁর আস্থা। সেটা না হলে আদর্শহীন, নীতিহীন, ভ্রষ্ট এই রাজনৈতিক ধান্দাবাজরা কখনোই নির্বাচনে জিততে পারতো না। তাঁদের জিতিয়ে দেয় ভোটারের অপ্রাপ্তবয়স্ক মন। তবে সম্প্রতি ভোটারের মনের অদ্ভুত দোলাচল দেখছি। সরকারি ভাতার টাকা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্রিগেডে ভাষণ শুনতে হাজির হওয়া তরুণ ভোটার আপাতত ভাইরাল। বহু ভোটার মনে করছেন, বিগত এক-দেড় দশকে স্রেফ রাজনীতি করে যদি কোনও ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী কোটিপতি হয়ে যায় বা কুঁড়েঘরে থাকা দিনমজুর পাঁচতলা হাঁকায়, তাহলে সরকার বিভিন্ন খাতে যে টাকা ভাতা দিচ্ছে, সেটা নেওয়ায় কোনও লজ্জা নেই। বরং বেশি করে সেটিই নেওয়া উচিত। কেননা এই টাকা তাঁদের নিজেদের। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের টাকা নিচ্ছেন। কেউ আলাদা করে দিচ্ছে না। কিন্তু তার জন্য ঋণী থাকবার প্রয়োজন নেই। ভোটবাক্সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ব্যাপার নেই। অবশ্য এই ভাবনার বিপরীতেও বহু মানুষ আছেন। এই দেওয়ার জন্য তাঁরা দু-হাত তুলে বরাভয় দেখাচ্ছেন শাসক দলকে। কিন্তু একটি জায়গায় বোধহয় প্রত্যেক ভোটারের মন এক। সেটা হলো উন্নয়ন ও সুশাসন। খাতায়-কলমে নয়, আক্ষরিক অর্থে। কোনও সন্দেহ নেই, বিভিন্ন কারণে আজ এই রাজ্যের সুনাম তলানিতে। রাজ্যের বাইরে থাকা তরুণ দুই ভোটার জানালেন, ‘নির্বাচনের দিন ঘোষণার সাংবাদিক সম্মেলনে যেভাবে প্রত্যেক সাংবাদিক পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে প্রশ্ন করলেন, তাতে আমাদের লজ্জা আরও বেড়েছে। অফিসে আমরাও অনেকের প্রশ্নের মুখে।’ এই লজ্জা বোধহয় এই মুহূর্তে আমাদের রাজ্যের সব ভোটারের মনে। তার মধ্যেই আবার ওত পেতে আছে সাম্প্রদায়িক শক্তির শক্ত হাত। আমাদের রাজ্যের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে যে ব্যাপারগুলি আগে ছিল না, সেগুলি বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। ধর্মীয় উন্মাদনায় কম যাচ্ছে না কেউই। পাশাপাশি রয়েছে বেকারত্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, হানাহানি-রক্তক্ষয়, সংঘাত, অপশাসন, দুর্নীতি ইত্যাদির মতো ব্যাপার। সব কিছু মিলে ভোটারের মন খানিকটা হলেও সংকটে। শাঁখের করাতের মধ্যে পড়েছেন তাঁরা। রক্তক্ষরণ দু-দিকেই। ফলে অন্তত এই মুহূর্তে তাঁরা বুঝতে পারছেন না ঠিক কীভাবে বলবেন মনের কথা। তাঁদের অবস্থাটা অন্তত এখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কথায় অনেকটা— ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ’।


https://a2onuswor.com/view?articale_id=a9d4d040-6b76-4473-b57d-31905bb14590


** প্রকাশিত: সানডে ফানডে: অ2অনুস্বর / সম্পাদক: শ্রী রূপায়ণ ভট্টাচার্য 

Monday, March 9, 2026


 

উত্তরবঙ্গে পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোর ইতিহাস 

(উত্তরবঙ্গে শিক্ষা বিস্তারে মিশনারিদের ভূমিকা—ঐতিহ্য, সামাজিক পরিবর্তন ও আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ।)

শৌভিক রায় 

বহুদিন আগের কথা। তখন ডিসেম্বর মাস এলেই অপেক্ষায় থাকতাম, কবে সেভেনথ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চ থেকে ছাত্রছাত্রীরা বাইবেল বিতরণ করতে আসবে। উত্তরের ছোট্ট জনপদে তখনও অবশ্য বড়দিনের জাঁকজমক সেভাবে ছিল না। কেক, পেস্ট্রি ইত্যাদি পাওয়াও অনেক দূরের ব্যাপার। তবে চার্চ যে স্কুলটি পরিচালনা করত, সেই স্কুলের খ্রিস্টান শিক্ষকদের কোয়ার্টার্সে গেলে, ঘরে বানানো সুস্বাদু পাই পাওয়া যেত। শোনা যেত খ্রিস্টমাস ক্যারোল। সবুজ খ্রিস্টমাস ট্রি সহ নানা রঙে চার্চ ও স্কুল সেজে উঠত।

তখনও জানতাম না, ১৯৪৯ সালে এম জে চ্যাম্পিয়ান তাঁর সহযোগী জেনসেনকে নিয়ে সুদূর কার্মাটার থেকে রবিনসন এসডিএ হাইস্কুল-কে সরিয়ে এনেছিলেন সেদিনের ছোট্ট ফালাকাটায়। ৫০০ একর জমি কেনা হয়েছিল শুভানুধ্যায়ী মিসেস রেমন্ডের আর্থিক সহযোগিতায়। বদলে গিয়েছিল স্কুলের নাম। সেদিন থেকেই শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে স্কুলটি। তবে শুধু শিক্ষাদান নয়। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি হচ্ছে বিরাট হাসপাতাল। আসলে গোটা বিশ্বে শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিষেবায় সেভেনথ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের নাম প্রথম সারিতে। ফলে, শুধু ফালাকাটা নয়, উত্তরের বহু জনপদে তাদের সেবামূলক কাজ চলে নিঃশব্দে।

এটা ঠিক যে, মূলত ধর্ম প্রচারের জন্যই খ্রিস্টান মিশনারিরা উত্তরবঙ্গে পা রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁরা শুধুমাত্র সেই গণ্ডির মধ্যে নিজেদের আটকে রাখেননি। কোচবিহারের কথাই ধরা যাক। ১৮৭৮ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে বিবাহের পর কোচবিহারে এসে, মহারানি সুনীতি দেবী এখানে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন। অনুভব করেছিলেন, মহিলাদেরও শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাঁর অনুরোধে মধ্যপ্রদেশ থেকে সুইডিশ মিশনের লিডিয়া ম্যাগুনসন কোচবিহারে আসেন। তাঁকে মহারানি প্রতিষ্ঠিত সুনীতি একাডেমির সেলাই শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। লিডিয়া চেয়েছিলেন মহারাজার নিজস্ব ব্যান্ড পার্টিতে কর্মরত খ্রিস্টান পরিবারের সন্তানরাও শিক্ষিত হয়ে উঠুক। তাঁর অনুরোধে সুনীতি দেবী মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাজ আমলে কোচবিহারে মিশনারিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সুইডিশরা ছাড়া আর কোনও ইউরোপিয়ান মিশনারি শিক্ষা বিস্তার করতে পারবে না, এই শর্তে লিডিয়া ম্যাগুনসনের আবেদন গ্রাহ্য হয়। মধ্যপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসা হয় লিলি উইলম্যানকে। ১৯০০ সালে তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয় একটি হোম স্কুল। কালক্রমে সেটি শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে আজ শহরের অন্যতম নামী স্কুল বলে পরিচিত। সুইডিশ মিশনের সঙ্গে আজ অবশ্য সেই স্কুলের সম্পর্ক নেই। তবে নর্দার্ন ইভানজেলিক্যাল লুথারেন চার্চের অধীনে রয়েছে অন্ধদের জন্য একটি স্কুল। আজ কোচবিহারে সুইডিশ মিশন বলতে সেটিকেও বোঝেন অনেকে।

আলিপুরদুয়ার শহরের একটি স্কুল, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও আধিকারিক পি এন ম্যাকউইলিয়ামের নামে হলেও, তিনি কিন্তু সরাসরি মিশনারিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। যেমন ছিলেন না ব্রিটিশ আধিকারিক ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস জেনকিন্স। তাঁর নাম উল্লেখ করলাম কারণ ওই নামে, ১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত, স্কুলটি আজ শুধু কোচবিহারের নয়, গোটা রাজ্যের গর্ব। তবে আলিপুরদুয়ার জেলার মহাকালগুড়ির শতবর্ষ প্রাচীন স্কুলটির ক্ষেত্রে স্কটিশ মিশনারি এ ডব্লিউ এফ ম্যাককাচেনের প্রধান ভূমিকা ছিল। এই অঞ্চলটি বক্সা অরণ্যের রায়ডাক ডিভিশনের কাছাকাছি ও প্রত্যন্ত বলেই পরিচিত। আদিবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজন নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। নারী শিক্ষার গুরুত্ব বুঝে এখানে মেয়েদের জন্যও আলাদা স্কুল স্থাপন করা হয়েছিল। আসলে পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তুলতে সবার আগে নারী শিক্ষার প্রয়োজন, সেটা বোধহয় মিশনারিদের চাইতে আর কেউ ভাল বোঝেননি। এই জেলাতেই ব্যাপটিস্ট মিশনের স্কুল দেখা যায় বীরপাড়ার মতো চা বাগান ও মেন্দাবাড়ির মতো অরণ্যে ঢাকা জনপদে। প্রেসবিটেরিয়ান, ক্যাথলিক ইত্যাদি মিশনারিদের অবদানও কম নয় আলিপুরদুয়ার জেলার শিক্ষাবিস্তারে।

জলপাইগুড়ি জেলায় অন্যান্য যে মিশনারি সংস্থাগুলি দেখা যায় তাদের মধ্যে হিমালয়ান ইভাঞ্জেলিক্যাল মিশন, সেলেসিয়ান অফ ডন বসকো, চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়া, মিশনারিজ অফ চ্যারিটি, মান্না মিশন, মিশনারি সিস্টার্স অফ মেরি হেল্প অফ খ্রিস্টানস, বিলিভার্স ইস্টার্ন চার্চ, এসেম্ব্লিজ অফ গড ইত্যাদি প্রধান। এদের অধীনে থাকা বিভিন্ন স্কুলগুলির শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। শুধু শিক্ষা প্রসারে নয়, এঁরা কাজ করছেন সমাজের নানা ক্ষেত্রে। জলপাইগুড়ির বিভিন্ন চা বাগানে তাঁদের সেবামূলক কাজ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের জন্যও তাঁদের অবদান ঈর্ষণীয়। লঙ্কাপাড়া, মাকড়াপাড়ার মতো এক সময়ের দুর্গম এলাকায়ও তাঁরা অনায়াসে পৌঁছে গেছেন। কদমপুর, সিমলাবাড়িতেও চলছে মিশনারিদের কর্মযজ্ঞ। চালসা, নাথুয়া, বিন্নাগুড়ি ইত্যাদি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থাও অনেক অংশে নির্ভর করছে মিশনারিদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলির ওপর। এই প্রসঙ্গে মালবাজারের শিক্ষাব্রতী রেভারেন্ড জন থ্যাটসের কথা বলতেই হয়। মালবাজারে বেড়াতে এসে তিনি দেখেন যে, এখানকার ছাত্রদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে দার্জিলিং, কালিম্পঙ কিংবা কলকাতায় পাঠানো হচ্ছে। তখনই তিনি এই অঞ্চলে প্রথম ইংরেজি মাধ্যম স্কুল স্থাপনের জন্য মনস্থির করেন। গড়ে ওঠে বয়েজ টাউন নামে অনাথ আশ্রম এবং তার অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি স্কুল। সেই স্কুল আজকের মালবাজারের গর্ব।

ডুয়ার্সের তরঙ্গায়িত ভূমি ছেড়ে যদি চোখ ফেরাই দার্জিলিং বা কালিম্পঙের পাহাড়ি অঞ্চলে, তাহলে দেখব পাহাড়ের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারিরা অন্যদের চাইতে অনেক এগিয়ে। এখানে মূলত স্কটিশ মিশন ও রোমান ক্যাথলিক মিশনকে চোখে পড়ে। তাঁদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ের সামাজিক বিকাশে তাঁদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এই রাজ্যের বহু নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হল দার্জিলিং পাহাড়। ভাবতে অবাক লাগে সেই কবে ১৯০০ সালে, ডক্টর গ্রাহামস হোমসের মতো মানুষ কালিম্পঙের ডেলো পাহাড়ের কাছে অনাথ আশ্রম সহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজের স্কুল। মনে পড়ছে রেভারেন্ড উইলিয়াম ম্যাকফার্লেনের কথাও। ১৮৭৩ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি কালিম্পঙের প্রথম স্কুল। দার্জিলিংয়ের লোরেটো কনভেন্ট অবশ্য আরও পুরোনো। এটির প্রতিষ্ঠা ১৮৪৬ সালে। মাদার টেরিজার সেন্ট হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও কিন্তু দার্জিলিংয়ের অবদান কম নয়। কেননা ভারতে এসে তিনি বেশ কিছুদিন ছিলেন দার্জিলিংয়ে। ফরেন মিশন সোসাইটি অফ প্যারিস, সুইস ক্যানন রেগুলারস, খ্রিস্টান ব্রাদার্স প্রমুখরাও পিছিয়ে নেই। পাহাড়ের লেপচা, নেপালি, ভুটিয়া সহ সব ধরনের মানুষকেই তাঁরা সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি থেকে শুরু করে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন।

একটি পরাধীন দেশের মানুষকে শিক্ষিত করে না তুললে, দেশটি যে এগোবে না সেটি বিলক্ষণ বুঝতেন মিশনারিরা। তাই ধর্মীয় শিক্ষার প্রদানের সঙ্গে, তাঁরা অনুভব করেছিলেন আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। সেই সময় এই অঞ্চলের প্রাজ্ঞ মানুষেরাও তাঁদের সাহায্য করেন। নিঃস্বার্থভাবে দান করেন স্কুলের জন্য জমি। দেন আর্থিক অনুদান। সামাজিক ও ধার্মিক অসহিষ্ণুতাকে দূরে সরিয়ে রেখে, দেশ গড়ার কাজে ব্রতী হন সকলেই। আজ যে শিক্ষার গর্ব করছি আমরা, তার পেছনে সেই মহাপ্রাণ মিশনারি ও স্থানীয় মানুষদের কথা ভুললে চলবে না।

(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)

https://uttarbangasambad.com/contribution-of-missionaries-in-north-bengal-education-history/?fbclid=IwY2xjawQbMohleHRuA2FlbQIxMABicmlkETFPa0ZHZWxqWlpHVXdlMFdmc3J0YwZhcHBfaWQQMjIyMDM5MTc4ODIwMDg5MgABHm8em8sMXrP5JePjwGsYuT6lyi3slXYOZZdvxXWvUxKAXq_SAIryZqcuZsRX_aem_5gLjIz5-lKuCn9AlL5VcXw

* প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, মার্চ ৯, ২০২৬
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ

Sunday, March 8, 2026

 



সিরিজ: মা 

পর্ব- বত্রিশ 

ফাল্গুন চৈত্র এলেই দিদার কথা মনে পড়ে। 

আর দিদার কথা মনে হলেই চোখে ভাসে তুলসি বেদি। তুলসি গাছের ওপর ঝুলছে মাটির ছোট্ট ফুটো পাত্র। স্নান সেরে দিদা সেই পাত্রে জল ঢালছেন। বহুক্ষণ ধরে জল টপটপ করে তুলসি গাছে জল ঝরে পড়ছে। 

টানের দিন এলে তাই দিদা ফ্ল্যাশব্যাকে বারবার। এই টান অবশ্য শুধু চৈত-ফাগুনের টান নয়। এর মধ্যে রয়েছে আরও কিছু গুহ্য কথা! সেসব বোঝে সাধুচরণ। বোঝে আর আর ফক ফক হাসে!

আমাদের তখন একটা অদ্ভুত ঘর ছিল। বিরাট বিরাট ডুলি সেই ঘরের প্রায় পুরোটা দখল করে নিলেও, হাতুড়ি, বাটাল, শাবল, দড়ি, খন্তা, দা, সাইকেলের ভাঙা স্পোক, ফাটা টায়ার, পুরোনো শাড়ি ইত্যাদি হরেক কিসিমের জিনিস নিয়ে সে ঘর ছিল প্রবল হাতছানির। লুকোচুরি খেলায় সেই ঘরে বড় বড় ডুলির পেছনে কতবার যে লুকিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই!

বিয়ের পরে পরে মা'কে দিদা একবার বলেছিলেন, 
- পাকঘরের পিছনের ওই ঘর থেইক্যা দাওহান লইয়া আসো তো রীতা।

নতুন বউ। শাশুড়ির আদেশ মানলেও 'দাওহান'-এর অর্থ রাঢ় বঙ্গের মেয়ের বোঝা হয়নি বলে, মা সেই ঘরে ঢুকে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন। বুঝতে পারছিলেন না ঠিক কোন জিনিষটা নেবেন।  

খানিক বাদেই দিদার আগমন। নিজেই বুঝে নিয়েছিলেন  আদরের দিদিমণি বউমা তার ভাষা বোঝেননি। দা আর খান কে যোগ করে 'দাওহান' অবশ্য অতি সাধারণ বুলি ছিল সেদিনের উদ্বাস্তু বাড়িতে!

দিদার গুরুদেব আসবার তালে থাকতাম। গুরুদেব এলেই দলা প্রসাদ। ওহো কী তার স্বাদ! আতপ চাল, ন্যাতনেতে আলু ভাজা, ডাল, ঘি, সবজি ইত্যাদি সব মিলে সেই দলাকে মনে হত অমৃত! কী নাম ছিল গুরুদেবের? জানি না। জানার চেষ্টাও করিনি। দিদার ঠাকুরঘরে গুরুদেবের ছবি ঝুলত। কোথায় গেল সেই ছবি? জানা নেই তাও... মানুষটার মুখটা অবশ্য মনে আছে আজও। কিন্তু আর কিচ্ছু জানি না। এমনটাও হয়? হয় বোধহয়। ওই যে... সাধুচরণ আবার ফক ফক হাসছে....

তুলসি বেদি আছে। গাছও। রীনা জল দেয়। পুজো করে। সন্ধ্যায় আমি প্রদীপ দেখাই। 

টানের দিন। মাটির পাত্রটা খুঁজি। টপটপ করে জল ঝরে যেটা থেকে। পাই না। 

দিদার জিনিস মা যত্ন করে রেখেছিলেন। ওটা কোথায় কাকে জিজ্ঞেস করব বুঝে পাই না।

 সাধুচরণকে বার কয়েক বলেছি। হাসি বন্ধ করে, সে চোখ মুছেছে শুধু.....


(ছবি- গয়ার ব্রহ্মযোগীর পথে দাদা ও আমাকে নিয়ে মা ও দিদা। দাদা দিদার পাশে। মা আমাকে জড়িয়ে। )

Wednesday, March 4, 2026


 

কোচবিহারের হেরিটেজ পোস্ট অফিস 

শৌভিক রায় 


অতীত ইংল্যান্ডে ডাক ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ব্যয় সাপেক্ষ। সত্যি বলতে সাধারণ মানুষের প্রায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই। ফলে গরীব মা`কে খামের ওপর নির্দিষ্ট একটি চিহ্ন দিয়ে পরিযায়ী সন্তানটি বুঝিয়ে দিত সে ভাল আছে। কেননা চিঠিটি নিতে যে পয়সা খরচ করতে হবে সেটি দিয়ে হয়ত দুদিনের খাওয়া হয়ে যাবে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রাবন্ধিক এ জি গার্ডিনার বলছেন, মহার্ঘ ছিল বলেই চিঠি লেখা একটি শিল্পে পরিণত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি কিটস, কার্লাইল প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকদের চিঠির কথা উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তীতে ডাকে চিঠি পাঠানো সস্তা হয়ে যায় যখন পেনি-পোস্টের প্রচলন হয়। অর্থাৎ পেনি বা সামান্য পয়সা খরচ করলেই ডাকে চিঠি পাঠানো যেত। গার্ডিনার বলছেন, এই সস্তা হয়ে যাওয়া ব্যাপারটি চিঠি শিল্পের অপমৃত্যু ঘটিয়েছিল। পরবর্তীতে টাইপ-রাইটারের মতো দ্রুত লিখে ফেলার যন্ত্র আবিষ্কার হলে সেটি আরও ত্বরান্বিত হয়। 


স্থানিক ইতিহাস নিয়ে লিখতে বসে ইংল্যান্ডকে দিয়েই শুরু করলাম। না, কোনও কলোনিয়াল হ্যাংওভার নয়। শুধুমাত্র সেই আমলের ডাক ব্যবস্থা বোঝাতে। আসলে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পোস্ট অফিস নিয়ে সেভাবে এর আগে কাজ হয়নি। সেদিক থেকে `দাগ' পত্রিকার এই উদ্যোগ অভিনব। তথ্য প্রযুক্তির এই প্রবল বিস্ফোরণের যুগে পৌঁছে মনে হয়, আজ গার্ডিনারের মতো মানুষ বেঁচে থাকলে কী বলতেন! এখন তো এই সেদিনের `এস এম এস` বা `শর্ট মেসেজ সার্ভিস`ও  প্রায় ব্রাত্য। চোখের নিমেষে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ছবি বা ভিডিও সহ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিভিন্ন ব্যবস্থা হাতের মুঠোয় মজুদ। পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটার, এনভেলোপ ইত্যাদিও এই প্রজন্ম দেখেছে কিনা সন্দেহ। টাকা জমা ও তোলা ছাড়া পোস্ট-অফিসের আর কতটা প্রয়োজনীয়তা আজকের দিনে রয়েছে, সেটিও গবেষণার বিষয় হতে পারে। খাকি পোশাকে বসন্তের পোস্টম্যান এখন নস্টালজিয়া আক্রান্ত কবি-সাহিত্যিকদের অবসেশন। আগামী দিনে আর কী আসতে চলেছে, সেটা আমরা এই মুহূর্তে কল্পনাও করতে পারছি না।


এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বিশ্বের প্রথম ডাক ব্যবস্থা চালু হয়েছিল জিশুর জন্মের ২০০০ বছর আগে প্রাচীন মিশরে। নিজেদের এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে রীতিমতো বাহক পাঠিয়ে চিঠি পৌঁছতেন ফ্যারাওরা। তাঁদের রাজত্বের আরও হাজার বছর পর, মোঙ্গলদের চিনে, চাও বংশের রাজত্বকালে, `পোস্ট হাউস রিলে সিস্টেম` চালু হয়। পিছিয়ে ছিলেন না সাইরাসের পার্সিয়ান রাজারাও। অবশ্য তাদের অবদান কিছুটা পরে।  খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে তাঁরা পোস্টহাউসের মাধ্যমে দ্রুতগামী ডাক-ব্যবস্থা চালু করেন। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের শাসনের ভিত্তি ছিল কিন্তু চিঠির দ্রুত আদান-প্রদান। সে ব্যাপারে রোমান শাসকরা আবিষ্কার করেছিলেন  cursus publicus যা ছিল সেই আমলের সবচেয়ে দ্রুত ডাক-ব্যবস্থা। দিন যত এগিয়েছে ডাক-ব্যবস্থার তত উন্নতি হয়েছে। নতুন নতুন উদ্ভাবন এসেছে। মধ্যযুগ স্পর্শ করে আধুনিক কাল পৌঁছতে পৌঁছতে ডাক-ব্যবস্থারও আমূল পরিবর্তন এসেছে। 


অতীত বিশ্বের সঙ্গে যদি নিজেদের দেশের দিকে তাকাই, তাহলে কিন্তু খুব কিছু পার্থক্য দেখছি না। এই দেশেও একসময় বিভিন্ন ছোট ছোট রাজ্যের মধ্যে দূত পাঠিয়ে বার্তা আদানপ্রদান হত। দ্রুতগামী অশ্ব, পায়রা ইত্যাদির সাহায্য নেওয়া হত চিঠি পৌঁছনোর ক্ষেত্রে। কিন্তু পোস্টহাউসের ধারণা ভারতে সম্ভবত ছিল না। ১৭৬৬ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস `কোম্পানি মেল` নামে পোস্টাল সার্ভিসের উদ্যোগ নেন। তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব চলছে। ১৮৫৪ সালে লর্ড ডালহৌসি ইন্ডিয়া পোস্ট অফিস এক্ট পাস করানোর ব্যাপারে উদ্যোগী হন। ১৮৩৭ সালের এক্টের চাইতে এটি ভারতে পোস্ট-অফিস খুলবার ব্যাপারে অনেক বেশি কার্যর্করী হয়েছিল।  


কোচবিহারে ঠিক কবে থেকে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছিল সে বিষয়ে খুব কিছু প্রামাণ্য তথ্য নেই। কেন নেই সে প্রশ্ন করেও আজ আর লাভ নেই। তবে এই রাজ্যে যে খৎগির বা সরকারি গোপনীয় চিঠি আদান-প্রদানে নিযুক্ত ব্যক্তি ছিল তার উল্লেখ পাওয়া যায়। ছিল হুকুমবরদার, কারপরদাজ, ডাকুয়া, জিনকাপ প্রমুখ নানা পদবীর মানুষেরা। এদের মূল কাজ ছিল চিঠির আদান-প্রদান। আবার চিঠি লেখার কাজেও কিন্তু তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। কিন্তু এই সব ব্যবস্থায় সেভাবে আধুনিকতার ছাপ পড়েনি। 


কিছুটা পরিবর্তন এলো মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণের রাজত্বকালে। তিনি ১৮১৩ সালে রংপুর থেকে ভেলাডাঙ্গা অবধি একটি নিয়মিত ডাকব্যবস্থা চালু করলেন। মাসিক ব্যয় ধরা হল ৩৭ টাকা ০৮ আনা। ম্যাকলয়েড সাহেবের লেখা চিঠির কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। তিনি রংপুরের কালেক্টর ডিগবি সাহেবকে লিখেছিলেন-  Being about to proceed immediately to Cooch Behar as Commissioner, in pursuance of the orders of Government, under the date 7th of August last, I beg to suggest to you the propriety of a regular dawk being established between this station and the present abode of the Rajah of that Province, near Bheladanga in Cooch Behar, for fecilitating my communications with Government or any authorities, with whom I have may occasion to correspond. এই চিঠির তারিখ ছিল ১৮১৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর। মাসিক ৩ টাকায় ২ জন হরকরা অর্থাৎ ৬ টাকা হিসেবে  রংপুর, কালিদহ, মোঘলহাট, আঠারোবেঙ্কি ও বেলডাঙার জন্য মোট ৩০ টাকা এবং তেল, কাপড় ইত্যাদি বাবদ ৭ টাকা ০৮ আনা খরচ ধরা হয়েছিল।  


এই হিসেবে দেখা যাচ্ছে কোচবিহারের ডাক ব্যবস্থা যথেষ্ট পুরোনো। কিন্তু এর পরের কয়েক দশকে কোচবিহারের ডাকব্যবস্থার ঠিক কী পরিবর্তন এসেছিল, তা বিশেষ জানা যাচ্ছে না। তবে চিঠির আদানপ্রদানে ঘোড়া, নৌকো ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। অবস্থার  কিছুটা পরিবর্তন হল মাঝ শতক থেকে। রংপুরে ১৮৫০ সালে একটি পোস্ট অফিস তৈরি হল। অনেকটা সেই অনুকরণে ১৮৬৪ সালে কর্নেল হটন কোচবিহারে আলাদা ডাক ব্যবস্থা চালু করেন।  কিন্তু ১৮৭৫ সালে কোচবিহারের ডাক ও টেলিগ্রাফকে রংপুরের অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়। 


১৮৭৬ সালকে কোচবিহারের ডাক ব্যবস্থার একটি স্মরণীয় বছর ধরা হচ্ছে। কেননা এই বছরই কোচবিহারে রেল পথ চালু হয়। দ্রুতগামী রেল ডাক ব্যবস্থাকে অনেকটা বদলে দিয়েছিল। ১৯৯৩ অবধি এই রেলপথ ছিল ন্যারো গেজ। ট্রেন চলত গীতালদহ থেকে তোর্ষা ঘাট অবধি। গেজ পরিবর্তন ও তোর্ষার ওপর তৈরি হওয়া ব্রিজ কোচবিহারকে সারা ভারতের সঙ্গে জুড়ে দেয়। ফলে ডাক ব্যবস্থারও দ্রুত উন্নতি হয়েছিল। ইতিমধ্যে কোচবিহারের হলদিবাড়িতে পোস্ট অফিস তৈরি হয়েছে। সারা ভারতের ডাক সেই পোস্ট অফিসেই একত্রিত হত। তারপর কোচবিহারের ডাকের সঙ্গে বিশাল ব্রহ্মপুত্র পার করে ছড়িয়ে পড়ত পূর্ব ভারতে। তবে শুধু হলদিবাড়ি নয়, ইতিমধ্যে দিনহাটা, মেখলিগঞ্জ, মাথাভাঙ্গা, বলরামপুর ইত্যাদি জনপদেও পোস্ট অফিস স্থাপিত হয়েছে। 


কোচবিহারের পোস্ট অফিসটি প্রথমে ছিল পুরোনো পোস্ট অফিস পাড়ায় কবিরাজখানার পাশের অংশে। আধুনিক ডাকের বহুল প্রচলন ও কাজ বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য জনপদের মতো কোচবিহারেও পোস্ট অফিসের দরকার দেখা দিয়েছিল। আজ এই বাড়িটিকে সবাই উপাধ্যায় বাড়ি হিসেবেই জানে। রেলপথ স্থাপনের পর রেল গাড়িতে ডাক দেওয়া নেওয়ার জন্য এরপর পোস্ট অফিস স্থানান্তরিত হয় কোচবিহার রেল স্টেশনের সামনে সুকুলদের বাড়ির পাশে। কিন্তু প্রয়োজন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলে শুরু হয় কোচবিহার হেড পোস্ট অফিসের কাজ। ১৯২১ সালে এই কাজ শুরু করেছিলেন মহারাজা জিতেন্দ্রনারায়ণ। তাঁর মৃত্যুর পর কাজটি সম্পূর্ণ করেন মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ। চন্দন দিঘির উত্তরে বরাদ্দ জমিতে ৮৮৯ বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে এই ভবনটি নির্মাণের জন্য। প্রাথমিক খরচ ধরা হয়েছিল ৮০৫০৮ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছিল ৭৮৬৫২ টাকা। অতীত কোচবিহারের স্থাপত্যকে মাথায় রেখে এই ভবন নির্মাণেও ব্যবহার করা হয়েছে নিও-রোমান শৈলী। ইতিমধ্যেই হেরিটেজের তকমা পেয়েছে কোচবিহারের হেড পোস্ট অফিস। গর্বের বিষয়, ভারতীয় ডাক বিভাগ সারা দেশের যে ছয়টি হেরিটেজ পোস্ট অফিসের ডাক টিকিট প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে এই অনিন্দ্যসুন্দর ভবনটি। এই পোস্ট অফিসে এখনও রয়েছে সেই কালো গোল টেবিলটি যেখানে চিঠি সর্টিং করা হত। সাধারণত ইমিরিয়াল পদ্ধতিতে চিঠি ট্রেনের ভেতর সর্টিং করা হয়। কিন্তু ছোট ছোট সমানভাবে বিভক্ত এই টেবিলে যে পদ্ধতিতে চিঠি আলাদা করা হয়, সেই পদ্ধতি পরবর্তীতে বহু জায়গায় অনুসৃত হয়েছিল। রেলওয়ে মেল সার্ভিসের পাশাপাশি কোচবিহার স্টেট ট্রান্সপোর্ট চালু হওয়ার পর ডাক ব্যবস্থায় আরও কিছুটা পরিবর্তন আসে। ১৯৪৫ সালের ২ এপ্রিল সকাল সাতটায় ডাক নিয়ে যাত্রীবাহী বাস পৌঁছেছিল ফালাকাটায় পৌঁছেছিল সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে। সেখানে থেকে শৌলমারী এসেছিল সকাল ৯ টায়। কোচবিহারের ডাক ব্যবস্থার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ কিন্তু এই পোস্ট অফিস থেকে হত। সেটি ছিল রেভিনিউ স্ট্যাম্প। সেটি বিক্রি করা হত রাজ্যের খাজনা আদায়ের জন্য। 


নবনির্মিত ভবন যেমন কোচবিহারের ডাকব্যবস্থার একটি নতুন দিক খুলে দিয়েছিল, তেমনি ডাক বিভাগের কর্মচারীদেরও নতুন ভাবনায় আন্দোলিত করতে পেরেছিল। এমনিতেই ব্রিটিশ ভারতে ডাক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের দুর্ব্যবহারের বহু দৃষ্টান্ত  রয়েছে। করদ রাজ্য হয়েও কোচবিহারের ডাক ব্যবস্থা তার থেকে আলাদা হতে পারেনি। নতুন ভবন, নতুন ভাবনা এবং সারা দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঢেউ ছুঁয়ে গিয়েছিল এই পোস্ট অফিসের চাকুরেদের। ফলে  `কুচবিহার দর্পণ`-এর ৯ম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা (শ্রাবণ ১৩৫৩, পৃ: ১৭৭) লিখেছে- `গত ১১ই জুলাই হইতে ডাকপিয়ন ও ডাকবিভাগের নিম্নপদস্থ কর্ম্মচারীদিগের ধর্ম্মঘট চলিতেছে। ধর্ম্মঘটের আশঙ্কায়  ডাকবিভাগ পূর্ব্ব হইতেই মণিঅর্ডার, ইন্সিওরেন্স ও রেজিস্ট্রি মাল গ্রহণ বন্ধ করিয়াছেন; কেবলমাত্র সাধারণ চিঠিপত্র গৃহীত ও বিলি হয়ত। ২২শে জুলাই হইতে এই ধর্ম্মঘট আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে ডাকবিভাগ সকলপ্রকার চিঠিপত্র গ্রহণ বন্ধ কোরিয়া দিয়াছেন। কেবল সরকারী চিঠিপত্র গৃহীত ও বিলি হইবার ব্যবস্থা বলবৎ রহিয়াছে। এই ধর্ম্মঘটের ফলে জনসাধারণের  অত্যন্ত অসুবিধা হইতেছে।` স্বাধীনতার পরে ১৯৬৮ সালে এই পোস্ট অফিসে `এফ এন পি ও` নামের সংগঠন তার শাখা খোলে। এর উল্লেখ করলাম বিশেষ কারণে। কেননা এই সংগঠনের প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদার। তিনি ছিলেন কোচবিহার হেড পোস্ট অফিসের অন্যতম কর্মী। তাঁর উপস্থিতি অবশ্যই এই হেরিটেজ পোস্ট অফিসকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।  


এই মুহূর্তে কোচবিহার জেলায় শতাধীক পোস্ট অফিস রয়েছে। তার মধ্যে বেশ কিছু অত্যন্ত প্রাচীন। কিন্তু কোচবিহার হেড পোস্ট অফিসের মতো ধারে বা ভারে কেউই পৌঁছতে পারেনি। খুব স্বাভাবিক সেটি। কিন্তু তাই বলে কারও গুরুত্ব কম নয়। কিছুদিন আগেও কোচবিহার হেড পোস্ট অফিসের পেছনের বিল্ডিংয়ে টেলিগ্রাফ অফিসের অস্তিত্ব ছিল। সেটি আজ আর নেই। কেননা টেলিগ্রাফ ব্যবস্থাই আমূল বদলে গেছে। কোচবিহার হেড পোস্ট অফিসের মুকুটে নতুন পালক হল, পাসপোর্ট তৈরির ব্যবস্থা। এখন জেলাবাসীকে পাসপোর্টের জন্য কলকাতা বা শিলিগুড়ি দৌড়তে হয় না। 


কোচবিহারের বহু কিছুর মতোই হেড পোস্ট অফিস অন্যতম দ্রষ্টব্য। উত্তরে তো বটেই, সারা রাজ্যে এরকম সুন্দর ভবন ও দক্ষ কর্মীর পোস্ট অফিস বিরল। এরকম ঐতিহাসিক একটি ভবনকে নিয়ে লেখার সুযোগ পাওয়াও অবশ্যই লেখককেও গর্বিত করে। 


(ঋণ স্বীকার: প্রসাদ দাস, দেবায়ন চৌধুরী, এবিপি আনন্দ)  



** প্রকাশিত: দাগ (উত্তরবঙ্গের ডাকঘর সংখ্যা ১৪৩১)/ সম্পাদক- মনোনীতা চক্রবর্তী 


Tuesday, March 3, 2026


 

প্রশ্ন জাগে আমরা শিক্ষকরা আসলে ঠিক কী !
শৌভিক রায়

বিখ্যাত ইংরেজ কবি ওডেন দা আননোন সিটিজেন কবিতায় এক সুনাগরিকের কথা বলেছিলেন। সেই মানুষটির বিরুদ্ধে কোনও দিন কোনও রকম অভিযোগ পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের তিনি ছিলেন একদম টেক্সটবুক উদাহরণ। আসলে রাষ্ট্রের চোখে জীবন ব্যাপারটি এমন এক বিজ্ঞান, যার উন্নতি শুধু ক্রমবর্ধমান বিস্তারিত তথ্যের মাধ্যমেই যাচাই করা যায়। আর সেটি করতে গিয়ে রাষ্ট্র ব্যক্তির জীবনের স্বাধীনতা, আনন্দ ইত্যাদির কোনও মূল্য দেয় না। বরং ব্যক্তিকে নানাভাবে বেঁধে রাখতে পারলেই তার লাভ।

প্রায় তিন দশক সসম্মানে শিক্ষকতা করবার পর, নিজের স্কুলে, নতুন করে, আবার নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি জমা দিতে গিয়ে এই কথাগুলিই মনে হচ্ছিল। নীল ইনল্যান্ড লেটারে একদিন যে নিয়োগপত্র স্বাধীনতা ও সম্মানের বার্তা এনেছিল, আজ সেটিই যেন গোলামির শক্ত শেকল। এ এক এমন ক্রীতদাসত্ব, যেখানে প্রাইভেট টিউশন না পড়িয়েও মুচলেকা দিয়েছি, আমি টিউশনের সঙ্গে যুক্ত নই। আমার খারাপ লাগলেও বলতে পারিনি কিছু। একই পদ্ধতিতে মেনে নিয়েছি `স্কুল টিচারদের তো শুধু ছুটি আর ছুটি` বলে ক্রমাগত টিটকিরি। অথচ বিশ্বাস করুন, আমি ছুটি চাইনি। বাধ্য হয়েছি।

চাইনি আমার স্কুলটি বিদ্যার আলয় থেকে বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত হোক। গ্রামের স্কুলগুলিকে প্রায় শিক্ষক-শূন্য করে দিয়ে দলে দলে শহরে চলে আসার যে পথটি খোলা হয়েছিল, সেটিও আমাকে আনন্দ দেয়নি। কিন্তু আমার আপত্তি শুনছে কে! বরং সুযোগ পেয়ে নিজেও তার সদ্ব্যবহার করেছি। বাঁকা পথে হলেও। সমস্যা হল, রাষ্ট্র সেদিন তথ্য চায়নি। আজও চায়নি। উচ্চ ডিগ্রি-প্রার্থী গবেষকের তথ্য আরোহনের প্রচেষ্টায় হয়ত এসব রয়ে যাবে। কিন্তু রাষ্ট্র যে সেই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, জাগছে আর কোথায়! দোষ নেই তার। ঘুম তো সবারই পায়! আর তাছাড়া আমি একজন মাস্টার। প্রাপ্য এই বিশেষণে, নিজের আড়ালে, আপনার মুখে 'মশাই'টুকু যোগ করতে পারিনি, শিক্ষক হওয়া তো দূরের কথা! কী যায় আসে আমার বলা বা আপত্তিতে!

তাই খুব সহজেই আমাকে নানা কাজে লাগানো যায়। আমাকে দেখবেন বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাগরিকপঞ্জী তৈরি করতে। মিড ডে মিলের বাজারের থলি নিয়েও দেখবেন আমাকে। ন্যূনতম বরাদ্দ টাকায় শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে আমার যে জাগলারি সেটি দেখে  কিন্তু অবাক হবেন। গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসবে ঘাড়ে ব্যালট বক্স আর তালপাতার কিছু সেপাই নিয়ে হয়ত আমাকে দেখে থাকবেন আপনাদের পাড়ায়। পান থেকে চুন খসলে আমাকে আক্রমণ করে সুখ পাবেন। কেননা একটু আগে কোনও এক দপ্তরে আপনাকে হয়ত ন্যায্য কাজের জন্য ঘুষ দিতে হয়েছে। রাগটা তো রয়েই গেছে। ঝাড়তে হবে তো সেটি। ভাবনা নেই, আমি আছি। বলুন আমাকে। গালমন্দ করুন। আপনার রাগটা অন্তত কমুক। আমাকে সম্মান-অসম্মানের কিছু ব্যাপার নেই।

আসলে যেহেতু আমি একজন তথাকথিত সুনাগরিক, তাই সবকিছু মেনে নিই। আমার চাকরিটি যে ন্যায্য ভাবেই পাওয়া সেটি প্রমাণ করতে নথি নিয়ে দৌড়োই জেরক্স করাতে। দোকানদারের বাঁকা হাসি দেখেও নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখি। পাড়ার বা রাস্তার লোকের ছদ্ম স্তোকবাক্য, আপনাদেরকেও দিতে হচ্ছে, এইসব শুনেও চুপ করে থাকি। কেননা মাস্টারমশাই আপনি কিছু দেখেননি আদেশটি তো সেই কবে থেকেই আছে! এখন কথা হল, যেসব নথি অত্যন্ত দ্রুত জমা দিতে বলা হয়েছে, সেগুলি কিন্তু ২০০৩ ও ২০১৪ সালেও নেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন জাগে আবার কেন! যখন উপায় ছিল, তখন কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ দেখা যায়নি। এখন বাড়িতে আগুন লেগেছে বলে সবাইকেই সেই আঁচ পোহাতে বলা হচ্ছে না তো? আদালতের রায়ে এরকম করতে হচ্ছে বললেও সন্দেহ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে! কিন্তু ওই সন্দেহটুকু অবধিই। মুখে কিছু বলছি না। চুপ করে থাকছি।

আমরা আসলে চুপ করেই থাকি। যে ঘটনার জন্য এই সব কর্মকাণ্ড তাতে তো মনে হচ্ছে, ধরে আনতে বলায় বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সেই ফাঁকে রাঘববোয়ালরা আরও গভীরে চলে যাচ্ছে। অসদুপায় নিয়েছে যারা, তারা তো অপরাধীই। তারা তো অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু যারা বাঁকা পথের প্রক্রিয়াটিকে চালু করল, তাদের সম্পর্কে কোনও তথ্যই জানা গেল না! এত মেশিনারি সব ব্যর্থ হয়ে গেল। রাষ্ট্রও তবে ব্যর্থ হয়!

আমার বহু ত্রুটির কথা মেনে নিয়েও বলতে পারি, আমাকে বা আমার মতো কয়েকজনকে দেখে সমষ্টিকে বিচার কখনই ঠিক নয়। আমরা অধিকাংশ শিক্ষকই নিজেদের যোগ্যতায় চাকরিটি পেয়েছি। কিন্তু কয়েকজনের সদিচ্ছার অভাবে, আজ যোগ্যরাও প্রশ্নের মুখে। এমনকি যাঁরা অবসরের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁরাও ছাড় পাচ্ছেন না। এসব কি তাঁদের প্রাপ্য? এই সামাজিক অসম্মানের জন্যই কি তাঁরা এই পেশায় এসেছিলেন? তাঁদের এই অবস্থা দেখে আগামী প্রজন্ম কি শিক্ষকতা করতে চাইবে?

আসলে আমরা সবাই তথ্য তুলে ধরা ও চুপ করে মেনে নেওয়া সুনাগরিক। রাষ্ট্রের চোখে হয়ত এরকম সুনাগরিকের মূল্য আকাশছোঁয়া। 

কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে? সে কি একবারও আয়নায় মুখ দেখতে বলে না?

** কিছুদিন আগে লেখা এই নিবন্ধটি সদ্য প্রকাশিত হয়েছে ভাস্কর শর্মা সম্পাদিত `ডুয়ার্স সংবাদ`-এ 
 

Saturday, February 28, 2026


 

গুহা 
শৌভিক রায় 


সেদিন ঝিরকার হাতে মদের বোতলটা দেখেও এতটা অবাক হয়নি সম্পদ, আজ যতটা হল গুহার মুখটাকে দেখে। মুখটা সত্যিই বড় হচ্ছে। ঝিরকা ভুল বলেনি। 

- প্রথম বড় হয়েছিল সেই মহামারির সময়। 
- কোন মহামারি?
- তোরা যখন নামলি দ্বীপে। আমাদের সঙ্গে ভাব করলি। 
- কী যে  বলিস, আর না বলিস! সে সব কি আজকের কথা নাকি?
- জানি তো। 
- জানিস যখন, তখন বলছিস কেন?  তোর বাপ ঠাকুর্দাও তো জন্মায়নি তখন। 
- ইতিহাস তো তাতে বদলাবে না.....তোদের জন্যই ওই মহামারি। তোরাই এনেছিলি। তোদের সঙ্গে মিশেই তো রোগ ছড়ালো আমাদের মধ্যে। তোদের ওই সব রোগ সামলানোর মতো শরীর আমাদের আজও নেই। শেষ করে দিয়েছিলি তোরা। 
- বেশ। মানলাম। কিন্তু তার সঙ্গে গুহার মুখ বড় হওয়ার সম্পর্ক কোথায়?
- আছে আছে। বুঝবি না। একদিন এই গুহা সব কিছু গিলে খাবে। 
- তার আগে বল, মদের বোতল পেলি কোথায়?
- দিয়েছে একজন। 
- গ্রামের কেউ? কী দিয়েছিলি তাকে? হরিণের মাংস?
- পরিচিত না। বেড়াতে এসেছিল। 
- টুরিস্ট? তোদের সঙ্গে না ওদের মেশা বারণ! 
- ওসব কথার কথা। 
- কিন্তু কী দিলি তাকে?
- ছবি তুলতে দিয়েছি আমার সঙ্গে। 
- ছবি? সেকি রে। লোকটা ধরা পড়লে তো জেল খাটবে। 
- সেটা তার সমস্যা। নে সিগারেট খা। 
- সিগারেট? এটাও শিখেছিস? এটা আবার কে দিল?
- তোদের গ্রামের লোক। ঝিনুক দিয়েছিলাম। 
- এখন তোদের রোগ হবে না ?

ঝিরকা উত্তর দিল না। মদ খেতে শুরু করল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আনাড়ি। এসব খায়নি বিশেষ। একটু পরেই ঝিমিয়ে পড়ল। তারপর ঘুম। 



ঝিরকার গলায় কিছু একটা ছিল। সম্পদ তাই গুহার মুখের ঠিক বাইরের গাছটায় চিহ্ন এঁকেছিল। দুই মাস পর গাছটাকে দেখতে এসে, একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল তার মেরুদণ্ডের মধ্যে। গাছটা গুহার মুখের ভেতরে ঢুকে গেছে। তার মানে গুহার মুখটা সত্যিই বড় হচ্ছে। ঝিরকা ঠিকই বলেছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে।  কিন্তু সে বুঝলে কী হবে! তার কথা শুনে তো অন্যেরা হাসে! কেউ বিরক্ত হয়। কেউ মেইনল্যাণ্ডে গিয়ে মাথার ডাক্তার দেখাতে বলে।

কথাটা অবশ্য তার নিজেরও মনে হয়েছে। ডাক্তার একবার দেখালে হয়। গুহা বড় হচ্ছে, সব গ্রাস করছে- এরকমটা আবার হয় নাকি? মনের ব্যারাম। মন? নাকি মাথার? মন আর মাথার পার্থক্যটা কী সেটা অবশ্য সম্পদ বোঝে না। কিন্তু অন্যদের ভাবভঙ্গিতে এটা বোঝে, কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে তার। কিন্তু দেখাবে কোথায়? মেইনল্যান্ডে যাওয়া কি সহজ নাকি? 

প্রথমে বোটে চেপে মেজ শহরে যাও। সেখান থেকে বাসে ধরে, রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে, বড় শহর এড়িয়ে ঝলমলে শহরে পৌঁছনো যায়। অবশ্য মেজ শহর থেকে উল্টো দিকে, আর এক জঙ্গলের ভেতর দিয়েও, পৌঁছনো যায় বড় শহরে। তারপর সেখান থেকে সারা রাত ভেসেলে চেপে ঝলমলে শহর।  কিন্তু তাতেও হুজ্জত কম নাকি! আর ঝলমলে শহরে পৌঁছোলেই  তো হল না।  মেইনল্যান্ডে যেতে ধরতে হবে জাহাজ বা প্লেন। প্লেন হলে ঠিক আছে। আড়াই-তিন ঘন্টার মামলা। কিন্তু জাহাজে চাপলে প্রায় তিন দিন। আইল্যান্ডার কার্ডে প্লেনের ভাড়া কিছুটা কম পড়ে ঠিকই, কিন্তু সেটাও  তার কাছে অনেক। ওদিকে জাহাজে চাপলে সময় তো সময়, অবিরাম দুলুনিতে তার বমি-টমি হয়ে একাকার অবস্থা! 

এমনিতে সম্পদ এখন তিরিশ বিঘে জমির মালিক। এই তিরিশ বিঘের পনের বিঘে চাষের। বাকিটা আধা জঙ্গল। ঠাকুরদা যখন উদ্বাস্তু হয়ে এই আইল্যান্ডে আসেন  তখন সেটেলার হিসেবে এটুকুই পেয়েছিলেন। কিন্তু এত দ্বীপ থাকতে কেন যে ঠাকুরদা এখানে এলেন, সেটাই মাথায় ঢোকে না সম্পদের। এখনও তাদের এখানে গুটি কয়েক বাড়ি। ফাঁকা ফাঁকা। জমির পরিমাণ সবারই ওই এক। তিরিশ বিঘে। কিন্তু তার বেশিটাই জঙ্গল। চাষের উপযুক্ত নয়। যেটুকুতে করা যায়, সেখানেও সব কিছু ফলে না সমুদ্রের নোনা জল আর হাওয়ায়। 

তার ওপর ওই গুহাটা এখন বেড়ে চলেছে দিনদিন। সম্পদ স্পষ্ট দেখছে, ওটা হাঁ করে একটু একটু করে গিলে নিচ্ছে চারপাশ। সে বারবার বলছে সবাইকে। কিন্তু তাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। তাদের দোষ নেই। ওই গুহাটাই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। ওটা দেখতে প্রতিদিন দলে দলে লোক আসে। মোটামুটি সকাল দশ-এগারো থেকে একের পর এক স্পিড বোটে রাজ্যের লোক হৈহৈ করতে করতে নামে জেটিতে। তারপর ম্যানগ্রোভের ভেতর দিয়ে কিমি তিনেক হেঁটে পৌঁছোয় এখানে। অবশ্য ম্যানগ্রোভের সেই ঘন অরণ্য এখন অনেকটা পাতলা। তবে এতটা হেঁটে সবাই নেতিয়ে পরে। শহুরে লোক। মেইনল্যান্ডের আরামে মানুষ। তারা একটু বসতে চায়।  গলা ভেজাতে চায়। 

ফলে দোকান দিয়ে বসে গেছে কম বেশি গ্রামের সবাই। বিস্কুট, চিপস, চা, লেবু জল। মোটামুটি এই আইটেম সব দোকানেই। লেবু জলের কাটতিই বেশি। এক গ্লাস জলের জন্য কুড়ি টাকাও পাওয়া যায় সিজন টাইমে। কেউ কেউ আবদার করে জংলি মুরগির মাংস খাবে বলে। গুহা দেখতে যত সময় লাগে, তার মধ্যে রান্না হয়ে যায়। এই জঙ্গলে অন্য হিংস্র প্রাণী পাওয়া না গেলেও, মুরগি আছে প্রচুর। 

নিজেদের জমিতে চাষ আর দোকান। মোটামুটি এভাবেই চলে সবার। এর মধ্যেই কেউ কেউ সাহস করে স্পিড বোট কিনেছে ব্যাংক লোন নিয়ে। ঠিকঠাক চালাতে পারলে তেলের খরচ মিটিয়ে আর ইন্টারেস্টের টাকা শোধ করে বছর দুয়েক পর লাভ শুরু হয়। সম্পদের প্রতিবেশীদের অনেকেই বোট কিনে স্বচ্ছল হয়ে গেছে। সম্পদও টাকা জমিয়েছিল। বোট কিনবে বলে। কিন্তু যেদিন থেকে বুঝেছে গুহাটা সব খেয়ে নিচ্ছে, সেদিন থেকে বোট কেনার চিন্তা ছেড়েছে। 



ঝিরকা এই দ্বীপের আদিবাসী। সত্যি বলতে এই দ্বীপ ঝিরকাদের সম্পত্তি। কিন্তু এখন ওরা কোনঠাসা। সম্পদের মতো মেইনল্যান্ড আসা মানুষেরা ঝিরকাদের প্রায় হটিয়ে দিয়েছে। তারা প্রথমটায় ঝিরকাদের হাত করেছিল এটা সেটা দিয়ে। মিশতে শুরু করেছিল খোলামেলা। তারপর যা হওয়ার হল তাই! বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে না মিশে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাই ছিল না ঝিরকাদের। ফলে সামান্য সংক্রমণ আকার নিল মহামারির। সংখ্যা কমতে লাগল ঝিরকাদের। এখন তারা হাতে গোনা। 

মহামারির আগে নাকি গুহাটা ছোট ছিল। ঝিরকা বলে। সম্পদের হাসি পায়। যে আমলে মহামারি দেখা দিয়েছিল ঝিরকাদের মধ্যে, তখন বোধহয় ঝিরকার বাবাও জন্মায়নি। কিন্তু ও এমন করে বলে যেন নিজের চোখে গুহাটাকে দেখেছিল। সম্পদের হাসি দেখে গম্ভীর হয়েছিল ঝিরকা। বুঝিয়ে দিয়েছিল, ঠাকুরদা আর বাবার মুখে শুনে আসা কথাকে এভাবে অবজ্ঞা করাটা সে ভালভাবে নিচ্ছে না। তবে সম্পদের হাসি অবশ্য মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। ঝিরকার সঙ্গে ওই সেদিনের কথার পর, মাস দুয়েক পরে সম্পদ নিজেও দেখল, গুহার মুখটা সত্যিই বড় হচ্ছে।


৪  
গুহাটা একটু অদ্ভুত। যেদিকে ওদের গ্রাম সেদিকে একটা মুখ। সেদিক দিয়েই সবাই ঢোকে আদিম গুহাটা  দেখতে। একটা নির্দিষ্ট জায়গার পর আর কেউ এগোয় না। কেননা রাস্তাটা সেখান থেকে ভাগ হয়ে গেছে। রাস্তা দুটো কোনদিকে গেছে কে জানে। তবে গুহাটা যে পাহাড়ে সেটা পেরিয়ে খুব কষ্ট করে ওপারে যাওয়া যায়।ফলে ওই পাশে লোকজন এমনিতেই যায় না। একেই পাহাড়, তার ওপর জঙ্গল। সম্পদও বিশেষ যায়নি কোনও দিন। কিন্তু সেবার টুরিস্টের ঢল নেমেছিল। চাহিদা বেড়েছিল বনমোরগের। পাহাড়ের ওপরে বা ওপাশে মুরগি মিলতে পারে ভেবে কষ্ট করছিল সম্পদ। তখনই প্রথম দেখা ঝিরকার সঙ্গে। বেশ গুছিয়ে বসেছিল সে। পাহাড়ের ঢালে খানিকটা সমতল জায়গায়। সামনে ছিল কচ্ছপের কাঁচা মাংস। আর মদের বোতল। ওর নৌকোটা দেখা যাচ্ছিল নিচে। ব্যাক ওয়াটারেঝিরকার মুখে সাদা হলুদ রং। কুচকুচে কালো সুঠাম চেহারা। সম্পদ প্রথমটায় ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তাকে অবাক করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় ঝিরকাই প্রথম কথা বলেছিল। ও নাকি  ভাষাটা শিখেছে কোন কোন টুরিস্টের সঙ্গে মিশে।

অথচ ওদের সঙ্গে টুরিস্টদের মেশা তো অনেক পরের ব্যাপার, দূর থেকে ছবি তোলাও বারণ। সম্পদ হিসেবে মেলাতে পারে না। 


ঝিরকা আর গুহার কথাটা সম্পদ বেমালুম ভুলে গেল নতুন দ্বীপে এসে। তার বাড়ি থেকে প্রায় তিনশো কিমি দূরের এই দ্বীপ। নতুন এক প্রকল্পের কাজ চলছে সেখানে। সারা বিশ্ব থেকে এখানে মালবাহী জাহাজ আসবে। আদান-প্রদান হবে সেগুলির। তার জন্য নানা রকম কাজ চলছে। বসছে অতিকায় পাওয়ার প্ল্যান্ট। টাউনশিপ তৈরি হচ্ছে আর একদিকে। আর এত কিছুর সঙ্গে যদি এয়ারপোর্ট না হয়, তবে কি চলে? মোট কথা, বিরাট এক কর্মযজ্ঞের ছোট্ট অংশীদার হয়ে  ডুবে রয়েছে সম্পদ। দেখছে কীভাবে সবুজ অরণ্য কাটতে হয়। পুঁততে হয় আরসিসি পিলার। পাওয়ার প্ল্যান্টের দূষিত জল কেমন করে ফেলতে হয় সমুদ্রে। দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের ওখান থেকে উঠিয়ে কী সুন্দরভাবে বসিয়ে দিতে হয় অন্য কোথাও, সেটাও জেনে গেল সম্পদ। 

মোটামুটি বছর দেড়েক কাজ করে বাড়ি ফিরল সম্পদ। আর ফিরেই দেখতে গেল গুহাটাকে। ঠিক যা ভেবেছিল। গুহাটা আরও বড় হয়েছে। তার বিরাট মুখের মধ্যে ঢুকে গেছে আশেপাশের অনেকটা অংশ। কিন্তু গ্রামের লোকেদের কোনও হেলদোল নেই। তারা কেউ মানতেই চাইল না যে, গুহার মুখটা বড় হয়েছে। উল্টে সম্পদের দিকে এমন করে তাকালো যে বলার না! এক খুড়ো বলে বসল,
- নতুন দ্বীপে গিয়ে তোর মাথাটা ঠিক হবে ভেবেছিলাম। ওখানে কত বিরাট কাজ হচ্ছে। কত লোক। মেইনল্যান্ড থেকে এসেছে। তাদের সঙ্গে মিশে কি কিছুই শিখলি না? আবার সেই গুহার মুখটা বড় হয়েছে বলছিস! তুই তাড়াতাড়ি এখন থেকে চলে যা। না হলে সবাই তোকে পেটাবে এবার। তোর এই বলার জন্য সেবার সার্ভে হয়েছিল। টুরিস্ট আসা বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। আমাদের পেটে  লাথি মেরেছিলি তুই । আবার শুরু করলি?

অবাক হল সম্পদ। সত্যিই কি এরা অন্ধ? দেখতে পাচ্ছে না? গুহাটা যে তাদের গ্রামের কতটা গ্রাস করেছে, বুঝতে পারছে না সেটা? মন খারাপ করে সে এলো আবার গুহার কাছে। শেষ বিদায় নিতে। সে সত্যিই এবার চলে যাবে একবারে। নতুন দ্বীপেই থেকে যাবে। ডুবিয়ে দেবে নিজেকে আরও অনেক কাজে। 


গুহার কাছে আসতেই যেন মাটি ফুঁড়ে বেরোল ঝিরকা। সেই চকচকে কালো চেহারা আর নেই। ঋজু শরীরটাও কেমন নুইয়ে গেছে। মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। তবু হিসহিসে গলায় ঝিরকা বলে উঠল,  
- সম্পদ। তুই চলে যা। নতুন দ্বীপে। ওখানকার গুহাটা বড় হচ্ছে। পাহারা দে গিয়ে। আর বড় হতে দিস না। 
- নতুন দ্বীপে গুহা আবার কোথায়? 
- কেন পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য মাটি খুঁড়িসনি? এয়ারপোর্টের জন্য গাছ কাটিসনি? 
- তার সঙ্গে গুহার সম্পর্ক কোথায়?
- পাশে পাহাড় আছে? ওসব জায়গার?
- আছে তো। এখানকার সব দ্বীপেই তো পাহাড়। 
- যা। ভাল করে দেখ। গুহা পাবি। ওটা বড় হতে দিস না। তাহলে সমস্যা। 
- কী সমস্যা?
- এই গুহাটা পুরো দ্বীপটাকে খেয়ে নিচ্ছে বুঝতে পারছিস তো?
- হ্যাঁ তো। কেন বুঝব না? কিন্তু কেউ তো বিশ্বাস করছে না। 
- তুই করলেই হল। এই দ্বীপের আয়ু আর মাত্র কয়েক বছর। তারপর শুধু গুহাটাই থাকবে। 
- কী বলছিস এসব?
- ঠিকই বলছি। অভিশাপ। 
- কার অভিশাপ?
- সমুদ্রের। আকাশের। জঙ্গলের। সবার.... 
- কী পাগলামো করছিস?
- তুই যা সম্পদ। নতুন দ্বীপে পাহারা দে। নইলে ওটাও যাবে। 
- ওখানে যে এত কিছু হচ্ছে সেই খবর তুই কীভাবে জানলি?
- হাওয়া বয়ে খবর আসে রে। তুইও জানবি, তুইও জানবি। যা সম্পদ...দেরি করিস না। 


...... নতুন দ্বীপের লোকজন আজকাল সম্পদকে দেখে অবাক হয়। যখন প্রথম এখানে আসে তখনই একটু ছিটেল ছিল। কিন্তু শেষবার নিজের বাড়ি থেকে ফিরে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাবে, কেউ ভাবেনি। 

আজকাল নতুন এয়ারপোর্টের পাশের ছোট্ট পাহাড়টায় সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। ওখানে একটা গুহা দেখা গেছে কিছুদিন আগে। এতদিন ওটার অস্তিত্ব কেউ টেরই পায়নি। সেদিক থেকে বলতে গেলে সম্পদই ওটাকে আবিষ্কার করেছে। কিন্তু গুহাটা বড় হচ্ছে বলে যে কথাটা সম্পদ সারাদিন বলে বেড়ায়, সেটা পাগলামির লক্ষণ। 

মজা হল, পাগলেরও বন্ধু থাকে। তার কথাও কেউ বিশ্বাস করে। এখানকার আদি বাসিন্দারা অন্য জায়গায় সরে গেলেও,  শম্পু মাটি কামড়ে পড়েছিল। সম্পদের সঙ্গে ওর বেশ ভাব। সারাদিন সেও সম্পদের সঙ্গে ঘোরে। হাওয়ায় কান পেতে কী যেন শোনে। সমুদ্রের কাছে গিয়ে বিড়বিড় করে। গাছের গায়ে হাত বোলায়। আর যখন পাগলামি চরমে ওঠে আকাশের দিকে দুই হাত তুলে চিৎকার করে ওঠে,
- গুহাটা বড় হচ্ছে....খেয়ে নিচ্ছে সব। তোরা দেখছিস না কেন? মরবি রে সব্বাই মরবি....গুহার পেটে পচে মরবি.....

(প্রকাশিত: কোচবিহার সাহিত্যসভা পত্রিকা, ২০২৫)