Thursday, March 26, 2026


 

আদর্শহীন দলবদলুরা গণতন্ত্রে বড় বিপদ
শৌভিক রায়

১৯৬২ সালে ডেমোক্র্যাট দল ছেড়ে রিপাবলিকান দলে যোগ দেওয়ার সময় আমেরিকার চল্লিশতম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের উক্তি ছিল, 'আমি দল ছাড়িনি, দল আমাকে ত্যাগ করেছে।' এই কথাটি রাজনীতিতে দলবদলের এক চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে। দলবদল কোনো এক দেশের একচেটিয়া বিষয় নয়, পৃথিবীর বহু দেশেই এই প্রবণতা কমবেশি দেখা যায়। রাজনীতিতে এমন ঘটনা বারবার ঘটে আসছে, যা ক্ষমতার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দলবদলের উদাহরণ অজস্র। ১৯৬৪ সালে হিলারি ক্লিনটনকে আরিজোনা রিপাবলিকানদের হয়ে প্রচার করতে দেখা গেলেও, পরবর্তীতে তিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট পদের জন্য রিপাবলিকান পার্টির টিকিট না পেয়ে, ১৯১২ সালে রুজভেল্ট প্রোগ্রেসিভ পার্টি (বুল মুজ পার্টি নামেও পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যদিও পরে তিনি পুরোনো দলেই ফিরে আসেন। মার্কিন সিনেটেও দলবদলের ঘটনা বিরল নয়। ১৯৯৪ সালে পাঁচজন হাউস ডেমোক্র্যাট ও দুজন সিনেট ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন। ২০০১ সালে জিম জেফর্ডস রিপাবলিকানদের সঙ্গ ত্যাগ করে 'স্বাধীন' হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করলেও, তার রাজনৈতিক রাশ ছিল ডেমোক্র্যাটদের হাতে। ২০০৯ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, যা প্রমাণ করে যে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রায়শই দলের প্রতি আনুগত্যের ঊর্ধ্বে স্থান পায়।

তুরস্কের কিউবিলে উগানের সাতবার নিজের দল থেকে ইস্তফা দেওয়া এবং চারটি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া এক কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়। অস্ট্রেলিয়ায় এক দল থেকে অন্য দলে যাওয়ার রেওয়াজ কম হলেও, নিজের দল ছেড়ে স্বাধীনভাবে থাকা বা নতুন দল প্রতিষ্ঠা করা সাধারণ ঘটনা। ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে ইতালিতে দলবদলের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ইতালির 'চেম্বার অফ ডেপুটিজ'-এর ২৫ শতাংশ সদস্য কোনো না কোনো সময় দলবদল করেছেন। ফিলিপাইনে দলবদল একটি 'নীতি' হিসেবেই বিবেচিত হয়। মালয়েশিয়ার মতো রাষ্ট্র দলবদলের ধাক্কায় বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত আইন করে এটিকে বন্ধ করেছে। আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়, বরং সেখানেও ক্ষমতার পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য দলবদল একটি সাধারণ কৌশল।

ভারতে দলবদলের প্রবণতা কমাতে ১৯৮৫ সালে সংবিধানের ৫২তম সংশোধনের মাধ্যমে দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন পাস করা হয়। কিন্তু এই আইন 'আয়ারাম গয়ারাম'দের আটকাতে পারেনি। 'আয়ারাম গয়ারাম' শব্দবন্ধটি মজার ছলে তৈরি হলেও, এর বাস্তব ভিত্তি হরিয়ানার বিধায়ক গয়ালালকে ঘিরে। ১৯৬৭ সালে তিনি হাসানপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেন এবং একই দিনে কয়েকবার কংগ্রেস ও ইউনাইটেড ফ্রন্টে যোগ দিয়ে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড তৈরি করেন। তখন প্রায়শই প্রশ্ন করা হতো, 'গয়ারাম আজ কোন দলে?' শেষ পর্যন্ত পনেরো দিন পর হরিয়ানার কংগ্রেস নেতা রাও বীরেন্দ্র সিং সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা করেন, 'গয়া রাম এখন আয়া রাম', অর্থাৎ তিনি আবার কংগ্রেসে ফিরে এসেছেন। এই ঘটনা ভারতীয় রাজনীতির একটি প্রতীকী চিত্র হয়ে আজও বিদ্যমান।

আমাদের রাজ্যেও এই 'আয়ারাম গয়ারাম' সংস্কৃতি সমানভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে এই দৃশ্য কমবেশি প্রতিবারই দেখা যায়। দলবদলকারীরা যদিও দেশের প্রতি তাদের গভীর চিন্তার যুক্তি দেন, আসল কারণটি বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। সম্প্রতি, একটি জেলা শহরে শাসক দল ছেড়ে শতাব্দীপ্রাচীন এক দলে যোগ দিয়ে একজন পরিচিত নেতা কেঁদে ফেলেন। দীর্ঘদিন ধরে শাসক দলে কোণঠাসা হয়ে থাকলেও, 'বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার' আশায় তিনি চুপ করে ছিলেন। কিন্তু যখন প্রার্থী তালিকায় তার স্থান হলো না, তখনই তিনি দল ছাড়লেন। শোনা যাচ্ছে, নতুন দল তাকে প্রার্থী করতে পারে। এই ধরনের ঘটনাগুলি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার লোভের স্পষ্ট প্রতিফলন।

আজকের রাজনীতি 'করে খাওয়ার' এক জায়গায় পরিণত হয়েছে। অপমানের শিকার হয়েও অনেকে চুপ থাকাকে শ্রেয় মনে করেন। মুখ তখনই খোলেন, যখন দেখেন তারা আর প্রার্থী তালিকায় নেই। কেউ কেউ 'সম্মানের সঙ্গে' রাজনৈতিক জীবন শেষ করতে পারলেন না বলে আক্ষেপ করেন, আবার কেউ কেউ অভিমানে রাজনৈতিক সন্ন্যাস ঘোষণা করেন। এই প্রবীণ নেতাদের অনেকেই হয়তো দলবদল করেননি বা করবেন না, কিন্তু তাদের শারীরিক ভাষা বুঝিয়ে দেয়, তারা আদৌ খুশি নন এবং সুযোগ পেলে অন্য কিছু ভাববেন না, এমনটিও নয়। যেমন, উত্তরবঙ্গের এক বড় শহরে কানাঘুষো শোনা যায় যে, কোনো বয়স্ক নেতার জন্য একজন তরুণ দল ছেড়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শের দক্ষিণপন্থী দলে যোগ দিয়েছিলেন, কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে ওই বয়স্ক মানুষটির জন্য তিনি কখনোই বিধায়ক হতে পারবেন না। এটি এক দুঃখজনক বাস্তবতা, যেখানে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভই মুখ্য হয়ে ওঠে।

একসময় বামপন্থীদের আদর্শ ও নীতি নিয়ে চলার কারণে তাদের দলবদল থেকে মুক্ত মনে করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নতুন শাসক দলে ভিড় জমিয়েছিলেন একদা বামপন্থীরা। তাদের অনেকেই আজ ক্ষমতার কেন্দ্রে। কেউ কেউ নির্লজ্জ দুর্নীতিতে জড়িয়েও প্রার্থী তালিকায় স্বমহিমায় রয়ে গেছেন। বর্তমান শাসক দলেও অনেক জায়গায় অন্য দল থেকে আসা এই নেতারাই ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। যারা দলের সঙ্গে প্রথম থেকে ছিলেন, তারা আজ ব্যাকফুটে। কেউ দল ছেড়েছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক হতাশা ঢাকতে কিছু হবে না জেনেও এমন সব দলে ভিড়ছেন, যারা এ বঙ্গে একেবারেই অপরিচিত। সামাজিক কোনো আন্দোলনের ফায়দা তুলে, রাজনৈতিক দলের তুল্যমূল্য বিচার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ধান্দাতেও কেউ কেউ লেগে আছেন; এঁরাও দলবদলু। এই প্রবণতাগুলি রাজনৈতিক আদর্শের অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।

গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায়, এবার জার্সি বদলে অন্য দলের হয়ে নেমে পড়ার সংখ্যাটা কিছুটা কম। তবে নিজের দলের কর্মী খুনে অভিযুক্ত দলবদলুর নির্বাচনে টিকিট পাওয়াটা বেশ অভিনব। অবশ্য যে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা নিজেই দলবদলকারী, সেই রাজ্যে হয়তো এটাই স্বাভাবিক। মনে রাখা প্রয়োজন, রাজ্যের বর্তমান প্রধানও একসময় দলবদল করেছিলেন; পার্থক্য এই যে, তিনি নতুন কোনো দলে যাননি, বরং নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া, কমবেশি প্রায় সকলেই দলবদলের রোগে আক্রান্ত। কেউ অন্য দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ আবার পিংপং বলের মতো এদিক-ওদিক করেছেন। এই বিষয়ে প্রবীণ-নবীন কেউই আর কলঙ্কমুক্ত নন। রাজনীতিতে নীতি-আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার প্রলোভন যে প্রবল, তা এই ঘটনাগুলি স্পষ্ট করে তোলে।

একটা সময় পুরোনো দল ছেড়ে অন্য দল প্রতিষ্ঠা করা বা নতুন দলে যোগ দেওয়ার পেছনে হয়তো কিছুটা আদর্শ কাজ করত। কিন্তু আজ সেই দিন নেই। আদর্শহীনতা এখন রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যে কোনোভাবে ক্ষমতায় থাকাই আজকাল রাজনীতির একমাত্র উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য দলবদল যেন অতি সাধারণ এক বিষয়। কিন্তু এই দলবদলকারীরা বুঝতে পারছেন না যে, এর ফলে সামগ্রিকভাবে তারা ভারতীয় গণতন্ত্রের বিপদ ডেকে আনছেন। তাদের জন্যই মেধাবী ও মননশীল মানুষরা ক্রমশ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। প্রাজ্ঞ, বুদ্ধিমান, সুবক্তা এবং আদর্শকে বুকে নিয়ে চলা সত্যিকারের নেতারা হারিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রের পক্ষে এটা কখনোই ভালো হতে পারে না। রাজনীতি যদি সমাজ সচেতন সুনাগরিক তৈরি করতে না পারে, তবে রাষ্ট্রের অগ্রগতি আর হবে কীভাবে? এ প্রশ্ন আজ জাতীয় রাজনৈতিক পরিসরে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা।)


* প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, মার্চ ২৬, ২০২৬ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ

No comments: