প্রশ্ন জাগে আমরা শিক্ষকরা আসলে ঠিক কী !
শৌভিক রায়
বিখ্যাত ইংরেজ কবি ওডেন দা আননোন সিটিজেন কবিতায় এক সুনাগরিকের কথা বলেছিলেন। সেই মানুষটির বিরুদ্ধে কোনও দিন কোনও রকম অভিযোগ পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের তিনি ছিলেন একদম টেক্সটবুক উদাহরণ। আসলে রাষ্ট্রের চোখে জীবন ব্যাপারটি এমন এক বিজ্ঞান, যার উন্নতি শুধু ক্রমবর্ধমান বিস্তারিত তথ্যের মাধ্যমেই যাচাই করা যায়। আর সেটি করতে গিয়ে রাষ্ট্র ব্যক্তির জীবনের স্বাধীনতা, আনন্দ ইত্যাদির কোনও মূল্য দেয় না। বরং ব্যক্তিকে নানাভাবে বেঁধে রাখতে পারলেই তার লাভ।
প্রায় তিন দশক সসম্মানে শিক্ষকতা করবার পর, নিজের স্কুলে, নতুন করে, আবার নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি জমা দিতে গিয়ে এই কথাগুলিই মনে হচ্ছিল। নীল ইনল্যান্ড লেটারে একদিন যে নিয়োগপত্র স্বাধীনতা ও সম্মানের বার্তা এনেছিল, আজ সেটিই যেন গোলামির শক্ত শেকল। এ এক এমন ক্রীতদাসত্ব, যেখানে প্রাইভেট টিউশন না পড়িয়েও মুচলেকা দিয়েছি, আমি টিউশনের সঙ্গে যুক্ত নই। আমার খারাপ লাগলেও বলতে পারিনি কিছু। একই পদ্ধতিতে মেনে নিয়েছি `স্কুল টিচারদের তো শুধু ছুটি আর ছুটি` বলে ক্রমাগত টিটকিরি। অথচ বিশ্বাস করুন, আমি ছুটি চাইনি। বাধ্য হয়েছি।
চাইনি আমার স্কুলটি বিদ্যার আলয় থেকে বিতরণ কেন্দ্রে পরিণত হোক। গ্রামের স্কুলগুলিকে প্রায় শিক্ষক-শূন্য করে দিয়ে দলে দলে শহরে চলে আসার যে পথটি খোলা হয়েছিল, সেটিও আমাকে আনন্দ দেয়নি। কিন্তু আমার আপত্তি শুনছে কে! বরং সুযোগ পেয়ে নিজেও তার সদ্ব্যবহার করেছি। বাঁকা পথে হলেও। সমস্যা হল, রাষ্ট্র সেদিন তথ্য চায়নি। আজও চায়নি। উচ্চ ডিগ্রি-প্রার্থী গবেষকের তথ্য আরোহনের প্রচেষ্টায় হয়ত এসব রয়ে যাবে। কিন্তু রাষ্ট্র যে সেই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, জাগছে আর কোথায়! দোষ নেই তার। ঘুম তো সবারই পায়! আর তাছাড়া আমি একজন মাস্টার। প্রাপ্য এই বিশেষণে, নিজের আড়ালে, আপনার মুখে 'মশাই'টুকু যোগ করতে পারিনি, শিক্ষক হওয়া তো দূরের কথা! কী যায় আসে আমার বলা বা আপত্তিতে!
তাই খুব সহজেই আমাকে নানা কাজে লাগানো যায়। আমাকে দেখবেন বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাগরিকপঞ্জী তৈরি করতে। মিড ডে মিলের বাজারের থলি নিয়েও দেখবেন আমাকে। ন্যূনতম বরাদ্দ টাকায় শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে আমার যে জাগলারি সেটি দেখে কিন্তু অবাক হবেন। গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসবে ঘাড়ে ব্যালট বক্স আর তালপাতার কিছু সেপাই নিয়ে হয়ত আমাকে দেখে থাকবেন আপনাদের পাড়ায়। পান থেকে চুন খসলে আমাকে আক্রমণ করে সুখ পাবেন। কেননা একটু আগে কোনও এক দপ্তরে আপনাকে হয়ত ন্যায্য কাজের জন্য ঘুষ দিতে হয়েছে। রাগটা তো রয়েই গেছে। ঝাড়তে হবে তো সেটি। ভাবনা নেই, আমি আছি। বলুন আমাকে। গালমন্দ করুন। আপনার রাগটা অন্তত কমুক। আমাকে সম্মান-অসম্মানের কিছু ব্যাপার নেই।
আসলে যেহেতু আমি একজন তথাকথিত সুনাগরিক, তাই সবকিছু মেনে নিই। আমার চাকরিটি যে ন্যায্য ভাবেই পাওয়া সেটি প্রমাণ করতে নথি নিয়ে দৌড়োই জেরক্স করাতে। দোকানদারের বাঁকা হাসি দেখেও নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখি। পাড়ার বা রাস্তার লোকের ছদ্ম স্তোকবাক্য, আপনাদেরকেও দিতে হচ্ছে, এইসব শুনেও চুপ করে থাকি। কেননা মাস্টারমশাই আপনি কিছু দেখেননি আদেশটি তো সেই কবে থেকেই আছে! এখন কথা হল, যেসব নথি অত্যন্ত দ্রুত জমা দিতে বলা হয়েছে, সেগুলি কিন্তু ২০০৩ ও ২০১৪ সালেও নেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন জাগে আবার কেন! যখন উপায় ছিল, তখন কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ দেখা যায়নি। এখন বাড়িতে আগুন লেগেছে বলে সবাইকেই সেই আঁচ পোহাতে বলা হচ্ছে না তো? আদালতের রায়ে এরকম করতে হচ্ছে বললেও সন্দেহ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে! কিন্তু ওই সন্দেহটুকু অবধিই। মুখে কিছু বলছি না। চুপ করে থাকছি।
আমরা আসলে চুপ করেই থাকি। যে ঘটনার জন্য এই সব কর্মকাণ্ড তাতে তো মনে হচ্ছে, ধরে আনতে বলায় বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সেই ফাঁকে রাঘববোয়ালরা আরও গভীরে চলে যাচ্ছে। অসদুপায় নিয়েছে যারা, তারা তো অপরাধীই। তারা তো অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু যারা বাঁকা পথের প্রক্রিয়াটিকে চালু করল, তাদের সম্পর্কে কোনও তথ্যই জানা গেল না! এত মেশিনারি সব ব্যর্থ হয়ে গেল। রাষ্ট্রও তবে ব্যর্থ হয়!
আমার বহু ত্রুটির কথা মেনে নিয়েও বলতে পারি, আমাকে বা আমার মতো কয়েকজনকে দেখে সমষ্টিকে বিচার কখনই ঠিক নয়। আমরা অধিকাংশ শিক্ষকই নিজেদের যোগ্যতায় চাকরিটি পেয়েছি। কিন্তু কয়েকজনের সদিচ্ছার অভাবে, আজ যোগ্যরাও প্রশ্নের মুখে। এমনকি যাঁরা অবসরের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁরাও ছাড় পাচ্ছেন না। এসব কি তাঁদের প্রাপ্য? এই সামাজিক অসম্মানের জন্যই কি তাঁরা এই পেশায় এসেছিলেন? তাঁদের এই অবস্থা দেখে আগামী প্রজন্ম কি শিক্ষকতা করতে চাইবে?
আসলে আমরা সবাই তথ্য তুলে ধরা ও চুপ করে মেনে নেওয়া সুনাগরিক। রাষ্ট্রের চোখে হয়ত এরকম সুনাগরিকের মূল্য আকাশছোঁয়া।
কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে? সে কি একবারও আয়নায় মুখ দেখতে বলে না?
** কিছুদিন আগে লেখা এই নিবন্ধটি সদ্য প্রকাশিত হয়েছে ভাস্কর শর্মা সম্পাদিত `ডুয়ার্স সংবাদ`-এ

No comments:
Post a Comment