গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসবে থাক সৌহার্দ্য, উদারতা
শৌভিক রায়
আরও একবার গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব আসন্ন। আগামী বেশ কিছুদিন আমরা, বঙ্গভূমের মানুষরা, মেতে থাকব সেই উৎসবে।
তিন দশক আগে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর পরই, ভোটকর্মী হিসেবে গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। সেই হিসেবে বিগত তিরিশ বছরে লোকসভা, বিধানসভা আর পঞ্চায়েত ধরে অনেকগুলি নির্বাচন সামলেছি। আর সেটা করতে গিয়েই বুঝতে পারছি, এই রাজ্যে সব কিছুর মতোই বদলে গিয়েছে সেই উৎসব। আজকাল আর কেউই বোধহয় সেই উৎসব উপভোগ করতে চান না। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন মানেই রক্তক্ষয়। তা সে নির্বাচনের আগেই হোক বা পরে।
অথচ কয়েক বছর আগেও, ভোটকর্মী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছিল এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। গ্রামে বা শহরে ভোট করাতে গিয়ে এই বঙ্গের প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে যেতাম সকলেই। কখনও নিরাপত্তা বাহিনীতে থাকা বিভিন্ন প্রদেশের জওয়ানদের সঙ্গে সখ্য হয়ে যেত অনায়াসে। অন্য দিকে, বিরুদ্ধ মতাবলম্বী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও, মনের অমিল ছিল না। বরং তাঁরা সচেষ্ট থাকতেন নিজেদের এলাকার সুনাম বজায় রাখতে। ফলে বাইরে থেকে আসা ভোটকর্মী, নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন `অতিথি দেব ভব`। প্রত্যেকেই চেষ্টা করতেন নির্বাচনকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করবার। কারণ, দায় সবার। গণতন্ত্র মানে তো নিজেদেরই নির্বাচিত সরকার। ফলে, সেখানে কোনও খাদ ছিল না। ছিল না ধর্ম, সম্প্রদায়, বর্ণ, ভাষা, মতের মল্লযুদ্ধ। বরং সব কিছু মিলেমিশে এই বহুত্ববাদের দেশে বেজে উঠত `বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান`-এর সুর।
অবস্থা যেন বদলে গেল কবে। আজকাল নির্বাচন মানেই উত্তেজনা, মারামারি, হানাহানি। কখনও আবার নিদারুণ প্রহসন ছাড়া কিছুই না। উদাহরণ হিসেবে গত দু`টি পঞ্চায়েত নির্বাচনের কথা বলা যেতে পারে। তুলনায় অনেক বেশি নিরাপত্তা টাকার পরেও লোকসভা ও বিধানসভা ভোটেও যে সব শতকরা একশো ভাগ সঠিক হয়েছে, সে দাবিও কেউই করবেন না। গণতন্ত্রকে পথে নামানোর চোরাগোপ্তা আক্রমণ চলেছে তখনও। সব কিছু দেখেশুনে মনে হয়েছে, এই জন্য কি দেশ স্বাধীন হয়েছিল? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
আসলে, গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হল সামগ্রিক শিক্ষা। মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষা কিন্তু শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়। প্রকৃত অর্থে একজন মানুষের আত্মিক উন্নয়ন, চিন্তাশক্তির বিকাশ এবং সামগ্রিকতার উত্তরণ হল শিক্ষার মূল কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আজও আমরা তা অর্জন করতে পারিনি। বরং এক অদ্ভুত অবক্ষয় গ্রাস করেছে করেছে আমাদের। ফলে গণতান্ত্রিক উদারতা নয়, নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু হাসিল করার একমাত্র উপায়। যতক্ষণ না আমাদের নিজেদের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততক্ষণ এই অবস্থা বদলাবে না। এটা বলাই যায়।
তবু নির্বাচন আসবে, যাবে। কিন্তু তার জন্য পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনষ্ট হোক, সেটা আমরা কেউই চাই না। সুষ্ঠ, সুস্থ, সুন্দর, শান্তির পরিবেশে নির্বাচন হোক, এটাই কাম্য। তার জন্য শুধুমাত্র কঠোর নিয়মবিধি শেষ কথা হতে পারে না, বরং অনেক বেশি প্রয়োজন, নিজেদের সঠিক থাকা। তা হলেই, গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব, উৎসব-ই থাকবে, শোকগাথায় পরিণত হবে না।
* শিক্ষক, কোচবিহার
(প্রকাশিত: আপনার অভিমত, আনন্দবাজার পত্রিকা উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, মার্চ ২৩, ২০২৬)

No comments:
Post a Comment