Sunday, March 22, 2026


 

মোড়ল, মাতব্বরদের দিন গিয়েছে

শৌভিক রায়

পুরানো দিনের মোড়ল নেই, কিন্তু ভোটারের মন কি আজও পরাধীন?

'শুধু অভিযোগ আর অনুযোগ! তোমার কি মন নেই, ভোটার?' জানতে ভীষণ ইচ্ছে করে, এইরকম প্রশ্ন কি করে থাকেন রাজনৈতিক দলের ভোটপ্রার্থী নেতা-কর্মীরা? নাকি তাঁরাও মনে করেন, মানুষের মন বোঝা বড্ড কঠিন। আর সেটা যদি ভোটারের হয়, তবে তা কঠিনতর। একটা সময় কিন্তু রঙ্গভরা এই বঙ্গে ভোটারের মন বোঝা খুব কিছু কঠিন ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে খুব সহজেই তাদের মন বোঝা গিয়েছিল বলেই, সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙালির মসনদ সামলেছিল কার্যত একটি দল। তারপর বদলে গেল অনেক কিছুই। নকশাল আন্দোলন ও পরবর্তীতে জরুরি অবস্থা ভোটারের মন দিল বদলে। হু হু করে পাল্টে গেল সব। এমন সে পরিবর্তন, যা হয়ে উঠল রীতিমতো গবেষণা ও চর্চার বিষয়। কিন্তু ওই অবধিই। এরপর আর ভোটারের মন বুঝতে ভুল করেননি রাজনীতির সেদিনের ধুরন্ধররা। তাই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত থেকেছে এই রাজ্যের রাজনীতির পটচিত্র। আসলে আমরা বাঙালিরা খুব বেশি নাড়াচাড়া বা পরীক্ষা ভালোবাসি না। বরং অনেক বেশি পছন্দ করি স্থিতাবস্থা। তাই ভারতের অন্যান্য নানা রাজ্যে পাঁচ বা দশ বছর অন্তর ভোটারের মন বদলে গেলেও বাংলায় সে দৃশ্য দেখা যায় না। এখানে অনায়াসে ঘটে যায় বিজন সেতু, বানতলা, সিঙ্গুর, সাইবাড়ি, নন্দীগ্রামের মতো নারকীয় ঘটনা। আবার রাজ্যের মন্ত্রীদের জেলযাত্রা, কয়লা-বালি-গরু মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যও 'এহ বাহ্য' হয়ে যায় অনায়াসে। অভয়া কাণ্ডের মতো নারকীয় ঘটনাও তাঁদের মনে শেষ অবধি রেখাপাত করে না। যোগ্য শিক্ষকদের পথে বসে থাকাও ভোটারের মনে বদল আনে না। স্থিতাবস্থা বজায় রাখায় বাংলার ভোটারের মন যেন তুরীয় অবস্থায় থাকে সবসময়। জগদ্দল পাথর হয়ে স্থিতাবস্থায় চলে যাওয়া প্রশাসন আর স্থিতধী বাঙালি ভোটারের মনকে আলাদা করা যায় না কোনও ভাবেই। বহু বছর পরে পরে তার হঠাৎ কখনও মনে হয়, 'অনেক হয়েছে, এবার পাথরটাকে সরানো উচিত।' অতীতে বহু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে দেখতাম, বাড়ির কর্তা কিংবা সম্ভ্রমের মানুষটি পরিবারের অন্য ভোটারদের মন বুঝে নিজের মতো তাঁদের পরিচালনা করতেন। বাড়ির পরিচারকসহ কর্মচারী শ্রেণির মানুষজনও তাঁর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতেন। কেউ বেসুরো গাইলে সেই সদস্য বা কর্মচারীর মন বুঝে নিতেন কর্তা ব্যক্তিটি। ছোট ছোট গ্রামগুলিতেও মোটামুটি একই ছবি ছিল। বিশেষ করে সেই সব গ্রামে যদি একই সম্প্রদায়ের মানুষ থাকতেন, তবে তো কথাই নেই। গ্রামকর্তা বা মোড়লের কথাই ছিল সব ভোটারের মনের কথা। ফলে একবার সেই কর্তার মনের কথা পড়ে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে। জন্মাবধি চা বাগান এলাকায় বড় হয়েছি বলে বোধহয় এই ব্যাপারটা ভালো বুঝেছি। দেখেছি কীভাবে নির্বাচনের দু-তিন দিন আগে, রাতের বেলায় পানভোজন করিয়ে শ্রমিক ভোটারের মন বুঝে নিত রাজনৈতিক দলগুলি। সঙ্গে থাকতেন শ্রমিকদের নেতা বা মাতব্বরজাতীয় কেউ। কোনও কোনও সময় একটি ছাতা বা যৎসামান্য পোশাক দিয়েও ভোটারের মন দখল করে নিত তারা। আর তার ছবি ধরা পড়ত ব্যালট বক্সে। অনায়াসে জিতে যেত উপঢৌকন দেওয়া সেই দল বা তাদের সমর্থিত প্রার্থী। চা বাগানের সরল সহজ গরিব ভোটারদের মন এভাবেই বহুবার প্রলুব্ধ হতো। না বুঝে তাঁরা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন। ভারতের অন্য রাজ্যগুলিতে ভোটারের মন বোঝা এত সহজ নয়। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। তামিলনাড়ুতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ সাল অবধি মোট কুড়ি বছর টানা রাজত্ব করেছিল কংগ্রেস। ১৯৬৭-তে আন্নাদুরাইয়ের ডিএমকে ক্ষমতায় এসে কাটিয়েছিল পরবর্তী দশ বছর। ১৯৭৭ সালে এমজি রামচন্দ্রন এআইএডিএমকে প্রতিষ্ঠা করবার পর মোটামুটিভাবে পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে তাদের ও ডিএমকে-র মধ্যে। বহুবার বহু চেষ্টা করেও সেখানকার ভোটারের মন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন পোড়খাওয়া রাজনৈতিক নেতা বা বিশ্লেষক। স্বাধীনতার পর থেকে কেরালায় ভোটারের মন এখনও পর্যন্ত বাইশ বার ক্ষমতার অদলবদল ঘটিয়েছে। তুলনায় কর্ণাটকের ভোটার খানিকটা স্থিতাবস্থা পছন্দ করলেও সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর বদল হয়েছে প্রায় তেইশ বার। অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ভোটারের মনের এই পরিবর্তন সাতবার, গুজরাটে আটবার। তুলনামূলকভাবে দেশের পূর্বদিকের রাজ্যগুলির মধ্যে অসমের ভোটারের মন পশ্চিমবঙ্গের মতোই পাঁচবার বুঝতে পেরেছে রাজনৈতিক দলগুলি। তুলনায় অনেক এগিয়ে ওড়িশা, মণিপুর, নাগাল্যান্ডের মতো রাজ্যগুলি। এই সব রাজ্যেই ভোটারের মন দশবারের বেশি বদল এনেছে। বহুত্ববাদের এই দেশে যেখানে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের ভাষা, বর্ণ, খাদ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার, ব্যবহার ইত্যাদি সবই আলাদা, সেখানে ভোটারের মন আলাদা হবে—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে ভোটারের মনের যে একটা যোগ রয়েছে, সেটা স্পষ্ট। কেরালায় স্বাক্ষরতার হার ৯৬.২ শতাংশ। তামিলনাড়ু ও পন্ডিচেরিতে ৮৫.৫ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমেও ৮০ শতাংশের ওপর। কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ বা অসমে ভোটারের মনের গতিপ্রকৃতি আঁচ করা অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় অনেকটা সহজ। আসলে স্বাক্ষরতা আর শিক্ষা এক নয়। আর রাজনৈতিক শিক্ষা ও জ্ঞান তো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। বলতে দ্বিধা নেই, এই বিষয়ে আমাদের রাজ্যের ভোটারের মন অনেকটা পিছিয়ে। আবার সর্বভারতীয় স্তরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে রাজ্যের অধোগতিও প্রমাণ করে আমাদের রাজনৈতিক দৈন্য। এরকম বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের ব্যাপক খামতি রয়ে গেছে। ফলে ভোটারের মন বোধহয় সেভাবে পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি আজও। এর সঙ্গে দিন দিন বেড়ে চলেছে ড্রপ আউট, ছদ্ম ও সাময়িক বেকারত্ব এবং পরিযায়ীর সংখ্যা। আর তাতেই সামান্য চাকরি বা ভাতাকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরছে এক বিপন্ন বিরাট প্রজন্ম, যারা আজ ও আগামীর ভোটার। এদের মন বোঝা খুব কিছু কঠিন নয়। যেন-তেন-প্রকারেণ উপার্জন ও জীবনধারণ তাদের একমাত্র পাখির চোখ। আজ যে রাজনৈতিক দল ভোটারের মনের শুধু এইটুকু বুঝতে পারবে, অ্যাডভান্টেজ তাদের। তার প্রমাণও যে আমরা পাচ্ছি না, তেমন নয়। অতীতেও ভোটারের মনের এই নির্লিপ্ততা 'প্রমোদ জ্যোতি মাতব্বর, আপেল পেঁয়াজ এক দর' হওয়ার পরেও বদলায়নি। কিন্তু সেটা বুঝতে পারেননি সেদিনের বিরোধী পক্ষ। উল্টে বিরোধিতা করতে গিয়ে ক্রমে সাইনবোর্ডে পরিণত হয়েছেন। একইভাবে বর্তমানের 'জিতলে গণতন্ত্র, হারলে ষড়যন্ত্র' সময়েও ভোটারের মন একইরকমভাবে নির্মোহ। হয়তো কখনও বিবেকের অত্যাধিক তাড়নায় সে পালাবদলের ডাক দেয়, কিন্তু পরক্ষণেই আবার আপোসের রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। ফলে সেদিনের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক আজ বিরোধী দল হয়ে ক্রমে শূন্যে মিলিয়ে যায়। বঙ্গের ভোটারের মন এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত নির্মম বলা যেতেই পারে। কেননা মাত্র এক দশকে সে নিজের একসময়ের পথপ্রদর্শককে ব্রাত্য করেছে। তাঁদের অবস্থা আজ এমনই যে, দূরবীন দিয়ে দেখলেও খুঁজে পাওয়া যায় না। সমাজমাধ্যমে তাঁদের দাপুটে উপস্থিতি কিংবা জনসভায় ভিড় থাকা সত্ত্বেও ক্ষয় অব্যাহত। সেজন্যই বলছি, ভোটারের মন বোঝা সবসময় সহজ হয় না। তবে ভারতীয় গণতন্ত্রে শেষ কথা হলো সংখ্যার প্রাধান্য। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত সমীকরণ। গণতন্ত্রের পক্ষে সেটি কতটা স্বাস্থ্যকর কে জানে। কিন্তু বোধহয় সেটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ৬৫.৭৯ শতাংশ ভোটার নিজেদের মনের কথা বলেছিলেন ভোটিং মেশিনে। অর্থাৎ মনের কথা না জানানোর দলে ছিলেন ৩৪.২১ শতাংশ। বিজয়ী দলের ভোটের শতাংশ ছিল ৩৬.৫৬। এখানেই ভাবনা আসে যে, মনের কথা না বলা ভোটাররা যদি তাঁদের ভোট বিরোধীদের দিতেন, তবে নির্বাচনের ফল পুরোটাই বদলে যেত। সেই অর্থে দেখতে গেলে গণতন্ত্রের এই প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ সময় সংখ্যালঘু ভোটারের মন জয় করে পরবর্তী পাঁচ বছরে তখতে মৌরসীপাট্টা গেড়ে বসে কোনও রাজনৈতিক দল। সংখ্যাতত্ত্বের এ এক অদ্ভুত খেলা। আর একটা ব্যাপার হলো, ভারতীয় গণতন্ত্রে এখনও ব্যক্তিপুজো করেই চলেছে মানুষ। দলবদলু বহু নেতার বারংবার জয় সে কথাই প্রমাণ করে। ভোটারের মন এক্ষেত্রে বুঝতে অসুবিধে হয় না। সে মন চলে নেতার সঙ্গে সঙ্গে। কখনোই স্বাবলম্বী হয় না সে। নিজের মনের ওপরেই থাকে না তাঁর আস্থা। সেটা না হলে আদর্শহীন, নীতিহীন, ভ্রষ্ট এই রাজনৈতিক ধান্দাবাজরা কখনোই নির্বাচনে জিততে পারতো না। তাঁদের জিতিয়ে দেয় ভোটারের অপ্রাপ্তবয়স্ক মন। তবে সম্প্রতি ভোটারের মনের অদ্ভুত দোলাচল দেখছি। সরকারি ভাতার টাকা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্রিগেডে ভাষণ শুনতে হাজির হওয়া তরুণ ভোটার আপাতত ভাইরাল। বহু ভোটার মনে করছেন, বিগত এক-দেড় দশকে স্রেফ রাজনীতি করে যদি কোনও ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী কোটিপতি হয়ে যায় বা কুঁড়েঘরে থাকা দিনমজুর পাঁচতলা হাঁকায়, তাহলে সরকার বিভিন্ন খাতে যে টাকা ভাতা দিচ্ছে, সেটা নেওয়ায় কোনও লজ্জা নেই। বরং বেশি করে সেটিই নেওয়া উচিত। কেননা এই টাকা তাঁদের নিজেদের। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের টাকা নিচ্ছেন। কেউ আলাদা করে দিচ্ছে না। কিন্তু তার জন্য ঋণী থাকবার প্রয়োজন নেই। ভোটবাক্সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ব্যাপার নেই। অবশ্য এই ভাবনার বিপরীতেও বহু মানুষ আছেন। এই দেওয়ার জন্য তাঁরা দু-হাত তুলে বরাভয় দেখাচ্ছেন শাসক দলকে। কিন্তু একটি জায়গায় বোধহয় প্রত্যেক ভোটারের মন এক। সেটা হলো উন্নয়ন ও সুশাসন। খাতায়-কলমে নয়, আক্ষরিক অর্থে। কোনও সন্দেহ নেই, বিভিন্ন কারণে আজ এই রাজ্যের সুনাম তলানিতে। রাজ্যের বাইরে থাকা তরুণ দুই ভোটার জানালেন, ‘নির্বাচনের দিন ঘোষণার সাংবাদিক সম্মেলনে যেভাবে প্রত্যেক সাংবাদিক পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে প্রশ্ন করলেন, তাতে আমাদের লজ্জা আরও বেড়েছে। অফিসে আমরাও অনেকের প্রশ্নের মুখে।’ এই লজ্জা বোধহয় এই মুহূর্তে আমাদের রাজ্যের সব ভোটারের মনে। তার মধ্যেই আবার ওত পেতে আছে সাম্প্রদায়িক শক্তির শক্ত হাত। আমাদের রাজ্যের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে যে ব্যাপারগুলি আগে ছিল না, সেগুলি বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। ধর্মীয় উন্মাদনায় কম যাচ্ছে না কেউই। পাশাপাশি রয়েছে বেকারত্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, হানাহানি-রক্তক্ষয়, সংঘাত, অপশাসন, দুর্নীতি ইত্যাদির মতো ব্যাপার। সব কিছু মিলে ভোটারের মন খানিকটা হলেও সংকটে। শাঁখের করাতের মধ্যে পড়েছেন তাঁরা। রক্তক্ষরণ দু-দিকেই। ফলে অন্তত এই মুহূর্তে তাঁরা বুঝতে পারছেন না ঠিক কীভাবে বলবেন মনের কথা। তাঁদের অবস্থাটা অন্তত এখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কথায় অনেকটা— ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ’।


https://a2onuswor.com/view?articale_id=a9d4d040-6b76-4473-b57d-31905bb14590


** প্রকাশিত: সানডে ফানডে: অ2অনুস্বর / সম্পাদক: শ্রী রূপায়ণ ভট্টাচার্য 

No comments: