Friday, February 21, 2025


 

গুগুল দেখাচ্ছে কোচবিহার থেকে এই জায়গাটির দূরত্ব ১৪৯৭ কিমি। এর মধ্যে ৪৮৯ কিমি স্থলভাগ। বাকিটা কালাপানি। জল আসলে এতটাই নীল, যে দূর থেকে কালো বলে ভ্রম হয়। তো সেখানেই এই দোকানটি। হতে পারে বিপনীটি যেমন তেমন। তবু রুজিরুটি। মা লক্ষ্মী।

ভাল লেগেছিল সাইন বোর্ডটি দেখে। কী সুন্দর বাংলা ভাষায় লেখা। আন্দামানের সুবিধে এটিই। বাড়ি থেকে এতদূরে আছি মনেই হয় না একবারও। ওখানকার বাঙালিরা বাংলাকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন হিন্দি আর তামিলের পাশাপাশি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে চারদিকের নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে হঠাৎ মনে পড়ল এই দোকানটির কথা। 

বেঁচে থাকে প্রত্যেকের নিজের ভাষা।  নিজের মতো করে.... 

Thursday, February 20, 2025


 

ডুয়ার্স রানির কাছে  
শৌভিক রায়  

এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। ঠিক প্রকাশ করা যাচ্ছে না! সামনে অনন্ত খাদ। পেছনে আকাশচুম্বী পাহাড়। দুজনেই মোহময়ী। কিন্তু তাদের হারিয়ে দিয়েছে বহু নিচের সেই অনির্বচনীয় দৃশ্য। ওই দূরে বয়ে দেখা যাচ্ছে তোর্ষাকে। খানিকটা পূবে জয়ন্তী। আর তার খানিকটা পাশে রায়ডাক। ভেবেছিলাম সংকোশকেও বোধহয় দেখতে পাবো। কিন্তু চোখ আটকে গেল ঘন সবুজে। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, এতটা ওপরে রয়েছি যেখান থেকে শুধু বক্সার ঘন  অরণ্য নয়, দেখা যাচ্ছে জলদাপাড়া, চিলাপাতা সব! ওপর থেকে গাছগুলিকে বেঁটে দেখালেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তাদের প্রাচীনত্ব। ঘন নীল আকাশটা আবার হাতের খুব কাছাকাছি। সেখানে উড়ছে অদ্ভুত সুন্দর পাখিরা সব। তাদের ডাক খানিকটা কর্কশ হলেও, সৌন্দর্যে ধারেপাশে আসছে না কেউ। আর উড়ছে রংবাহারি প্রজাপতির দল। শুধু তাদের দেখেই কাটিয়ে দেওয়া যায় সারাটা দিন। তবে মেঘ বৃষ্টি আর আলোর খেলা দিনের সবসময়ে। এই মুহূর্তে ঢেকে যাচ্ছে সব তো পরমুহূর্তেই ঝলমলে রোদে হেসে উঠছে চারদিক। এখানকার গুটিকয়েক বাড়ির বাসিন্দাদের সঙ্গে সেই হাসির কেমন যেন অদ্ভুত মিল। এই সব মিলেই প্রবল হাওয়ায় গায়ে শীত জড়িয়ে বুঁদ হয়ে আছি লেপচাখার সৌন্দর্যে।

বক্সা ফোর্ট থেকে আরও কিমি চারেক ওপরে উঠলে পাহাড়ি ছোট্ট হ্যামলেট লেপচাখা। আর অন্যদিকে, সান্তালাবাড়ি পার হয়ে জিরো পয়েন্টের দিকে এগোতে বাঁ হাতে এক পথ চলে গেছে চুনাভাটির দিকে। ভয়ঙ্কর নির্জন সেই পথে অনেকটা হেঁটে দেখে এসেছি সেই গ্রামটিও। ভুট্টা, আর মকাই ক্ষেতের সেই গ্রামে পাখিরা কথা বলে। দোকানপাট নেই বললেই চলে। সামান্য কয়েকটি বাড়ি। চলে পশুপালন। পায়ে হাঁটা পথে ভারসাম্য ঠিক রাখাই মুশকিল কিছু কিছু জায়গায়। পাহাড়, জঙ্গল আর নির্জনতা মিলিয়ে এই দিকটাও অসামান্য। আসলে এটি বক্সা ফোর্টে যাওয়ার সমান্তরাল অন্য একটি পথ। একটি জায়গা থেকে ডান  হাতে বেঁকে যেতে হয় ফোর্টের দিকে। এই পথেও রয়েছে নদী আর ঝর্ণা। বর্ষায় সেগুলি যে কী সুন্দর হয়, সেটা বেরসিকও বুঝবে। তবে এই পথে ফোর্টে যাই নি। চুনাভাটি থেকে ফিরে জিরো পয়েন্ট হয়ে পরিচিত পথেই এগিয়েছি ফোর্টের দিকে। ফোর্টে ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, সেখান থেকে ডুয়ার্স রানি লেপচাখায়।   















ফোর্ট নিয়ে আর নতুন কথা কী বলব! ব্রিটিশ আমলে আন্দামানের সেলুলার জেলের পরেই দুর্গম ও দুর্ভেদ্য বক্সা ফোর্ট, ডুয়ার্স তো বটেই, উত্তরবঙ্গের গর্ব। হিংস্র শ্বাপদের গা ছমছমে বক্সা জঙ্গলের উত্তরে, সিনচুলা পাহাড়ে, ২৮৪৪ ফিট উচ্চতায়, কে বা  কারা ফোর্টটি নির্মাণ করে সে বিষয়ে স্পষ্ট জানা যায় না। কারো মতে ফোর্টটি তিব্বতিদের তৈরী, কেউ কেউ মনে করেন কামরুপীরা ছিলেন এর নির্মাণের পেছনে। আবার ভুটিয়ারা এই ফোর্টের নির্মাতা এরকমটাও মনে করেন ঐতিহাসিকেরা। আরও ওপরে ৪৫০০ ফুট উচ্চতায় রয়েছে রোভারস পয়েন্ট। মাত্র ১১ কিমি দূরে ভুটান। সিনচুলা গিরিপথ পেরোলেই অসামান্য রূপম উপত্যকা। 

বক্সা ফোর্ট কবে তৈরী সে নিয়ে বিতর্কের মাঝে কিছু তথ্য জরুরী। মনে করা হয়, ১৬৬১ সালে প্রাণভয়ে ভীত কোচবিহার-রাজ প্রাণনারায়ণ এই ফোর্টে এক বছর কাটিয়ে ছিলেন। ফোর্টটি তখন 'জং' নামে পরিচিত। পরবর্তীতে 'জং'-এর অধিকার নিয়ে লড়াই বেঁধে থাকতো ভুটান ও কোচবিহারের। প্রথম ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধে, ইংরেজ ক্যাপ্টেন জোনস ১৭৭৩ সালে বক্সা অধিকার করলেও, ১৮৬৫ সালে সিনচুলা চুক্তি অনুসারে ফোর্টটি পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশদের দখলে আসে এবং 'জং` বা দুর্গের দখল নেয় তারা।
 
বক্সা ফোর্টের দখল নিয়ে ব্রিটিশরা  কিছু সংস্কার করেছিল। ফোর্টটি পাথরের দেওয়ালে মুড়ে ফেলা হয়, টিনের ছাদ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় অফিসারদের থাকবার ঘর, পোস্ট অফিস। জলের ব্যবস্থাও করা হয়। বক্সাকে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৮৭৩ সালে সেনা মোতায়েন-সহ তিনটি পিকেট বসানো হয় বক্সায় এবং পরের বছর বক্সাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৯০১ সালে রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ চালু হলেও ফোর্টের দুর্গমতা কিন্তু একই থেকে যায়। ১৯১৪ থেকে ১৯২৪ অবধি মিলিটারি পুলিশের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ফোর্টটি। অবশেষে স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে ১৯৩০-এ জেলখানায় বদলে যায় ফোর্ট। দুর্গম এই ফোর্টে বন্দি হয়েও সেদিনের স্বাধীনতা-সংগ্রামীরা দমে যাননি। তবে এই ফোর্টে নেতাজি সুভাষকে বন্দি রাখা হয়েছিল বলে যে কথা শোনা যায় তা ঠিক নয়। স্বাধীনতা-সংগ্রামী তৈলক্যনাথ চক্রবর্তীকে অন্য বন্দীরা 'নেতাজি' সম্বোধন করতেন। সম্ভবত সেখান থেকেই নেতাজি সংক্রান্ত বিপত্তি। এই ফোর্ট থেকেই ১৯৩১ সালে বন্দিরা রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁকে অভিনন্দনপত্র পাঠিয়েছিলেন। বিশ্বকবি প্রত্যুত্তরও দিয়েছিলেন। ফোর্টে প্রবেশের মুখে খোদাই করা দুটো পত্রই দেখা যায় আজও। স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের এখানে বন্দি হিসেবে রাখা হয়েছিল। সেই বন্দিদের মধ্যে ছিলেন পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ অবধি তিব্বতি রিফিউজি ক্যাম্প ছিল ফোর্টে। ১৯৭১-৭২ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদেরও  আশ্রয় দেওয়া হয় এখানে এবং শেষ অবধি ১৯৭৬-৭৭ সালে পরিত্যক্ত হয় ফোর্ট। 
      
১৯৮০ সালে জাতীয় স্মারকের ঘোষণা হলেও, আজ কিন্তু বড্ড অবহেলায় পড়ে রয়েছে আজকের বক্সা ফোর্ট। বক্সাকে নিয়ে প্রবন্ধ-উপন্যাস-গল্প-কবিতায় বহু লেখালিখি হলেও বর্তমান বক্সা ফোর্টের চারদিকে ধ্বংসস্তুপ কেবল! সান্ত্রাবাড়ি থেকে এখনও পাঁচ-ছয় কিমির উঁচু-নীচু পাহাড়ি  হাঁটা পথে যেতে হয় ফোর্টে। অপূর্ব নৈসর্গিক পরিবেশে, ফোর্টের বিপরীতে দেখা মেলে নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, ফরেস্ট রেস্ট হাউস, পোস্ট অফিস (অতীতের রেসিডেন্টস অফিস) ও  কিছু বাড়িঘরের। কিন্তু ফোর্টের ভগ্নদশায় মন খারাপ হয়ে যায়। ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদের প্রতি এই অবহেলা সত্যি অকল্পনীয়। কে বিশ্বাস করবে যে, কয়েক দশক আগেও লোহার গেট, পাহারাদার, দেওয়াল, আংটাবেড়ি ইত্যাদি দেখা যেত এই দুর্গে। কাঁটাতারে ঘেরা থাকত এলাকা। কাকপক্ষীও ঢুকবার সাহস পেত না। বক্সা ফোর্ট নিয়ে আলোকপাতের অবকাশ আজও রয়ে গেছে। বারংবার দৃষ্টি আকর্ষণ সত্ত্বেও অজানা কারণে বক্সা ফোর্ট অবহেলিত। জানা নেই কবে ঘুচবে এই অন্ধকার, কবে যোগ্য মর্যাদা পাবে ইতিহাসের বক্সা ফোর্ট।   

লেপচাখায় বসে বসে ভাবছিলাম ডেভিস আর গ্রিফিথের কথা। আজকের বক্সা দেখলেও কি তাঁরা একই কথা বলতেন? কেননা  ১৭৮৪ সালে লেফটেন্যান্ট ডেভিস ও  ১৮৩৮ সালে উইলিয়াম গ্রিফিথ বক্সার দূর্ভেদ্য জঙ্গল ও অপরূপ শোভায় মোহিত হয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন।  গ্রিফিথ ১৮৩২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৮৪২-৪৪ সালে কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিন্টেন্ড হিসেবে কাজ করেছিলেন। প্রকৃতি-প্রেমিক গ্রিফিথের বা ডেভিসের সেদিনের বিবরণ থেকে আজকের বক্সার কি বিরাট অমিল? আমি নিজে ১৯৮৪ সালে যখন প্রথম বক্সা ফোর্টে আসি তখন রাস্তা ছিল আলাদা। ১৯৯৩ সালের বিধ্বংসী বন্যায় সেই রাস্তার অস্তিত্ব বিলুপ্ত। ফোর্টেরও কিছু অবশিষ্ট ছিল সে সময়। আজকের এই দৈন্যদশা হয় নি তখনও পর্যন্ত। মনে আছে কয়েক মাস পরেই সান্দাকফু ট্রেক করতে যাব বলে, প্রস্তুতির জন্য ফোর্ট থেকে সান্তালাবাড়ি অবধি নদী বক্ষ ধরে নেমেছিলাম। সেদিনও এখানে অরণ্য যেমন গভীর ছিল, আজও ঠিক ততটাই। যোগাযোগ ব্যবস্থার  খানিকটা উন্নতি হলেও, প্রয়োজনের তুলনায় সেটা কিছুই না। ড্রুকপা ও নেপালি অধ্যুষিত এই অঞ্চলের মানুষদের কষ্টের সীমা-পরিসীমা নেই বললেই চলে। জীবনধারণের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষগুলি আনতেও তাদের যে পরিশ্রম করতে হয়, তা আমাদের মতো শখের পর্যটকদের বোধগম্য হয় না কিছুতেই। 

ফোর্ট থেকে লেপচাখার দিকে, চড়াই-উৎরাই পথে, কিছু বাড়িঘর চোখে পড়েছে। বেশির ভাগ বাড়ির সামনে রয়েছে 'ক্ষেতি' আর তাতে যথারীতি চাষ হয়েছে ভুট্টা আর মকাই। দেখা গেল ইউ-এর চাষও। সেগুলি দিয়ে পরে তৈরী হবে পানীয়। বাড়িগুলিতে থাংকা ঝোলানো দেখে বোঝাই যায় তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। লেপচাখাতেও রয়েছে চোর্তেন। দেখা মেলে বৌদ্ধ মঠ বা মনাস্ট্রির। আধুনিক সভ্যতার হাত ধরে এখানেও তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি হোম স্টে। ডুয়ার্সের এই অঞ্চল আজও যেন অচেনা, রহস্যময়। লেপচাখা থেকে আর একটি পাহাড়ি পথে চলে যাওয়া যায় রায়মাটাঙে। তবে সেই পথ বড্ড নির্জন আর বিপদসংকুল। সময়ও লাগে আমাদের মতো অনভ্যস্তদের। গাইড ছাড়া যাওয়া উচিত নয় বলে, ঝুঁকি নেওয়া গেল না আর। 

ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো লেপচাখায়। কিন্তু পূর্ণিমার আলোয় মুহূর্তেই মুছে গেল সেই অন্ধকার। এক অদ্ভুত আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো চারদিক। নিচের সবুজ অরণ্যের রূপ গেল পাল্টে। খাপ খোলা তরবারির মতো দেখতে হয়ে গেল তিন সেই নদী। এক অদ্ভুত নির্জনতায় কখনও কখনও ভেসে এল কোনও প্রাণীর ডাক। যে সৌন্দর্যের সাক্ষী হলাম এবার তা বর্ণনা আমার সাধ্যাতীত। শুধু মনে হচ্ছিল, আবহমানকাল থেকে এভাবেই যেন বসে আছি আমি আর আমার সামনে একে একে চলে যাচ্ছে বক্সার ইতিহাসের নানা অধ্যায়। সাক্ষী হচ্ছি কেবল সেসবের। 

মরা চাঁদের আলোয় যখন হোম স্টে-এর ঘরে ঢুকলাম, তখন রাঙা হচ্ছে চারদিক। রেডি হলাম ঝটপট সূর্যোদয় দেখব বলে!   

* ছবি- লেখক

(প্রকাশিত- এখন ডুয়ার্স)

Wednesday, February 19, 2025


 

এক অন্য জয়ন্তীর কথা 
শৌভিক রায় 

নদীর দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হচ্ছিলাম। প্রথম যখন নদীটি দেখি তখন জল ছিল বেশ। এখন প্রবাহ অনেকই কম। এমন নয় যে, শীতকাল বলে জল নেই। বর্ষার আর শীতের মধ্যবর্তী এই সময়ে যখন নদীরা পূর্ণ-যৌবনা, ঢলঢলে, ঠিক সেই সময়ে জয়ন্তীর এই হাল দেখে সত্যি খারাপ লাগছিল। পাশাপাশি, আর একটা হিসেব মিলছিল না। এই নদী কি সেই নদী যে ফি বছর জয়ন্তীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়! উঠে আসে পত্রিকার শিরোনামে! বুকে পাথর নিয়ে নদীর এই শুকনো চেহারায় বিস্মিত হতেই হয় কমবেশি!


দাঁড়িয়ে আছি ডুয়ার্সের পর্যটন মানচিত্রের রানি জয়ন্তীতে। এত কথা লেখা হয়েছে জয়ন্তীকে নিয়ে যে, নতুন কথা বোধহয় সেভাবে বলবার নেই। কিন্তু জয়ন্তী বাদে ডুয়ার্স! ভাবা যায়? সেজন্যই আর একবার চেষ্টা করা, নিজের মতো জয়ন্তীকে দেখা। আর সে দেখা দেখতে গিয়ে জানতে পারছি যে, ১৮৬৫ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের পর সিনচুলা চুক্তির পর নভেম্বর মাসের ১১ তারিখ ভুটান বাংলা আর অসমের ৮৮০ বর্গকিমি জায়গা বার্ষিক ৫০০০০ টাকার বিনিময়ে সমর্পণ করে। এই এলাকার মধ্যে ছিল ভুটানিদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মহাকালধাম। কিন্তু জয়ন্তীর দখল ছিল ভুটানের হাতেই। নিজেদের পবিত্র তীর্থস্থান পুনরুদ্ধারের চিন্তা যেমন ছিল ভুটানের, তেমনি ইংরেজরাও চাইছিল জয়ন্তীকে নিজেদের হাতে নিতে। এর পেছনে ছিল ইংরেজদের প্রবল ব্যবসা বুদ্ধি। কেননা এই অঞ্চল যে বিশাল খনিজ ভান্ডারে পূর্ণ সে কথা ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল ১৮৬৫-৬৬ সালে গডউইন অস্টিনের রিপোর্টে। ১৮৭৫ সালে এফ আর ম্যালেটের আর একটি রিপোর্ট অস্টিনের কথাকেই সমর্থন করে। কিন্তু সে সময়ে শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে ইংরেজরা খনিজ সম্পদ সংগ্রহে আগ্রহী হয় নি। তাদের মনে তখন অন্য ভাবনা। আর এই ভাবনা থেকেই প্রমাণিত হয় যে, জয়ন্তী সে আমলে ঠিক কী ছিল। 

জয়ন্তী সে সময় ছিল হাতি কেনাবেচার কেন্দ্র। ভারী কাজের ক্ষেত্রে বলশালী এই পশুটি ছিল মুশকিল-আসান। এদের লোভনীয় দাঁত ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। সুতরাং ব্যবসা পণ্য হিসেবে হাতির কদর ছিল আলাদা। কিন্তু মুশকিল হল, হাতি পাওয়া যেত যে অঞ্চলে, সেই জায়গাটি ছিল ভুটানের অন্তর্গত। আর সেজন্যই হাতি ধরতে গেলে নিতে হচ্ছিল ভুটানের বিশেষ অনুমতি। অতএব চলল প্রচেষ্টা। ইংরেজদের ভাগ্যলক্ষ্মী তখন সব দিক থেকেই দিয়েই সুপ্রসন্ন। কেননা ভুটানও চাইছিল ইংরেজদের হাত থেকে তাদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র নিজেদের হাতে নিতে। অবশেষে সে প্রচেষ্টা সফল হল ১৮৮৮ সালে। আসরে নামলেন এডওয়ার্ড ডালটন। মূলত তাঁর সুপারিশে তদানীন্তন ভারত সরকারের বিদেশ দপ্তর আজকের বক্সা দেওস্থানের পূর্বদিকের অঞ্চলটি কিনে নিলেন। ২১.৪৩ বর্গমাইলের সেই জায়গাটি নিতে তাদের খরচ হয়েছিল ১০০০০টাকা। এই অঞ্চলটির নাম ইংরেজরা রেখেছিল জয়ন্তী ল্যান্ডস বা জৈনতি। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল ডুয়ার্স রানি। এই সময়েই মহাকাল চলে গিয়েছিল ভুটানের দখলে। তীর্থক্ষেত্রের জন্য ইংরেজদের খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না বলে সেদিনের দশ হাজার টাকার সঙ্গে মহাকালকেও দিয়ে তুলে দিয়েছিল তারা ভুটানের হাতে। 









  জয়ন্তীকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে হাতি কেনাবেচার ব্যস্ত ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত করতে ইংরেজদের সময় লাগে নি। তবে শুধু হাতি নয়, তাদের নজর ছিল বিপুল অরণ্য সম্পদের ওপরেও। ফলে জঙ্গল দ্রুত মুছে যেতে লাগল। যে বক্সা-জয়ন্তীতে আজও দিনের বেলায় মহীরুহদের গা-ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে থাকায় সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছায় না, সেই জায়গা তবে সেকালে কী ছিল ভেবে ওঠাটাই দুষ্কর। কিন্তু বাস্তব এটাই। ১৮৯৬ সালে এইচ হেডেনের রিপোর্ট বলেছিল, জয়ন্তীতে রয়েছে  লিগনাইট, ডলোমাইট এবং লৌহ তামার আকরিক। কিন্তু তবুও দীর্ঘদিন জয়ন্তীতে সেভাবে কোনও কলকারখানা দেখা যায় নি। এর কারণ সম্ভবত ডুয়ার্সের বিশেষ করে বক্সা-জয়ন্তীর দুর্ভেদ্য জঙ্গল। যাহোক, নতুন শতকে এসে কিন্তু জয়ন্তীর বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। স্থাপিত হয়  কোচবিহার স্টেট রেলওয়ের জয়ন্তি- গীতালদহ রেলপথ। ১৯০১ সাল সেটি। আর এই রেলপথ স্থাপনের পূর্ণ কৃতিত্ব কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের। ততদিনে জয়ন্তী নদীর ওপাশে গড়ে উঠেছে চা-শিল্প।এসে গেছেন ইউরোপিয়ানরা। জয়ন্তীর কাছে-পিঠে নানা জায়গায় চা-বীজ সবুজ গাছে পরিণত হচ্ছে। বন কেটে বসত গড়ে তুলতে আর দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তুলে ফ্যাক্টরিতে পাঠানোর কাজে ভিন রাজ্য থেকে এসে গেছে শ্রমিকেরা। তাই ভারত সরকারের অনুরোধে সাড়া দিতেই রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছিল সেই রেলপথ। এই রেলপথ মূলত চা-শিল্পের জন্য তৈরি করা হলেও, জয়ন্তী থেকে বিশালাকার বৃক্ষদের মৃতদেহ যাত্রা শুরু করেছিল ভারতের নানা প্রান্তে ব্রিটিশদের হাত ধরে। 

জয়ন্তীর অবস্থা আরও বদলে গেল ট্রান বুলস, এ জে কিং আর জি সি দে প্রমুখেরা যখন জয়ন্তী নদীর ওপর ব্রিজ তৈরি করলেন। এই সড়ক পথটি হয়ে গেল বক্সা জয়ন্তী সহ ডুয়ার্স যাওয়ার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। রেলপথ, সড়কপথ ইত্যাদি সবকিছু মিলে জয়ন্তীর তখন জমজমাট অবস্থা। এখানকার সোমবারের বিরাট হাটে যোগ দিতে নানা প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষজন আসতে শুরু করেছেন, ফলে জয়ন্তী হয়ে উঠেছে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান জনপদ। ১৯৩২ আর ১৯৪৭ সাল দুটিও জয়ন্তীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই দুই বছরে যথাক্রমে বেঙ্গল লাইম এন্ড স্টোন কোম্পানি ও   জয়ন্তী লাইম কোম্পানি জয়ন্তী থেকে ডলোমাইট তুলবার সরকারি সম্মতি পায়। প্রসঙ্গত ১৯৩৭, ১৯৫০ ও ১৯৫৯ সালে এই অঞ্চলের বহু গর্ভস্থ খনিজ সম্পদ নিয়ে আরও তিনটি  সার্ভে করেছেন এ লাহিড়ী, ডি কে চন্দ্র ও টি কে কুরিয়ান এবং জানা গেছে , জয়ন্তী এই ব্যাপারে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সবকিছু মিলে শিল্পে, চা-চাষে, খনিজ সম্পদ উত্তোলনে জয়ন্তী তখন উত্তরের গর্ব। জয়ন্তীকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছেন সবাই। চলছে বিভিন্ন উৎসব। নিয়মিত বসছে যাত্রা থিয়েটারের আসর। শোনা যাচ্ছে রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তীতে কোনও কিশোরের আবৃত্তি। বিরাট দুর্গাপূজায় অংশ নিতে বহু মানুষ ছুটে আসছেন এখানে।

কিন্তু অবস্থা পাল্টে গেল কবে যেন। আজকের জয়ন্তী মানে ২৬ মাইল কোর জংগল জিপ্সি সাফারি, পুকুরি পাহাড় এবং তাঁসিগাও নজর মিনার, ভুটিয়াবস্তি ও চুনিয়া জংগল সাফারি, ছোট এবং বড় মহাকাল গুহা। ছোট্ট এই জনপদ দেখলে কে বলবে একসময় এখানে ছিল এত কিছু! অতীতের রেলপথ বন্ধ হয়ে গেছে সেই কবে ১৯৮৬ সালে। মাঝে এই রেলপথ পুনরায় চালুর দাবি উঠেছিল। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ব্যাঘ্র প্রকল্পের মর্যাদা পাওয়া বক্সায় এই রেলপথ চালু হওয়া বোধহয় আর সম্ভব নয়। গভীর অরণ্য গ্রাস করেছে লোহার সেই সমান্তরাল লাইনকে। বন্ধ হয়ে গেছে ডলোমাইট তোলা। অধ্যাপক অর্ণব সেন লিখেছেন, 'পাহাড়ে এখানে ডলোমাইটের বিশাল ভান্ডার। তবে ডলোমাইট তোলা নিষিদ্ধ হয়েছে। চুনাভাটির চুন-সংগ্রহও বন্ধ, পড়ে আছে নদীর ওপর পরিতক্ত্য বাংলো। পাথর তোলাও বন্ধ কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে।...১৯৯৩-এর জুলাই মাসে বন্যার দাপটে পাহাড়ের ভেঙে পড়া পাথরে নদীগর্ভ ভরাট হয়ে প্লাবনের আশংকা বাড়িয়ে দিয়েছে।` সত্যি বলতে ১৯৯৩ সালের বিধ্বংসী এই বন্যাই তছনছ করে ফেলেছে প্রাচীন জয়ন্তীকে। ফলে, দেখা যায় না সেদিনের পি ডব্লিউ বাংলো, নদীর ওপর থাকা ব্রিজ। পাহাড়ের ভেঙে পড়া পাথর আর ডলোমাইট নদীবক্ষ ভরাট করে তোলায় বিপত্তি হয়েছে দুই ভাবে। নদীতে জলপ্রবাহ এমনিতে দেখা না গেলেও বর্ষাকালে নদী  দুই কূল ছাপাচ্ছে। ফল, বন্যা ও বাসিন্দাদের ঘর ছাড়া হওয়া। এই মুহূর্তে জয়ন্তীর লোকসংখ্যা বারোশোর কাছাকাছি। রেভিনিউ ভিলেজের মর্যাদা পাওয়ার জন্য যা যা থাকা দরকার তার সব থাকা সত্বেও এখনও জয়ন্তী সে মর্যাদা পায় নি। জয়ন্তীর বাসিন্দা অজয় রায় লিখছেন, `রেভিনিউ ভিলেজে পরিণত হতে একটি হাই স্কুল প্রাইমারি স্কুল, প্রাইমারি হেলথ সেন্টার, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পি ডব্লু ডি . পাকা সড়ক পথ, ৫০০ জনের উপরে ভোটার, পাকা বাড়ি, তিনটের বেশি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যাতায়াতের জন্য সরকারি ব্যবস্থা সব কিছু থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের জয়ন্তি গ্রাম রেভিনিউ ভিলেজ-এর আওতায় আসেনি। যদিও এই গ্রামের ২০১৪ পর্যন্ত জুডিশিয়াল লিস্ট (J L number) 45 ছিল। এখন জে এল নম্বর 45 এর পাশে জয়ন্তি গ্রামের নামের পরিবর্তে বক্সা ফরেস্ট (পানবাড়ি খন্ড) হাওয়ায় আমরা আমাদের জমি থেকে পাট্টা থেকে বঞ্চিত এবং অধিকার পাওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।`

আজকের জয়ন্তীতে রয়েছে PWD-এর একটি ইনস্পেকশান বাংলো, PHE-এর ইন্সপেকশন বাংলো, বনবিভাগের বন বাংলো, CESC-এর অবকাশ বাংলো, পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের কটেজ ও একটি ধর্মশালা। ইকো ট্যুরিজমের ক্ষেত্রেও জয়ন্তী পিছিয়ে নেই। রয়েছে কমবেশি ৩৬টি হোম স্টে। এখানকার পরিবেশ আজও কসমোপলিটান। নানা বর্ণের, ভাষার, ধর্মের মানুষের বাস জয়ন্তীতে। বহু অসুবিধে নিয়েও তাঁরা মাটি কামড়ে পড়ে আছেন শুধুমাত্র জয়ন্তীকে ভালোবেসে। জয়ন্তী থেকে খানিক দূরের রাজাভাতখাওয়া, বক্সা দুর্গ ইত্যাদি সব কিছু মিলে জয়ন্তী আজও আকর্ষণীয় হলেও জয়ন্তীর কষ্ট এখনও শেষ হয় নি। কবে হবে কেউ তা জানেও না। এই ডুয়ার্স আমাদের অচেনা। জয়ন্তী-সহ ডুয়ার্সের অনন্য সৌন্দর্যে মোহিত হলেও এই ডুয়ার্স কি আপনারও চেনা?

ছবি- লেখক

(প্রকাশিত: এখন ডুয়ার্স)

Tuesday, February 18, 2025


 

টোটোপাড়া বারবার 
শৌভিক রায় 

হান্টাপাড়া পার হতেই উত্তরে দেখা গেল হিসপা-কে। আর পশ্চিমে চোখ ফেরাতে নজরে এল পদুয়া। অবশ্য এখান থেকেও গন্তব্য একেবারে কম দূর নয়। দাম্পি আর দ প্রুঙকে দেখতে হলে অবশ্য এখনও চলতে হবে আরও খানিকটা পথ। এমনিতে  বল্লালগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তর অবধি রাস্তা এখন ঝকঝকে কালো পিচের। তারপর পাথুরে ধুলো মাখা পথে আরও গেলে অবশেষে তাদিং পাহাড়ের কোলে বিস্ময়কর ছোট্ট সেই জনপদ। পদুয়া আর হিসপা পাহাড় দুটি এখানকার মূল বাসিন্দাদের কাছে দেবতার মত পবিত্র। চারপাশের এই পাহাড়গুলি থেকেই নেমে এসেছে  দাতিঙতি, হাউড়ি, কাংদুতি, দীপ্তি, চুয়াতি, নিটিংটি, জৈপ্তি, গোয়াতি, নামতিতি ও মুটি নামের ঝোরাগুলি। আপাত শান্ত এই ঝোরাগুলিই বর্ষায় আকুলিবিকুলি করে চারপাশ এমন ভাসায় যে, প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছোট্ট গ্রামটি! সমগ্র ডুয়ার্স এত সুন্দর যে, আলাদা করে এই জনপদের  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করবার প্রয়োজন হয় না। আর সত্যি বলতে, প্রকৃতিপ্রদত্ত রূপমাধুরীর জন্য নয়, এই জনপদের পরিচিতি তার বাসিন্দাদের জন্য।  অবশ্য পাকদন্ডী রাস্তা, হাউড়ি-তিতি-তোর্ষা নদী, দিনের বেলায় ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের ছমছমে জঙ্গল, অদূরের ভুটান পাহাড়, সাপ্তাহিক হাটে রঙচঙে মানুষজন এবং সুপারি আর কমলালেবু বাগান ঘেরা জনপদটির টান প্রবল। সঙ্গে আছেন এখানকার এখানকার মানুষেরা যাদের জন্য  সেই কবে থেকে ছুটে আসছেন পন্ডিত ব্যক্তি যেমন, তেমনি আসছেন আমার মতো অর্বাচীন মানুষেরাও। মাদারিহাট ব্লকের টোটোপাড়ার এমনই!

আশির দশকে প্রথম যখন যাই সেখানে, তখন পথঘাট ছিল দুরূহ। ঝাঁকুনিতে শরীরের কলকব্জা খুলে আসার উপক্রম হত প্রায়!  টোটোপাড়ার  আরণ্যক পরিবেশে তখন আক্ষরিক অর্থেই গা ছমছম করত। মাদারিহাট থেকে চব্বিশ কিমির সম্পূর্ণ রাস্তা ছিল পাথুরে। যোগাযোগের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া সেভাবে কিছুই ছিল না। দেখা যেত পান সুপুরি চিবোতে থাকা স্থানীয় মানুষদের। তাদের চোখে সমতলের মানুষদের জন্য লেগে থাকত বিস্ময়। অবশ্য এমনটা নয় যে, তারা সমতলের মানুষদের দেখেন নি। বহুদিন আগেই তাদের আবিষ্কার করেছিলেন ইংরেজরা। তবু নিজের মনে প্রশ্ন জাগে যে, ১৮৯০ সালে যখন সান্ডার সাহেব জমি জরিপ করছিলেন তখন তিনি জানতেনই না কী আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন!

মনে করা হয় যে, লুপ্তপ্রায় জনজাতি টোটোরা একসময় ভুটান-রাজের মালবাহকের কাজ করত। ভারবহনের সূত্র ধরেই তারা জলপাইগুড়ির বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করে। ভারত-ভুটান যুদ্ধে ভুটানের পরাজয় হলে বিভিন্ন গ্রামে বসবাসকারী টোটোরা ভুটানের নানা জায়গায় আশ্রয় নিলেও, টোটোপাড়ার টোটোরা সম্ভবত বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের গ্রামে থেকে যান। কেননা তারা ভেবেছিলেন তাদের গ্রামটি ভুটানের অন্তর্ভুক্ত। সে ভুল ধরা পড়ে একসময়। এই ছোট্ট গ্রামটি ভারতের বলেই পরিচিতি পায় ও টোটোরা ভারতীয় হিসেবে গণ্য হন। তথ্য বলছে যে, ১৮৮৯ সালে যে টোটোদের সান্ডার সাহেব দেখেছিলেন, তার দেখা টোটোরা, টোটোপাড়ায় সাত-আট পুরুষ আগে এসেছিলেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন যে, তারও আগে মালবাজারের টটগাওঁ, আলিপুদুয়ারের টটপাড়া ইত্যাদি জায়গায় টোটোদের বসতি ছিল। অনেকের মতে, কোচ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা ভুটান পাহাড়ের পাদদেশে এই অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আবার 'ডয়া' নামের এক ভুটানি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিগ্রহ তাদেরকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছিল বলেও অনেকের অনুমান। কারণ যেটাই হোক, আজকের টোটোপাড়া কিন্তু জগৎবিখ্যাত একটিই কারণে আর সেটা হল এখানকার মানুষেরা। পশ্চিমবঙ্গের ৪০টি উপজাতি ও ৩টি আদিম সম্প্রদায়ের মধ্যে টোটোরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত এবং তাদের হাত ধরেই টোটোপাড়া বিশ্বজগতে স্থান করে নিয়েছে। আজকের টোটোপাড়া দুমসি গাওঁ, পূজা গাওঁ, মিত্র গাওঁ, সুব্বা গাওঁ, মন্ডল গাওঁ ও পঞ্চায়েত গাওঁ নিয়ে গঠিত। এবাদেও হাউরি লাইন, হাসপাতাল লাইন, চানবা লাইন, স্কুল লাইন, পরগাওঁ, পাখাগাওঁ, তাদিং ইত্যাদি ভাগেও ভাগ হয়েছে টোটোপাড়া। টোটো সম্প্রদায়ের নামের বিবর্তন হিসেবে বলা হয় যে, জেপাঙ থেকে এই শব্দের সৃষ্টি। জেপাঙ থেকে জিতেন - টোটাভি- টোটা - টোটো এভাবেই বিবর্তিত হয়েছে শব্দটি।        

একসময় টোটোপাড়া সন্নিহিত পাহাড়ে কমলালেবুর ফলন ছিল চোখে পড়ার মতো। এখানকার মানুষদের মূল জীবিকাই ছিল কমলালেবু সংগ্রহ করা। পঁয়তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেও টোটোপাড়ার অর্থনীতি কমলালেবুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হত। সমতল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সেই কমলালেবু কিনে নিয়ে যেতেন। শোনা যায় যে, তারও বহু আগে ইংরেজ আমলে, একটি দুটি সিগারেটের বিনিময়েও নাকি বানিয়া ইংরেজ সংগ্রহ করত ডুয়ার্সের সুস্বাদু কমলালেবু। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আজ আর কমলালেবু বাগান নেই। ফলে, টোটোপাড়ার অর্থনীতির অভিমুখ আজ বদলে গেছে। কিছুদিন আগেও সেই অর্থনীতিতে এখানকার মাটিতে জন্মানো স্বাভাবিক বাঁশ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিত। কিন্তু কমলালেবুর মতো সেখানেও অজানা রোগ হানা দিয়ে ফলন বন্ধ করেছে। ফলে আজকের টোটোপাড়ার বাসিন্দাদের মূল কাজ কৃষিকাজ এবং এই কৃষিতে সুপারির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এখানকার মাটিতে সুপারির অধিক ফলন হেতু এখানে প্রচুর পরিমানে সুপারি চাষ হয়। এরকমই এক কৃষিজীবী টোটো পরিবারের সন্তান অভিষেক টোটো জানালেন যে, বছরে তারা ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা প্রতি কেজি হিসেবে প্রায় লাখ দুয়েক টাকার সুপারি উৎপাদনে সক্ষম। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, অভিষেক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বীরপাড়া কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করে টোটোপাড়াতেই একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তার এক দিদিও টিসিএসে কর্মরত। ভাই বিপ্লব টোটোও অভিষেকের মতো বি এ পাস করেছেন। আজকের টোটোপাড়ায় অবশ্য বিদ্যালয় শিক্ষার জন্য আর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মোটামুটি সব সুবিধে রয়েছে। ধনপতি টোটো  মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে এই মুহূর্তে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ২৫৬ জন। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত  প্রধানশিক্ষিকা শ্রীমতী মিশা ঘোষাল রায় জানালেন যে, তাঁর বিদ্যালয়ে মোটামুটি সব পরিকাঠামো থাকলেও শিক্ষকের অভাব রয়েছে। তবে সকলের সাহায্যে সেই অসুবিধে অচিরেই দূর করা যাবে বলে তাঁর বিশ্বাস। টোটোরা ছাড়াও গ্রামে নেপালি, রাজবংশী, বিহারি ও কিছু সংখ্যক বাঙালি রয়েছেন। 















নব্বইয়ের দশকের শেষেও কিন্তু টোটোপাড়ার চেহারা ছিল আলাদা। আজকের মতো এত সংখ্যক বাড়িঘর ও মানুষজনের দেখা পাওয়া যেত না সেখানে। আজ প্রায় ৫০০০ লোকের বাস টোটোপাড়ায়।  অসমর্থিত সূত্র অনুসারেএই জনসংখ্যার মধ্যে ১৬০৩ হলেন টোটো সম্প্রদায়ভুক্ত। আদিবাসী সম্প্রদায়ের অতীতের সেই সামাজিক জীবনেও এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। টোটোদের নামকরণে বাংলা, নেপালি শব্দের প্রয়োগ তার প্রমান। এখন শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, তাদের বিয়ে হচ্ছে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গেও। পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের জীবনে বদল আনলেও এখনও টোটো সম্প্রদায় ১৩টি গোত্রে বিভক্ত- বঙ্গবি-বে, বৌদুবি-বে , বুদুবি-বে, নুরিং -চানকোবে, দিড়িঙ -চানকোবে, পিশু - চানকোবে, নুবি-বে, রেংকাই জি-বে, দাংকোবে, দাংত্র বি, মাংকোবি, মাংত্র বি, মাং-চি-বি। স্বগোত্রে বিয়ে সাধারণত দেখা যায় না টোটো সমাজে। বিয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদার হলেও, নিজের গোষ্ঠী ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ে বিয়ে করতে হলে, প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন রয়েছে টোটো সমাজে। অনেক সময় সন্তান আসবার পরেও বিয়ের অনুষ্ঠান চলে 'বিয়ো পং-পেওয়া'-এর মাধ্যমে। কিন্তু বিবাহিত দম্পতির কেউই বিচ্ছেদ  ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। বিয়ের পর নবদম্পতির জন্য আলাদা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। 

টোটোদের বাসগৃহ নির্মাণেও বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে।  বাঁশ বা কাঠের খুঁটির ওপরে খড়ের দোচালা ছাউনি দিয়ে তাদের ঘর নির্মিত হয়। তাদের ভাষায় এই ঘরের নাম হল 'না কে শা'। ঘরে প্রবেশের জন্য একটি মাত্র দরজা বা 'লাপুঙ' থাকে। সাধারণত মাটি থেকে পাঁচ-সাত ফুট উচ্চতায় ঘরের মেঝে তৈরী করা হয়। দরজার সামনে থাকে উন্মুক্ত বারান্দা, মেঝের উচ্চতার চাইতে সামান্য নিচে। 'কাইবু' বা খাঁজ কাটা গাছের গুড়ি ব্যবহার করা হয় বাড়িতে প্রবেশের জন্য। ঘরের ভেতর থাকে 'চি মা' বা গৃহদেবতার জন্য নির্দিষ্ট স্থান। তাছাড়াও রান্নার জায়গা বা 'মে-রিং', শোওয়ার ঘর বা 'সিরি', অতিথির জায়গা বা 'দেইচি কো সিরি', বাড়ির তলায় চলে পশুপ্রতিপালন। বারান্দা শুধুমাত্র আপ্যায়নের জন্য নয়, সাংসারিক সব কাজই চলে সেখানে। তবে আজকের টোটোপাড়ায়  'না কে শা' পাওয়া মুশকিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টোটোদের চিরাচরিত বাড়িও পাল্টে গেছে, লেগেছে আধুনিকতার স্পর্শ। এখন অধিকাংশ টোটো পরিবার পাকা দালানবাড়িতে থাকতেই অভ্যস্ত। সাবেক সেই বাড়ির অভাব টোটোপা ড়ার চেহারা সামান্য হলেও বদলে দিয়েছে। তবে কে না জানে যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন অত্যন্ত স্বাভাবিক। 

ঘরের ভেতর সাধারণত চই সুন, জিরং কোবে, সংকা মংকা পূজা হয়ে থাকে। সাতরিং, জিদিং, কুংরি, বারাইগোরি নুচে, পাদুওয়া (পাহাড় পুজো), তোর্ষা মেরে মধি, লাপু ভিন্তি, দাংতেনতি-হইনতি (নদীপূজো), বিরকো চইসুন, পকিংসওয়া (পাথরের পুজো) ইত্যাদি পুজো বাইরে হয়ে থাকে। টোটো সমাজের পুজোয় বলিপ্রথা রয়েছে আজও , তবে নব্যশিক্ষিত টোটো যুবকদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলে মনে হয়েছে যে, তারা এই প্রথার বিরোধী। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংস্কার ও প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে একটু সময় লাগে বৈ কী! অত্যন্ত ধর্মভীরু টোটো সমাজে সারাবছর পুজোপার্বন লেগেই থাকে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, তাদের মন্দিরে কোনও বিগ্রহ থাকে না। আসলে তারা প্রকৃতির পূজারী। আকাশ, পাহাড়, নদী ,গাছ, ভূমি ইত্যাদি তাদের উপাস্য। 'ঈশপা' হলেন টোটোদের প্রধান দেবতা। পুরুষ রূপে তিনি মহাকাল ও নারী রূপে মহাকালী বা সইনঝানি। টোটো সমাজে 'মইনাঙ্গ' বা 'পিদুয়া' নামের দেবতা বা অপদেবতাও রয়েছে। টোটোদের পুজোয় প্রধান পুরোহিত বা  'দেবপাও' বা 'কাইজি' এবং তার সহকারী 'দেওসী'-এর ভূমিকা বিরাট। টোটোদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের নাম হল 'ওমচু' ও  'ময়ূ' এবং এই দুটি পুজোই  ঈশপার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে। তবে তাদের পুজোয় মূর্তি দেখা যায় না, চিগাইমু এবং মুগাইমু নামের দুটি বড় বড় ঢোলকে তারা মহাকাল ও মহাকালীর প্রতীক হিসেবে পুজো করে থাকে। ওমচু পুজোর সময় কাল এখন পাঁচদিন থেকে তিনদিনে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। জুলাই মাসের শেষে বা অগাস্টের শুরুতে ওমচু পুজোর ২২ দিন পর ময়ূ পুজো হয়ে থাকে। ময়ূ পুজোর পরিধিও এখন ৯দিন থেকে ৫দিনে আনা হয়েছে। বাদ পড়েছে গরু বলির মতো প্রথাও। ধর্মীয় উৎসব ও সমাজ পরিচালনার জন্য কাইজি (পুরোহিত), গাপ্পু (মোড়ল), পাও (ওঝা), নামপনের  (সংগঠক) ভূমিকা মেনে নেওয়া হয়েছে। 

আজকের টোটোপাড়ার টোটোদের খাদ্যাভাসেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চাল বা ভুট্টার ভাত, ডাল,সবজি এখন প্রধান খাদ্য হিসেবে পরিগণিত। চলে লবন চা বা 'না চাসিং'। আটা, মারুয়ার রুটির পাশাপাশি দাঙনিং, কাইরিং, বুরিং, দুরিং, ডাকানি, লিসু , সতেই, লাকা, লাইরা ইত্যাদি পাহাড়ি ও জংলী আলু সংগ্রহ করা হয়। মাছ-মাংসও টোটো সমাজে বিশেভাবে আদৃত। 'চরুসাই' নামের শাকও তাদের খুব প্রিয়। আর রয়েছে টোটোদের নিজস্ব পানীয় ইউ। সাধারণত মারুয়া ও কাউন থেকে ইউ তৈরী করা হয়ে থাকে। বলা যেতে পারে যে, ইউ হল টোটোদের সর্বক্ষণের পানীয়। সঙ্গে থাকে পান ও সুপুরি। রয়েছে ধূমপানের অভ্যেস। তবে আজকাল তামাক পাতা মুড়িয়ে নলের মধ্যে ঢুকিয়ে ধূমপানের চিত্র বিরল হয়ে এসেছে। বয়স্ক কিছু মানুষের মধ্যে এই অভ্যেস দেখা গেলেও, আধুনিক সময়ের টোটোদের পছন্দ বাজার চলতি প্যাকেটের সিগারেট। ঝুম চাষের রীতি পাল্টে যাওয়ার জন্য অতীতের খাদ্য আজ লুপ্ত হতে বসেছে। তবে এখনও শূকর-মাংস অত্যন্ত চালু। টোটোপাড়ার চারপাশের নদীতে মাছের সংখ্যা কমে আসায় বাজারের মাছের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে টোটো সম্প্রদায়। 

আজও টোটোপাড়ায় বিনোদনের জন্য বিদ্যালয়ে সদ্য নির্মিত অডিটোরিয়াম ছাড়া আর কোনও ধরণের প্রেক্ষাগৃহ দেখা যায় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তথ্যের কোনও বিনোদন নেই। প্রতিটি আদিবাসী সমাজের মতোই ততসমাজ নৃত্য গীতে পটু। টোটো ভাষা জানলে বা বুঝতে পারলে লক্ষ্য করা যায় যে, তাদের গানে সমাজচিত্র থেকে শুরু করে অতীত ইতিহাস ফুটে ওঠে। গানে বলা হয় শিকারের কথা, ধর্মের কথা। আবার নারী-পুরুষের পারস্পরিক মন দেওয়া নেওয়ার কথাও তথ্যের গানে লিপিবদ্ধ। টোটোদের গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গান হল 'লেতিগেহুয়া' বা স্বপ্নদ্রষ্টাদের গান। কোনও সাধারণ টোটো এই গান গাইতে পারে না, এই গান গাইবার অধিকারী ইয়ং টং রাই, যিনি স্বপ্নের মাধ্যমে দেবতার আদেশ পান এবং গান বাঁধেন। ধর্মীয় সংগীত হলেও এই গানে জীবনের কথাই ফুটে ওঠে। গানের পাশাপাশি টোটো নৃত্যও কিন্তু অসাধারণ। যদিও আজ 'চি চি পাওয়া' বা মহিলাদের নৃত্যের মতো বেশ কিছু নাচ বিলুপ্ত হয়ে গেছে তবু টুং টুং গামু, দৈতাপা, সেংজা, পেলা হো ইত্যাদি নাচগুলি দেখা যায়। সেংজা ছাড়া বাকি সব নাচেই শুধুমাত্র পুরুষদের দেখা যায়।    

অতীতের সেই টোটোপাড়ার আমূল বদল না হলেও, পরিবর্তন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পর্যটনের সুযোগ রয়েছে বুঝে টোটোপাড়ায় এখন পিকনিক স্পটও দেখা যায় পাহাড়ের ওপরে। টোটোপাড়া যাওয়ার পথে সরকারি পর্যটক আবাস যেমন রয়েছে তেমনি কিছু হোম স্টে তৈরি হয়েছে। সরকারি পর্যটক আবাসটি থেকে লঙ্কাপাড়া, হান্টাপাড়া, টোটোপাড়ার পাশাপাশি মাদারিহাট, জলদাপাড়াও কাছেই হয়। টোটোপাড়ার মঙ্গলবারের হাটে জামাকাপড় থেকে শুরু করে বহু কিছুই মেলে, তবে দেখা যায় না কমলালেবুর বেচাকেনা কিংবা পিঠে কমলালেবুর টুকরি নিয়ে পাকদন্ডী বেয়ে নেমে আসা আদিবাসী সুঠাম পুরুষ বা ঝলমলে মহিলাকে। বল্লালগুড়ি পঞ্চায়েত অফিস থেকে টোটোপাড়া পর্যন্ত পথে এখনও পিচের আস্তরণ পড়ে নি, তবে টোটোপাড়ায় রাস্তাঘাট পাকা, ফলে যান চলাচলে কষ্ট হয় না। প্রায় অধিকাংশ বাড়িতেই দুই চাকার বাহন রয়েছে, ফলে মাদারিহাট থেকে কখন বাস বা ট্রেকার আসবে সেই ভরসায় থাকতে হয় না বেশির ভাগ মানুষকেই। তবে মাদারিহাট থেকে এখন বাসের পাশাপাশি কিছু জিপ ও মারুতি ভ্যান চলছে। টোটোপাড়ার খুদে পড়ুয়ারা বাঙালি-নেপালি=বিহারি-টোটো নির্বিশেষে ভীড় জমাচ্ছে টোটোপাড়ার ধনপতি টোটো মেমোরিয়াল হাই স্কুলে কিংবা মাদারিহাট-টোটোপাড়া পথে উত্তর খয়েরবাড়ির কাছে  তৈরী হওয়া বিভিন্ন মাধ্যমের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। 

বারবার গিয়েও টোটোপাড়া পুরোনো হয় না। প্রতিবারই নজরে পড়ে নতুন কোনও পরিবর্তন। হয়ত সেই পরিবর্তনের অনেককিছু ভাল লাগে না, কিন্তু এটা বুঝি যে, এই পরিবর্তন না মানবার কিছু নেই। টোটো সম্প্রদায়ের মানুষেরা যত বেশি নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হবেন, তত তাদের নিজেদের মঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ভাল। কেননা খুব কম জনপদের টোটোপাড়ার মতো সম্পদ থাকে। সেদিক থেকে আমরা ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গবাসী অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। অন্যতম ক্ষুদ্র আদিবাসী সম্প্রদায় হওয়ায় আমাদের ওপরেও দায়িত্ব এসে পড়ে তাদেরকে দেখে রাখবার। বংশগত দারিদ্র, শিক্ষাহীনতা, অপুষ্টি দূর করে যেদিন টোটোপাড়া আমাদের সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে, সেদিন হয়ত আমাদের কর্তব্য শেষ হবে। তাই যখন আমার প্রিয় দুই ছাত্র বিপ্লব ও অভিষেক তাদের নিজেদের ভাষায় গেয়ে ওঠে 'নুবাই কাঙ জোড়া দিবাই কাংয়াং গোত্র/ দাঙতা কাঙ, হিপসা খাংতা কাঙ চুংচা/ অকো পাই কতা ইয়ং কো জেজেঙ কইয়া লোই/ লেই বার বার লেই / তে বার বার তে সানি / তাত্রপুন তেনা / সেনে বোকো তে লাকা ডাইকো তে / ইয়চ পুঙ, ওয়াঙ পুনা মুমুঙরো সেঙ্গে /লেই বার বার লেই /লুনডি ইয়ং বিহিং মোই দিঙনা / মোইবে তিঙ্কো লেই সামা তিঙ্কো লেই/ লেই বার বার লেই' (পূর্বে তোর্ষা, পশ্চিমে পাহাড়, উত্তরে দেবতা হিপসা, দক্ষিণে ঘন অরণ্য, তার মাঝে সুন্দরী টোটোপাড়া, এস বন্ধু এস। চলো বন্ধু সূর্য উঠেছে, জঙ্গলে যাই কাঠ আনতে, বৃষ্টি হলে গাছ ভিজবে, মাঠ আমাদের ডাকে, ধান লাগাই চলো, মারুয়া লাগাই চলো, চলো বন্ধু চলো),তখন মনে হয় চলি আবার পাহাড়-নদী -অরণ্য  ঘেরা রহস্যময় টোটোপাড়ায়.... 

       
ছবি- লেখক 

(প্রকাশিত: এখন ডুয়ার্স)

Monday, February 17, 2025


 

ফালাকাটা, মধ্যবর্তী সেই জনপদ 
শৌভিক  রায় 

এ এক মধ্যবর্তী অঞ্চল। উত্তর-দক্ষিণে পাহাড়-সমতলের আর পূবে-পশ্চিমে তোর্ষা-তিস্তার মাঝে, এক সমৃদ্ধ এলাকা। সেজন্যই বোধহয় জয়প্রসাদ সিং, মানিক প্রধান, অম্বিকাচরণ বসাক, কুঞ্জবিহারী মুখোটি, যোগেন্দ্রনাথ বর্মন প্রমুখেরা এই অঞ্চলে জমিদারি বা জোতদারি পত্তন করেছিলেন। কিন্তু সে তো খুব বেশিদিনের কথা নয়। এই অঞ্চলটি তার বহু আগে থেকে পরিচিত। হবে না-ই বা কেন! অরণ্য শেষে উর্বর ভূমি শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। তবে  সে আমলের কথা অনেকটাই ধূসর। কিন্তু আজকের জনপদে তখন যে হিংস্র শ্বাপদ ঘুরে বেড়াত, বড় বড় ঘাসের মাঝে লুকিয়ে থাকত বনচররা, তা বুঝতে কিন্তু তেমন কল্পনার দরকার হয় না! 

স্থানটির নামের পেছনে লুকিয়ে আছে আর এক ইতিহাস। জানা যাচ্ছে যে, রংপুর জেলার সামন্ত রাজার কন্যা ফুলটুসি ছিলেন অন্য এক রাজা শ্যামল বর্মনের স্ত্রী ও মন্ত্রী। বীরাঙ্গনা সেই নারী ভুটান রাজের সৈনিকদের নাকি এখানেই ফালা ফালা করে কেটেছিলেন। তাই নাম হয়েছে ফালাকাটা। মনে করা হয় যে, ফুলটুসির আমল থেকেই 'বাবাহে' (অপভ্রংশে 'বাহে') শব্দটির সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে আর একটি কথা হয়ত একটু অপ্রাঙ্গিক হবে। তবু যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা এলো বলে উল্লেখ করাই যায়। এই সামন্ত রাজারা ও তাদের সৈনিকেরা রাজার হয়ে যুদ্ধ করবার সময় চর্মনির্মিত বর্ম পরিধান করত। রাজ বংশের লোকেরা বা তাদের প্রত্যক্ষ কর্মচারীরা ধাতু নির্মিত বর্ম ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। শত্রুপক্ষের আক্রমণের হাত থেকে তাদের এই বর্ম পরিধানের জন্যই সম্ভবত তারা বর্মন নামে পরিচিত ছিল। নামকরণের ইতিহাস ঘাটলে অবশ্য গাছ ফালা ফালা করে কাটার মতামতটিও প্রাধান্য পায়। আবার সাপটানা নদীর ভূমিখন্ডকে বেশ কয়েকটি ফালিতে ভাগ করা বা লৌকিক দেবতা হুঁকো-হাতে বাঘের পিঠে বসে থাকা দেবতা ফালাকাটার কথাও মনে হতে পারে। 

নামকরণের ইতিহাস কিন্তু সবসময়েই অনুমাননির্ভর। তবে, সব তত্ত্বই কিছু না কিছু সত্য ঘটনাকে তুলে ধরে। আর সেই তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে এটা স্পষ্ট যে, পাহাড় থেকে নেমে দীর্ঘ অরণ্যভূমির ভেতর দিয়ে ভুটানিরা, বিশেষ করে শীতকালে, আশ্রয় নিত ফালাকাটার উপকন্ঠে মুজনাই নদীর তীরে। প্রত্যেক বছর তারা ওই অঞ্চলে আসত বলে, সেই জায়গাটির নাম হয়ে গেল ভোটানির বা ভুটানির ঘাট। এক আমলের জমজমাট ব্যবসাকেন্দ্র সেই ভুটানির ঘাট আজ একটু ম্রীয়মান হলেও এখানে কিন্তু রয়েছে এস এস বি ১৭ নম্বর  ব্যাটেলিয়ানের হেডকোয়ার্টার। আর এস এস বি-র দুর্গা পুজো এক সময় জমকালো ভাব খানিকটা হারালেও, আন্তরিকতায় এখনও এক। একই কথা বলা যায়, ফালাকাটা জনপদের অভ্যন্তরে পি ডব্লু ডি-এর উল্টোদিকে থাকা তাদের ক্যাম্পটির ক্ষেত্রেও। এখানকার কালীপুজো একসময় ছিল রীতিমতো নামকরা। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে, ফালাকাটার উন্নয়নে এই ক্যাম্প দুটি কিন্তু সবসময় সদর্থক ভূমিকা নিয়েছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ এস এস বি জওয়ান হওয়ায় ফালাকাটায় যেন ছোট্ট ভারত পাওয়া যায়। গত শতকের আশির দশকে, এস এস বি-এর সর্বভারতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়েছিল ফালাকাটার ক্যাম্পের মাঠে। তার জৌলুষ আজও ফিকে হয়নি সেদিনের দর্শকদের চোখে।রাজ্যপাল বি ডি পান্ডে উপস্থিত ছিলেন উদ্বোধনে। ফালাকাটার বিপদে-আপদে এস এস বি আজও বিরাট ভরসা। এস এস বি জওয়ানদের সময়ানুবর্তিতা, সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা অবশ্যই ফালাকাটার মানুষদের প্ৰেৰণা দেয় সব যুগেই। তাদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে এস এস বি তে চাকরিও নিয়েছে। ক্রীড়া জগতে ফালাকাটার উজ্জ্বল নামের পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।  











এস এস বি ক্যাম্পের মাঠের কথা উঠল যখন, তখন অবশ্যই বলতে হচ্ছে তার পাশে থাকা ফালাকাটা টাউন ক্লাবের মাঠটির কথা। অতীতে মেলার মাঠ নামে পরিচিত এই মাঠটিকে ঘিরে ভুটানিরা ঘোড়দৌড় থেকে শুরু করে নানা খেলার আয়োজন করত। ভুটানের থেকে হাতবদল হয়ে ফালাকাটা ইংরেজদের হাতে এলেও, আজকের মুক্তিপাড়া সাপটানা ব্রিজের পূর্বাংশ থেকে শুরু করে দোলন নদী পর্যন্ত অর্থাৎ উত্তরাংশে ছিল মাঠ ও জঙ্গলের বিস্তৃতি। আর পূর্ব পশ্চিম ও দক্ষিণে ছিল ভুটান ও কোচবিহারের দখলে। তবে বাঁধাধরা কোনও সীমানা ছিল না বললেই চলে। বড় বড় কিছু গাছকে সীমানা ধরে নেওয়া হত। প্রায়শই বিবাদ বাঁধত দু'পক্ষে। অবশেষে সিনচুলা চুক্তির ফলে ১৮৬৫ সালে ফালাকাটা পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশদের হাতে আসে। ইংরেজদের করদ রাজ্য কোচবিহারের সঙ্গেও ফালাকাটার নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়। কোচবিহারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে একটি কথা আগেভাগেই বলে রাখি। কোচবিহারে ১৯৪৫ সালে যখন প্রথম সরকারি পরিবহন শুরু হয়, তখন যাত্রীবাহী বাসের জন্য প্রথম রুট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ফালাকাটাকে। চারটি ফোর্ডসন থেমস বাস ও তিনটে ফোর্ড ট্রাক নিয়ে ভারতের অন্যতম প্রাচীন পরিবহন সংস্থা উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহনের সেদিনের সেই যাত্রায় ফালাকাটাই ছিল প্রথম পছন্দের। কোচবিহার রাজদরবারের প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে কোচবিহার থেকে ফালাকাটায় ছুটে চলা বাসটি এই অঞ্চলের স্বপ্নপূরণ করেছিল আর ইতিহাসে ঢুকে গিয়েছিল ফালাকাটা। আজও কোচবিহার-শিলিগুড়ি যাত্রাপথে ফালাকাটা  গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টপ হলেও, কোনও বাসস্ট্যান্ড এখানে তৈরি করা হয় নি। মধ্যবর্তী হওয়ার কষ্ট চেপেও কিন্তু ফালাকাটা এখনও যাত্রী-সহ সবাইকে আপ্যায়ন করে চলেছে। রেলপথে ব্রডগেজে ১৯৬৩ সালে যখন নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন ইঞ্জিনিয়ার ব্র্যাগাঞ্জার তত্ত্বাবধানে ব্রডগেজ রেললাইন পাতা শুরু হয়, তখন আরও অনেক শহরের মতোই ফালাকাটাও পূর্বে অসম আর উত্তর-পশ্চিমে শিলিগুড়ির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। অর্থাৎ রেলপথের ক্ষেত্রেও কিন্তু ফালাকাটার সেই মধ্যবর্তী ভূমিকা একইরকম। মাথাভাঙা হয়ে নতুন লাইন তৈরি হওয়ার বা আলিপুরদুয়ার জংশন-রাজাভাতখাওয়া হয়ে সেভক-শিলিগুড়ি লাইন ব্রডগেজে রূপান্তরিত হওয়ার আগে অবধি, ফালাকাটা স্টেশন দীর্ঘদিন একটি বিরাট অঞ্চলের স্টেশনের কাজ করে গেছে। তার গুরুত্ব আজও কমে নি।   

জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হলে ফালাকাটার প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল আজ থেকে দেড়শ বছর আগে। সে সময় মহকুমার সীমা ছিল অধুনা বাংলাদেশের পাটগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৮৭৪-৭৫ সালে ফালাকাটা থেকে বক্সায় মহকুমা স্থানান্তরিত হলেও কিন্তু ফালাকাটার কদর কমে নি। কেননা ফালাকাটা সেসময়ে অরণ্য গভীর অরণ্যের উপকন্ঠে হলেও, এখানে প্রচুর পরিমান  চাষের জমি ছিল। ফলে গড়ে উঠেছিল জোতদারি। যেমন ফালাকাটার উত্তরে সাবান মিঞা ও মজিদ মিঞাদের জোতদারির কথা জানা যায়। উত্তর পূর্বে ছিল সুখচাঁদ বর্মনের জোতদারি। কিছু নাম তো লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। ডুয়ার্সের, বিশেষ করে আজকের আলিপুরদুয়ার জেলার, আর কোনও এলাকায় এরকম জোতদারের কথা কিন্তু সেভাবে শোনা যায় না। ফলে এই জায়গাটি হয়ে উঠেছিল ইংরেজদের কাছে খাজনা আদায়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই খাসমহল ময়দানে ইঁটের পিলারের ওপর কাঠের সুরম্য খাজনা আদায়ের তহসিল অফিসটি, যা আজ বিলুপ্ত, তৈরি হয়েছিল সেই ইংরেজ আমলেই। আরও কিছুদিন পর ১৯২৪ সালে ড্রামাটিক হল তৈরি হওয়ার পর সেখানে অফিস খুলেছিল জোতদার অ্যাসোসিয়েশন। আর সেই অফিসের বিপরীতে আরও দু'দশক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত সেনা ছাউনিতে ১৯৪৮ সালে তৈরি হয়েছিল ফালাকাটার প্রথম লাইব্রেরি। ড্রামাটিক হল আর লাইব্রেরি সংলগ্ন মন্ডপে শুরু হয়েছিল প্রথম বারোয়ারি পুজো যার আজ অন্তত এক শতাব্দী। অন্যদিকে তহসিল অফিসের পূবে ১৮৯৩ সালে স্থাপিত হয়েছিল এম ই স্কুল। পরবর্তীতে সেই বিদ্যালয়ের নাম পাল্টে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, ফালাকাটার প্রবীণ মানুষেরাও বলতে পারছেন না যে, সেটি ঠিক কোন বিদ্যালয়টি- ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয় নাকি তার পাশে থাকা বেসিক স্কুল! তবে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের  বিদ্যালয়-সংগীতটি রচনার জন্য শান্তিনিকেতনের অবদান ভুলবার নয়। বিদ্যালয় স্থাপনের পর সেদিনের ফালাকাটার বিশিষ্ট মানুষেরা শান্তিনিকেতনে যোগাযোগ করেছিলেন। আশ্রমিক শান্তিদেব ঘোষ-সহ আরও অনেকে এই সংগীত রচনায় সহায়তা করেন শিক্ষক কার্তিকচন্দ্র মুখোটি ও ফালাকাটার অন্যান্য গুণীজনদের।  

তহসিল অফিসের সামান্য পরেই দক্ষিণ দিকে সাপটানা নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছিল ফালাকাটা থানা। তখন কোচবিহারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য থানার সামনে দিয়ে যাওয়া রাস্তাটিই ব্যবহার করা হত। কাছেই ফালাকাটার পুরোনো চৌপথি। অন্যদিকে জোতদার মানিক বোসদের বাড়ি। এই বাড়ির দুর্গাপূজা ফালাকাটার প্রথম পারিবারিক পুজো। থানার কাছেই ছিল ফালাকাটার প্রথম মানিক দাসের হোটেল। থানাতে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় জেলবন্দী করা হত সংগ্রামীদের। তাই থানা ছিল প্রাচীর ঘেরা। সাপটানার দক্ষিণ তীর তাই কিন্তু সেসময় ছিল জমজমাট। আর তার আর একটি কারণ ছিল ফালাকাটার হাট। এই হাট ছিল Western Dooars Fund Market-এর অন্তর্ভূক্ত। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, Western Dooars Fund Market ১৮৯৮ সালে তৈরি করা হলেও ১৯০০ সালে তা সংশোধিত হয়। এই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভুটান-সহ তিব্বতের সঙ্গে ব্যবসা বৃদ্ধি করা। ফালাকাটাতে ৩০ বিঘা জমি নিয়ে তৈরি হওয়া এই হাট এই অঞ্চলের প্রথম হাট বা বাজার যার নেপথ্যে এই ব্রিটিশরাজের সরকারি সংস্থাটি। ১৯৮০ সালে এই সংস্থাটির অবলুপ্তি হয়। আজকের এই অনলাইন যুগে এরকম একটি হাট বা বাজারের গুরুত্ব সেভাবে বোঝা না গেলেও, একশ বছরের বেশি সময় ধরে ফালাকাটার এই হাট একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাহিদার যোগানদার ছিল। বদলে যাওয়া সময়ে নবগঠিত কৃষিমান্ডি যেন সেদিনের সেই হাট, যার কাছে সভ্যতার ঋণ আবহমানকালের।

ফালাকাটার হাটের কাছেই রয়েছে অত্যন্ত প্রাচীন জংলা কালীবাড়ি। নাম থেকে বোঝা যায় যে, গভীর জঙ্গলের মধ্যে অবস্থান ছিল এই মন্দিরের। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও, যখন সুভাষ গার্লস হাই স্কুলের সামনে দিয়ে হাটে আসবার পথে সাপ্টানা নদীর ওপর ব্রিজ তৈরী হয় নি, তখনও এই মন্দিরের পরিবেশ ছমছমে ছিল। পাশ দিয়ে বয়ে যেত মুজনাই। জনশ্রুতি, এই মন্দিরে পুজো দিয়ে জলপথে লুঠপাঠ করতে বেরোত সেদিনের ডাকাতেরা। ব্রহ্মপুত্র গোষ্ঠীর নদী মুজনাই দক্ষিণে আরও খানিকটা বয়ে জলঢাকায় মিশেছে। সম্মিলিত সেই প্রবাহ মানসাই নাম নিয়ে মিশেছে ব্রহ্মপুত্র। কাজেই সেদিনের ডাকাতদের জলপথে একটি বিরাট অঞ্চলে ঘোরাফেরার জন্য মুজনাইয়ের মতো নদী ব্যবহার অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। তবে শুধু জলপথেই নয়, ফালাকাটা-সহ তার আশেপাশের সমৃদ্ধ অঞ্চলও অবশ্যই তাদের নিশানায় থাকত। আজকের দিনে সেই প্রাচীন মন্দিরের চেহারায় আধুনিকতার ছোঁওয়া লেগেছে। মন্দির কমিটি অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। মুজনাইও পুরোনো খাত বদল করে বয়ে চলেছে অন্য পথে। জংলা কালীবাড়ির কালী পুজো আজও বিখ্যাত। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজো হয় বলে পুণ্যার্থীদের ঢল নামে কালীপুজোর রাতে। মন্দির ও পুজোর বয়স কত সে ব্যাপারে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে কিছু বলা না গেলেও মনে করা হয় যে, অন্তত দেড়শ বছর অতিক্রান্ত করেছে এই মন্দির ও পুজো। একদা নদীতীরের এই মন্দিরের কাছেই, সামান্য উত্তরে, ফালাকাটার বিখ্যাত দশমীর ঘাট। একসময় অত্যন্ত জমজমাট ছিল প্রতিমা ভাসানের সেই উৎসব। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ডুয়ার্সে। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিমা আনা হত দশমী উৎসবে অংশ নিতে। আজ জৌলুষ খানিকটা কমলেও, ঐতিহ্য কিন্তু বজায় রেখেছে ফালাকাটা। দশমীর ঘাটের কাছেই একসময় ছিল শিশু কল্যাণ সদনের পুরোনো ঘরবাড়ি। অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার অন্যতম প্রাচীন এই শিশু সদন আজ স্থান পাল্টে ধূপগুড়ি মোড়ের কাছে। ভাল লাগে ভাবতে যে, একটি অত্যন্ত শুভকাজে ফালাকাটার নাম বহুদিন থেকে জড়িয়ে আছে। দশমীর ঘাট লাগোয়া মুক্তমঞ্চ ফালাকাটার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা ছিল আশির দশকে। শিলিগুড়ির পর উত্তরবঙ্গে ফালাকাটাই ছিল মুক্তমঞ্চ আন্দোলনের অন্যতম দিশারী। ফালাকাটা হাটের একদম দক্ষিণ প্রান্তে মুজনাই নদীর তীরে রয়েছে সুপ্রাচীন মহাকাল মন্দির। এই মন্দিরের বয়স নিয়েও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। যদিও মনে করা হয় যে, জংলা কালীবাড়ির সমসাময়িক সময়ে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়। তবে মন্দিরের সামনের অংশে রাধাকৃষ্ণের অবস্থান পরবর্তীতে হয়েছে বলে মনে করা হয় এবং তার জন্য এই অঞ্চলের অবাঙালি সমাজের অবদান ভুলবার নয়। আসলে ফালাকাটায় বাঙালিদের পাশাপাশি উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষদের আমরা দেখতে পাই। ফালাকাটার উন্নতিতে তাদের সদর্থক ভূমিকা কোনও অংশে কম নয়। দুবে, ভাদানি, মাহেশ্বরী-সহ আরও কিছু পরিবারের অবদান কখনই ভুলবার নয়। বংশীধর দুবে, হরকাচাঁদ মালচাঁদ ভাদানী প্রমুখেরা গত শতকের কুড়ি-তিরিশের দশকে ফালাকাটার নাট্যমঞ্চে অভিনয় পর্যন্ত করেছেন। পরবর্তীতে তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরিরা নানাভাবে জড়িয়ে আছেন ফালাকাটার কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে।

একটা সময় ফালাকাটার মূল জনপদ সাপটানা নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠলেও, পরবর্তীতে শহর  উত্তরদিকেও বাড়তে থাকে। সাপটানা আসলে ফালাকাটা চারপাশেই রয়েছে। দ্বীপের মতো সেই অঞ্চলে পরবর্তীতে তৈরী হয়েছে বাবুপাড়া। সরকারি দপ্তর ও চা-বাগান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে  বাবু শ্রেণীর মানুষেরা এই অঞ্চলে থাকতে শুরু করেন।স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশ ভাগ ইত্যাদির পর গড়ে উঠেছে দেশবন্ধু পাড়া, সুভাষপল্লি অঞ্চল। আবার যাদবপল্লী, গোপনগর ইত্যাদি নামগুলির পেছনে সেসব অঞ্চলের মানুষদের জীবিকা প্রাধান্য পেয়েছে। তবে ফালাকাটার কাছের ময়রাডাঙ্গা নামের ইতিহাস কিন্তু বলছে যে, জলাভূমি থেকে উঠে আসা অথবা বালি মাটির অকৃষিযোগ্য উঁচু জমির জন্য মরাডাঙ্গা ধীরে ধীরে হয়েছে ময়রাডাঙ্গা। এই বালি জমির জন্যই ফালাকাটা স্টেশনের কাছে থাকা একটি বিরাট জমি পরিত্যক্ত করেছিলেন চা-ব্যবসায়ীরা। চল্লিশের দশকে সেই জমি মিসেস রেমন্ডের সাহায্যে জোগাড় করতে পেরেছিলেন  সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন। যদিও তারা সে সময় ফালাকাটায় আসেন কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা-বাগানের শ্রমিকদের শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ফালাকাটার সুন্দর প্রকৃতি, বিস্তৃত জনপদ, শিক্ষা ও ধর্ম বিস্তারের সুযোগ ও ছোটনাগপুর অঞ্চলের কার্মাটারে অসফল বিদ্যালয় ছিল তাঁদের সেই সিদ্ধান্তের কারণ। ফলে জমি জোগাড় হলে ১৯৪৯ সালে কার্মাটার থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ফালাকাটায় চলে আসেন তাঁরা। তৈরী হয় রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল। ইংরেজি মাধ্যমের এই স্কুলটি আজ ফালাকাটার অন্যতম সেরা দ্রষ্টব্য। দেখতে ছবির মতো সুন্দর এই স্কুলে রয়েছে সারা ভারত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা। তারা যেমন হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে, তেমনি নিজেদের বাড়ি থেকে পড়ছে স্থানীয় ছাত্ররা। বলতে হয় ফালাকাটার কাছে কোচবিহার জেলায় অবস্থিত শৌলমারী আশ্রমের কথাও। একদা ফালাকাটার সর্বভারতীয় পরিচিত এনে দিয়েছিল এই আশ্রমটি। আশ্রমের মূল কান্ডারি সারদানন্দজিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছিল রহস্য আর সেই রহস্যের পেছনে ছিল নেতাজির নাম। 

আধুনিকতার ছোঁওয়ায় উত্তরের সব জনপদের মতো ফালাকাটাও আজ অনেক পাল্টে গেছে। শপিং মল, হোটেল, পর্যটন কেন্দ্র কুঞ্জনগর, দক্ষিণ খয়েরবাড়ি, আধুনিক জীবনযাত্রা, ঝাঁ চকচকে পথঘাট ইত্যাদি সব নিয়ে সেই বিরাট বিরাট গাছের ছায়ায় ঢাকা আলো-আঁধারীর ফালাকাটা আজ আর নেই। তবু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও কিছু প্রাপ্য ছিল হয়ত ফালাকাটার। কিন্তু সে অন্য বিষয়। ভাবতে অবাক লাগে যে,  সেই কোন অতীতে ভুটান ও কোচবিহার রাজ্যের দখলদারির ফালাকাটা অন্যভাবে চলতে শুরু করেছিল ব্রিটিশদের চুকানি স্বত্বের হাত ধরে। বহু উত্থান পতন জড়িয়ে রয়েছে ফালাকাটার নিজের সঙ্গেই। বহু কিছুর সাক্ষ্য বহন করছে মুজনাই তীরের এই সমৃদ্ধ জনপদ। ফালাকাটার চোখের সামনেই অরণ্য কেটে তৈরী হয়েছে অন্তত ১৮টি জনপদ। গড়ে উঠেছে একের পর এক চা-বাগান। ফালাকাটার নিজের অবয়বেও খানিক পরিবর্তন এলে, ফালাকাটা আজও মধ্যবর্তী সেই জায়গা যাকে বাদ দিয়ে ডুয়ার্স সম্পূর্ণ হতে পারে না। 

* ছবি- লেখক

(প্রকাশিত- এখন ডুয়ার্স)    

Sunday, February 16, 2025


 

বীরপাড়া: এক টুকরো সবুজ ভারত
শৌভিক রায়

বীরপিয়া কে? সে কি সত্যিই বীরের পিয়া? তাহলে সেই বীর-ই বা কে?

উত্তর খুঁজুক সন্ধানী গবেষক। ওসব থেকে থাকি দূরে।

শুনেছি এই ছোট্ট নদীর নামে জায়গাটির নাম হয়েছে বীরপাড়া। পিয়া 'পাড়া' হতেই পারে...সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকমুখে কত শব্দই তো পালটে যায়! তবে বীর যখন আগে আছে, তখন ভাবনা আসে যে, নির্ঘাৎ এমন কোনও চরিত্র ছিল যার নামটি ছিল বীর অথবা স্বভাবে ছিল বীরত্ব। হয়ত ছিল তার কোনও প্রেয়সী। রূপসী কোনও নারী। দু'জনে মিলেমিশে হয়েছিল তাই বীরপিয়া। আবার আলাদা আলাদাভাবে বীর ও পিয়া...দুটি সরল নদী একসাথে মিশে যদি হয়ে যায় বীরপিয়া, তবে তো কথাই নেই! কেননা নদী মানেই তো মিলন। নদী মানেই বয়ে চলার অনন্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাসে রয়ে যায় ভাঙনের পাশাপাশি গড়ার কথা। আর সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ডুয়ার্সের ছোট্ট শহর, বীরপাড়া। তবে আয়তনে ছোট হলে হবে কী, এই শহরের গুরুত্ব দিনদিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য নামকরণের ইতিহাস এখানেই থেমে নেই। সাঁওতাল ভাষা বলছে যে, 'বীর' শব্দটির অর্থ অরণ্য। ডুয়ার্সের এই অঞ্চল যে জঙ্গলে পূর্ণ ছিল তা তো বলাই বাহুল্য। আর সেই বীর শব্দটির সঙ্গে পাড়া যোগ করে নামকরণের তত্ত্বটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যেমন অস্বীকার করা যায় না আদিবাসী নেতা বীরসা মুন্ডার নামে এই স্থানের নামকরণের অন্য ধারণাটিকে।

চা-শহর বলতে যা বোঝায় বীরপাড়া আসলে তা-ই। সেই কবে, কোন একসময়ে ইংরেজ সাহেবরা দলে দলে কালো কালো গরীর মানুষগুলোকে নিয়ে এসেছিল ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে! উদ্দেশ্য ছিল সহজ, সাদা। কাটতে হবে জঙ্গল। তৈরি করতে হবে চা-চাষের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি। এই বিপুল অরণ্য তাই কেটে তৈরি হয়েছিল একের পর এক চা-বাগান।

তবে শুধু চা-বাগান হলে তো হবে না! আনুসাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও দরকার তো। আধুনিক জীবন যাপনে প্রয়োজন হয় যা আর কী! অথচ আলাদা আলাদা করে সব চা-বাগানে সেটা সম্ভব নয়। সব চা-বাগানের পকেটের রেস্ত সমান নয়। সবার ইচ্ছেও সমান নয়। তাই আশেপাশে চা-বাগান নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক একটি জনপদ, যেখানে পাওয়া যাবে নগর জীবনের ছন্দ। তবে বন কেটে বসত বানানো সেইসব জনপদ একদিনে গড়ে ওঠেনি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে তারা। তাদের বুকে লেখা হয়েছে কত না ইতিহাস। আবার সেই ইতিহাসে সময়ের ধুলো জমলেও, সেখান থেকেই পাওয়া যায় প্রবাহমান জীবনের চিত্র।

আক্ষরিক অর্থেই ডুয়ার্সে যখন চা-বাগান তৈরির ধুম পড়েছিল, বীরপাড়ার চলা শুরুও তখন। তার আগে জায়গাটি ছিল ঘন অরণ্যে ঘেরা। আজকের বীরপাড়ার কাছে ভুটানের গুমটু থাকলেও, তুলনায় এই জায়গাটি নতুন। সিমেন্ট তৈরির কারখানার ধোঁওয়া আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো ডলোমাইটের গুঁড়ো গুমটুর ট্রেডমার্ক হয়ে গেলেও, মানুষজনের টান কিন্তু ভারত সীমান্তের প্রখ্যাত কালীমন্দিরের জন্য। উঁচু টিলার ওপর বাহান্নটি সিঁড়ি ভেঙে এই মন্দিরের দেবী দর্শন আর আরও ওপরে পাহাড়ের গায়ে, ভুটান ভুখন্ডে বৌদ্ধ মঠ বেড়াতে যাওয়া, শুধু বীরপাড়া নয়, আশেপাশের একটা বৃহত্তর অংশের রীতি ও রেওয়াজ। নতুন গাড়ি কেনা হয়েছে কিংবা নতুন বিয়ে হয়েছে? মাকরাপাড়ার কালীমন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে এলে মনে করা হয় যে, শুভ হবে সবকিছু। এখানকার সৌন্দর্যও কিন্তু নজরকাড়া। অসমতল ভূমি, পাগলি নদীর ছিপছিপে রহস্যময়তা, চারপাশের অদ্ভুত নির্জনতা আর ঝিঁঝিঁপোকার ডাক...সব মিলে অসামান্য। আর অতি অবশ্যই রয়েছে মাকড়াপাড়া চা-বাগান।

তবে চা-বাগান তো সমস্ত বীরপাড়াকে ঘিরেই। আসলে ১৮৭৬ সালে গজলডোবায় ডুয়ার্সের প্রথম চা-বাগান পত্তনের সঙ্গে সঙ্গে, ডুয়ার্সে চা-চাষের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে একের পর এক চা-বাগান তৈরি করা শুরু হয়েছিল। আজকের বীরপাড়াকে ঘিরে রয়েছে হান্টাপাড়া, লঙ্কাপাড়া, ধুমচীপাড়া, রামঝোরা, সিংহানিয়া, গোপালপুর, তাসাটি, দলগাঁও, মুজনাই, ডিমডিমা ইত্যাদি-সহ প্রায় সতেরোটি চা-বাগান। আর এদের মালিকানা ডানকান, গুডরিক, অক্টোভিয়ান স্টীল কোম্পানির পাশাপাশি কিছু বাঙালি প্রতিষ্ঠানেরও। তবে অতীতের সেই বাঙালি আধিপত্য আজ অনেকটাই অস্তমিত। এস পি রায়, বি সি ঘোষদের মতো মানুষদের আর দেখা যায় না। কিন্তু চা-বাগানের কমতি নেই। এরকমই চা-বাগান বান্দাপানিতে রয়েছে একশ কুড়ি বছর অতিক্রান্ত চা-গাছ। আজকের বীরপাড়ার এ এক অনন্য দ্রষ্টব্য। এই গাছ যেন বন্ধ চা-বাগান, আমৃত্যু সঙ্গী দারিদ্রকে নিয়ে বেঁচে থাকবার এক প্রত্যয়ী সংগ্রাম!












শুধু চা-বাগানের জন্যই বীরপাড়া ইংরেজদের চোখের মণি ছিল এমনটা ভাবা অবশ্য ঠিক নয়। আসলে বানিয়া ইংরেজদের ডুয়ার্স প্রীতির নেপথ্যে একটি বড় কারণ ছিল ব্যবসা। ভুটানের ভেতর দিয়ে তিব্বতের সঙ্গে ব্যবসার জন্য তারা বেছে নিয়েছিল কালিম্পংকে। কেননা তিব্বত থেকে নাথুলা-ছাঙ্গু-কারপোনাং-গ্যাংটক হয়ে পৌঁছানো যেত কালিম্পঙে এবং সেই সময়ে কালিম্পং ছিল ভুটানের অন্তর্গত। তাই ডুয়ার্সে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হত কালিম্পং। ইংরেজরা সেই পথের খানিকটা বিকল্প হিসেবে ভুটানে প্রবেশের জন্য বীরপাড়া থেকে লঙ্কাপাড়া, গুমটু-ভুটান পথটিকেও কাজে লাগাতে শুরু করে। চা-চাষের পাশাপাশি ভুটানে প্রবেশের আর একটি পথ পাওয়া ইংরেজদের কাছে ছিল সোনায় সোহাগা। ফলে বীরপাড়ার কদর বেড়েছিল তাদের কাছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতেও, ১৯৬২ সালে চিন-ভারত যুদ্ধ ডুয়ার্সের এই অঞ্চলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে এবং খানিকটা সেই কারণেও বীরপাড়ার কাছে বিন্নাগুড়িতে উত্তর-পূর্ব ভারতের সর্ববৃহৎ সেনাছাউনি গড়ে উঠেছে। এই সেনাছাউনি শেষ হয়েছে অরণ্যের প্রান্তে। ফলে ঘরে বসেই বন্যপ্রাণী দর্শনের সৌভাগ্য হয় অনেকের। তবে আম-জনতার জন্য নয় তা। অবশ্য সেনাছাউনিতে পরিচিতি বা আত্মীয় থাকলে দর্শন হতে পারে যূথবদ্ধ হাতি বা পেখম ছড়ানো ময়ূরের পাশাপাশি বাইসন, চিতা ইত্যাদির।বন্যপ্রাণের কথা এল বলেই বোধহয় একথা বলা প্রাসঙ্গিক হবে যে, বীরপাড়ার কাছেই রয়েছে গারোচিরা ইকো টুরিজম সেন্টার। আগেই উল্লেখ করেছি বান্দাপানি চা-বাগানের। সেই চা-বাগানের কাছেই রেতি ফরেস্টের ভিতরে কালাপানি বস্তি পার করে আরও উত্তরে গারোচিরার অসাধারণ সৌন্দর্য শিহরিত করে তোলে যে কোনও মানুষকে। এখানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে পাকদন্ডি পথে শুধু বনচরদের দেখাই মেলে না, ডুয়ার্সের মোহময়ী সৌন্দর্য পাগল করে দেয়। মনে হয়, সভ্যতা থেকে অনেকদূরে আদিম অরণ্যে আজও যেন পথ চলছে ভোটরাজা, বানিয়া ইংরেজ, বৌদ্ধ লামা আর অবশ্যই আবহমানকালের এক পথিক।

চা-বাগানকে কেন্দ্র করে বীরপাড়া গড়ে উঠলেও, এই জনপদের বিস্তার কিন্তু বাড়তে শুরু করে ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ডুয়ার্স রেলওয়েজের মাদারিহাট পর্যন্ত সম্প্রসারণের সময় থেকে। এই সময়েই বীরপাড়ার কাছে তৈরি হয় মুজনাই রেল স্টেশন। খুব সম্ভবত মুজনাই চা-বাগান থেকে চা-পাতা অন্যত্র পাঠানোর জন্য এই রেলস্টেশনটির সৃষ্টি এবং চা-বাগানের নামেই এই রেলস্টেশনের নাম দেওয়া হয় মুজনাই, যদিও জায়গাটি শিশুবাড়ি বলে পরিচিত। মুজনাই চা-বাগানের পাশে বাঙাবাড়ি ডিভিশনে থাকা তিনটি প্রস্রবণ, শিব-মন্দির ও টিলাময় ভূখন্ড এখন পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এমনিতেও মুজনাই রহস্যময় নদী বলে পরিচিত। এখান থেকে বল্লালগুড়ি পেরিয়ে টোটোপাড়া খুব কাছে। মুজনাই চা-বাগান ও টোটোপাড়া আসা যায় বান্দাপানি-লঙ্কাপাড়ার দিক থেকেও। টোটোপাড়া নিয়ে বিস্তারিত বলবার অবকাশ রয়ে যাচ্ছে। আপাতত শুধু এটাই বলবার যে, টোটোপাড়া নিঃসন্দেহে উত্তরের পর্যটনের অন্যতম সেরা ঠিকানা।

বীরপাড়ার রেলস্টেশনটিও কিন্তু দলগাঁও নামে পরিচিত। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, বীরপাড়া চা-বাগান লাগোয়া দলগাঁও চা-বাগানের বিশেষ অনুরোধে রেলস্টেশনটির নাম দলগাঁওয়ের নামে রাখা হয়। হয়ত ব্যাপারটি একদিকে ভাল হয়েছিল। কেননা আজকের বীরপাড়া গড়ে উঠবার পেছনে সব চা-বাগানেরই বিশেষ অবদান ছিল। মুজনাইয়ের মতো আর একটি চা-বাগানের এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে ডুয়ার্সে চা-বাগানের গুরুত্বকেই প্রমাণ করে। অবশ্য এটাও ঠিক যে, ডুয়ার্সের উন্নয়নে চা-বাগানগুলির ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। বীরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথাই ধরা যাক। ১৯৫২ সালে স্থাপিত এই বিদ্যালয়ের পেছনে ছিল বীরপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজার এফ এম কার ও ডাক্তার ডঃ এস পি মুখার্জির প্রচেষ্টা। সেই সময়ে নাগরাকাটায় চ্যাংমারি হিন্দি হাই স্কুল থাকলেও এই চা-বলয়ে, রাঙালিবাজনার মোহনসিং উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া, বাংলা মাধ্যম স্কুল ছিল না। ১৯৬৪ সালে বীরপাড়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, রোমান ক্যাথলিকদের পরিচালিত ডিমডিমা ফতেমা হিন্দি বিদ্যালয়, ১৯৭৫ সালে শ্রীমহাবীর হিন্দি উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৮০ সালে বীরপাড়া নেপালি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রমাণ করে যে, চা-বাগানের মানুষ-সহ এই এলাকার নানা বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতির মানুষের জন্য বীরপাড়া ডুয়ার্সের আদর্শ একটি জায়গা। নিজের কসমোপলিটান চেহারা নিয়ে বীরপাড়া তাই নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সত্যিই কসমোপলিটান বীরপাড়া। ভারতের প্রায় সবপ্রান্তের মানুষকেই পাওয়া যায় এখানে। একসময় এখানে ইউরোপিয়ানদেরও আধিপত্য ছিল। অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় শ্রী অর্ণব সেন ও ডুয়ার্স-বিশেষজ্ঞ শ্রীব্রজগোপাল ঘোষের কাছে আজও শোনা যায় বীরপাড়ার কাছের নাংডালা চা-বাগানের সাহেব ম্যানেজারের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারের কথা কিংবা তাসাটি চা-বাগানের বড়বাবু অনাথবন্ধু ঘোষের সঙ্গে ডিমডিমা চা-বাগানের ফিডারবাবুর মাছ ধরতে যাওয়ার গল্প। অতীতের সেই বীরপাড়া আজ অনেক বদলে গেছে। একথা সত্যি। বীরপাড়া থেকে ফালাকাটা যেতে পথের পাশের সেই প্রাচীন মহীরুহেরা অদৃশ্য। এককালের কাঠের দেওয়াল-টিনের চালের বাড়ির বদলে কনক্রীটের জঙ্গল ঢেকে ফেলেছে বীরপাড়াকে। অতীতের খেলাধুলার সেই ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। শ্রদ্ধেয় তুষার বন্দোপাধ্যায়ের মতো কবি ও শিক্ষক, অভয়চরণ কুন্ডুর মতো দক্ষ শিক্ষা প্রশাসকের অভাব আজ পরিলক্ষিত। চা-বাগানের মাদলের শব্দ স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের চটুল রিংটোনে। উন্নয়নের চাকায় চাপা পড়ে যাচ্ছে বৃক্ষদের আর্তনাদ। ধুঁকতে থাকা চা-বাগানকে গ্রাস করছে অপুষ্টি-অশিক্ষা-দারিদ্র। গত শতকের আশির দশকের মতো ঘনঘন ডাইনি-শিকারের কথা শোনা না গেলেও, সংস্কারের আলো আজও বহু মানুষের অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করতে পারেনি। নারীপাচার একটি বিরাট সমস্যা এখনও অবধি।

তবু সব কিছুর পরেও বীরপাড়া সবুজে ঘেরা প্রকৃতির মাঝে যেন 'সব পেয়েছি'র এক ছোট্ট মরুদ্যান যেখানে অনবরত হেঁটে চলেছে এক ছোট্ট ভারত তার সব আনন্দ, সব দুঃখকে সঙ্গী করে।

* ছবি- লেখক

( প্রকাশিত: এখন ডুয়ার্স )