বীরপাড়া: এক টুকরো সবুজ ভারত
শৌভিক রায়
বীরপিয়া কে? সে কি সত্যিই বীরের পিয়া? তাহলে সেই বীর-ই বা কে?
উত্তর খুঁজুক সন্ধানী গবেষক। ওসব থেকে থাকি দূরে।
শুনেছি এই ছোট্ট নদীর নামে জায়গাটির নাম হয়েছে বীরপাড়া। পিয়া 'পাড়া' হতেই পারে...সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকমুখে কত শব্দই তো পালটে যায়! তবে বীর যখন আগে আছে, তখন ভাবনা আসে যে, নির্ঘাৎ এমন কোনও চরিত্র ছিল যার নামটি ছিল বীর অথবা স্বভাবে ছিল বীরত্ব। হয়ত ছিল তার কোনও প্রেয়সী। রূপসী কোনও নারী। দু'জনে মিলেমিশে হয়েছিল তাই বীরপিয়া। আবার আলাদা আলাদাভাবে বীর ও পিয়া...দুটি সরল নদী একসাথে মিশে যদি হয়ে যায় বীরপিয়া, তবে তো কথাই নেই! কেননা নদী মানেই তো মিলন। নদী মানেই বয়ে চলার অনন্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাসে রয়ে যায় ভাঙনের পাশাপাশি গড়ার কথা। আর সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ডুয়ার্সের ছোট্ট শহর, বীরপাড়া। তবে আয়তনে ছোট হলে হবে কী, এই শহরের গুরুত্ব দিনদিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য নামকরণের ইতিহাস এখানেই থেমে নেই। সাঁওতাল ভাষা বলছে যে, 'বীর' শব্দটির অর্থ অরণ্য। ডুয়ার্সের এই অঞ্চল যে জঙ্গলে পূর্ণ ছিল তা তো বলাই বাহুল্য। আর সেই বীর শব্দটির সঙ্গে পাড়া যোগ করে নামকরণের তত্ত্বটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যেমন অস্বীকার করা যায় না আদিবাসী নেতা বীরসা মুন্ডার নামে এই স্থানের নামকরণের অন্য ধারণাটিকে।
চা-শহর বলতে যা বোঝায় বীরপাড়া আসলে তা-ই। সেই কবে, কোন একসময়ে ইংরেজ সাহেবরা দলে দলে কালো কালো গরীর মানুষগুলোকে নিয়ে এসেছিল ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে! উদ্দেশ্য ছিল সহজ, সাদা। কাটতে হবে জঙ্গল। তৈরি করতে হবে চা-চাষের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি। এই বিপুল অরণ্য তাই কেটে তৈরি হয়েছিল একের পর এক চা-বাগান।
তবে শুধু চা-বাগান হলে তো হবে না! আনুসাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও দরকার তো। আধুনিক জীবন যাপনে প্রয়োজন হয় যা আর কী! অথচ আলাদা আলাদা করে সব চা-বাগানে সেটা সম্ভব নয়। সব চা-বাগানের পকেটের রেস্ত সমান নয়। সবার ইচ্ছেও সমান নয়। তাই আশেপাশে চা-বাগান নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক একটি জনপদ, যেখানে পাওয়া যাবে নগর জীবনের ছন্দ। তবে বন কেটে বসত বানানো সেইসব জনপদ একদিনে গড়ে ওঠেনি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে তারা। তাদের বুকে লেখা হয়েছে কত না ইতিহাস। আবার সেই ইতিহাসে সময়ের ধুলো জমলেও, সেখান থেকেই পাওয়া যায় প্রবাহমান জীবনের চিত্র।
আক্ষরিক অর্থেই ডুয়ার্সে যখন চা-বাগান তৈরির ধুম পড়েছিল, বীরপাড়ার চলা শুরুও তখন। তার আগে জায়গাটি ছিল ঘন অরণ্যে ঘেরা। আজকের বীরপাড়ার কাছে ভুটানের গুমটু থাকলেও, তুলনায় এই জায়গাটি নতুন। সিমেন্ট তৈরির কারখানার ধোঁওয়া আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো ডলোমাইটের গুঁড়ো গুমটুর ট্রেডমার্ক হয়ে গেলেও, মানুষজনের টান কিন্তু ভারত সীমান্তের প্রখ্যাত কালীমন্দিরের জন্য। উঁচু টিলার ওপর বাহান্নটি সিঁড়ি ভেঙে এই মন্দিরের দেবী দর্শন আর আরও ওপরে পাহাড়ের গায়ে, ভুটান ভুখন্ডে বৌদ্ধ মঠ বেড়াতে যাওয়া, শুধু বীরপাড়া নয়, আশেপাশের একটা বৃহত্তর অংশের রীতি ও রেওয়াজ। নতুন গাড়ি কেনা হয়েছে কিংবা নতুন বিয়ে হয়েছে? মাকরাপাড়ার কালীমন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে এলে মনে করা হয় যে, শুভ হবে সবকিছু। এখানকার সৌন্দর্যও কিন্তু নজরকাড়া। অসমতল ভূমি, পাগলি নদীর ছিপছিপে রহস্যময়তা, চারপাশের অদ্ভুত নির্জনতা আর ঝিঁঝিঁপোকার ডাক...সব মিলে অসামান্য। আর অতি অবশ্যই রয়েছে মাকড়াপাড়া চা-বাগান।
তবে চা-বাগান তো সমস্ত বীরপাড়াকে ঘিরেই। আসলে ১৮৭৬ সালে গজলডোবায় ডুয়ার্সের প্রথম চা-বাগান পত্তনের সঙ্গে সঙ্গে, ডুয়ার্সে চা-চাষের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে একের পর এক চা-বাগান তৈরি করা শুরু হয়েছিল। আজকের বীরপাড়াকে ঘিরে রয়েছে হান্টাপাড়া, লঙ্কাপাড়া, ধুমচীপাড়া, রামঝোরা, সিংহানিয়া, গোপালপুর, তাসাটি, দলগাঁও, মুজনাই, ডিমডিমা ইত্যাদি-সহ প্রায় সতেরোটি চা-বাগান। আর এদের মালিকানা ডানকান, গুডরিক, অক্টোভিয়ান স্টীল কোম্পানির পাশাপাশি কিছু বাঙালি প্রতিষ্ঠানেরও। তবে অতীতের সেই বাঙালি আধিপত্য আজ অনেকটাই অস্তমিত। এস পি রায়, বি সি ঘোষদের মতো মানুষদের আর দেখা যায় না। কিন্তু চা-বাগানের কমতি নেই। এরকমই চা-বাগান বান্দাপানিতে রয়েছে একশ কুড়ি বছর অতিক্রান্ত চা-গাছ। আজকের বীরপাড়ার এ এক অনন্য দ্রষ্টব্য। এই গাছ যেন বন্ধ চা-বাগান, আমৃত্যু সঙ্গী দারিদ্রকে নিয়ে বেঁচে থাকবার এক প্রত্যয়ী সংগ্রাম!
শুধু চা-বাগানের জন্যই বীরপাড়া ইংরেজদের চোখের মণি ছিল এমনটা ভাবা অবশ্য ঠিক নয়। আসলে বানিয়া ইংরেজদের ডুয়ার্স প্রীতির নেপথ্যে একটি বড় কারণ ছিল ব্যবসা। ভুটানের ভেতর দিয়ে তিব্বতের সঙ্গে ব্যবসার জন্য তারা বেছে নিয়েছিল কালিম্পংকে। কেননা তিব্বত থেকে নাথুলা-ছাঙ্গু-কারপোনাং-গ্যাংটক হয়ে পৌঁছানো যেত কালিম্পঙে এবং সেই সময়ে কালিম্পং ছিল ভুটানের অন্তর্গত। তাই ডুয়ার্সে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হত কালিম্পং। ইংরেজরা সেই পথের খানিকটা বিকল্প হিসেবে ভুটানে প্রবেশের জন্য বীরপাড়া থেকে লঙ্কাপাড়া, গুমটু-ভুটান পথটিকেও কাজে লাগাতে শুরু করে। চা-চাষের পাশাপাশি ভুটানে প্রবেশের আর একটি পথ পাওয়া ইংরেজদের কাছে ছিল সোনায় সোহাগা। ফলে বীরপাড়ার কদর বেড়েছিল তাদের কাছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতেও, ১৯৬২ সালে চিন-ভারত যুদ্ধ ডুয়ার্সের এই অঞ্চলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে এবং খানিকটা সেই কারণেও বীরপাড়ার কাছে বিন্নাগুড়িতে উত্তর-পূর্ব ভারতের সর্ববৃহৎ সেনাছাউনি গড়ে উঠেছে। এই সেনাছাউনি শেষ হয়েছে অরণ্যের প্রান্তে। ফলে ঘরে বসেই বন্যপ্রাণী দর্শনের সৌভাগ্য হয় অনেকের। তবে আম-জনতার জন্য নয় তা। অবশ্য সেনাছাউনিতে পরিচিতি বা আত্মীয় থাকলে দর্শন হতে পারে যূথবদ্ধ হাতি বা পেখম ছড়ানো ময়ূরের পাশাপাশি বাইসন, চিতা ইত্যাদির।বন্যপ্রাণের কথা এল বলেই বোধহয় একথা বলা প্রাসঙ্গিক হবে যে, বীরপাড়ার কাছেই রয়েছে গারোচিরা ইকো টুরিজম সেন্টার। আগেই উল্লেখ করেছি বান্দাপানি চা-বাগানের। সেই চা-বাগানের কাছেই রেতি ফরেস্টের ভিতরে কালাপানি বস্তি পার করে আরও উত্তরে গারোচিরার অসাধারণ সৌন্দর্য শিহরিত করে তোলে যে কোনও মানুষকে। এখানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে পাকদন্ডি পথে শুধু বনচরদের দেখাই মেলে না, ডুয়ার্সের মোহময়ী সৌন্দর্য পাগল করে দেয়। মনে হয়, সভ্যতা থেকে অনেকদূরে আদিম অরণ্যে আজও যেন পথ চলছে ভোটরাজা, বানিয়া ইংরেজ, বৌদ্ধ লামা আর অবশ্যই আবহমানকালের এক পথিক।
চা-বাগানকে কেন্দ্র করে বীরপাড়া গড়ে উঠলেও, এই জনপদের বিস্তার কিন্তু বাড়তে শুরু করে ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ডুয়ার্স রেলওয়েজের মাদারিহাট পর্যন্ত সম্প্রসারণের সময় থেকে। এই সময়েই বীরপাড়ার কাছে তৈরি হয় মুজনাই রেল স্টেশন। খুব সম্ভবত মুজনাই চা-বাগান থেকে চা-পাতা অন্যত্র পাঠানোর জন্য এই রেলস্টেশনটির সৃষ্টি এবং চা-বাগানের নামেই এই রেলস্টেশনের নাম দেওয়া হয় মুজনাই, যদিও জায়গাটি শিশুবাড়ি বলে পরিচিত। মুজনাই চা-বাগানের পাশে বাঙাবাড়ি ডিভিশনে থাকা তিনটি প্রস্রবণ, শিব-মন্দির ও টিলাময় ভূখন্ড এখন পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এমনিতেও মুজনাই রহস্যময় নদী বলে পরিচিত। এখান থেকে বল্লালগুড়ি পেরিয়ে টোটোপাড়া খুব কাছে। মুজনাই চা-বাগান ও টোটোপাড়া আসা যায় বান্দাপানি-লঙ্কাপাড়ার দিক থেকেও। টোটোপাড়া নিয়ে বিস্তারিত বলবার অবকাশ রয়ে যাচ্ছে। আপাতত শুধু এটাই বলবার যে, টোটোপাড়া নিঃসন্দেহে উত্তরের পর্যটনের অন্যতম সেরা ঠিকানা।
বীরপাড়ার রেলস্টেশনটিও কিন্তু দলগাঁও নামে পরিচিত। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, বীরপাড়া চা-বাগান লাগোয়া দলগাঁও চা-বাগানের বিশেষ অনুরোধে রেলস্টেশনটির নাম দলগাঁওয়ের নামে রাখা হয়। হয়ত ব্যাপারটি একদিকে ভাল হয়েছিল। কেননা আজকের বীরপাড়া গড়ে উঠবার পেছনে সব চা-বাগানেরই বিশেষ অবদান ছিল। মুজনাইয়ের মতো আর একটি চা-বাগানের এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে ডুয়ার্সে চা-বাগানের গুরুত্বকেই প্রমাণ করে। অবশ্য এটাও ঠিক যে, ডুয়ার্সের উন্নয়নে চা-বাগানগুলির ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। বীরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথাই ধরা যাক। ১৯৫২ সালে স্থাপিত এই বিদ্যালয়ের পেছনে ছিল বীরপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজার এফ এম কার ও ডাক্তার ডঃ এস পি মুখার্জির প্রচেষ্টা। সেই সময়ে নাগরাকাটায় চ্যাংমারি হিন্দি হাই স্কুল থাকলেও এই চা-বলয়ে, রাঙালিবাজনার মোহনসিং উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া, বাংলা মাধ্যম স্কুল ছিল না। ১৯৬৪ সালে বীরপাড়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, রোমান ক্যাথলিকদের পরিচালিত ডিমডিমা ফতেমা হিন্দি বিদ্যালয়, ১৯৭৫ সালে শ্রীমহাবীর হিন্দি উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৮০ সালে বীরপাড়া নেপালি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রমাণ করে যে, চা-বাগানের মানুষ-সহ এই এলাকার নানা বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতির মানুষের জন্য বীরপাড়া ডুয়ার্সের আদর্শ একটি জায়গা। নিজের কসমোপলিটান চেহারা নিয়ে বীরপাড়া তাই নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সত্যিই কসমোপলিটান বীরপাড়া। ভারতের প্রায় সবপ্রান্তের মানুষকেই পাওয়া যায় এখানে। একসময় এখানে ইউরোপিয়ানদেরও আধিপত্য ছিল। অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় শ্রী অর্ণব সেন ও ডুয়ার্স-বিশেষজ্ঞ শ্রীব্রজগোপাল ঘোষের কাছে আজও শোনা যায় বীরপাড়ার কাছের নাংডালা চা-বাগানের সাহেব ম্যানেজারের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারের কথা কিংবা তাসাটি চা-বাগানের বড়বাবু অনাথবন্ধু ঘোষের সঙ্গে ডিমডিমা চা-বাগানের ফিডারবাবুর মাছ ধরতে যাওয়ার গল্প। অতীতের সেই বীরপাড়া আজ অনেক বদলে গেছে। একথা সত্যি। বীরপাড়া থেকে ফালাকাটা যেতে পথের পাশের সেই প্রাচীন মহীরুহেরা অদৃশ্য। এককালের কাঠের দেওয়াল-টিনের চালের বাড়ির বদলে কনক্রীটের জঙ্গল ঢেকে ফেলেছে বীরপাড়াকে। অতীতের খেলাধুলার সেই ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। শ্রদ্ধেয় তুষার বন্দোপাধ্যায়ের মতো কবি ও শিক্ষক, অভয়চরণ কুন্ডুর মতো দক্ষ শিক্ষা প্রশাসকের অভাব আজ পরিলক্ষিত। চা-বাগানের মাদলের শব্দ স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের চটুল রিংটোনে। উন্নয়নের চাকায় চাপা পড়ে যাচ্ছে বৃক্ষদের আর্তনাদ। ধুঁকতে থাকা চা-বাগানকে গ্রাস করছে অপুষ্টি-অশিক্ষা-দারিদ্র। গত শতকের আশির দশকের মতো ঘনঘন ডাইনি-শিকারের কথা শোনা না গেলেও, সংস্কারের আলো আজও বহু মানুষের অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করতে পারেনি। নারীপাচার একটি বিরাট সমস্যা এখনও অবধি।
তবু সব কিছুর পরেও বীরপাড়া সবুজে ঘেরা প্রকৃতির মাঝে যেন 'সব পেয়েছি'র এক ছোট্ট মরুদ্যান যেখানে অনবরত হেঁটে চলেছে এক ছোট্ট ভারত তার সব আনন্দ, সব দুঃখকে সঙ্গী করে।
* ছবি- লেখক
( প্রকাশিত: এখন ডুয়ার্স )










No comments:
Post a Comment