Monday, February 17, 2025


 

ফালাকাটা, মধ্যবর্তী সেই জনপদ 
শৌভিক  রায় 

এ এক মধ্যবর্তী অঞ্চল। উত্তর-দক্ষিণে পাহাড়-সমতলের আর পূবে-পশ্চিমে তোর্ষা-তিস্তার মাঝে, এক সমৃদ্ধ এলাকা। সেজন্যই বোধহয় জয়প্রসাদ সিং, মানিক প্রধান, অম্বিকাচরণ বসাক, কুঞ্জবিহারী মুখোটি, যোগেন্দ্রনাথ বর্মন প্রমুখেরা এই অঞ্চলে জমিদারি বা জোতদারি পত্তন করেছিলেন। কিন্তু সে তো খুব বেশিদিনের কথা নয়। এই অঞ্চলটি তার বহু আগে থেকে পরিচিত। হবে না-ই বা কেন! অরণ্য শেষে উর্বর ভূমি শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। তবে  সে আমলের কথা অনেকটাই ধূসর। কিন্তু আজকের জনপদে তখন যে হিংস্র শ্বাপদ ঘুরে বেড়াত, বড় বড় ঘাসের মাঝে লুকিয়ে থাকত বনচররা, তা বুঝতে কিন্তু তেমন কল্পনার দরকার হয় না! 

স্থানটির নামের পেছনে লুকিয়ে আছে আর এক ইতিহাস। জানা যাচ্ছে যে, রংপুর জেলার সামন্ত রাজার কন্যা ফুলটুসি ছিলেন অন্য এক রাজা শ্যামল বর্মনের স্ত্রী ও মন্ত্রী। বীরাঙ্গনা সেই নারী ভুটান রাজের সৈনিকদের নাকি এখানেই ফালা ফালা করে কেটেছিলেন। তাই নাম হয়েছে ফালাকাটা। মনে করা হয় যে, ফুলটুসির আমল থেকেই 'বাবাহে' (অপভ্রংশে 'বাহে') শব্দটির সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে আর একটি কথা হয়ত একটু অপ্রাঙ্গিক হবে। তবু যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা এলো বলে উল্লেখ করাই যায়। এই সামন্ত রাজারা ও তাদের সৈনিকেরা রাজার হয়ে যুদ্ধ করবার সময় চর্মনির্মিত বর্ম পরিধান করত। রাজ বংশের লোকেরা বা তাদের প্রত্যক্ষ কর্মচারীরা ধাতু নির্মিত বর্ম ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। শত্রুপক্ষের আক্রমণের হাত থেকে তাদের এই বর্ম পরিধানের জন্যই সম্ভবত তারা বর্মন নামে পরিচিত ছিল। নামকরণের ইতিহাস ঘাটলে অবশ্য গাছ ফালা ফালা করে কাটার মতামতটিও প্রাধান্য পায়। আবার সাপটানা নদীর ভূমিখন্ডকে বেশ কয়েকটি ফালিতে ভাগ করা বা লৌকিক দেবতা হুঁকো-হাতে বাঘের পিঠে বসে থাকা দেবতা ফালাকাটার কথাও মনে হতে পারে। 

নামকরণের ইতিহাস কিন্তু সবসময়েই অনুমাননির্ভর। তবে, সব তত্ত্বই কিছু না কিছু সত্য ঘটনাকে তুলে ধরে। আর সেই তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে এটা স্পষ্ট যে, পাহাড় থেকে নেমে দীর্ঘ অরণ্যভূমির ভেতর দিয়ে ভুটানিরা, বিশেষ করে শীতকালে, আশ্রয় নিত ফালাকাটার উপকন্ঠে মুজনাই নদীর তীরে। প্রত্যেক বছর তারা ওই অঞ্চলে আসত বলে, সেই জায়গাটির নাম হয়ে গেল ভোটানির বা ভুটানির ঘাট। এক আমলের জমজমাট ব্যবসাকেন্দ্র সেই ভুটানির ঘাট আজ একটু ম্রীয়মান হলেও এখানে কিন্তু রয়েছে এস এস বি ১৭ নম্বর  ব্যাটেলিয়ানের হেডকোয়ার্টার। আর এস এস বি-র দুর্গা পুজো এক সময় জমকালো ভাব খানিকটা হারালেও, আন্তরিকতায় এখনও এক। একই কথা বলা যায়, ফালাকাটা জনপদের অভ্যন্তরে পি ডব্লু ডি-এর উল্টোদিকে থাকা তাদের ক্যাম্পটির ক্ষেত্রেও। এখানকার কালীপুজো একসময় ছিল রীতিমতো নামকরা। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে, ফালাকাটার উন্নয়নে এই ক্যাম্প দুটি কিন্তু সবসময় সদর্থক ভূমিকা নিয়েছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ এস এস বি জওয়ান হওয়ায় ফালাকাটায় যেন ছোট্ট ভারত পাওয়া যায়। গত শতকের আশির দশকে, এস এস বি-এর সর্বভারতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়েছিল ফালাকাটার ক্যাম্পের মাঠে। তার জৌলুষ আজও ফিকে হয়নি সেদিনের দর্শকদের চোখে।রাজ্যপাল বি ডি পান্ডে উপস্থিত ছিলেন উদ্বোধনে। ফালাকাটার বিপদে-আপদে এস এস বি আজও বিরাট ভরসা। এস এস বি জওয়ানদের সময়ানুবর্তিতা, সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা অবশ্যই ফালাকাটার মানুষদের প্ৰেৰণা দেয় সব যুগেই। তাদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে এস এস বি তে চাকরিও নিয়েছে। ক্রীড়া জগতে ফালাকাটার উজ্জ্বল নামের পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।  











এস এস বি ক্যাম্পের মাঠের কথা উঠল যখন, তখন অবশ্যই বলতে হচ্ছে তার পাশে থাকা ফালাকাটা টাউন ক্লাবের মাঠটির কথা। অতীতে মেলার মাঠ নামে পরিচিত এই মাঠটিকে ঘিরে ভুটানিরা ঘোড়দৌড় থেকে শুরু করে নানা খেলার আয়োজন করত। ভুটানের থেকে হাতবদল হয়ে ফালাকাটা ইংরেজদের হাতে এলেও, আজকের মুক্তিপাড়া সাপটানা ব্রিজের পূর্বাংশ থেকে শুরু করে দোলন নদী পর্যন্ত অর্থাৎ উত্তরাংশে ছিল মাঠ ও জঙ্গলের বিস্তৃতি। আর পূর্ব পশ্চিম ও দক্ষিণে ছিল ভুটান ও কোচবিহারের দখলে। তবে বাঁধাধরা কোনও সীমানা ছিল না বললেই চলে। বড় বড় কিছু গাছকে সীমানা ধরে নেওয়া হত। প্রায়শই বিবাদ বাঁধত দু'পক্ষে। অবশেষে সিনচুলা চুক্তির ফলে ১৮৬৫ সালে ফালাকাটা পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশদের হাতে আসে। ইংরেজদের করদ রাজ্য কোচবিহারের সঙ্গেও ফালাকাটার নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়। কোচবিহারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে একটি কথা আগেভাগেই বলে রাখি। কোচবিহারে ১৯৪৫ সালে যখন প্রথম সরকারি পরিবহন শুরু হয়, তখন যাত্রীবাহী বাসের জন্য প্রথম রুট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ফালাকাটাকে। চারটি ফোর্ডসন থেমস বাস ও তিনটে ফোর্ড ট্রাক নিয়ে ভারতের অন্যতম প্রাচীন পরিবহন সংস্থা উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহনের সেদিনের সেই যাত্রায় ফালাকাটাই ছিল প্রথম পছন্দের। কোচবিহার রাজদরবারের প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে কোচবিহার থেকে ফালাকাটায় ছুটে চলা বাসটি এই অঞ্চলের স্বপ্নপূরণ করেছিল আর ইতিহাসে ঢুকে গিয়েছিল ফালাকাটা। আজও কোচবিহার-শিলিগুড়ি যাত্রাপথে ফালাকাটা  গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টপ হলেও, কোনও বাসস্ট্যান্ড এখানে তৈরি করা হয় নি। মধ্যবর্তী হওয়ার কষ্ট চেপেও কিন্তু ফালাকাটা এখনও যাত্রী-সহ সবাইকে আপ্যায়ন করে চলেছে। রেলপথে ব্রডগেজে ১৯৬৩ সালে যখন নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন ইঞ্জিনিয়ার ব্র্যাগাঞ্জার তত্ত্বাবধানে ব্রডগেজ রেললাইন পাতা শুরু হয়, তখন আরও অনেক শহরের মতোই ফালাকাটাও পূর্বে অসম আর উত্তর-পশ্চিমে শিলিগুড়ির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। অর্থাৎ রেলপথের ক্ষেত্রেও কিন্তু ফালাকাটার সেই মধ্যবর্তী ভূমিকা একইরকম। মাথাভাঙা হয়ে নতুন লাইন তৈরি হওয়ার বা আলিপুরদুয়ার জংশন-রাজাভাতখাওয়া হয়ে সেভক-শিলিগুড়ি লাইন ব্রডগেজে রূপান্তরিত হওয়ার আগে অবধি, ফালাকাটা স্টেশন দীর্ঘদিন একটি বিরাট অঞ্চলের স্টেশনের কাজ করে গেছে। তার গুরুত্ব আজও কমে নি।   

জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হলে ফালাকাটার প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল আজ থেকে দেড়শ বছর আগে। সে সময় মহকুমার সীমা ছিল অধুনা বাংলাদেশের পাটগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৮৭৪-৭৫ সালে ফালাকাটা থেকে বক্সায় মহকুমা স্থানান্তরিত হলেও কিন্তু ফালাকাটার কদর কমে নি। কেননা ফালাকাটা সেসময়ে অরণ্য গভীর অরণ্যের উপকন্ঠে হলেও, এখানে প্রচুর পরিমান  চাষের জমি ছিল। ফলে গড়ে উঠেছিল জোতদারি। যেমন ফালাকাটার উত্তরে সাবান মিঞা ও মজিদ মিঞাদের জোতদারির কথা জানা যায়। উত্তর পূর্বে ছিল সুখচাঁদ বর্মনের জোতদারি। কিছু নাম তো লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। ডুয়ার্সের, বিশেষ করে আজকের আলিপুরদুয়ার জেলার, আর কোনও এলাকায় এরকম জোতদারের কথা কিন্তু সেভাবে শোনা যায় না। ফলে এই জায়গাটি হয়ে উঠেছিল ইংরেজদের কাছে খাজনা আদায়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই খাসমহল ময়দানে ইঁটের পিলারের ওপর কাঠের সুরম্য খাজনা আদায়ের তহসিল অফিসটি, যা আজ বিলুপ্ত, তৈরি হয়েছিল সেই ইংরেজ আমলেই। আরও কিছুদিন পর ১৯২৪ সালে ড্রামাটিক হল তৈরি হওয়ার পর সেখানে অফিস খুলেছিল জোতদার অ্যাসোসিয়েশন। আর সেই অফিসের বিপরীতে আরও দু'দশক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত সেনা ছাউনিতে ১৯৪৮ সালে তৈরি হয়েছিল ফালাকাটার প্রথম লাইব্রেরি। ড্রামাটিক হল আর লাইব্রেরি সংলগ্ন মন্ডপে শুরু হয়েছিল প্রথম বারোয়ারি পুজো যার আজ অন্তত এক শতাব্দী। অন্যদিকে তহসিল অফিসের পূবে ১৮৯৩ সালে স্থাপিত হয়েছিল এম ই স্কুল। পরবর্তীতে সেই বিদ্যালয়ের নাম পাল্টে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, ফালাকাটার প্রবীণ মানুষেরাও বলতে পারছেন না যে, সেটি ঠিক কোন বিদ্যালয়টি- ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয় নাকি তার পাশে থাকা বেসিক স্কুল! তবে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের  বিদ্যালয়-সংগীতটি রচনার জন্য শান্তিনিকেতনের অবদান ভুলবার নয়। বিদ্যালয় স্থাপনের পর সেদিনের ফালাকাটার বিশিষ্ট মানুষেরা শান্তিনিকেতনে যোগাযোগ করেছিলেন। আশ্রমিক শান্তিদেব ঘোষ-সহ আরও অনেকে এই সংগীত রচনায় সহায়তা করেন শিক্ষক কার্তিকচন্দ্র মুখোটি ও ফালাকাটার অন্যান্য গুণীজনদের।  

তহসিল অফিসের সামান্য পরেই দক্ষিণ দিকে সাপটানা নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছিল ফালাকাটা থানা। তখন কোচবিহারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য থানার সামনে দিয়ে যাওয়া রাস্তাটিই ব্যবহার করা হত। কাছেই ফালাকাটার পুরোনো চৌপথি। অন্যদিকে জোতদার মানিক বোসদের বাড়ি। এই বাড়ির দুর্গাপূজা ফালাকাটার প্রথম পারিবারিক পুজো। থানার কাছেই ছিল ফালাকাটার প্রথম মানিক দাসের হোটেল। থানাতে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় জেলবন্দী করা হত সংগ্রামীদের। তাই থানা ছিল প্রাচীর ঘেরা। সাপটানার দক্ষিণ তীর তাই কিন্তু সেসময় ছিল জমজমাট। আর তার আর একটি কারণ ছিল ফালাকাটার হাট। এই হাট ছিল Western Dooars Fund Market-এর অন্তর্ভূক্ত। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, Western Dooars Fund Market ১৮৯৮ সালে তৈরি করা হলেও ১৯০০ সালে তা সংশোধিত হয়। এই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভুটান-সহ তিব্বতের সঙ্গে ব্যবসা বৃদ্ধি করা। ফালাকাটাতে ৩০ বিঘা জমি নিয়ে তৈরি হওয়া এই হাট এই অঞ্চলের প্রথম হাট বা বাজার যার নেপথ্যে এই ব্রিটিশরাজের সরকারি সংস্থাটি। ১৯৮০ সালে এই সংস্থাটির অবলুপ্তি হয়। আজকের এই অনলাইন যুগে এরকম একটি হাট বা বাজারের গুরুত্ব সেভাবে বোঝা না গেলেও, একশ বছরের বেশি সময় ধরে ফালাকাটার এই হাট একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাহিদার যোগানদার ছিল। বদলে যাওয়া সময়ে নবগঠিত কৃষিমান্ডি যেন সেদিনের সেই হাট, যার কাছে সভ্যতার ঋণ আবহমানকালের।

ফালাকাটার হাটের কাছেই রয়েছে অত্যন্ত প্রাচীন জংলা কালীবাড়ি। নাম থেকে বোঝা যায় যে, গভীর জঙ্গলের মধ্যে অবস্থান ছিল এই মন্দিরের। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও, যখন সুভাষ গার্লস হাই স্কুলের সামনে দিয়ে হাটে আসবার পথে সাপ্টানা নদীর ওপর ব্রিজ তৈরী হয় নি, তখনও এই মন্দিরের পরিবেশ ছমছমে ছিল। পাশ দিয়ে বয়ে যেত মুজনাই। জনশ্রুতি, এই মন্দিরে পুজো দিয়ে জলপথে লুঠপাঠ করতে বেরোত সেদিনের ডাকাতেরা। ব্রহ্মপুত্র গোষ্ঠীর নদী মুজনাই দক্ষিণে আরও খানিকটা বয়ে জলঢাকায় মিশেছে। সম্মিলিত সেই প্রবাহ মানসাই নাম নিয়ে মিশেছে ব্রহ্মপুত্র। কাজেই সেদিনের ডাকাতদের জলপথে একটি বিরাট অঞ্চলে ঘোরাফেরার জন্য মুজনাইয়ের মতো নদী ব্যবহার অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। তবে শুধু জলপথেই নয়, ফালাকাটা-সহ তার আশেপাশের সমৃদ্ধ অঞ্চলও অবশ্যই তাদের নিশানায় থাকত। আজকের দিনে সেই প্রাচীন মন্দিরের চেহারায় আধুনিকতার ছোঁওয়া লেগেছে। মন্দির কমিটি অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। মুজনাইও পুরোনো খাত বদল করে বয়ে চলেছে অন্য পথে। জংলা কালীবাড়ির কালী পুজো আজও বিখ্যাত। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজো হয় বলে পুণ্যার্থীদের ঢল নামে কালীপুজোর রাতে। মন্দির ও পুজোর বয়স কত সে ব্যাপারে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে কিছু বলা না গেলেও মনে করা হয় যে, অন্তত দেড়শ বছর অতিক্রান্ত করেছে এই মন্দির ও পুজো। একদা নদীতীরের এই মন্দিরের কাছেই, সামান্য উত্তরে, ফালাকাটার বিখ্যাত দশমীর ঘাট। একসময় অত্যন্ত জমজমাট ছিল প্রতিমা ভাসানের সেই উৎসব। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ডুয়ার্সে। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিমা আনা হত দশমী উৎসবে অংশ নিতে। আজ জৌলুষ খানিকটা কমলেও, ঐতিহ্য কিন্তু বজায় রেখেছে ফালাকাটা। দশমীর ঘাটের কাছেই একসময় ছিল শিশু কল্যাণ সদনের পুরোনো ঘরবাড়ি। অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার অন্যতম প্রাচীন এই শিশু সদন আজ স্থান পাল্টে ধূপগুড়ি মোড়ের কাছে। ভাল লাগে ভাবতে যে, একটি অত্যন্ত শুভকাজে ফালাকাটার নাম বহুদিন থেকে জড়িয়ে আছে। দশমীর ঘাট লাগোয়া মুক্তমঞ্চ ফালাকাটার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা ছিল আশির দশকে। শিলিগুড়ির পর উত্তরবঙ্গে ফালাকাটাই ছিল মুক্তমঞ্চ আন্দোলনের অন্যতম দিশারী। ফালাকাটা হাটের একদম দক্ষিণ প্রান্তে মুজনাই নদীর তীরে রয়েছে সুপ্রাচীন মহাকাল মন্দির। এই মন্দিরের বয়স নিয়েও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। যদিও মনে করা হয় যে, জংলা কালীবাড়ির সমসাময়িক সময়ে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়। তবে মন্দিরের সামনের অংশে রাধাকৃষ্ণের অবস্থান পরবর্তীতে হয়েছে বলে মনে করা হয় এবং তার জন্য এই অঞ্চলের অবাঙালি সমাজের অবদান ভুলবার নয়। আসলে ফালাকাটায় বাঙালিদের পাশাপাশি উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষদের আমরা দেখতে পাই। ফালাকাটার উন্নতিতে তাদের সদর্থক ভূমিকা কোনও অংশে কম নয়। দুবে, ভাদানি, মাহেশ্বরী-সহ আরও কিছু পরিবারের অবদান কখনই ভুলবার নয়। বংশীধর দুবে, হরকাচাঁদ মালচাঁদ ভাদানী প্রমুখেরা গত শতকের কুড়ি-তিরিশের দশকে ফালাকাটার নাট্যমঞ্চে অভিনয় পর্যন্ত করেছেন। পরবর্তীতে তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরিরা নানাভাবে জড়িয়ে আছেন ফালাকাটার কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে।

একটা সময় ফালাকাটার মূল জনপদ সাপটানা নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠলেও, পরবর্তীতে শহর  উত্তরদিকেও বাড়তে থাকে। সাপটানা আসলে ফালাকাটা চারপাশেই রয়েছে। দ্বীপের মতো সেই অঞ্চলে পরবর্তীতে তৈরী হয়েছে বাবুপাড়া। সরকারি দপ্তর ও চা-বাগান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে  বাবু শ্রেণীর মানুষেরা এই অঞ্চলে থাকতে শুরু করেন।স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশ ভাগ ইত্যাদির পর গড়ে উঠেছে দেশবন্ধু পাড়া, সুভাষপল্লি অঞ্চল। আবার যাদবপল্লী, গোপনগর ইত্যাদি নামগুলির পেছনে সেসব অঞ্চলের মানুষদের জীবিকা প্রাধান্য পেয়েছে। তবে ফালাকাটার কাছের ময়রাডাঙ্গা নামের ইতিহাস কিন্তু বলছে যে, জলাভূমি থেকে উঠে আসা অথবা বালি মাটির অকৃষিযোগ্য উঁচু জমির জন্য মরাডাঙ্গা ধীরে ধীরে হয়েছে ময়রাডাঙ্গা। এই বালি জমির জন্যই ফালাকাটা স্টেশনের কাছে থাকা একটি বিরাট জমি পরিত্যক্ত করেছিলেন চা-ব্যবসায়ীরা। চল্লিশের দশকে সেই জমি মিসেস রেমন্ডের সাহায্যে জোগাড় করতে পেরেছিলেন  সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন। যদিও তারা সে সময় ফালাকাটায় আসেন কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা-বাগানের শ্রমিকদের শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ফালাকাটার সুন্দর প্রকৃতি, বিস্তৃত জনপদ, শিক্ষা ও ধর্ম বিস্তারের সুযোগ ও ছোটনাগপুর অঞ্চলের কার্মাটারে অসফল বিদ্যালয় ছিল তাঁদের সেই সিদ্ধান্তের কারণ। ফলে জমি জোগাড় হলে ১৯৪৯ সালে কার্মাটার থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ফালাকাটায় চলে আসেন তাঁরা। তৈরী হয় রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল। ইংরেজি মাধ্যমের এই স্কুলটি আজ ফালাকাটার অন্যতম সেরা দ্রষ্টব্য। দেখতে ছবির মতো সুন্দর এই স্কুলে রয়েছে সারা ভারত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা। তারা যেমন হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে, তেমনি নিজেদের বাড়ি থেকে পড়ছে স্থানীয় ছাত্ররা। বলতে হয় ফালাকাটার কাছে কোচবিহার জেলায় অবস্থিত শৌলমারী আশ্রমের কথাও। একদা ফালাকাটার সর্বভারতীয় পরিচিত এনে দিয়েছিল এই আশ্রমটি। আশ্রমের মূল কান্ডারি সারদানন্দজিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছিল রহস্য আর সেই রহস্যের পেছনে ছিল নেতাজির নাম। 

আধুনিকতার ছোঁওয়ায় উত্তরের সব জনপদের মতো ফালাকাটাও আজ অনেক পাল্টে গেছে। শপিং মল, হোটেল, পর্যটন কেন্দ্র কুঞ্জনগর, দক্ষিণ খয়েরবাড়ি, আধুনিক জীবনযাত্রা, ঝাঁ চকচকে পথঘাট ইত্যাদি সব নিয়ে সেই বিরাট বিরাট গাছের ছায়ায় ঢাকা আলো-আঁধারীর ফালাকাটা আজ আর নেই। তবু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও কিছু প্রাপ্য ছিল হয়ত ফালাকাটার। কিন্তু সে অন্য বিষয়। ভাবতে অবাক লাগে যে,  সেই কোন অতীতে ভুটান ও কোচবিহার রাজ্যের দখলদারির ফালাকাটা অন্যভাবে চলতে শুরু করেছিল ব্রিটিশদের চুকানি স্বত্বের হাত ধরে। বহু উত্থান পতন জড়িয়ে রয়েছে ফালাকাটার নিজের সঙ্গেই। বহু কিছুর সাক্ষ্য বহন করছে মুজনাই তীরের এই সমৃদ্ধ জনপদ। ফালাকাটার চোখের সামনেই অরণ্য কেটে তৈরী হয়েছে অন্তত ১৮টি জনপদ। গড়ে উঠেছে একের পর এক চা-বাগান। ফালাকাটার নিজের অবয়বেও খানিক পরিবর্তন এলে, ফালাকাটা আজও মধ্যবর্তী সেই জায়গা যাকে বাদ দিয়ে ডুয়ার্স সম্পূর্ণ হতে পারে না। 

* ছবি- লেখক

(প্রকাশিত- এখন ডুয়ার্স)    

No comments: