Tuesday, February 18, 2025


 

টোটোপাড়া বারবার 
শৌভিক রায় 

হান্টাপাড়া পার হতেই উত্তরে দেখা গেল হিসপা-কে। আর পশ্চিমে চোখ ফেরাতে নজরে এল পদুয়া। অবশ্য এখান থেকেও গন্তব্য একেবারে কম দূর নয়। দাম্পি আর দ প্রুঙকে দেখতে হলে অবশ্য এখনও চলতে হবে আরও খানিকটা পথ। এমনিতে  বল্লালগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তর অবধি রাস্তা এখন ঝকঝকে কালো পিচের। তারপর পাথুরে ধুলো মাখা পথে আরও গেলে অবশেষে তাদিং পাহাড়ের কোলে বিস্ময়কর ছোট্ট সেই জনপদ। পদুয়া আর হিসপা পাহাড় দুটি এখানকার মূল বাসিন্দাদের কাছে দেবতার মত পবিত্র। চারপাশের এই পাহাড়গুলি থেকেই নেমে এসেছে  দাতিঙতি, হাউড়ি, কাংদুতি, দীপ্তি, চুয়াতি, নিটিংটি, জৈপ্তি, গোয়াতি, নামতিতি ও মুটি নামের ঝোরাগুলি। আপাত শান্ত এই ঝোরাগুলিই বর্ষায় আকুলিবিকুলি করে চারপাশ এমন ভাসায় যে, প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছোট্ট গ্রামটি! সমগ্র ডুয়ার্স এত সুন্দর যে, আলাদা করে এই জনপদের  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করবার প্রয়োজন হয় না। আর সত্যি বলতে, প্রকৃতিপ্রদত্ত রূপমাধুরীর জন্য নয়, এই জনপদের পরিচিতি তার বাসিন্দাদের জন্য।  অবশ্য পাকদন্ডী রাস্তা, হাউড়ি-তিতি-তোর্ষা নদী, দিনের বেলায় ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের ছমছমে জঙ্গল, অদূরের ভুটান পাহাড়, সাপ্তাহিক হাটে রঙচঙে মানুষজন এবং সুপারি আর কমলালেবু বাগান ঘেরা জনপদটির টান প্রবল। সঙ্গে আছেন এখানকার এখানকার মানুষেরা যাদের জন্য  সেই কবে থেকে ছুটে আসছেন পন্ডিত ব্যক্তি যেমন, তেমনি আসছেন আমার মতো অর্বাচীন মানুষেরাও। মাদারিহাট ব্লকের টোটোপাড়ার এমনই!

আশির দশকে প্রথম যখন যাই সেখানে, তখন পথঘাট ছিল দুরূহ। ঝাঁকুনিতে শরীরের কলকব্জা খুলে আসার উপক্রম হত প্রায়!  টোটোপাড়ার  আরণ্যক পরিবেশে তখন আক্ষরিক অর্থেই গা ছমছম করত। মাদারিহাট থেকে চব্বিশ কিমির সম্পূর্ণ রাস্তা ছিল পাথুরে। যোগাযোগের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া সেভাবে কিছুই ছিল না। দেখা যেত পান সুপুরি চিবোতে থাকা স্থানীয় মানুষদের। তাদের চোখে সমতলের মানুষদের জন্য লেগে থাকত বিস্ময়। অবশ্য এমনটা নয় যে, তারা সমতলের মানুষদের দেখেন নি। বহুদিন আগেই তাদের আবিষ্কার করেছিলেন ইংরেজরা। তবু নিজের মনে প্রশ্ন জাগে যে, ১৮৯০ সালে যখন সান্ডার সাহেব জমি জরিপ করছিলেন তখন তিনি জানতেনই না কী আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন!

মনে করা হয় যে, লুপ্তপ্রায় জনজাতি টোটোরা একসময় ভুটান-রাজের মালবাহকের কাজ করত। ভারবহনের সূত্র ধরেই তারা জলপাইগুড়ির বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করে। ভারত-ভুটান যুদ্ধে ভুটানের পরাজয় হলে বিভিন্ন গ্রামে বসবাসকারী টোটোরা ভুটানের নানা জায়গায় আশ্রয় নিলেও, টোটোপাড়ার টোটোরা সম্ভবত বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের গ্রামে থেকে যান। কেননা তারা ভেবেছিলেন তাদের গ্রামটি ভুটানের অন্তর্ভুক্ত। সে ভুল ধরা পড়ে একসময়। এই ছোট্ট গ্রামটি ভারতের বলেই পরিচিতি পায় ও টোটোরা ভারতীয় হিসেবে গণ্য হন। তথ্য বলছে যে, ১৮৮৯ সালে যে টোটোদের সান্ডার সাহেব দেখেছিলেন, তার দেখা টোটোরা, টোটোপাড়ায় সাত-আট পুরুষ আগে এসেছিলেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন যে, তারও আগে মালবাজারের টটগাওঁ, আলিপুদুয়ারের টটপাড়া ইত্যাদি জায়গায় টোটোদের বসতি ছিল। অনেকের মতে, কোচ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা ভুটান পাহাড়ের পাদদেশে এই অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আবার 'ডয়া' নামের এক ভুটানি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিগ্রহ তাদেরকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছিল বলেও অনেকের অনুমান। কারণ যেটাই হোক, আজকের টোটোপাড়া কিন্তু জগৎবিখ্যাত একটিই কারণে আর সেটা হল এখানকার মানুষেরা। পশ্চিমবঙ্গের ৪০টি উপজাতি ও ৩টি আদিম সম্প্রদায়ের মধ্যে টোটোরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত এবং তাদের হাত ধরেই টোটোপাড়া বিশ্বজগতে স্থান করে নিয়েছে। আজকের টোটোপাড়া দুমসি গাওঁ, পূজা গাওঁ, মিত্র গাওঁ, সুব্বা গাওঁ, মন্ডল গাওঁ ও পঞ্চায়েত গাওঁ নিয়ে গঠিত। এবাদেও হাউরি লাইন, হাসপাতাল লাইন, চানবা লাইন, স্কুল লাইন, পরগাওঁ, পাখাগাওঁ, তাদিং ইত্যাদি ভাগেও ভাগ হয়েছে টোটোপাড়া। টোটো সম্প্রদায়ের নামের বিবর্তন হিসেবে বলা হয় যে, জেপাঙ থেকে এই শব্দের সৃষ্টি। জেপাঙ থেকে জিতেন - টোটাভি- টোটা - টোটো এভাবেই বিবর্তিত হয়েছে শব্দটি।        

একসময় টোটোপাড়া সন্নিহিত পাহাড়ে কমলালেবুর ফলন ছিল চোখে পড়ার মতো। এখানকার মানুষদের মূল জীবিকাই ছিল কমলালেবু সংগ্রহ করা। পঁয়তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেও টোটোপাড়ার অর্থনীতি কমলালেবুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হত। সমতল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সেই কমলালেবু কিনে নিয়ে যেতেন। শোনা যায় যে, তারও বহু আগে ইংরেজ আমলে, একটি দুটি সিগারেটের বিনিময়েও নাকি বানিয়া ইংরেজ সংগ্রহ করত ডুয়ার্সের সুস্বাদু কমলালেবু। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আজ আর কমলালেবু বাগান নেই। ফলে, টোটোপাড়ার অর্থনীতির অভিমুখ আজ বদলে গেছে। কিছুদিন আগেও সেই অর্থনীতিতে এখানকার মাটিতে জন্মানো স্বাভাবিক বাঁশ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিত। কিন্তু কমলালেবুর মতো সেখানেও অজানা রোগ হানা দিয়ে ফলন বন্ধ করেছে। ফলে আজকের টোটোপাড়ার বাসিন্দাদের মূল কাজ কৃষিকাজ এবং এই কৃষিতে সুপারির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এখানকার মাটিতে সুপারির অধিক ফলন হেতু এখানে প্রচুর পরিমানে সুপারি চাষ হয়। এরকমই এক কৃষিজীবী টোটো পরিবারের সন্তান অভিষেক টোটো জানালেন যে, বছরে তারা ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা প্রতি কেজি হিসেবে প্রায় লাখ দুয়েক টাকার সুপারি উৎপাদনে সক্ষম। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, অভিষেক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বীরপাড়া কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করে টোটোপাড়াতেই একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তার এক দিদিও টিসিএসে কর্মরত। ভাই বিপ্লব টোটোও অভিষেকের মতো বি এ পাস করেছেন। আজকের টোটোপাড়ায় অবশ্য বিদ্যালয় শিক্ষার জন্য আর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মোটামুটি সব সুবিধে রয়েছে। ধনপতি টোটো  মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে এই মুহূর্তে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ২৫৬ জন। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত  প্রধানশিক্ষিকা শ্রীমতী মিশা ঘোষাল রায় জানালেন যে, তাঁর বিদ্যালয়ে মোটামুটি সব পরিকাঠামো থাকলেও শিক্ষকের অভাব রয়েছে। তবে সকলের সাহায্যে সেই অসুবিধে অচিরেই দূর করা যাবে বলে তাঁর বিশ্বাস। টোটোরা ছাড়াও গ্রামে নেপালি, রাজবংশী, বিহারি ও কিছু সংখ্যক বাঙালি রয়েছেন। 















নব্বইয়ের দশকের শেষেও কিন্তু টোটোপাড়ার চেহারা ছিল আলাদা। আজকের মতো এত সংখ্যক বাড়িঘর ও মানুষজনের দেখা পাওয়া যেত না সেখানে। আজ প্রায় ৫০০০ লোকের বাস টোটোপাড়ায়।  অসমর্থিত সূত্র অনুসারেএই জনসংখ্যার মধ্যে ১৬০৩ হলেন টোটো সম্প্রদায়ভুক্ত। আদিবাসী সম্প্রদায়ের অতীতের সেই সামাজিক জীবনেও এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। টোটোদের নামকরণে বাংলা, নেপালি শব্দের প্রয়োগ তার প্রমান। এখন শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, তাদের বিয়ে হচ্ছে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গেও। পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের জীবনে বদল আনলেও এখনও টোটো সম্প্রদায় ১৩টি গোত্রে বিভক্ত- বঙ্গবি-বে, বৌদুবি-বে , বুদুবি-বে, নুরিং -চানকোবে, দিড়িঙ -চানকোবে, পিশু - চানকোবে, নুবি-বে, রেংকাই জি-বে, দাংকোবে, দাংত্র বি, মাংকোবি, মাংত্র বি, মাং-চি-বি। স্বগোত্রে বিয়ে সাধারণত দেখা যায় না টোটো সমাজে। বিয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদার হলেও, নিজের গোষ্ঠী ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ে বিয়ে করতে হলে, প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন রয়েছে টোটো সমাজে। অনেক সময় সন্তান আসবার পরেও বিয়ের অনুষ্ঠান চলে 'বিয়ো পং-পেওয়া'-এর মাধ্যমে। কিন্তু বিবাহিত দম্পতির কেউই বিচ্ছেদ  ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। বিয়ের পর নবদম্পতির জন্য আলাদা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। 

টোটোদের বাসগৃহ নির্মাণেও বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে।  বাঁশ বা কাঠের খুঁটির ওপরে খড়ের দোচালা ছাউনি দিয়ে তাদের ঘর নির্মিত হয়। তাদের ভাষায় এই ঘরের নাম হল 'না কে শা'। ঘরে প্রবেশের জন্য একটি মাত্র দরজা বা 'লাপুঙ' থাকে। সাধারণত মাটি থেকে পাঁচ-সাত ফুট উচ্চতায় ঘরের মেঝে তৈরী করা হয়। দরজার সামনে থাকে উন্মুক্ত বারান্দা, মেঝের উচ্চতার চাইতে সামান্য নিচে। 'কাইবু' বা খাঁজ কাটা গাছের গুড়ি ব্যবহার করা হয় বাড়িতে প্রবেশের জন্য। ঘরের ভেতর থাকে 'চি মা' বা গৃহদেবতার জন্য নির্দিষ্ট স্থান। তাছাড়াও রান্নার জায়গা বা 'মে-রিং', শোওয়ার ঘর বা 'সিরি', অতিথির জায়গা বা 'দেইচি কো সিরি', বাড়ির তলায় চলে পশুপ্রতিপালন। বারান্দা শুধুমাত্র আপ্যায়নের জন্য নয়, সাংসারিক সব কাজই চলে সেখানে। তবে আজকের টোটোপাড়ায়  'না কে শা' পাওয়া মুশকিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টোটোদের চিরাচরিত বাড়িও পাল্টে গেছে, লেগেছে আধুনিকতার স্পর্শ। এখন অধিকাংশ টোটো পরিবার পাকা দালানবাড়িতে থাকতেই অভ্যস্ত। সাবেক সেই বাড়ির অভাব টোটোপা ড়ার চেহারা সামান্য হলেও বদলে দিয়েছে। তবে কে না জানে যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন অত্যন্ত স্বাভাবিক। 

ঘরের ভেতর সাধারণত চই সুন, জিরং কোবে, সংকা মংকা পূজা হয়ে থাকে। সাতরিং, জিদিং, কুংরি, বারাইগোরি নুচে, পাদুওয়া (পাহাড় পুজো), তোর্ষা মেরে মধি, লাপু ভিন্তি, দাংতেনতি-হইনতি (নদীপূজো), বিরকো চইসুন, পকিংসওয়া (পাথরের পুজো) ইত্যাদি পুজো বাইরে হয়ে থাকে। টোটো সমাজের পুজোয় বলিপ্রথা রয়েছে আজও , তবে নব্যশিক্ষিত টোটো যুবকদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলে মনে হয়েছে যে, তারা এই প্রথার বিরোধী। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংস্কার ও প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে একটু সময় লাগে বৈ কী! অত্যন্ত ধর্মভীরু টোটো সমাজে সারাবছর পুজোপার্বন লেগেই থাকে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, তাদের মন্দিরে কোনও বিগ্রহ থাকে না। আসলে তারা প্রকৃতির পূজারী। আকাশ, পাহাড়, নদী ,গাছ, ভূমি ইত্যাদি তাদের উপাস্য। 'ঈশপা' হলেন টোটোদের প্রধান দেবতা। পুরুষ রূপে তিনি মহাকাল ও নারী রূপে মহাকালী বা সইনঝানি। টোটো সমাজে 'মইনাঙ্গ' বা 'পিদুয়া' নামের দেবতা বা অপদেবতাও রয়েছে। টোটোদের পুজোয় প্রধান পুরোহিত বা  'দেবপাও' বা 'কাইজি' এবং তার সহকারী 'দেওসী'-এর ভূমিকা বিরাট। টোটোদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের নাম হল 'ওমচু' ও  'ময়ূ' এবং এই দুটি পুজোই  ঈশপার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে। তবে তাদের পুজোয় মূর্তি দেখা যায় না, চিগাইমু এবং মুগাইমু নামের দুটি বড় বড় ঢোলকে তারা মহাকাল ও মহাকালীর প্রতীক হিসেবে পুজো করে থাকে। ওমচু পুজোর সময় কাল এখন পাঁচদিন থেকে তিনদিনে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। জুলাই মাসের শেষে বা অগাস্টের শুরুতে ওমচু পুজোর ২২ দিন পর ময়ূ পুজো হয়ে থাকে। ময়ূ পুজোর পরিধিও এখন ৯দিন থেকে ৫দিনে আনা হয়েছে। বাদ পড়েছে গরু বলির মতো প্রথাও। ধর্মীয় উৎসব ও সমাজ পরিচালনার জন্য কাইজি (পুরোহিত), গাপ্পু (মোড়ল), পাও (ওঝা), নামপনের  (সংগঠক) ভূমিকা মেনে নেওয়া হয়েছে। 

আজকের টোটোপাড়ার টোটোদের খাদ্যাভাসেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চাল বা ভুট্টার ভাত, ডাল,সবজি এখন প্রধান খাদ্য হিসেবে পরিগণিত। চলে লবন চা বা 'না চাসিং'। আটা, মারুয়ার রুটির পাশাপাশি দাঙনিং, কাইরিং, বুরিং, দুরিং, ডাকানি, লিসু , সতেই, লাকা, লাইরা ইত্যাদি পাহাড়ি ও জংলী আলু সংগ্রহ করা হয়। মাছ-মাংসও টোটো সমাজে বিশেভাবে আদৃত। 'চরুসাই' নামের শাকও তাদের খুব প্রিয়। আর রয়েছে টোটোদের নিজস্ব পানীয় ইউ। সাধারণত মারুয়া ও কাউন থেকে ইউ তৈরী করা হয়ে থাকে। বলা যেতে পারে যে, ইউ হল টোটোদের সর্বক্ষণের পানীয়। সঙ্গে থাকে পান ও সুপুরি। রয়েছে ধূমপানের অভ্যেস। তবে আজকাল তামাক পাতা মুড়িয়ে নলের মধ্যে ঢুকিয়ে ধূমপানের চিত্র বিরল হয়ে এসেছে। বয়স্ক কিছু মানুষের মধ্যে এই অভ্যেস দেখা গেলেও, আধুনিক সময়ের টোটোদের পছন্দ বাজার চলতি প্যাকেটের সিগারেট। ঝুম চাষের রীতি পাল্টে যাওয়ার জন্য অতীতের খাদ্য আজ লুপ্ত হতে বসেছে। তবে এখনও শূকর-মাংস অত্যন্ত চালু। টোটোপাড়ার চারপাশের নদীতে মাছের সংখ্যা কমে আসায় বাজারের মাছের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে টোটো সম্প্রদায়। 

আজও টোটোপাড়ায় বিনোদনের জন্য বিদ্যালয়ে সদ্য নির্মিত অডিটোরিয়াম ছাড়া আর কোনও ধরণের প্রেক্ষাগৃহ দেখা যায় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তথ্যের কোনও বিনোদন নেই। প্রতিটি আদিবাসী সমাজের মতোই ততসমাজ নৃত্য গীতে পটু। টোটো ভাষা জানলে বা বুঝতে পারলে লক্ষ্য করা যায় যে, তাদের গানে সমাজচিত্র থেকে শুরু করে অতীত ইতিহাস ফুটে ওঠে। গানে বলা হয় শিকারের কথা, ধর্মের কথা। আবার নারী-পুরুষের পারস্পরিক মন দেওয়া নেওয়ার কথাও তথ্যের গানে লিপিবদ্ধ। টোটোদের গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গান হল 'লেতিগেহুয়া' বা স্বপ্নদ্রষ্টাদের গান। কোনও সাধারণ টোটো এই গান গাইতে পারে না, এই গান গাইবার অধিকারী ইয়ং টং রাই, যিনি স্বপ্নের মাধ্যমে দেবতার আদেশ পান এবং গান বাঁধেন। ধর্মীয় সংগীত হলেও এই গানে জীবনের কথাই ফুটে ওঠে। গানের পাশাপাশি টোটো নৃত্যও কিন্তু অসাধারণ। যদিও আজ 'চি চি পাওয়া' বা মহিলাদের নৃত্যের মতো বেশ কিছু নাচ বিলুপ্ত হয়ে গেছে তবু টুং টুং গামু, দৈতাপা, সেংজা, পেলা হো ইত্যাদি নাচগুলি দেখা যায়। সেংজা ছাড়া বাকি সব নাচেই শুধুমাত্র পুরুষদের দেখা যায়।    

অতীতের সেই টোটোপাড়ার আমূল বদল না হলেও, পরিবর্তন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পর্যটনের সুযোগ রয়েছে বুঝে টোটোপাড়ায় এখন পিকনিক স্পটও দেখা যায় পাহাড়ের ওপরে। টোটোপাড়া যাওয়ার পথে সরকারি পর্যটক আবাস যেমন রয়েছে তেমনি কিছু হোম স্টে তৈরি হয়েছে। সরকারি পর্যটক আবাসটি থেকে লঙ্কাপাড়া, হান্টাপাড়া, টোটোপাড়ার পাশাপাশি মাদারিহাট, জলদাপাড়াও কাছেই হয়। টোটোপাড়ার মঙ্গলবারের হাটে জামাকাপড় থেকে শুরু করে বহু কিছুই মেলে, তবে দেখা যায় না কমলালেবুর বেচাকেনা কিংবা পিঠে কমলালেবুর টুকরি নিয়ে পাকদন্ডী বেয়ে নেমে আসা আদিবাসী সুঠাম পুরুষ বা ঝলমলে মহিলাকে। বল্লালগুড়ি পঞ্চায়েত অফিস থেকে টোটোপাড়া পর্যন্ত পথে এখনও পিচের আস্তরণ পড়ে নি, তবে টোটোপাড়ায় রাস্তাঘাট পাকা, ফলে যান চলাচলে কষ্ট হয় না। প্রায় অধিকাংশ বাড়িতেই দুই চাকার বাহন রয়েছে, ফলে মাদারিহাট থেকে কখন বাস বা ট্রেকার আসবে সেই ভরসায় থাকতে হয় না বেশির ভাগ মানুষকেই। তবে মাদারিহাট থেকে এখন বাসের পাশাপাশি কিছু জিপ ও মারুতি ভ্যান চলছে। টোটোপাড়ার খুদে পড়ুয়ারা বাঙালি-নেপালি=বিহারি-টোটো নির্বিশেষে ভীড় জমাচ্ছে টোটোপাড়ার ধনপতি টোটো মেমোরিয়াল হাই স্কুলে কিংবা মাদারিহাট-টোটোপাড়া পথে উত্তর খয়েরবাড়ির কাছে  তৈরী হওয়া বিভিন্ন মাধ্যমের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। 

বারবার গিয়েও টোটোপাড়া পুরোনো হয় না। প্রতিবারই নজরে পড়ে নতুন কোনও পরিবর্তন। হয়ত সেই পরিবর্তনের অনেককিছু ভাল লাগে না, কিন্তু এটা বুঝি যে, এই পরিবর্তন না মানবার কিছু নেই। টোটো সম্প্রদায়ের মানুষেরা যত বেশি নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হবেন, তত তাদের নিজেদের মঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ভাল। কেননা খুব কম জনপদের টোটোপাড়ার মতো সম্পদ থাকে। সেদিক থেকে আমরা ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গবাসী অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। অন্যতম ক্ষুদ্র আদিবাসী সম্প্রদায় হওয়ায় আমাদের ওপরেও দায়িত্ব এসে পড়ে তাদেরকে দেখে রাখবার। বংশগত দারিদ্র, শিক্ষাহীনতা, অপুষ্টি দূর করে যেদিন টোটোপাড়া আমাদের সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে, সেদিন হয়ত আমাদের কর্তব্য শেষ হবে। তাই যখন আমার প্রিয় দুই ছাত্র বিপ্লব ও অভিষেক তাদের নিজেদের ভাষায় গেয়ে ওঠে 'নুবাই কাঙ জোড়া দিবাই কাংয়াং গোত্র/ দাঙতা কাঙ, হিপসা খাংতা কাঙ চুংচা/ অকো পাই কতা ইয়ং কো জেজেঙ কইয়া লোই/ লেই বার বার লেই / তে বার বার তে সানি / তাত্রপুন তেনা / সেনে বোকো তে লাকা ডাইকো তে / ইয়চ পুঙ, ওয়াঙ পুনা মুমুঙরো সেঙ্গে /লেই বার বার লেই /লুনডি ইয়ং বিহিং মোই দিঙনা / মোইবে তিঙ্কো লেই সামা তিঙ্কো লেই/ লেই বার বার লেই' (পূর্বে তোর্ষা, পশ্চিমে পাহাড়, উত্তরে দেবতা হিপসা, দক্ষিণে ঘন অরণ্য, তার মাঝে সুন্দরী টোটোপাড়া, এস বন্ধু এস। চলো বন্ধু সূর্য উঠেছে, জঙ্গলে যাই কাঠ আনতে, বৃষ্টি হলে গাছ ভিজবে, মাঠ আমাদের ডাকে, ধান লাগাই চলো, মারুয়া লাগাই চলো, চলো বন্ধু চলো),তখন মনে হয় চলি আবার পাহাড়-নদী -অরণ্য  ঘেরা রহস্যময় টোটোপাড়ায়.... 

       
ছবি- লেখক 

(প্রকাশিত: এখন ডুয়ার্স)

No comments: