Tuesday, January 28, 2025

শিখেছি যত্নে

শৌভিক রায় 


হে মহান, শিখিয়েছ চুপ করে থাকা

তোমার এই সর্বগ্রাসী খিদের মুখে 
মুখে কুলুপ তাই!

বাঁ থেকে ডান, কিংবা ডান থেকে বাঁ, 
এরোবিক্স শিখেছি যত্নে।
সব বুঝি। সবটাই বুঝি। 
যদিও বুঝি, বুঝি না সেটা। 

ঝুরঝুরে মেরুদণ্ড নিয়ে নুয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি,
হেঁটে যাচ্ছে জীব সেসব প্রাক ঐতিহাসিক, 
রয়ে সয়ে, মাড়িয়ে যত্নে  
রাখছে হাত কাঁধে, পিঠে, 
ছিঁড়ে খাবে বলে..... 

 



  


  



Sunday, January 26, 2025


 


রাজনৈতিক উপন্যাস বলেছে মানুষের কথাই
শৌভিক রায়
সাহিত্যগুণ তেমন নেই বলে উপন্যাসটিকে প্রকাশ করতে চাননি স্বয়ং লেখক। কিন্তু কথা শোনেননি প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাই `বঙ্গবাণী` পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি তিনি। উপন্যাসের শেষ কিস্তির পর, ১৯২৬ সালে, কটন প্রেস থেকে, মলাটবন্দি হয় শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের `পথের দাবী`।
প্রকাশের পরেই `পথের দাবী` ঘুম কেড়ে নিয়েছিল তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের। যদিও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় কেন লেখাটি তাদের নজরে এলো না, সেটি আজও বিস্ময়। হয়ত উত্তাল সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় `উত্তেজক' উপন্যাসটি নজর এড়িয়ে গিয়েছিল সরকার বাহাদুরের। কিন্তু প্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যেই কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট নড়েচড়ে বসেছিলেন। মূলত তাঁর উদ্যোগে `পথের দাবী` নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। বাজেয়াপ্ত করা হয় বই।
সময়ের রসিকতা বোধহয় এমনই। যে বই নিয়ে শরৎচন্দ্র নিজে আগ্রহী ছিলেন না, সেটিই অন্যতম `বেস্ট সেলার` হয়েছিল। অনেকে ভাবতে পারেন, বিতর্কিত, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আমাদের আকর্ষণ বেশি বলেই বোধহয় এমনটা। কিন্তু সেটা কখনও মূল কারণ নয়। আসলে, এই উপন্যাসে অমর কথাশিল্পী যেভাবে অত্যাচারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, তাতে এটাই হতো।
সূর্য সেন, সুভাষ চন্দ্র বোস প্রমুখ দেশনায়কের আদলে সৃষ্ট, উপন্যাসের নায়ক, সব্যসাচী ছিলেন পরাধীনতার শেকল ভাঙবার মূর্ত প্রতীক। শুধু তাই নয়। সাধারণ মানুষের অবদমিত ইচ্ছেও ফুটে উঠেছিল তাঁর মধ্যে দিয়ে। আসলে আমরা প্রত্যেকেই কোনও কোনও সময় অতিমানব হতে চাই। আমাদের ক্রোধ, হতাশা, আপোষ সব কিছু নিয়ে এই যে অতি সাধারণ জীবন, সেখান থেকে মুক্তি পেতে চাই। বাস্তবে সেটা কখনই সম্ভব নয় জানি। তবু মনের গভীরে সেই ইচ্ছে পুষে রাখি। আর সেটিই যেন বাস্তব হয়ে ওঠে কখনও সিনেমার পর্দার বা উপন্যাসের নায়কের হাত ধরে। সেই অর্থে মনস্তাত্বিক দিক থেকেও `পথের দাবী` অত্যন্ত আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক।
কেননা আমাদের পথের দাবী মেটেনি। এক্ষেত্রে পথ বলতে জীবনের পথকেই বোঝাচ্ছি। উপন্যাসের নামকরণে এটুকু রূপক রেখেছিলেন শরৎচন্দ্র। আজ যদি নিজেদের দিকে তাকাই, তবে সব্যসাচীর সেদিনের রাষ্ট্র থেকে, বর্তমান রাষ্ট্রের খুব কিছু ফারাক দেখি কি? যে শোষণ, অপমান, লাঞ্ছনা সেই পরাধীন দেশে ছিল, তার চাইতে বোধহয় খুব কিছু পরিবর্তন ঘটেনি। যাদের কঠিন সংগ্রামে দেশে মুক্তিসূর্য উঠেছিল, তাঁদের আমরা ভুলে গেছি। যারা আজ ক্ষমতার অলিন্দে, তাদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা কিন্তু সব্যসাচীর মতো সেইসব মহাপ্রাণ মানুষদের জীবনের বিনিময়ে। সাধারণ মানুষ সেদিনও শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়নি, আজও নয়। আজও পথের দাবী তুললে রাষ্ট্রের খাঁড়া নেমে আসে। বলিষ্ঠ লেখনীকে কারারুদ্ধ করা হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় আদিবাসীদের স্বভূমি। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ক্রমাগত চলে অত্যাচার। কৃষক জমি হারায়, শ্রমিকদের মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়, বিনা নোটিশে লকআউট হয়, ছিনিয়ে নেওয়া হয় ন্যূনতম অধিকারটুকু। এমন নয় যে, স্বাধীনতার সুফল কিছুই পাইনি। কিন্তু সেটা হয়ত উনিশ-বিশ। তাই আজও বহু বরিষ্ঠ মানুষ, দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, চাপা গলায় বলেন, `এর চেয়ে ইংরেজ আমল বোধহয় বেশি ভাল ছিল।`
এই দ্বন্দ্ব কিন্তু উপন্যাসের পরতে পরতে। দেখতে পাচ্ছি, উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র অপূর্ব সাধারণ একজন মানুষ। সব্যসাচী তাকে আকর্ষণ করলেও সে দোটানায় ভোগে। আসলে পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুন কিছু আনতে হলে যে সাহস ও মানসিকতা দরকার সেটি সাধারণদের থাকে না। তারা গড্ডালিকা প্রবাদে চলতেই অভ্যস্ত। বিশেষ করে পরাধীন দেশের নাগরিকদের কোনও কিছুই যেন স্পর্শ করে না। তাদের কাছে বিপ্লব, স্বাধীনতা, পরাধীনতা ইত্যাদি সবই এক। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনে সেই প্রান্তিক মানুষদের সেভাবে পাওয়া যায় না।
সব্যসাচীর ভাবনা এখানেই। কেন সমাজের এই শ্রেণি স্বাধীনতার অর্থ বুঝবে না, কেন শুধুমাত্র উঁচু তলার মানুষরাই সবকিছু কুক্ষিগত করে থাকবে। উপন্যাসের একশো বছর পরেও একই চিত্র। রাষ্ট্র প্রদত্ত বিভিন্ন সামাজিক সুযোগ-সুবিধে, মৌলিক অধিকার ইত্যাদি নিয়ে আজও সাধারণ মানুষদের অবস্থান প্রমাণ করে, তাদের সত্যিই কিছু যায় আসে না। আর এই ফাঁকে সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে ছড়ি ঘোরায় তথাকথিত এলিট সমাজ। স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই আমলের থেকে, এই আমলের তাই বোধহয় বিশেষ পার্থক্য নেই।
আসলে মহান লেখকরা ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা হন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর `রক্তকরবী`-তে সেই কবে শিল্পবিপ্লবের কুফল সম্পর্কে বলে গিয়েছিলেন। আজ আমরা সেটা বুঝতে পারছি। একইভাবে প্রান্তিক মানুষদের অবস্থান বুঝতে `পল্লীসমাজ`-এর লেখক শরৎচন্দ্রের বেশি সময় লাগেনি। সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে যে ছবি তিনি এঁকেছেন, তা আজও এক।
পথের দাবীর নিবিড় পাঠ দেখায় যে, ``উপন্যাসে তিনটি অভিযোগ রয়েছে- শিল্প শ্রেণীর নিপীড়ন, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতীয়দের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও তার শিল্পপতিদের নিজেদের লাভের জন্য এশিয়ার সম্পদ লুট করার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।`` পাশাপাশি, নারীদের পথের দাবীও চোরা স্রোতের মতো বয়ে চলেছে উপন্যাসে। কাঙ্খিত সেই নারী স্বাধীনতা কিন্তু আজও আসেনি। গৃহের নিশ্চিন্ত নিরাপত্তা আর ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সেদিনের মহিলাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেওয়া সহজ ছিল না। তবু সুমিত্রা, ভারতী প্রমুখের মতো চরিত্র আমরা দেখি উপন্যাসে। তাদের অর্গল ভাঙা শুধু সমাজ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদের বিরুদ্ধেও। যেভাবে দীর্ঘদিন ভারতীয় নারীদের পুতুল সাজিয়ে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে অনেক দূরে তাদের অবস্থান। কিন্তু পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের পরেও সেদিনও তারা যোগ্য মর্যাদা পাননি। আজও পিছিয়ে আছেন। আসলে এই দেশে খুব সহজেই নারীদের পিছিয়ে রাখা যায়। ব্যবহার করা যায় যেভাবে খুশি।
রাজনৈতিক উপন্যাস হয়েও `পথের দাবী` আসলে সাধারণ মানুষের কথাই বলেছে। তাদের স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, আশা, হতাশা, প্রত্যাশা, মুক্তি, আলো আর অন্ধকার ফুটে উঠেছে নিপুণ শিল্পীর দক্ষ হাতে। ক্ষমতার হস্তান্তর হলেও, পথের দাবী আজও এক....অন্তত একশো বছরের খণ্ডিত সময় জুড়ে। বরং আজ সব্যসাচীর বড্ড অভাব। অপূর্বর মতো দোলাচলে থাকা মানুষদের ভিড়ে, তিনি হয়ত লুকিয়ে আছেন। এই আশা নিয়েই পথ চলা। কেননা ``আমরা সবাই পথিক। মানুষের মন্যুষত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবি অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙ্গেচুরে চলব।” উপন্যাসের এই কথাগুলি শতবর্ষ পার করে, আজও একইরকম প্রাসঙ্গিক।
(লেখক শিক্ষক ও সাহিত্যিক। কোচবিহারের বাসিন্দা)

*এই বছরের (২০২৫) প্রজাতন্ত্র দিবস অন্যরকম হয়ে রইল উত্তরবঙ্গ সংবাদের জন্য। আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা কার্যকরী সম্পাদক ও পত্রিকাকে।


https://uttarbangasambad.com/political-novels-speak-for-the-people/

Wednesday, January 15, 2025


 

সীমান্তে কি প্রহরী হতে হবে আবার 
শৌভিক রায় 

`প্রিয়তমাসু` কবিতায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, `সীমান্তে আজ আমি প্রহরী/  অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম ক’রে/  আজ এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি।` 

গত কয়েকদিন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যা চলছে, তাতে এই কথাগুলি বারবার মনে হচ্ছে। দেশ ভাগের সময় একবার রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করেছি। চোখের জলে আলাদা করেছি গঙ্গা আর পদ্মা। দুঃখ-সুখের বুকের মাঝে একই যন্ত্রণা হলেও, ভিন্ন পথে হেঁটেছি আমরা। 

পথ রক্তাক্ত হয়েছে আবারও। গত শতকের সত্তরের দশকের উত্তাল সেই সময় বাঁধতে চাইলেও, আমরা থমকে দাঁড়াইনি। বরং হাত বাড়িয়েছিলাম প্রকৃত বন্ধু হয়ে। অনন্য এক অনুভূতি স্পর্শ করেছিল আমাদেরও। স্নাত হয়েছিলাম রক্তাক্ত পথ শেষের মুক্তিসূর্যের কিরণে। 

ভাবিনি, আলোর উজ্জ্বল আভাতে লুকিয়ে রাহুগ্রাসের গাঢ় অন্ধকার!      

সেই অন্ধকার গাঢ়তর হচ্ছে বলেই বোধহয়, আজ আমাদের আবার সীমান্তে দাঁড়াতে হচ্ছে। না, দীর্ঘ কোনও যুদ্ধের প্রস্তুতি নয় এটি। নিজের রাষ্ট্রকে সুস্থিত রাখবার জন্যই এই প্রয়াস। যারা সীমান্ত সম্পর্কে সামান্য অবহিত, তাঁরা জানেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত দৈর্ঘ্যে মোট ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। দৈর্ঘ্যের দিক থেকে পৃথিবীর পঞ্চম দীর্ঘতম সীমান্তরেখা। এর মধ্যে ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। বাকি অংশ অসম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও মিজোরামের মধ্যে। 

ফলে বাংলাদেশের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব কতটা, সেটা বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল এই বঙ্গের উত্তরাংশ। সৌজন্যে, চিকেন নেক। দৈর্ঘ্যে ৬০ কিলোমিটার আর প্রস্থে ১৭-২২ কিলোমিটার ক্ষুদ্র এই ভূখণ্ড দেখতে অনেকটা মুরগির গলার মতো। আর এর মধ্যে দিয়েই সারা দেশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যেগুলির যোগাযোগ। সড়ক পথে যেতে হলে এই করিডোরকে স্পর্শ করতেই হবে। ফলে বোঝাই যায় কী নিদারুণ এর গুরুত্ব। আবার এই করিডোরকে ঘিরে রয়েছে নেপাল, ভুটানের মতো অন্য দু`টি রাষ্ট্রও। খুব দূরে নেই চিনও।

অতীতে বাংলাদেশ-ভারতের উন্মুক্ত সীমান্ত চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল। অনুপ্রবেশ ছিল নিত্য ঘটনা। কাঁটাতারের এপারে সীমান্ত রক্ষীদের অতন্দ্র পাহারায় আর সাধারণ মানুষদের সচেতনতায় অনেকটাই বন্ধ করা গেছে সে সব। কিন্তু এখনও খোলা জলপথ। ফলে চিন্তামুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তার উপরে যদি সীমান্তে কাঁটাতার দিতে মেখলিগঞ্জের মতো বাধা দেওয়া হয়, তবে সেটি অবশ্যই অশনি সঙ্কেত। আরও বড় কথা হল, এই বাধাদান অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে আঘাত দেওয়ার সামিল। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এটিকে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। ধোঁয়া দেখলেই আগুন থেকে সাবধান হওয়া উচিত।

স্বদেশের ঠিকানায় থমকে দাঁড়িয়ে বারবার প্রশ্ন জাগে, এই রক্তাক্ত পথ কাম্য ছিল? কেউই তো চাইনি। তবু কেন হায়নারা এলো ক্ষতবিক্ষত করতে সব!     

শিক্ষক, কোচবিহারের বাসিন্দা


আজকের (জানুয়ারি ১৫, ২০২৫) আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তরবঙ্গ সংস্করণে `আপনার অভিমত`-এ প্রকাশিত। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকা।  
     

Sunday, January 12, 2025


 

কচ্ছ দেখেননি? কিছুই দেখেননি....
শৌভিক রায়

'যখন পাসপোর্ট ভ্যালিড ছিল, তখন কেউ ডাকেনি। এখন সবাই ডাকে। কিন্তু বিদেশ যাত্রার ধকল এই বয়সে সম্ভব নয়', বললেন পদ্মশ্রী আব্দুল গফুর খেতরি সাহেব।
বসে আছি নিরোনা গ্রামে। খেতরি সাহেবের দৌলতে কচ্ছের এই গ্রামের নাম প্রায় সবাই জানে। পার্সিয়ান শৈলীর রোগান শিল্পের একমাত্র ধারক তিনি। আটশো বছর ধরে বংশপরম্পরায় তাঁদের পরিবার শিল্পটি বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হাতেও খেতরি সাহেবের শিল্প তুলে দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বের আরও বহু জায়গায় তাঁর শিল্প শোভা পাচ্ছে।
কচ্ছে আসার পথ মনে রাখার মতো। আহমেদাবাদ থেকে দীর্ঘপথে কার্পাস খেত, উইন্ডমিল, বিচ্ছিন্নভাবে সাদা হয়ে থাকা প্রান্তর আর ছোট বড় নানা শিল্পের সমাবেশ দারুন লাগছিল। তবে সানন্দে টাটার ন্যানো কারখানা দেখে মন একটু খারাপ হল বৈকি!
ভুজে পৌঁছালাম সন্ধ্যাবেলায়। কতবার ভূমিকম্পের শিকার হয়েছে এই শহর! তবু জীবন থামেনি। ২০০১ সালের সেই ভয়ানক ২৬ জানুয়ারির পর ভুজের এখন নতুন রূপ। সেই প্রবল বিপর্যয়ের স্মৃতি নিয়ে স্থাপিত স্মৃতি ভবন আধুনিকতার সঙ্গে অতীতের এক অসামান্য মেলবন্ধন। রোমাঞ্চিত হতে হয় সেটি দেখে। কচ্ছ মিউজিয়ামেও তারই ছাপ। তবে সেখানে কচ্ছের জনজীবন আর হস্তশিল্পের বিস্তারিত বিবরণ দেশের এই এলাকাকে জানবার জন্য যথেষ্ট। শহরের মাঝে হামিসার লেকের ধারের প্রাগ আর আয়না মহল কচ্ছের রাজকীয় অতীতের অসামান্য এক নিদর্শন। আভিজাত্য, বিত্ত আর রুচির এরকম মিশেল অবশ্য ভারতের বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে রয়েছে। তবে প্রাগ মহলের ইউরোপিয়ান শৈলীর স্থাপত্য নজরকাড়া। দ্রষ্টব্যগুলিও অন্য ধরণের।
ভুজ থেকে কিমি ষাটেক দূরের মান্ডবীর বিজয়বিলাস প্যালেসও অনবদ্য। হিন্দি ফিল্মের দৌলতে অনেকেই অবশ্য জানেন এর কথা। আগেই দেখে নিয়েছিলাম বাহাত্তর মন্দিরের জৈনালয়া আর শ্যামজি কৃষ্ণ ভার্মা মেমোরিয়াল। তবে মান্ডবি আমার কাছে আলাদা হয়ে রইল জাহাজ তৈরির জায়গা হিসেবে। কিছুটা জানা থাকলেও, মালয়েশিয়া থেকে নিয়ে আসা কাঠে এভাবে জাহাজ তৈরি করা দেখব ভাবিনি কখনও। এ এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। তবে সূর্যাস্ত বাদে এখানকার সৈকত সাধারণ বলেই মনে হয়েছে।
সবটাই অসাধারণ হয়ে গেল ধোরঢো আর ধোলাভিরায় এসে। ধোরঢো বিখ্যাত তার সাদা রনের জন্য। ধু-ধু এই প্রান্তরে কোনটা আকাশ আর কোনটা জমি বোঝা কঠিন। কপাল ভালো থাকায় ফ্লেমিঙ্গো আর বেলেহাঁসদের দেখাও মিলল। আসলে থর মরুভূমির বর্ধিত এই দক্ষিণ অঞ্চল প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি। লবণের এরকম বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর কোথাও নেই। অন্যদিকে, ধোলাভিরা ইতিমধ্যেই ইউনেসকোর হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পেয়েছে। এখানেই রয়েছে হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম বৃহৎ ধ্বংসাবশেষ। না দেখলে বোঝা যায় না সেই সময় কতটা উন্নত ছিল মানুষের জীবনযাত্রা। এখানকার ফসিল পার্ক একদম রন অফ কচ্ছ লেকের পাশে। সানসেট পয়েন্টটিও নজরকাড়া। সূর্যাস্তের আলোয় সাদা রনের মুহুর্মুহ রং পরিবর্তন যে কী অসাধারণ তা লিখে বোঝানো যায় না। ধোলাভিরা পৌঁছনোর পথেই কর্কটক্রান্তি রেখা পেরিয়ে আসাটাও উল্লেখ করতে হয়।
ধোলাভিরার আর একটি পালক হল তার রোড অফ হেভেন। লেকের মাঝখান দিয়ে তৈরি হয়েছে পাকা রাস্তা। দুই দিকে টলটলে জল আর রন নিয়ে এই পথ তুলনাহীন। এর টান উপেক্ষা করা যায় না। দিনে তো অবশ্যই, পূর্ণিমার রাতেও বিশেষ অনুমতি নিয়ে প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ কিমির রাস্তা নৈশবিহার করা করলাম। নেমে পড়লাম রনে। চাঁদ সাক্ষী, এরকম অভিজ্ঞতা জীবনে কোনও দিন হয়নি।
কচ্ছের সবচেয়ে উঁচু জায়গা কালা ডুঙ্গার থেকে পাকিস্তান বর্ডার দেখবার বৃথা চেষ্টা করলেও, ম্যাগনেটিক জোনে আপনাআপনি গাড়ি চলতে দেখে সত্যিই বোকা হয়ে গেলাম। কী অদ্ভুত কাণ্ড! একসময় এই রাস্তা দিয়েই প্রতিবেশী এলাকার সঙ্গে ব্যবসা চলত। দেশ তখন ভাগ হয়নি। আজ অবশ্য আলাদা কথা। এখানকার সানসেট পয়েন্ট থেকে সূর্যাস্ত দেখা এক বিরল পাওনা। উঁচুনিচু পাহাড়, পাতা দিয়ে ছাওয়া গোলাকৃতি কচ্ছি বাড়ি আর নিজস্ব পোশাকের রঙিন মানুষ নিয়ে এই অঞ্চলটি ভাল লাগবেই।
অজস্র গ্রাম ছড়িয়ে কচ্ছ জেলায়। প্রত্যেকেই মোটামুটি প্রসিদ্ধ নিজেদের হস্তশিল্পের জন্য। বান্নি এলাকার এই গ্রামগুলিতে পরিবারের সংখ্যা কোথাও পঁচিশ, কোথাও দশ। কিন্তু তার মধ্যেই গড়ে উঠেছে আজরক, মুশরু, বাঁধনি, ব্লক প্রিন্ট ইত্যাদি সব নানা শিল্প। কেউ কেউ আবার বান্নি এলাকায় অস্থায়ীভাবে পশুপালন নিয়েই রয়েছে। ভুজৌদি, গান্ধি নাগাঁও, ধামারকা, ভিরানদিয়ারা, খভরা ইত্যাদি নানা গ্রামের মধ্যে আলাদা করে নজর পড়ে মাধাপারে। ভারতের অন্যতম ধনী গ্রাম এটি।
কচ্ছের মতো বৈচিত্র্য সারা দেশে বিরল। লবণের মরুভূমি, পাহাড়, সমুদ্র, রকমারি খাবার আর অতি অবশ্যই দুর্দান্ত মানুষজন নিয়ে কচ্ছ নিঃসন্দেহে পর্যটনের অন্যতম সেরা ঠিকানা।
(প্রকাশিত: রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ জানুয়ারি ১২, ২০২৫)
* ছবি- শৌভিক রায়

Wednesday, January 8, 2025





বক্সা জয়ন্তীর ওপারে 
 শৌভিক রায় 

 বেশ অদ্ভুত লাগছিল উঁচু পাহাড় থেকে নিচে স্বর্ণকোষকে বয়ে যেতে দেখে। ওপারে ভুটানের পাহাড়। জায়গাটির সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম মানসের। আসলে ডুয়ার্সের এই অঞ্চলগুলির সঙ্গে অসমের মিল থাকবেই। কেননা একসময় প্রতিবেশী রাজ্যের ওই অঞ্চলগুলি অসম ডুয়ার্স বলে পরিচিত ছিল। স্বর্ণকোষ বা সংকোশ নদীকে অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সীমা ধরা হলেও প্রকৃতির রূপটান একই। 

খানিক আগে নিউল্যান্ড চা-বাগানের শতাব্দী প্রাচীন কাঠের পোস্ট-অফিস আর বাংলো দেখে এসেছি। দেখেছি সেই মাঠ যেখানে এই চা-বাগানের একদা ইউরোপিয়ান ম্যানেজার তাঁর নিজের প্লেন চালিয়ে নামতেন। আর চারদিকের তরঙ্গায়িত সবুজের কথা নতুন করে না-ই বা বললাম। তার সৌন্দর্য যে দেখেনি সে মরেছে, আর যে দেখেছে সে তো মরেইছে। 

সকালে ঘুম ভেঙেছে চা-বাগানের ওপারে বক্সার ঘন অরণ্য ঘেঁষা বনবস্তিতে। ঘুম ভেঙেছে বলা বোধহয় ভুল হল। মোটামুটি সারা রাত জেগে ছিলাম যদি হাতি এসে কাঠের ওই হোমস্টেতে পিঠ চুলকোয় সেই ভয়ে! গেল বিকেলে ওদের দেখা গেছে ময়ূর, হরিণের পাশে। বনবস্তিটিও খাসা। ওখানে যে মানুষ আছে সেটা বোঝা যাবে না চা-বাগানের ভেতরের সরু রাস্তা দিয়ে উত্তরের দিকে চলতে চলতে। অবশ্য বক্সা অভয়ারণ্যের এই দিকে লোকজন আসে না বললেই চলে। সেই কোন অতীতে যখন জয়ন্তী নদী পার করে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অসম যাওয়া হত, তখন গমগমে ছিল এইসব অঞ্চল। পরবর্তীতে অরণ্য বাঁচিয়ে, খানিকটা দূরে জাতীয় সড়ক তৈরি হলে, পরিত্যক্ত হয়েছে সেই পথ। জঙ্গল আবার হয়ে উঠেছে নির্জন। সারারাত সত্যিই এক গা ছমছমে অভিজ্ঞতা হয়েছে এখানে।   

সকালে চলে এসেছি নিউল্যান্ডের গা-লাগোয়া সংকোশ কালিখোলায়। কী যে অপরূপ চারধার তার বর্ণনা আর কী করব! সময় যেন থমকে আছে এখানকার আদিম মহীরুহ আর প্রাচীন বাড়িগুলিতে। আসলে এইসব অঞ্চলে চা-বাগান পত্তন হয়েছে বহু আগে। তারও আগে কুমারগ্রামদুয়ারের এই অঞ্চল দিয়ে ভুটানে যাওয়ার একটি গিরিপথ ছিল। ভুটানের সেই অঞ্চলটিও ঘুরে এলাম টুক করে। ছবির মতো ছোট্ট জনপদ। স্কুল, মন্দির আর সংকোশের অপূর্ব বিস্তার নিয়ে যে ল্যান্ডস্কেপ তাতে কোথায় লাগে অন্য কিছু! বেঁচে থাক আমার অকৃত্রিম ডুয়ার্স। 

আলিপুরদুয়ার জেলার এই অঞ্চলটি টুরিস্ট সার্কিটে সামান্য হলেও অফবিট। তার অবশ্য কারণও আছে। এক সময় রাজনৈতিক ডামাডোলে ব্রাত্য ছিল এই অঞ্চল। ফলে লোকজন আসেন কম। অনেকেই যেমন জানেন না খুব কাছের কামাখ্যাগুড়িতে রয়েছে আদি কামাখ্যা মন্দির। দেড়শ বছরের পুরোনো এই মন্দিরটির কথা রয়েছে  ১৮৮৯ -১৮৯৫ সালের Survey and Settlement of the Western Dooars in the District Jalpaiguri র রিপোর্টে। তখন অবশ্য পলাশ গাছের তলায় কামাখ্যা দেবীর মূর্তি ছিল। চারদিক ছিল ঘন জঙ্গলে ভরা। এখন সেই পরিবেশ আশা করা বৃথা। তবে ব্যস্ত জনপদ থেকে খানিকটা দূরের এই মন্দির আজও গ্রাম্য পরিবেশে। শুধু দেবী নন, এখানে পূজিত হন মা শীতলা, পাগলী, জুকি, জোকা ঠাকুর, বুড়া ঠাকুর, রাখাল ঠাকুর, লোহাসুর, কালাসুর, মাশান, বাগাসুর, মুড়িয়া মাশান, ভোটমুনী, মা গঙ্গা, মা মনসা, বাসুকী নাগ, লক্ষ্মী নারায়ন, মহাদেব, সত্যপীর সহ মোট আঠারো জন লৌকিক দেবতা। এক সময় কোচবিহার রাজবাড়ি থেকেও এখানে পুজোর সামগ্রী পাঠানো হত। রাজবংশী জনজাতির জীবন ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জানতে গেলে এই মন্দির দর্শন আবশ্যিক বলে মনে হল।

কুমারগ্রামদুয়ার ও কামাখ্যাগুড়ির খুব কাছে, আলিপুরদুয়ার থেকে মাত্র ২১ কিমি দূরের শামুকতলাকে ছুঁয়ে পথ গেছে উত্তরমুখী। কিছু প্রাচীন আদিবাসী জনপদ, চার্চ, ইংলিশ/বাংলা মিডিয়াম স্কুল ইত্যাদির মাঝে দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তায় সোজা এগোতে এগোতে ঢুকে পড়লাম শাল-সেগুন-মাদারের জঙ্গলে। পথ আলোছায়া। হঠাৎ কোনও ময়ূরের ডাক। এ গাছে ও গাছে বাঁদরের লাফ আর কৌতূহলী দৃষ্টি। পথ বেশ খানিকটা গিয়ে তুরতুরি চা- বাগানের কাছে দু'ভাগ হয়ে গেছে। 

ডান হাতের রাস্তা বাগানের বসতি ও বনবস্তির মধ্য দিয়ে অরণ্য ভেদ করে শেষ হয়েছে ভুটানঘাটে। অনবদ্য প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে হলে ভুটানঘাটের বিকল্প নেই। পাহাড়, নদী, নদীর পারে গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন ধাঁচের ভূমিক্ষয়, অরণ্যজীবন এবং অদ্ভুত নির্জনতা মুহূর্তেই ভুটানঘাটের প্রেমে পড়তে বাধ্য করবেই। তবে বনদপ্তরের নিজস্ব অনুমতি ছাড়া ঢোকা বারণ এই পথে। কারণটি রাজনৈতিক। তাই বিস্তৃত ব্যাখ্যায় না যাওয়াই ভাল। 


















তুরতুরি চা-বাগানের কাছে ভাগ হয়ে যাওয়া রাস্তায় বাঁ হাতে গেলে হাতিপোতা। ছোট্ট গঞ্জ। আরণ্যক। একটি মন্দির, ছোট্ট বাজার, ছোট্ট জনবসতির হাতিপোতাকে দেখে মনে হবে, শহর থেকে সত্যিই যেন অনেক দূরে চলে এসেছি। বাজার এলাকায় ঢুকতে হলে পাকা রাস্তা থেকে ডান হাতে ঢুকতে হয় সামান্যই। তা না করে সোজা এগোলেই  চা-বাগান শুরু। দু'পাশে চা- বাগান আর গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি মারা দূরের পাহাড়ে ততক্ষণে মনে বেশ রোমাঞ্চের ছোঁওয়া। এস এস বি ক্যাম্পের কোয়ার্টার্সের পাশ দিয়ে সোজা এগোলে দেখা মেলে টুরিস্ট লজের। লজের সামনেই ঝকঝকে সুউচ্চ ভুটান পাহাড়। প্রাকৃতিক দৃশ্য অসামান্য।

টুরিস্ট লজে না গিয়ে সোজা এগোতে থাকলেও কোন অসুবিধে নেই। তরঙ্গায়িত পথ, রায়ডাক, জয়ন্তী নদীর  শুকনো খাত (অবশ্যই বর্ষাকাল বাদে), জঙ্গল, পাহাড় আর ফাসখাওয়া চা-বাগানের অসাধারণ সৌন্দর্যে পাগল পাগল, কেবল চলতেই ইচ্ছে করবে। এ ভাবেই এগোতে এগোতে একসময় ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে শুনশান অন্ধকার মাখা পথ অতিক্রম করে পৌঁছে যাওয়া যায় জয়ন্তী নদীর ধারে জয়ন্তীর টুরিস্ট লজ ও জনপদের বিপরীত প্রান্তে। তবে ওই পথ আজ বন্ধ। অরণ্য এখানে দূর্ভেদ্য। মিলে যেতে পারে হাতি থেকে শুরু করে অন্য বন্যপ্রাণী। পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা জয়ন্তী চা-বাগানও এই এলাকায়। অপূর্ব সুন্দর সে বাগান। সৌন্দর্যে উত্তরের অন্যতম সেরা চা-বাগান। হ্যাঁ, সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা-বাগানকে মনে রেখেও বলছি পাহাড়ের ঢালের জয়ন্তী চা-বাগান টি ট্যুরিজমের অন্যতম সেরা বাজি হতে পারে।    
শামুকতলা থেকে অন্য একটি পথ গেছে মহাকালগুড়ি হয়ে ছিপরা বা চিপরাতে। রায়ডাক রেঞ্জের এই অরণ্যও আদিম। ভুটানের ওয়াং চু বঙ্গদেশে রায়ডাক নামে পরিচিত। আর নদীর নামেই বিস্তার এই অরণ্যভূমির। ডুয়ার্সের পরিচিত সব ধরনের বৃক্ষ মেলে এখানে। রয়েছে বেশ কয়েকটি বনবস্তি এবং রাভা-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনজাতির আবাস। বনচরদের মুক্তভূমি রায়ডাক। হাতি তো আছেই, দেখা মেলে বাইসন, হরিণ, বুনো শুয়োর-সহ নানা প্রাণীর। লালমুনিয়া, টিয়ে, কোয়েল, শ্যামা, ফিঙের ডাকে কেটে যায় সারাদিন। চারদিকের সবুজ চোখকে দেয় প্রশান্তি আর রায়ডাকের মৌনতা কেবল স্তব্ধই করে। ছিপরা-সহ সমস্ত রায়ডাক ডুয়ার্সের এক অনন্য সম্পদ। রায়ডাকের মোহিত করা সৌন্দর্য, নিস্তব্ধতার মধ্যে অসংখ্য বলে দেওয়া কথা রায়ডাককে ভালবাসায় কেবল। বক্সা অভয়ারণ্যের  ছিপরা রেঞ্জ যাওয়া যায় মহাকালগুড়ি হয়েও। গাছগাছালি-ছাওয়া মহাকালগুড়িতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রাধান্যই বেশী। দু'টি চার্চ, দু'টি বিদ্যালয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গ্রামটি এক নজরেই ভাল লেগে যায়। বড়দিনে সেজে ওঠে পুরো গ্রাম। প্রায় সব বাড়ির সামনেই দেখা যায় খ্রিস্টমাস ট্রি।

সবশেষে সিকিয়াঝোরা। নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো নিজের মতো। কিন্তু সে আর আলাদা কী! আছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মতো সিকিয়াঝোরাতেও দুপাশের গাছেরা প্রায় নদীর বুকে নেমে এসেছে। যত চলা যায় উজানে তত জঙ্গল ঘন হয়। কপাল ভাল থাকলে সে জঙ্গলে দেখা মিলতে পারে বনচরদের। তবে স্থানীয় মানুষেরা যেভাবে বাঘ দেখা যায় বলে দাবি  করে,তেমনটা কিছুই নয়। কিন্তু নদীর বুকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা নিঃসন্দেহে মনে করিয়ে দেবে সুন্দরবন বা আন্দামানের বারাটাংয়ের লাইমস্টোন কেভ দেখতে যাওয়ার কথা। অত্যন্ত ছোট হলেও উত্তরের নিজস্ব। সেটুকু বা কম কীসে! 

আসলে আলিপুরদুয়ার জেলার ডুয়ার্স অঞ্চলের মধ্যে বক্সা-জয়ন্তী যতটা পরিচিত ঠিক ততটা নাম করে উঠতে পারেনি এই অঞ্চলগুলি। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তারা কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। বরং লাটাগুড়ি, ঝালং, জয়ন্তীরর মতো কোলাহল নেই এখানে। তুলনায় ভিড় কম। ইদানিং সিকিয়াঝোরা কিছু টুরিস্ট টানছে। কিন্তু ট্রাভেলার বা পর্যটকের বড্ড অভাব যেন! ফলে কাঙ্খিত সমীক্ষা থেকে যেন অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে তারা। বক্সা-জয়ন্তীর ওপার অপার সম্ভাবনা নিয়ে উন্মুক্ত সকলের জন্য আজও তাই।      

     
(প্রকাশিত: ফুলেশ্বরী নন্দিনী, ২০২৩)
 

Sunday, January 5, 2025


 

অদৃশ্য দীর্ঘ সেই ছায়া 
শৌভিক রায় 


ছাপান্ন কিমির দূরত্ব কি সেদিন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল? কিন্তু সেটা হয় কীভাবে? বাসের গতি তো একই ছিল! 

পথটা খুব চেনা বলেই জোর দিয়ে বলতে পারি, বাসের গতি একই ছিল। সেই কোন ছোট থেকে ফালাকাটা-কোচবিহার-দিনহাটা করছি।

আসলে বাড়ি তো দুটো। স্বাধীনতার সময় দেশভাগ হলে অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ থেকে আসা দিশেহারা উদ্বাস্তু পরিবারটি দিনহাটায় থিতু হয়েছিল। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান, আমার বাবা, সেই ডামাডোলের মধ্যেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম. এ. পাস করে দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছিলেন। মা তার আগেই দিনহাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মরত। এক অর্থে বাবাকে আমার মা-ই এম. এ. পড়িয়েছিলেন। ফলে তাঁর একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল। খুব স্বাভাবিক সেটা। যাহোক, দিনহাটা থেকে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হয়ে চলে যেতে বাবার লেগেছিল মাত্র সাত বছর। মা তখনও দিনহাটায়। ফলে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের কোয়ার্টারস ছিল আমার ঘরবাড়ি। আমার জন্ম ফালাকাটায়। দিনহাটায় মায়ের কাছে কিছুদিন থাকলেও, ফালাকাটাতেই আমার বেড়ে ওঠা। মা নিজেও পরে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে আসেন। কোয়ার্টারস ছেড়ে নিজেদের বাড়িও তৈরি করা হয়। কিন্তু দিনহাটার সঙ্গে সম্পর্ক আজও অটুট। শাটল ককের মতো তাই ফালাকাটা দিনহাটা ছিল নিত্য ঘটনা। আর সেই যাতায়াতের কোচবিহার তো ছুঁতেই হবে।  

সেই সুবাদেই বলতে পারি, বাসের গতি তো একই ছিল! রাস্তাও তো সেই পারাডুবি-হিন্দুস্থান মোড়-নিশিগঞ্জ-সুটকাবাড়ি-ঘুঘুমারি- কোচবিহার। তাহলে হলটা কী! 

আজ আটাশ বছর পরে সেদিনের কথা ভাবলে মনে হয়, সেদিন যেমন ছাপান্ন কিমির পথ দ্রুত শেষ হয়েছিল, এতগুলো বছরও তেমনি বোধহয় অতি দ্রুত চলে গেল। রাজনগরে মহারাজার নামাঙ্কিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে চলেছি -- সেদিনের এই উত্তেজনায় ফালাকাটা কোচবিহার পথকে ছোট্ট মনে হয়েছিল। আর আজ প্রায় তিন দশক শিক্ষকতায় থেকেও মনে হয় এই তো সেদিন কাজে যোগ দিলাম। সেভাবে শিখলাম না কিছুই। শেখার এখনও অনেক বাকি। শেখানোর তো বটেই!

কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, শেখা চলে জীবনভর। তার কোনও শেষ নেই। শেখা ও শেখানো যেদিন শেষ হয়ে যায়, সেদিন একজন শিক্ষকের মৃত্যু হয়। তাই আজও অবসরের কাছাকাছি এসেও দশে দশ পেতে চাই না। পূর্ণ মান পেয়ে গেলে পূর্ণতার জন্য ছুটব না। আর কে না জানে স্থবিরতা মানেই মৃত্যু। তার চাইতে দশে নয় পাওয়াটা অনেক ভাল!

এসব ভেবে ভেবেই বোধহয় বয়স আর বাড়ল না! এমনিতেও সারাদিন কচিকাঁচাদের সঙ্গে থেকে আমাদের, শিক্ষকদের, বয়স বাড়ে না। সেই ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ যখন স্কুলে যোগ দিলাম বয়স বোধহয় তখন থেকেই থমকে গেল! আর থমকে গেল বলেই, তাড়িয়ে তাড়িয়ে আজও উপভোগ করছি শিক্ষক জীবনকে। সেই উপভোগে সবচেয়ে বড় অবদান আমার ছাত্রদের। ওরা না থাকলে কোথায় আমি আর কোথায় কে! ওরাই তো তৈরি করেছে এই আমিকে। ওরা ছাড়া আমার আলাদা কোনও অস্তিত্ব আছে কি? প্রশ্ন যখন হ্যাঁ-বাচক, উত্তর তো অবশ্যই 'না' হবে। আসল কথাটা হল, একজন শিক্ষকই শুধু ভাল ছাত্র তৈরি করেন না, ছাত্ররাও ভাল শিক্ষক তৈরি করে। এই সহজ সত্যটা আমরা অনেকে বুঝি না। হয়ত সেজন্যই আজ শিক্ষা জগতে এই অস্থিরতা! তাই শতবর্ষের এই অসাধারণ মুহূর্তে যদি সবার আগে কাউকে মনে হয়, তবে ওদের কথাই বলতে হয়। ওদের জন্যই তো নিজের ও পরিবারের অন্ন সংস্থান! আর সত্যি বলতে ওদের ভুলের জন্যই আমাদের বেঁচেবর্তে থাকা। কথায় বলে না, errors are bread earners.... ওরা যদি ভুল না করত, আমাদের শিক্ষকতার প্রয়োজন হত?

শতবর্ষে ভীষণ মনে পড়ছে জগদেও ভাইকে। দীর্ঘদেহী মানুষটিকে কোনও দিন চেয়ারে বসতে দেখিনি। প্রেয়ার লাইনের জন্য যে ওয়ার্নিং বেল বাজাতেন তার সংখ্যা হত কোনও দিন পঁচাশি, কোনও দিন সাতানব্বই। সারা স্কুল ঘুরে টুকটুক করে এটা সেটা পরিষ্কার করতেন। আফসোস, ওঁর ছেলে লালনকে আমরা এই স্কুলে চাকরি দিতে পারিনি। সপরিবারে বিহারে চলে গেলেও, শুধুমাত্র স্কুলের টানে লালন আজও আসে। উকিলদা বা কম যেতেন কীসে? পরীক্ষার আগে অমানুষিক পরিশ্রম করতে দেখতাম মানুষটিকে। একা হাতেই এত এত খাতা রেডি করতেন অনায়াসে। বয়সের গাছ পাথর ছিল না উকিলদার। কিন্তু খাটতে পারতেন প্রচুর। ব্যাংকের কাজে গোপালদা ছিলেন অসম্ভব পটু। নিশ্চিন্ত থাকা যেত গোপালদাকে কাজ দিয়ে। এবাদেও চুপিচুপি বলি, প্রতি বছর রাসমেলায় আসা সার্কাসের পাস জোগাড় করতে আমাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল গোপালদা। শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে এই মুহূর্তে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের কথা আলাদা করে বলছি না। বিদ্যালয় জানে তাঁদের অবদান। 

করণিক অশোকদার মতো দক্ষ মানুষ খুব কম দেখেছি। এত সুন্দর গুছিয়ে কাজ করতেন যে, তাকিয়ে দেখতে হত। মানুষটি অনেক উপকার করে গেছেন আমাদের বিভিন্নভাবে। আর সুদর্শনদা সত্যিই মাটির মানুষ। তাঁর সারল্য ও রসবোধ মনে পড়লেই উদাস হই। উনি সত্যিই আলাদা। বর্তমান করণিক যাঁরা আছেন তাঁরা সেই ঐতিহ্যই বহন করছেন। 

এই দীর্ঘ আটাশ বছরে যে কতজন সহকর্মীর সংস্পর্শে এসেছি! ভাবতেই অবাক হই। আমি স্কুলে যোগ দেওয়ার পর প্রথম ফেয়ারওয়েল দিই কুমুদবাবুকে। তারপর একে একে ভরতবাবু, তিমিরবাবু, কালীশঙ্করবাবু, সমসেরবাবু, সুহাসবাবু, তরুণবাবু, রাখালবাবু, পার্বতীবাবু, শান্তিবাবু,  সমীরবাবু, স্নিগ্ধবাবু, গৌরগোপালবাবু, সমীরবাবু, প্রণয়বাবু, দিলীপবাবু, সরলবাবু, তপনবাবু, দীপঙ্করবাবু, অনুপমবাবু, পরিমলবাবু, নারায়ণবাবু, অপরেশবাবু, অনিলবাবু,  নৃপেণবাবু, নিখিলবাবু, পরমেশ্বরবাবু, ইন্দ্রবাবু, সন্তোষবাবু, সত্যজিতবাবু, উত্তমবাবু, ধীমানবাবু...। কেউ কি বাদ পড়লেন? স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করতেই পারে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তাই। কর্মরত অবস্থায় চিরবিদায় দিয়েছি সমীরণবাবু ও রঞ্জনদাকে। শিক্ষাকর্মী জলিলও বিদায় নিয়েছে আকস্মিক। কালের নিয়মে বর্তমান আমরা যারা রয়েছি, তারাও বিদায় নেব অচিরেই। কিন্তু বিদ্যালয় একই থাকবে। এটিই ধ্রুব সত্য। এটুকু বুঝি যে কেউই অপরিহার্য নয়। প্রকৃতির নিয়মেই কেউ সেটা হতে পারে না। দীর্ঘ একশো বছর স্কুল তার নিজের নিয়মেই চলেছে। আগামীতেও চলবে। সেই বিরাট পদক্ষেপে আমার নিজের অবদান কতটা! অতীব সামান্য। আমাদের সকলেরই তাই। মনে রাখা দরকার, আমার জন্য স্কুল ভাবনাটা মূর্খের, স্কুলের জন্য আমি এটিই একমাত্র সত্য। মাঝে মাঝে যখন এর ব্যতিক্রম দেখি, কষ্ট হয় ঠিকই। কিন্তু তার চাইতেও করুণা হয় বেশি!

একশো বছর পূর্তির বিরাট কর্মযজ্ঞে একটি গুরুদায়িত্ব নিঃসন্দেহে আমাকে গর্বিত করেছে। প্রত্যেকের অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। তবে বিশেষ করে উল্লেখ করব বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ও স্মারক পত্রিকার যুগ্ম আহবায়ক শ্রী অলোক কুমার গুহর কথা। বয়সের ব্যবধান আমাদের বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়ে ওঠেনি কখনও। বরং অসমবয়সী এই সখ্যে ভারের চাইতে জোড়টা অনেক বেশি। বিদ্যালয়ের হাজার হাজার প্রাক্তনীর মধ্যে শুধুমাত্র একজনের উল্লেখ পক্ষপাতিত্ব হলেও আমার উপায় নেই। স্বীকার করতেই হবে। যেমন বলব সহকর্মী শ্যামলদার কথা। স্কুলে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন থেকে সেই যে গাঢ় বন্ধুত্ব তার শেষ হবে না কোনও দিনই। বলব আমার ছাত্র ও সহকর্মী সুবল, মৃত্যুঞ্জয় ও গৌরাঙ্গর কথা। ছাত্র সহকর্মী হলে যে কী আনন্দ হয় তার স্বাদ দিয়েছে ওরা। বাকি যাঁরা আছেন, রমা ম্যাডাম, সুখপ্রিয়বাবু, অর্ণব থেকে শুরু করে অন্যেরা (স্মারক পত্রিকার স্থান সংকুলানের কথা ভেবেই আলাদা করে সকলের নাম উল্লেখ করলাম না) প্রত্যেকেই আমার বর্ধিত পরিবার। আমার কর্মক্ষেত্র মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় আমাকে এই উপহারটা দিয়েছে।

যাপনের প্রতিটি মুহূর্তই আসলে অর্জন। সেই অর্জনে যদি নিত্য যুক্ত হয় একটি বিদ্যালয়, তবে সেই পাওনা পবিত্র বলেই মনে করি। সঙ্গে শতবর্ষের ঐতিহ্য মহৎ করে তোলে তাকে। আমি সৌভাগ্যবান একটি বিদ্যালয়কে পঁচাত্তর ও একশো বছর স্পর্শ করতে দেখলাম। আমার অর্জন তাই সুবিশাল। নিক্তিতে মাপা অসম্ভব। যেমন সম্ভব নয় জীবনের বাকি দিনগুলো থেকে কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের অদৃশ্য দীর্ঘ ছায়াকে মুছে ফেলা.....

(প্রকাশিত: শতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ, কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়)