অদৃশ্য দীর্ঘ সেই ছায়া
শৌভিক রায়
ছাপান্ন কিমির দূরত্ব কি সেদিন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল? কিন্তু সেটা হয় কীভাবে? বাসের গতি তো একই ছিল!
পথটা খুব চেনা বলেই জোর দিয়ে বলতে পারি, বাসের গতি একই ছিল। সেই কোন ছোট থেকে ফালাকাটা-কোচবিহার-দিনহাটা করছি।
আসলে বাড়ি তো দুটো। স্বাধীনতার সময় দেশভাগ হলে অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ থেকে আসা দিশেহারা উদ্বাস্তু পরিবারটি দিনহাটায় থিতু হয়েছিল। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান, আমার বাবা, সেই ডামাডোলের মধ্যেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম. এ. পাস করে দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছিলেন। মা তার আগেই দিনহাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মরত। এক অর্থে বাবাকে আমার মা-ই এম. এ. পড়িয়েছিলেন। ফলে তাঁর একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল। খুব স্বাভাবিক সেটা। যাহোক, দিনহাটা থেকে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হয়ে চলে যেতে বাবার লেগেছিল মাত্র সাত বছর। মা তখনও দিনহাটায়। ফলে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের কোয়ার্টারস ছিল আমার ঘরবাড়ি। আমার জন্ম ফালাকাটায়। দিনহাটায় মায়ের কাছে কিছুদিন থাকলেও, ফালাকাটাতেই আমার বেড়ে ওঠা। মা নিজেও পরে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে আসেন। কোয়ার্টারস ছেড়ে নিজেদের বাড়িও তৈরি করা হয়। কিন্তু দিনহাটার সঙ্গে সম্পর্ক আজও অটুট। শাটল ককের মতো তাই ফালাকাটা দিনহাটা ছিল নিত্য ঘটনা। আর সেই যাতায়াতের কোচবিহার তো ছুঁতেই হবে।
সেই সুবাদেই বলতে পারি, বাসের গতি তো একই ছিল! রাস্তাও তো সেই পারাডুবি-হিন্দুস্থান মোড়-নিশিগঞ্জ-সুটকাবাড়ি-ঘুঘু মারি- কোচবিহার। তাহলে হলটা কী!
আজ আটাশ বছর পরে সেদিনের কথা ভাবলে মনে হয়, সেদিন যেমন ছাপান্ন কিমির পথ দ্রুত শেষ হয়েছিল, এতগুলো বছরও তেমনি বোধহয় অতি দ্রুত চলে গেল। রাজনগরে মহারাজার নামাঙ্কিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে চলেছি -- সেদিনের এই উত্তেজনায় ফালাকাটা কোচবিহার পথকে ছোট্ট মনে হয়েছিল। আর আজ প্রায় তিন দশক শিক্ষকতায় থেকেও মনে হয় এই তো সেদিন কাজে যোগ দিলাম। সেভাবে শিখলাম না কিছুই। শেখার এখনও অনেক বাকি। শেখানোর তো বটেই!
কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, শেখা চলে জীবনভর। তার কোনও শেষ নেই। শেখা ও শেখানো যেদিন শেষ হয়ে যায়, সেদিন একজন শিক্ষকের মৃত্যু হয়। তাই আজও অবসরের কাছাকাছি এসেও দশে দশ পেতে চাই না। পূর্ণ মান পেয়ে গেলে পূর্ণতার জন্য ছুটব না। আর কে না জানে স্থবিরতা মানেই মৃত্যু। তার চাইতে দশে নয় পাওয়াটা অনেক ভাল!
এসব ভেবে ভেবেই বোধহয় বয়স আর বাড়ল না! এমনিতেও সারাদিন কচিকাঁচাদের সঙ্গে থেকে আমাদের, শিক্ষকদের, বয়স বাড়ে না। সেই ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ যখন স্কুলে যোগ দিলাম বয়স বোধহয় তখন থেকেই থমকে গেল! আর থমকে গেল বলেই, তাড়িয়ে তাড়িয়ে আজও উপভোগ করছি শিক্ষক জীবনকে। সেই উপভোগে সবচেয়ে বড় অবদান আমার ছাত্রদের। ওরা না থাকলে কোথায় আমি আর কোথায় কে! ওরাই তো তৈরি করেছে এই আমিকে। ওরা ছাড়া আমার আলাদা কোনও অস্তিত্ব আছে কি? প্রশ্ন যখন হ্যাঁ-বাচক, উত্তর তো অবশ্যই 'না' হবে। আসল কথাটা হল, একজন শিক্ষকই শুধু ভাল ছাত্র তৈরি করেন না, ছাত্ররাও ভাল শিক্ষক তৈরি করে। এই সহজ সত্যটা আমরা অনেকে বুঝি না। হয়ত সেজন্যই আজ শিক্ষা জগতে এই অস্থিরতা! তাই শতবর্ষের এই অসাধারণ মুহূর্তে যদি সবার আগে কাউকে মনে হয়, তবে ওদের কথাই বলতে হয়। ওদের জন্যই তো নিজের ও পরিবারের অন্ন সংস্থান! আর সত্যি বলতে ওদের ভুলের জন্যই আমাদের বেঁচেবর্তে থাকা। কথায় বলে না, errors are bread earners.... ওরা যদি ভুল না করত, আমাদের শিক্ষকতার প্রয়োজন হত?
শতবর্ষে ভীষণ মনে পড়ছে জগদেও ভাইকে। দীর্ঘদেহী মানুষটিকে কোনও দিন চেয়ারে বসতে দেখিনি। প্রেয়ার লাইনের জন্য যে ওয়ার্নিং বেল বাজাতেন তার সংখ্যা হত কোনও দিন পঁচাশি, কোনও দিন সাতানব্বই। সারা স্কুল ঘুরে টুকটুক করে এটা সেটা পরিষ্কার করতেন। আফসোস, ওঁর ছেলে লালনকে আমরা এই স্কুলে চাকরি দিতে পারিনি। সপরিবারে বিহারে চলে গেলেও, শুধুমাত্র স্কুলের টানে লালন আজও আসে। উকিলদা বা কম যেতেন কীসে? পরীক্ষার আগে অমানুষিক পরিশ্রম করতে দেখতাম মানুষটিকে। একা হাতেই এত এত খাতা রেডি করতেন অনায়াসে। বয়সের গাছ পাথর ছিল না উকিলদার। কিন্তু খাটতে পারতেন প্রচুর। ব্যাংকের কাজে গোপালদা ছিলেন অসম্ভব পটু। নিশ্চিন্ত থাকা যেত গোপালদাকে কাজ দিয়ে। এবাদেও চুপিচুপি বলি, প্রতি বছর রাসমেলায় আসা সার্কাসের পাস জোগাড় করতে আমাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল গোপালদা। শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে এই মুহূর্তে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের কথা আলাদা করে বলছি না। বিদ্যালয় জানে তাঁদের অবদান।
করণিক অশোকদার মতো দক্ষ মানুষ খুব কম দেখেছি। এত সুন্দর গুছিয়ে কাজ করতেন যে, তাকিয়ে দেখতে হত। মানুষটি অনেক উপকার করে গেছেন আমাদের বিভিন্নভাবে। আর সুদর্শনদা সত্যিই মাটির মানুষ। তাঁর সারল্য ও রসবোধ মনে পড়লেই উদাস হই। উনি সত্যিই আলাদা। বর্তমান করণিক যাঁরা আছেন তাঁরা সেই ঐতিহ্যই বহন করছেন।
এই দীর্ঘ আটাশ বছরে যে কতজন সহকর্মীর সংস্পর্শে এসেছি! ভাবতেই অবাক হই। আমি স্কুলে যোগ দেওয়ার পর প্রথম ফেয়ারওয়েল দিই কুমুদবাবুকে। তারপর একে একে ভরতবাবু, তিমিরবাবু, কালীশঙ্করবাবু, সমসেরবাবু, সুহাসবাবু, তরুণবাবু, রাখালবাবু, পার্বতীবাবু, শান্তিবাবু, সমীরবাবু, স্নিগ্ধবাবু, গৌরগোপালবাবু, সমীরবাবু, প্রণয়বাবু, দিলীপবাবু, সরলবাবু, তপনবাবু, দীপঙ্করবাবু, অনুপমবাবু, পরিমলবাবু, নারায়ণবাবু, অপরেশবাবু, অনিলবাবু, নৃপেণবাবু, নিখিলবাবু, পরমেশ্বরবাবু, ইন্দ্রবাবু, সন্তোষবাবু, সত্যজিতবাবু, উত্তমবাবু, ধীমানবাবু...। কেউ কি বাদ পড়লেন? স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করতেই পারে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তাই। কর্মরত অবস্থায় চিরবিদায় দিয়েছি সমীরণবাবু ও রঞ্জনদাকে। শিক্ষাকর্মী জলিলও বিদায় নিয়েছে আকস্মিক। কালের নিয়মে বর্তমান আমরা যারা রয়েছি, তারাও বিদায় নেব অচিরেই। কিন্তু বিদ্যালয় একই থাকবে। এটিই ধ্রুব সত্য। এটুকু বুঝি যে কেউই অপরিহার্য নয়। প্রকৃতির নিয়মেই কেউ সেটা হতে পারে না। দীর্ঘ একশো বছর স্কুল তার নিজের নিয়মেই চলেছে। আগামীতেও চলবে। সেই বিরাট পদক্ষেপে আমার নিজের অবদান কতটা! অতীব সামান্য। আমাদের সকলেরই তাই। মনে রাখা দরকার, আমার জন্য স্কুল ভাবনাটা মূর্খের, স্কুলের জন্য আমি এটিই একমাত্র সত্য। মাঝে মাঝে যখন এর ব্যতিক্রম দেখি, কষ্ট হয় ঠিকই। কিন্তু তার চাইতেও করুণা হয় বেশি!
একশো বছর পূর্তির বিরাট কর্মযজ্ঞে একটি গুরুদায়িত্ব নিঃসন্দেহে আমাকে গর্বিত করেছে। প্রত্যেকের অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। তবে বিশেষ করে উল্লেখ করব বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ও স্মারক পত্রিকার যুগ্ম আহবায়ক শ্রী অলোক কুমার গুহর কথা। বয়সের ব্যবধান আমাদের বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়ে ওঠেনি কখনও। বরং অসমবয়সী এই সখ্যে ভারের চাইতে জোড়টা অনেক বেশি। বিদ্যালয়ের হাজার হাজার প্রাক্তনীর মধ্যে শুধুমাত্র একজনের উল্লেখ পক্ষপাতিত্ব হলেও আমার উপায় নেই। স্বীকার করতেই হবে। যেমন বলব সহকর্মী শ্যামলদার কথা। স্কুলে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন থেকে সেই যে গাঢ় বন্ধুত্ব তার শেষ হবে না কোনও দিনই। বলব আমার ছাত্র ও সহকর্মী সুবল, মৃত্যুঞ্জয় ও গৌরাঙ্গর কথা। ছাত্র সহকর্মী হলে যে কী আনন্দ হয় তার স্বাদ দিয়েছে ওরা। বাকি যাঁরা আছেন, রমা ম্যাডাম, সুখপ্রিয়বাবু, অর্ণব থেকে শুরু করে অন্যেরা (স্মারক পত্রিকার স্থান সংকুলানের কথা ভেবেই আলাদা করে সকলের নাম উল্লেখ করলাম না) প্রত্যেকেই আমার বর্ধিত পরিবার। আমার কর্মক্ষেত্র মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় আমাকে এই উপহারটা দিয়েছে।
যাপনের প্রতিটি মুহূর্তই আসলে অর্জন। সেই অর্জনে যদি নিত্য যুক্ত হয় একটি বিদ্যালয়, তবে সেই পাওনা পবিত্র বলেই মনে করি। সঙ্গে শতবর্ষের ঐতিহ্য মহৎ করে তোলে তাকে। আমি সৌভাগ্যবান একটি বিদ্যালয়কে পঁচাত্তর ও একশো বছর স্পর্শ করতে দেখলাম। আমার অর্জন তাই সুবিশাল। নিক্তিতে মাপা অসম্ভব। যেমন সম্ভব নয় জীবনের বাকি দিনগুলো থেকে কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের অদৃশ্য দীর্ঘ ছায়াকে মুছে ফেলা.....
(প্রকাশিত: শতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ, কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়)

No comments:
Post a Comment