Wednesday, January 8, 2025





বক্সা জয়ন্তীর ওপারে 
 শৌভিক রায় 

 বেশ অদ্ভুত লাগছিল উঁচু পাহাড় থেকে নিচে স্বর্ণকোষকে বয়ে যেতে দেখে। ওপারে ভুটানের পাহাড়। জায়গাটির সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম মানসের। আসলে ডুয়ার্সের এই অঞ্চলগুলির সঙ্গে অসমের মিল থাকবেই। কেননা একসময় প্রতিবেশী রাজ্যের ওই অঞ্চলগুলি অসম ডুয়ার্স বলে পরিচিত ছিল। স্বর্ণকোষ বা সংকোশ নদীকে অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সীমা ধরা হলেও প্রকৃতির রূপটান একই। 

খানিক আগে নিউল্যান্ড চা-বাগানের শতাব্দী প্রাচীন কাঠের পোস্ট-অফিস আর বাংলো দেখে এসেছি। দেখেছি সেই মাঠ যেখানে এই চা-বাগানের একদা ইউরোপিয়ান ম্যানেজার তাঁর নিজের প্লেন চালিয়ে নামতেন। আর চারদিকের তরঙ্গায়িত সবুজের কথা নতুন করে না-ই বা বললাম। তার সৌন্দর্য যে দেখেনি সে মরেছে, আর যে দেখেছে সে তো মরেইছে। 

সকালে ঘুম ভেঙেছে চা-বাগানের ওপারে বক্সার ঘন অরণ্য ঘেঁষা বনবস্তিতে। ঘুম ভেঙেছে বলা বোধহয় ভুল হল। মোটামুটি সারা রাত জেগে ছিলাম যদি হাতি এসে কাঠের ওই হোমস্টেতে পিঠ চুলকোয় সেই ভয়ে! গেল বিকেলে ওদের দেখা গেছে ময়ূর, হরিণের পাশে। বনবস্তিটিও খাসা। ওখানে যে মানুষ আছে সেটা বোঝা যাবে না চা-বাগানের ভেতরের সরু রাস্তা দিয়ে উত্তরের দিকে চলতে চলতে। অবশ্য বক্সা অভয়ারণ্যের এই দিকে লোকজন আসে না বললেই চলে। সেই কোন অতীতে যখন জয়ন্তী নদী পার করে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অসম যাওয়া হত, তখন গমগমে ছিল এইসব অঞ্চল। পরবর্তীতে অরণ্য বাঁচিয়ে, খানিকটা দূরে জাতীয় সড়ক তৈরি হলে, পরিত্যক্ত হয়েছে সেই পথ। জঙ্গল আবার হয়ে উঠেছে নির্জন। সারারাত সত্যিই এক গা ছমছমে অভিজ্ঞতা হয়েছে এখানে।   

সকালে চলে এসেছি নিউল্যান্ডের গা-লাগোয়া সংকোশ কালিখোলায়। কী যে অপরূপ চারধার তার বর্ণনা আর কী করব! সময় যেন থমকে আছে এখানকার আদিম মহীরুহ আর প্রাচীন বাড়িগুলিতে। আসলে এইসব অঞ্চলে চা-বাগান পত্তন হয়েছে বহু আগে। তারও আগে কুমারগ্রামদুয়ারের এই অঞ্চল দিয়ে ভুটানে যাওয়ার একটি গিরিপথ ছিল। ভুটানের সেই অঞ্চলটিও ঘুরে এলাম টুক করে। ছবির মতো ছোট্ট জনপদ। স্কুল, মন্দির আর সংকোশের অপূর্ব বিস্তার নিয়ে যে ল্যান্ডস্কেপ তাতে কোথায় লাগে অন্য কিছু! বেঁচে থাক আমার অকৃত্রিম ডুয়ার্স। 

আলিপুরদুয়ার জেলার এই অঞ্চলটি টুরিস্ট সার্কিটে সামান্য হলেও অফবিট। তার অবশ্য কারণও আছে। এক সময় রাজনৈতিক ডামাডোলে ব্রাত্য ছিল এই অঞ্চল। ফলে লোকজন আসেন কম। অনেকেই যেমন জানেন না খুব কাছের কামাখ্যাগুড়িতে রয়েছে আদি কামাখ্যা মন্দির। দেড়শ বছরের পুরোনো এই মন্দিরটির কথা রয়েছে  ১৮৮৯ -১৮৯৫ সালের Survey and Settlement of the Western Dooars in the District Jalpaiguri র রিপোর্টে। তখন অবশ্য পলাশ গাছের তলায় কামাখ্যা দেবীর মূর্তি ছিল। চারদিক ছিল ঘন জঙ্গলে ভরা। এখন সেই পরিবেশ আশা করা বৃথা। তবে ব্যস্ত জনপদ থেকে খানিকটা দূরের এই মন্দির আজও গ্রাম্য পরিবেশে। শুধু দেবী নন, এখানে পূজিত হন মা শীতলা, পাগলী, জুকি, জোকা ঠাকুর, বুড়া ঠাকুর, রাখাল ঠাকুর, লোহাসুর, কালাসুর, মাশান, বাগাসুর, মুড়িয়া মাশান, ভোটমুনী, মা গঙ্গা, মা মনসা, বাসুকী নাগ, লক্ষ্মী নারায়ন, মহাদেব, সত্যপীর সহ মোট আঠারো জন লৌকিক দেবতা। এক সময় কোচবিহার রাজবাড়ি থেকেও এখানে পুজোর সামগ্রী পাঠানো হত। রাজবংশী জনজাতির জীবন ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জানতে গেলে এই মন্দির দর্শন আবশ্যিক বলে মনে হল।

কুমারগ্রামদুয়ার ও কামাখ্যাগুড়ির খুব কাছে, আলিপুরদুয়ার থেকে মাত্র ২১ কিমি দূরের শামুকতলাকে ছুঁয়ে পথ গেছে উত্তরমুখী। কিছু প্রাচীন আদিবাসী জনপদ, চার্চ, ইংলিশ/বাংলা মিডিয়াম স্কুল ইত্যাদির মাঝে দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তায় সোজা এগোতে এগোতে ঢুকে পড়লাম শাল-সেগুন-মাদারের জঙ্গলে। পথ আলোছায়া। হঠাৎ কোনও ময়ূরের ডাক। এ গাছে ও গাছে বাঁদরের লাফ আর কৌতূহলী দৃষ্টি। পথ বেশ খানিকটা গিয়ে তুরতুরি চা- বাগানের কাছে দু'ভাগ হয়ে গেছে। 

ডান হাতের রাস্তা বাগানের বসতি ও বনবস্তির মধ্য দিয়ে অরণ্য ভেদ করে শেষ হয়েছে ভুটানঘাটে। অনবদ্য প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে হলে ভুটানঘাটের বিকল্প নেই। পাহাড়, নদী, নদীর পারে গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন ধাঁচের ভূমিক্ষয়, অরণ্যজীবন এবং অদ্ভুত নির্জনতা মুহূর্তেই ভুটানঘাটের প্রেমে পড়তে বাধ্য করবেই। তবে বনদপ্তরের নিজস্ব অনুমতি ছাড়া ঢোকা বারণ এই পথে। কারণটি রাজনৈতিক। তাই বিস্তৃত ব্যাখ্যায় না যাওয়াই ভাল। 


















তুরতুরি চা-বাগানের কাছে ভাগ হয়ে যাওয়া রাস্তায় বাঁ হাতে গেলে হাতিপোতা। ছোট্ট গঞ্জ। আরণ্যক। একটি মন্দির, ছোট্ট বাজার, ছোট্ট জনবসতির হাতিপোতাকে দেখে মনে হবে, শহর থেকে সত্যিই যেন অনেক দূরে চলে এসেছি। বাজার এলাকায় ঢুকতে হলে পাকা রাস্তা থেকে ডান হাতে ঢুকতে হয় সামান্যই। তা না করে সোজা এগোলেই  চা-বাগান শুরু। দু'পাশে চা- বাগান আর গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি মারা দূরের পাহাড়ে ততক্ষণে মনে বেশ রোমাঞ্চের ছোঁওয়া। এস এস বি ক্যাম্পের কোয়ার্টার্সের পাশ দিয়ে সোজা এগোলে দেখা মেলে টুরিস্ট লজের। লজের সামনেই ঝকঝকে সুউচ্চ ভুটান পাহাড়। প্রাকৃতিক দৃশ্য অসামান্য।

টুরিস্ট লজে না গিয়ে সোজা এগোতে থাকলেও কোন অসুবিধে নেই। তরঙ্গায়িত পথ, রায়ডাক, জয়ন্তী নদীর  শুকনো খাত (অবশ্যই বর্ষাকাল বাদে), জঙ্গল, পাহাড় আর ফাসখাওয়া চা-বাগানের অসাধারণ সৌন্দর্যে পাগল পাগল, কেবল চলতেই ইচ্ছে করবে। এ ভাবেই এগোতে এগোতে একসময় ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে শুনশান অন্ধকার মাখা পথ অতিক্রম করে পৌঁছে যাওয়া যায় জয়ন্তী নদীর ধারে জয়ন্তীর টুরিস্ট লজ ও জনপদের বিপরীত প্রান্তে। তবে ওই পথ আজ বন্ধ। অরণ্য এখানে দূর্ভেদ্য। মিলে যেতে পারে হাতি থেকে শুরু করে অন্য বন্যপ্রাণী। পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা জয়ন্তী চা-বাগানও এই এলাকায়। অপূর্ব সুন্দর সে বাগান। সৌন্দর্যে উত্তরের অন্যতম সেরা চা-বাগান। হ্যাঁ, সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা-বাগানকে মনে রেখেও বলছি পাহাড়ের ঢালের জয়ন্তী চা-বাগান টি ট্যুরিজমের অন্যতম সেরা বাজি হতে পারে।    
শামুকতলা থেকে অন্য একটি পথ গেছে মহাকালগুড়ি হয়ে ছিপরা বা চিপরাতে। রায়ডাক রেঞ্জের এই অরণ্যও আদিম। ভুটানের ওয়াং চু বঙ্গদেশে রায়ডাক নামে পরিচিত। আর নদীর নামেই বিস্তার এই অরণ্যভূমির। ডুয়ার্সের পরিচিত সব ধরনের বৃক্ষ মেলে এখানে। রয়েছে বেশ কয়েকটি বনবস্তি এবং রাভা-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনজাতির আবাস। বনচরদের মুক্তভূমি রায়ডাক। হাতি তো আছেই, দেখা মেলে বাইসন, হরিণ, বুনো শুয়োর-সহ নানা প্রাণীর। লালমুনিয়া, টিয়ে, কোয়েল, শ্যামা, ফিঙের ডাকে কেটে যায় সারাদিন। চারদিকের সবুজ চোখকে দেয় প্রশান্তি আর রায়ডাকের মৌনতা কেবল স্তব্ধই করে। ছিপরা-সহ সমস্ত রায়ডাক ডুয়ার্সের এক অনন্য সম্পদ। রায়ডাকের মোহিত করা সৌন্দর্য, নিস্তব্ধতার মধ্যে অসংখ্য বলে দেওয়া কথা রায়ডাককে ভালবাসায় কেবল। বক্সা অভয়ারণ্যের  ছিপরা রেঞ্জ যাওয়া যায় মহাকালগুড়ি হয়েও। গাছগাছালি-ছাওয়া মহাকালগুড়িতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রাধান্যই বেশী। দু'টি চার্চ, দু'টি বিদ্যালয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গ্রামটি এক নজরেই ভাল লেগে যায়। বড়দিনে সেজে ওঠে পুরো গ্রাম। প্রায় সব বাড়ির সামনেই দেখা যায় খ্রিস্টমাস ট্রি।

সবশেষে সিকিয়াঝোরা। নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো নিজের মতো। কিন্তু সে আর আলাদা কী! আছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মতো সিকিয়াঝোরাতেও দুপাশের গাছেরা প্রায় নদীর বুকে নেমে এসেছে। যত চলা যায় উজানে তত জঙ্গল ঘন হয়। কপাল ভাল থাকলে সে জঙ্গলে দেখা মিলতে পারে বনচরদের। তবে স্থানীয় মানুষেরা যেভাবে বাঘ দেখা যায় বলে দাবি  করে,তেমনটা কিছুই নয়। কিন্তু নদীর বুকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা নিঃসন্দেহে মনে করিয়ে দেবে সুন্দরবন বা আন্দামানের বারাটাংয়ের লাইমস্টোন কেভ দেখতে যাওয়ার কথা। অত্যন্ত ছোট হলেও উত্তরের নিজস্ব। সেটুকু বা কম কীসে! 

আসলে আলিপুরদুয়ার জেলার ডুয়ার্স অঞ্চলের মধ্যে বক্সা-জয়ন্তী যতটা পরিচিত ঠিক ততটা নাম করে উঠতে পারেনি এই অঞ্চলগুলি। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তারা কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। বরং লাটাগুড়ি, ঝালং, জয়ন্তীরর মতো কোলাহল নেই এখানে। তুলনায় ভিড় কম। ইদানিং সিকিয়াঝোরা কিছু টুরিস্ট টানছে। কিন্তু ট্রাভেলার বা পর্যটকের বড্ড অভাব যেন! ফলে কাঙ্খিত সমীক্ষা থেকে যেন অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে তারা। বক্সা-জয়ন্তীর ওপার অপার সম্ভাবনা নিয়ে উন্মুক্ত সকলের জন্য আজও তাই।      

     
(প্রকাশিত: ফুলেশ্বরী নন্দিনী, ২০২৩)
 

No comments: