Sunday, January 12, 2025


 

কচ্ছ দেখেননি? কিছুই দেখেননি....
শৌভিক রায়

'যখন পাসপোর্ট ভ্যালিড ছিল, তখন কেউ ডাকেনি। এখন সবাই ডাকে। কিন্তু বিদেশ যাত্রার ধকল এই বয়সে সম্ভব নয়', বললেন পদ্মশ্রী আব্দুল গফুর খেতরি সাহেব।
বসে আছি নিরোনা গ্রামে। খেতরি সাহেবের দৌলতে কচ্ছের এই গ্রামের নাম প্রায় সবাই জানে। পার্সিয়ান শৈলীর রোগান শিল্পের একমাত্র ধারক তিনি। আটশো বছর ধরে বংশপরম্পরায় তাঁদের পরিবার শিল্পটি বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হাতেও খেতরি সাহেবের শিল্প তুলে দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বের আরও বহু জায়গায় তাঁর শিল্প শোভা পাচ্ছে।
কচ্ছে আসার পথ মনে রাখার মতো। আহমেদাবাদ থেকে দীর্ঘপথে কার্পাস খেত, উইন্ডমিল, বিচ্ছিন্নভাবে সাদা হয়ে থাকা প্রান্তর আর ছোট বড় নানা শিল্পের সমাবেশ দারুন লাগছিল। তবে সানন্দে টাটার ন্যানো কারখানা দেখে মন একটু খারাপ হল বৈকি!
ভুজে পৌঁছালাম সন্ধ্যাবেলায়। কতবার ভূমিকম্পের শিকার হয়েছে এই শহর! তবু জীবন থামেনি। ২০০১ সালের সেই ভয়ানক ২৬ জানুয়ারির পর ভুজের এখন নতুন রূপ। সেই প্রবল বিপর্যয়ের স্মৃতি নিয়ে স্থাপিত স্মৃতি ভবন আধুনিকতার সঙ্গে অতীতের এক অসামান্য মেলবন্ধন। রোমাঞ্চিত হতে হয় সেটি দেখে। কচ্ছ মিউজিয়ামেও তারই ছাপ। তবে সেখানে কচ্ছের জনজীবন আর হস্তশিল্পের বিস্তারিত বিবরণ দেশের এই এলাকাকে জানবার জন্য যথেষ্ট। শহরের মাঝে হামিসার লেকের ধারের প্রাগ আর আয়না মহল কচ্ছের রাজকীয় অতীতের অসামান্য এক নিদর্শন। আভিজাত্য, বিত্ত আর রুচির এরকম মিশেল অবশ্য ভারতের বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে রয়েছে। তবে প্রাগ মহলের ইউরোপিয়ান শৈলীর স্থাপত্য নজরকাড়া। দ্রষ্টব্যগুলিও অন্য ধরণের।
ভুজ থেকে কিমি ষাটেক দূরের মান্ডবীর বিজয়বিলাস প্যালেসও অনবদ্য। হিন্দি ফিল্মের দৌলতে অনেকেই অবশ্য জানেন এর কথা। আগেই দেখে নিয়েছিলাম বাহাত্তর মন্দিরের জৈনালয়া আর শ্যামজি কৃষ্ণ ভার্মা মেমোরিয়াল। তবে মান্ডবি আমার কাছে আলাদা হয়ে রইল জাহাজ তৈরির জায়গা হিসেবে। কিছুটা জানা থাকলেও, মালয়েশিয়া থেকে নিয়ে আসা কাঠে এভাবে জাহাজ তৈরি করা দেখব ভাবিনি কখনও। এ এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। তবে সূর্যাস্ত বাদে এখানকার সৈকত সাধারণ বলেই মনে হয়েছে।
সবটাই অসাধারণ হয়ে গেল ধোরঢো আর ধোলাভিরায় এসে। ধোরঢো বিখ্যাত তার সাদা রনের জন্য। ধু-ধু এই প্রান্তরে কোনটা আকাশ আর কোনটা জমি বোঝা কঠিন। কপাল ভালো থাকায় ফ্লেমিঙ্গো আর বেলেহাঁসদের দেখাও মিলল। আসলে থর মরুভূমির বর্ধিত এই দক্ষিণ অঞ্চল প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি। লবণের এরকম বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর কোথাও নেই। অন্যদিকে, ধোলাভিরা ইতিমধ্যেই ইউনেসকোর হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পেয়েছে। এখানেই রয়েছে হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম বৃহৎ ধ্বংসাবশেষ। না দেখলে বোঝা যায় না সেই সময় কতটা উন্নত ছিল মানুষের জীবনযাত্রা। এখানকার ফসিল পার্ক একদম রন অফ কচ্ছ লেকের পাশে। সানসেট পয়েন্টটিও নজরকাড়া। সূর্যাস্তের আলোয় সাদা রনের মুহুর্মুহ রং পরিবর্তন যে কী অসাধারণ তা লিখে বোঝানো যায় না। ধোলাভিরা পৌঁছনোর পথেই কর্কটক্রান্তি রেখা পেরিয়ে আসাটাও উল্লেখ করতে হয়।
ধোলাভিরার আর একটি পালক হল তার রোড অফ হেভেন। লেকের মাঝখান দিয়ে তৈরি হয়েছে পাকা রাস্তা। দুই দিকে টলটলে জল আর রন নিয়ে এই পথ তুলনাহীন। এর টান উপেক্ষা করা যায় না। দিনে তো অবশ্যই, পূর্ণিমার রাতেও বিশেষ অনুমতি নিয়ে প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ কিমির রাস্তা নৈশবিহার করা করলাম। নেমে পড়লাম রনে। চাঁদ সাক্ষী, এরকম অভিজ্ঞতা জীবনে কোনও দিন হয়নি।
কচ্ছের সবচেয়ে উঁচু জায়গা কালা ডুঙ্গার থেকে পাকিস্তান বর্ডার দেখবার বৃথা চেষ্টা করলেও, ম্যাগনেটিক জোনে আপনাআপনি গাড়ি চলতে দেখে সত্যিই বোকা হয়ে গেলাম। কী অদ্ভুত কাণ্ড! একসময় এই রাস্তা দিয়েই প্রতিবেশী এলাকার সঙ্গে ব্যবসা চলত। দেশ তখন ভাগ হয়নি। আজ অবশ্য আলাদা কথা। এখানকার সানসেট পয়েন্ট থেকে সূর্যাস্ত দেখা এক বিরল পাওনা। উঁচুনিচু পাহাড়, পাতা দিয়ে ছাওয়া গোলাকৃতি কচ্ছি বাড়ি আর নিজস্ব পোশাকের রঙিন মানুষ নিয়ে এই অঞ্চলটি ভাল লাগবেই।
অজস্র গ্রাম ছড়িয়ে কচ্ছ জেলায়। প্রত্যেকেই মোটামুটি প্রসিদ্ধ নিজেদের হস্তশিল্পের জন্য। বান্নি এলাকার এই গ্রামগুলিতে পরিবারের সংখ্যা কোথাও পঁচিশ, কোথাও দশ। কিন্তু তার মধ্যেই গড়ে উঠেছে আজরক, মুশরু, বাঁধনি, ব্লক প্রিন্ট ইত্যাদি সব নানা শিল্প। কেউ কেউ আবার বান্নি এলাকায় অস্থায়ীভাবে পশুপালন নিয়েই রয়েছে। ভুজৌদি, গান্ধি নাগাঁও, ধামারকা, ভিরানদিয়ারা, খভরা ইত্যাদি নানা গ্রামের মধ্যে আলাদা করে নজর পড়ে মাধাপারে। ভারতের অন্যতম ধনী গ্রাম এটি।
কচ্ছের মতো বৈচিত্র্য সারা দেশে বিরল। লবণের মরুভূমি, পাহাড়, সমুদ্র, রকমারি খাবার আর অতি অবশ্যই দুর্দান্ত মানুষজন নিয়ে কচ্ছ নিঃসন্দেহে পর্যটনের অন্যতম সেরা ঠিকানা।
(প্রকাশিত: রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ জানুয়ারি ১২, ২০২৫)
* ছবি- শৌভিক রায়

No comments: