Thursday, May 30, 2024

ছায়া দীর্ঘ হয় কেবল

শৌভিক রায় 


ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সব সাধনাই নিভৃতের বিষয়। 


কিন্তু সাধনা ব্যাপারটি আসলে ঠিক কী? আপাতভাবে বিষয়টি আপেক্ষিক মনে হলেও, একটু ভাবলেই বোঝা যায় কর্ম-ই আসলে সাধনা। ভারত সহ সমগ্র বিশ্বের মাগদর্শীরা বিভিন্ন সময়ে এই সত্যটি শিখিয়ে গেছেন মানব সমাজকে। 

কিন্তু আজকের দিনে 'নিভৃত' ব্যাপারটি আদৌ সম্ভব কি? তথ্য প্রযুক্তির এই বিস্ফোরণের যুগে যেখানে মানুষের শয়ন কক্ষটিও আজ যে কোনও মুহূর্তে 'ওপেন' হয়ে যেতে পারে, সেখানে নিভৃতে কিছু করা সম্ভব? বিশেষ করে যিনি নিভৃত সাধনাটি করছেন, তিনি যদি কেউকেটা হন তাহলে বোধহয় আরও সম্ভব নয়।

কিন্তু সমস্যা হল, সমস্যা এখানে নয়। সমস্যা অন্যত্র। সেটি লুকিয়ে ব্যক্তিটির সদিচ্ছার ওপর। সেই সদিচ্ছটা কী? না জানানোর। না দেখনদারির। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার পাওয়া গেলেও, লোকের নজর টানা গেলেও, বহুজনের বাহবা কুড়োনো গেলেও আর যা হোক সাধনা হয় না। 

আধুনিক কবিতার অন্যতম দিকপাল এলিয়ট বলেছিলেন, The birth of a poetry is like a birth of a baby। একটি কবিতার জন্ম দিতে গিয়ে কবিকে সেই যন্ত্রণা পেতে হয়, যা একজন মা পান সন্তানকে ভূমিষ্ঠ করতে গিয়ে। কবিতা একটি সাধনা। তাই এই সত্যটি যেমন তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তেমনি একইরকম ভাবে কথাটি প্রযোজ্য কোনও সাধনার ক্ষেত্রেই।

এই যন্ত্রণায় যাঁদের উত্তরণ ঘটে, তাঁদের দীর্ঘ ছায়া দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের শীতল করে। আমরা বুঝি না। কেননা দীর্ঘ অভ্যাসে সেটি আমাদের স্বাভাবিক বলে মনে হয়। বোঝা যায় যখন সেই ছায়া আমাদের অপগণ্ডতার জন্য যখন সরে যেতে শুরু করে। যেদিন সম্পূর্ণ সরে যাবে হয়ত সেদিন বুঝব কী ভুলটাই না করেছিলাম!

আপাতত তাই জিতে যাচ্ছে কপটতা। জিতে যাচ্ছে তীব্র হাততালি। জিতে যাচ্ছে উল্লাস। জিতে যাচ্ছে মিথ্যাচার। 

কিন্তু মনে রাখা দরকার, ছায়া সরে গেলেও মিলিয়ে যায় না। আকাশ মেঘে ঢাকা হলে ছায়া দেখা যায় না। কিন্তু মেঘ একটা সময় কেটে যায়। ঝলমলে রোদ ওঠে। 

যত তীব্র রোদ, তত গাঢ় ছায়া..... 

(নিজের ভাবনায়)

Thursday, May 23, 2024

 স্যালুট 

শৌভিক রায় 

ট্র্যাফিক পুলিশ আমাকে স্যালুট ঠুকছে! একি কাণ্ড! ঠিক বুঝতে পারছি না কী করব। বোকা বোকা হাসলাম। 
ততক্ষণে লোকটি গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে গদগদ মুখে বলছে,
- কাভানামাকেই ইরুনকাই সা। উনকালেই শান্তিত্তাতিল মিক্কা মাগেচেই।  

পুরোটাই উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে। আমার মাথায় চুল নেই বলে সেই ওড়াটাও সম্ভবত নর্মাল স্পিডের চাইতে আরও একটু দ্রুত হল। 
আবার বোকার মতো হাসলাম। সঙ্গে সঙ্গে আবার ঠকাত করে স্যালুট। খারাপ কিছু হচ্ছে না বুঝে, মুখটা গম্ভীর করে মাথাটা নাড়লাম। কানে এলো, 
- ভেলুর পকুমপতে শান্তিপম সা ডক্টর 

কোনও এক্সপ্রেশন দেওয়ার আগেই শিবা গাড়ি চালিয়ে দিল। 
ততক্ষণে টোল গেটের স্পিড ব্রেকার সরে গেছে। শিবার ফাইভ গিয়ার অ্যাম্বাসডর সাঁ করে এগিয়ে গেল। 
সামনেই সাইনবোর্ড, `ওয়েলকাম টু তামিলনাড়ু`।   
 
ভেলোর থেকে বেরিয়েছিলাম দিন সাতেক আগে। শিবাকে নিয়ে। সেই সময় ভেলোর আমার দ্বিতীয় বাড়ি। বছরে একবার তো বটেই, কোনও কোনও সময়ে দু`বারও যেতে হয়। ভেলোর না গেলে বাঙালি হওয়া যায় না তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ আমি। খ্রীষ্টান মিশনারি কলেজ এন্ড হসপিটালের উল্টো দিকের গান্ধি রোডের ডন বেকারির মালিক থেকে শুরু করে আপ্পাজি, ভেলমুরুগান এরকম বেশ কিছু স্থানীয় মানুষের বন্ধু হয়ে গেছি। শিবা আমার ড্রাইভার। ওর নিজের গাড়ি আছে। হসপিটালে দেখানোর ফাঁকে ফাঁকে ওকে নিয়ে এদিক ওদিক চলে যাই। সেবার একটু সময় নিয়ে গিয়েছিলাম উটি-মুদুমালাই-বন্দিপুর-মাইশোর-শ্রাবনবেলগোলা-হ্যালোবিদু-বেলুড়-ব্যাঙ্গালোর। 

ব্যাঙ্গালোর থেকে ফেরার সময় শিবা সদ্য হওয়া ফোর যেন ধরল না। ওল্ড মাদ্রাজ রোড ধরে চলল। মাঝে থামলো কোলারে। খানিকক্ষণ আমাদের বসিয়ে রেখে নিজে ভ্যানিশ। ওদিকে কোলারে এসে আমি উত্তেজিত। খনি খুঁজছি শুধু। জন্মানো ইস্তক পড়ে এসেছি কোলার স্বর্ণখনি।  

খনি টনি অবশ্য কিছু দেখলাম না। তবে দূরে মাটির ঢিবি দেখে নিজেই ভেবে নিলাম ওগুলোই হবে। তখন কোথায় আর কেজিএফ পার্ট ওয়ান পার্ট টু! বীরাপ্পন কিছুদিন আগে কন্নড় ছবির সুপারস্টার রাজকুমারকে পণবন্দি করেছিল। তারই রেশ রয়ে গেছে। 

ফিরে এসে শিবা জানালো বোনের সঙ্গে দেখা করে এলো। জল দেওয়া ভাত খেয়ে এলো। চেঁচামেচি করলাম। আমাদের ফেলে খেয়ে এসেছে বলে। প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে ওকে। 

করল সেটা শিবা। কোটিলিঙ্গেশ্বরম মন্দির দেখিয়ে। ছোট-মাঝারি-বড়-দৈত্যাকার এত সংখ্যক শিবলিঙ্গ আমার ঊর্ধতন চতুর্দশ পুরুষ পর্যন্ত কেউ দেখেনি সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। ভালই লাগল। নতুন জায়গা দেখা সবসময়ের নেশা। শিবা সেটা খুব ভালভাবে জানে। সুতরাং আমাকে ম্যানেজ করতে ওর বেশি সময় লাগে না.... 

ইতিমধ্যে কর্ণাটক ছেড়ে তামিলনাড়ুতে ঢুকেছি। ভেলোর খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু এই কেসটা কী হল? ট্রাফিক পুলিশ আমাকে দেখে আজ অবধি চালান কাটা ছাড়া কিছু করেনি, হঠাৎ স্যালুট দিতে গেল কেন? আর নিজের ভাষায় বললটা কী? চেপে ধরলাম শিবাকে। এবার শুরু হল ওর স্বীকারোক্তি। আমারই মতো মারাত্মক হিন্দিতে,
- আপকো স্যালুট কিয়া না?
- হাঁ....কিয়া। তো?
- আপ খুশ নেহি হুঁয়ে!
- আরে স্যালুট করলে কে না খুশ হুয়ে, এ তো আবার পুলিশ হ্যায়...
- ওহি তো। 
- আরে ধুত্তোর তোমার ওহি তো। কেসটা কও তো। 
- জি?
- আরে কেস কী? স্যালুট কিঁউ কিয়া ও পুলিশওয়ালা?
- ডক্টর কো তো করতে হ্যায় সবলোগ 
- কোন ডক্টর?
- আপ
- আমি! ম্যায়!
- বিলকুল আপ 
- পাগল নাকি! 
- নেহি নেহি শুনিয়ে। কেয়া হ্যায়, ও যো ফোর লেন হ্যায়, উধার যানে সে টোল ট্যাক্স জাদা হ্যায়। ওল্ড মাদ্রাজ রোড মে এক হি টোল হ্যায়। বর্ডার মে। তো ম্যায়নে ট্রাফিক কো বতায়া আপ সিএমসি কে ডক্টর হ্যায়। ট্যাক্স নেহি লিয়া। ছোড় দিয়া আয়সেই!
- ডক্টর!! ম্যায়!!
- লাগতে হো না দাদা। বাল নেহি হ্যায় না আপকা। ডক্টর কি তারহা দেখতে হো না!

বোমকে গেলাম। এ বলে কী! একবারে ডাক্তার বানিয়ে ছেড়েছে! তাও ভেলোর সিএমসির! এবার সত্যিই কেস না খাই। রিয়ার ভিউয়ে দুশ্চিন্তায় ভরা আমার মুখ দেখে শিবা অভয় দিল,
- ডড়িয়ে মত দাদা। ও পুলিশ বোলা না আপ কো দেখ কে খুশ হুয়া। ভেলোর আনে সে আপকে সাথ মুলাকাত ভি করেগা। 

হা হা করে হাসব নাকি রেগে অগ্নিশর্মা হব বুঝতে পারলাম না। কেমন একটা অবস্থা হল। উদাস হয়ে তাকিয়ে রইলাম বাইরে। এই তামিলনাডু, কোলার, হ্যালোবিদু, কুব্বন পার্ক, পান্তাভাত, ডাক্তার, চুল......আহা জীবন! স্যালুট, পুলিশ, বীরাপ্পন, গোঁফ, টাক মাথা....হায় জীবন....  

দুম করে মাথায় ভাবনা এলো। একটা স্টেথো কিনে গলায় ঝুলিয়ে যদি যখন খুশি হসপিটাল যাই, তাহলে সিকিউরিটিকে আটকাবে না! ডাক্তার ভেবেই ছেড়ে দেবে হয়ত। কথাটা গিন্নিকে বলব ভেবে মুখ ফেরাতেই তিনি চোখ পাকিয়ে উঠলেন,
- না।  একদম না। ওসব ভাববে না। কখনই না। 

ধুস! কিছুই বললাম না তার আগেই এত `না`! 
তার চাইতে ওই পুলিশ মানুষটিই ভাল। 
আহা স্যালুট....বাহা স্যালুট....    
   
(বোকামির এককাল)
   

Wednesday, May 15, 2024

আয়নায় দেখি মুখ বদলে গেল কেমন 

শৌভিক রায় 


আমাদের সময়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবর্ষ এক বছর দেরিতে চলছিল। ফলে এম এ পাস করে বি এড ট্রেনিং নিয়ে চাকরি পেতে পেতে, আমাদের অনেকের বয়স সাতাশ ছুঁই ছুঁই হত। তবে আমাদের একটি ভরসা ছিল, এম এ বি এড ডিগ্রি থাকলে মোটামুটি চাকরি একটি পাব। 
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই চাকরি হত শিক্ষকতার। আর কোনও বিকল্পও ছিল না। রাজ্যের অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, সে যুগেও এই উত্তরে চা ছাড়া আর কোনও শিল্প ছিল না।  সেই সময় অবশ্য চা শিল্পও ধুঁকছে। লক আউট, মালিক পক্ষের চা বাগান ছেড়ে চলে যাওয়া ইত্যাদি ছিল নিত্য ঘটনা। ফলে, এম এ বি এড পাস করা মানে মোটামুটিভাবে শিক্ষকতার খাতায় নাম লেখানো। 

যারা শিক্ষকতায় আসতে চাইত না, তারা গ্রাজুয়েট হয়েই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলি দিত। অনেকে এম এ পড়তে পড়তেও সেগুলি টকাটক পাস করে যেত। আমাদের আনন্দ হত, আবার ঈর্ষাও হত। তবে ভরসা ছিল চাকরি আমাদেরও হবে। হতও। যতদূর জানি, আমাদের সময়ে পাস করা বন্ধুরা, মোটামুটি চার পাঁচ বছরের মধ্যে, চাকরিতে ঢুকে গিয়েছিল সবাই। 

আমি নিজে যখন চাকরিতে ঢুকি, তখন আমার বয়স সাড়ে পঁচিশ। মনে আছে, আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন অধ্যাপক গুরুপদ দেব ও অধ্যাপক অম্লানজ্যোতি মজুমদার। দুজনেই কোচবিহারের জাঁদরেল ইংরেজির শিক্ষক। ক্লাস প্রেজেন্টেশন শেষে ভাইবাতে বিকেল চারটা দশ থেকে পাঁচটা অবধি ওঁরা ইংরেজি সাহিত্যের পুরো পরিক্রমা করিয়েছিলেন আমাকে। চাকরিটা অবশ্য হয়েছিল। বেসিক ছিল ১৭৮০ টাকা। গ্রস স্যালারি ৩০০০ টাকার একটু বেশি বা কম। তখনও 'আচ্ছে দিন' আসেনি। ফলে মুদি দোকানে তিন চারশ টাকায় মাসের মাল হয়ে যেত। সবজি, মাছ, বাড়ি ভাড়া (তখনও কোচবিহারে আমার নিজের বাড়ি হয়নি) ইত্যাদি খরচের পর সামান্য যে পয়সা থাকত, সেটা দিয়ে ঘরের জন্য কিছু কিনলে নিজেকে রাজা বাদশা মনে হত।

১৯৯৬ সালের সেই সময় আর আজকের দিন! বেতন বেড়েছে। পরিচিতি আর বয়সও বেড়েছে। কিন্তু এখন যত অসহায় লাগে, তেমনটি আর কোনোদিন লাগেনি ! অথচ আগের তুলনায় সামাজিকভাবে অনেক ভাল আছি হয়ত বা!

আমাদের ব্যাচমেট, সহকর্মী প্যারা-টিচার, দুপুরে বলছিল, "আর কোর্ট! টেট পাস করেছি সেই কবে। হবে হচ্ছে করে করে রিটায়ারমেন্টের সময় হয়ে এল। অন্যান্য রাজ্যেও প্যারা টিচারদের এই হাল নয়, যা আমাদের এখানে।"

তবু ওর কিছু অন্তত আছে। কিন্তু যে প্রজন্মগুলো পর পর শেষ হয়ে গেল! তাদের কি কিছু যাবে আসবে? যে প্রিয় প্রাক্তন ছাত্রটির চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করতে পারিনা "কেমন আছিস", তার কী যায় আসে কোটি কোটি টাকা পাওয়া গেলে! 

যারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নিজেদের দাবিতে খোলা আকাশের তলায় পড়ে রয়েছে, তাদের জন্যই তো এডওয়ার্ড থমাসের সেই প্যাঁচা আজও ডেকে চলেছে! আমরা বধির হয়েছি বলেই বোধহয় শুনতে পারিনা সেটা! এই দমবন্ধ করা পরিবেশের জন্য কি আমরা একদিন স্বপ্ন দেখেছিলাম!!

মোটামুটি স্বচ্ছল বেতনের একজন সরকারি বা বেসরকারি চাকুরে সারা জীবন নিজেকে নিংড়ে দিয়েও, অবসরের সময় যে পয়সা পান, তা দিয়ে কোচবিহারের মতো শহরেও তিন কাঠা জমি কেনা যায় না। মেগা সিটি তো বাদই দিলাম। তবু আমরা তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। নিজেদের ওপর আমাদের সেই আস্থা আছে যে, কোনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করিনি। সেটাই আমাদের জীবনীশক্তি। কিন্তু আমাদের সেই অহংকারকে আজ একদম শেষ করে দিল কিছু ঘটনা পরম্পরা! এটাই কি আমাদের পাওনা ছিল? কে এই অধিকার দিল আপনাদের?

এই লেখা পড়ে অনেকে কোনও একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধে আমাকে হয়ত বেঁধে ফেলবেন। না। আমি কোনও রাজনৈতিক দলের নই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়ের প্রবল প্রতাপশালী শাসকদের বিরুদ্ধে গিয়ে হাজতে পর্যন্ত ঢুকেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলাম সেদিনও, আজও আছি। থাকবও। সাধারণত এই জাতীয় লেখা লিখতেও পছন্দ করি না। লিখিও না। কিন্তু লিখতে বাধ্য হচ্ছি আজ। ওই সময় ওটা হয়েছিল, সেটা হয়েছিল, ওই রাজ্যে এটা হয়, সেটা হয়, চক্রান্ত করা হয়েছে ইত্যাদি যে যা খুশি বলতে পারেন, আজ কোনও যুক্তিই শুনব না।

এটা মানা যায় না। মানবও না। জানি বিরুদ্ধ  শক্তির বিপরীতে ক্ষমতা আমার কিছুই নেই। তবু বলব। এই বলাটাই আমার কাজ। হয়ত এটাই ক্ষমতা.....

প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা
সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব

Sunday, May 12, 2024

মায়ের সঙ্গে নার্সেরাও আজ  
শৌভিক রায় 

মাতৃ দিবস! 

আলাদা করে পালন করার কী আর আছে? অনেকেই বলবেন। কিংবা বলেন। 

সত্যিই তো। মা-কে ভালবাসবার জন্য কী আলাদা কোনও দিন লাগে? সে তো বোন বা ভাইয়ের ক্ষেত্রেও সত্যি। কিন্তু তবু তো রাখি পূর্ণিমা, ভাইফোঁটা ইত্যাদি করে থাকি আমরা। কেন করি? না করলে কি ভাই-বোনের স্নেহের সম্পর্ক কমে যাবে? নিশ্চয়ই না। তবু আমাদের পরম্পরায় এসব রয়েছে। গুরু পূর্ণিমাও রয়েছে। শিক্ষক দিবসও আছে। 

সেরকমই কোনও জায়গা থেকে যদি মায়ের জন্য আলাদা করে একটা দিন রাখা যায় মন্দ কি তাতে! মা তো আমাদের অন্তরেই থাকেন। সবসময়। থাকবেনও। তবু যদি মা`কে নিয়ে একটা দিন যদি একটু কিছু আলাদা করা হয়, তাতে আমি অন্তত খারাপ কিছু দেখি না। 

আধুনিক মাতৃ দিবস শুরু হয়েছিল ১৯০৭ সালের মে মাসের ১২ তারিখে। ফিলাডেলফিয়ার আনা জারভিস ছিলেন এর স্রষ্টা। আনার মা ছিলেন দক্ষ সংগঠক। তিনি মহিলাদের বেশ কয়েকটি গ্ৰুপ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বন্ধুত্ব ও উন্নত স্বাস্থ্যের প্রচার। সেই মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জন্য ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের এক চার্চে একটি বিশেষ প্রার্থনা সভা রাখেন আনা। তিনি হয়ত নিজেও বোঝেননি, তাঁর আয়োজিত এই প্রার্থনা সভা সাধারণ মানুষকে কতটা প্রেরণা দিয়েছিল। কেননা পরবর্তী পাঁচ বছরে আমেরিকার প্রায় প্রতিটি স্টেটে মা`কে স্মরণ করে এরকম প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হতে লাগল। সাধারণ মানুষের মায়ের প্রতি এই সম্মাননা দেখে ১৯১৪ সালে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন দিনটিকে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করলেন। 

আনা এই দিনটিতে সাদা পোশাকের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু যে মায়েরা বেঁচে আছেন তাঁদের জন্য গোলাপি বা লাল পোশাক পরাই এখনকার রীতি। আর শুধুমাত্র নিজের মায়ের জন্য নয়, দিনটি উদযাপিত হয় মায়ের জায়গা নিয়েছেন এমন যে কোনও মহিলার জন্য। তিনি ঠাকুমা, দিদিমা, কাকিমা, পিসিমা, মাসিমা যে কেউ হতে পারেন। একদম ব্যক্তিগত স্তরে থাকা দিনটিকে আমেরিকানরা অবশ্য কার্ড, ফুল ইত্যাদি পাঠিয়ে ব্যবসায়িক রূপ দিতে দেরি করেনি। সেটাও এতটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যে, স্বয়ং আনা নিজে জীবনের শেষদিকে চেয়েছিলেন এই দিনটিকে যেন জাতীয় ছুটির মর্যাদা দেওয়া না হয়। 

ঘটনা হল, মাতৃ দিবসের ভাবনা কিন্তু আজকের নয়। ধরিত্রী মা রিয়া এবং সিবিলকে পুজোর মাধ্যমে প্রাচীনকালে গ্রিক ও রোমানরা এই দিনটির উদযাপন করতেন। উর্বরতা এবং মাতৃত্বের সেই উৎসব বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হত। বর্ষা ঋতুতে আমাদের অম্বুবাচি পরবের সঙ্গে কোনও মিল কি পাওয়া যাচ্ছে প্রাচীন গ্রিস ও রোমের এই উৎসবের? অম্বুবাচিও তো মাতৃ পুজোর একটি বিশেষ ধারা। 

ষোলশো শতকে ইংল্যান্ডে `মাদারিং সানডে` চালু হয়। কাছের চার্চে পরিবারের সবাই একত্রিত হত। প্রার্থনার পর মায়ের হাতে ফুলে তুলে দিত শিশুরা। এই দিনটির সঙ্গে অবশ্য মাদার্স ডে-কে মেলালে চলবে না। কেননা এটি হয় লেন্টের চতুর্থ রবিবারে। প্রশ্ন হল, লেন্ট কী? লেন্ট হল চল্লিশ দিনের সেই বিশেষ দীর্ঘ সময় যখন ক্রিষ্টানরা জিশুর মৃত্যু সহ, তাঁর পুনরোজ্জীবন সহ বিভিন্ন ঘটনার কথা স্মরণ করে। `লেন্থেন` বা দীর্ঘ শব্দটি থেকে `লেন্ট` এসেছে। সম্ভবত এই আমায় থেকে দিন বড় হতে শুরু করে এবং গ্রীষ্মের দিকে এগোয় বলেই এই লেন্থেন বা লেন্ট। এই সময় ক্ষমা ও দানের কথা বলে। জীবনের গুরুত্ব বোঝায়। লেন্টের একদম শেষ পর্যায়ে আসে ইস্টার। এই বছর সেই মাদারিং ডে কিন্তু ইংল্যান্ডে মার্চের ১০ তারিখে উদযাপিত হয়েছে। 

পাশাপাশি আজ কিন্তু আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। ১৮৬০ সালে লন্ডনে প্রথম নার্সিং স্কুলটি গড়ে তুলেছিলেন `লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প` ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। নার্সদের সেবা সম্পর্কে নতুন কিছু বলবার আছে কি? এক অর্থে তাঁরাও তো মা। তাঁদের নিরলস সেবা রোগীকে যে প্রশান্তি দেয়, তা আর পাই কোথায় আমরা? মায়ের স্নেহ আঁচল আর বাবার মমতার পরেই বোধহয় আসেন নার্সরা। স্যালুট তাঁদের।    

ইতিহাস, স্মরণ, উদযাপন,ব্যবসা  ইত্যাদি সবকিছু মিলেমিশে রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃ ও নার্স দিবসকে ঘিরে। কে কীভাবে নেবেন সেটি তার নিজস্ব। 

আমি শুধু জানি, মায়ের জন্য নিত্যদিনের স্মরণে যদি একটি দিন একটু অন্যভাবে পালিত হয়, তাতে কিছু যায় আসে না। বরং কুসন্তানেরা যদি এই দিবসের ছলে একটিবার হলেও মায়ের কথা ভাবে, তাহলে তার কু-বৃত্তি কিছুটা হলেও কমে। কেননা মা তো সন্তানের ক্ষেত্রে সর্বংসহা, পরম ক্ষমাদাত্রী। তিনি ওই ভাবনাটুকু পেয়ে ভুলে যান সব অবহেলা, অপমান। একইভাবে রোগশয্যায় যখন `পেশেন্স` বা ধৈর্য্য হারিয়ে একজন `পেশেন্ট` বা রোগী নার্সের ওপর কুবচন বা কুব্যবহার করেন, তিনিও হয়ত আজ আমাদের সামান্য উষ্ণ ব্যবহারে ভুলে যান তাঁর কাজের বিড়ম্বনাময় পরিস্থিতি। নতুন উদ্যমে আবারও নামেন সেবা কাজে।  

তাই মাতৃ দিবস অবশ্যই আলাদা। তাই সেবিকা দিবস আলাদা।  

সব দিন মায়েদের হয়েও মাতৃ দিবস অন্য কিছু। সব দিন সেবিকাদের হয়েও নার্স ডে আলাদা কিছু।

ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্মদাত্রী মা মায়ের পাশাপাশি বিশেষভাবে মনে পড়ছে আমার বড় কাকিমাকে। আমাকে পুনর্জীবন দিয়েছেন তিনি। মায়ের সহকর্মী ও পারিবারিক বন্ধু মানি-কেই বা ভুলব কীভাবে! আমার অন্য কাকিমারা যাঁরা মায়ের অনুপস্থিতিতে (চাকরি সুবাদে) দীর্ঘদিন আমাদের বাবা-ছেলের সংসার সামলেছেন, তাঁরা কি কম যান? কিংবা আমার ঠাকুমা! তিনিও তো ওই একই স্নেহ দিয়ে গেছেন আমৃত্যু। আমার ফালাকাটার বাড়িতে বছর তিরিশের ওপর গৃহস্থালি কাজে সাহায্য করা আমোদি এবং কোচবিহারের বাড়িতে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে থাকা স্বপ্নাই বা অনুল্লিখিত থাকবে কেন! মা ও বাবার শেষ সময়ের নিত্যসঙ্গী পারুলদি যেভাবে ঋণী করেছে আমাদের, তাতে নার্সদের ওপর শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেছে। 

আমার স্ত্রী রীনা ও ওর মা-ও এর বাইরে নন। কেননা ওরাও মা। নিজের স্ত্রীর কথা বলব না। ওর কথা বলবে ওর ছেলে। ওর মায়ের কথা বলতে পারি। নিজের ছেলেকে একটি কিডনি দান করে উনি আমার চোখে দেবত্ব স্পর্শ করেছেন। 

এই তালিকা আর বাড়াচ্ছি না। কেননা কুলোবে না। কম তো পেলাম না এই জীবনে। 
যদি তলিয়ে দেখি, তবে তার অধিকাংশই মায়েদের জন্য।
যদি আমরা সবাইই একটু ভাবি, দেখব মায়েদের জন্যই আমাদের সব।  


(তথ্য- ব্রিটানিকা, বিবিসি, ইকোনমিক টাইম)  


    

Thursday, May 2, 2024

 সাফল্যের সংজ্ঞা ঠিক কী?

শিখরে ওঠা শুধু? নাকি উঠবার পর সঠিক ভাবে নেমে আসাও? 


ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, শুধু উঠলেই হয় না। নামাটিও জানতে হয়। সবার আগে মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করেছিলেন ম্যালোরি। কিন্তু নামতে পারেননি। তাই তাঁকে নয়, প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে তেনজিং নোরগে ও স্যার এডমন্ড হিলারিকে মনে রেখেছি আমরা।


প্রার্থনা, আজ যারা সাফল্যের শীর্ষে তারা যেন এই আরোহণ অবরোহণ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থিতধী থাকতে পারে....তবেই সাফল্য। 


আকাশ স্পর্শ করো, পা রেখো মাটিতে।


শুভেচ্ছা ও শুভকামনা সবার জন্য।।